নববর্ষ এবং উদযাপন

আগামী দুই দিনের মাথায় খ্রিস্টীয় বর্ষের সমাপ্তি এবং নতুন বছরের আগমন। সারা বিশ্ব নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে উম্মুখ। ক্ষণগণনার মাধ্যমে নতুন বছরের আশা আকাঙ্ক্ষাকে, সুন্দর আগামীর পথচলাকে স্বাগত জানানোর রীতি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। তরুণদের কাছে এ এক উৎসাহ উম্মাদনার উপলক্ষ্য। বাংলা এবং আরবী নববর্ষ পালনের সাথে সাথে বাংলাদেশেও তা স্বাভাবিক ভাবে পালিত হতে পারত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে কিংবা জনাকীর্ণ জায়গাগুলোতে উৎসব আয়োজনের সাথে সাথে নাগরিক অপর্যাপ্ত বিনোদনের অভাবের স্বাক্ষী তরুণরা বাসা বাড়ির ছাদে কিংবা রাস্তাঘাটেও বাজিসমেত উদযাপন লক্ষ্যনীয় ছিল। শহুরে নাগরিকদের এই আনন্দোতসবে বাধা হয়ে আসে ন্যাক্কারজনক যৌন হয়রানির ঘটনা, ২০০০ সালের প্রথমে। তারপর থেকে সরকার পক্ষান্তরে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তার নামে জনপরিসরে বাধা নিষেধ আরোপ করতে শুরু করে। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এই আরোপিত বাধা নিষেধ এতটাই তীব্র হতে শুরু করে যে- উৎসবের আমেজ না থাকলেও বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ, পুলিশ চেকপোষ্ট বসিয়ে নাগরিকদের তল্লাশি এবং গান বাজনা বা ঘরোয়া পার্টিতেও নিষেধাজ্ঞা খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় এসব নিষেধাজ্ঞা নিরাপত্তার খাতিরে নাকি খ্রিষ্টীয় নববর্ষের প্রতি অতিরিক্ত নেতিবাচক মনোভাব সেই প্রশ্নের উদ্রেক করে।

দেশের শহরাঞ্চলে একমাত্র রেস্টুরেন্ট ছাড়া বিনোদনের উপায় নেই বললেই চলে। সরকারি পার্ক, খেলার মাঠ তো অপ্রতুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যা কিছু অতীতে বিদ্যমান থাকলেও বর্তমানে তা দখল করে শপিং মল, রিকশাস্ট্যান্ড, দোকান, বাণিজ্যিক কার্যে ভাড়া দেয়া সহ এমন সব কাজে দখল করে রাখা হয় যে এসবের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। শিশু কিশোর তরুণেরা খেলার মাঠে যাবার বদলে মোবাইল কিংবা ভিডিও গেমসে আসক্ত হয়ে পড়েছে যাতে সুস্থ বিনোদনের সাথে সাথে শারীরিকভাবে সক্ষম হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হওয়ায় সেই অনুষ্ঠান সমূহ থেকে দূরে রাখাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে যা শুধু অবাস্তবই নয়, সেই চেষ্টাও রাষ্ট্রের নিয়মনীতির প্রতি বিরাগভাজন হয়ে ব্যুমেরাং হয়ে আসছে। কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের নাগরিকের বা তরুণদের মানসিক বিকাশ এবং বিনোদনের প্রতি হেয়ালীপনা আনন্দ উদযাপনে আগ্রহী তরুণদের মনে বিতৃষ্ণার সৃষ্টি করছে। ফলশ্রুতিতে সামর্থ্যবান অংশ দেশের বাইরে কিংবা অন্য উপায়ে আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করে। তাহলে সিংহভাগ তরুণের আনন্দে বাধা হয়ে দাঁড়ানোটা বৈষম্যমূলক নয় কি?

এটি সত্যি যে অপরাধপ্রবণ কিছু মানুষ সব অনুষ্ঠানের আনন্দকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেন। আর সেজন্যই পহেলা বৈশাখ, ঈদ কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও রাষ্ট্র পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। কিন্তু এই নববর্ষের নিরাপত্তার চেয়ে উৎসব পালনে বাধা দেয়ার উৎসাহটাই চোখে পড়ে বেশি। নিরাপত্তা দিয়েও কি রাষ্ট্র তরুণদের আনন্দ উৎসবে সহযোগী হতে পারে না?

হয়তো প্রতিবারের মত এবারেও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, তল্লাশি, আতশবাজি এবং “ডিজে পার্টি” আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করবে। এসব আয়োজন নির্বিঘ্নে করতে দিলেও যে খুব একটা ক্ষতি হবে তা প্রমাণসাপেক্ষ নয়। যে কোন গানের অনুষ্ঠান যদি আয়োজন করা যায় তাহলে নির্দিষ্ট ধরনের তরুনদের পছন্দের গানের অনুষ্ঠান বা কনসার্ট আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কতটা যৌক্তিক তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম ২০২৪ সালের থার্টি ফার্স্ট নাইট এবং নববর্ষ উদযাপনে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছিলেন- “সারা পৃথিবীতেই নববর্ষে পটকা-আতশবাজি ফোটান হয়। তবে তারা নির্দিষ্ট স্থানে এ উৎসব করেন। আগামী বছর থেকে ঢাকায়ও বর্ষবরণ উৎসবের জন্য স্থান নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে।… আমরাও এ বছর ঢাকা মহানগরীর একটি নির্দিষ্ট স্থানে থার্টি ফার্স্ট ও ইংরেজি নববর্ষ উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠান আয়োজন করার চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু এ বছর আমরা সেটি পারিনি। আশা করি আগামী বছর আমরা সেটি আয়োজন করব।“ পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ছিল। ইট পাথরের নাগরিক শহরে আনন্দোৎসবের আয়োজনের বড় সংকট নিরসনে আশার সঞ্চার করেছিল। নিশ্চিতভাবেই সরকার মহলে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেই প্রতীয়মান।

মানসিক ভাবে ক্লান্তিকর বছর শেষে শহুরে নাগরিকরা নিরাপত্তার সাথে নববর্ষের আনন্দে উদ্বেলিত হবে, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এজন্য অহেতুক নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করার জন্য সরকারের প্রতি তরুণদের এবং প্রগতিশীল জনগোষ্ঠী আশা ব্যক্ত করতেই পারেন।

৮০ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য “নববর্ষ এবং উদযাপন”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।