গরু, তোমরা সব গরু

“বেহেশতের দারোয়ানকে একটা রাঙামাটির তরমুজ দিও। তাহলে ওখানে সহজে ঢুকতে পারবে।” ভুগোল পড়াতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন সম্পদের গুণমাণ বোঝাতে এমনটাই বলেছিলেন আমাদের শিক্ষক অধ্যাপক এম এ কাশেম।

গত শনিবার হৃদরোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অপারেশন টেবিল থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন তিনি। শুধু ক্যাডেট কলেজেই ৩৪ বছর। ১৯৫৮ থেকে ১৯৯২ সাল। এর মধ্যে অল্প সময়ের জন্য বরিশাল ও কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে গিয়েছিলেন। বাকি পুরো সময়টা ফৌজদারহাটে। ফৌজদারহাট থেকে অবসরে যাওয়ার আগে তিনি কলেজটির উপাধ্যক্ষ হয়েছিলেন। পরে ঢাকায় ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন চার বছর।

স্যারের প্রিয় গালি ছিল “গরু”। প্রচণ্ড রেগে গেলেও “তোমরা সব গরু” এ ছাড়া আর কোনো বকাঝকা স্যারের মুখ দিয়ে বের হতো না। এ কারণে ছাত্রদের কাছে স্যারের নিক নেমও হয়েছিল “গরু”। ওই এক নামে ফৌজদারহাটের হাজার হাজার ছাত্র স্যারকে চিনতো। ওই নামেই তাকে আমরা ডাকতাম। স্যার নিজেও জানতেন সেটা। এ নিয়ে তার কোনো ক্ষোভ ছিল না।

বেটেখাটো ধবধবে সাদা চুলের কাশেম স্যার চমৎকার করে ভুগোল পড়াতেন। স্যারের কাছে পড়ে বিষয়টা ভালোই রপ্ত করেছিলাম আমি। প্রিয় একটা বিষয় ছিল ওটা আমার। সহপাঠি বন্ধুরাও ভুগোল বুঝে নিতে আমার শরণাপন্ন হতো। এইচএসসিতে বিষয়টিতে মাত্র ২ নম্বরের জন্য লেটারটা ফসকে গিয়েছিল আমার।

চার মেয়ে আর দুই ছেলে স্যারের। বড় ছেলে সালেক আমাদের একবছরের ছোট। আর ছোট ছেলেটি ছিল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। ছোট ছেলেটাকে ভীষণ ভালোবাসতেন স্যার। তো সেই ছেলেটি বেশ ক’বছর আগে মারা গেলে প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলেন কাশেম স্যার।

প্রিয় শিক্ষককে শেষ বিদায় জানাতে গতকাল রোববার গিয়েছিলাম লালমাটিয়া মসজিদে। ওখানে জানাজায় স্যারের অনেক ছাত্র ছিল যাদের কারো কারো বয়স এখন ৬০-৬২ বছর। স্যার যেমন মজা করতেন সব সময়, তারই রেশ টেনে আমি এক বন্ধুকে বলেছিলাম ‘চল স্যারের কফিনে একটা রাঙামাটির তরমুজ দিয়ে আসি। বেহেশতের দারোয়ানের জন্য স্যার ওটাই তো নেওয়ার পরামর্শ আমাদের দিয়েছিলেন।’

১,৯৬২ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “গরু, তোমরা সব গরু”

  1. শফি (৮৬-৯২)

    যে সব শিক্ষকদের হাত দিয়ে ছয় বছরে আমাদের মত গরু-গাধা মানুষ হয়ে বেরোয়, তাতে তাঁর আর কোনও তরমুজ বা উপঢৌকন বেহেশ্‌তের ফেরেশতাকে দেবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না। তাঁদের জন্যে স্বর্গের দ্বার অবারিত, আমি নিশ্চিত। উনি ভাল থাকুন। আমীন্‌।

    জবাব দিন
  2. বিসিসি-তে ঢুকে স্যারকে পাইনি কিন্তু তাঁকে চিনতাম। ১৯৮৪/৮৫ সালের কথা। এখনো আমার চোখে ভাসে- মাথাজুড়ে ব্যাক ব্রাশ করা সাদা চুল, ক্লীন সেভড, বেটে-খাটো কিন্তু বলশালী, শ্যামবণের সদা হাসে্যাজ্জ্বল স্যার সবার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। চলাফেরা, কথাবাতায় ছিলেন খুবই স্মাট। তাঁর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সন্তানটি ছিলেন দেখতে খুব সুন্দর। এই ছেলের কিছু স্মৃতি মনে পড়ে। মনে হতো, স্যারের সমস্ত ভালবাসা ছিল এই সন্তানের জন্য। ব্লগে স্যারের খবরটি দেখে চোখে পানি এসে গেল।

    আল্লাহতায়ালা স্যারকে যেন বেহেস্তেবাসী করেন এবং তাঁর পরিবারকে শোক সহ্য করার শক্তি দেন- এ দোয়া করি।

    জবাব দিন
  3. মান্নান (১৯৯৩-১৯৯৯)

    ক্যাডেট কলেজের টিচাররা যে মমতা দিয়ে ক্যাডেটদের আগলে রাখেন আমিও বিশ্বাস করি ঐটিই তাদের জন্য বেহেশতের জন্য যথেষ্ট। স্যারের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি ।

    জবাব দিন
  4. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    আমাদের সময়ে ফৌজদারহাটে কাশেম, ভুঁইয়া, রফি ইমাম, নুরুল ইসলাম, জামান, নাসির, মিজান, জয়গোপাল, গোপাল, নজরুল, হাসান, ফয়জুল, বাচ্চি খান, আক্কাস আলী, আ. আ. নূর, জাকেরউল্লাহ স্যারেরা শাসন এবং স্নেহ দিয়ে আগলে রেখেছিলেন। সব শিক্ষকের নাম এক্ষুনি মনে পড়লো না। মনে পেড়েছ আরো- সলিমউল্লাহ, হাবিবউল্লাহ স্যার- আরো অনেকে। দারুণ সময় কেটেছে তাদের সঙ্গে। এরা অনেকে পরে অন্য ক্যাডেট কলেজে গেছেন।

    কাশেম স্যার চলে গেলেন। জাকেরউল্লাহ স্যার (ফৌজদারহাটের প্রাক্তন ছাত্র) অনেক আগেই মারা গেছেন। কারো কারো খবর জানি। বেশির ভাগেরই জানিনা।

    কদিন আগে ক্যাডেট কলেজ ক্লাবে আমরা নূর স্যারকে পেয়েছিলাম। গত ১৭ মে ক্লাবে আমরা বেশ কয়েকজন মিলে স্যারকে নিয়ে উনার ৭২তম জন্মদিন পালন করেছি।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  5. সাদা চুলের স্যারকে খুব বেশি দিন পাইনি। তবে স্যারের কিছু স্মৃতি মনে পড়ে.... স্যারের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি । দোয়া করি - আল্লাহতায়ালা স্যারকে যেন বেহেস্তেবাসী করেন এবং তাঁর পরিবারকে শোক সহ্য করার শক্তি দেন

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।