আমি ক্ষমাপ্রার্থী, আমি লজ্জিত

অভিজিত রায় কে হত্যা করা হলো।
এই বাঙলায় আঘাত হানা হয়েছে শামসুর রাহমান এর উপর, হুমায়ুন আজাদ এর উপর, সৈয়দ শামসুল হক এর উপর, হাসান ইমাম এর উপর। দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন হাউদ হায়দার, তসলিমা নাসরিন। হত্যা করা হয়েছে রাজিব হায়দার (থাবা বাবা) কে, হত্যা করা হলো অভিজিত রায়কে।

কেনো জানি না শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন উপন্যাস এর কথা মনে পড়ে গেলো, বিশেষ করে শেষাংশ। বখতিয়ার খিলজির বাহিনী মূর্তি ধ্বংস করছে, কাহিনীর মূল নায়ক শ্যামাঙ্গ কে যার পেশা ছিলো মূর্তি বানানো তাকে হত্যা করা হচ্ছে।

এই পোড়ার বাঙলায় হিন্দু হবার জন্য নিগৃহিত হতে হয়, বৌদ্ধ হবার জন্য নিগৃহিত হতে হয়, পাহাড়ি আদিবাসী হবার জন্য নিগৃহিত হতে হয়। শুধু তাই নয় আপনি কলম দিয়ে লিখবেন আপনাকে নিগৃহিত হতে হবে, আপনাকে হত্যা করা হবে। এবং আপনাকে আঘাত টি করবে শান্তির ধর্ম বলে খ্যাত মহান ধর্ম ইসলামের অনুসারী রা। এবং অনেক ক্ষেত্রেই এই কাজটি তারা করে দল মত নির্বিশেষে। এই মহান অত্যাচারের সময়, ধর্ষণের সময়, ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেবার সময়, হত্যা করার সময় জামাত, বিএনপি, আওয়ামিলীগ, কম্যুনিষ্টরা সবাই একসাথে অস্ত্র চালান।

আজ এই নির্বোধ, বোবা সময়ে আমরা একে একে নিজেদের কে দাড় করাচ্ছি প্রতিপক্ষের ছুরির নিচে। এবং অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কলম ছাড়া আর কোন অস্ত্র আমরা চালাতে শিখিনি। কেউ আঘাত করে রক্ত ঝরালে ঐ কলম ছাড়া আর কোন কিছুতে প্রত্তুত্তর ও দিতে পারি না। রাষ্ট্র, সমাজ আজ ব্যর্থ হচ্ছে নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে। এমনকি যারা নিরাপত্তা দিবে তারাই মেতে উঠেছে আমাদের হত্যার উৎসবে।

কলমের জবাব দেয়া হচ্ছে অস্ত্রের মাধ্যমে, শুধুমাত্র জাতিসত্বা ভিন্ন হবার জন্য ৪৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত আমরা পুরো বাঙালি জাতি নিগৃহিত হয়েছি, নিষ্পেষিত হয়েছি। অথচ এই একই বাঙালি জাতি, বাঙালি জাতির সামরিক সামরিক বাহিনী অত্যাচার করে পাহাড়ি দের উপর, আদিবাসি দের উপর।

সেনাবাহিনী তোমাদের কাজে আমি গর্ববোধ করি। কিন্তু তুমি যখন মাথা হেট করে দাও তখন আর বলার কিছু থাকে না। আমি লজ্জিত হতে হতে ক্ষীণ থেকে ক্ষীনতর হয়ে যাচ্ছি, একসময় হয়তো হাওয়ায় উবে যাবো যদি না তার আগেই কোন ছুরি কেড়ে নেয় প্রাণ।

Screen Shot 2015-03-16 at 13.43.38

ইমতিয়াজ মোহাম্মদ জানালেন,

(১)
পদযাত্রা ধরনের নির্দোষ কর্মসূচীতে সেনাবাহিনী গুলি করবে কেন? সেনাবাহিনী কেন?

বাবুছড়া জায়গাটা খাগড়াছড়ি শহর থেকে বেশ দুরে। সেখানে একটা গ্রামের বাইশটা আদিবাসী পরিবারকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে বিজিবির ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর স্থাপন করা হচ্ছে। এই ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর স্থাপনের জন্যে জায়গা দখল করার বিরুদ্ধে সেখানে প্রথম থেকেই প্রতিবাদ হচ্ছে। মানুষকে এর আগেই সেখানে মারধোর করা হয়েছে। গ্রামবাসীদেরকে মেরে আবার ওদের নামেই উল্টো মামলা করা হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও সেখানকার হতভাগা আদিবাসী গ্রামের লোকেরা প্রতিবাদ করেই যাচ্ছে। সেখানে ভূমি রক্ষা কমিটি বা এরকম কোন একটা নামে একটা ছোট্ট কমিটি করে সেখানকার আদিবাসী লোকজন নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করে আসছে। এছাড়া পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এরাও আছে আন্দোলনে।

সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজকে একটা কর্মসূচী ছিল ‘পদযাত্রা’। পদযাত্রা কর্মসূচীটা কি? আপনি এই কর্মসূচীর ফটো দেখতে পারেন অনলাইনে। অল্প কয়েকটা নারী পুরুষ যাদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ, একটা লাল রঙের ব্যানার হাতে নিয়ে পাহাড়ি পথে হেঁটে আসছে। ওরা বিজিবির হেড অফিস পর্যন্ত যাবে গিয়ে ভূমি রক্ষা আর মামলা প্রত্যাহারের দাবীগুলি জানাবে, তারপর ফিরে আসবে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী।

ওরা পদযাত্রা শুরু করেছে দীঘিনালা উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে। নিরস্ত্র শান্ত পদযাত্রা। একটু দুরে যেতে না যেতেই কারবারি টিলা নামক একটা জায়গায় ওদেরকে থামিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনীর লোকেরা শুরু করে পদযাত্রায় অংশ নেওয়া ছেলেমেয়েদের উপর মারধর আর নির্বিচার গুলিবর্ষণ।

ওদের দাবী ন্যায় কি অন্যায়, ঠিক না বেঠিক সেই আলোচনা এখানে করব না। কিন্তু ভিতাভুমি উদ্ধারের দাবী নিয়ে গোটা বিশেক বা পঞ্চাশেক লোক একটা মিছিল নিয়ে একটা সরকারী অফিসের সামনে যাবে দাবী পেশ করতে, ওদেরকে আর্মি দিয়ে গুলি করে ঠেকাতে হবে?

(২)
আপনারা যারা ঢাকা শহরে থাকেন, শীতকালে দুই একবার বেড়াতে যাওয়া ছাড়া রাঙ্গামাটিতে বা খাগড়াছড়ি বা পাহাড়ের অন্যত্র কোথাও যাননি, তাদের জন্যে বলি। ঢাকা শহরে একটা মিছিল করা আর দীঘিনালায় একটা মিছিল করা এক জিনিস না। এমনকি রাঙ্গামাটি খাগড়াছড়ি বা বান্দরবান শহরেও যদি আদিবাসীরা একটা কর্মসূচী ঘোষণা করে শুরু হয়ে যায় নানারকম অপতৎপরতা। কয়দিন আগে বান্দরবানে দেখেছেন কি হয়েছে। শহরের বাইরে পাহাড়ের উপরের দিকে মিটিং মিছিলে নির্বিচারে মারপিট করা গুলি করে মানুষ মেরে ফেলা তো সাধারণ ঘটনা। একটা ছেলে বা মেয়ে যদি নিয়মিত এরকম দুই তিনটা কর্মসূচীতে অংশ নেয় তাকে আর্মি পুলিশের লোকেরা চোখে চোখে রাখা শুরু করে দেয়। কিরকম অবস্থায় মানুষ সেখানে মিটিং মিছিল করতে যায় সেটা আপনি ঢাকা শহরে বসে বুঝবেন না।

বিজিবির কেড়ে নেওয়া ভিটেমাটি বাবুছড়ার বাইশটা না একুশটা পরিবারের কাছে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ সেটা আপনি আমি ডাকা শহরে বসে চিন্তাও করতে পারব না। আমাদের হয়তো মনে হবে- জায়গা নিয়েছে তাতে কি, ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিলেই হয়ে গেল। কিন্তু আদিবাসী জীবনযাত্রায় জিনিসটা এইভাবে কাজ করে না। সেকারণেই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও সেই গ্রামবাসীরা ওদের ভূমির অধিকার আদায়ের জন্যে আর্মির বুলেটের সামনে দাঁড়াতে দ্বিধা করে না।

আদিবাসীদের জীবনযাত্রা, ওদের জীবনধারণের পদ্ধতি, ওদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধরন, ওদের সংস্কৃতি এগুলিকে গুরুত্ব দিতে হয়। এগুলি রক্ষা করতে হয়। আপনারা যারা শিক্ষিত সচেতন সংবেদনশীল আছেন, একটু পড়াশুনা করে খোঁজ খবর নিয়ে দেখতে পারেন। আদিবাসী অধিকার নিয়ে নানারকম লিটারেচার এখন ফ্রিই পাওয়া যায় অনলাইনে।

(৩)
আদিবাসী ইস্যু না হয় বাদই দিলাম। আমাকে শুধু এইটুকু বুঝিয়ে বলেন এইরকম একটা ছোটখাট নির্দোষ কর্মসূচীতে আর্মি বাধা দিতে যাবে কেন? আর্মি কেন যাবে? এটা তো পুলিশের কাজ, প্রয়োজনে পুলিশ যাবে। আর্মি গিয়ে কেন গুলি করবে?

আমি খবর জানার চেষ্টা করলাম। দেখালাম ওখানকার এক মিলিটারি কমান্ডার নাকি সাংবাদিকদেরকে বলেছে যে পদযাত্রাকারীদের সাথে সংঘর্ষে নাকি আটজন জওয়ান আহত হয়েছে। ডাহা মিথ্যা কথা। প্রেসের ছেলেরা যখন আহত সেনা সদস্যদের নাম ধাম জানতে চেয়েছে তখন সেই কর্মকর্তা আর কোন নাম বলতে পারেনি। আপনিই বলুন, সুসজ্জিত সশস্ত্র সেনাবাহিনীর সদস্যরা গুলি করছে পদযাত্রাকারিদের ছোট্ট দলটাকে, সেখানে আর্মির জওয়ানরা কিভাবে আহত হয়?

শোনেন, এইভাবে হয়না। এইটা ন্যায় না। এইগুলি সভ্য আচরণ না। আজকে এই দুই হাজার পনের সনে এসে যদি আমরা মানুষের অধিকার ও মর্যাদার মত মৌলিক বিষয়গুলির প্রতি সম্মান দেখাতে না পারি তাইলে আর কিসের মানুষ হলাম রে ভাই!

যে মেয়েটা একটা পদযাত্রা করতে গেল গ্রামবাসীদের ভূমির অধিকার দাবী করে তাকে আর্মি কেন গুলি করবে? চ্ছা নাহয় ধরেই নিলাম ওদের দাবীর কোন ন্যায্য ভিত্তি নাই। তবুও আমাকে বলেন মিলিটারি কেন সেই পদযাত্রায় গুলি করবে। ওরা যদি বিজিবি হেডকোয়ার্টারের কাছে গিয়ে দাবী জনাইয়ে আসতো তাইলে কার কি এমন ক্ষতি হতো? স্বাধীন দেশের নাগরিক সরকারের কাছে একটা দাবী জানতে পারবে না? এটা কিরকম কথা? আর্মি কেন গুলি করবে?

নিলয় সোবহান জানালেন,

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান l
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় একটা গ্রামের বাইশটা আদিবাসী পরিবারকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে বিজিবির ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর স্থাপন করা হচ্ছে।
উচ্ছেদ হওয়া ২১ পরিবারকে পুনর্বাসন এবং পাহাড়িদের নামে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ভূমি রক্ষা কমিটি রোববার দুপুরে বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর অভিমুখে পদযাত্রা করলে উপজেলার কারবারি টিলা এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ পদযাত্রায় অংশ নেওয়া পাহাড়িদের মারধর করে ও তাদের উপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে। 

 

পাহাড়ি জাতিসত্বা- আদিবাসি সহ সমতল এর আদিবাসিরা যে বাঙলাদেশের নাগরিক, তাদের ও রয়েছে বাঙলাদেশের নাগরিক দের প্রাপ্ত সকল অধিকার এই বোধ টা যেনো আমরা ভুলে না যাই।

শেষকথাঃ এই ব্লগের মাধ্যমে এক্স ক্যাডেট যারা সমতলের আদিবাসি, পাহাড়ের আদিবাসি তাদের কাছে একটি অনুরোধ জানাচ্ছি। আমরা প্রায় সবাই জানি পাহাড়ে আদিবাসীদের উপর অত্যাচার হচ্ছে। আপনারা-তোমরা যারা এই বিষয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা লদ্ধ তারা কেনো কথা বলছে না। দয়া করে আপনারা কথা বলুন। আমার ভালোমানুষির মুখোশ টা খুলে থুথু মারুন।   

সূত্রঃ
ইমতিয়াজ মোহম্মদ
নিলয় সোবহান।

১,৯৫৭ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “আমি ক্ষমাপ্রার্থী, আমি লজ্জিত”

  1. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    এই ভুখন্ডে একটি সমাবেশের উপরে অর্বাচিনের মত গুলি চালানোর জন্য ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস।
    দেশটি একটি স্বাধীন দেশ।
    এর পরেও যারা কোন শিক্ষা না নেয়, তাঁদের জন্য করুনা ছাড়া আর কি ই বা করার থাকে?


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    অন্যত্র শেয়ার করেছিলাম। সেখান থেকে দুটো প্রশ্ন/ কমেন্ট তুলে দিচ্ছি

    ০১। কতজন মারা গেছে নির্বিচারে গুলি করায়?
    ০২। নিরবিচারে গুলিবর্ষণ এর কথা সুন্তেছি। কতো রাউন্ড ভাই? সাংবাদিক ভাইরা কি এম্পটি কারট্রিজ পাইছে লাখ খানেক?
    "" আমি খবর জানার চেষ্টা করলাম। দেখালাম ওখানকার এক মিলিটারি কমান্ডার নাকি সাংবাদিকদেরকে বলেছে যে পদযাত্রাকারীদের সাথে সংঘর্ষে নাকি আটজন জওয়ান আহত হয়েছে। ডাহা মিথ্যা কথা। প্রেসের ছেলেরা যখন আহত সেনা সদস্যদের নাম ধাম জানতে চেয়েছে তখন সেই কর্মকর্তা আর কোন নাম বলতে পারেনি। ""
    নিজে থেকে ডিডাকশন দিয়ে দেয়া হচ্ছে ডাহা মিথ্যা কথা। তাইলে আর কথার কি থাকে? গতকালকে টিভি নিউজেই বলছে আহত সেনা সদস্যরা স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে।
    সাংবাদিক ভাইয়েরা মনে হয় একটা ডক্টরিয়াল কারটেসি জানেন না, সেটা হল কেউ আহত বা নিহত হলে প্রথমে তার নেক্সট অব কিন কে ইনফো করতে হয়, নট এনিওয়ান এলস।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  3. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    পাহাড়ি, বাঙালি, আদিবাসি সবাই যে বাংলাদেশের নাগরিক এই হিসাব করলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়।
    এই জীবনে পাহাড়ে শান্তি দেখতে পাবো কিনা সন্দেহ।।।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।