সমসাময়িক

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি অন্যতম ট্রেন্ড আছে। দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র দুইটি দলে বিভক্ত। এক তাদের দলে, দুই শয়তানের দলে। আমাদের দেশের সরকারি দলের মানসিকতাও এমন হয়ে যাচ্ছে। হয় তুমি আওআমী লীগে, নয় তুমি স্বাধীনতাবিরোধী, জামাত শিবিরের দলে।

এই সরকারের সমালোচনা করলেই তারা তার মধ্যে শিবির, জামাত আর জঙ্গিবাদের ভূত দেখে। নিজের দোষ ঢাকার এর চেয়ে ভাল উপায় আর কি হতে পারে? সরকার সমালোচনা করলেই আপনার পশ্চাতদেশে জামাতের সিল লাগিয়ে দিবে। সেই সিল যে শুধু লাগাবেই না তার উপর সরকারি কিছু বিচ্ছু বাহিনী আছে যারা সরকারি লোকের বেসরকারি হুকুম পেলেই হয়, জান যাবে তবু স্যারের হুকুম নড়চড় হতে দিবো না টাইপ মানসিকতায় কোমর বেধে নেমে পড়ে। তাই অনেকেই সরকারি দলের প্রতি সহানূভুতিশীল হলেও তাদের সমালোচনা করতে চায় না। যার ফলে সরকারও তাদের সঠিক আর ভুল সিদ্ধান্তের মধ্যে ফারাক খুজে পায় না। তাদের সব কাজই সঠিক এবং জন কল্যানকর !!!

জনগনের মন্দ কিছুই তারা চান না। তারা মনে প্রানে মঙ্গলকামী। দেখুন না তারা জনস্বার্থেই সাগর রুনি হত্যাকান্ডের রহস্যভেদ করছেন না, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারী নিয়ে কিছুই করলেন না, হলমার্ক কেলেঙ্কারী নিয়েও কিছু করার নাম গন্ধ নাই, খুনের সাজাপ্রাপ্ত আসামীকে ক্ষমা করে দিলেন, ইলিয়াস গুমের ঘটনা ধামাচাপা দিলেন এবং আর কত কি। সবই কিন্তু জনস্বার্থে।

আর এই সরকার যে আমাদের বিদ্যুৎ দিচ্ছে তা কিন্তু আমাদের একদম প্রাপ্য নয়। আমাদের সাত পুরুষ আগের পুরুষেরা কিছু ভাল কাজ করেছিলেন, তার বিনিময়ে আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। এতো আমাদের অধিকার নয়। নইলে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে কিভাবে দম্ভভরে আমাদের মনে রাখতে বলেন, একদা এদেশে লোডশেডিং ছিলো তা আমাদের মনে করিয়ে দেবার জন্য হলেও লোডশেডিং করানোর দরকার। বিদ্যুৎ যেন অন্য কারো তা থেকে আমরা হাত পেতে ভিক্ষা নিচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংবিধান বলে এদেশের সকল নাগরিকই সমান। আপনি, আমি, রাস্তায় ভিক্ষা করা আইজুদ্দিনও। এদেশে লোডশেডিং ছিল এটি যদি আমার এবং আইজুদ্দিনের মনে রাখতে হয় আশা করি আপনার ও মনে রাখা উচিত। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে আপনি কখনো অসহ্য গরমে একটি রাতও বিদ্যুৎ বিহীন ভাবে কাটিয়েছেন কিনা?

আমাদের মহান সাংসদরা অসীম ক্ষমতাবান। বোধ করি বিধাতার পরেই তাদের ক্ষমতা। তারা একবার সেনাকর্মকর্তাদের শাসান তো আরেকবার বিচারপতিদের। সরকারী কর্মচারীদের তো তারা মানুষ মনে করেন কিনা আমার জানতে ইচ্ছে হয়। এক সাংসদ কতৃক ম্যাজিস্ট্রেটকে আঙ্গুল তুলে ধমকানোর কথা ভুলে যাননি কেউ। আর সংসদ অধিবেশন শুরু হলেই হয় সরকারি দলের নেতাদের তোষন অথবা বিরোধীদলের চৌদ্দ গুষ্ঠী উদ্ধার। জনসেবার নামে ভোট নিয়ে, জনগনের টাকায় এসি ঘরে বসে তারা একে অন্যের পশ্চাতদ্দেশে আঙ্গুল প্রদান করেন। এখন কেউ যদি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা কি জনসেবা করছেন? উত্তর আসবে, অবশ্যই। অবশ্য মনে মনে বলবেন, সেটা কি জিনিস? আমরা আমজনতা তা দেখতে দেখতে ক্লান্ত।

তারা আর যাই করুক রাজনীতিটা খুব ভালো করেই জানেন। মুখে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বললেও নিজেরা ধর্ম নিয়ে ভালোই রাজনীতি করতে পারেন। ধর্মে আঘাত লাগে এমন কিছুই তারা মেনে নিবেন না। মুখে সেকুলার হলেও একটি বিশেষ ধর্মের প্রতি দুর্বলতা রয়েই গেছে। ইনোসেন্স অফ মুস্লিম সিনেমা নিয়ে গুগল, ইউটিউব বন্ধ করে আপনারা ইসলাম ধর্মের মানুষের মন, ধর্ম দুইই রক্ষা করেছেন। সাধুবাদ। কিন্তু অন্য ধর্ম মতাবলম্বীদের স্বার্থ কি রক্ষা করেছেন? নাস্তিক দের? ওয়াজ মাহফিলের নামে সারারাত যে অন্য ধর্ম নিয়ে হাসি মস্করা হয়, হিন্দু খ্রিস্টান ধর্মের মানুষের মনে যে আঘাত দেয়া হয় তা কি রোধ করতে পেরেছেন? আমাদের মহান সংসদকে কি সেকুলার করতে পেরেছেন? স্পীকার এর মাথার উপরে লিখা ইসলাম ধর্মের বানীটি কি নামিয়ে ফেলতে পেরেছেন?পারেননি। পারবেন না। কারন আপনারা ইসলাম ধর্মানুভুতি রক্ষার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন। অন্যেরা গোল্লায় যাক তাতে কি? ভোট আপনার থলেতে পরলেই মিটে গেলো।

কয়েক দিন আগে ভারত সরকার গুগল, ইউটিউব, ফেসবুক সহ আরো কিছু সাইটের প্রতিনিধিদের এই বলে সতর্ক করে দিয়েছে যে, সরকার বিরোধী কোন প্রচারনা এগুলোর মাধ্যমে হলে তারা সাইটগুলি বন্ধ করে দিবে। আমরা তাদের প্রতিবেশী বলে কথা। বাংলাদেশ সরকারও পারলে তাই করত। আমার মনে হয় তারা সুযোগ খুজছিল। পেয়ে গেছে, এখন বন্ধ।

আমি জানি না আমাদের দেশের এই কাঠ মোল্লা উম্মাদগুলোকে কেমন জানি সবাই ভয় পায়। এয়ারপোর্টের সামনে লালন মুর্তি নিয়ে ঝামেলায় শেষ পর্যন্ত হজ্ব মিনার স্থাপন করেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বিরোধী দলতো ভন্ড হুজুরদের পশ্চাতদেশের সাথে নিজেদের সুপার গ্লু দিয়ে আটকে নিয়েছে। কাঠ মোল্লারা ইউটিউব বন্ধ করার জন্য বলে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ পর্ন সাইট বন্ধ করার জন্য বলে না। এক সিনেমার জন্য তাদের ইমান দন্ড খাড়া হয়ে গেছে, কিন্তু দেশের একটি সমস্যা নিয়ে তারা মাঠে নামে না। সব ভন্ডের দল।

একটি গল্প মনে আসছে। বিমান একসিডেন্ট করার পর খবরে আসছে। হুলস্থুল কান্ড। বিমানের এই খারারপ ছিল ওই খারাপ ছিল ইত্যাদি। বিমান বেচারার মন খারাপ। সে আরেক জনকে বলছে, দেখো আমি ১০-১৫ বছর ধরে কত মানুষ নিয়ে উড়লাম। তার কোন খবর নাই, একদিন একটা একসিডেন্ট হয়েছে তার কত খবর। দুর্মুখের দল। বিমান বেচারা জানতো না, উড়ে বেড়ানোই তার কাজ। কাজের ব্যত্যয় ঘটলেই খবর হয়ে যায়। সরকারের কাজই হচ্ছে জনসেবা করা। সেই শপথ নিয়েই তারা ক্ষমতায় যায়। জনসেবা করাই আপনাদের দায়িত্ব। না করলেই সমালোচনা শুনতে হবে। তাতে আবার বিমানের মত চিন্তা করার অবকাশ নেই।

 

১,২৮৭ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “সমসাময়িক”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    দুর্দান্ত। দুর্দান্ত!
    সিসিবিতে এসব ঘটনা নিয়ে একটা পোস্ট ফরজ হয়ে গেছিলো।
    অবশ্য আমাদের তাফালিং-ও বের হয়ে যাবে।জোর গুজব, শিগগির ব্লগ (এবং আরো অনেক কিছু) নিয়ন্ত্রণ করার নানারকম কায়দাকানুন আসতে আছে।

    লালনের ভাস্কর্য নিয়ে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রীতিলতার নামে হল নামকরণ করা নিয়ে যখন প্রতিবাদের আস্ফালন দেখি তখন প্রাণপণে চেঁচাতে ইচ্ছা হয় --

    এই ছাগুদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না।

    জবাব দিন
  2. রিদওয়ান (২০০২-২০০৮)

    সাংসদ কর্তৃক ম্যাজিস্ট্রেটকে ধমকানোর বাপার নিয়ে একটা কথা বলছি। একজন ম্যাজিস্ট্রেট শিক্ষিত এবং যোগ্যতা ও পদাধিকার বলে দেশের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা। তাকে যখন অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত সাংসদের কাছে বাজে মন্তব্য শুনতে হয়, তখন মনে কোথায় আছে শিক্ষার গুরুত্ব, ক্ষমতাই তো সব।
    উপজেলা নির্বাচনের পরও বেশ কয়েকবার ইউ এন ও কে অশিক্ষিত চেয়ারমান কর্তৃক বাজে আচরনের খবর দেখেছি।
    ছাত্রলীগ কর্মীদের ইভটিজিং বিরোধী আন্দোলনের দায়ে কুয়েট ক্যাম্পাসে আমি সহ আরও অনেক ছেলেদের গায়ে "ছাত্রদল-শিবির" সিল লাগিয়েছিল ছাত্রলীগের "সচেতন ছাত্ররা"।

    আর বেজন্মা ছাগুদের নিয়ে নূপুর ভাইয়ের মত আমারও একই কথা -
    "এই ছাগুদের উল্লাশ মঞ্চ আমার দেশ না।"

    জবাব দিন
    • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

      শিক্ষিত বা অশিক্ষিত এইটা কোন যুক্তি না।
      শিক্ষিত রা ঘুষ খান আর অশিক্ষিত সংসদ সদস্য রা চুরি করেন। কে কার চাইতে ভালো।

      একজন সংসদ সদস্যের উচিত আরো দায়িত্ববান হওয়া। সে শিক্ষিত না অশিক্ষিত বা প্রাইমারী পাশ এটা কোন ভাবেই মূখ্য হতে পারেনা।
      কারণ আমি, তুমি, আমরাই তাকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছি, সংসদে পাঠিয়েছি।

      একটা বই আছে একাত্তরের ঘাতক-দালালেরা এখন কে কোথায়?
      সেরকম একটা বই বের করা যেতে পারে, বাংলাদেশের সৎ অফিসারের তালিকা।
      বইটাকে অনেক টেনেটুনে হুমায়ুন আহমেদের একটা উপন্যাস বানানো যাবে কিনা সন্দেহ!


      এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

      জবাব দিন
  3. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    লেখা ভালো হইছে।
    আওয়ামী লীগের কানে একটু পানি দেয়া উচিত।
    তারা এইটা বোঝে না যে এই প্রজন্ম তাদের ভোট দেয় কারণ তারা রাজাকারদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা দেখতে চায় না। কিন্তু তার মানে এই না যে তারা ভালবেসে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়!


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  4. ফখরুল (১৯৯৭-২০০৩)

    দুর্দান্ত লেখা।

    আমাদের সকলের এই মনোভাব আছে এসএসসি পাশ চেয়ারম্যান কিভাবে বিসিএস কর্মকর্তাদের উপর খবরদারি করে। আসল ব্যাপার হচ্ছে তারা জনপ্রতিনিধি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তাদের ক্ষমতায় সবচেয়ে বেশি। প্রশাসনকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে আনার চেষ্টা চলছে। এরকম করলে আমলাদের দূর্নীতি অনেকাংশে কমবে

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।