মন রে, তুই মুক্ত হবি কবে? (১)

আমাদের বাড়ী জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার একটা গ্রামে। আপনারা অনেকেই হয়তো জেনে থাকবেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে হিন্দুদের সংখ্যাধিক্যের কথা। স্বাধীনতার আগে তারাই প্রধান ছিল, কি ব্যবসায়, কি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে, কি রাজনীতিতে। আমাদের গ্রামের পাড়াগুলোর নাম শুনলেও এটা বোঝা যাবে- ঘোষপাড়া, গোয়ালপাড়া, মালিপাড়া, দাসপাড়া, সাহাপাড়া, কৃষ্ণনগর, ইত্যাদি। বর্তমানে কোন পাড়াতে চার/পাঁচ ঘরের বেশি হিন্দু নেই, অধিকাংশই মুসলমান অধিবাসী। এখন সেসব পাড়ায় গেলে বোঝার উপায় নেই যে, এগুলো এককালে প্রায় সমস্তই হিন্দুদের বাড়ি ছিল। আমার এখনো মনে আছে, ছোটবেলায় আমাদের গ্রামে কম করে হলেও চারটা দূর্গা প্রতিমা হতো, এমনকি কালীপুজাতেও দুই/তিনটা পুজা-মন্ডপের আয়োজন থাকত। জন্মাষ্টমীর মেলা ছিল আশেপাশে বিশ/তিরিশ গ্রামের লোকদের জন্য বছরের সবথেকে বড়, জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান। হিন্দু/মুসলিম সকল শিশু-কিশোর প্রবল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম চৈত্রমাসের এই জন্মাষ্টমীর মেলার জন্য। এখন হিন্দুদের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় নাই হয়ে গেছে- ঘোষপাড়ায় আছে তিনটে ঘর (তথা পরিবার), গোয়াল পাড়ায় ছয়টা, সাহাপাড়ায় দুইটা, দাসপাড়ায় একটা, কৃষ্ণনগরে দুইটা। অন্যান্য গ্রামের অবস্থাও একই রকম।-

আমাদের বাড়ি হল কয়েকটা পাড়ার মাঝখানে, স্কুলের পাশে। ১৯৮০ সালে ঐ বাড়িটা ছাড়া আশেপাশে আধমাইলের মধ্যে ছিল শুধু স্কুলের উল্টো দিকে সাহাদের একটা বাড়ি। নানাবাড়ী-দাদাবাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকায় সাহাদের সাথেই আমাদের পারিবারিক মেলামেশা, উঠাবসা বেশি। পুজা আর ঈদের (কুরবানীর ঈদের দিনটা বাদে) উৎসবগুলোতে সকলে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতাম এমনভাবে যে, সেসময় গ্রামের কেউ কেউ আমাদেরকে আধা-হিন্দুও বলত। আমাদের বাড়িতে নিয়ম করে সাপ্তাহিক গানবাজনার আসর, ঘরের সামনে বাহারী ফুলের বাগান আর তুলসি গাছের প্রবল উপস্থিতি তাদের সেই ঠাট্টার ছলে করা মন্তব্যকে প্রায় সত্যি মনে করাতো। স্কুলেও হিন্দু ছাত্রদের উপস্থিতি ছিল প্রায় সমান। এই প্রতিবেশে বেড়ে ওঠা আমার জন্য তাই এখন গ্রামের বাড়িতে গিয়ে শেকড়ে ফেরার প্রশান্তি পাওয়া হয়ে ওঠে না। কারণ, আমার শৈশব-কৈশর জুড়ে থাকা বাড়িগুলো, মানুষগুলো, স্মৃতিগুলোর অনেকখানিই এখন খাঁ খাঁ বিরান। সাহাদের জমিদারবাড়ির পুকুর পাড়ে অলস বসে থাকা, ঘোষদের জামতলার ঘিনঘিনে কাঁদা মাড়িয়ে সন্দেশ খেতে যাওয়া, গোয়ালপাড়ার পাশ দিয়ে গরু-মহিষের গোয়ালঘরের উৎকট গন্ধে নাকচেপে ধরে রিক্সায় করে নানাবাড়ি যাওয়া- কোনটাই হয়না।

গ্রাম বদলায়, মানুষ বদলায়। জানি। স্মৃতি হারানোর বেদনায় কষ্ট হলেও আমরা তা’ মেনে নিই। যুগের বদলের সাথে সাথে এই পরিবর্তন স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিতে হয়। কিন্তু আমার শৈশব-কৈশরের এই যে হারিয়ে যাওয়া বর্ণনা করলাম, এটা স্বাভাবিক নয়। এটা আমাদের নিজেদের সৃষ্ট, যা’ আমরা সামান্য একটু মানবিক হলেই এড়ানো যেত। হ্যাঁ, আমি হিন্দুদের উপরে ধারাবাহিকভাবে যে সাম্প্রদায়িক হামলা চলে আসছে, তা’র কথা বলছি। আমার কয়েকজন হিন্দু বন্ধু আছে। আমি তাদেরকে হিন্দু বলে কোনদিন আলাদা করিনি, শুধুমাত্র এই লেখার প্রসঙ্গে হিন্দু বলে উল্লেখ করা দরকার হলো। পাবনার সাঁইথিয়াতে সম্প্রতি হিন্দুদের উপরে যে সাম্প্রদায়িক হামলা করা হলো, তা’র প্রতিক্রিয়ায় আমার এক হিন্দু বন্ধুর ষ্ট্যাটাসটার অংশবিষেষ উদ্ধৃতি করছিঃ

রাজীব ছেলেটি আমার আত্মীয়। অতীতে আমি ওদের বাড়ি গিয়েছি। এই ঘটনার পর আমার আত্মীয়- স্বজন, চেনা-জানা হিন্দু বাড়ির অভিভাবকবৃন্দ একটু চুপচাপ আর গম্ভীর হয়ে গেছেন। অতীতে দেশ বিভাগের সময়টায় তাদের পূর্বপুরুষেরা ওপারে না গিয়ে ভিটে আগলে পরে থেকে যে ভুল করেছে তার মাশুল দিতে হচ্ছে কিনা, ভবিষ্যতে এ দেশে থাকা যাবে কিনা, চলে গেলে সারা জীবনের পরিশ্রমে অর্জিত ব্যাবসা-বাণিজ্য, সম্পদ আর সম্পর্কগুলোর কি হবে এই নিয়ে পরস্পর নীচু স্বরে কথা বলছেন। বাড়ির মহিলারা আতঙ্কিত। শিশুরা ভীত ও বিস্মিত। আমি সুখী হতাম যদি এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হত। বাস্তবে তা নয়। ধর্মের বিষে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়া, এমন কি এক যোগে কয়েক হাজার মানুষকে কেটে ফেলে হত্যা করার দূর্বিষহ স্মৃতি আমাদের মুরুব্বিদের অনেকেই হয়তো আজো মনে করতে পারবেন।আরেকটু খেয়াল করলে দেখতে পাব ইতিহাসের নির্দিষ্ট শাসনামলে এই ধরনের ধারা পৃষ্ঠপোষকতায় সমৃদ্ধ হয়েছে। আজ আমি এই লেখার মাধ্যমে আমার ফেসবুকের সকল মুসলিম বন্ধুকে আহবান জানাচ্ছি।

আমি হিন্দু। আপনারা আমাকে (আমি বলতে যে কোন হিন্দু) ধর্মের দোহাই দিয়ে আক্রমন করুন। আমাকে হত্যা করুন অথবা দেশ থেকে তাড়িয়ে দিন। এদেশের মাটি থেকে যে জ্ঞান আমি অর্জন করেছি তা অন্য কোন দেশের, অন্য কোন জাতির সেবায় সমর্পন করি। অথবা ইসলামের নামে কোতলের চেয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে অধিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন তাহলে যারা এই ভাবধারাকে লালন করে তাদের প্রতিহত করতে আপনার হাতটা ভাইয়ের মত বাড়িয়ে দিন।

– এই ষ্ট্যাটাস পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলাম কয়েক মুহূর্ত। দুচোখ ভরে পানি চলে আসল। রিসার্চ ল্যাবে একলা বসে ছিলাম, তাই গোপন করার চেষ্টা করলাম না। আমার বন্ধু, যাকে আমি আমার আপন ভাইয়ের থেকেও বেশি আপনজ্ঞান করি, যার সাথে যাপিত জীবনের দুইতৃতীয়াংশেরও বেশি সময় কাটিয়েছি, এখনো দেশে গেলে যার কাছে ছুটে যাই, আমার সেই বন্ধু শুধুমাত্র হিন্দু হওয়ার কারণে আজ এতটাই অসহায় বোধ করছে যে, মুসলমান এই আমাকে আহ্বান করছে তাকে হত্যা করতে, অথবা দেশে থেকে তাড়িয়ে দিতে! আমার ইচ্ছে করছিলো তখনই ছুটে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়াতে, ওকে অভয় দিয়ে বলতে যে, শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতেও তোকে কোন সাম্প্রদায়িক হারামজাদা স্পর্শ করতে পারবে না।

বাংলাদেশে এবং ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে হিন্দু/মুসলিম সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ইতিহাস মোটামুটি সবার জানা ধরে নিয়ে আর সেদিকে যাচ্ছি না। শুধুমাত্র বাংলাদেশের বর্তমান সাম্প্রদায়িক সংঘাতগুলোর দিকেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। সাম্প্রদায়িক সংঘাত না-বলে বরং মুসলমানকর্তৃক হিন্দুদের আক্রমণ-লুন্ঠন-বিতারণ বলা বেশি যুক্তিযুক্ত। কারণ, এই সংঘাত পুরোটাই একপেশে। মুসলমানরা মেরেই যাচ্ছে। আর হিন্দুরা শুধু মার খেয়েই যাচ্ছে। কিন্তু সব মুসলমান হিন্দুদেরকে মারছে না, মারছে মুসলমানদের মধ্যকার বিশেষ একটা শ্রেণী/দল/গোষ্ঠী। এদেরকে আমরা সকলেই “সাম্প্রদায়িক শক্তি” হিসেবে জানি। আর রাজনীতিতে এরা হচ্ছে মূলতঃ স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার জামাত-শিবির। আমার এক বন্ধু, আওয়ামীলীগের একটা পেশাজীবি অংগসংগঠনের আঞ্চলিক নেতাকে জিজ্ঞাস করলাম সাইথিয়াতে মাঠপর্যায় থেকে আম-জনতার রেফারেন্স দিয়ে জানাতে যে, অপরাধীগুলো কারা। তার উত্তরটা নিচে উদ্ধৃতি করলামঃ

ভিকটিমের নাম বাবলু সাহা। সেদিন দুপুরে তাকে এক দোকানের ভেতরে বন্ধ করে মাথার চুল কেটে দেয়া হয়। কয়েকদিন থানায় রেখেছিল নিরাপত্তার জন্য। কাল ফিরেছে। নিজের বাড়িতে ফিরতে সাহস পায়নি। বড় ভাইয়ের বাড়িতে আছে। ওনার বড় ভাই সুরজিৎ সাহা আমার ছোট ফুপা। আজ তাকে ফোন করেছিলাম। যত টুকু অনুধাবন করতে পারলাম তাই বলছি। যারা ঘটনা টা ঘটিয়েছে তারা অপরিচিত নয়। একই নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা। নিজামীর এলাকা। জামাতের শক্তি বেশি। হিন্দু পাড়াটি গতানুগতিক ভাবে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাঙ্ক। তার উপর বাবলু সাহার পরিবার স্থানীয় ইস্কনের সাথে গভীর ভাবে জড়িত। ইস্কন একটা ইন্টার ন্যাশনাল সংগঠণ, যারা বিশ্বব্যাপী শ্রী কৃষ্ণের মহিমা প্রচার করে। এসব সূত্রে ওদের ভিতর শত্রু ভাবাপন্ন সম্পর্ক আগে থেকেই আছে। ফুপার জবানে- আগে থেকেই ওরা মাঝে মধ্যেই অত্যাচার করে। কিছু দিন আগে বাবলু সাহার মেয়ের বিয়ে হয়। সে সময় ওরা চার লাখ টাকা চাঁদা চায়। সেটা না দেয়ায় ট্রিটমেন্ট দেয়ার মতলবেই ছিল। সময়ে সুজোগে মিলে গেছে। প্ল্যান বাস্তবায়ন করেছে। – এই আর কি।

– উদ্ধৃতির মূল বক্তব্য সহজে বুঝতে কিছু কিছু শব্দ বোল্ড করে দিলাম। আমাদের জাতীয় অঙ্গনে প্রচলিত ব্যাখ্যার সাথে হুবহু মিলে যায়- জামাত হিন্দুদেরকে নির্যাতন করে রাজনৈতিক কারণে, যেহেতু হিন্দুরা আওয়ামীলীগের ভোটব্যাংক। বয়ানটা সহজেই বিশ্বাসযোগ্যও, কারণ সাঁইথিয়া নিজামীর নির্বাচনী এলাকা, উপরন্তু আক্রান্ত হিন্দুরা ইস্কন নামের একটা হিন্দু সংগঠণের সাথে জড়িত বলে স্বভাবতঃই ইসলামধর্মের ব্যাপারী জামাতের চক্ষুশূল। “ওরা মাঝে মাঝেই অত্যাচার করে”। ওরা বাবুল সাহার মেয়ের বিয়ের সময় চাঁদা দাবী করে, কিন্তু সেটা না পেয়ে আলোচ্য আক্রমণ সংঘটীত করে।

পাঠক, আল্লাহ/ভগবান/প্রকৃতি আপনার মাথায় যে গ্রে-ম্যাটার দিয়েছে, সেটাকে সামান্য খাটাতে অনুরোধ করছি।- যে সময়ে হিন্দুরা যাদের ভোটব্যাংক সেই আওয়ামীলীগ প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করছে, নিজামী জেল-হাজতে মৃত্যু-পরোয়ানা শোনার অপেক্ষা করছে, সারাদেশে জামাতের যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে গণজোয়ার বইছে, ঠিক এমন সময়ে জামাতের স্থানীয় নেতা/কর্মীরা হিন্দুদের কাছে চাঁদাবাজী করছে, সেই চাঁদা না-পেয়ে পাইকারী ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে পুরো একটা হিন্দু গ্রামের উপর, প্রকাশ্য দিবালোকে!!!- কি, বিশ্বাস হয়? যদি আপনার মনে সামান্য সন্দেহও থাকে যে, জামাত এই কাজ করে থাকতেও পারে, ওদের চরিত্রই ত’ সাম্প্রদায়িক, হিন্দুবিরোধী, তাইলে নিচের ছবিটিতে দেখুন আক্রমণকারীদের একজনকে দৈনিক আমাদের সময়ের বরাতে-
159401_1

দৈনিক আমাদের সময় (এইটা আমারদেশ না কিন্তু) বলেছে, ছবিতে লাল সার্কেলের মধ্যের মুখটা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী হারামজাদাগুলোর একজন, মিঠু, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট ছাত্রলীগ নেতা (ডেইলী স্টারও একইভাবে ছবি দিয়ে হালমাকারী হিসেবে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সনাক্ত করেছে)। আগেরদিন জামাত ও বিএনপিপন্থী ইনকিলাব আর নয়াদিগন্ত সাঁথিয়ার স্থানীয় ১৮-দলীয় নের্তৃবৃন্দের একটা প্রেস কনফারেন্সের রিপোর্ট করেছে যেখানে তারা হামলার জন্য স্থানীয় ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করে দায়ী করেছে, এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে প্রকৃত হামলাকারীদের বাদ দিয়ে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং পুলিশী হয়রানীর প্রতিবাদ করেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রধান ডঃ মিজানুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশের কর্মকর্তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন ঘটনার প্রকৃত অপরাধী আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসীদের না-ধরার জন্য (ইত্তেফাক, নভেম্বর ৮)।

উপরের উদ্ধৃতিকারী আমার বন্ধু, আওয়ামীলীগের নেতা/কর্মী/সমর্থক সাঁইথিয়াতে হিন্দুদের উপর প্রকাশ্য দিবালোকে হামলাকারীকে চিহ্নিত করেছে জামাত শিবিরের কর্মী হিসেবে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী এবং সেসময়ে হিন্দুদের উপর নারকীয় অত্যাচারকারী। আমাদের মিডিয়াও বরাবরের মতো একইভাবে আওয়ামীলীগের সমর্থকদের না-দেখে এক অপ্রকাশ্য ‘সাম্প্রদায়িক শক্তি’কে দায়ী করছে, যারা ‘বাই ডিফল্ট’ জামাত-শিবির। কয়েকজন মন্ত্রী, পত্রিকা সম্পাদক (যেমন, আবেদ খান), এবং সুশীলনেতা (যেমন, শাহরিয়ার কবীর) ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করেছেন এবং এই সাম্প্রদায়িক হামলার জন্য জামাত-শিবিরকে দায়ী করেছেন।

এইখানে একটা প্যাটার্ণ লক্ষ্যণীয়- চাঁদাবাজী বা অন্যকোন স্থানীয়+অরাজনৈতিক+ধর্মনিরপেক্ষ ইস্যুকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের উপর নিপীড়ণ এবং চুড়ান্ত পর্যায়ে হিন্দুদের উপর পাইকারী হামলা, পুলিশের প্রাথমিক নিস্ক্রিয়তা, সরকারের দায়ীত্বশীল মন্ত্রী ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে জামাত-শিবিরকে (এবং সুবিধামত বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধীদলকে) দায়ী বলে অভিযুক্তকরণ, পুলিশের তদন্ত, মামলা ও বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার। একই ঘটনা গত বছর রামুতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলাতেও- আক্রান্তরা যাদেরকে হামলাকারী হিসেবে সনাক্ত করেছে, তাদের মধ্য থেকে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে আওয়ামীলীগ, সুশীলদের এবং মিডিয়ার অধিকাংশ ক্রমাগত প্রচার করেছে যে, হামলাকারীরা ছিল স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-শিবির চক্র। (অবশ্য পরবর্তীতে কিছু কিছু মিডিয়া আবার হামলাকারীদের অগ্রভাগে স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের নামও উল্লেখ করেছে)। “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা”র মোড়কে এই প্যাটার্ণটা ক্রমাগত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, যার ভিত্তিতে আছে একটা ঐতিহাসিক সত্য, কিন্তু যা’র বেড়ে ওঠা একটা নির্লজ্জ মিথ্যার উপরে- ঐতিহাসিক সত্যটা হলো এই যে, ১৯৭১এ জামাত ইসলাম রক্ষার নামে বাংলাদেশী হিন্দুদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা করেছে; আর মিথ্যাটা হলো এ’ই যে, আওয়ামীলীগ হিন্দুদের নির্যাতন করে না, করতে পারেনা। সত্যটা যেমন ঐতিহাসিক, মিথ্যাটাও। পার্থক্য হলো, জামাত পরাজিত শক্তি বলে তাদের অপরাধটা সহজেই প্রতিষ্ঠা করা গেছে, কিন্তু আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় বলে তাদেরকে অপরাধের কথা মুখে আনতেও বাঁধা, প্রতিষ্ঠা ত’ দূরের কথা। উপরন্তু, রাষ্ট্রের প্রচারযন্ত্র, দলকানা বুদ্ধিজীবি আর হলুদ মিডিয়া আপ্রাণ চেষ্টা করে আওয়ামীলীগের হিন্দুবিরোধী ভূমিকাকে আড়াল করতে। সাঁইথিয়ার মতো। রামুর মতো। (আরো জানতে চাইলে এই লিঙ্কে যান-//opinion.bdnews24.com/bangla/2013/11/10/%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A0/

দূরের কথা বাদ দিয়ে এখন আমার ঘরের পাশের, আমার পাড়া-প্রতিবেশী হিন্দুদের কথা বলি। আমাদের গ্রাম থেকে হিন্দুরা চলে যাচ্ছে। মুসলমানরাও যায়, তবে সেটা চাকুরী বা অন্যান্য প্রয়োজনে। তারা বছরের নানান সামাজিক-ধর্মীয় উপলক্ষ্যে বাড়ি ফিরেও আসে। কিন্তু আমার হিন্দু প্রতিবেশীরা বেশির ভাগই শুধু চলে যায়, ফিরে আর আসেনা। শুনেছি, ১৯৭১-এর পর সবথেকে বেশি হিন্দু ঘরছারা/দেশেছাড়া হয়েছে আমাদের গ্রাম থেকে। তাদের বাড়িঘর, জায়গাজমি এখন মুসলমানরা ভোগদখল করছে। এই মুসলমানরা আবার আওয়ামীলীগের নেতা+কর্মী+সমর্থক। খালেদ মোশারফের গ্রামের পাশের গ্রামে ত’ সেটা সেটাই স্বাভাবিক। সেখানে ২০০১ সাল ছাড়া আর কখনো আওয়ামীলীগ ভিন্ন আর কেউ জিততে পারেনি, আর সেবারও হেরেছিলো নিতান্ত দলীয় কোন্দলে। এমপি, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড সর্বত্র আওয়ামীলীগের জয়জয়কার। আমাদের গ্রামের কোন ভোটকেন্দ্রে কোনদিন জামাতের এজেন্ট দেখিনি, কোন কেন্দ্রে দাড়িপাল্লায় চল্লিশ ভোট পড়েছে এমন কখনো হয়নি। হিন্দুবান্ধব আওয়ামীলীগের এমন প্রতাপ, জামাতের এহেন কোনঠাসা অবস্থা, এর পরেও আমাদের গ্রাম থেকে হিন্দুদেরকে ক্রমাগত দেশান্তরী হতে হচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের অনুপস্থিতিতেও হিন্দুরা গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এর কারণ কি?- ভারী ভারী তত্ত্বকথা বাদ দিয়ে আমার দেখা কিছু অভিজ্ঞতা থেকে বলি-

১৯৮৮/৮৯ সালের ঘটনা। ঘোষপাড়ায় এক বাড়িতে ডাকাত হামলা করলো। তার কয়েকদিন আগে ওদের একটা জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল। হয়তো স্বর্ণালঙ্কারের লোভেই ডাকাতরা হামলা করেছিল। কিন্তু হামলাটা করেছিল সন্ধ্যের কিছুটা পরেই। গ্রামবাসীরা অনেকেই জেগে ছিল। আক্রান্তদের চিৎকারে সবাই এগিয়ে গিয়ে ধাওয়া করলে ডাকাতদল পালিয়ে যায়। যথারীতি পুলিশ আসে, এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা আসে। কয়েকদিন ধরে তদন্ত হয়, ঘোষদের বাড়িতে পুলিশ আর স্থানীয় নেতাকর্মীদের আপ্যায়ণের তোড়জোড় চলে। মাস খানেক পরে শুনি আসামীর তালিকায় আক্রান্ত পরিবারের প্রতিবেশী একঘর দিনমজুর মুসলমান, এমনকি আরেক হিন্দু প্রতিবেশীও। মুসলমান আসামী জমি বেঁচা টাকায় পুলিশের খাতা থেকে নাম কাটিয়ে নিলেও হিন্দু পরিবারটি সব সহায়সম্পত্তি বেঁচে দিয়ে দিনাজপুরে কোথায় যেন চলে যায়। জমির ক্রেতা ছিলেন আমাদের গ্রামেরই এক মুরুব্বী, আওয়ামীলীগের রাজনীতি করেন।

আরেকটা ঘটনা। এইটা আরো নতুন, ২০০০ সালের। আমার বাল্যবন্ধু কমল। গোয়ালাদের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত, ডানপিটে। স্কুলে গোল্লাছূট খেলায় ওকে দলে নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি হতো, কারণ সে বাতাসের গতিতে দৌডাতে পারত। সেই কমল ফেঁসে গেলো রেপ কেসে, তাও আবার এক মধ্য বয়স্ক বুয়াকে রেপ করার অপরাধে! ঈদে ঢাবি’র ছুটিতে বাড়ি গিয়ে শুনলাম কাহিনী। কমলের সাথে দেখা হওয়ার পর শুধু বলল, “তোর কি বিশ্বাস হয়?”- আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই কাজ ওর নয়। কিন্তু ওকে আমি কোন উত্তর দিতে পারিনি। কারণ জানি, সেও উত্তর আশা করেনি। তৎকালীন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক একটা নতুন বাজার বসাতে চাইছিলেন নিজের জমিতে। কমলদের একফালি আবাদী জমি ছিল তারই পাশে। বাজার বসানোর জন্য জমিটা দরকার ছিলো। নেতা ওদেরকে প্রস্তাব দিয়ে জমিটা কিনতে পারেনি। তাই নেতার নিজ বাড়ির কাজের বুয়াকে দিয়ে মিথ্যা রেপ কেসে কমলকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন। কমল দেড়মাস হাজতবাসও করেছে সেই কেসে। পরে শুনেছি কমলের বাবা জমিটা নেতার কাছে বেঁচে দিয়ে সন্তানকে মামলা থেকে ছাড়িয়েছেন।

আমাদের গ্রাম এবং আশেপাশের আরো বেশ কিছু গ্রাম একটা ছোটখাটো জমিদারির অধীনে ছিল, যার মালিক ছিল সাহা পরিবার। ওদের মুখে নানান সময়ে শুনেছি কিভাবে ওদের সরকারের (তথা অফিস সহকারী) পদে থেকে দুই/তিনটা পরিবার ১৯৭১-এর পর ওদের জমিজমাগুলো জোর করে লিখিয়ে নিয়েছিল। এখন তারা আওয়ামীলীগের মাধ্যমে প্রবল প্রতাপে এলাকায় কর্তৃত্ব করে।

জমি নিয়ে বিরোধ ছাড়াও আরো নানান অযুহাতে হিন্দুদের উপর নির্যাতন নেমে আসে। যেমন, একবার এক হিন্দু ছেলে এক মুসলমান মেয়ের প্রেমে পড়েছিল। মেয়েটি ছিল এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর হিন্দু পরিবারটির উপর এমন সিস্টেম্যাটিক চাপ চলে আসে যে, তারা বাধ্য হয়ে জেলা শহরে চলে যায়।

– উপরের ঘটনাগুলো দিয়ে বলার চেষ্টা করলাম এই যে, বাংলাদেশের হিন্দুদের উপরে চলমান সাম্প্রদায়িক হামলা+লুটপাট+নির্যাতন ‘বাই ডিফল্ট’ স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-শিবিরের কাজ নয়, জাতীয় রাজনীতির বা ধর্মীয় কোন বিষয়ও নয়। বরং, এগুলোর প্রকৃত কারণ স্থানীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট। নিজেদের ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ বা পারিবারিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাবানেরা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে। কখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে (মূলতঃ আওয়ামীলীগ), আবার কখনো ধর্মের নামে (মূলতঃ জামাত)। কিন্তু সমস্যার মূল সবসময় একই- স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তি/পারিবারিক স্বার্থের বিরোধ। বর্তমানে ক্ষমতায় আওয়ামীলীগ। আর তাই, স্থানীয় পর্যায়ে স্বার্থের বিরোধের কারণে সংঘটিত হামলাকে চলমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চোখে দেখলে প্রকৃত সন্ত্রাসী আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা কখনোই ধরা পড়বে না, পড়বে বিরোধী দলে থাকা জামাত ও তার বর্তমান রাজনৈতিক সহযোগী বিএনপির নেতা/কর্মী।সমর্থক। ফলে, প্রকৃত অপরাধী ছাড়া পেয়ে যাবে। আর সরকারী প্রশ্রয়ে থেকে অপরাধীরা আরো জোরেসোরে নেমে পড়বে ব্যক্তি/পারিবারিক স্বার্থোদ্ধারের কাজে, যা’র বলী হতে থাকবে সংখ্যায় স্বল্প হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। যেমন সাঁইথিয়াতে ছাত্রলীগের নেতারা ব্যক্তিগত স্বার্থে চাঁদাবাজী করতে গিয়েছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে পাইকারীভাবে সকল হিন্দুর উপরে হামলা করেছে। কিন্তু চেতনায় আচ্ছন্ন আমার বন্ধু, আওয়ামীলীগের সহযোগী সংগঠনের আঞ্চলিক নেতা তাদেরকে দেখতে পারেনি, দেখেছে ইতোমধ্যেই কারাগারে থাকা নিজামীকে, জাতীয় রাজনীতি থেকে বহিস্কৃত জামাতকে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও প্রকৃত হামলাকারীকে দেখতে পাননা, যে কিনা তারই ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে শুনে মন্ত্রীর কঠোর শাস্তির হুশিয়ারী। পত্রিকা সম্পাদক আবেদ খানও স্বাধীনতাবিরোধীচক্রের হাতে হিন্দুদের নির্যাতনে দিশেহারা মানুষকে সচেতন করতে চান।

মুসলমান নেতারা নাহয় ধর্মীয় পক্ষপাতিত্তের কারণে তাদের ক্যাডারদের প্রতি সদয় হতে পারেন। কিন্তু হিন্দুরাও কেন এমন হবে? পত্রিকায় দেখলাম জাতীয় হিন্দু-খ্রীষ্টান-বৌদ্ধ পরিষদের নেতারা সাঁথিয়াতে আক্রান্ত এলাকায় পরিদর্শণে গেছেন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছেন। কিন্তু তাদের সভাপতি নিমচন্দ্র ভৌমিক ত’ একজন হিন্দু, তিনিও প্রকৃত সন্ত্রাসীর নাম উল্লেখ করলেন না, তাদের শাস্তি চাইলেন না। ঢাবি’র কয়েকজন হিন্দু শিক্ষক (মুসলিমও ছিলেন একজন) প্রথম আলোতে একটা সম্মিলিত দাবীর মাধ্যমে অপরাধী হিসেবে স্বাধীনতাবিরোধীদেরকে দায়ী করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করলেন। কিন্তু সাঁইথিয়ার অপরাধী ত’ ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেই, যে দলকে শুরু থেকেই নিরপরাধদের হিসেবে ‘বিশ্বাস’ করে আছে সবাই। ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজ, মিডিয়া, সবাই মিলে ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে এভাবে প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করে যেতেই থাকলে হিন্দুদের উপর চলা এইসব নির্যাতন কোনদিনই নির্মূল করা সম্ভব হবেনা।

আমার প্রথম উদ্ধৃতির বন্ধুর সাহায্যের আবেদনে সাড়া দিতে সর্বান্তকরণে প্রস্তুত, প্রতিপলে। কিন্তু বন্ধুকে বলি, চোখটা খোল। দেখিয়ে দে কে আসল অপরাধী। দূর্নীতিবাজ মন্ত্রী-আমলা-নেতা, খুনের আসামী, চোরাকারবারী, ধর্ষক, ইত্যাদি নানান সমাজবিরোধীকে তাদের অপরাধের দায় থেকে দলীয় বিবেচনায় রক্ষার জন্য অপব্যবহার হতে হতে জীর্ণপ্রায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মোড়কে প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করে অযথাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দিকে আঙ্গুল তুলিস না। হিন্দুদের বিরুদ্ধে নির্যাতনে তোর প্রিয়দল আওয়ামীলীগ কারো থেকে পিছিয়ে নেই, যেমন সাঁইথিয়ায় চান্দাবাজী করতে গিয়ে এতোগুলো হিন্দুকে নরকযন্ত্রণা দিল। আরো রেফারেন্স দরকার হলে ১৯৭১- এ হিন্দুদের কাছ থেকে বেদখল করে নেওয়া শত্রু সম্পত্তির দখলদারদের তালিকা কর, তাইলেই বুঝবি।

– মন রে, মন আমার, তুই আর কবে মুক্ত হবি?

১২ টি মন্তব্য : “মন রে, তুই মুক্ত হবি কবে? (১)”

    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      নঈম ভাই,

      আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম।

      ব্র্যাকেটে ১ কেন? ২, ৩, ... আছে নাকি?

      ভাইয়া, ঠিকই অনুমান করেছেন। আরো আছে কয়েকটা, মূল কথা একই, তবে প্রসংগ ভিন্ন।


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
  1. জিহাদ (৯৯-০৫)

    এদের আসলে কোন দল নাই। এরা আওয়ামীলীগের সময় আওয়ামীলীগের পেছনে ঘুরে। বিএনপি আসলে আবার তাদের দলে ভীড়ে যায়। দুইদলই সুযোগ সুবিধামত এদের ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করে।

    আওয়ামীলীগ হিন্দুদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং বন্ধুভাবাপন্ন এটা ভেবে আসলে শান্তির ঢেকুর তোলার কোন অবকাশ নাই। সাম্প্রতিক সময়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলোও আওয়ামীলীগের শাসনামলেই ঘটেছে। সেসব ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ জোরালো কোন পদক্ষেপ নিয়েছে বা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছে বলে কোথাও চোখে পড়েনি এখনো।

    বিডিনিউজের এই লেখাটা থেকে উদ্বৃতিটুকু দিলাম: //bit.ly/1azLWib

    "যুক্তিটা যদি এই হয় যে, জামাত-শিবির-বিএনপি এলে দেশে অরাজকতা হবে, তাই আগামী পনের বছর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে হবে– তবে আমরাও বুঝতে চাই সেটি তারা আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়েই করতে চান কিনা!"

    কাজেই আওয়ামীলীগ যদি সত্যিই নিজেদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাদেরকে সেটা তাদের কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ করতে হবে।

    অফটপিক: আমার বেড়ে ওঠা টাঙ্গাইলে। কিন্তু দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি দুইটাই জামালপুরের সরিষাবাড়ি। আমার বোনের শ্বশুরবাড়ি ইসলামপুরে।


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      জিহাদ,

      ভালো লাগল এই দেখে যে, আমার বক্তব্য বোঝাতে পেড়েছি।

      তুমি তাইলে জামালপুরের পোলা?!......না, থাক। আর কিছু কইলাম না। কারণ, এলাকাইজমও একটা প্রকার সাম্প্রদায়িকতা 🙂


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
  2. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    মাহমুদ,
    অনেকদিন পর!
    অনেককিছু বলার, কিন্তু ভাবতে গিয়ে আর খেই পাইনা।
    কেউ আসলে মূল সমস্যাটা বুঝতে চায়না - এভাবেই চলতে থাকলে মন্দ কি!
    রাজনীতি বা সামাজিক অবস্থান নিশ্চিত করতে তো bargaining power থাকা দরকার -- আমার কখনো মনে হয়নি সেরকম ভাবনা কখনো সম্প্রদায়গতভাবে হিন্দুদের ছিলো। সম্প্রদায়গতভাবে এমন ভাবনা/প্রবণতা নিশ্চয়ই শুভ নয়, কিন্তু একটা অহিংস সমাধানের জন্য এটার কোন বিকল্প ছিলোনা। যা ঘটছে তাতে সাম্প্রদায়িকতা থেকে শুরু করে 'ভারতমুখিতা, আওয়ামীমুখিতা, বিষয়আশয় হাতানোর ফন্দি সব ঘ্যাঁটপাকানো আছে। কেবল একটি ফ্যাক্টরেরই একচ্ছত্র আধিপত্য নেই -- এবং প্রতিক্ষেত্রেই কমন হচ্ছে হিন্দুসমাজের সমষ্টিগত পদক্ষেপের অভাব।

    পুকুরের উপরে উপরে যতই আওয়ামী, বিএনপি, জামাত বা অন্যান্য ভিসিবল সীমা দেখা যাক না কেন -- তলে তলে সব মাছের নির্বিরোধ বিচরণ সবখানে; ফলে যা হবার তা হবে। আওয়ামী লীগের পক্ষে এখন আর হিন্দুদের প্রতি বেশি মায়া দেখিয়ে ভোট হারানোর বিলাসিতা সাজেনা। ২০০১ এ বিএনপি এসে রাষ্ট্রীয়ভাবে যে হিন্দুনির্যাতন করেছিলো তার একটা সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য ছিলো -- গাণিতিক সেই সমীকরণ কাজে লেগেছে -- এখন আর হিন্দুদের না গুণলেও চলে। তথাকথিত 'হিন্দু সিম্প্যাথাইজার' আওয়ামী লীগ এটাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনার প্রয়োজন করেনি -- অথচ এটুকু সিন্সিয়ারলি করলেই পরবাসে পাড়ি জমানো মানুষের সংখ্যা অনেকগুণ কম হতো। কেউ করবেনা -- কারণ হিন্দুরা আসলে মানুষ না -- তারা মালাউন, তারা অবিশ্বাসী। তাদের পায়ের নীচে পিষে ফেললে বা পোড়ালে, ধর্ষণ করলে, লুটপাট করলে কিছু যায় আসেনা -- ইহকাল তো বাদই দিলাম, পরকালেও না -- যারা ফিল্ডে এসব কাজে নিয়োজিত তাদের উদ্দীপনার অন্যতম ফ্যাক্টর এটি -- আমি অন্ততঃ নিঃসন্দেহ।

    এবং এটা একটা বিচ্ছিন্ন বিষয় হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই -- ভোটের হিসেবে এসব গোণাগুণতি করে আর কোন দল সময় আর অর্থ নষ্ট করতে চাইবেনা।

    জবাব দিন
    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      নূপুর ভাই,

      আক্রান্ত হিন্দু-> আওয়ামীলীগ আর আক্রমনকারী মুসলমান->জামাত সমীকরণটা এতোটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, নিজে মুসলমান হয়েও হিন্দুদের প্রতি সহমর্মী হতেও সংকোচ লাগে, ভয় লাগে। অবিশ্বাসের দেওয়াল আজ এতোটাই পুরু যে, নিজেকে নিয়েও সন্দেহ হয় যে, আসলেই কি আমার পক্ষে হিন্দুদের সাথে বন্ধুত্ব, সহমর্মীতার সম্পর্ক সম্ভব? এতোদিন যেসব হিন্দু প্রতিবেশীর সাথে আত্মীয়তার, বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল, এগুলো সবই কি তবে মিথ্যা?

      আমার এক জুনিয়র, সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ফেসবুকে একটা ষ্ট্যাটাস দিছে। খুবই প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় হুবহু তুলে দিলামঃ

      "দেশে থাকলে ভোট পাব, চলে গেলে জমি"-- ক্ষমতাসীনরা হিন্দু, বোদ্ধ সহ অন্য সব অ-মুসলিমদের এই ভাবেই দেখে। তবে তাদের একটা বাড়তি লাভ আছেঃ হিন্দু, বোদ্ধ বাড়ি পুড়িয়ে, নির্যাতন, ধর্ষণ করে বিরোধীদলের উপর দোষ চাপিয়ে রাজনীতি জমানো। অকাট্য যুক্তি বটে!ঃ যেহেতু বিরোধীরা ইসলামপন্থীদের শরিক তাই তারাই হিন্দু-বোদ্ধদের দেশে রাখতে চায় না!! ( তার মানে এই না যে বিরোধীরা তুলশীপাতা; ভোট সবসময় না পাইলেও জমি-জিরাতের ভাগ তো ঠিকই পায়!!) তথাকথিত "সংখ্যালঘুদের" একেবারে নির্বংশ না করে কিছু সেম্পল জিয়াইয়ে রাখা তাইলে ক্ষমতাসীনদের রাজনীতির জন্য ফরজ! আর অন্যদিকে বিরোধীদের বিপদটা একটু বেশী; অনেক সময় কান্ডটা না ঘটাইয়াও দোষী বনতে হয়! তারাও হয়তো মনে মনে খুশি! এইভাবে যদি দেশটা হিন্দু-বোদ্ধ-নাছারা মুক্ত হয় তাইলে তো ভালই; শত্রুর ভোটব্যাংক খোয়া গেল আর ইসলাম আরো শক্তিশালী হবে! মাশাল্লা!


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
      • নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

        মাহমুদ,
        বন্ধুত্ব, আত্মার সম্পর্কে যে আত্মীয়তা তাকে বিশ্বাস কিংবা অন্যান্য রীতি প্রথা ইত্যাদি থেকে আলাদা করে কবেই বা দেখতে শিখেছি আমরা বলো! যুগ যুগ ধরে এই ভায়ে ভায়ে গলাগলির মধ্যেই কি করে গালাগালি আর গলায় খঞ্জর বসানোর কাহিনীর পুনরাবৃত্তি দেখে যেতে হয় --- কোথাও একটা তো ফাঁক আছেই।
        একমুহূর্তের জন্যে বাংলাদেশের হিন্দুদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে না দেখলে দেখতে পাবে তারাও ভয়াবহভাবে সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন। তফাত কিছু নেই। আসল সমস্যাটা শিক্ষায়, সচেতনতায়। আমরা যারা পারতাম , তারা নিষ্ক্রিয় --- স্বার্থপরভাবে।

        জবাব দিন
        • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

          নূপুর ভাই,

          মিডিয়া জুড়ে কয়েকদিন ধরে দেখছি বিএনপি+জামাতের হাতে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর তান্ডবের রিপোর্ট। এরা একটা বিশেষ ধারাকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকলেও মাঝে-মধ্যে (হয়তো নিজেদের অসাবধানতায়ই হবে) প্রকৃত বাস্তবের আরেকটা দিকও দেখিয়ে ফেলে। এখানে উল্লিখিত লিঙ্কটা ভালো করে পড়ে নিন, খানিকটা ধারণা পাবেন //www.somewhereinblog.net/blog/ashrafmahmud/29914531#c10402082

          উপরে জিহাদের করা মন্তব্যের সাথে মিলিয়ে বলতে চাই, এইসব কুলাঙ্গারের কোন দল নেই। তারা সময় মত বিএনপি/জামাত/আওয়ামীলীগ সবখানেই থাকে। যতদিন পর্যন্ত আমরা তাদেরকে দলীয় পরিচয়ের বাইরে দেখতে পারবো, ততোদিন ধরেই এই তান্ডব চলতে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। আশা করি, আমরা দ্রুতই দলীয় রাজনীতির কুপ্রভাব থেকে এই সমস্যার প্রকৃত কারণ ও প্রতিকার নিয়ে ভাবনা+আলোচনা+প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাধান বের করতে সক্ষম হবো।


          There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

          জবাব দিন
  3. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    হিন্দু বা অমুসলিমদের উপর বাংলাদেশে অত্যাচার হবেই।
    এইটাই বটম লাইন।
    যারা বুদ্ধিমান তারা আগেই দেশ ছাইড়া গেছে বাকিরাও যাবে।
    তারেক মাসুদের অন্তর্যাত্রায় একটা চমৎকার কবিতা আছে এই নিয়ে।
    ঐদিন ডেইলী স্টারে রামুর ঘটনা কিভাবে ঘটনা হইছে সেইটা দেখলাম।
    লিঙ্ক


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  4. সিরাজ(১৯৯১-১৯৯৭)

    মাহমুদ ভাই
    আগে আমরা বইয়ে পড়তাম বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা শতকরা ১৫% এর মত কিন্তু এখন তো মনে হয় ৩% ও নাই। কেন নাই।আপনি অবশ্য অনেকটাই বলেছেন কিন্তু কেন আমরা তাদের ধরে রাখতে পারি নাই? হিন্দু,মুসলিম আবার কি। আমরা সবাই বাংলাদেশী।এই মুল্যবোধ আমাদের মধ্যে নাই কেন।এমনিতেই হিন্দুরা সংখ্যালঘু,কখনো শুনিনি তারা মুসলমানদের কে হিন্দু বানানোর চেষ্টা করছে তাহলে আমরা তাদের কে তাদের মত থাকতে দেই না কেন?আপনাদের ব্যাচের অসীম ভাই কিংবা আমাদের ব্যাচের দেবাশিষ দের সাথে যখন মিশেছি তখন তো নিজেদেরকে আলাদা মনে হয় নি। আমার নানাবাড়ির সাথে বেশ কিছু হিন্দু ছিল,তাদের সকাল বেলা হরে রামও হরে কৃষ্ণ গানের সুরে ঘুম ভাংতো। দুর্গাপূজার সময় তো কোন কথাই ছিল না প্রসাদ কিংবা নাড়কেলের নাড়ু খাবার বা দইচিড়া।সেই দিনগূলো নাই কেন। ব্যাক্তিগতভাবে আমিতো কোন ভাবেই তাদের আলাদা মনে করিনি এমনকি এখনো না।


    যুক্তি,সঠিক তথ্য,কমন সেন্স এবং প্রমাণের উপর বিশ্বাস রাখি

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।