তাহমিনা এবং হিপোক্রেসি

আমার কলিগ একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,

ঃভাই আপনি কি সকল কর্মের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী?

ঃ আলবৎ!

ঃ কর্ম কর্মই। সকল কর্মের মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী এই ধারনা পোষন করেন?

ঃ আলবৎ

ঃ ধরেন আপনি উন্নত বিশ্বে জীবিকার জন্য গেলেন। সেখানে আপনাকে অড জব করতে হলো আপনি কি করবেন?

ঃ করব।

ঃ ট্যাক্সি চালাতে হলো। করবেন?

ঃ করব না কেন?

ঃ আচ্ছা আপনার ছেলেকে সেখানে ট্যাক্সি চালাতে হবে। আপনি এলাউ করবেন?

ঃ অবশ্যই।

ঃ আসল প্রশ্নে আসি। আপনি সেই অড জব গুলো কি এখানে করবেন? বাদ দেন। আপনি কি এখানে ট্যাক্সি চালাবেন? আপনার ছেলেকে এখানে চালাতে দিবেন? ধরেন বিদেশের মতই পেমেন্ট হবে। তারপর এলাউ করবেন?

ঃ না…

 

আমার হিপোক্রেসিটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সেদিন আমার সেই কলিগ। উপরে কর্ম নিয়ে মহান ধারনা পোষন করি বলে বয়ান ছেড়েছিলাম তা ‘সমাজে মান রক্ষার’ তাগিদে ‘হিপোক্রেসি’তে পরিণত হতে দুই মিনিটও সময় লাগেনি। এই পক্ষপাতদুষ্টে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

কোথায় যেন দেখেছিলাম, বাঙ্গালী নাকি পাছার মত। যেকোন ইস্যুতে দুই ভাগ হয়ে যায়। হালের তাহমিনা (স্মার্ট বাদাম বিক্রেতা) ঘটনা তার একটি উদাহরণ মাত্র।

ঘটনা কিছুদিন আগের। ইগ্নোর করেছিলাম। আজ মনে হলো আপনাদের হিপোক্রেসিটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেই।

আচ্ছা হ্যান্ডসাম ফেরিওয়ালা তাজুল ইসলাম লিখনের ‘ড্রিম ভ্যান’ এর রিপোর্ট যখন প্রচারিত হল তখন এত কথা হয়নি কেন? মাস্টার্স করা একটা ছেলে যখন পান্থপথ মোড়ে বিভিন্ন স্বাদের চায়ের দোকান দিয়েছিল তখন আমরা বাহবা দিয়েছিলাম না? মনে আছে মনে হয় আপনাদের। আত্নকর্মসংস্থানের সুন্দর উদাহরণ। আমিও বন্ধু বান্ধব সহ চা খেতে সেই দোকানে গিয়েছি। তখন আশপাশের গরিব চাওয়ালাদের আর্তনাদ আমার কানে আসেনি, একটা ঘরে পুরো পরিবার থাকার দুঃখ আমাকে আঘাত করেনি। অসহায় বাদাম ‘আন্ডার এইজ’ বাদাম বিক্রেতা আর তার নানীর গল্প যদি আসে তাহমিনার বেলায়, গোল বাধে যদি তাহমিনায় এসে তাহলে বলে রাখি আপনি একটা ‘হিপোক্রেট’।

আপনি অর্থনীতির কথা বলবেন? ‘ফুড চেনের মত পেশার চেন’ এর কথা বলবেন? আহ হা রে। গরীব ফল সবজি দোকানির বদলে চেন শপ থেকে বাজার করতে ভাল্লাগে না আপনার? গরু টা মুরগিটা কি পাড়ার কসাইয়ের কাছ থেকেই আসে? বুকে হাত দিয়ে বলেন সামর্থ্য থাকার পরেও আপনি রাস্তার পাশের দোকান থেকে কিনেছেন, কসাইয়ের কাছে ভালো মাংস দেবার অনুরোধ করেছেন! ঝামেলা হয় শুধু তাহমিনার বেলাতেই। চমৎকার! আপনার অন্তরটা পাছার মতই উম্মুক্ত হয়ে পড়ছে যে।

ঝা চকচকে রেস্টুরেন্টে খাওয়া বাদ দিয়ে বসে পড়ুন না টং দোকানে। হ্যা, জানি বলবেন অন্য টপিকে যাচ্ছি। উদাহরণ দিচ্ছি মাত্র। শকয়েক ওয়েবসাইট যখন এসেছে সবজি, চাল ডাল থেকে শুরু করে জামা কাপড়, ইলেক্ট্রনিক্স, (সঅঅব জিনিস) বিক্রি করতে তখন এদের সাথে জড়িতদের পেটে লাথি পড়েনি? কই তখন তো আপনার একটা কথাও বের হয়নি?

ওমেনচ্যাপ্টারের লেখা গুলো আমার ভালোই লাগে। সেখানে দেখলাম ‘জীবন কখনোই ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ নয়’। সত্যি। অনেক ব্যবসায়ীর সন্তানকে দেখেছি চাকুরী করতে। চাকুরী না করে দিব্যি তারা ব্যবসা দেখে জীবিকা নির্বাহ করতে পারত, অথবা চাকুরী/ব্যবসা কোনটাই না করলেও তাদের চলত আর সেখানে কয়েকজন বেকার হলেও চাকরী করতে পারত। তাদের কাছে ‘জীবনটা যেমন খুশি তেমন সাজো’ না??? নাকি সেটা শুধুই তাহমিনার জন্য? সেটা কি জাগো ফাউন্ডেশনের একদিনের ফুল বেচাদের জন্য নয়? একদিনের ভিক্ষাবৃত্তির জন্য কেন নয়?

 

বিডি নিউজের লিঙ্কটা এখানে পাবেন। সত্যকার অর্থেই সে একটা মেসেজ দিতে চেয়েছে। আফসোস সে এমন শ্রেনীকে সেটা দিতে চেয়েছে যারা বছরের পর বছর ধরে পাবলিক ভার্সিটিতে পড়ে আরো বছরের পর বছর ধরে শুধু সরকারী চাকরী খুঁজে এখন বেকার। প্রতিকী একটা চিত্র মাত্র। কোন কর্মকেই ছোট করে দেখা উচিত না, যা পারো তুমি তাই কর।

আর যদি তার অন্য কোন উদ্দেশ্য নাও থাকে তবেও কোন সমস্যা দেখি না। ওর যা ইচ্ছা হয়েছে করেছে। তাতে আপনার আমার সমস্যা কোথায়? আপনার আমার খায় না পড়ে? ইস্যু দেখলেই খালি আঙ্গুল ভরতে ইচ্ছে করে তাই না???

সমস্যা অন্যখানে। সমস্যা হচ্ছে তাহমিনার ‘গেট আপে’। ওর শার্ট পান্ট স্মার্ট লুকই যথেষ্ঠ লুল সম্প্রদায়ের চুলকানি ঊঠানোর জন্য। এবং দুঃখজনক হলেও সত্যি আমরা অধিকাংশই লুল সম্প্রদায়ভুক্ত।এই লুল সম্প্রদায় তনুর শয়ে শয়ে ছবি থাকলেও শুধু হিজাবী ছবিটা দিয়েই বিচার চায়। এসপি পত্নী’র হিজাবী ছবিটা দিয়েই বিচার চায়। তাহমিনার হিজাবী ছবি থাকলেই সবাই অন্যকিছু বলত বলেই আমার একান্ত ব্যক্তিগত ধারনা। শিক্ষিত লোকজনকেও বাজে কথা বলতে শুনেছি শুধু গেট আপের জন্য।

১,৯৩৬ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “তাহমিনা এবং হিপোক্রেসি”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    ধন্যবাদ মাহমুদুল।
    যেমন খুশি তেমন সাজ লেখা টা দেখে বিরক্ত হইছিলাম।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  2. মাহমুদুল (২০০০-০৬)

    অনেক কিছু নিয়ে আমিও বিরক্ত ভাই। চিন্তাগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এই অপাঠ্যগুলো একমাত্র আপনিই পড়েন 😛


    মানুষ* হতে চাই। *শর্ত প্রযোজ্য

    জবাব দিন
  3. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    এইসব হিপোক্রেসিই এখন স্বাভাবিক, আর যারা হিপোক্রেসিইকে চোখে আংুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তারাই হলো অস্বাভাবিক, বেলাইনের লোক।

    পড়ে ভাল লাগলো।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।