আঁতেল সমাচার-১

[ইহা একটি বিরক্তি উদ্রেককারী অস্থায়ী গোছের লিখা,কারো মনে গভীর রেখাপাত করিবার জন্য রচিত নহে। বরং ইহা মানসিক পরিবেশ দূষনকারী। তাই এই জগতে কিংবা ভীনগ্রহের কোন জীবের সাথে কোন যোগসূত্র পাওয়া গেলে এই সস্তা লেখক তার দায়ভার বহন করিবেনা। একইসাথে এই লিখা কারো চিন্তাজগতে ক্রিমির সংক্রমণ ঘটাইলে ও লেখক ক্রিমিনাশক ঔষধ সরবরাহে বাধ্য থাকিবেনা।]

ছোটবেলা থেকেই আমার আঁতেল হবার খুব শখ।কিন্তু আঁতেল হওয়া তো আর মুখের কথা নয়। এরজন্য বিশেষ সাধনার প্রয়োজন।কলেজ জীবনের পাঠ চুকিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলাম তখন পরিচিত এক বড় আঁতেলকে ধরলাম।বললাম ভাই,আমি আঁতেল হব।শুনেই উনি বললেন,এটা কি বাজারের মাল, যে টাকা খরচ করলেই মিলবে।এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিক্ষার চেয়ে ও কঠিন।এর জন্য অনেক পরিক্ষা দিতে হবে। আমি বললাম তাইত আপনার কোচিং সেন্টারে আসলাম।আমাকে দীক্ষা দেন।

প্রথমেই আমাকে উনি বিশেষ একটা টিপস দিলেন।বললেন,কথা এমনভাবে বলবে যে কেউই কিছু বুঝবেনা।আমি ভাবি,সেটা আবার কিরকম?তার উত্তর ও বলে দিলেন,এমন কথা বলবে যে নিজেই ঠিকমত বুঝলানা,আর অন্যের ও বোঝার কোন সুযোগ নাই তাতে। আর ম্যাঙ্গোপিপল ভাববে তুমি অনেক বড় পন্ডিত।আর পরের টিপস হল,নিয়মিত আবুল সুপার মার্কেটে যাবা, ওখানে এই লাইনে আর ও বড় কিংবদন্তিরা আসা-যাওয়া করেন। তাদেরকে অনুসরণ করবা।আপাতত এই,আগে এটা চেষ্টা করে দেখ তারপর আরও জ্ঞান দিব।

কথামত আমিও আবুল মার্কেটে আসা-যাওয়া শুরু করলাম। সেই বড় ভাইয়ের সাথেই এক আড্ডায় আমার অনাকাংখিত প্রবেশ ঘটল। তবে তা সকলের আকাঙ্ক্ষায় রূপ নিতে বেশি সময় নেয়নি।কারণ আড্ডার চা-নাস্তা, বিড়ি-সিগারেট আর গঞ্জিকার ব্যয়ভার আমি নিয়ে নিলাম,তাই আড্ডায় না গেলেও লোকে আমায় খুব মিস করে। বরং যন্ত্রনা হয়েছে না গেলে সকলেই খুব মন খারাপ করে।তাই অল্প সময়েই আমি আঁতেলদের সাহচর্য পেতে শুরু করলাম।

মনে পড়ছে প্রথম যেদিন গিয়েছিলাম, দেখলাম দুই বিজ্ঞ সেইরকম তর্কে মশগুল। আলাপের কিছুই বুঝি নাই,কারণ বিষয় হল-গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নন্দনতত্ত্ব আর ল্যাটিন আমেরিকার নগরদর্শন। তাদের আলাপের দৌড় দেখে নিজের মধ্যে হীনমন্যতার উদয় হল।ভাবি এরা এত জানেন,আর আমি এক উজবুক,এদের কাছে তো আমি নস্যি !আমার উৎসাহের ঘাটতি দেখে বড় ভাই বললেন,হতাশ হবার কিছু নাই। এরা কেউই মার্কেজের কোন বই জীবনে ছুঁয়ে ও দেখেনি। আমি জিজ্ঞেস করি, তাহলে এই যে ঘন্টার পর ঘন্টা এই বিষয় নিয়ে ওনারা প্যাঁচাল পেড়ে গেলেন? আরে অধের্য্য হয়োনা,তুমি তো লাইনে নতুন তাই আস্তে আস্তে টের পাবে। আমি বলি সেটা কিরম? তারপর আমাকে উনি কোলকাতা থেকে প্রকাশিত একখানা পত্রিকার কথা বললেন। বললেন,ওটার শেষে দেখবে যে অনেক বিদেশী বইয়ের পর্যালোচনা আছে, ওটা নিয়মিত পড় আর নেটে একটু-আধটু বইয়ের খোঁজ-খবর নাও, আর পারলে নিউইয়র্ক টাইমসের বুক রিভিউ পড়ে আসবা। এই আঁতেলরা ওটা পড়েনা,কারণ ওটা ওরা পড়ে ও বুঝবেনা। তারপর এসো আবার আবুল সুপার মার্কেটে। দেখবে তোমাকে পায় কোন শালা(আঁতেল)।

এরপরে আমি পরিক্ষা চালিয়ে দেখেছি,এতে শুধু কাজই দিচ্ছেনা,একেবার দৌড়োচ্ছে।তবে সমস্যা একটা তৈ্রী হয়েছে,মাঝে মাঝে দু-একটা বই দাম দিয়ে কিনে হাতে করে নিয়ে যেতে হয়,যাতে লোকে ভাবে আমি জ্ঞানের গুদাম। তাই আমার শোরুম সর্বস্ব জ্ঞানের ভাবের সাথে ভাব-গাম্ভীর্যের সিন্ডিকেট(আঁতাত) করে আমার আঁতলামীর দাম বাজারে বেশ চড়াও করে ফেলেছি।এখন বাণিজ্যমন্ত্রীর শত হাক-ডাক কিংবা টিসিবি কার্যকর করেও আমার দাম কমানো যাবেনা।

৪,৪৫৪ বার দেখা হয়েছে

৪৩ টি মন্তব্য : “আঁতেল সমাচার-১”

  1. মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)
    তারপর আমাকে উনি কোলকাতা থেকে প্রকাশিত একখানা পত্রিকার কথা বললেন।

    কোন পত্রিকা ???
    আর যথারীতি জটিল লিখেছো শাহাদাত.....
    নতুন সিরিজ শুরু করলা দেখে অভিনন্দন, কিন্তু তাই বলে আগেরটাকে ভুলে যেও না ...... তোমার প্রেমিকারা আমার খুব প্রিয় সিরিজ

    জবাব দিন
  2. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    দারুন লাগল :hatsoff: তবে আতেঁল হতে গিয়ে আবার প্রেমিকাদের ভুলে যেয়েন না।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  3. বন্য (৯৯-০৫)

    প্রেমিকাদের মধ্যে যেইগুলা আতেঁল পড়ছে সেইগুলারে নিয়া "আমার আতেঁল প্রেমিকাদের সমাচার" নামে নতুন আরেক্টা সিরিজ চাই। 😀

    লেখা তো লা জওয়াব।দাগিয়ে দিলুম ৫।

    কারণ আড্ডার চা-নাস্তা, বিড়ি-সিগারেট আর গঞ্জিকার ব্যয়ভার আমি নিয়ে নিলাম,তাই আড্ডায় না গেলেও লোকে আমায় খুব মিস করে

    :pira:

    জবাব দিন
  4. হোসেন (৯৯-০৫)

    পোস্ট টা কি স্যাটায়ার?

    যারা মার্কেজের বই ছুয়ে দেখেন তারা কি আলোচনা করতে পারেন না? এরকম কাউকে চোখে পরে নাই?


    ------------------------------------------------------------------
    কামলা খেটে যাই

    জবাব দিন
    • শাহাদাত মান্না (৯৪-০০)

      আমার লেখার মধ্যে একবর্ণ সত্য ও নেই। সবই কাল্পনিক। 😉
      আর মার্কেজের সম্পর্কে যার কাছে আমার হাতেখড়ি ,তিনি ও একজন এক্স-ক্যাডেট।রফিক ভাই(৮৪-৮৯)।বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।তিনি শুধু মার্কেজ পড়েননি,মূল স্প্যানিশ থেকে তার কিছু অনুবাদ ও করেছেন।
      আর এই দেশটা অভাগা এই কারণে যে,যারা জানেননা,তারা জানার ভাণ করেন,আর যারা সত্যি জানেন তারা অগোচরে থাকেন। 🙁

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।