জীবনের টুকরো – দেশবিদেশে (পূবের মানুষ যখন পশ্চিমে – ৩)

বাংগালিরা নাকি খুব সমালোচনাপ্রবণ। আমার কাছে এক্ষেত্রে পশ্চিমাদের খুব একটা ধোয়া তুলসী পাতা বলে মনে হয় না। সমালোচনা পৃথিবীর সব জায়গাতেই হয়। বরং আমি বলব পশ্চিমে পাবলিক ফিগারদের যে রকম চুলচেরা বিশ্লেষন এবং জবাবদিহিতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, পূবে সেরকমটা হয় না বললেই চলে। এর একটা উকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে দুই প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের কথা ধরা যাক। একজন পশ্চিমের বিল ক্লিনটন আর আমাদের এরশাদ। মনিকা লিউনাস্কি জনিত যে কাজের জন্য ক্লিনটনকে বিরোধী দল রিপাবলিকানদের ইমপীচমেন্টের সম্মুখীন হতে হলো তার থেকে ঢেড় কয়েক গুণ একই কাজ করে এরশাদকে তার শাসনামলে কোন ইমপীচমেন্টের সম্মুখীন হতে হয়নি। শেষ পর্যন্ত যদিও রিপাবলিকানদের ইমপীচমেন্ট ব্যর্থ হয়, কিন্তু ক্লিনটনকে টেলিভিশন সেটের সামনে বসে সারা জাতির সামনে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। আর আমাদের প্রেমিক প্রেসিডেন্ট এরশাদকে নিয়ে তার এক প্রাক্তন প্রেমিকা জিনাত মোশাররফ বলেন, ‘এরশাদের যদি বাচ্চা জন্মদানের ক্ষমতা থাকতো তাহলে বাংলাদেশ কচিকাঁচার আসরে ভরে যেতো।’ প্রাক্তন স্ত্রী বিদিশা তো তার জীবনের ‘এরশাদ অধ্যায়’ নিয়ে একটা বই’ই লিখে ফেলেছেন। কথা হচ্ছে এরশাদের দিক থেকে তার প্রাক্তন স্ত্রী কিম্বা প্রেমিকাদের এইসব অপবাদের অফিসিয়াল কোন প্রতিবাদ আমার চোখে পড়েনি। তাই যা বলা হয়েছে তা অনেকাংশে সত্য বলেই ধরে নিচ্ছি। সেক্ষেত্রে বলা যায় পূবের মানুষজন বরং রাজনীতিবিদদের এইসব বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সহনশীল। রংপুরের গ্রামীন মানুষজনের কথা নাকি রাজ-রাজারা এই রকম অনেক কিছুই করে। উত্তর আমেরিকার এই ফ্রী-সেক্সের দেশে কিন্তু ভোটের সময় জনগনের সামনে প্রার্থীদের অন্তত দুটো বিষয়ে নিজেদের ইমেজ পরিষ্কার রাখতে হয়। একঃ সে তার পরিবারে একজন বিশ্বস্ত মানুষ; দুইঃ সে একজন আস্তিক এবং নিয়ম করে প্রার্থনায় বসেন। এই পশ্চিমে আমরা অহরহই দেখতে পাই যে যত বড় পদাধারীই হোক না কেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটের সংজ্ঞানুযায়ী কোন অনৈতিক কাজের খবর প্রকাশ হলেই সে কুপোকাৎ। কেউ পরিবারে অবিশ্বস্ত প্রমানিত হলেই সে জনগনের সহানুভূতি হারায়। কারো হাই-প্রোফাইল ক্যারিয়ার ধূলিস্মাৎ করতে পশ্চিমের মিডিয়ার কাছে তুরুপের তাস হলো সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে চারিত্রিক অপবাদ চালিয়ে দেওয়া। পুরো বিষয়টাই মিডিয়ার খেলা। জনগন এক্ষেত্রে পুতুলমাত্র। জনগনের মানসিক গঠন
এখন রুপার্ড মারডক আর টেড টার্নারদের হাতের সুতোয় বাঁধা। একই অপরাধে কেনেডিকে ছাড় দিয়ে তাকে নায়কোচিত জেমস বন্ড ইমেজ দিচ্ছে তো ক্লিনটনকে দিতে হচ্ছে নাকে খত। এক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তা হলো বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক থাকলেই কি একজন অসফল নেতা হয়ে যান? কত শত পত্নী আর উপপত্নি ছিল, তারপরও তো তিনি আকবর দ্য গ্রেট। বহুদা ভাষাভাষী আর ধর্মে বিভক্ত সমগ্র ভারতকে একই সূতোয় বাঁধলেন। তার গৃহিত পলিসি অনুসরণ করে মোঘল সাম্রাজ্য চূড়ার শিখড়ে উঠলো। মোঘলদের এই সময়টাকে এককালের রোমান বা তার পরবর্তীতে গ্রীক সাম্রাজ্যের সাথে তুলনা করা হয়। আর ওদিকে প্রৌত্র আওরঙ্গজেব স্বভাবে বড়দাদা আকবরের একেবারে উলটো। জীবনযাত্রায় সাধু পুরুষ। কোন অপব্যয়, শখ-আহ্লাদ বলে কিছু নেই। মোঘল দরবার থেকে তো সংগীতই উঠিয়ে দিলেন। আকবর যেখানে ছিলেন উদারপন্থী ধার্মিক, বর্তমানে যাকে সেক্যুলার বলা হয়, সেখানে আওরঙ্গজেব একেবারেই কট্টরপন্থী। বর্তমান জমানার মোল্লা ওমর ঘরানার। যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেও কোন কিছুর পরোয়া না করে সময়মতো নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। পূর্ব পুরুষদের মতো তেমন কোন ভোগবিলাসের রেকর্ড নেই। ক্ষমতায় বসে আকবরের উদার পলিসি বদলে তার উপর রক্ষণশীলতার প্রচণ্ডতা চাপিয়ে দিলেন। যাদের আগে জিজিয়া কর দিতে হতো না তারা হঠাৎ করে দেখলেন নিয়ম বদলে গেছে। জিজিয়া কর দিতে হচ্ছে। এই আওরঙ্গজেবের আমলেই বেজে উঠে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সুর।

১০
একবিংশ শতাব্দির শুরুতে আমরা আরেক আওরঙ্গজেবের দেখা পাই। তাও আবার এই পশ্চিমে। ব্যক্তিটি হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জুনিয়র জর্জ বুশ। ভদ্রলোক একজন ধর্মপ্রাণ গোঁড়া এঞ্জেলিক্যান খ্রিষ্টান। প্রতিদিন নিয়ম করে ধর্মগ্রন্থ পড়েন। ব্যক্তিগত জীবনেও অসম্ভব সংযমী। কোনদিন কেউ বলতে পারবে না যে বউ ছাড়া পরনারীর দিকে চোখ দিয়েছে। আগে খুব ভালই এলকোহলিক ছিলেন। একদিন হঠাৎ করেই ছেড়ে দেন। কথিত আছে একদিন এই বুশ সাহেব পবিত্র বাইবেল পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যান। তারপর স্বপ্নে পান এক অহী। ব্যস। তারপর আর তাকে থামায় কে? চারপাশের হাজারো আপত্তির মুখে আক্রমণ করে বসে দুর্বল ইরাককে। সঙ্গি হিসেবে পাশে পায় ঝিমিয়ে পড়া অস্ত্র ব্যবসায়ী আর মিডিয়াকে। মিডিয়া আমেরিকান আমজনতার মধ্যে এমন বিষ ঢুকিয়ে দিল যে ইরাক-আক্রমনের বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই সে দেশোদ্রোহী। সে সময় হিলারী ক্লিনটন সিনেটে দাঁড়িয়ে এর বিরুদ্ধে দু-চারটা কথা বলেছিলেন। ইরাকের কি ক্ষতি হলো সে কথা না হয় বাদই দিলাম, মাত্র আট বছরে এ যুগের জিন্দাপীর জুনিয়র বুশ তার একার আমলেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির তেরোটা বাজিয়ে ফেললেন। ক্লিনটন বিদায় নেবার সময় ট্রেজারিতে বিশাল ডলারের স্তুপ রেখে গিয়েছিলেন। জিন্দাপীর সেই ডলারের পাহাড় কাটতে কাটতে সেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতা তৈরি করে ফেললেন। অনেকেই এটাকে একটা অর্থনৈতিক সাইকেল বলতে চাইবে। কিন্তু কতোটা অদূরদর্শী হলে কেউ সাবপ্রাইম লোনকে জায়েজ করে? কতোটা অবিবেচক হলে একজন রাষ্ট্রনেতা জাতির ঘাড়ে অনর্থক দু’দুটো যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়? চোখের সামনে আউটসোর্সিংএর বন্যা দেখেও সে পথে কোন বাঁধ দেয় না? সাড়ে তের বছর ধরে আমেরিকায় আছি। এই পর্যন্ত তিনটে প্রেসিডেন্ট দেখেছি। এবং বুঝেছি রাষ্ট্র প্রধানের মতো একক একটি পদ কিভাবে দেশের পুরো জনগনের উপর প্রভাব বিস্তার করে। পাঁচ-ছয় বছর আগেও মনে হতো আমেরিকার এই ঘোর দুর্দিন বোধহয় আর কোনদিন কাটবে না। সেসময় পরিচিত অনেক তাইওয়ানীজ তাইওয়ানে চলে গেল। ভারতীয়রা ঝাঁকে ঝাঁকে ভারতে চলে যেতে লাগলো। বাংলাদেশ তখন একটু দূরদর্শী হলে এইসব আউটসোর্সিংএর একটা ভাগ পেতে পারতো। দুর্ভাগ্য আমাদের। তাই যাওয়ার জায়গা নেই বলে অগ্যতা আমরা থেকে যাই আমেরিকায়। ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস কিম্বা মোহাম্মদ জাফর ইকবালের মতো দেশপ্রেমিক কালে-ভদ্রে জন্মে। তখন থেকে মুসলিমদের সম্পর্কে সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে একটা নেতিবাচক ধারণা জন্মে। তাদের অনেকেই কানাডা, মালয়েশিয়া কিম্বা দুবাইয়ের দিকে চলে যায়। অনেকেরই বৈধ অধিবাসীর কাগজপত্রের সমস্যা, আবার অনেকের চাকরি নেই। সেসময় পরিচিত এক ভারতীয় মুসলিম মালয়েশিয়ার যাওয়ার আগে আমাদের বললো , ‘ঘর-বাড়ি যা কিনেছেন সব ধ্বসে পড়বে। আমি যাচ্ছি। আপনাদের জন্যও ব্যবস্থা করবো।’ না, আমাদের আর যেতে হয়নি। কয়েক বছর পর ভদ্রলোক আবার সপরিবারে আমেরিকাতে ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেছে তাইওয়ানীজদের অনেকে। তাইওয়ানে নাকি অনেক বেশি অফিস পলিটিক্স। অনেক ভারতীয় ফিরে এসেছে। তারা বলে যানজট, নোংরা-আবর্জনা, অফিস পলিটিক্স সব সহ্য করা যায়, কিন্তু চারপাশের এতো দারিদ্র সহ্য করা যায় না। আসলে আমেরিকা-বাস আমাদের অভ্যাস খারাপ করে দিয়েছে। দেশপ্রেমের জোর না থাকলে লোকে সব পিছুটান ভুলে যায়। ভুলে যায় দেশের কাছে জমে থাকা তার ঋণের কথা। তারপরও কেউ কেউ মুখ বুজে সহ্য করে যায়। সবকিছুর উর্ধ্বে জয়ী হয় তাঁর দেশপ্রেম। এতো অপমানের পরও ড মোহাম্মদ ইউনুস বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হবেন না। হবেন না জাতিসংঘের মহাসচিব। করবেন না রাজনীতিও। তারপরও দেশকেই আকড়ে ধরে থাকবেন। উনি ভালো করেই জানেন তথাকথিত ঐ সব অভাবী বুদ্ধিজীবি দেশের অর্থনীতি ধ্বসে পড়লেও রাখাল বালকদের মাথায় হাত বুলাবেন। আর সওদাগরের পুত্রের দিকে তেড়েমেড়ে আসবেন। সওদাগরপুত্র নোবেল পুরষ্কার পেলে তার দিকে অনেকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাবেন। কিন্তু দেশের অর্থনীতি ধ্বংশ করে ফেলা রাখাল বালকরা কেন ‘ইন্দিরা গান্ধী’ পুরষ্কার পান তা নিয়ে কেউ টুঁ শব্দটি করবে না।
সব মানুষের কাছে টাকাটাই যে মুখ্য নয় সেটা বোঝার ক্ষমতা খুব ভাগ্যবানেরই হয়। আর তাই ভুল রাজনীতির কারণে শত শত লোক মারা পড়লেও নেতার দিকে আঙ্গুল উঠেনা। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণে একজন মারা গেলেই সব দোষ নন্দঘোষের ঘাড়ে পড়ে। এখন থেকে বলা উচিত ‘যত দোষ ডক্টর ইউনুস।’ ঋণের ব্যাপারে আগেও বলেছি এই বিষয়টি অনেকটা ছুড়ির মতো। চিকিৎসকের হাতে গেলে তা অপারেশনের কাজে লাগে আর ডাকাতের হাতে গেলে তা দিয়ে সে মানুষ খুন করে। দারিদ্র হচ্ছে এমন একটা চক্র যা থেকে সহজে বের হয়ে আসা যায় না। ক্ষুদ্রঋণ কেন আমি অনেক স্বচ্ছল পরিবারকে দেখেছি বৃহৎঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করে দেউলিয়া হতে। এই ঋণ ব্যাপারটা বন্ধ হলে তো ভালই হয়। এর বিকল্প হিসেবে কেউ নতুন কোন আইডিয়া নিয়ে আসছে না কেন? আমার পরিচিত কয়েকজন একটা আইডিয়ার উপর কাজ করছেন। সেটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। বিষয়টা এরকম যে আমি রহিমকে এক লাখ টাকা দিলাম। এই টাকাটি পেতে বিনিয়োগকারীকে রহিম তার ব্যবসার পরিকল্পনাটি পরিষ্কারভাবে বোঝাতে হবে। বিনিয়োগকারী একটা সময় বেঁধে দেবে। এর মধ্যে রহিম সেই টাকাটি ফেরত দেবে। সেই টাকা তখন আরেকজন উদ্যোক্তাকে দেওয়া হবে। আমি এরকম কিছু বিনিয়োগ করে ভাল ফল পেয়েছি। কিছু কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। অবশ্য এর মধ্যেও অনেক সমস্যা আছে। ক্ষুদ্রব্যবসায় একলাখ টাকা বিনিয়োগ করে খুব সহজে একলাখ টাকা বের করে আনা সম্ভব নয়। মূলধন ফেরত চাওয়াটাকে অমানবিক মনে হয়। আবার ফ্রী টাকার কোন মূল্য নাই। কড়াকড়ি কিছু নিয়ম না করে দিলে দেখা যাবে আমেরিকায় যখন রাত তিনটা তখন কোন উদ্যোক্তা দেশ থেকে ফোন করে টাকা চাইছে। বিনিয়োগকারীকে সোনার ডিম পাড়া হাস মনে করছে। কেউ বিদেশ গেলে তখন হয়তোবা কয়েক বছরে টাকা ফেরৎ দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এক্ষেত্রে তো দেশের মধ্যে কোন উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠলো না। এসব বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা চলতে পারে। ব্লগ মাধ্যমে তরুনরা নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কথা বলতে পারে। জনসংখ্যার অনুপাতে বাজারে চাকরির সংখ্যা তো খুবই কম। আবার বিশাল জনগোষ্ঠির শুধু চাহিদা পূরণের জন্যই তো অনেক উৎপাদন দরকার। এই উৎপাদনের জন্য কি আমাদের তারুণ্যকে যথাযথ ব্যবহার করা যায় না? হতাশা আমাদের ক্ষেপিয়ে তুলছে। ক্ষ্যাপা মানুষ অনেক সময়ই নিজের ভালমন্দ বুঝতে পারে না। পৌছাতে পারে না মানসিক পরিপক্কতায়।

১১
কথা হচ্ছিল বর্তমানের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রনায়কদের চারিত্রিক নৈতিকতা বিষয়ে। বর্তমান বলছি এই কারণে যে আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে নৈতিকতা বিষয়টি সময় নিরপেক্ষ নয়। নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ কিন্তু এক নয়। মূল্যবোধ সার্বজনীন কিন্তু নৈতিকতা সময়ের সাথে সাথে বদলে যায়। ঠিক যেমন সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম আইন তৈরি হয়। এখন বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে জুনিয়র বুশ একজন চরিত্রবান মানুষ। কিন্তু মাত্র আট বছরের শাসনামলে আমেরিকার ভেতর-বাইরে এতো মানুষকে অসহায় অবস্থার ফেলার জন্য তাকে কি একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক বলা যায়? অবশ্যই নয়। আবার সেই তুলনায় অনৈতিক চরিত্রের ক্লিনটন তো রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সার্থক। আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের সার্থকতা বিচারের একটা পরিমাপক হলো চাকরির বাজার। ক্লিনটনের সময় সারাবিশ্ব থেকে লোকদেরকে ডেকে ডেকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। অবশ্য ডটকম বুম এবং বাস্টকে অতো সহজিকরণ করা চলা না। সে আরেক ইতিহাস। কিন্তু দায়িত্বজনিত কোন অবহেলা নয়, মনিকাজনিত কারণে মিডিয়া ক্লিনটনের চরিত্র হনন করলো। এই ক্ষেত্রে মিডিয়াকে আমি অনেক ধন্যবাদ দিবো যে তাদের এই কাজটি মূলত নারীদের পক্ষে কাজ করছে। মিডিয়া নিরূপিত চারিত্রিক নৈতিকতার কারণে অনেক পুরুষই বাধ্য হয়ে ভাল থাকছেন। নারীরাও গড়ে তুলছে নিশ্চিন্তময় সংসার। আবার আমরা দেখি যে বর্তমান বিশ্বে সংসার ভেংগে যাবার হার হু হু করে বেড়ে চলছে। উত্তর আমেরিকাতে প্রতি দুটো বিয়ের একটা ভেংগে যাচ্ছে। মিডিয়া এ বিষয়ে নিশ্চুপ বলে আমরাও বিষয়টাকে খারাপ চোখে দেখছি না। মেয়াদোত্তির্ন মনে করে অনেকে খুব সহজেই সম্পর্ক ভেংগে ফেলছে। কিন্তু এর বিরূপ প্রভাব পড়ে সন্তানদের উপরে। আর ডিভোর্সের পরে অর্থনৈতিকভাবে নারীরা আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। মিডিয়া কিন্তু এই সমস্যা কমিয়ে আনার ব্যাপারে তেমন কোন সহায়ক ভূমিকা রাখছে না। বরং বাচ্চারা যাতে ডিভোর্সটা স্বাভাবিক মনে করে এর জন্য প্রি-স্কুলের ছবির বইতেও সৎবাবা, সৎমা, সৎভাই-বোনের পরিচিতি থাকে। বাবা-মাদের ঝগড়া করতে দেখলে খুব স্বাভাবিকভাবে বাচ্চারা এসে জিজ্ঞেস করে, “তোমরা কি আলাদা হয়ে যাচ্ছ?”
আজকে আমেরিকায় অন্যদেশ থেকে লোক এসে বেশি বেতনের চাকরিগুলো করছে। আমেরিকানদের একটা বিশাল সংখ্যকই দিনমজুর ওয়ার্কিংক্লাস থেকে যাচ্ছে। এর প্রধান একটা কারণ আমেরিকানদের উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে অনীহা নয়তো অসমর্থতা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাল বিষয়গুলোতে পড়তে হলে একটা প্রচ্ছন্ন সাহায্য লাগে।
এশিয়ান মুল্যবোধে এখনও আমরা সবকিছুর উর্ধ্বে সন্তানকে প্রাধান্য দিই। আশংকার ব্যাপার হচ্ছে পশ্চিমা শিক্ষায় আধুনিক হয়ে এখন এশিয়ানরাও ক্রমশ পশ্চিমা মুল্যবোধকে আঁকড়ে ধরছে। অতীত খুঁড়লে পূবে তো দার্শনিকের অভাব হওয়ার কথা নয়। কনফুশিয়াস, গৌতম বুদ্ধ এরকম আরো অনেক নাম আসবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে পূবের দার্শনিকরাও এ যুগে ভেসে উঠছে পশ্চিমের ফ্যাশনেবল কায়দায়। জুলিয়া রবার্টস হিন্দু হন, রিচার্ড গেয়ার বৌদ্ধ হন। আমরা এখন পশ্চিম থেকে ইয়োগা শিখি।

১২
রাষ্ট্রনায়কদের চারিত্রিক বিশ্বস্ততার কথাই যখন আসলো তখন এ নিয়ে না হয় আরো কয়েক লাইন খরচ করি। গত বছর বাংলাদেশে গিয়ে প্রথমেই দক্ষিণের বেশ কয়েকটা জেলায় ঘোরা হলো। সবই গাড়িতে করে। যানজটের কথা বাদই দিলাম। প্রধান প্রধান মহাসড়কগুলোর নাজেহাল দেখে খালি দীর্ঘশ্বাস ফেলি আর ভাবি বাজেটে সওজের (সড়ক ও জনপথ) জন্য বরাদ্দ এতো এতো হাজার কোটি টাকা সব কই যায়? এখানে সেখানে ঘরোয়া আড্ডায় অনেক কথাই শুনতে পেলাম। বুয়েটে আমার তিন বছরের ছোট এক জুনিয়র বললো তার এক ব্যাচমেট সওজে ঢোকার কয়েক বছরের মধ্যেই একটা আস্ত পাজেরোর মালিক হয়ে গেছে। বাংলাদেশে এডিবি (এশিয়ান ডেভোলাপমেন্ট ব্যাংক) এর এক হর্তা কর্তা জানালেন কাজ না করেই ঠিকাদাররা টাকা নিয়ে যাচ্ছে। এসব ঠিকাদাররা হঠাৎ গজিয়ে উঠা অপেশাদার। আবার ওদিকে প্রকোশলীরা বলছে তাদের হাতপা বাঁধা। কিছুই করার নেই। কোনরকম জানটা বাঁচিয়ে চলছেন। এলাকার প্রভাবশালীদের কথামতো অসৎ এবং অদক্ষ ঠিকাদারদের টেন্ডার না দিলে নির্ঘাৎ মৃত্যু। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকায় একটি খবর দেখলাম। নদীতে একজন প্রকৌশলীর লাস পাওয়া গেছে। পরিবার বলছে খুনের ঘটনা। দুইয়ে-দুইয়ে চার মেলাতে বেগ পেতে হয় না। শুধু শুধু চিকিৎসক আর প্রকৌশলীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাংলাদেশে এইসব পেশাজীবিদের কাজের ক্ষেত্রটি এখন এমন কলুষিত হয়ে গেছে যে সেখানে চাইলেও খুব একটা সৎ থাকা যায় না। আগে যখন অফিসে একটা গ্রুপের দায়িত্বে ছিলাম, তখন নিজেকে প্রতিপদে সতর্ক থাকতে হতো। গ্রুপ ভালভাবে কাজ করে যদি এর মর‍্যাল এবং স্পিরিট উন্নত থাকে। একটু অসর্তক হলেই স্পিরিট কমে যায়। এতে আউটপুট কমে আসে। আবার বাসায় বাচ্চারা মাকে দেখে নিয়ম শেখে। ওদের জন্য বলতে গেলে টেলিভিশন দেখা প্রায় বাদই দিয়েছি। নইলে ওরা টিভি টাইমের কারফিউ মেনে না নিয়ে বিদ্রোহ করে বসতে পারে। এখনও তো মোটামুটি কম্পিউটারও বাদ। অর্থাৎ যে নীতিনির্ধারণের পদটিতে বসে আছে তার কার্যকলাপই হচ্ছে অলিখিত নিয়ম, তার কর্মচারীদের মূল্যবোধের মেরুদণ্ড। রাষ্ট্রের নিয়মটিও কিন্তু একটি পরিবার বা একটি অফিসের নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। এজন্য রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ পদধারীর মূল্যবোধ কেমন সেটা খুবই বিবেচ্য বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রে এখন আগামী নির্বাচনের জন্য রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর নির্বাচন চলছে। বিষয়টা খুবই কষ্টের, ধৈর্য্যের এবং দীর্ঘমেয়াদী। আমার কাছে মনে হয় ঠিক এই অংশটিই যুক্তরাষ্ট্রের গনতন্ত্রের প্রধান এবং প্রথম বুনিয়াদ। রাষ্ট্র যিনি চালাবেন তাকে অবশ্যই প্রজ্ঞাবান হতে হবে। বিষয়টি অতীতের জন্যও সত্য ছিল, এখনও সত্য আছে। সক্রিটিসের মতে একজন রাষ্ট্রনায়কের অংক, ইতিহাস আর দর্শনের উপর জ্ঞান থাকতে হবে। আর আমাদের দেশে এমন সব মানুষেরা ক্ষমতায় আসে যারা নিজেদের পরিবারের মধ্যে সন্তানদেরই মুল্যবোধ তৈরি করতে অসমর্থ। দেশের কথা বাদই দিলাম। কিন্তু আমাদের দেশের মিডিয়া অনবরত মগজ ধোলাই দিচ্ছে যে দুই নেত্রী মানেই গনতন্ত্র। অথচ এবার দেশে থাকতেই নানা আড্ডায় একটা কথা উঠে আসলো আর তা হলো যা রাস্তাঘাট হয়েছে তা সব এরশাদের আমলেই হয়েছে। মনে আছে আশির দশকের প্রথম দিকে আগে লক্কর ঝক্কর রাস্তায় তিনটে ফেরী পার হয়ে কুমিল্লা যেতাম। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনটে ফেরীর জায়গায় ব্রীজ হয়ে গেল। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় প্রশস্ত ঝকঝকে তকতকে রাস্তায় ঢাকা-ময়মনসিংহ রাস্তায় আসা-যাওয়া করতাম। এখন চোখের সামনে রোকেয়া সরনী, বিজয় সরনী, পান্থপথ হলো। এবার জীবনে প্রথম মেঘনা পার হয়ে পটুয়াখালী গেলাম। তিনটা ফেরী পার হতে হলো। নদী তিনটার উপরে ব্রীজ হচ্ছে দেখলাম। কিন্তু এতোদিন লাগলো কেন? আমাদের উত্তরে রংপুর, দিনাজপুরের দিকেও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পথে দুইবার নির্ঘাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়াতে সে পরিকল্পনা বাদ দেই। আমি দেশে থাকতে থাকতেই তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনির সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন। পুরো দেশ শোকে নিস্তদ্ধ। প্রবাবিলিটি কিম্বা সম্ভাবনার সূত্রানুযায়ী আমার কাছে কিন্তু এই মৃত্যু খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছে। বাংলাদেশে মহাসড়কগুলোতে একটু বেশি চলাচল করলে তার কপালে সড়ক দুর্ঘটনা কোন দুর্ঘটনা নয়। কারণ নিয়ম না মানাই সেখানে নিয়ম হয়ে গেছে। আর গাড়ির মালিকদেরও খেয়াল রাখতে হবে গাড়ির চালকেরা ঠিক মতো খেয়েছে কিনা, ঘুমিয়েছে কিনা, মানসিক সুস্থিরতা আছে কিনা। আমেরিকায় সড়ক দুর্ঘটনার একটি প্রধান কারণ ছিল গাড়ি চালনার সময় ড্রাইভারের সেল ফোন ব্যবহার। বিশেষ করে টিন-এজ ড্রাইভাররা একহাতে চলন্ত গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল ধরে রাখতো আর আরেক হাতে টেক্স মেসেজ পাঠাতো। এভাবে তারা অনেক দুর্ঘটনা ঘটায়। আদালতে ধরে যখন তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলো কেন তারা এই কাজ করছে। তখন জানা গেল এই জেনারেশন জানেই না যে গাড়ি চালনার সময় টেক্স মেসেজ পাঠাতে হয় না। কারণ কেউ তাদের মানা করেনি। তারপর এখন আমেরিকাতে স্টেটে স্টেটে আইন করে গাড়ি চালনার সময় সেলফোন ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে আমাদের দেশের গাড়ি চালকেরা জানেনা বলেই অনিয়মগুলো করছে। আর তারা জানবে কি করে? একেবারে মন্ত্রী পর্যায় থেকেই তাদের অনিয়মগুলোর সাফাই গাওয়া হয়। যেমন হবুচন্দ্র রাজা, তেমন তার গবুচন্দ্র মন্ত্রী। বাংলাদেশের মতো একটি সমস্যাসংকুল দেশে এই ধরনের দুর্বল মূল্যবোধসম্পন্ন, প্রজ্ঞাহীন হবুচন্দ্র রাজারা ক্ষমতার শীর্ষে বছরের পর বছর টিকে থাকেন কি করে? আমার মনে হয় এক্ষেত্রে প্রথমেই দায়ী করা যেতে পারে বাংলাদেশের মিডিয়া এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবি শ্রেণীটিকে। অথচ ঊনসত্তরের সময়টাতে হাজারো চাপের মাঝে এই দুই শ্রেনী বাংগালির মানসিকতাকে স্বাধীনতার জন্য উজ্জিবিত করেছে। একটি যুদ্ধের জন্য সাহসী করে তুলেছে। বেশি কিছু নয় শুধু জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেওয়া’ ছবিটির কথাই ধরা হোক। এখন কোথায় সে শিল্প, সাহিত্য – কোথায় সেই মানিক মিয়ার ইত্তেফাক? মনে আছে ইরাক যুদ্ধের আগে জর্জ বুশ কিছু মিডিয়ার সহযোগে একটি ঘোলাটে অবস্থার সৃষ্টি করে। তখন কেউ যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি কথা বললেই আনপ্রেট্টিয়েট বলে চিহ্নিত হতো। অনেক বছর ধরেই আমাদের ক্রমশ মানসিকভাবে পঙ্গু করা হয়েছে। সোজাসাপ্টা দৃষ্টিতে আমি যা দেখি তা হলো নেতা প্রজ্ঞাবান না হলে সে দল ভাল দেশ চালাতে পারে না। রাজনৈতিক দলের মধ্যে বির্তকের সুযোগ না থাকলে দেশে গনতন্ত্র থাকে না। প্রজ্ঞাবান নেতাদের ক্ষমতায় যেতে পারে না। অথচ সেই জর্জ বুশের আমলের মতো বাংলাদেশের মিডিয়া আমাদের ক্রমশ মগজ ধোলাই করে চলছে সব দোষ মন্ত্রি আর উপদেষ্টাদের। দুই নেত্রী মানেই গনতন্ত্র। তৃতীয় শক্তি মানেই ষড়যন্ত্র। যে এর বাইরে কথা বলবে সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না। ‘এর থেকে দেশ আর কতো খারাপ চলতে পারে?’ – মাঝে মধ্যে মনের ভেতর এই প্রশ্নটা উঁকিঝুঁকি মারলেই নিজেকে শাসিয়ে উঠি। পাছে লোকে কিছু বলে এই ভয়ে। এইসব হবুচন্দ্র রাজাদের আমলে আমরা ক্রমশ অটিস্টিক হতে চলছি। স্বৈরতন্ত্র খারাপ। কিন্তু অপভ্রংশ গনতন্ত্র তো আরো খারাপ। হাসিনা এবং খালেদা এই দুইজন সম্পর্কে আমার যা ধারণা তা হলো যখন সন্তানদের দেখাশোনা করার কথা তখন তারা সে দায়িত্ব পালন করেননি। এখন ফ্র্যাংকেস্টাইন হয়ে যাওয়া সন্তানদের হাতে ললিপপের মতো দেশটাকে তুলে দিচ্ছেন। না, কারও পক্ষালম্বন করার জন্য এসব লিখছি না। আমার মনে যখন এই প্রশ্ন আসলো তখন নিশ্চয় আরও কারও মনেও এইসব প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে। কেউ উত্তর দিলে বাধিত হবো।

১৩
বিএনপির প্রথমামলে মালয়েশিয়ার তৎকালিন প্রধান মন্ত্রী মাহাথির বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সময় তাঁর একটা বক্তব্য ছিল যে ‘এশিয়ার জন্য পশ্চিমের গনতন্ত্র কার্যকরী নয়।’ তখন শফিক রেহমানের মহা জনপ্রিয়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। মাহাথিরের এ উক্তির বিরুদ্ধে তার বিখ্যাত ‘যায় যায় দিন’ পত্রিকায় এক বিশাল লেখা দিলেন। শফিক রেহমান যা বলে যুবকদের কাছে তাই মহা বেদবাক্য। মাহাথির তো আর যেই সেই লোক নয়। নিজের দেশটাকে একটা সম্মানজনক অবস্থায় নিয়ে গেছেন। আবার আধুনিক সিংগাপুরের স্থপতি তিনিও কিন্তু একই কথা বলেন। সিংগাপুরের কখনও পশ্চিমের মতো গনতন্ত্র প্রচলিত হবে না। এশিয়ার তিনটি দেশ সিংগাপুর, মালয়েশিয়া আর চীন – পশ্চিমা ধাঁচের গনতন্ত্র ছাড়াই উন্নতি করেছে। কেউ হয়ত ভারতের কথা বলতে পারে। কিন্তু ভারতে যে কয়েকমাস থেকেছে বা ভারতের ব্লগগুলোতে দৃষ্টি দিলে এক অন্য ভারত দেখতে পাই। এই কিছুদিন আগে অরুদ্ধতি রায়ের একটি লেখায় দেখলাম ভারতের মাত্র একশটি পরিবার দেশের এক-চতুর্থাংশ জিডিপি হারণ করে। কি ভয়ংকর কথা! এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয়না যে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গনতান্ত্রিক দেশে কেন কিছু ছুঁতো পেলেই প্রান্তিক জনগনের এতো আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়। দারিদ্র সেখানে এতো প্রকট যে মনুষত্বের রাশনালিটি কাজে লাগে মনুষত্ব বিনাশে। ভারতের ষাটোর্ধ্ব গনতন্ত্রে শুরুটা ছিল গান্ধী, নেহেরু, আবুল কালাম আযাদদের দিয়ে। আর এখন হাই-টেক রাজনীতিবিদরা সংসদে বসে পর্ণো দেখেন। গান্ধী পরিবারের ক্যারিশমা দিয়ে ঠেকার রাজনীতি করতে হয়। পূবে পশ্চিমা পুঁজিবাদ, সামাজ্রবাদ নিয়ে অহরহই প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু পশ্চিমা গনতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না? কেন? পশ্চিমা গনতন্ত্র পশ্চিমের জন্য উপযোগী কারণ সেখানকার সমাজ বহুজাতি-বর্ণে বিভক্ত নয়। ওদের মধ্যে অতো হীনমন্যতা কাজ করে না। অনেকটা সমতল ভূমিতে ওরা গনতন্ত্রের ফুটবল খেলা শুরু করতে পেরেছে। আর এই ভারতীয় উপমহাদেশে আমরা গনতন্ত্র খেলছি উঁচু-নীচু পাহাড়ি জমিতে। স্বৈরতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা ইসলামীতন্ত্রও এ ক্ষেত্রে কোন বিকল্প হতে পারে না। ওসবের রূপও আমরা অনেক দেখেছি। তার উপর মধ্যবিত্তের শখের বিলাস, রাজনৈতিক আড্ডাবাজী, বন্ধ হয়ে যায়। না, গনতন্ত্র ভিন্ন অন্য কোন কিছুকে মহিমান্বিত করার জন্য এ লেখা লিখছি না। শুধু প্রশ্ন তুলতে চাচ্ছি পশ্চিমের উন্নতির পদ্ধতি কি পূবের উন্নতির জন্য অন্ধ অনুকরণীয় হতে হবে? আ্যসপিরিন খেলে অনেকেরই মাথাব্যাথা সারে। কিন্তু যার হার্টের অসুখ আছে তার জন্য অ্যাসপিরিন নয়। কি পশ্চিম, কি পূর্ব – দেশের উন্নয়ন সম্ভব সরকার প্রধানের হাতে। আমাদের দরকার নতুন একজন কার্ল মার্ক্স। যে প্রবর্তন করবে নতুন কোন তন্ত্র। দুঃখের বিষয় পশ্চিমা গণতন্ত্র ভ্যাক্যুয়াম ক্লিয়ারের মতো আমাদের সব মেধা শুষে নিচ্ছে। এদেশের মেধাবীরা সব বিবিএ নয়তো কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে ছুটছে। আর অবসরে শখের কিছু ব্লগিং। এভাবে তো আর নতুন কোন দার্শনিক মতবাদ গড়ে উঠে না। আজকের মধ্যবিত্ত তরুনদের অনেকেই ঘরের মধ্যে বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতাদের ছবি দেখে বড় হয়েছে। এই বিষয়টা ভেতরে এক ধরনের হীনমন্যতা তৈরি করে। তাই আমরা গনতন্ত্র বলতেই বুঝি দুই নেত্রীকে। সরকারী সব ভুল সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী করি উপদেষ্টাদের। সরকার প্রধানের প্রজ্ঞা নিয়ে কথা বলাটা তাদের কাছে ধর্মবিরুদ্ধ কাজ হয়ে যায়। আজকের বাংলাদেশে ‘সংস্কার’, ‘তৃতীয় শক্তি’, ‘রাজনৈতিক দলে গনতন্ত্রের চর্চা’ এসব কথার প্রতিশব্দ দাড়িয়েছে ‘ষড়যন্ত্র’তে। মিডিয়াও এর সপক্ষে কাজ করছে। পশ্চিম আর পূবে এই একটা ব্যাপারে মিল আছে। ইরাক যুদ্ধের আগে তৎকালীন সিনেটর হিলারি ক্লিনটন সিনেটে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “এসব কি হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট বুশের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলেই তাকে আনপেট্রিয়টিক বলা হচ্ছে।” ঠিক তেমনি আমাদের দেশে বর্তমানের এই অপভ্রংশ গনতন্ত্রকে, যা কিনা স্বৈরাচারের থেকেও নিম্নমানের, ধীরে ধীরে গনতন্ত্র বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জানি যে আমার বিরুদ্ধে কোন পরোয়ানা আসবে না। মাছি মারতে কেউ কামান দাগায় না। তাই যা ভাবছি তাই লিখছি কারণ আমি জানি আমার মতো অনেকেই এমনটা ভাবছেন।

(চলবে)

৩,৬৯৪ বার দেখা হয়েছে

৩৪ টি মন্তব্য : “জীবনের টুকরো – দেশবিদেশে (পূবের মানুষ যখন পশ্চিমে – ৩)”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    আমাদের দেশে মিডিয়া জাস্ট ক্যানভাসারে পরিনত হয়েছে। রাঘব বোয়ালরা এখন সবাই একটা করে মিডিয়া হাউস খুলে বসছে, তারপর নিজেদের এজেন্ডা অনুযায়ী ক্যানভাসিং করে যাচ্ছে।

    আর গনতন্ত্রের ভাল মন্দ সেভাবে বুঝি না, তবে আমাদের দেশে যেটা চলছে সেটা কোন ভাবেই গনতন্ত্র বলা যায় না। দেশের এমন কোন ক্ষেত্র বাদ নেই যেখানে দলীয় রঙ লাগেনি আর তার কারনে খবরদারী, দখলদারী, স্বজনপ্রীতি চলছে না। এমন কি গ্রামে সাঁকো বানাতে গিয়েও একুলের বানাও সাঁকো দিয়ে আরেক দলের লোকদেরকে পার হতে দেয়া হচ্ছে না, তারা তখন তৈরী করে নিচ্ছে আরেকটি সাঁকো।

    আমি অন্তত আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে খুব একটা আশাবাদি হতে পারি না, কোন মিরাকল ছাড়া এই ব্যবস্থা থেকে বের হবার উপায় এখন পর্যন্ত চোখে পড়ছে না।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      একমত। তুমি যা বলছো আশার কথা হলো এই যে ব্যক্তি কর্মঠ হলে নিজের অবস্থান বদলাতে পারে। আর আমাদের দেশের সিস্টেমটা এমন হয়ে গেছে যে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই স্রোতের সাথে চলতে থাকে। নিজের ভাবনাগুলোকে গুটিয়ে রাখে। শুধু তাই না, অন্য কেউ যদি এসব বিষয়ে কথা বলতে চায় তাহলে তাকেও নানাভাবে হেনস্তা করবে, পিছু টেনে ধরবে, দোষ খুঁজবে। হয়তো আমাকে বলবে প্রবাসে থেকে এতো কথা বলার কি দরকার? প্রবাসে থাকার ফলেই তো যা ভাবছি তা নির্বিঘ্নে লিখতে পারছি। দেশে থাকলে হয়তো সিস্টেমের চাপে দু-লাইনের ফেসবুকার হয়েই থাকতাম।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
  2. গুলশান (১৯৯৯-২০০৫)

    আচ্ছা আপু, এরশাদবিরোধী আন্দোলন আশা করি কাছ থেকে দেখেছেন। ঐ আন্দোলনের মূল ইস্যু কী ছিল? শিক্ষা আর গণতন্ত্র? আরো কিছু ছিল কি? সেগুলোর বর্তমান অবস্থার সাথে ঐসময়ের অবস্থার তুলনা করলে কেমন দাঁড়াবে? মাহাথির মুহাম্মদ আমাদের জন্য গণতন্ত্রের কোন মডেলের কথা কি বলেছিলেন?

    আর শেষে একটু কথা বলি-
    আর তাই ভুল রাজনীতির কারণে শত শত লোক মারা পড়লেও নেতার দিকে আঙ্গুল উঠেনা। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণে একজন মারা গেলেই সব দোষ নন্দঘোষের ঘাড়ে পড়ে। এখন থেকে বলা উচিত ‘যত দোষ ডক্টর ইউনুস।’
    কোনভাবেই এটার সাথে একমত না। বিভিন্ন কারণে ডক্টর ইউনুসের দিকে যতটা আঙুল উঠে, নেতাদের দিকে এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি উঠে। যদিও কাজের কাজ কিছু হয় না। আর সব দোষ ড. ইউনুসের উপর কেউ চাপানোর চেষ্টা করছে না। যতটুকু উনার (বা উনার সিস্টেমের) মধ্যে পাওয়া যায়, মূলত সেটার কথাই সবাই বলে। উনি আমাদের জন্য অনেক বড় সম্মান এনেছেন। তাই বলে সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে যাননি। আর একটা কারণে উনাকে অবশ্যই শ্রদ্ধা করি। আমরা সবাই মুখেই বলি আর ব্লগেই হাত চালাই। সেখানে উনি বাস্তবে কিছু একটা করে দেখিয়েছেন।

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      আমি তখন ক্যাডেট কলেজে পড়তাম। তাই প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই। তবে আমার উপন্যাসের একটা অংশে এই সময়টা উঠে এসেছে। তখন স্টাডি করতে গিয়ে দেখলাম আসল ইস্যু ছিল বা এক দফা ছিল স্বৈরতন্ত্রকে নামাতে হবে, গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে পুরো এরশাদের দশ বছরের শাসনামনে যতদিন হরতা্ল ছিল, গনতান্ত্রিক সরকার আসার পর শুধুমাত্র এর প্রথম দুই-তিন বছরেই হরতালের সংখ্যা তা অতিক্রম করে ফেলেছিল। বুয়েটে এই পর্যন্ত আমাদের ব্যাচ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই গনতান্ত্রিক সরকারের আচরণের কারণে। ৯১ সালে ইন্টারমেডিয়েট দিয়েছি আর বুয়েট থেকে পাশ করেছি ৯৮ সালের অক্টোবরে। পুরোটাই সেশনজটের কারণে। আমার মনে আছে ৯৬ সালে শুধু আমি না আমার বন্ধু-বান্ধব সবাই আওয়ামী লীগকে ভোগ দিয়েছিলাম যাতে হরতাল কমে যায় আর আমরাও তাড়াতাড়ি পাশ করতে পারি।

      আমি আসলে ডঃ ইউনুসের একনিষ্ট ভক্ত নই। ব্যাপক আকারে ক্ষুদ্র্রঋণের প্রসার হয়ে হয়তো ভাল ফল আসছে না। তবে উনার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল গ্রামের নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। নব্বইয়ের দশকে উনি ইউরোপ ্থেকে আন্তর্জাতিক মডেল বিবি রাসেলকে ডেকে নিয়ে সারা পৃথিবীতে গ্রামীনচেকের প্রসার ঘটালেন। মনে আছে আমি তখন খুব গ্রামীন চেক পড়তাম। এর আগে আমার ফ্রেন্ডরা গ্রামীন চেকের ব্যাপারে অতোটা পজেটিভ ছিল না। স্টিভ জবসকে দেখ - উঠলো, পড়লো আবার উঠলো। একটা মানুষকে প্রমাণিত হতে হলে তাঁর জীব্দদশাতেই একবার পড়তে হয়।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
        • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

          কয়েকবছর আগে এক দাওয়াতে একজন ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন। তখন সাথে সাথে আরেকজন উঠে চলে গেলেন। কারণ উনার বাবা এরশাদের গুণ্ডাবাহিনীর হাতে খুন হয়েছিলেন। সেসময় বিটিভি ছিল সাহেব-বিবির বাক্স। সেইসাথে প্রেমিকারাও প্রাধান্য পেত। স্বয়ং বিবির টেলিফোনে নাকি ড্রাগের চালান ছাড়া পেত। ঘটনার তো শেষ নেই। মানুষ বিরক্ত না হলে তো আর কারও এভাবে প্রস্থান হয় না। তবে এটাও ঠিক কেউ আশা করেনি গনতন্ত্রের নামে সরকার প্রধানের পদটিতে এমন মানুষজন বসবে যাদের সরকার প্রধান হয়ে অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতির এ-বি-সি শিখতে হয়।
          কাউকে যদি একবাক্যে মেনে নেওয়া যেত তাহলে তো আমাদের রাজনীতির কোন সমস্যা থাকতো না।


          “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
          ― Mahatma Gandhi

          জবাব দিন
  3. তাওসীফ হামীম (০২-০৬)

    শেষবার যখন এসেছিলাম,আপনার পোস্ট না পড়েই স্ক্রল করেছিলাম, এখন পড়ার পর একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। লেখাটা আসলেই সুন্দর,অনেক জায়গায় থেমে থেমে গালে হাত দিয়ে ভেবেছি।
    ভালো থাকবেন।


    চাঁদ ও আকাশের মতো আমরাও মিশে গিয়েছিলাম সবুজ গহীন অরণ্যে।

    জবাব দিন
  4. সালেকীন (২০০২-২০০৮)

    এক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তা হলো বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক থাকলেই কি একজন অসফল নেতা হযে় যান? কত শত পত্নী আর উপপত্নি ছিল, তারপরও তো তিনি আকবর দ্য গ্রেট

    বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক এর সাথে একজন নেতার সফল অসফলতার তুলনার চাইতে আমার মনে হয় একজন মানুষ যদি তার পরিবারের সাথেই অবিশ্বস্ততা করতে পারে তাহলে দেশের জনগণ কেন তাকে বিশ্বাস করবে? আর রাজতন্ত্রের আকবর এর সাথে গণতন্ত্রের ক্লিনটনের এই তুলনাটাও কেমন যেন 🙁
    আপু, আমার ভুল হইলে মাফ করবেন 🙂

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      ক্যাডেট কলেজ ব্লগের এই এক অসুবিধা। জুনিয়ররা ্কোন দ্বিমত রাখবে না আর রাখলেও এমন ভাবে সেটা বলবে যে তার বিনয় বোধ দেখে নিজেরই খারাপ লাগতে থাকে।
      যেই প্রশ্নগুলো তুমি তুলেছ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেগুলোকেই বিভিন্নভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। হয়তো অতো ভাল পারিনি। মিডিয়া আমাদের মনোজগত বা দৃষ্টিভংগি তৈ্রি করে দিচ্ছে। ইংরেজিতে যাকে বলে প্যারাডাইম। তুরুপের তাস হিসেবে মিডিয়া এখন অনৈতিক সম্পর্কটাকে ব্যবহার করছে। কোন অসুবিধা নেই। খুবই ভাল কথা। এতে মেয়েদের অনেক সুবিধা হচ্ছে। কিন্তু বাচ্চাদের কথা ভেবে মিডিয়া সম্পর্কচ্ছেদ বা ডিভোর্সের ব্যাপারে আরেকটু সোচ্চার হতে পারতো। আর আপাতত তন্ত্রের কথা ভুলে গিয়ে দেখ বৌএর কাছে বিশ্বস্ত হলেই একজন সৎ হয়ে যায় না। জুনিয়র বুশ তো বিশ্বস্ত স্বামী কিন্তু মিথ্যা কথা বলে দেশটাকে ইরাক যুদ্ধে নিয়ে গিয়েছিল। তুমি বা আমি এখন এমনটা ভাবছি যে বৌএর কাছে বিস্বস্ত না হলে তাকে বিশ্বাস করা যায় না তা কিন্তু এখনকার মিডিয়ার তৈরি করা প্যারাডাইম। অনেকটা হিরক রাজার দেশের যন্তর-মন্তর যন্ত্রের মগজধোলাইয়ের মতো।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
  5. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    আপু,

    অনেক প্রশ্ন করেছেন, প্রশ্নের আকারে বেশ কিছু মন্তব্যও করেছেন। সহমত আছে, দ্বিমতও আছে (ইউনুস-ইস্যু ছাড়াও 🙂 )
    সীমাহীন পড়াশোনার চক্করে আছি বলে আপাততঃ তুলে রাখলাম, সপ্তাহ দুয়েকের জন্য।

    অ ট- আপু, নতুন প্রোপিক ভাল্লাগছে।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  6. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    :clap: :clap: :clap:
    পড়তে সময় লাগলো আর তাই মন্তব্যেও দেরি।
    কিছু দিমত আছে।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  7. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    ইয়ে মানে আপু, আপনার লেখা পড়া শুরু করি। পড়ার পথে পথে কিছু জায়গায় দ্বিমত হয়। আবার লেখার পরের পার্টে গিয়ে সেটা ভুলে যাই। এর পরের থেকে এক প্যারা পড়বো আর নিজের মত দেবো এই ডিসিশন নিয়া নিলাম।
    যা হোক, এরশাদ প্রসঙ্গে আসি, কম খারাপএর রাজনীতি ধরে এরশাদকে আমরা অনেকেই ভালোর সার্টিফিকেট দিয়ে দেই। খিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে এরশাদের সময়কাল বেশ দূরের মানে মোটামুটি বিশ বছর আগের। আমাদের বাঙালিদের মেমোরি গোল্ড ফিশের । তাই খুব তাড়াতাড়িই ভুলে যাই আমরা। খেয়াল করলে দেখবেন এখন কথা বলতে গেলে অনেককেই বলতে শুনবেন বিএনপির আমলে ল এন্ড অর্ডার কনডিশন ভালো ছিলো ইত্যাদি। মাত্র ছয় বছর আঘের কথাই আমরা অল্প অল্প করে ভুলে গেছি। তাই বিশ তিরিশ বছর আগের কুকীর্তি ভুলে যাওয়া খুবই স হজ কাজ। সেই সাথে যোগ করেন সেই আমলের মিডিয়ার কথা। প্রথমত তখন প্রিন্ট মিডিয়া আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া এখনকার মত শক্তিশালী ছিলো না। তার উপর সরকারের হস্তক্ষেপে মিডিয়ার মুখ নিয়ন্ত্রিত ছিলো। তাই মোটাদাগে ব্রিজ কালভার্ট দিয়ে এরশাদের আমলকে আমরা স্বর্ণযুগ ভাবার চেষ্টা করলেও সেটা মূলত একটা রোমান্টিক ভাবনা। লেখা পড়ে আকবর আড় এরশাদ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যায় এমন একটা সম্ভাবনা থেকে আমার এই কথা বলা।
    াওনেক গুলো বিষয়ে একমত হলেও কিছু কিছু জায়গায় আপনার সাথে একমত নই। সময় করে ভাগে ভাগে আরো কিছু বলে যাবো এই আশা রাখি।
    ভালো থাকবেন।

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      আমিন 'গোল্ডফিস মেমোরী' এই ধরনের আবেগীয় স্টেরিওটাইপ শব্দ প্রয়োগের থেকে আরেকটু তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যুক্তি প্রকাশ করলে আমার পক্ষে লেখার ভুল বোঝা সহজ হয়। তুমি এরশাদ সম্পর্কে গুলশানের প্রশ্নের উত্তরে আমার কমেন্ট দেখতে পারো।
      আর এরশাদ সম্পর্কে আমি যা লিখেছি তা আমার নিজস্ব কোন মতামত নয়। তিন সরকারের আমলে চাকরি করেছে এবং দেশের পলিসির সাথে যুক্ত ছিল এমন অনেক মানুষের বক্তব্যের সুত্র ধরে আমি কি দেখেছি তা বর্ণণা করেছি।
      এরশাদের আমলে ব্রীজ-কালভার্ট বা ইনফ্রাস্ট্রাকচারে কাজ বেশি হলে তা স্বীকার করলে অসুবিধা কোথায়?
      বিএনপি আমলে আওয়ামীলিগের আমলের থেকে আইন-শৃখংলা পরিস্থিতি ভাল থাকলে তা বলতে দ্বিধাবোধ করবো কেন?
      আওয়ামীলীগের আমলে জংগীবাদের প্রকোপ কমে গেলে এবং গ্রামীন পর্যায়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জোর দিলে তার প্রশংসা করব না কেন?


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
      • আমিন (১৯৯৬-২০০২)
        ‘গোল্ডফিস মেমোরী’ এই ধরনের আবেগীয় স্টেরিওটাইপ শব্দ প্রয়োগের থেকে আরেকটু তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যুক্তি প্রকাশ করলে আমার পক্ষে লেখার ভুল বোঝা সহজ হয়।

        প্রথম কথা হলো আপনার লেখার ভুল ধরার কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলার জন্য কমেন্ট টা করি নি। আপনি মত দিয়েছেন আমি আমার মত বলতে চেয়েছি। এখানে ঠিক ভুল ছাত্র-শিক্ষক কোন ব্যাপার নেই বলেই মনে করি। দ্বিতীয়ত গোল্ডফিস মেমোরী শব্দটা কীভাবে আবেগীয় স্টেরিওটাইপ হলো তা আমার বোধগম্য হলো না। স্টেরিওটাইপ মানে হচ্ছে কোন পয়েন্ট ছাড়া কারো সম্পর্কে কোন মতামত প্রকাশ করা। আমার গোল্ড ফিশ মেমোরীর ব্যবহারে কার ব্যাপারে জেনারালাইজ কথা বললাম সেটাও বোধগম্য হলো না। আমি বলতে চেয়েছি আমাদের ভুলে যাওয়ার একটা সাধারণ প্রবণতা থাকে। তার উদাহরণ টেনে বলেছি জোট সরকারের আমলের দুর্নীতি জঙ্গীবাদ ইত্যাদি ভুলে মানুষ আবার ভালো দিকটা দেখতে শুরু করেছে শুধু মাত্র আওয়ামী লীগের খারাপের কারণে। একইভাবে বিএনপি আওয়ামী লীগের খারাপ দেখে আমরা এরশাদকে ভালো বলা শুরু করেছি - জাস্ট এই এনালোজিটা বলবার চেষ্টা করেছি। আমি এরশাদ খালেদা বা হাসিনার কারো ভালো কাজই অস্বীকার করার কথা বলি নি। আমি বলেছি যার শাসন আমল যত দূরে যায় তার খারাপ টার চেয়ে ভালোটা বেশি চোখে পড়ে। সময় যত আগাচ্ছে দেশের প্রেক্ষাপটেই দেশ শাসন তত কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই আশির দশকে উন্নয়ন করা যত সহজ ছিলো এখন সিনারিও তার চাইতে অনেক কঠিন। আর ঐ সময়ের মিডিয়া উইক থাকার কারণে এরশাদের কুকীর্তির অনেক কিছুই চাপা পড়ে গেছে-- আমি সেটাই বলতে চাইছি।

        তৃতীয় শক্তির উত্থান চাই তবে এরশাদ নয়। একজন ৮২ বছরের প্রতিবন্ধী যে কিনা কোন কিছুতে "আমরা" ব্যবহার করতে পারে না, সব "আমি" টার্মে ব্যবহার করে, যার মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ, যে ব্যাক্তিগত জীবনে লম্পট, যে ভার্সিটিতে পুলিশের গুলি করার নজির দেখিয়েছে, যে ব্যাক্তি মিডিয়ার মুখ বন্ধ করে লেজুড়বৃত্তি মূলক গণমাধ্যমের পথিকৃত, শুধুমাত্র কয়েকটি ব্রিজ কালভার্টের জন্য আর তার কাছ থেকে সুবিধাভোগী কয়েকজন আমলার প্রশংসা শুনে তার ব্যাপারে এত সহানুভূতি দেখালে অবশ্যই আমার আপত্তি আছে।

        বাই দ্যা ওয়ে আপনি এরশাদ আমলে হরতাল কম ছিল বলে যে প্রশংসা করলেন তার সাথে আমি একমত নই। কারণ ঢাকা ভার্সিটির কলা অনুষদের ৮২ এর ব্যাচ পাস করছে ৯২ বসালে। এইবার আপনার বুয়েটে পড়া বছরের সাথে এরশাদ আমলের হরতাল কম হওয়া সময়ে ভার্সিটি পাস করে বের হওয়া ছাত্র ছাত্রীদের সময়ের হিসাব মিলিয়ে নেন। শুধু এটুকুই বলবো, এরশাদের আমলে হরতাল হতো না শুধু ক্লাশ করবার মাঝেই স্টুডেন্টরা টের পেত গ্যঁঘ্জাম শুরু হয়ে গেছে। আমার কথা গুলো মানুষের কাছে শোনা। লাবলু ভাই হয়তো এ ব্যাপারে আরো ভালো তথ্য দিতে পারবেন।

        আমি এই মুহূর্তে একটু সময় সংকটে আছি। আরো তথ্য উপাত্ত সহ এরশাদ আমল বিষয়ে বলে যাওয়ার ইচ্ছা রাখি। লেখাটা আপাতত বুকমার্ক করলাম।

        জবাব দিন
        • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

          হায়দার আকবর খান রনোর বই 'শতাব্দীর পথে' বইটিতে স্পষ্ট করে সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে ৮২-৯০ এর হরতাল সংখ্যা < ৯১-৯৪ এর হরতাল সংখ্যা। বইতির পৃষ্টা নাম্বার দেওয়ার জন্য এই দুইদিন বইটি খুঁজছিলাম কিন্তু পেলাম না। পরে পেলে পৃষ্টা নাম্বার দিয়ে দিব। হরতালের সংখ্যা কম হলে তাতে সরকারকে ক্রেডিট দেওয়া হয় না বরং তাতে এই গরীব দেশের বিরোধী দলের আচরণ বোঝা যায়। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম ৮২-৯০ এর দরকার ছিল স্বৈরতন্ত্রকে নামাতে। তাহলে গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সময়ে বিরোধীদল অনর্থক এতো হরতাল+হাংগামা+মারামারি করলো কেন? তাহলে গনতন্ত্র নয় শুধুই ক্ষমতায় যাওয়াটাই মূল লক্ষ্য? এখন প্রশ্ন হলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা এতো মরিয়া ছিল কেন? সরকার চালানোর ব্যাপারে খুব বেশি প্রিপারেশন নিয়েছিল তাই? কিন্তু ক্ষমতায় এসে নির্দwইধায় সরকারপ্রধান বা অর্থ্মন্ত্রী তাদের অর্থনীতি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা বলে। যেই দেশে অর্থনীতিই বড় সমস্যা সেই দেশের সরকার প্রধান অর্থনীতি জানাটাকে তেমন প্রয়োজন মনে করে না। কে কাকে পছন্দ করেবে এটা তার ব্যক্তিগতবোধের পরিচায়ক। এখানে আমি কারো ক্যানভাসার নই।


          “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
          ― Mahatma Gandhi

          জবাব দিন
          • আমিন (১৯৯৬-২০০২)
            হায়দার আকবর খান রনোর বই ‘শতাব্দীর পথে’ বইটিতে স্পষ্ট করে সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে ৮২-৯০ এর হরতাল সংখ্যা < ৯১-৯৪ এর হরতাল সংখ্যা। বইতির পৃষ্টা নাম্বার দেওয়ার জন্য এই দুইদিন বইটি খুঁজছিলাম কিন্তু পেলাম না। পরে পেলে পৃষ্টা নাম্বার দিয়ে দিব।