জীবনের টুকরো – দেশবিদেশে (পূবের মানুষ যখন পশ্চিমে – ১)


নিউ ইয়র্কে যখন সূর্যাস্ত বাংলাদেশে তখন সূর্যোদয়। তারপরও পাশ্চাত্য আর প্রাচ্য বলতে আমরা মূলত সংস্কৃতির পার্থক্য বুঝি – দ্রাঘিমার নয়। আমি পূবের মানুষ। থাকি এখন পশ্চিমে। তবে ছোট হয়ে আসা এই পৃথিবীতে প্রবাসী শব্দটার মধ্যে এখন আর কোন জৌলুস নেই। বরং প্রবাসী মানেই রেমিটেন্স নয়তো মেধা-পাচার। এই একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এমন এলাকা এখন বিরল যেখানে অন্তত: একজনও প্রবাসে থাকে না। তবে বাঙালিদের বিশ্ব-ভ্রমণ আজকালকার বিষয় নয়। আজ থেকেও পনেরো শ বছর আগে, বগুড়া অঞ্চলের দিককার প্রেক্ষাপটে রচিত ‘মনসামঙ্গল’এর চাঁদ সওদাগর জাহাজ করে সাগরে যেত বাণিজ্য করতে। বগুড়া-রংপুর সড়ক থেকে ১ কিলোমিটার দূরে গোকুল মেধ নামের জায়গাটি স্থানীয়ভাবে বেহুলার বাসরঘর বা লক্ষ্মীন্দ্রের মেধ নামে পরিচিত। ১৯৩৪-৩৬ সালে এখানে খননকার্যের সময় একটি সারিবদ্ধ অঙ্গনে ১৭২টি আয়তাকার বদ্ধঘরের সন্ধান মিলে। এটি খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ অথবা সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত হয়। স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই স্থানটি বেহুলা ও লখিন্দরের সঙ্গে যুক্ত। এই লখিন্দর হচ্ছে চাঁদ সওদাগরের ছোট ছেলে। অবশ্য সৈয়দ বাড়ির বংশগৌরবের মতো প্রাচীন ঐতিহ্যের শরীরেও মরচে ধরে। বর্তমান ঝকমকে না হলে অতীত শুধুই দীর্ঘশ্বাস। চাঁদ সওদাগরের এলাকার মানুষ হয়ে আজ আমরা ধীরে ধীরে মানসিক গুহায় আটকে পড়ছি, আর সেসময়ের মানসিক গুহাবাসীরা আজ যাচ্ছে চাঁদে। অতীত ঘাঁটলে এমন অনেক নজীর পাওয়া যাবে। ইউরোপীয়রা চীনাদের কাছ থেকে কাগজ, সিল্কের মতো পণ্যের পাশাপাশি জেনেছিল বারুদের কৌশল। তারপর সতেরশো শতাব্দীতে চীন একই জায়গাতে স্থির রইলো। কিন্তু ইউরোপে ঘটলো রেনেসাঁ। শিল্প-বিপ্লবের সময় আরও অনেক প্রয়োজনীয় তৈজসপত্রের সাথে তারা বানালো কামান – উচ্চমাত্রার বারুদ বিস্ফোরক। তারপর তারা জাহাজ করে বেরুলো বাণিজ্য করতে। অস্ত্র আর কূটবুদ্ধির জোরে তাদের উপনিবেশ ছড়িয়ে পড়লো সারা পৃথিবীতে। গোলাপি অথবা বাদামী মীরজাফর জগৎশেঠরা গদগদ হয়ে সাদা চামড়ার লর্ড ক্লাইভদের মসনদ দিয়ে দিলেও হলুদিয়া চীনারা তাদের বন্দর বন্ধ করে রাখল। চীনাদের মনে সাদাদের সামনে হাত কচলানোর মতো তেমন কোন হীনমন্যতা ছিল না। উলটো তারা ভাবতো ‘আমরা কিসে কম, আমাদের কারো থেকে কিছু নেওয়ার নেই।’ সুপিরিয়র বা ইনফিরিয়র কোন কমপ্লেক্সই ভাল ফল বহন করে না। ব্রিটিশরা প্রথমে চোরাকারবারির মাধ্যমে চায়নার বন্দরে অপিয়াম ছড়িয়ে দিল। ড্রাগের নেশায় বুদ হয়ে থাকা চায়নিজদের রক্ষা করার জন্য উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে তৎকালীন চীনা সম্রাট ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অপিয়াম যুদ্ধে নামলো। ব্রিটিশদের কামানের মুখে টিকতে না পেরে যুদ্ধে হেরে চায়না বাধ্য হলো ব্রিটিশদের কাছে তাদের বন্দর খুলতে। সেই প্রথম চায়না বুঝতে পারলো তারা সুপিরিয়র নয়। পশ্চিমের কাছে তাদের অনেক কিছু শেখবার আছে। অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না। তারপর তো কম্যুনিজম, কালচারাল রেভ্যুলিউশন, মুক্তবাজার এরকম এক একেকটা মাইলফলক পেড়িয়ে চায়না আজ সুপার পাওয়ার হবার পথে। আর সিংহাসন থেকে পড়ে যাবার ভয়ে পশ্চিমেরা ছুটছে চায়নার স্কুল ব্যবস্থা দেখতে। কি রহস্য চায়নার যে সেখানে এতো এতো প্রযুক্তিবিদ তৈরি হচ্ছে? মজার ব্যাপার হলো আজকের চীনারা উলটো বিশ্লেষণ করছে পশ্চিমের শিক্ষা ব্যবস্থা। কারণ ওদের মনে একটা দুঃখ আছে। সবচেয়ে কম দামে আলপিন থেকে শুরু করে কম্পিউটার বানিয়েও ওদের প্রযুক্তিবিদেরা ‘চোরা বিদ্যা’র অপবাদ থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। ওদের দেশে এখন পর্যন্ত একটা মৌলিক সৃষ্টিশীল ধারণার উপর ভিত্তি করে আইবিএম, মাইক্রোসফট কিম্বা হালের ফেসবুকের মতো নিজস্ব কোন কোম্পানি গড়ে উঠেনি। অতীত থেকে ওরা যথেষ্ট শিক্ষা নিয়েছে। এখন বরং ওরা তক্কে তক্কে থাকে পশ্চিমের থেকে কি কি নেওয়া যায় সেই সুযোগের। প্রযুক্তি তো নিচ্ছেই। এখন জানতে চেষ্টা করছে সৃষ্টিশীল হওয়ার রহস্য।

পৃথিবীর নিয়মটাই বোধহয় এমন। অঞ্চলভেদে এ গ্রহে ভোরের আলো ফোটে পালাক্রমে। যে কোন মুহূর্তে কোথাও না কোথাও ঘটে চলছে আলো-আঁধারীর করমর্দন। মায়াময় এই পৃথিবী সূর্যের মতো সভ্যতাকেও যেন ক্রমাগত ঘুরে ঘুরে প্রদক্ষিণ করছে। এখানে সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতার পীঠ-ভূমি আফ্রিকা আজ অন্ধকারাচ্ছন্ন। মরু অঞ্চলের দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনীর মতো আজ আফ্রিকা পাড়ি দিচ্ছে অন্ধকারের লম্বা পথ। আর কর্কট ক্রান্তির উপর জেগে উঠা এক শ্যামলিমা ব-দ্বীপে আমরা আবার স্বপ্ন দেখছি অদম্য চাঁদ সওদাগর হবার। স্বপ্ন দেখছি নির্ঝরের স্বপ্ন-ভগ্নের।

আগে আমরা সমাজ বইতে পড়তাম ‘মানুষ সামাজিক জীব।’ কথাটা ঠিক কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে। আমরা বলি নিউক্লিয়ার পরিবার আধুনিকতা আর নগরায়নের উপজাত। এর ফলে আমরা হচ্ছি আত্মকেন্দ্রিক। এইরকম কথাবার্তা শুনতে খুব তাত্ত্বিক শোনায়। আমি বুঝি না সরাসরি কেন বলে হয় না যে মানুষ আসলে আলাদা হয় মূলত অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা আর ভিন্নমতের কারণে। বাংলাদেশে এখন হাজার-হাজার বয়স্ক বাবা-মায়েরা একা একা নিজেদের ফ্ল্যাটে বাস করছে। ছেলেমেয়েরা দূর-দূরান্তে কিম্বা অনেক ক্ষেত্রে কাছে থেকেও পাশে নেই। আমার ফুফু একটা মজার কথা বলতেন – ‘ভাগ্যবানের ছেলেমেয়েরা দেশে থাকে, অভাগার ছেলেমেয়েরা সব বিদেশ চলে যায়।’ এবারে ফুফুর সাথে দেখা হলো। জানি না এখনও উনি তেমনটা ভাবেন কিনা। ফুফুকে দেখেছি আমার বৃদ্ধ দাদাকে খুব যত্ন নিয়ে পরিচর্যা করতে। সময় বদলেছে। মায়েরাই এখন আর তাদের বাচ্চাদের তেমন একটা সময় দিতে পারে না, সেখানে বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের জন্য তাদের সময় কোথায়? পশ্চিমের মতো পুবেও আজ বয়স্ক মানুষেরা একাকীত্বের সাথে সহাবস্থান করছে। পশ্চিমে এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ঢেউ আগে এসেছিল। পূবে যখন বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা নাতি-নাতনি নিয়ে আয়েশ করছিলেন তখন পশ্চিমের বয়স্করা একাকীত্বের যন্ত্রণার মধ্যে যাচ্ছিলেন। এখন আবার অনেকদিন একা থাকার পর পশ্চিমের বয়স্করা যখন এর মধ্যেই জীবনকে আনন্দময় করার উপায় বাতলে নিচ্ছেন, পূবে তখন বদ্ধ ঘরে একাকী বাবা-মায়েদের দীর্ঘনিশ্বাস আছড়ে পরছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সিলিকন ভ্যালীতে অনেক ককেশীয়দের বাসায় গিয়ে দেখেছি যে সেখানে আবার আগের জামানার যৌথ পরিবারের চল শুরু হয়েছে। একই ছাদের নীচে নানা-মেয়ে-নাতি থাকছে। আমার বাচ্চাদের স্কুলে দেখছি এখানকার গ্রান্ডপেরেন্টসরা প্রতিদিন নাতি-নাতনীদের স্কুল থেকে তুলে নিতে আসছেন। এর পেছনের কারণটাও অনেকটা অর্থনৈতিক। এই এলাকার সব উচ্চমূল্যের বাড়িগুলো কিনে ফেলছে হাই-টেকের হাইপেইড বিজ্ঞানী আর প্রযুক্তিবিদেরা। এদের অধিকাংশই আবার এশিয়া থেকে আসা হলুদ আর বাদামী বর্ণজাত। অর্থনৈতিক চাপে সাদাদের অনেকেই হয় ক্যালিফোর্নিয়া ছাড়ছে নয়তো যৌথ পরিবারে একই ছাদের নীচে থাকতে শুরু করেছে। আবার সাংস্কৃতিক-ভাবে তিন প্রজন্ম একই ছাদের নীচে বসবাস করার ক্ষেত্রে চীনাদের সংখ্যাটা অনেক বেশি। এর একটা প্রধান কারণ ওদের ‘এক সন্তান’ নীতি। দেখা যাচ্ছে এই প্রজন্মের তরুণ বা তরুণীদের বাবা-মা ছাড়া নিকটা আত্মীয় বলতে কোন ভাই-বোন এমনকি অনেকাংশে কোন কাজিনও নেই। আর চীনা সংস্কৃতিতে মোটামুটি এই ধারণা চালু আছে যে প্রথম প্রজন্ম তৃতীয় প্রজন্মকে দেখবে আর দ্বিতীয় প্রজন্ম বাইরে কাজ করতে যাবে। তবে শুধু সাংস্কৃতিক চল আছে বলে কিম্বা মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করেই তো আর সবার সহাবস্থান হয়ে যায় না। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে প্রত্যেককেই অনেক বেশি সাবধানী, সর্তক আর বুদ্ধিমান হতে হয়।
আমার তখনও কোন বাচ্চা হয়নি। আমার অফিসের সহকর্মি ক্রিস্টিন তখন দুটো ছোট ছোট বাচ্চার মা। তার শাশুড়ি তখন বাসায় ক্রিস্টিনের দু বাচ্চাকে দেখাশোনা করছিলেন। এর আগে চীনা সংস্কৃতির উপর একটা বই পড়েছিলাম। সেখানে দেখেছি যে মাও-সে-তুঙ্গের আগের চীনে মেয়েদের যৌতুক, শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার এরকম সব সমস্যাই ছিল। অনেক অনেক আগে থেকেই চীনা মেয়েদের মধ্যে একটা সিক্রেট কোড চালু রয়েছে। সেখানে শ্বশুর বাড়ির অত্যাচার থেকে কিভাবে রক্ষা পাওয়া যায় তার কিছু উপায় লেখা রয়েছে। ক্রিস্টিনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ,’শাশুড়ি-বৌয়ের এতো সমস্যার কথা শুনি, তোমাদের কোন সমস্যা হয় না?’ উত্তরে সে বলেছিল, ‘আমার শাশুড়ি অনেক কথাই বলে। কিন্তু আমি শুধু সে কথাটাই শুনতে পাই যেটা আমাদের সম্পর্ককে খারাপ করবে না।’ ক্রিস্টিনের এই টিপসটা পরবর্তীকালে আমার সাথে আমার শাশুড়ির সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে কাজে দিয়েছিল। এবং অবশ্যই ব্যাপারটা উভয়-পাক্ষিক। প্রবাসী বাচ্চাদের তুলনায় আমার বাচ্চারা অনেক ভাগ্যবান। তারা অনেকদিন তাদের দাদা-দাদির সহচার্য পেয়েছিল। এখনও তারা দু প্রান্তের দু মহাদেশ থেকে অপেক্ষা করে কে কখন কাকে দেখবে। বিষয়টা শুধু বেবিসিটিং এর নয়। একজন সাহায্যকারী বেবি-সিটার থাকার পরও প্রথম প্রজন্মের উপস্থিতি তৃতীয় প্রজন্মের মনের মধ্যে নিরাপত্তার বীজ বুনে দেয়। দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন পরবর্তীকালে তাকে একজন আত্মবিশ্বাসী নাগরিকে পরিণত করে। আমার নিজের ছোটবেলায় দাদা এবং নানা-নানির সাথে সুন্দর সময় কাটাবার স্মৃতি আছে। নানি এতো সুন্দর করে গল্প বলতেন যে তা চোখের সামনে চলচ্চিত্রের দৃশ্যপটের মতো ভেসে উঠত। আমি চেয়েছিলাম আমার সন্তানদেরও শৈশব স্মৃতিতেও সেরকম সুন্দর কিছু ঘটনা জমা থাকুক। এবার দেশে গিয়ে মনে হলো মেয়েদের ক্যারিয়ার চালাতে চাইলে এই তিন-প্রজন্মের সহাবস্থান আরো বেশি জরুরী। কারণ সেখানে কোন পেশাদার বেবি-সিটার (বাচ্চা-তদারক) নেই। আগেও মহিলারা কাজ করেছেন তবে তা এখনকার মতো খুব দীর্ঘ সময়ের ছিল না। ছিল না এইসব ট্র্যাফিক জ্যাম, আরও আনুষঙ্গিক নানান নাগরিক চাপ। বাংলাদেশের সেরকম ডে-কেয়ার নেই। কিন্তু বাচ্চা-পালনে অভিজ্ঞ করে অনেক মহিলাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। জানিনা দেশে এরকম কোন এজেন্সি আছে কিনা। না থাকলে কেউ খুলে দেখতে পারে। আসলে দেশে এতো কাজ আছে যে কেউ চাইলে চাকরি খোঁজার থেকে নিজেই চাকরি-দাতা বনে যেতে পারে। দরকার শুধু সাহস আর একনিষ্ঠতা।
আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে অনেক কথাই সরাসরি বলা যায় না। নিজের প্রয়োজনেই আমরা সম্পর্কগুলো ভালো রাখবো এই কথা জোরেশোরে বলতে শুরু করলে কতগুলো তীর আমার দিকে ছুড়ে আসবে। সবাই শুধু এর পেছনের ধান্ধা-বাজ মনোভাবটাকে খুঁজে বেড়াবে। কিছুটা আত্মত্যাগ ছাড়া যে কোন সহাবস্থান হয় না তা কেউ ভেবে দেখবে না। কারণ আবেগ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন বলে রবীন্দ্রনাথকে যতটা স্মরণ করা হয়, বিজ্ঞান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা জগদীশ চন্দ্র বসুকে তার সিকিভাগও স্মরণ করা হয় না। আমাদের বাঙালি নারীরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন তারা একদমই বৈষয়িক নয়। আবার দেখা যাবে বদ্ধ ঘরের আড়ালে স্বামীর সাথে টাকা-পয়সা নিয়ে অনবরত খিটিমিটি করছেন। আসলে যে ভাবটি প্রকাশ করার জন্য এতো কথা লিখছি তা হলো পূব কিম্বা পশ্চিমের নারীদের মৌলিক চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে আসলে তেমন ফারাক নেই। আজ যা পশ্চিমে ঘটছে তার ঢেউ কাল পুবে চলে আসছে। রক্ষণশীলতার বাঁধ দিয়ে সমাজকে বোরখা দিয়ে মুড়ে রাখার পরও পরিশেষে ভোক্তা ভোক্তাই থেকে যাচ্ছে। আজকের বিশ্বের প্রধান দুই নিয়ন্ত্রক কর্পোরেট আর মিডিয়া – এই দুটোর আক্রমণ এড়িয়ে যাবার জন্য কোন বোরখা আবিষ্কার হয়েছে কিনা তা আজ পর্যন্ত আমার জানা নেই।

ব্যাংকের পোর্টফলিও যে আমাদের কতোটা নিয়ন্ত্রণ করে তার আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে আমেরিকার এবারের অর্থনৈতিক মন্দায় দেখা যাচ্ছে যে ডিভোর্সের হার খানিকটা কম। এর পেছনের হিসেবটা সহজ। বাজারে চাকরি কম। অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলে লোকে ‘পছন্দ হলো না তাই চলে গেলাম’ এ ধরনের আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনায় লাগাম টেনে ধরে। উপরোক্ত স্টক এবং বাড়ির মূল্য পড়তির দিকে। সম্পত্তির বাজার মূল্য কমে যাওয়াতে নিজের ভাগের সম্পত্তির মূল্যও কম। এখন আমেরিকাতে এমনও দেখা যাচ্ছে যে ডিভোর্স হবার পরও প্রাক্তন স্বামী-স্ত্রীরা একই ছাদের নীচে বসবাস করছে। এই মুহূর্তে তারা সম্পত্তি ভাগ করতে চাচ্ছে না। অন্যদিকে ভারত, চীনে অর্থনীতির গ্রাফ উর্ধ্বমুখী। সেই সাথে চাকরীর বাজারও চাঙ্গা। সেখানে উচ্চ শিক্ষিত চাকরিজীবী মেয়েদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে ডিভোর্সের হার। এমনকি বাংলাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান এসব মুসলিম দেশেও ডিভোর্সের সংখ্যা আগের থেকে অনেক বেশি। পুবের মানুষদের পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে যে গর্ববোধ আছে তা তো আসলে পরীক্ষিত নয়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা থাকলে এ মূল্যবোধ যে ঠুনকো হয়ে পড়বে না তার গ্যারান্টি কে দিবে? ছোট বাচ্চাদের ভয় দেখিয়ে তাদেরকে দিয়ে অনেক কিছুই করানো যায়। ঠিক তেমনি নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর উপর রক্ষণশীলতার বাঁধ চাপিয়ে আপাত সামাজিক বিপর্যয়গুলোকে এড়ানো যেতে পারে। কিন্তু যখন এই নির্ভরশীলতা কেটে যায় তখন অগভীর জলের মাছ হঠাৎ গভীর জলের মধ্যে দিশেহারা হয়ে পড়ে। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় এই দিশেহারা শ্রেণীভুক্তরা সমাজের জন্য তেমন প্রোডাকটিভ (এই শব্দটা আমার খুব একটা পছন্দ নয়, কিন্তু অন্য প্রতিশব্দ খুঁজে পাচ্ছি না) হতে পারছে না। হয় তারা আরও রক্ষণশীল হয়ে পরছে নয়তো আধুনিকতার পার্শ্বপতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এতে আমরা হারাচ্ছি আমাদের দিকনির্দেশকদের। সমাজবিদরা বলতে পারবে এ সমস্যা এড়ানোর উপায়। তবে খুব সাধারণ জ্ঞানে আমার যেটা মনে হয় তা হলো আমাদের সারা পৃথিবী সম্পর্কে জানতে হবে। আমরা অনেক সময় না বুঝে, না জেনে একটা পূর্বধারণার বশবর্তী হয়ে চিন্তা করি। রক্ষণশীলতা আর আধুনিকতার ভালো-খারাপ দিকগুলো বোঝবার চেষ্টা করি। বিকিনি পড়া মেয়ে মানেই যথেচ্ছা যৌনাচার করতে ইচ্ছুক কেউ নয়। আবার হিজাব পড়া মানেই জড়ভরত, চিন্তা-ভাবনায় অনগ্রসরমান কেউ নয়। একেক দেশের সাংস্কৃতিক কাঠামো একেক রকম। আর সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে পোশাক-আশাক, খাওয়া-দাওয়া, প্রার্থনা, বাচনভঙ্গি, ধর্মাচরণ – সব কিছুই পড়ে। আমেরিকার রাস্তায় কেউ হাঁচি দিলে পাশ থেকে লোকে ‘ব্লেস ইউ’ বলে উঠে, আমাদের দেশে বলে উঠে ‘আলহামদুলিল্লাহ’। একবার টেলি কনফারেন্সে ইসরাইলের সাথে মিটিং ছিল। ওখানকার লোকের কথা শুনে মনে হচ্ছিল সবাই ঝগড়া করছে। ওরা মিটিঙে হয়তো ওভাবেই কথা বলে। ওদের সাথে এই দিক দিয়ে একটা সাংস্কৃতিক মিল আছে আমাদের হাসিনা-খালেদার সাথে। পুরো ব্যাপারটা বিশ্লেষণ করলে তার ফলাফলটা দাঁড়াচ্ছে এরকম যে স্বনির্ভরতা আমাদের আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। অন্যদিকে মূল্যবোধ এবং প্রয়োজনীয়তা আমাদের আবার এক করছে। পশ্চিমের সবকিছুই যেমন খারাপ নয় ঠিক তেমনি পূবের সবকিছুই ভালো নয়। একটু গভীরে গেলে হয়তো দেখতে পাব আসলে আমরা সব মানুষই এক। বিশালতার মধ্যে হারিয়ে যাবার ভয়ে শুধু নিজেদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দল গড়ে তুলছি। এই ভিন্নতাই হয়তো আমাদের টিকিয়ে রেখেছে। হাতের পাঁচ আঙ্গুল সমান হলে কোন কাজ করা যায় না। পৃথিবীতে সব স্থানে একই সময় সূর্যোদয় ঘটে না। তারপরও নির্বোধের মতো আমরা ভেবে নিই সবকিছু একরকম হয়ে গেলেই বুঝি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

(চলবে)

২,৯১৪ বার দেখা হয়েছে

২৩ টি মন্তব্য : “জীবনের টুকরো – দেশবিদেশে (পূবের মানুষ যখন পশ্চিমে – ১)”

  1. রাব্বী (৯২-৯৮)

    এগুলি পড়ে আমার মাথা গুরায় 😮

    আপনার লেখা পড়লে মনে হয় প্রবাসীদের সংকটগুলি আপনাকে ভাবায়। শুধু তাই না, ছোটখাটো থেকে অনেক বড়বড় বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। চিন্তাশীল মানুষ আপনি :-B

    প্রথম প্যারা পড়ে অনেকদিন আগে ইউনিভার্সিটির নাটমন্ডলে দেখা বেহুলার ভাষাণ নাটকটার কথা মনে পড়লো। নাট্যকলা বিভাগের দুর্দান্ত একটা নেশা ধরানো প্রযোজনা ছিল!

    তিন নম্বর অনুচ্ছেদটা ভাল লাগলো বেশি। অর্থনৈতিক মন্দার সাথে সম্পর্কের ব্যাপারটা ঠিক মনে হয়, সদ্য ডিভোর্স নেয়া এক বন্ধু তার সম্পদ ভাগাভাগি নিয়ে বললো যে - এইটা বাড়ি বিক্রির জন্য সঠিক সময় ছিল না, তাও করতে হয়েছে।

    পুবের মানুষদের পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে যে গর্ববোধ আছে তা তো আসলে পরীক্ষিত নয়

    আমারো তাই মনে হয়। এটা একটা ভাল পর্যবেক্ষণ এবং হাইপোথেটিক্যালি মজার একটা রিসার্চ প্রবলেম হবে পারে!


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন
  2. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    মাথা গুরায় না? ফাজলামী কর?
    লেখাটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছিল দেখে অর্ধেক করলাম, তারপর আবার সেই অর্ধেককে অর্ধেক করতে হলো। বুঝতেছি না আমার বোধহয় বেশি বয়সের বকবক রোগে ধরছে।
    যাইহোক একটা সাজেশন দরকার। বাচ্চাদের জন্য একটা একুশে ফেব্রয়ারীর নাটক লিখতে চাচ্ছি ফেইরি-ফিকশন-ফাক্ট মিলিয়ে। পলাশী থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত কতগুলো চরিত্র আসবে যারা এই ২য় প্রজন্মের সাথে কিছু বাতচিৎ করবে। আপাতত মাথায় সিরাজুদ্দৌলা, লর্ড ক্লাইভ, তিতুমীর (?), সিপাহী বিপ্লবের কিছু সৈনিক, জিন্নাহ, সালাম-রফিক-জব্বার, সোহরাওয়ার্দী অথবা শেরেবাংলা এর নাম ঘুরছে। কথাগুলো খুব সিরিয়াস হবে না - একটু হাস্যরস থাকবে। তুমি কি আর কোন নাম সাজেস্ট করতে পার?


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      কি যে বলেন শান্তা আপা! এতো কঠিনসব বিষয় লিখলেন মাথা তো একটু গুরাতেই পারে, তাই না 🙂

      নাটকে হাস্যরস চাইলে বিষয়টা কঠিন। তাহলে মীর জাফর, জগৎ শেঠ, রাজবল্লভ, ইয়ার লতিফ খান, ঘষেটি বেগমদের আনতে পারেন।

      আর তথ্য নির্ভর হলে আরো আসতে পারে - হাজী শরীয়তুল্লাহ, নুরুলদীন, সূর্যসেন, প্রীতিলতা, লীলা নাগ, বেগম রোকেয়া, কুমুদিনী হাজং, চিত্তরঞ্জন দাস, ভাসানী, প্রমুখ। আসলে নির্ভর করবে নাটকে কি আনছেন তার উপর।


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
  3. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    পড়েছি। আমার নিজের খুব পছন্দের একটি বিষয় নিয়ে ঘুরে ফিরে এসেছে। ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্য ও স্বনির্ভরতা বিষয়ক।
    সিরিজের সাথে থাখতে পারবো কিনা বলতে পারছি না। আপাতত বুঝার জন্য পড়ে গেলাম।
    কমেন্ট লিখতে কষ্ট লাগে। সিসিবিতে ঢুকতে আরো বেশি।
    ভালো থাকবেন।

    জবাব দিন
  4. সাইফ শহীদ (১৯৬১-১৯৬৫)

    শান্তা,

    খুবই সুন্দর হয়েছে লেখাটা। আসলে পৃথিবীতে মানুষ সব স্থানেই মূল আশা-আকাক্ষাতে এক।

    সবচেয়ে কম দামে আলপিন থেকে শুরু করে কম্পিউটার বানিয়েও ওদের প্রযুক্তিবিদেরা ‘চোরা বিদ্যা’র অপবাদ থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। ওদের দেশে এখন পর্যন্ত একটা মৌলিক সৃষ্টিশীল ধারণার উপর ভিত্তি করে আইবিএম, মাইক্রোসফট কিম্বা হালের ফেসবুকের মতো নিজস্ব কোন কোম্পানি গড়ে উঠেনি।

    এক কথাটা এক সময়ে ঠিক থাকলেও এখন আর নেই। আমি সময় পেলে CCTV দেখি। আজই দেখলাম সম্পূর্ন নতুন ধরেনের ডিজাইনের এক রেস্টুরেন্ট-এর ছবি। একে মডার্ন আর্ট বা স্কালপচারের স্টুডিও বললেও ভুল হবে না। সাংহাই-এর নতুন বিল্ডিং-এর স্থাপত্য দেখলে বুঝবে কতটা এগিয়েছে চীন। পিএইচডি পাবার ছাত্রদের মধ্যে চীনা ছাত্রের সংখ্যা সব চাইওতে বেশী। চীনা 'আলিবাবা' এবং আরও কিছু কোম্পানী দেখবে কত তাড়াতাড়ি কত কিছু দখল করে বসেছে।

    বাংলাদেশকে কি ভাবে দেখো এবং কি ভাবে দেখতে চাও - জানতে আগ্রহী।

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      চীনাদের যে ক্ষমতা নেই তা তো নয়। এই দেখেন সুযোগ পেয়ে বাংলাদেশি এফ আর খান সারা বিশ্বকে কি দেখালো। আমি বলতে চাচ্ছিলাম চীনারা সারাবিশ্বে এখনও এমন কোন প্রডাক্টের একক এবং মৌলিক দাবীদার হতে পারে নাই। মেন্টাল ব্লকেজ খুলে গেলে তো মানুষ অপরিসীম ক্ষমতা দেখাতে পারে। ইয়াহু কিম্বা গুগলের সাথে তো ২য় প্রজন্মের চীনারা জড়িত ছিল। বাংলাদেশের কথাও আসবে।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
  5. রেজওয়ান (৯৯-০৫)

    সকাল বেলা বসে বসে মোবাইল দিয়ে পড়ছিলাম.....
    অদ্ভুত সুন্দর ভাবে গুছিয়ে লিখেছেন এই কঠিন বিষয়টা নিয়ে......চলবে যখন একটু দ্রুতই চলুক........কিছু শিখি আমরা 🙂

    জবাব দিন
  6. রেজা শাওন (০১-০৭)

    চমৎকার লেখা আপু। মাঝে মাঝে এই ধরনের গভীর জ্ঞানের ব্যাপারগুলো নিয়ে পরীক্ষার খাতায় লিখতে হয়। কিছুই পারি না। আম জাম লিচু কাঁঠাল লিখে দিয়ে আসি।

    আপনার এই পোস্ট আমার কাজে দিবে।

    জবাব দিন
  7. সামিয়া (৯৯-০৫)
    কিছুটা আত্মত্যাগ ছাড়া যে কোন সহাবস্থান হয় না তা কেউ ভেবে দেখবে না।

    আপনার লেখা পড়লে বেশ কিছু লাইনই কোট করতে ইচ্ছা হয়। এই লেখাটা রেখে দিয়েছিলাম আয়েশ করে পড়ব জন্য। দৌড়ের উপ্রে আছি। আপনার প্রচ্ছদের রিভাইসড ভার্শনটা ১৬ তারিখে পাঠাবো, দেরি হবে না আশা করি?

    আমি শুধু সে কথাটাই শুনতে পাই যেটা আমাদের সম্পর্ককে খারাপ করবে না।

    অন্যান্য অনেক সম্পর্কই এভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। এটা ভাল বুদ্ধি 😀

    বিশালতার মধ্যে হারিয়ে যাবার ভয়ে শুধু নিজেদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দল গড়ে তুলছি

    এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি প্রচন্ড কনফিউজড। দলভিত্তিক ব্যাপারটা ম্যানেজমেন্টে খুব কাজে দেয়, কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে কেমন কাজে দেয়? একটা চরে গিয়েছিলাম একবার, ছোট্ট একটা চর। বিশ পঁচিশ ঘর লোক হবে, তার মধ্যেই চার পাঁচটা দল। নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ফেলাটা কিরকম স্ট্র্যাটেজি? এটা কেনই বা আমরা করি?

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      পরীক্ষার খবর কি? প্রচ্ছদের অপেক্ষায় আছি।

      চর অঞ্ছলের মানুষদের সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। অনেকদিন বাংলাদেশের গ্রাম থাকা হয়নি। এখন সেখানকার সামাজিক অবস্থা কেমন কে জানে? শহর তো বলতে গেলে খুব আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। লেখাপড়া করে একটা চাকরি পেলে কেউ আর এখন ভাবতে চায় না তার বাসার রাস্তার উপরে কে ময়লা ফেলে গেল।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।