নির্ধর্মকথা- এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল, মিঠা নদীর পানি (১/৩)

প্যালের ঘড়ি

এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল কিংবা মিঠা নদীর পানিতে নাম জানা হরেক রকমের মাছ- সবকিছু কী নিখুঁত চমৎকারিত্বপূর্ণ। এতো সুন্দর, এতো জটিল প্রাণীজগতের দিকে তাকালে বোঝা যায় এগুলো এমনি এমনি আসেনি- এদের এভাবেই তৈরী করা হয়েছে। ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে সন্দেহাতিতভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত যুক্তি এটাই। বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন ভাবে বর্ণনা করা হলেও যুক্তির মূল কাঠামো একই। সেটা হলোঃ 1

১। কিছু কিছু জিনিস- যেমনঃ জীবনের গঠন বৈচিত্র এতো জটিল (কিংবা এতো নিপুন) যে এটা আকস্মিক দূর্ঘটনার মাধ্যমে এমনটা হয়নি তা বোঝাই যায়।
২। একমাত্র কোনো স্রষ্টার প্রত্যক্ষ কারণেই এমনটা হতে পারে।
৩। সুতরাং ঈশ্বর আছেন।

আরেকটু ভিন্নভাবে বলা যায়ঃ

১। বিশ্বজগৎ বা জীব-বৈচিত্র প্রমান করে, এরকম হবার পেছনে অবশ্যই কোনো কারণ রয়েছে।
২। সুতরাং এই কারণের কারক বা জীব-বৈচিত্র বা বিশ্বসৃষ্টির দিক নির্দেশক হিসেবে অবশ্যই একজন আছেন।
৩। তিনিই ঈশ্বর।

প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্রষ্টার অস্তিত্ব খোঁজার দীর্ঘ ইতিহাসের সূচনা গ্রিকদের দ্বারা (2) হলেও সাধারণের মাঝে এতো জনপ্রিয় করার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান ধর্মবেত্তা ও দার্শনিক উইলিয়াম প্যালের (১৭৪৩-১৮০৫)। প্যালে জ্যোতির্বিজ্ঞান দিয়েই তার চিন্তাভাবনা শুরু করলেও খুব দ্রুত বুঝে উঠেছিলেন, বুদ্ধিদীপ্ত স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমানের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞান উপযুক্ত মাধ্যম নয় (3)। তার কাছে উপযুক্ত মাধ্যম মনে হয়েছিল জীব বিজ্ঞানকে। নিজের ভাবনাকে গুছিয়ে সৃষ্টির পরিকল্প যুক্তি বা’ডিজাইন আর্গুমেন্ট নিয়ে তিনি ১৮০২ সালে প্রকাশ করেন “Natural Theology, or Evidence of Existence and Attributes of the Deity, collected from the Appearances of Nature”(4)। ধর্ম ও দর্শনের এই বিখ্যাত বইয়ে প্যালে রাস্তার ধারে একটি ঘড়ি এবং পাথর পরে থাকার উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, এই ব্যাপারে সবাই একমত হবে যে, পাথরটি প্রকৃতির অংশ হলেও ঘড়িটি একটি নির্দিষ্ট কাজ (সময় গণনা) সম্পাদন করার জন্য কারও দ্বারা তৈরী করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী অন্যান্য প্রাকৃতিক ধর্মাবেত্তার মতো প্যালেও জীবজগতকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে জীবের অভিযোজনের ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। প্যালে লক্ষ্য করেছিলেন যে, প্রতিটি জীবদেহে নির্দিষ্ট কাজ করবার জন্য নির্দিষ্ট অংগ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, যা জীবটিকে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে টিকে থাকতে সহায়তা করে। তিনি জটিল জীবদেহকে কিংবা চোখের মত প্রত্যঙ্গকে ঘড়ির কাঠামোর সাথে তুলনা করার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিলেন স্রষ্টার সুমহান পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য আর নিপুণ তুলির আঁচড়।

এই যুক্তির নাম সৃষ্টির পরিকল্প যুক্তি বা ‘ডিজাইন আর্গুমেন্ট’। দুইশ বছর পেরিয়ে গেলেও এই যুক্তি আজও সকল ধর্মানুরাগীরা নিজ নিজ ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমানে ব্যবহার করে আসছেন। কয়েক সপ্তাহ আগেই ঈশ্বর আছে কী নেই এই আলোচনায় আমার এক বন্ধু আর সহ্য করতে না পেরে উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে একমিনিটের জন্য তার কথা শুনতে অনুরোধ করলো। এক যুক্তিতেই সকল সন্দেহকে কবর খুড়ে দেবার অভিপ্রায়ে সে শুরু করলো- ধর যে, তুই রাস্তা দিয়ে হাঁটছিস, হঠাৎ দেখলি তোর সামনে একটি পাথর আর ঘড়ি পড়ে আছে …। প্যালের ঘড়ির মৃত্যু নাই।

জীবজগতের জটিলতা নিয়ে অতিচিন্তিত সৃষ্টিবাদীরা জটিলতার ব্যাখ্যা হিসেবে আমদানী করেছেন ঈশ্বরকে। ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন- সুতরাং সবকিছু ব্যাখ্যা হয়ে গেছে বলে হাত ঝেড়ে ফেললেও তাদের তত্ত্ব তৈরী করে যায় আরও মহান এক জটিলতা। তর্কের স্বার্থে যদি ধরেও নেই, সবকিছু আসলেই খুব জটিল এবং এই জটিলতা একজন সৃষ্টি করেছেন তাহলে তো সেই সৃষ্টিকর্তাকে আরও হাজারগুণ জটিল হতে হবে। তিনি কীভাবে সৃষ্টি হলেন?

প্যালের ঘড়ি ছাড়াও লেগো সেটের মাধ্যমে একই যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। ধরা যাক, লেগো সেট দিয়ে তৈরী করা হল একটি গ্রীন লাইন স্ক্যানিয়া মডেলের বাস। একজন দেখেই বুঝবে, বুদ্ধিমান মানুষ লেগো সেটের মাধ্যমে বাসটি তৈরী করেছে। এখন কেউ যদি বাসের লেগোগুলো আলাদা করে একটি বস্তায় ভরে ঝাঁকাতে থাকে তাহলে কী আদৌ কোনোদিন বস্তা থেকে আরেকটি বাস বের হয়ে আসবে? আসবেনা।

উপরোক্ত উদাহরণে সৃষ্টিবাদীরা বাস তৈরীর দুটি প্রক্রিয়ার “ধারণা” দেন আমাদের, একটি বুদ্ধিমান কোনো স্বত্তার হস্তক্ষেপে দ্বারা (যার তৈরী হওয়া নিয়ে সৃষ্টিবাদীরা চিন্তিত নন, যতটা চিন্তিত বাস নিয়ে), আরেকটি বস্তায় ভরে ঝাঁকি দেওয়া। কিন্তু বস্তায় ভরে ঝাঁকি দেবার ধারণার বদলে আমাদের হাতে প্রাণীর জগতের জটিলতা ব্যাখ্যা করার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে, শত সহস্র পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যেই তত্ত্বের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যেটি সকল প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে খাপ খায়। এই তত্ত্বের নাম ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব।

বিবর্তন তত্ত্ব

১৮২৭ সালে চার্লস ডারউইন (মৃত্যুঃ ১৮৮২) যখন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালে প্রবেশ করেন ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করার জন্য তখন তাকে রবাদ্দ করার হয় ৭০ বছর আগে প্যালে যে কক্ষে থাকতেন সেই কক্ষটিই (5) । ধর্মতত্ত্বের সিলেবাসে ততদিনে অর্ন্তভুক্ত হয়ে যাওয়া প্যালির কাজ ডারউইনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বলেন,

“ইউক্লিডের রচনা আমাকে যেরকম মুগ্ধ করেছিল ঠিক সেরকম মুগ্ধ করেছিল প্যালের বই”(6)

পরবর্তীতে এই ডারউইনই প্যালের প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক জবাব দানের মাধ্যমে এই যুক্তিকে সমাধিস্থ করেন।

প্রাণীজগতে বিবর্তন হচ্ছে এই ব্যাপারটি প্রথম ডারউইন উপলব্ধি করেন নি। তৎকালীন অনেকের মধ্যেই ধারণাটি ছিল, তার মধ্যে ডারউইনের দাদা ইরাজমাস ডারউইন অন্যতম (7)। এপাশ ওপাশে ধারণা থাকলে বিবর্তন কেন ঘটছে এই প্রশ্নে এসেই আটকে গিয়েছিলেন তাদের সবাই। ১৮৫৯ সালে ডারউইন তার বই “দ্য অরিজিন অফ স্পেসিজ” প্রকাশ করেন (8)। ৪৯০ পাতার এই বইয়ে ডারউইন উপযুক্ত প্রমান দিয়ে ব্যাখ্যা করেন বিবর্তন কী, বিবর্তন কেন হয়, প্রাণীজগতে বিবর্তনের ভূমিকা কী। এই লেখায় বিবর্তন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য আমার নেই। কিন্তু সৃষ্টিবাদী বা ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন প্রবক্তাদের ভুল-ত্রুটি ব্যাখ্যা ও তাদের বক্তব্যের অসারতা সর্বোপরি প্রাণীর প্রাণী হবার পেছনে ঈশ্বরের হাতের অনস্তিত্ব প্রমানের আগে পাঠকদের বিবর্তন তত্ত্বের সাথে সংক্ষিপ্ত প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

প্রথমেই দেখে নেয়া যাক বিবর্তন কাকে বলে এবং এটি কিভাবে ঘটে।

বিবর্তন: বিবর্তন মানে পরিবর্তন। সময়ের সাথে সাথে জীবকূলের মাঝে পরিবর্তন আসে। প্রকৃতির বর্তমান অবস্থা , জীবাশ্মের রেকর্ড , জেনেটিক্স, আনবিক জীববিজ্ঞানের মত বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার গবেষণা থেকে এটি স্পষ্ট বোঝা গেছে। গাছ থেকে আপেল পড়ার মতোই বিবর্তন বাস্তব- এ নিয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই।

বৈচিত্র্যময় বংশধর সৃষ্টি: সাধারণ একটি পূর্বপুরুষ থেকে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা বিস্তারের মাধ্যমে বিবর্তন ঘটে। প্রতিটি শাখা-প্রশাখার জীব তার পূর্বপুরুষ থেকে খানিকটা ভিন্ন হয়। মনে রাখা উচিত বংশধরেরা কখনও হুবহু তাদের পিতামাতার অনুরূপ হয় না, প্রত্যেকের মাঝেই খানিকটা বৈচিত্র্য তথা ভ্যারিয়েশন বা প্রকরণ তৈরি হয়। আর এই বৈচিত্র্যের কারণেই সদা পরিবর্তনশীল পরিবেশে অভিযোজন নামক প্রক্রিয়াটি কাজ করতে পারে। অসংখ্য বৈচিত্র্যের মধ্যে পরিবেশে সবচেয়ে উপযোগীরাই টিকে থাকে।

ধীর পরিবর্তন: পরিবর্তন সাধারণত খুব ধীর একটি পক্রিয়া। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বিবর্তনের মাধ্যমেই নতুন প্রজাতির জন্ম হতে পারে।

প্রজাতির ক্রমবর্ধন (multiplication of speciation): এক প্রজাতি থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে অনেক নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটতে পারে। সে কারণেই আজকে আমরা প্রকৃতিতে এত কোটি কোটি প্রজাতির জীব দেখতে পাই। আবার অন্যদিকে যারা সদা পরিবর্তনশীল পারিপার্শ্বিকতার সাথে টিকে থাকতে অক্ষম তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রকৃতিতে প্রায় ৯০-৯৫% জীবই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

প্রাকৃতিক নির্বাচন: চার্লস ডারউইন এবং আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস স্বাধীনভাবে বিবর্তনের যে প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছিলেন তা এভাবে কাজ করে:

ক) জনসংখ্যা সদা সর্বদা জ্যামিতিক অনুপাতে কেবল বাড়তেই চায়।
খ) কিন্তু একটি প্রাকৃতিক পরিবেশে জনসংখ্যা সমসময় একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকতে হয়।
গ) সুতরাং পরিবেশে একটি “অস্তিত্বের সংগ্রাম” থাকতেই হবে। কারণ উৎপাদিত সকল জীবের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
ঘ) প্রতিটি প্রজাতিতেই বৈচিত্র্য তথা ভ্যারিয়েশন আছে।
ঙ) অস্তিত্বের নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চলার সময় যে প্রজাতির গুলোর মাঝে পরিবেশে টিকে থাকার জন্য অধিক উপযোগী বৈশিষ্ট্য আছে তারাই সর্বোচ্চ সংখ্যাক বংশধর রেখে যেতে পারে। আর যাদের মাঝে পরিবেশ উপযোগী বৈশিষ্ট্য কম তাদের বংশধরও কম হয়, আবার এক সময় তারা বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে। বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় “প্রভেদক প্রজননগত সাফল্য” (৯)।

শেষ পয়েন্টটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং এর মাধ্যমে ঘটা বিবর্তনীয় পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে ঘটে। সেই নির্দিষ্ট পরিবেশে কে সবচেয়ে বেশি বংশধর রেখে যাতে পারে তথা কে সবচেয়ে সফলভাবে নিজের জিনকে পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত করতে পারে, তার উপরই বিবর্তনের পক্রিয়া নির্ভর করে।বিবর্তনের কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই, প্রজাতির প্রগতি কোনদিকে হবে, বা এর মাধ্যমে আদৌ কোন কৌশলগত লক্ষ্য অর্জিত হবে কিনা এ সম্পর্কে প্রাকৃতিক নির্বাচনের কিছুই বলার নেই। এমনকি বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টি হতেই হবে বা বুদ্ধিমত্তা নামক কোনকিছুর বিবর্তন ঘটতেই হবে এমন কোন কথাও সে বলে না। বিবর্তনের কোন সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠে না, বা কোন পিরামিডের চূড়ায় উঠতে চায় না। এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে, মানুষ তৈরির জন্য এতকাল ধরে প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করেছে। বরং বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট অসংখ্য লক্ষ্যহীন শাখা-প্রশাখারই একটিতে মানুষের অবস্থান। তাই নিজেদের সৃষ্টির সেরা জীব বলে যে পৌরাণিক ধারণা আমাদের ছিল সেটারও কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কারণ সেরা বলে কিছু নেই, সর্বোচ্চ বলা যেতে পারে, মানুষ সবচেয়ে উন্নত মস্তিষ্কের অধিকারী, যেটা হয়তো টিকে থাকার জন্য আমাদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। আর মানুষের এতো উন্নতির পেছনেও মূল কারণ কিন্তু প্রভেদক প্রজননগত সাফল্য। আমরা অনেক বংশধরের জন্ম দিতে পারি এবং এমনকি তারা পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদের ভরণ পোষণও করতে পারি। এই বৈশিষ্ট্য কিন্তু উল্টো জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আবার আমাদের বিলুপ্তও করে দিতে পারে।

বিবর্তন শুধুই একটি তত্ত্ব নয়

বিবর্তনকে উদ্দেশ্য করে সৃষ্টিবাদীদের করা সবচেয়ে প্রচারিত সন্দেহ, বিবর্তন শুধুই একটি তত্ত্ব, এর কোনও বাস্তবতা নেই। সত্যিই কি তাই? বিজ্ঞানীরা বাস্তবে ঘটেনা, এমন কোনও কিছু নিয়ে কখনও তত্ত্ব প্রদান করেন না। বাস্তবতা কাকে বলে? কোন পর্যবেক্ষণ যখন বারংবার বিভিন্নভাবে প্রমানিত হয় তখন তাকে আমরা বাস্তবতা বা সত্য (fact) বলে ধরে নেই।
প্রাণের বিবর্তন ঘটছে। প্রতিটি প্রজাতি স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্টি করা হয়নি, বরঞ্চ প্রাণের উদ্ভবের পর থেকে প্রতি নিয়ত পরিবেশের বিভিন্ন প্রভাবের কারণে এক প্রজাতি বিবর্তিত হয়ে অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এইপরা রাতে ঘুমালো, সকালে উঠে দেখলো তারা সবাই হোমোসেপিয়েন্স এ রুপান্তরিত হয়ে গেছে- এমন না, এটি লক্ষ বছরে পরিবেশে টিকে থাকার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের ফসল। প্রজাতি এক রূপ থেকে আরেক রূপে বিবর্তিত হতে পারেনা, এটা এই যুগে এসে মনে করাটা পাপ, যখন দেখা যায়, চৈনিকরা যোগাযোগ খরচ বাচানোর জন্য গোল, গোল তরমুজকে চারকোণা করে ফেলেছে। কবুতর, কুকুরের ব্রিডিং সম্পর্কেও আমরা সবাই অবগত। মাত্র কয়েক প্রজন্মেই এক প্রজাতির কুকুর থেকে আরেক প্রজাতির উদ্ভব হয়, সেখানে পরিবেশ পেয়েছে লক্ষ- কোটি বছর। হোয়াই ইভুলিউশন ইজ ট্রু বইটিতে লেখক জেরি কোয়েন বলেন,
প্রতিদিন, কয়েকশত পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয় … এবং এদের প্রতিটি বিবর্তনের সত্যতা নিশ্চিত করে। খুঁজে পাওয়া প্রতিটি জীবাশ্ম, সিকোয়েন্সকৃত প্রতিটি ডিএনএ প্রমান করে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিটি প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রাক ক্যাম্বরিয়ান শিলায় আমরা স্তন্যপায়ী কোনও প্রাণীর জীবাশ্ম পাইনি, পাইনি পাললিক শিলার একই স্তরে মানুষ এবং ডাইনোসরের জীবাশ্ম। লক্ষাধিক সম্ভাব্য কারণে বিবর্তন ভুল প্রমানিত হতে পারতো, কিন্তু হয়নি- প্রতিটি পরীক্ষায় সে সাফল্যের সাথে প্রমানিত হয়েছে।

সুতরাং আমাদের পর্যবেক্ষণলব্ধজ্ঞানের মাধ্যমে আমরা জানি বিবর্তন ঘটে এটি একটি বাস্তবতা। এখন পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞানকে ব্যাখ্যা করার জন্যই প্রয়োজন হয় বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের। যেমনঃ গাছ থেকে আপেল পড়ে, এটি একটি বাস্তবতা, একে ব্যাখ্যা করা হয় নিউটনের মহার্কষ তত্ত্ব দ্বারা। তত্ত্ব কোনও সাধারণ বাক্য নয়, বাস্তবতার ব্যখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে একটি হাইপোথিসিস বা অনুমিত তত্ত্ব দাঁড় করান। পরবর্তীতে এই অনুমিত তত্ত্বকে অন্যান্য বৈজ্ঞানিক সূত্রের মাধ্যমে আঘাত করা হয়। যদি সকল আঘাত থেকে যুক্তিযুক্ত ভাবে একটি অনুমিত তত্ত্ব বেঁচে ফিরতে পারে এবং যখন প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ প্রমান একে সমর্থন করে তখন একে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব উপাধি দেওয়া হয়। বিবর্তনকে যে তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়, তার নাম ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব’।

প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব নিয়ে ডারউইন একদিকে যেমন নিঃসংশয় ছিলেন অপরদিকে ছিলেন দ্বিধাগ্রন্থ। কারণ লক্ষ- কোটি প্রজাতির মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট একটি প্রজাতির এই তত্ত্বের বাইরে উদ্ভব হওয়া এই তত্ত্বকে বাতিল করে দিতে যথেষ্ট। দীর্ঘ বিশ বছর বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহের পর একটি বিশেষ ঘটনার কারণে ডারউইন ১৮৫৮ সালে তত্ত্বটি প্রকাশ করেন (10)। তারপর থেকেই বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানীদের ছুরির নীচে। গত দেড়শ বছর ধরে বিভিন্ন ভাবে বিবর্তন তত্ত্বকে পরীক্ষা করা হয়েছে, এটি কখনওই ভুল প্রমানিত হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রতিটা নতুন ফসিল আবিষ্কার বিবর্তন তত্ত্বের জন্য একটি পরীক্ষা। একটি ফসিলও যদি বিবর্তনের ধারার বাইরে পাওয়া যায় সেই মাত্র তত্ত্বটি ভুল বলে প্রমানিত হবে। একবার বিজ্ঞানী জেবি এস হালডেনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কিভাবে বিবর্তনকে ভুল প্রমাণ করা যায়? উত্তরে হালডেন বলেছিলেন,(11)

কেউ যদি প্রক্যাম্বরিয়ান যুগে খরগোশের ফসিল খুঁজে পায়।

বলা বাহুল্য এ ধরনের কোন ফসিলই এ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয় নি। না হওয়ারই কথা, কারণ বিজ্ঞানীরা বিবর্তনের যে ধারাটি আমাদের দিয়েছেন তা হল :

মাছ –> উভচর –> সরীসৃপ –> স্তন্যপায়ী প্রানী।

খরগোশ যেহেতু একটি পুরোপুরি স্তন্যপায়ী প্রাণী, সেহেতু সেটি বিবর্তিত হয়েছে অনেক পরে এবং বিভিন্ন ধাপে (মাছ থেকে উভচর, উভচর থেকে সরিসৃপ এবং সরিসৃপ থেকে শেষ পর্যন্ত খরগোশ), তাই এতে সময় লেগেছে বিস্তর। প্রাক ক্যাম্বরিয়ান যুগে খরগোশের ফসিল পাওয়ার কথা নয়, কারণ বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী এ সময় (প্রিক্যাম্বরিয়ান যুগে) থাকার কথা কতকগুলো আদিম সরল প্রাণ – যেমন নিলাভ সবুজ শৈবাল, সায়নোব্যকটেরিয়া ইত্যাদি (ফসিল রেকর্ডও তাই বলছে)। আর স্তন্যপায়ী প্রাণীর উদ্ভব ঘটেছে ট্রায়োসিক যুগে (প্রিক্যাম্বরিয়ান যুগ শেষ হওয়ার ৩০ কোটি বছর পরে)। কাজেই কেউ সেই প্রিক্যাম্বরিয়ান যুগে খরগোশের ফসিল খুঁজে পেলে তা সাথে সাথেই বিবর্তনতত্ত্বকে নস্যাৎ করার জন্য যথেষ্ট হত।

তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অনুমান করা। যার মাধ্যমে এটিকে ভুল প্রমানের সুযোগ থাকে। আধুনিক পিঁপড়াদের পূর্বপুরুষের ফসিল কোথা থেকে পাওয়া যাবে সেইটা বিবর্তন তত্ত্ব দিয়ে অনুমান করে সত্যতা যাচাই করা হয়েছে। ডারউইন নিজেই বলে গিয়েছিলেন,মানুষের পূর্বপুরুষের জীবাশ্মের সন্ধান মিলবে আফ্রিকায় এবং জীবাশ্মবিজ্ঞানীরা সন্ধান পেয়েছেন এমন অনেক জীবাশ্মের। একটি অনুমানও যদি ভুল হতো তাহলে আমরা নিমেষেই বিবর্তনকে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারতাম, কিন্তু হয়নি। তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ন সকল অনুমানের তালিকা পাওয়া যাবে এখনে- //tinyurl.com/4bh3n

তবে এতসব কিছুর মধ্যে আমার প্রিয় একটি উদাহরণ। ডারউইনের তত্ত্ব মতে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাজ করতে হাজার হাজার কোটি কোটি বছরের প্রয়োজন। কিন্তু বই প্রকাশের সময়ও সকল মানুষ বাইবেলীয় ব্যাখা অনুযায়ী মনে করতো, পৃথিবীর বয়স মোটে ছয় হাজার বছর। ১৮৬৬ সালে বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী উইলিয়াম থমসন (পরবর্তী লর্ড কেলভিন উপাধিতে ভূষিত) বিবর্তন তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসেন। থমসন রাসায়নিক শক্তি এবং মাধ্যাকর্ষণ এই দুইটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আলাদা আলাদাভাবে সূর্যের বয়স নির্ধারণ করে দেখান, মাধ্যাকর্ষণ বল ব্যবহার করলে সূর্যের বয়স সবচেয়ে বেশী পাওয়া যায় এবং সেটাও কিনা হচ্ছে মাত্র কয়েক’শ লক্ষ বছর। এছাড়াও তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র ব্যবহার করে থমসন এটাও প্রমান করেন যে,মাত্র কয়েক লক্ষ বছর আগেও পৃথিবীর তাপমাত্রা এতই বেশী ছিল যে সেখানে কোনরকম প্রাণের উৎপত্তি ঘটা ছিল একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। তার সুতরাং বিবর্তন হবার কারণ হিসেবে ডারউইন যে প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং এটির যে কোটি বছরের ক্রিয়াকালের কথা বলছেন,তা অবাস্তব।

মজার ব্যাপার হলো,সেই সময় নিউক্লিয়ার শক্তি সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলে পদার্থবিজ্ঞানীরা। বিংশ শতকের প্রথমদিকে শক্তির এই রূপ আবিষ্কার হবার পর বিজ্ঞানী বুঝতে পারলেন,ক্রমাগত নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে সূর্য এবং সকল তারা কোটি বছরেরও বেশি সময় একটি সুস্থিত শক্তির উৎস হিসেবে বিদ্যমান থাকে। সুতরাং কেলভিন বুঝতে পারলেন, সূর্য এবং পৃথিবীর বয়স নির্ধারণের জন্য তার করা হিসেবটি ভুল। তিনি আনন্দের সাথে বিবর্তন তত্ত্বের উপর চ্যালেঞ্জ প্রত্যাহার করে নেন। সুতরাং বিবর্তন তত্ত্বকে এমন একটি শক্তির উৎসের অনুমানদাতাও বলা যায়! (12) উল্লেখ্য বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে পৃথিবীর নির্ভূল বয়স নির্ধারণ করা হয়, যা প্রায় সাড়ে চারশ’ কোটি বছর।

বিবর্তনের সত্যতাঃ

সত্যতা প্রমান করা যায় সবদিক দিয়েই, তবে এইখানে আমরা মানুষের বিবর্তন নিয়েই আলোচনা করে দেখি বিবর্তন তত্ত্বের দাবীরা কতোটা সঠিক। বিবর্তনের প্রমান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ফসিল রেকর্ডকেই ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু আনবিক জীববিদ্যা এবং কোষবংশগতিবিদ্যা উদ্ভাবনের পর এখন আর ফসিল রেকর্ডের কোন দরকার নেই। জীনতত্ত্ব দিয়েই চমৎকারভাবে বলে দেওয়া যায় আমাদের বংশগতিধারা। জীববিজ্ঞানের এই শাখাগুলোর মাধ্যমে, আমাদের পূর্বপুরুষ কারা ছিল, তাদের বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল, দেখতে কেমন ছিল তারা সব নির্ণয় করা হয়েছে। দেখা গেছে ফসিল রেকর্ডের সাথে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছে সেটা।

জীববিজ্ঞানীরা আমাদের পূর্বপুরুষের যেই ধারাটা দিয়েছেন সেটা হলোঃ

মানুষ –> নরবানর –>পুরোন পৃথিবীর বানর –> লেমুর

প্রমান একঃ

রক্তকে জমাট বাঁধতে দিলে একধরণের তরল পদার্থ পৃথক হয়ে আসে, যার নাম সিরাম। এতে থাকে এন্টিজেন। এই সিরাম যখন অন্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করানো হয় তখন উৎপন্ন হয় এন্টিবডি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মানুষের সিরাম যদি আমরা খরগোশের শরীরে প্রবেশ করাই তাহলে উৎপন্ন হবে এন্টি হিউমান সিরাম। যাতে থাকবে এন্টিবডি। এই এন্টি হিউমান সিরাম অন্য মানুষের শরীরে প্রবেশ করালে এন্টিজেন এবং এন্টিবডি বিক্রিয়া করে অধঃক্ষেপ বা তলানি উৎপন্ন হবে। যদি একটি এন্টি হিউমান সিরাম আমরা যথাক্রমে নরবানর, পুরোন পৃথিবীর বানর, লেমুর প্রভৃতির সিরামের সাথে মেশাই তাহলেও অধঃক্ষেপ তৈরী হবে। মানুষের সাথে যে প্রানীগুলোর সম্পর্কের নৈকট্য সবচেয়ে বেশি বিদ্যমান সেই প্রানীগুলোর ক্ষেত্রে তলানির পরিমান বেশি হবে, যত দূরের তত তলানীর পরিমান কম হবে। তলানীর পরিমান হিসেব করে আমরা দেখি, মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি তলানী পাওয়া যাচ্ছে, নরবানরের ক্ষেত্রে আরেকটু কম, পুরানো পৃথিবীর বানরের ক্ষেত্রে আরেকটু। অর্থাৎ অনুক্রমটা হয়-

মানুষ- নরবানর- পুরোন পৃথিবীর বানর- লেমুর।

অঙ্গসংস্থানবিদদের মতে উল্লিখিত প্রাণীদের মধ্যে সর্বাধিক আদিম হচ্ছে লেমুর, আর সবচেয়ে নতুন প্রজাতি হচ্ছে মানুষ। তাই মানুষের ক্ষেত্রে তলানির পরিমাণ পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি আর লেমুরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম। দেখা যাচ্ছে বিবর্তন যে অনুক্রমে ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়েছে রক্তরস বিজ্ঞানের ‘অ্যান্টিজেন এন্টিবডি’ বিক্রিয়াও সে ধারাবাহিকতাকেই সমর্থন করে।

প্রমান দুইঃ

চোখ মেলে তাকিয়ে দেখুনঃ

১। প্রকৃতিতে মাঝে মাঝেই লেজ বিশিষ্ট মানব শিশু জন্ম নিতে দেখা যায়। এছাড়াও পেছনে পা বিশিষ্ট তিমি মাছ, ঘোড়ার পায়ে অতিরিক্ত আঙ্গুল কিংবা পেছনের ফিন যুক্ত ডলফিন সহ শরীরে অসংগতি নিয়ে প্রাণীর জন্মের প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায়। এমনটা কেন হয়। এর উত্তর দিতে পারে কেবল বিবর্তন তত্ত্বই। বিবর্তনের কোন এক ধাপে অংগ লুপ্ত হয়ে গেলেও জনপুঞ্জের জীনে ফেনোটাইপ বৈশিষ্ট্য হিসেবে ডিএনএ সেই তথ্য রেখে দেয়। যার ফলে বিরল কিছু ক্ষেত্রে তার পূনঃপ্রকাশ ঘটে।

২। বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী পুর্ব বিকশিত অংগ-প্রত্যঙ্গ থেকেই নতুন অঙ্গের কাঠামো তৈরির হয়। বিভিন্ন মেরুদন্ডী প্রাণীর সামনের হাত বা অগ্রপদের মধ্যে তাই লক্ষ্যনীয় মিল দেখা যায়! ব্যাঙ, কুমীর, পাখি, বাদুর, ঘোড়া, গরু, তিমি মাছ এবং মানুষের অগ্রপদের গঠন প্রায় একই রকম।

৩। পৃথিবীতে অগুনিত প্রজাতি থাকলেও সবচে মজার ব্যাপার হলো, ভেতরে আমরা সবাই প্রায় একই। আমরা সবাই “কমন জিন” শেয়ার করে থাকি। পূর্বপুরুষের সাথে যত বেশি নৈকট্য বিদ্যমান, শেয়ারের পরিমানও তত বেশি। যেমন, শিল্পাঞ্জি আর আধুনিক মানুষের ডিএনএ শতকরা ৯৬% একই, কুকুর আর মানুষের ক্ষেত্রে সেটা ৭৫% আর ড্যাফোডিল ফুলের সাথে ৩৩%।

৪। চারপাশ দেখা হলো। এবার আসুন একবার নিজেদের দিকে তাকাই।

ক) ত্রয়োদশ হাড়ঃ বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ভর্তি হবার সুযোগ পেলো আমার এক বন্ধু। বাক্স পেটরা বন্দী করে সে চলে গেল ট্রেনিং এ চট্রগ্রামের ভাটিয়ারিতে। ছয় সপ্তাহ ডলা খাবার পর মিলিটারি একাডেমির নিয়ম অনুযায়ী একটি ফাইনাল মেডিক্যাল পরীক্ষা হয়। সেই পরীক্ষায় আমার বন্ধুর দেহ পরীক্ষা করে দেখা গেলো, তার পাঁজরে এক সেট হাড় বেশি। আধুনিক মানুষের যেখানে বারো সেট হাড় থাকার কথা আমার বন্ধুর আছে তেরোটি। ফলস্বরূপ তাকে মিলিটারি একাডেমির প্রশিক্ষণ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।
পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া যায়, পৃথিবীর আটভাগ মানুষের শরীরে এই ত্রয়োদশ হাড়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যেটি কিনা গরিলা ও শিল্পাঞ্জির শারিরিক বৈশিষ্ট্য। মানুষ যে, এক সময় প্রাইমেট থেকে বিবর্তিত হয়েছে এই আলামতের মাধ্যমে সেটিই বোঝা যায়।

খ) লেজের হাড়ঃ মানুষের আদি পূর্বপুরুষ প্রাইমেটরা গাছে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য লেজ ব্যবহার করতো। গাছ থেকে নীচে নেমে আসার পর এই লেজের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। কিন্তু আমাদের শরীরে মেরুদন্ডের একদম নীচে সেই লেজের হাড়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

গ) আক্কেল দাঁতঃ পাথুরে অস্ত্রপাতি আর আগুনের ব্যবহার জানার আগে মানুষ মূলতঃ নিরামিশাষী ছিলো। তখন তাদের আক্কেল দাঁতের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও আমাদের তা নেই, যদিও আক্কেল দাঁতের অস্তিত্ব এখনও রয়ে গেছে।

ঘ) অ্যাপেন্ডিক্সঃ আমাদের পূর্বপুরুষ প্রাইমেটরা ছিল তৃনভোজি। তৃণজাতীয় খাবারে সেলুলোজ থাকে। এই সেলুলোজ হজম করার জন্য তাদের দেহে এপেনডিক্সে বেশ বড় ছিল। ফলে সিকামে প্রচুর পরিমান ব্যাকটেরিয়ার থাকতে পারতো যাদের মূল কাজ ছিল সেলুলোজ হজমে সহায়তা করা। সময়ের সাথে আমাদের পূর্বপুরুষদের তৃনজাতীয় খাবারের উপর নির্ভরশীলতা কমতে থাকে, তারা মাংসাশী হতে শুরু হলে। আর মাংসাশী প্রাণীদের অ্যাপেন্ডিক্সের কোন প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন বৃহৎ পাকস্থলীর। ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট অ্যাপেন্ডিক্স এবং বড় পাকস্থলীর প্রাণীরা সংগ্রামে টিকে থাকার সামর্থ লাভ করে, হারিয়ে যেতে থাকে বাকিরা। পূর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সেই অ্যাপেন্ডিক্স আমরা এখনও বহন করে চলছি।

ঙ) গায়ের লোম: মানুষকে অনেক সময় ‘নগ্ন বাঁদর’ বা ‘নেকেড এপ’ নামে সম্বোধন করা হয়। আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেই লোমশ শরীরের অস্তিত্ব দেখা যায় এখনো। আমরা লোমশ প্রাইমেটদের থেকে বিবর্তিত হয়েছি বলেই এই আলামত এখনো রয়ে গেছে।

প্যালের চোখ

বিবর্তনতত্ত্বের সমালোচনাকারীরা সবচেয়ে বেশি আঙুল তুলেছেন মানুষের চোখের দিকে। চোখের মতো এমন নিখুঁত এবং জটিল একটি যন্ত্র কিভাবে দৈব পরিবর্তন (র্যা ন্ডম মিউটেশন), প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যেমে সৃষ্টি হতে পারে? হোকনা শত সহস্র বছর।

একটি ক্যামেরার মতো চোখেরও আলোকরশ্মি কেন্দ্রীভূত করার জন্য লেন্স, আলোকরশ্মির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইরিস, আর এই আলোকরশ্মি থেকে ছবি আবিষ্কার করার জন্য একটি ফোটোরিসেপ্টর প্রয়োজন। এই তিনটি যন্ত্রাংশ একসাথে কাজ করলেই কেবলমাত্র চোখ দিয়ে কিছু দেখা সম্ভব হবে। যেহেতু বিবর্তন তত্ত্বমতে, বিবর্তন প্রক্রিয়া চলে স্তরে স্তরে- তাহলে লেন্স, রেটিনা, চোখের মণি সবকয়টি একসাথে একই ধরনের উৎকর্ষ সাধন করলো কীভাবে? বিবর্তন সমালোচনাকারীদের প্রশ্ন এটাই।

ক্যাম্বরিয়ান যুগে শরীরের উপর আলোক সংবেদনশীল ছোট একটি স্থানবিশিষ্ট প্রাণীরা আলোর দিক পরিমাপের মাধ্যমে ঘাতক প্রাণীদের হাত থেকে বেঁচে যাবার অতি সামান্য সুযোগ পেত। সময়ের সাথে সাথে এই রঙিন সমতল স্থানটি ভেতরের দিকে ডেবে গিয়েছে, ফলে তাদের দেখার ক্ষমতা সামান্য বেড়েছে। গভীরতা বাড়ার পাশাপাশি পরবর্তীতে আলো ঢোকার স্থান সরু হয়েছে। অর্থাৎ দেখার ক্ষমতা আরও পরিষ্কার হয়েছে। প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তন প্রানীকে সামান্য হলেও টিকে থাকার সুবিধা দিয়েছে।
সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যান এরিক নিলসন গবেষণার মাধ্যমে বের করে দেখান যে, কীভাবে কোনও প্রাণীর শরীরের উপর আলোক সংবেদনশীল ছোট এবং রঙিন স্থান পরবর্তীতে মানুষের চোখের মতো জটিল যন্ত্রে পরিবর্তিত হতে পারে।

উপরের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন। একটি অন্ধকার রুম। পেছনে একটি বাতি জ্বলছে। সবচেয়ে বামে একটি সমতল কাগজ লাগানো। যার মাধ্যমে আমরা শুধু বুঝতে পারছি আলো আছে। কিন্তু কোথা থেকে আলো বের হচ্ছে কিংবা বাতিটি কোথায় তেমন কিছুই জানা যাচ্ছে না। তারপরের পিংপং বলটিতে আলো প্রবেশের স্থানটি চওড়া আর গভীরতা কম। তারপরেরটায় স্থানটি আগেরটার চেয়ে সংকুচিত এবং গভীরতা বেশি। সর্ব ডানেরটায় আলো প্রবেশের স্থান সবচেয়ে সংকুচিত এবং গভীরতা সবচেয়ে বেশি। আর এটি দিয়েই আমরা সবচেয়ে ভালোভাবে আলোটির উৎস বুঝতে পারছি।

এখন প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি পরিবর্তনই প্রাণীকে কিঞ্চিৎ হলেও আক্রমণকারীর হাত থেকে বাঁচার সুবিধা প্রদান করেছে। যারা সামান্য দেখতে পাচ্ছে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে, বেড়েছে তাদের সন্তান বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনা। অপরদিকে অর্থবরা হারিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে বংশানুক্রমে উন্নতি হয়েছে দৃষ্টিশক্তির। সময়ের সাথে সাথে শুরুর এই আলোক সংবেদনশীল স্থান রেটিনায় পরিণত হয়েছে, সামনে একটি লেন্সের সৃষ্টি হয়েছে।

ধারনা করা হয়, প্রাকৃতিক ভাবে লেন্সের সৃষ্টি হয়েছে যখন চোখকে পূর্ণকরে রাখা স্বচ্ছ তরলের সময়ের সাথে সাথে ঘনত্ব বেড়েছে। ছবিতে দেখুন সাদা অংশটি তৈরি হচ্ছে চোখকে পূর্ণ করে রাখা স্বচ্ছ তরলের মাধ্যমে। তরলের ঘনত্ব যত বেড়েছে লেন্সের গঠন ততো ভালো হয়েছে, দৃষ্টিশক্তি প্রখর হয়েছে।

স্বচ্ছ তরলে পরিপূর্ণ।

স্বচ্ছ তরলে পরিপূর্ণ।

তরল ঘন হচ্ছে

তরল ঘন হচ্ছে

ঘন হতে হতে লেন্সের সৃষ্টি

ঘন হতে হতে লেন্সের সৃষ্টি

বলে রাখা প্রয়োজন বিজ্ঞানীদের তৈরি করা চোখের বিবর্তনের প্রতিটি স্তর বর্তমানে জীবিত প্রাণীদের মধ্যেই লক্ষ করা যায়। এছাড়াও শুধুমাত্র আলোক সংবেদনশীল স্থান বিশিষ্ট প্রাণী ছিল আজ থেকে ৫৫ কোটি বছর আগে। বিজ্ঞানীরা গণনা করে বের করেছেন, এই আলোক সংবেদনশীল স্থানটি মানুষের চোখের মতো হবার জন্য সময় প্রয়োজন মাত্র ৩৬৪ হাজার বছর।

ডিজাইন না ব্যাড ডিজাইনঃ

মানুষের চোখের অক্ষিপটের ভেতরে একধরনের আলোগ্রাহী কোষ আছে যারা বাইরের আলো গ্রহণ করে এবং তারপর একগুচ্ছ অপটিক নার্ভের (আলো গ্রাহী জাল) মাধ্যমে তাকে মস্তিষ্কে পৌঁছোনোর ব্যবস্থা করে, ফলে আমরা দেখতে পাই। কিন্তু মজার ব্যপার হলো, অক্ষিপটের ঠিক সামনে এই স্নায়ুগুলো জালের মত ছড়ানো থাকে, সাথে সাথে এই স্নায়ুগুলোকে যে রক্তনালীগুলো রক্ত সরবরাহ করে তারাও আমাদের অক্ষিপটের সামনেই বিস্তৃত থাকে। ফলে আলো বাধা পায় এবং আমাদের দৃষ্টিশক্তি কিছুটা হলেও কমে যায়। স্নায়ুগুলোর এই অসুবিধাজনক অবস্থানের কারণে আমাদের চোখে আরেকটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। স্নায়বিক জালটি মস্তিষ্কে পৌঁছোনোর জন্য অক্ষিপটকে ফুটো করে তার ভিতর দিয়ে পথ করে নিয়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে একটি অন্ধবিন্দুর (blind spot)(13)

কুকুর, বিড়াল কিংবা ঈগলের দৃষ্টিশক্তি যে মানুষের চোখের চেয়ে বেশি তা সবাই জানে। মানুষ তো বলতে গেলে রাতকানা, কিন্তু অনেক প্রাণীই আছে রাতে খুব ভাল দেখতে পায়। আবার অনেক প্রাণীই আছে যাদের চোখে কোনও অন্ধবিন্দু নেই। যেমন, স্কুইড বা অক্টোপাস। এদের মানুষের মতই একধরনের লেন্স এবং অক্ষিপটসহ চোখ থাকলেও অপটিক নার্ভগুলো অক্ষিপটের পেছনে অবস্থান করে এবং তার ফলে তাদের চোখে কোনও অন্ধবিন্দুর সৃষ্টি হয়নি।
মানুষের চোখের এই সীমাবদ্ধতাকে অনেকেই “ব্যাড ডিজাইন” বলে অভিহিত করে থাকেন। অবশ্য যেহেতু চোখ দিয়ে ভালোভাবেই কাজ চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে তাই “ব্যাড ডিজাইন” এর মতো শব্দ প্রয়োগে নারাজ জীববিজ্ঞানী কেনেথ মিলার। তারমতে, চোখের এমন হবার কারণ বিবর্তন তত্ত্ব দিয়ে বেশ ভালো ভাবে বোঝা যায় (14)। বিবর্তন কাজ করে শুধুমাত্র ইতোমধ্যে তৈরি বা বিদ্যমান গঠনকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে, সে নতুন করে কিছু সৃষ্টি বা বদল করতে পারে না। মানুষের মত মেরুদণ্ডি প্রাণীর চোখ সৃষ্টি হয়েছে অনেক আগেই সৃষ্টি হওয়া মস্তিষ্কের বাইরের দিকের অংশকে পরিবর্তন করে। বহুকাল ধরে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের বাইরের দিক আলোক সংবেদনশীল হয়েছে, তারপর ধীরে ধীরে অক্ষিপটের আকার ধারণ করেছে। যেহেতু মস্তিষ্কের পুরোনো মূল গঠনটি বদলে যায়নি, তাই জালের মত ছড়িয়ে থাকা স্নায়ুগুলোও তাদের আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে। কিন্তু অন্যদিকে স্কুইড জাতীয় প্রাণীর চোখ বিবর্তিত হয়েছে তাদের চামড়ার অংশ থেকে, মস্তিষ্কের অংশ থেকে নয়। এক্ষেত্রে ত্বকের স্নায়ুগুলো মস্তিষ্কের মত ঠিক বাইরের স্তরে না থেকে ভেতরের স্তরে সাজানো থাকে, আর এ কারণেই স্নায়ুগুলো চোখের অক্ষিপটের সামনে নয় বরং পেছনেই রয়ে গেছে। চোখের ক্ষেত্রে তাই গুড ডিজাইন বা ব্যাড ডিজাইন তর্ক অপ্রাসংগিক। এটাকে তো ডিজাইনই করা হয়নি।
বিবর্তনের পথে অনন্ত চল্লিশ রকম ভাবে চোখ তৈরী হতে পারতো (15)। আলোকরশ্মী সনাক্ত এবং কেন্দীভূত করার আটটি ভিন্ন উপায়ের সন্ধান দিয়েছেন নিউরো-বিজ্ঞানীরা (16)। কিন্তু পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের যুদ্ধে অসংখ্য সমাধান মধ্যে একটি সমাধান টিকে গিয়েছে। সংক্ষেপে, চোখের গঠন যদি বাইরের কারও হস্তক্ষেপ ব্যতিত, শুধুমাত্র বস্তুগত প্রক্রিয়ায় উদ্ভব হতো তাহলে দেখতে যেমন হবার কথা ছিল ঠিক তেমনই হয়েছে। চোখের গঠনে কারও হাঁত নেই, নেই কোনও মহাপরাক্রমশালী নকশাকারকের নিপুনতা।

আগামী পর্বগুলোয় যা থাকবেঃ

বিহের হ্রাস অযোগ্য জটিলতা, অসম্ভব্যতা, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক নির্বাচন, সেলফ অর্গানাইযেশন, আদম- হাওয়া কাহিনী ও নূহের মহাপ্লাবন।

তথ্যসূত্রঃ

১। Irreligion: A Mathematician Explains Why the Arguments for God Just Don’t Add Up – John Allen Paulos। পৃষ্ঠা নং ১০

২। একই বই, পৃষ্ঠা নং ১১

৩। ডারউইন দিবসে রিচার্ড ডকিন্স পরিচিতি- অভিজিৎ রায় //mukto-mona.com/banga_blog/?p=5042

৪। Natural Theology, or Evidence of Existence and Attributes of the Deity, collected from the Appearances of Nature (London: Halliwell, 1802)

৫। Before Darwin: Reconciling God and Nature (New Haven and London: Yale University Press, 2005), পৃষ্ঠা নং ২০

৬। একই বই, পৃষ্ঠা নং ৬

৭। বিবর্তনের সাক্ষ্যপ্রমাণ- ১ (জেরি কোয়েন –এর ‘বিবর্তন কেন বাস্তব’ অবলম্বনে), ইরতিশাদ। //mukto-mona.com/banga_blog/?p=5649

৮। The Origin of Species by Means of Natural Selection (London: John Murray, 1859)

৯। Why People Believe in Weird Things, তৃতীয় অধ্যায়, পৃষ্ঠা নং ১৪০

১০। GOD: The Failed Hypothesis, Victor Stenger, পৃষ্ঠা নং ৪৯

১১। এক বিবর্তনবিরোধীর প্রত্যুত্তরে, অভিজিৎ রায়, //mukto-mona.com/banga_blog/?p=936

১২। GOD: The Failed Hypothesis, Victor Stenger, পৃষ্ঠা নং ৫১

১৩। The Blind Watchmaker: Why the Evidence of Evolution reveals a Universe Without Design, Richard Dawkins (London, New York,: Norton, 1987) পৃষ্ঠা নং ৯৩

১৪। “Life’s Grand Design”, Kenneth R. Miller, পৃষ্ঠা নং ২৪-৩২

১৫। Climbing Mount Improbable, Richard Dawkins, চ্যাপ্টার “The Fortyfold Path to Enlightenment”

১৬। “Evolution of Eyes, Current Opinion in Neurobiology”, R. D. Fernald, পৃষ্ঠা নং ৪৪৪-৫০

৪,৬০৮ বার দেখা হয়েছে

৩৫ টি মন্তব্য : “নির্ধর্মকথা- এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল, মিঠা নদীর পানি (১/৩)”

  1. রকিব (০১-০৭)

    আবীরদা, একটা টাইপো (শিউর না! 🙁 ); সম্ভবত শিরোনামের 'নির্ধর্মকথা' এর বদলে নির্মকথা হবে।
    অর্ধেকটা পড়েছি। বাকীটা খানিকটা পরে পড়বো; না হলে বুঝতে সমস্যা হবে আমার 😕 ।
    অফটপিকঃ পোষ্ট-বহির্ভূত একটা প্রশ্ন। আইনস্টাইনের একটা উক্তি পড়েছিলাম,

    Science without religion is lame, religion without science is blind.

    এটা দিয়ে তিনি আসলে কি বুঝাতে চেয়েছিলেন কিংবা কতটুকুই বা তা যুক্তিসঙ্গত?


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
    • রায়হান আবীর (৯৯-০৫)

      টাইপো না। হয় নিঃধর্ম, এইটা না লিখলে নির্ধর্ম 🙂

      আইনস্টাইন প্রসংগে আসি। উনি গতানুগতিক (আব্রাহামিক গড) ঈশ্বর, ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না। তবে নানা জায়গায় উনি গড এবং রিলিজিয়ন শব্দটা ব্যবহার করে উক্তি দিয়েছিলেন। তাঁকে এই গডের মানে কী জিজ্ঞেস করা হলে উনি বলেছিলেন, "god of Spinoza" তে বিশ্বাস করার কথা। যেটা ইউনিভার্সের স্ট্রাকচার আর অর্ডারের একটা মেটাফোর। এই ডকট্রিন কে প্যানথিয়েজম নামে ডাকা হয়। প্যানথিয়েজম বাস্তবতার যোগফলকে "গড" নাম দিয়ে থাকে। ইহুদীরা একেশ্বরবাদী হবার আগে এইরকমই ছিল।

      ডকিন্স গড ডিলুশ্যনের প্রথম চ্যাপ্টারে আইনস্টানকে নিয়ে বেশ ভালো করে লিখছে। কোট করি,

      It is commonly held to mean that science and religion cannot be independent of each other, one cannot function without the other. Einstein's bias is towards science, as the quote implies that whilst science is weakened without understanding of religion (it is lame, or crippled) religion without science is blind (therefore without evidence, untrue, without reason). It is a quote oft cited as evidence that Einstein was religious yet this was not the case. Here he argues against dogma of any kind. For example he also said: "The idea of a personal God is quite alien to me and seems even naive".

      Richard Dawkins "The God Delusion" pg.36-41

      জবাব দিন
  2. আশহাব (২০০২-০৮)

    আবীর ভাই, পুরাটাই পড়লাম, তবে আবার পড়তে হবে মনে হচ্ছে 😕 কেমন যেন গোলায়ে ফেলতেসি 🙁
    অফটপিক : রকিব ভাইয়ের প্রশ্নটার সাথে সহমত ? এটা দিয়ে উনি আসলে কি বুঝাতে চেয়েছিলেন?

    জবাব দিন
  3. আন্দালিব (৯৬-০২)

    এই পর্বের কিছু কিছু অংশ কি আগের একটা পোস্টে ছিলো?

    আমি সময় নিয়ে পড়লাম। গুছানো লেখা। এবং সেইসাথে অনেক নির্মোহ। আমার মনে হয় কি, তুমি যদি এভাবে, এই ভাষা-ভঙ্গিতে লেখালেখি করো, সেটা খুব কার্যকর একটা অ্যাপ্রোচ হবে।

    পোস্ট সংক্রান্ত একটা জিজ্ঞাসা। মানুষের বিবর্তনের যে প্রচলিত ধারা, সেটার মতই আরেকটা মতবাদ (প্রমাণিত কী না জানি না) শুনেছি সম্প্রতি। সেটা হলো মানুষ জলজ প্রাণী থেকে সরাসরি বিবর্তিত হয়েছে। প্রাণীর বাসস্থানের প্রচলিত ধারাকে (জল>স্থল>গাছ>স্থল) সেই মতবাদে নাকচ করে দেয়া হয়। এর পেছনে একটা বড়ো যুক্তি হলো ত্বকের লোমহীনতা, জন্মের পরে শিশুর সাঁতারের স্বাভাবিক ক্ষমতা (যা আমরা অনভ্যাসে ভুলে যাই, চলন শেখার পরে আবার শিখতে হয়!) ইত্যাদি এবং আরো কিছু চিহ্ন। এই বিষয়ে একটা ভিডিও পেয়েছি, দেখতে পারো।

    //www.youtube.com/watch?v=gwPoM7lGYHw

    জবাব দিন
    • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

      বিষয়টা আমিও জানতাম না আন্দালিব ভাই। এটাকে "অ্যাকুয়াটিক এইপ হাইপোথিসিস" বলে। এটার মূল প্রবক্তা এলেইন মরগ্যান যিনি আসলে পেশাদার বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞানী নন। তার কথার পেছনে যুক্তি থাকলেও যা বুঝলাম তার এই অনুকল্প বৈজ্ঞানিক মহলে গৃহীত হয়নি এখনও। সুতরাং এ নিয়ে খুব একটা ভাবার কিছু নেই। আসলে সাধারণ গ্রেট এইপ থেকে মানুষের বিবর্তনের পথটা এখন অনেকটাই পরিষ্কার, বিশেষ করে আর্ডি আবিষ্কারের পর। তাই অ্যাকুয়াটিক এইপ অনুকল্পের গ্রহণযোগ্যতা আরও হ্রাস পাওয়ার কথা। উইকির এই লাইন দুটো দেখতে পারেন (রেফারেন্স যুক্ত আছে উইকিতে)

      While it is uncontroversial that both H. neanderthalensis and early H. sapiens were better suited to aquatic environments than other great apes, and there have been theories suggesting protohumans underwent some adaptations due to interaction with water the sort of radical specialization posited by the AAH has not been accepted within the scientific community as a valid explanation for human divergence from related primates.

      উইকির নিবন্ধ এটা: //en.wikipedia.org/wiki/Aquatic_ape_hypothesis

      জবাব দিন
    • রায়হান আবীর (৯৯-০৫)

      আন্দালিব ভাই ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য। নেট বিম্ভ্রাটে কয়েকদিন মন্তব্যের জবাব দিতে পারেনাই। দুঃখিত।

      আপনার প্রশ্নের জবাব তো মানব বিবর্তন নিয়ে বই লিখতে থাকা মুহাম্মদ দিয়েই দিলো। ভিডুটা আমিও দেখলাম। ভালো থাকবেন।

      জবাব দিন
  4. সময়ের সাথে সাথে জীবকূলের মাঝে পরিবর্তন আসে। প্রকৃতির বর্তমান অবস্থা , জীবাশ্মের রেকর্ড , জেনেটিক্স, আনবিক জীববিজ্ঞানের মত কঠিন বিষয়গুলো জানা না থাকলেও ঘটে কিছু বুদ্ধি থাকলেই এই পরিবর্তনটা বুঝা যায়। কারন গাছ থেকে আপেল পড়ার মতো সহজে দৃশ্যমান না হলেও একটু লক্ষ্য করলেই এই পরবর্তন অনুভব করা যায়। কিন্তু এই পরিবর্তনটাই বিবর্তন নয়। অন্ততপক্ষে মানুষ বা জীব তৈরী হওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে সৃষ্টিতত্ত্বের বিপরীতে যে বিবর্তন মতবাদ কে হাজির করা হয় সেটাকে- “বীচি থেকে গাছ হয়, গাছ থেকে আলু হয়- কাজেই বিবর্তন সত্য, এটা নিয়ে আর তর্ক বা সন্দেহ পোষন করা যাবে না”- এই ধরনের মীমাংসা দিয়ে পরিবর্তন, অভিযোজন, মিউটেশন, সমরুপতা ইত্যাদির সাথে এক করে প্রতিষ্ঠিত করার পুরনো কায়দাটি নিতান্তই অসততা।
    বিবর্তন কি? এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে এক কথায় বিবর্তন হলোঃ
    মানুষ <– নরবানর <–পুরোন পৃথিবীর বানর <– লেমুর
    এই প্রক্রিয়াটী।
    অর্থ্যাৎ বিবর্তন মতবাদ অনুয়ায়ী লেমুর ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে পুরনো পৃথিবীর বানর হয়েছে, সেটা আবার কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে নরবানর হয়েছে, তারপর নরবানর সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়ে মানুষ এ পরিনত হয়েছে। আরো ব্যাপক অর্থে একই রকম দেখতে জীব গুলো একই পূর্বপুরুষ থেকে ক্রম রুপান্তরের মাধ্যমে উদ্ভুত হয়েছে এবং সাধারণ একটি পূর্বপুরুষ থেকে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা বিস্তারের মাধ্যমে পৃথিবীর বিপুল জীবজগত তৈরী হয়েছে।
    কাজেই বিবর্তনবাদ প্রমান করার অর্থ হলো সুদীর্ঘ সময়ের স্ব-প্রনোদিত ক্রম রুপান্তরের প্রক্রিয়াটি প্রমান করা।
    বিবর্তনবাদীরা যা করেছেনঃ
    শত সহস্র পর্যবেক্ষণ
    গত ১৫০ বছরের ইতিহাসে বিবর্তনবাদীরা তাদের তত্ত্ব প্রমানের জন্য যা কিছু হাজির করছেন তার ৯০% হচ্ছে ‘পর্যবেক্ষণ’ এর নমুনা সংগ্রহ। মাটি খুঁড়ে, পাহার পর্বত চষে, নদী-সাগর পাড়ি দিয়ে জীবজগতের বিভিন্ন প্রজাতীর আকার, কাঠামো, চাল-চলন এর উপর পর্যবেক্ষন চালিয়ে তারা আবিষ্কার করছেন মিল-অমিল গুলো। এক সময় তারা বিভিন্ন প্রজাতীর বাহ্যিক মিল অমিল গুলো খুঁজে বের করেছেন, এখন প্রযুক্তিগত উন্নতির বদৌলতে তারা কোষ, নিউক্লিয়াস, জীন, ডিএনএ পর্যায়ে পর্যবেক্ষন করে এই মিল অমিল গুলো খুজে বের করছেন। কিন্তু পর্যবেক্ষনই একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রমান নয়, বরং এটা হচ্ছে তত্ত্বের সত্যতা প্রমানের প্রাথমিক শর্ত।
    “কোন পর্যবেক্ষণ যখন বারংবার বিভিন্নভাবে প্রমানিত হয় তখন তাকে আমরা বাস্তবতা বা সত্য (fact) বলে ধরে নেই।“
    “পর্যবেক্ষন” প্রমানিত হওয়ার কোন বিষয় নয়। পর্যবেক্ষন থেকে লব্ধ প্রকল্পটি-ই হচ্ছে প্রমানিত হওয়া বা না হওয়ার ক্যান্ডিডেট। এজন্য প্রকল্পটিকে নির্মোহ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষন এর ভিতর দিয়ে যেতে হয়। বলা প্রয়োজন, বিবর্তনবাদের মুল তত্ত্বটি পরীক্ষনের ভিতর দিয়ে যায়নি। “সিকোয়েন্সকৃত প্রতিটি ডিএনএ” বা “বিভিন্ন ভাবে বিবর্তন তত্তকে পরীক্ষা করা হয়েছে”, “প্রতিদিন, কয়েকশত পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে” বলতে সত্যকার অর্থে যা করা হয়েছে বা হচ্ছে তা হলো সুক্ষাতিসুক্ষ ভাবে ‘পর্যবেক্ষন’ ধাপটি সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। বলা বাহুল্য এই পর্যবেক্ষনটি “সুদীর্ঘ সময়ের স্ব-প্রনোদিত ক্রম রুপান্তর” এর পর্যবেক্ষন নয়। এটি হচ্ছে জীবজগতের প্রজাতী সমুহের মধ্যে আকারে, গড়নে, চলনে, জীনগতভাবে মিল-অমিল এর পর্যবেক্ষন। কিন্তু সমরুপ প্রজাতী সমুহের সমরুপতা পর্যবেক্ষন করে স্ব-প্রনোদিত ক্রম রুপান্তর হওয়ার সিদ্ধান্তটি জন্মগত ভাবেই অদ্যবধি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষনের অনুপযুক্ত। কারন প্রকল্পমতে এক একটি প্রজাতী রুপান্তরিত হতে লক্ষ লক্ষ না হলেও অন্তত হাজার হাজার বছর প্রয়োজন।
    গোল তরমুজ, চারকোনা তরমুজঃ
    “চৈনিকরা যোগাযোগ খরচ বাচানোর জন্য গোল, গোল তরমুজকে চারকোণা করে ফেলেছে। কবুতর, কুকুরের ব্রিডিং সম্পর্কেও আমরা সবাই অবগত।“
    কেউ যখন গাছ থেকে নিচের দিকে বল প্রয়োগে আপেল ছুড়ে মারে সেটা দিয়ে মধ্যাকর্ষ তত্ত্ব প্রমানিত হয় না। মধ্যাকর্ষ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নিজে থেকে আপেল মাটিতে পড়ার পর্যবেক্ষনের উপর ভিত্তি করে। একইভাবে, তরমুজ, কবুতর, কুকুর, ঘোড়া ব্রিডিং এর উদাহরন বিবর্তন তত্তের জন্য প্রযোজ্য নয়। বিবর্তন প্রকল্পের অন্যতম শর্ত ‘হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ বছর সময়কাল’ এসব ক্ষেত্রে মানা হয়নি। অধিকন্তু, কবুতর, কুকুর, ঘোড়া ব্রিডিং, চারকোনা তরমুজ উৎপাদন দিয়ে বুঝা যায প্রজাতীগত ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতি (চারকোনা তরমুজের জন্য যেমন চৈনিকদের বুদ্ধিমত্তা) ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। তাই চারকোনা তরমুজের উৎপাদন সৃষ্টিতত্ত্বের ধারনাকেই প্রমান করে, বিবর্তন তত্ত্ব নয়।
    চোখতত্ত্ব, জীনতত্ত্বঃ
    “জীনতত্ত্ব দিয়েই চমৎকারভাবে আমাদের বংশগতিধারা বলে দেওয়া” কিংবা “চোখ” বিবর্তনের কল্পিত ধারাবাহিকতা বহুল প্রচারিত বানর সদৃশ প্রানী থেকে মানুষ হওয়ার চিত্রটির ভিন্নরুপমাত্র। এই সবগুলো ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোর ক্ষেত্রে জীবের বা জীবের কোনো একটি অঙ্গের কি কার্যকারিতা সেটা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কার্যকারিতা বা কাঠামোর সমরুপতা আবিষ্কারকে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ ‘পর্যবেক্ষন’ এর নমুনা বলা যায়, কিন্তু কাঠামোগত এই মিল-অমিল প্রজাতীগুলোর ক্রম রুপান্তর কে প্রমান করে না।
    দুটিই ইলেক্ট্রনিক বস্তু হিসেবে এবং একই পরিবেশে ব্যবহৃত হওয়ার প্রেক্ষিতে টেলিভিশন ও কম্পিউটার মনিটর এর মধ্যে কাঠামোগত, কার্যকারিতাগত অনেক মিল পাওয়া যায়, কিন্তু এই সদৃশতা যেমন কম্পিউটার মনিটর ও টেলিভিশন এর ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সৃষ্ট হওয়াকে অপ্রমান করে না, তেমনি ভাবে এটা একটি টেলিভিশন এর স্বপ্রনোদিত হয়ে ক্রম রুপান্তরের মাধ্যমে কম্পিউটারে পরিনত হওয়ার কোন কাল্পনিক ঘটনাকেও প্রমান বা অপ্রমান করে না। একইভাবে, প্রজাতী গুলোর সমরুপতা এক পৃথিবীর আলো বাতাসে বা একই পরিবেশে বসবাসের জন্য তাদের সকল মিল-অমিল সহকারে ‘কোনও মহাপরাক্রমশালী নকশাকারকের নিপুনতা’য় সৃষ্টি হয়েছে-এই ধারনাকে অপ্রমান করে না বা ক্রম রুপান্তরের মাধ্যমে ‘কারও হস্তক্ষেপ ব্যতিত, শুধুমাত্র বস্তুগত প্রক্রিয়ায় উদ্ভব’ হয়ে অস্তিত্তে এসেছে- এই ধারনা কেও প্রমান বা অপ্রমান করে না। তাই “বিভিন্ন মেরুদন্ডী প্রাণীর সামনের হাত বা অগ্রপদের মধ্যে লক্ষ্যনীয় মিল”, “ভেতরে আমরা সবাই প্রায় একই। আমরা সবাই “কমন জিন” শেয়ার করে থাকি“, “লেজের হাড়” এই সব কিছুই পর্যবেক্ষন মাত্র, এদের কোনটাই বিবর্তন তত্ত্বকে প্রমান করেনা।
    সত্যতার প্রমান একঃ এন্টিজেন-এন্টিবডি বিক্রয়াঃ
    “যদি একটি এন্টি হিউমান সিরাম আমরা যথাক্রমে নরবানর, পুরোন পৃথিবীর বানর, লেমুর প্রভৃতির সিরামের সাথে মেশাই তাহলেও অধঃক্ষেপ তৈরী হবে। মানুষের সাথে যে প্রানীগুলোর সম্পর্কের নৈকট্য সবচেয়ে বেশি বিদ্যমান সেই প্রানীগুলোর ক্ষেত্রে তলানির পরিমান বেশি হবে, যত দূরের তত তলানীর পরিমান কম হবে। তলানীর পরিমান হিসেব করে আমরা দেখি, মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি তলানী পাওয়া যাচ্ছে, নরবানরের ক্ষেত্রে আরেকটু কম, পুরানো পৃথিবীর বানরের ক্ষেত্রে আরেকটু।“
    এটা কি বিবর্তনের প্রমান নাকি ফলাফল? অর্থ্যাৎ এই ক্রমটা অনুসৃত হচ্ছে বলে বিবর্তন সত্য নাকি বিবর্তন সত্য বলে এই ক্রমটা বজায় আছে সেটা বুঝা গেলো না।
    এটা যদি বিবর্তনের ফলাফল হয়ে থাকে তাহলে এটাকে প্রমান হিসেবে জুড়ে দেয়ার মানে কি?
    আবার তলানী পড়ার ক্রমানুসার দেখেই যদি কেউ বিশ্বাস করে বসে তারা ক্রমানুসারেই একটি থেকে আরেকটি অস্তিতে এসেছে তাহলে সেটাকে কাল্পনিক গল্প বলা যেতে পারে, বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়। বিবর্তন তত্ত্বকে সত্য ধরে নিয়েই তার ভিত্তিতেই তত্ত্ব প্রমানের জন্য আনিত পর্যবেক্ষন এর নমুনা গুলোকে ব্যাখ্যা করে আবার বিবর্তন তত্ত্বকেই সত্য প্রমান করার হাস্যকর চেষ্টা বিবর্তনবাদীদের নতুন নয়। অর্থ্যাৎ তাদের যুক্তি উপস্থাপনের প্রক্রিয়াটি হলো ‘বিচার কর, তবে এমন ভাবে কর যেন তালগাছটা আমার হয়’।
    জীবের আর দশটি বৈশিষ্টের মধ্যে ‘অভিযোজন’ একটি। এক কোষী ব্যাক্টেরিয়া থেকে শুরু করে জটিল মানবদেহ পর্যন্ত এই বৈশিষ্টের অধিকারী। ঠান্ডার জন্য বা বৃষ্টিতে ভিজলে আমাদের দালান কোঠায় বাস করা শিশুরা যত সহজে সর্দি, জ্বরে আক্রান্ত হয় সেই তুলনায় একই কারনে বস্তিবাসী শিশুদের সর্দি, জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার হার কম। এটা বস্তিবাসী শিশুদের পরিবেশের সাথে অভিযোজনের ফল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে দালান কোঠার শিশুরা মানুষ আর বস্তিবাসী শিশুরা ভিন্ন প্রজাতীতে রুপান্তরিত হয়ে গেছে। অভিযোজনের এই প্রক্রিয়ায়টি মানবদেহের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রক্রিয়া দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়, তার জন্য প্রজাতী গুলোর স্বপ্রনোদিত ক্রম রুপান্তরের কাল্পনিক গল্প ফাঁদার দরকার হয় না। এভাবে বিবর্তনবাদীরা অভিযোজন, মিউটেশন, প্রাকৃতিক নির্বাচন এর মতো নৈর্ব্যক্তিকভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য বিষয় গুলোকে তাদের কল্পিত তত্ত্বের সাথে সুবিধাজনক ভাবে জুড়ে দিয়ে, সেই সাথে ‘হাজার/লক্ষ বছরের’ দায়মুক্তি শর্ত যোগ করে বিবর্তনবাদ এর মতো একটি প্রিমিটিভ দার্শনিক মতবাদের উপর নিজেদের অন্ধভক্তিকেই প্রমান করেন।
    বিবর্তনবাদীদের সবচেয়ে বড় শঠতা হচ্ছে তাদের কাল্পনিক তত্ত্বটিকে ‘বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব’ হিসেবে চালানোর চেষ্টাটা। গত কয়েকশ বছরের বিজ্ঞানের ব্যাপক অগ্রগতির ফলে কতিপয় মোহিত মানুষ তাদের চিন্তা, আদর্শ, বিশ্বাস, মতবাদ এমনকি নিজেরেদের ধর্মকেও বিজ্ঞানের নামে চালানোর চেষ্টা করে আসছে। মানুষের কাছে প্রহনযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য বিবর্তনবাদীরাও তাদের দার্শনিক মতবাদকে বিজ্ঞানের নামে চালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বস্তুর জাগতিক অস্তিত্ত্ব কোনো নকশাকারকের হাত ধরে আসল নাকি নিজেরাই ডিগবাজী খেয়ে খেয়ে আজকের অবস্থায় উপনিত হলো সেটা নিয়ে বিজ্ঞানের মাথাব্যাথা নেই। (উপস্থিতি যে প্রক্রিয়াই হোক না কেন) উপস্থিত বস্তুজগতের উপর বস্তুবাদী অধ্যয়ন-ই বিজ্ঞানের কাজ। যে গল্পের শুরু ‘লক্ষ/কোটি বছর আগে ঘটনাক্রমে উদ্ভুত উপযুক্ত পরিবেশে ঘটনাক্রমে প্রানের বিকাশ ঘটল’ এটা দিয়ে এবং যাকে প্রতিটি ধাপ এই “ঘটনাক্রম” বা by chance এর উপর নির্ভর করে পার হতে হয় সেটাকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বলার অর্থই হলো বিবর্তনবাদ তো বটেই, বিজ্ঞান সম্পর্কেই চরম মূর্খতা। University College (Cardiff, Wales) এর Applied Mathematics and astronomy এর অধ্যাপক Chandra Wickramasinghe এর ভাষায়ঃ “The likelihood of the spontaneous formation of life from inanimate matter is one to a number with 40,000 noughts after it… It is big enough to bury Darwin and the whole theory of evolution....”
    বিবর্তনবাদের জন্ম ও লালন পালন দর্শনের গৃহে বলেই আজো বিবর্তনবাদীরা আলোচনার সময় তাদের তত্ত্বের প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রথমেই, কোন বৈজ্ঞানিক তত্তকে নয়, বরং সবেধন নীলমনি সৃষ্টতত্ত্বকে টেনে এনে তার উপর নিজেদের দার্শনিক অনুরাগের ঝাল ঝাড়েন। সৃষ্টতত্ত প্রচলিত অর্থে দর্শনেরই বিষয়।
    আর মতবাদটা দার্শনিক বলেই বিবর্তনের সত্যতার উপর তাদের বিশ্বাসটাও গোঁড়ামী পর্যায়ের। অথচ কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব চরম সত্য বলে স্বীকৃত হয় না, বৈজ্ঞানিকভাবে গৃহিত সিদ্ধান্ত speculative বলেই বিজ্ঞান সবসময় ক্রম অগ্রসরমান।
    ফসিল সমাচারঃ
    ফসিল রেকর্ড হলো বিবর্তন তত্ত্বের জন্য সবচেয়ে নির্যাতিত সাক্ষীগোপাল। এই ফসিল রেকর্ড যেহেতু অধিকাংশ মানুষের (এমনকি বিবর্তন তত্ত্বের উপর যাদের বেজায় বিশ্বাস তাদেরও অনেকের) অভিজ্ঞতার বাইরের বিষয় তাই বিবর্তনবাদের অনুসারী ও বিরোধীরা যে যার ইচ্ছা মতো এটাকে ব্যবহার করে থাকেন। একদিকে কেউ কেউ প্রচার করেন,
    “আধুনিক পিঁপড়াদের পূর্বপুরুষের ফসিল কোথা থেকে পাওয়া যাবে সেইটা বিবর্তন তত্ত্ব দিয়ে অনুমান করে সত্যতা যাচাই করা হয়েছে। ডারউইন নিজেই বলে গিয়েছিলেন,মানুষের পূর্বপুরুষের জীবাশ্মের সন্ধান মিলবে আফ্রিকায় এবং জীবাশ্মবিজ্ঞানীরা সন্ধান পেয়েছেন এমন অনেক জীবাশ্মের। একটি অনুমানও যদি ভুল হতো তাহলে আমরা নিমেষেই বিবর্তনকে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারতাম, কিন্তু হয়নি।“
    অন্যদিকে Glasgow University এর নৃতত্ত্ববিজ্ঞানী Neville George বলছেন:
    “There is no need to apologise any longer for the poverty of the fossil record. ......The fossil record nevertheless continues to be composed mainly of gaps”.
    কিংবা বৃটিশ বিবর্তনবাদী Derek Ager এর ভাষায় “The point emerges that if we examine the fossil record in detail, whether at the level of orders or of species, we find - over and over again - not gradual evolution, but the sudden explosion of one group at the expense of another”.
    একদিকে কেউ দাবী করছেন ফসিল রেকর্ডে প্রাক ক্যাম্বরিয়ান যুগে খরগোশের ফসিল পাওয়ার যায়নি, আবার অন্যদিকে কেউ কেউ ফসিল রেকর্ডের দোহাই দিয়েই বলেন, ক্যাম্ব্রিয়ান যুগে এমন অনেক complex invertebrates এর সন্ধান পাওয়া যায় যেটা ক্রম বিবর্তন তত্ত্বের সাথে খাপ খায় না। কোনো ধরনের পুর্বপুরুষের ক্রম ধারাবাহিকতার তোয়াক্কা না করে বিপুল পরিমান জটিল জীবের অকস্মাৎ উপস্থিতির এই ঘটনা ভুতত্ত বিজ্ঞানে “Cambrian Explosion” হিসেবে পরিচিত।
    আরেক উচ্চকন্ঠি বিবর্তনবাদী Richard Dawkins এক সময় এসে বলেছেন “the Cambrian strata of rocks, vintage about 600 million years, are the oldest ones in which we find most of the major invertebrate groups. And we find many of them already in an advanced state of evolution, the very first time they appear. It is as though they were just planted there, without any evolutionary history. Needless to say, this appearance of sudden planting has delighted creationists”.
    তথাকথিত অতিরিক্ত অংগ/অঙ্গানু (vestige organs)
    যার মনে ভুতের ভয় আছে সে রাতের বেলা বট গাছের পাতার আওয়াজ শুনে ভুতের কথাই মনে করবে। বটের পাতা যে বাতাসেও নড়তে পারে সেটা তারা চোখে না দেখে বিশ্বাস নাও করতে পারে।
    মানবদেহের সব অংগ প্রত্যংগের কার্যকারীতা এক সময়ে আবিষ্কৃত হয়নি। সময়সাপেক্ষ গবেষনার ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে এসব আবিষ্কৃত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। বিভিন্ন অংগ/প্রত্যংগের কার্যকারীতা আবিষ্কারের মাঝখানের সময় গুলো বিবর্তনবাদীরাদের জন্য মহাউল্লাসের সময়। যখন্ই কোন একটা অংগের কার্যকারিতা জানা যায় না তখনই বিবর্তনবাদীরা সেটাকে মানুষের পুর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে প্রচার করতে থাকেন। যখন সেটার কার্যকারিতা আবিষ্কার হয় তখন তারা সেটা বাদ দিয়ে আরেকটা কাজ না জানা অংগ/অংগানুর ভিতর নিজেদের পুর্বপুরুষের চিহ্ন খুজে পান। এক সময় বিবর্তনবাদীদের হিসেবে মানবদেহে পুর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন স্বরুপ ১৮০ টার মতো অংগের কথা বলা হলেও এখন সেই সংখ্যা কমতে কমতে কয়েকটিতে এসে ঠেকেছে। মেলাটোনিন হরমোন নি;সরন কারী পিনিয়াল গ্ল্যান্ড কে এক সময় ভেজটিজ অর্গান বলা হয়েছিল। মানবদেহের রোগপ্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ন ‘থাইমাস’ কেও তার কার্যকারীতা আবিষ্কারের আগে ‘ভেজটিজ অর্গান’ বলা হয়েছিল। Duke University, Oklahoma University তে পরিচালিত কয়েকটি গবেষনয়ায় মানবদেহের ভ্রুন অবস্থায় তো বটেই পরিপুর্ন বয়স্কালেও এপেন্ডিক্স এর গুরুত্ত্বপুর্ন কার্যকারীতা সনাক্ত করা হয়েছে। গত তিন বছরে (২০০৭, ২০০৮, ২০০৯) বিভিন্ন সাইন্টিফিক জার্নালে সেগুলো প্রকাশিত ও হয়েছে। মেডিক্যাল সাইন্সের অগ্রগতির ফলে হয়ত এক সময় আর কোন ভেজটিজ অর্গানের অস্থিত্ত্ব থাকবে না। এই কারনেই সম্ভবত বিবর্তনবাদীরা ‘বিবর্তিত প্রজাতীতে লুপ্ত কার্যকারিতা সম্পন্ন অঙ্গান্নুর ক্রমান্বয়ে নতুন কর্মক্ষমতা অর্জনের’ নতুন তত্ত বানানোর চেষ্টায় আছে। মানুষের পুর্বপুরুষের গাছে ঝুলার, গাছ বেয়ে উঠা নামার দরকার ছিলো। এখনো তাই লেজের হাড় মানবদেহে রয়ে গেছে, ডাল পালা ধরে ঝুলার অভ্যাসের কারনেরই নাকি এখনো মানব শিশু হাত মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় জন্ম নেয়। বিবর্তনবাদীরদের দাবী অনুযায়ী মানুষ গাছ থেকে চিরতরে নেমেছে সেই হাজার হাজার বছর আগে, এর মধ্যে ব্যবহারের অভাবে এত্তোবড় লেজ খসে পড়ল কিন্তু সামান্য হাতের মুষ্টি আজো সোজা হলো না!
    বৈজ্ঞানিক ধারনাকে আগে পরীক্ষায় পাশ করে প্রমানিত হয়ে আসতে হয় তারপর তাকে আর দশটা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সাথে দাঁড় করানো যায়। আর বিবর্তনবাদীরা করেছেন ঠিক উল্টো কাজটা। তারা আগেই বিবর্তন তত্ত্বকে পুরোপুরি সত্য হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন আর তারপর এখন স্বীকৃতির পাওয়া আশায় দিকবিদিক ছুটছেন তার প্রমান খোঁজার জন্য আর নিজেদের অন্ধ গোঁড়ামী বজায় রাখতে জোগাড় করছেন কিছু অজুহাত।

    একবার এক ক্লাসে শিক্ষক তার ছাত্র কে একটা সাদা কাগজ দিয়ে বললেন একটা ছবি আঁকতে।
    বেশ কিছুক্ষন পর ছাত্র কাগজটা জমা দিলো শিক্ষককে।
    শিক্ষক দেখলেন সে কোন ছবি আঁকে নি। পাতাটি সাদাই রয়ে গেছে। শিক্ষক ধমক দিয়ে বললেন, ‘ছবি কোথায়?’
    ছাত্রঃ স্যার, ছবি তো এঁকেছি। আমার ছবিতে একটা গরু ঘাস খাচ্ছে।
    শিক্ষকঃ কোথায় গরু আর কোথায় ঘাস? আমি তো দেখছি এটা সাদা কাগজ।
    ছাত্রঃ স্যার, গরু সব ঘাস খেয়ে ফেলেছে, তাই ঘাস গুলো দেখতে পাচ্ছেন না।
    শিক্ষকঃ তাহলে গরু কোথায়?
    ছাত্রঃ ঘাস খাওয়ার পর গরু গোয়াল ঘরে ফিরে গেছে, তাই গরুটাও এখানে আর দেখা যাচ্ছে না।
    এটা একটা পরিচিত কৌতুক। ‘গরু ঘাস খায়’ বা ‘ভরা পেটে গরু গোয়াল ঘরে ফিরে যায়’ দুটিই সাধারন পর্যবেক্ষন হিসেবে বাস্তব ঘটনা। কিন্তু এই বাস্তব দুটি পর্যবেক্ষন কে ব্যবহার করে এই ছাত্রটি যা করেছে সেটা হলো প্রতারনা আর সমস্ত বিষয়টাই হয়ে গেছে হাসির খোরাক। বৈজ্ঞানিক চিন্তার ধরন, বৈজ্ঞানিক গবেষনার প্রক্রিয়াকে বিবেচনায় নিয়ে বিবর্তনবাদের ধারনা কে সঠিকভাবে অনুধাবন করলে বুঝতে কষ্ট হবে না যে বিবর্তনবাদ গত ১৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উচ্চ হাসির কৌতুক গুলোর একটি।

    জবাব দিন
    • মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)

      বস ..... আপনার বক্তব্য / যুক্তিগুলো ঠিকঠাক মতন বুঝি নাই ..... বিবর্তনবাদীদের একটু কম আক্রমন করে শুধু যুক্তিগুলো দিয়ে একটা ব্লগ লিখে দিলে আমার মতন আমজনতার উপকার হয় ....

      জবাব দিন
      • মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

        বিবর্তনবাদ গত ১৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উচ্চ হাসির কৌতুক গুলোর একটি =)) =)) =)) =)) =)) =)) =)) =)) =)) =)) =))

        এর চেয়েও বড় হাসির খোরাক পাইলাম এই লাইনটায়।এই লাইন কালজয়ী হয়া যাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।

        জবাব দিন
        • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

          =)) =)) =))
          নির্মল বিনোদনের জোগান দিল নিরীহ পাবলিক। তার কথা হেসে উড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছা ছিল না, এমনই যুক্তি তিনি দেখাইছেন যে সেটার পাল্টা যুক্তি দেয়াটাকে খুব লেইম মনে হচ্ছে। তারপরও একটা নিষ্ফল চেষ্টা নেয়া যায়। কোকো দ্য গরিলা কে সাইন ল্যাংগুয়েজ শেখানো গেলে নিরীহ পাবলিককেও আশাকরি কিছুটা রুডিমেন্টারি সায়েন্স শেখানো সম্ভব, যদি তিনি উৎসাহী থাকেন।

          জবাব দিন
      • বস, আমিও আপনার মতো আমজনতা। নিতান্তই নিরীহ পাবলিক। নিজে থেকে জেনে বুঝে কঠিন ধরনের কোনো তত্ত খাড়া করার মতো যথেষ্ট বুদ্ধি নাই, আরেক জনের কথার উপর কথা বলতে গিয়ে মনের প্রশ্ন গুলো বড় অগোছালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে। নেহাতই নিরীহ পাবলিকের বৈশিষ্ট্য আর কি!
        আবির ভাই এর মূল লেখাটা পড়ে আমার বক্তব্যটা পড়লে আশা করি বুঝতে কোনো সমস্যা হবে না। বক্তব্যটা যেহেতু মূল লেখাটা নিয়েই তাই আবীর ভাই এর উল্লিখিত পয়েন্টগুলোর বিরোধীতা করেই লেখা হয়ে গেছে। যুক্তি খন্ডনের কিছু নির্দোষ চেষ্টা ....এটাকে 'আক্রমন' বললে একটু বেশী বলা হয়ে যায় না বস?

        জবাব দিন
        • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

          ব্যঙ্গ বাদ দিয়ে যুক্তির কথায় আসি, বড় না ছোট জানি না, তাই আপনি বলেই সম্বোধন করছি:

          এখানে আপনি নিইজ থেকে যেসব কথা বলেছেন তা এক কথায় বাতিল যোগ্য। কারণ আপনার মন্তব্য পড়ে আমার মনে হয়েছে বিবর্তনের বেসিক ধারণাই আপনার নেই: বিবর্তন বিষয়ে ডারউইন ও লামার্কের তত্ত্বের পার্থক্যই আপনি বোঝেন না, প্রাকৃতিক নির্বাচন যে বোঝেন না সেটা প্রমাণিত হয়েছে নিচের কথাটাতে:

          বিবর্তনবাদীরদের দাবী অনুযায়ী মানুষ গাছ থেকে চিরতরে নেমেছে সেই হাজার হাজার বছর আগে, এর মধ্যে ব্যবহারের অভাবে এত্তোবড় লেজ খসে পড়ল কিন্তু সামান্য হাতের মুষ্টি আজো সোজা হলো না!

          এত্তো বড় লেজ খসে পড়েনি কখনও, বৈজ্ঞানিক ভাষার এ কি অপব্যবহার। যাহোক বিবর্তন নিয়ে প্রাথমিক জ্ঞান না থাকায় আপনার নিজ থেকে বলা সকল কথাই বাতিলযোগ্য। আপনি যে বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সেগুলো হচ্ছে:
          - মাইক্রোবিবর্তন ঘটলেও নতুন প্রজাতির উৎপত্তি তথা স্পেসিয়েশন হয় না।
          - বিবর্তনবাদী বলে অপবিজ্ঞানীদের একটা দল আছে যারা বিজ্ঞান বোঝে না।
          - ফসিল বিবর্তন প্রমাণ করে না।
          - জেনেটিক্স বিবর্তন প্রমাণ করে না।

          আপনার ফালতু প্রোপাগান্ডার কিছু জবাব দেয়ার চেষ্টা করি। বিবর্তনবাদী আবার কি? বলেন জীববিজ্ঞানী, বর্তমানে জীববিজ্ঞানের গ্র্যান্ড ইউনিফিকেশন থিওরি হিসেবে বিবর্তন স্বীকৃত হয়েছে। সকল জীববিজ্ঞানীই বিবর্তনের আলোকে গবেষণা করেন। থিওডসিয়াস ডবঝানস্কি বলেই দিয়েছেন, বিবর্তনের আলোকে ব্যাখ্যা না করলে জীববিজ্ঞানের কোনকিছুরই কোন অর্থ হয় না। ডবঝানস্কি কে চিনেন তো? বিংশ শতকের অন্যতম সেরা জীববিজ্ঞানী ইনি, উনার কথার দাম আপনার চেয়ে বেশি জনাব। আপনি বলে দিলেই হল একটা কথা? বিবর্তনকে এভাবে হেয় করার অথরিটি আপনি নন, যদি অথরিটেটিভ কথা বলতে চান তাহলে অথরিটির রেফারেন্স দিন।
          কোন বিজ্ঞানী কবে বিবর্তন ভুল বলেছেন এবং এর বদলে কোন হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়েছেন? - এই সোজা প্রশ্নের উত্তর দিন। এর উত্তর দিতে না পারলে আপনার হাজার চিল্লপাল্লা সব ১০০% ব্যর্থ।

          শুধু মানুষের ফসিলগুলো নিয়ে ধারণা পেতে হলে এই সাইটে যান। অনেক কিছু আছে, কিছু শিখে তারপর কথা বলুন। ফসিল নিয়ে আপনি যাকে কোট করেছেন তার কথায় কিছুই প্রমাণিত হয় না, তিনি বলেছেন ফসিল একটা রেয়ার জিনিস, এটা সব বিজ্ঞানীই মানেন, কিন্তু রেয়ার ফসিলগুলো থেকেই যে সুস্পষ্ট সিম্যুলেশন ও পরীক্ষার মাধ্যমে কত কিছু জানা গেছে সেটা উপরে লিংক দেয়া সাইটে গেলেই পাবেন। ভগিজগি সাইট না এটা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক জাদুঘরের একটার সাইট: স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট। ভগিজগি বাদ দিয়ে এমন কনক্রিট রেফারেন্স দেয়া শুরু করলে কি হয়?

          এসব প্রমাণ না আপনি বললেই হয়ে যাবে নাকি? রায়হানের লেখাই তো মনে হয় পড়েননি। এখানে বলাই হয়েছে বিবর্তন একটা ফ্যাক্ট, তোন তত্ত্ব নয়। এই ফ্যাক্ট ব্যাখ্যা করার জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচন একটা তত্ত্ব। রকেট কাজ করে, এই কাজ করাটা নিউটনের গতির ৩য় সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এটা কি সূত্রটির সত্যতা প্রমাণ করে না? বিবর্তন ঘটে আর এটা প্রাকৃতিক নির্বাচন দিয়ে কিছুটা ব্যাখ্যা করা যায়। এতে কি সেই কিছুটা প্রমাণিত হয় না। এটাও জেনে রাখেন যে, বিবর্তনের বিভিন্ন আসপেক্ট ব্যাখ্যার জন্য বেশ কয়েকটা তত্ত্ব আছে: প্রাকৃতিক নির্বাচন, জেনেটিক ড্রিফ্ট ইত্যাদি। এগুলো দিয়ে ক্যামব্রিয়ান এক্সপ্লোশন অনেকটাই ব্যাখ্যা করা যায়।

          ডকিন্স সহ আরও কয়েকজনের উক্তি মিসকোট করতে লজ্জা লাগল না। একটা বিষয় মনে রাখবেন, বিবর্তন বিষয়ক অমুক ধারণাটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, আর বিবর্তন মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে কথা দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। যেমন সম্প্রতি আর্ডির ফসিল আবিষ্কৃত হওয়ার পরে মানুষের বিবর্তন বিষয়ক বেশ কিছু ধারণা সংশোধিত হয়েছে, এটা দেখে আল জাজিরা টিভির মূর্খরা মধ্যপ্রাচ্যের মূর্খদের জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য প্রচার করেছে, আর্ডির মাধ্যমে ডারউইন ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

          পরিশেষে আবারও বলি: কয়েকজন বিজ্ঞানীর বক্তব্য মিসকোট করে লাভ নেই। ভগিজগি বাদ দিয়া আপনি একজন বিজ্ঞানীর বর্তমানে একটা সর্বজন গৃহীত সায়েন্টিফিক পেপার এর নাম বলেন যেখানে লেখা আছে: "বৈজ্ঞানিক চিন্তার ধরন, বৈজ্ঞানিক গবেষনার প্রক্রিয়াকে বিবেচনায় নিয়ে বিবর্তনবাদের ধারনা কে সঠিকভাবে অনুধাবন করলে বুঝতে কষ্ট হবে না যে বিবর্তনবাদ গত ১৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উচ্চ হাসির কৌতুক গুলোর একটি।"

          নইলে আপনার কথাগুলো বিবর্তন সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান যার আছে সেও হেসে উড়িয়ে দেবে। শুধু শুধু হাসির পাত্র হবেন কেন?

          ও আর বললেন না প্রজাতির উৎপত্তি হয় না। মিছা কথা। এই সাইটে যায়া মাথা ঝাড়া দিয়া একটু চোখ বুলান, কিছু ঢুকলেও ঢুকতে পারে:
          //www.talkorigins.org/faqs/faq-speciation.html

          জবাব দিন
          • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

            এই পোষ্টটা আমি পড়ছি। মন্তব্যগুলোও। পোষ্টের বক্তব্যে আমার কিছুই বলার নাই। তবে অফটপিক একটা কথা আছে।

            @মুহাম্মদ,
            তোমার যুক্তি-খন্ডন রীতিটা আমার কাছে ভুল মনে হয়। কেন, তা' বলছিঃ

            এখানে আপনি নিইজ থেকে যেসব কথা বলেছেন তা এক কথায় বাতিল যোগ্য। কারণ আপনার মন্তব্য পড়ে আমার মনে হয়েছে বিবর্তনের বেসিক ধারণাই আপনার নেই:

            - তুমি শুরুই করেছো তোমার সিদ্ধান্ত দিয়ে, তারপর তোমার যুক্তি উপস্থাপন করেছো। আসলে ত' হওয়ার কথা উল্টোটি, আগে যুক্তির বিস্তার, তারপর সেখান থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। আগেই সিদ্ধান্ত পেয়ে গেলে যুক্তিগুলো গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। এতে যেই লাউ সেই কদুই থেকে যায়, কোন পক্ষের অবস্থানই পরিবর্তন হয়না যা' কিনা যুক্তিতর্কের লক্ষ্য।


            There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

            জবাব দিন
            • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

              ভুল মনে হওয়ার কিছু নেই মাহমুদ ভাই। যুক্তি খণ্ডনের এই রীতি যে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত সেটা আমিও জানি। কিন্তু বিবর্তন সম্পর্কে কিছুটা জানার পর নিরীহ পাবলিকের কমেন্ট যদি কেউ পড়ে তাহলে বুঝতেই পারবে যে, লোকটা বিবর্তনের কিছুই জানে না, শুধু শুধু গোঁয়াড়ের মত মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। নিরীহ পাবলিকের কথায় যুক্তি দেখানোর কিছু তো পাই নি। আমি এই কথাটা বলেছি তাকে বুঝিয়ে দিতে যে,

              নিরীহ পাবলিক নিজ থেকে যা বলেছেন তার কোনই গুরুত্ব নেই। কারণ আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা সম্পর্কে কোন পদার্থবিজ্ঞান-মূর্খ কি বলল না বলল সেটাতে কিছু আসে যায় না। কিন্তু তিনি যদি কোন রেফারেন্স ব্যবহার করেন সেক্ষেত্রে কথা আছে। উপরের কথা বলার মাধ্যমে উনার নিজ থেকে বলা সব কথা পুরো মিথ্যা প্রোপাগান্ডা বলেছি। তারপর দেখিয়েছি উনি যেসব রেফারেন্স ইউজ করেছেন তার সবই ১০০% মিসকোট। বিবর্তন সম্পর্কে কিছু না জানলে এ ধরণের মিসকোটগুলো খুব মজাদার লাগার কথা।

              জাকির নায়েক এর যুক্তি খণ্ডানোর যে কিছু নেই সেটা আমি মানি। এই নিরীহ পাবলিকের যুক্তিও ছিল সেই স্টাইলের। এদের যুক্তিকে ব্যঙ্গ করার কোন বিকল্প নেই।

              জবাব দিন
            • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

              আরেকটা প্রশ্ন মাহমুদ ভাই:
              বিবর্তনবাদী বলে যে কিছু নেই, বরং পৃথিবীর সকল জীববিজ্ঞানীই যে এক অর্থে বিবর্তনবাদী এটা কি আপনি জানেন বা মানেন?
              জাস্ট আপনার ভিউটা বোঝার জন্য বললাম। কারণ আপনি এর আগে জাহিদ ভাইয়ের কোটি কোটি ভুল তথ্যে ভরা বিবর্তনবাদের একটা রিভিউয়ের প্রশংসা করেছিলেন। অথচ সেই রিভিউটা যে কিছুই হয় নি সেটা মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। জাহিদ ভাইয়ের ঐ রিভিউটাকে যদি একটা সায়েন্টিফিক রিভিউ পেপারের সাথে তুলনা করি তাহলে সেটা পুরোপুরি বাতিলযোগ্য। কারণ উনিও সেখানে মিসকোট করেছেন, বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন আবিষ্কারকে বিজ্ঞানীরা যেভাবে ব্যাখ্যা করে সেভাবে না করে বিবর্তনবিরোধী প্রোপাগান্ডা স্টাইলে ব্যাখ্যা করেছেন যা স্পষ্টতই হারুন ইয়াহিয়া বা জাকির নায়েক দ্বারা প্রভাবিত। তেমন একটা লেখায় আপনার সাপোর্ট জোগানোটা দুঃখজনক ছিল। কারণ আমার ধারণা আপনি সব না জেনে কনক্লুশনে পৌঁছান না।

              বিবর্তন নিয়ে যে বিতর্ক নেই সেটা কেউ বলেনি। বিজ্ঞানী মহলেই বিতর্ক সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সেটা বিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে, খোদ বিবর্তন নিয়ে নয়। আপনি যদি কেবল বিতর্কের চর্চাকে সাপোর্ট দেয়ার জন্যও জাহিদ ভাইয়ের লেখার প্রশংসা করেন তাহলেও দুঃখজনক বলতে হয়। কারণ সেটা অনেকটা জাকির নায়েকের ভণ্ডামি সাপোর্ট করার মত হয়ে যায়। স্ট্রিং থিওরি নিয়ে যেসব বিতর্ক হচ্ছে সেটাকে একজন সাপোর্ট করতে পারে কিন্তু সেটা নিয়ে জ্যোতিষীরা যেসব ঝাড়ফুঁক করে সেটাকে কেউ সাপোর্ট করতে পারে না।

              জবাব দিন
              • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
                জাস্ট আপনার ভিউটা বোঝার জন্য বললাম। কারণ আপনি এর আগে জাহিদ ভাইয়ের কোটি কোটি ভুল তথ্যে ভরা বিবর্তনবাদের একটা রিভিউয়ের প্রশংসা করেছিলেন।

                - মুহাম্মদ, তুমি মনে হয় ভুল পড়েছিলে। নিচে দেখো আমি কি বলেছিলাম জাহিদ ভাইয়ের সেই পোষ্টেঃ

                'আমার জানা তথ্যগুলোকে আমি নিজের মত করে এখানে প্রকাশ করলাম। তিন ধরণের বিশ্বাস থেকে কে কোনটাকে বেশী যৌক্তিক মনে করবেন তা পাঠকের উপরে, সবারই বোঝার ক্ষমতা আছে। সুতরাং ‘বেছে নিন’।
                ভাইয়া, আপনার এই এপ্রোচটাই আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে।
                লেখাটা অনেক ভালো লেগেছে। অনেক কিছুই বুঝেছি, আবার বুঝি নাই এমন কিছুও আছে। কিন্তু, সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে খুব ভাল লেগেছে।
                অনেক ধন্যবাদ গুছিয়ে, সুন্দরভাবে কথাগুলো উপস্থাপন করার জন্য।

                - আমি সহমত করেছিলাম তানভীরের (১৯৯৪-২০০০) এই মন্তব্যে।

                আর আমার নিজের একটা মন্তব্য ছিলো এরূপঃ

                'একজন কিছুদিন কোন কিছু নিয়ে থাকলে আমি একবার পরেই সবকিছু বুঝে যাব, এটা বোধহয় কঠিন।'
                সহমত। কারন, নতুন কিছু বোঝার প্রকৃয়ার প্রথম পর্যায়ে মুগ্ধতা থাকে ব্যাপক। ফলে ঐটা নিয়েই পড়ে থাকলে তা’র প্রতি ভালোবাসাই বাড়ে। আর ভালোবাসার সামনে যুক্তি ত অসহায়!
                এজন্য কোন জিনিস/বিষয় বোঝার পর আমি তা’র সমালোচনাগুলোর দিকে ফিরে তাকাই। এতে নতুন শেখা বিষয়টার প্রতি “প্রথমদৃষ্টিতে-প্রেম” হালকা নিয়ন্ত্রনে আসে।

                এখানে বিবর্তন নিয়ে কিছু বলিনি, বলেছিলাম উপস্থাপনের ধরণ নিয়ে। এখনো বলছি, জাহিদ ভাইয়ের উপস্থাপনের ধরণটা আমার কাছে তুলনামূলকভাবে ভালো মনে হয়েছে।

                আর বিবর্তন নিয়ে আমি খানিকটা উৎসাহী, কিন্তু এটা নিয়ে মাতামাতির কারণ নিয়ে আমি আরো বেশি উৎসাহী। (এই নিয়ে পরে অন্যকোথাও আলাপ হবে আশা করি, এই পোষ্টের ফোকাস বদলে যাবে তা না হলে)।


                There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

                জবাব দিন
          • যাদের বিবর্তন তত্ত্বের উপর বিশ্বাস নেই, বিবর্তনবাদীদের কথা বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেয় না তারা বিবর্তন কি জিনিস বুঝেই না, বিবর্তন সম্পর্কে তাদের কোনো ধারনাই নেই- এসবই ভাই পুরান ডায়ালগ। আবীর ভাইয়ের লেখা পয়েন্ট গুলো নিয়ে লিখেছিলাম। আপনি রিপ্লাই দেয়ার ধান ভানতে নেমেছেন ঠিকই, কিন্তু শিবের গীতটা বেশী গাওয়া হয়ে গেছে।
            “প্রতিটা নতুন ফসিল আবিষ্কার বিবর্তন তত্ত্বের জন্য একটি পরীক্ষা। একটি ফসিলও যদি বিবর্তনের ধারার বাইরে পাওয়া যায় সেই মাত্র তত্ত্বটি ভুল বলে প্রমানিত হবে।। বলা বাহুল্য এ ধরনের কোন ফসিলই এ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয় নি।“
            “খুঁজে পাওয়া প্রতিটি জীবাশ্ম, সিকোয়েন্সকৃত প্রতিটি ডিএনএ প্রমান করে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিটি প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রাক ক্যাম্বরিয়ান শিলায় আমরা স্তন্যপায়ী কোনও প্রাণীর জীবাশ্ম পাইনি, পাইনি পাললিক শিলার একই স্তরে মানুষ এবং ডাইনোসরের জীবাশ্ম।“
            ফসিল নিয়ে আবীর ভাইয়ের এই বক্তব্যের বিরোধীতা করে বলেছিলাম, ফসিল নিয়ে মতভেদ আছে বিজ্ঞানীদের মধ্যেই এবং আপনিও এখন বলছেন ফসিল একটা রেয়ার জিনিস। আমার লেখায় উদ্ধৃত বিজ্ঞানীর বক্তব্যও তাই ছিল। ডকিন্সের বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও তাই। তাহলে ভাই এটাকে মিসকোট মিসকোট বলে বিবর্তনবাদীদের প্রথাগত সুর ধরলেন কেন? অন্তত এই ক্ষেত্রে সেটা না করলেও হতো।
            আমার বক্তব্য ছিল “একটি ফসিলও বিবর্তনের ধারার বাইরে পাওয়া যায় নি”, “খুঁজে পাওয়া প্রতিটি জীবাশ্ম প্রমান করে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিটি প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে“ এইধরনের অতিউৎসাহি দাবীর সত্যতা নেই। যাহোক, ফসিল রেকর্ড নিজেই যখন বিবর্তন কে প্রশ্নবিদ্ধ করল তখন বিবর্তনবাদীরা প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব কে টেবিলের নীচে রেখে উপরে তুলে আনল জেনেটিক ড্রিফট তত্ত্বকে, উদ্দেশ্য কিভাবে এটাকে কাল্পনিক তত্ত্বের সাথে ফিট করা যায়। কিছু বাস্তব পর্যবেক্ষন কে পুঁজি করে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা দিয়ে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রমান করলে সেটা আদতে কি দাড়াঁয় সেটা বুঝার জন্য দয়া করে আমার প্রথম পোস্টের শেষে উল্লিখিত কৌতুকটি আবার পড়ে দেখুন।

            “জীনতত্ত্ব দিয়েই চমতকারভাবে বলে দেওয়া যায় আমাদের বংশগতিধারা। জীববিজ্ঞানের এই শাখাগুলোর মাধ্যমে, আমাদের পূর্বপুরুষ কারা ছিল, তাদের বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল, দেখতে কেমন ছিল তারা সব নির্ণয় করা হয়েছে। দেখা গেছে ফসিল রেকর্ডের সাথে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছে সেটা।“
            জীনতত্ত্ব দিয়ে বংশগতিধারা বলা যায়। সোজা বাংলায়, জীনের গাঠনিক তারতম্য ভেদে তার আগের পরের কাঠামোর জন্য জীব সমুহের বৈশিষ্ট্য কেমন হবে সেটা সহজে বলা যায়। আর সেই তারতম্য অনুযায়ী কি ধরনের জীবের অস্তিত্ত্ব থাকতে পারে তাও বলা যায়। অবশ্যই এই অধ্যয়নটা বিবর্তনবাদীদের উৎসাহিত করেছে। জীনতত্ত নিয়ে প্রচুর গবেষনা হয়েছে। সেটা গবেষনার নতুন নতুন দিকও উন্মোচন করেছে। কিন্তু এইসব কিছু দিয়ে কাছাকাছি কাঠামোর জীব গুলো একটা থেকে ক্রমান্বয়ে আরেকটায় অস্তিতে এসেছে সেটা প্রমান হয় না।
            যেকোনো বস্তুর রাসায়নিক ধর্ম নির্ভর করে উক্ত বস্তুর মৌল উপাদানের উপর। ইলেক্ট্রন বিন্যাস দিয়ে সহজেই মৌল গুলোর বৈশিষ্ট্য নির্ধারন করা যায়। পর্যায় সারনীর মৌল গুলোর ইলেক্ট্রনিক বিন্যাস থেকে পুর্বাপর মৌল সমুহের সম্পর্ক বুঝা যায়। এমনকি ইলেক্ট্রন বিন্যাসের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা অনাবিষ্কৃত মৌল সমুহের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও বিস্তারিত বলে দিতে পারেন। একটী মৌল এর আগের মৌল গুলোর বৈশিষ্ট্যগুলো ইলেক্ট্রন বিন্যাসের ভিত্তিতেই বুঝা যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে উক্ত মৌল গুলোর কোন কোনটী দিয়ে তৈরী দুইটি বস্তু (যেমন টেলিভিশন আর কম্পিউটার মনিটর) ক্রমরুপান্তরের মাধ্যমে একটি থেকে আরেকটিতে অস্তিতে আসে। মৌল গুলোর ইলেক্ট্রন বিন্যাসের পরিবর্তন করে একটি থেকে আরেকটি মৌলে রুপান্তরও কঠিন ব্যাপার নয়, এমনকি প্রচন্ড চাপ ও তাপে কয়লাও হীরা হয়ে যায়-তাও আমরা জানি। কিন্তু তাই বলে এটার উপর ভিত্তি করে যাবতীয় দৃশ্যমান বস্তু গুলোর ক্রমরুপান্তরের মাধ্যমে অস্তিতে আসার কাল্পনিক কোন তুঘলকি তত্ত্ব পদার্থবিজ্ঞানে গড়ে উঠেনি। তবে যাবতীয় বস্তুর ক্রম রুপান্তরের গল্প না থাকলেও বস্তুর বস্তুগত অধ্যয়নের জন্য, মৌলগুলোর উপর গবেষনা করতে অবশ্যই ইলেক্ট্রন ক্রমবিন্যাসের ভিত্তি খুবই গুরুত্তপুর্ন একটি অধ্যায়।
            কিন্তু অন্যদিকে ‘প্রান থাকা না থাকার’ মতো অবস্তুবাদী তত্তের ভিত্তিতে পৃথক করা এবং সেই সাথে মানুষের নিজের অস্তিতের বিষয়টি জড়িত থাকা হেতু জীববিজ্ঞান কে দার্শনিকরা নিজের ঘরের জিনিস মনে করে। আর তার ফল স্বরুপ এর মধ্যে কিছু দার্শনিক ভগিজগিও ঢুকে পড়ে। যাহোক, জেনেটিক্স এর বদৌলতে এখন জীববিজ্ঞানীরা জীবসমুহকে ‘ইলেক্ট্রন বিন্যাস দিয়ে পদার্থ বোঝার মতো’ করে বুঝতে পারেন (রেয়ার ফসিল গুলোর সুস্পষ্ট সিম্যুলেশন আর পরীক্ষা করে কত কিছু জানার ব্যাপারটাও একই রকম) আর এর জন্য জীবগুলোর একটি থেকে আরেকটিতে বিবর্তনের মাধ্যমে অস্তিতে আসার কাল্পনিক কাহিনীর উপর ঈমান থাকার প্রয়োজন হয় না, আর এই বিষয়ে ঈমান থাক বা না থাক জীব সমুহের উপর গবেষনার জন্য তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে গাঠনিক, জেনেটিক্স, সিকুয়েন্সিয়্যাল ডিএনএ এসবের ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন করা অত্যাবশ্যক। এটাই আপনার কথিত “বিবর্তনের আলোকে ব্যাখ্যা না করলে জীববিজ্ঞানের কোনকিছুরই কোন অর্থ হয় না” এর ক্রিয়াশীল অর্থ। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে প্রায়োগিক দৃষ্টিকোন থেকে না দেখে বিজ্ঞানীর কোন একটা কথাকে পুঁজি করে একটা দার্শনিক বিশ্বাস নিয়ে আহ্লাদিত হওয়াটা সৃষ্টিতত্ত্ববাদীদের দ্বারা আইনষ্টাইনের ‘ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান খোঁড়া আর বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম অন্ধ’ উক্তি দিয়ে আইনষ্টাইন কে ধার্মিক বিজ্ঞানী বানিয়ে নিজেদের তত্ত্বকে মহিমান্বিত করার ছেলেমানুষী চেষ্টা করার মতোই একটা ব্যাপার।
            প্রজাতীগত পরিবর্তন প্রমান করার জন্য যে ওয়েবসাইটের এড্রেস দিলেন সেখানে কয়েকটি আছে ‘একদা তিনি দেখিতে পাইলেন...’ জাতীয় ব্যক্তিগত আলাপ আর বাকি বেশীর ভাগই বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের দ্বারা ল্যাব এ কিছু নিম্ন শ্রেনীর জীব নিয়ে প্রজাতী পরিবর্তনের পরীক্ষন। ভাই, আপনে মাথা ঝাড়া দিয়া আমার আগের লেখাটা আরেকবার পইড়া দেখেন। বলছিলাম প্রজাতীগত ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ‘বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতি’ আর ‘পরিকল্পিত প্রক্রিয়া’। আপনার সাইটের উল্লিখিত বিজ্ঞানীদের (বুদ্ধিমত্তা) দ্বারা ল্যাবে (পরিকল্পিত প্রক্রিয়ায়) করা প্রজাতীগত পরিবর্তনের পরীক্ষন গুলোর উদাহরনই কি আমার কথার উপযুক্ত প্রমান নয়? গুগলে সার্চ দিয়ে হাজার হাজার সাইট পাওয়া যায় যেখানে দিন রাত বিবর্তনবাদের পক্ষে সাফাই গাওয়া হচ্ছে, সেগুলোতে ঘোরাঘুরি করলে বিবর্তনবাদের উপর জ্ঞান বাড়বে, সেটা খুবই ভালো কথা, কিন্তু তত্ত্বটাকে বুঝতে গেলে তত্ত্বটার উপরই মনোযোগী অধ্যয়ন জরুরী।
            ‘এসব প্রমাণ না আপনি বললেই হয়ে যাবে নাকি? রায়হানের লেখাই তো মনে হয় পড়েননি। এখানে বলাই হয়েছে বিবর্তন একটা ফ্যাক্ট, তোন তত্ত্ব নয়। এই ফ্যাক্ট ব্যাখ্যা করার জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচন একটা তত্ত্ব। রকেট কাজ করে, এই কাজ করাটা নিউটনের গতির ৩য় সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এটা কি সূত্রটির সত্যতা প্রমাণ করে না? বিবর্তন ঘটে আর এটা প্রাকৃতিক নির্বাচন দিয়ে কিছুটা ব্যাখ্যা করা যায়। এতে কি সেই কিছুটা প্রমাণিত হয় না।‘

            ভাই, কেউ একজন ‘বলেই দিল’ আর সাথে সাথে একটি তত্ত্ব ফ্যাক্ট হয়ে গেলো এইটা অন্তত বৈজ্ঞানিক তত্তের জন্য প্রযোজ্য নয়। আপনার রকেট, নিউটনের ৩য় সুত্রের উদাহরন থেকে বুঝা যাচ্ছে আপনি, বৈজ্ঞানিক চিন্তা, পর্যবেক্ষন, বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, প্রযুক্তিগত বিদ্যার পার্থক্যটা এখনো ঠিক মতো বুঝতে পারেননি। বিবর্তন তত্তের ভিত্তিতে কোন রকেটটা উড়ে বলেন তো ভাই? জীব বিজ্ঞানের যেকোনো গবেষনাকে, যেকোনো অগ্রগতিকে, যেকোনো ধরনের ফাইন্ডিংস কে কম-বুঝা বিবর্তনবাদীরা সবসময় তাদের তত্তের প্রমান বলে শোরগোল তোলেন সেটা তাদের স্বভাবদোষ। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তত্ত বাড়োয়ারী তাঁবুর কানাতের নীচের ব্যবসাদার নাচওয়ালী না যে, যে-সে তার দিকে তাকিয়ে ইচ্ছা হলো আর সিট্টি বাজিয়ে উল্লাস করল। বরং এটা শুভদৃষ্টি কালের বঁধুর মুখ, বেনারসীর ঘোমটার পর্যবেক্ষন ধরার জন্য ও বিশেষ লোকের প্রয়োজন। বিবর্তনবাদে উৎসাহি বিজ্ঞানীদের বিস্তর গবেষনা বিভিন্নভাবে বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে তরান্বিত করছে, নতুন নতুন বিষয় বুঝতে শিখিয়েছে সেটা আগেই বলেছি, কিন্তু সেই সবই স্বয়ংসম্পূর্ন গবেষনার নিজস্ব অবদান, বিবর্তনবাদ সত্য বা মিথ্যা হওয়ার সাথে সেটার সম্পর্ক নেই। বিবর্তন তত্তের গবেষনার ফল স্বরুপ পাওয়া বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে সিট্টি বাজানো বখাটেরাই বিবর্তনবাদ তত্তের ‘রকেট’ মনে করবে। শুভদৃষ্টি দেয়া বিশেষ লোকটী ঠিকই জানে রসায়নবিদদের ‘রাজ অম্ল’ আবিষ্কার পরশ পাথরের অস্তিতের সত্যতা প্রমান করে না।
            “বিবর্তনবাদী বলে অপবিজ্ঞানীদের একটা দল আছে যারা বিজ্ঞান বোঝে না।
            বিবর্তনবাদী আবার কি? বলেন জীববিজ্ঞানী,”

            কোনো বিজ্ঞানী সৃষ্টিতত্তে বিশ্বাস করল নাকি বিবর্তন তত্তে বিশ্বাস করল সেটা দিয়ে বিচার করে তাকে অপবিজ্ঞানী বলার ধৃষ্টতা আমার নাই। ব্যক্তিগত বিশ্বাস যাই হোক না কেন বিজ্ঞানীর জীবনের যে সময়টা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় গবেষনায় ব্যস্ত থাকেন সেটার জন্যই তিনি শ্রদ্ধার পাত্র। আর পৃথিবীর যেসব বিজ্ঞানী বিবর্তনবাদ কে সঠিক বলে মানেন তারা নিজেদের ‘বিবর্তনবাদী’ বলতে কুন্ঠাবোধ করেন না। বিবর্তনবাদী বললে তারাই অপমানবোধ করেন যারা বিজ্ঞান বোঝেন না কিন্তু বিবর্তনবাদের উপর কিছু বই পুস্তক পড়ে, কিছু ওয়েবসাইট সার্ফিং করে তথ্য পন্ডিত হয়ে নিজেদেরকে ‘জীববিজ্ঞানী’ ভাবতে শুরু করেন।

            যাই হোক আপনার লেখার সবচেয়ে হাস্যকর অংশটায় আসিঃ
            “থিওডসিয়াস ডবঝানস্কি বলেই দিয়েছেন, বিবর্তনের আলোকে ব্যাখ্যা না করলে জীববিজ্ঞানের কোনকিছুরই কোন অর্থ হয় না। ডবঝানস্কি কে চিনেন তো? বিংশ শতকের অন্যতম সেরা জীববিজ্ঞানী ইনি, উনার কথার দাম আপনার চেয়ে বেশি জনাব। আপনি বলে দিলেই হল একটা কথা? বিবর্তনকে এভাবে হেয় করার অথরিটি আপনি নন, যদি অথরিটেটিভ কথা বলতে চান তাহলে অথরিটির রেফারেন্স দিন।“
            ভাই, নিউটন বলে দিয়েছেন বলে মহাকর্ষ তত্ত্ব সত্য তা কিন্তু নয়। বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রমানিত হয় বিজ্ঞানের নিজস্ব প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে, বিজ্ঞানীর মুখের কথা দিয়ে নয়। অবশ্যই আবিষ্কারের ক্রেডিবিলিটিটা সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীর। বৈজ্ঞানিক প্রমান কোনো পীরের বয়ান নয় যে, একজন মুরীদ এসে বলবে, ‘অমুক পীররে চিনেন? তার অনেক ক্ষমতা, তার মুখের কথায় এটা ওটা হয়ে যায়, তিনি বলেছেন এটা ঠিক, কাজেই এর উপর আর কথা চলে না। উনার কথার উপর কথা কইতাছ তুমি কেডা?’ ‘তোমার পীর কে? তার তরিকত কি?’ ইত্যাদি ইত্যাদি..., আর সাথে সাথে সবাই পীরের বয়ানকে বিনা প্রশ্নে মেনে নেবে। আমি না চিনলেও আপনার তো জানার কথা আপনার অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী থিওডসিয়াস ডবঝানস্কি নিজেকে একই সাথে সৃষ্টিতত্ত্ববাদী ও বিবর্তনবাদী দাবী করতেন এবং বিবর্তন কে ঈশ্বরের সৃজনপদ্ধতি বলেছিলেন। আর আপনার উল্লিখিত "বিবর্তনের আলোকে ব্যাখ্যা না করলে জীববিজ্ঞানের কোনকিছুরই কোন অর্থ হয় না" এই কথাটিও ডবঝানস্কি বলেছিলেন একজন নকশাকারকের হাত ধরে বিবর্তন হওয়ার ধারনাকে সমর্থন দিয়ে। তাহলেকি সেরা বিজ্ঞানীর মুখের কথা বলে এখন আমরা সৃষ্টিতত্ত্ববাদ ও বিবর্তনবাদ দুটাকেই সত্য বলে ধরে নেব?
            বিবর্তনবাদ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব না হলেও ভেবেছিলাম এখানে যারা আলোচনা করছেন তারা বৈজ্ঞানিক আলোচনার সাধারন ভব্যতাটা অন্তত বুঝেন, এখন তো দেখছি আসলে ভুল করে পীর মুরীদের আস্তানায় আইসা পড়ছি।

            বিঃ দ্রঃ- ভাই, আপনার কাছে আর কোন কোন সাইটের এড্রেস আছে আমারে এট্টু দয়া করে পাঠাইয়া দিয়েন। দেখি নতুন কিছু পাই কিনা। আপাতত যেই দুইটা দিছেন দুইটাই কমন পড়ছে।

            জবাব দিন
            • মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

              আলোচনা চলুক-দেখি কি কি শিখতে পারি।আমি যেহেতু এই লাইনের লোক না তাই আমার ভরসা প্রতিষ্ঠিত সায়েন্টিফিক জার্নালগুলা।আমার সীমিত জ্ঞানে(আবার বলছি, অত্যন্ত সীমিত জ্ঞানে) আপাতত বিবর্তনবাদকে পুরোপুরি অস্বীকার করে এরকম প্রতিষ্ঠিত জার্নালের কথা শুনি নাই।আর এই তত্বে অনেক সমস্যা থাকলেও(সমস্যা=বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক) আদম হাওইয়ার ক্রিয়েশনিস্ট গাল্গল্পের চাইতে এইটাকে বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হয়।বিবর্তনবাদের চাইতে ভালো কোন তত্ব যদি সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করে(অলৌকিক গাল্গল্প,গড ইন গ্যাপ জাতীয় রূপকথা না)তাহলে সেইটাকেই মেনে নেব।ক্ষুদ্র জ্ঞানের কারনে এখনও সেইরকম কিছুর কথা শুনি নাই-যদি থেকে থাকে এবং ভবিষ্যতে এরকম কিছু আসে তাহলে অবশ্যই সেটা মেনে নেব-অধিকতর বৈজ্ঞানিক যুক্তিযুক্ত তত্বকে অস্বীকার করার মত গোঁড়া আমি নই বলেই আমার ধারণা।আপাতত বিবর্তনবাদই ভরসা।

              দেখা যাক আপনাদের বিতর্কে নতুন কিছু শিখতে পারি কিনা...

              জবাব দিন
          • মুহাম্মদ লিখেছেন:

            বিবর্তন একটা ফ্যাক্ট, তোন তত্ত্ব নয়। এই ফ্যাক্ট ব্যাখ্যা করার জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচন একটা তত্ত্ব।

            লাইনটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হল।

            NirihoPublic লিখেছেন:

            ফসিল রেকর্ড নিজেই যখন বিবর্তন কে প্রশ্নবিদ্ধ করল তখন বিবর্তনবাদীরা প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব কে টেবিলের নীচে রেখে উপরে তুলে আনল জেনেটিক ড্রিফট তত্ত্বকে, উদ্দেশ্য কিভাবে এটাকে কাল্পনিক তত্ত্বের সাথে ফিট করা যায়।

            এই লাইনটা কিছুটা aggressive হলেও বিবর্তনবাদকে ব্যাখ্যা করার আরো একটা নতুন তত্ত্বের নাম জানা গেল। আরো অন্য কোন তত্ত্ব আছে কি?

            NirihoPublic লিখেছেন:

            রা বিজ্ঞানী থিওডসিয়াস ডবঝানস্কি নিজেকে একই সাথে সৃষ্টিতত্ত্ববাদী ও বিবর্তনবাদী দাবী করতেন এবং বিবর্তন কে ঈশ্বরের সৃজনপদ্ধতি বলেছিলেন। আর আপনার উল্লিখিত “বিবর্তনের আলোকে ব্যাখ্যা না করলে জীববিজ্ঞানের কোনকিছুরই কোন অর্থ হয় না” এই কথাটিও ডবঝানস্কি বলেছিলেন একজন নকশাকারকের হাত ধরে বিবর্তন হওয়ার ধারনাকে সমর্থন দিয়ে।

            বিষয়টা একটু খোলাসা করে বলবেন কি?

            জবাব দিন
    • রায়হান আবীর (৯৯-০৫)

      ধন্যবাদ, নিরীহ পাবলিক।

      আপনার যে যুক্তিগুলো প্রদান করলেন সেগুলো বিভিন্ন ক্রিয়েশনিস্টরা বহু বছর ধরে প্রদান করছেন। এই লেখাতেও আমি দেখাতে চাই ক্রিয়েশনিস্টরা ঠিকমতো হোমওয়ার্ক করতে আগ্রহী নন, তারা একই কথা বার বার ঘুরে ঘুরে বলতেই থাকেন, বলতেই থাকেন। আমি যেই রিবাটালগুলো লিখছি সেগুলোও এইকারণে ডারউইন থেকে শুরু করে হাজার জীববিজ্ঞানী লিখেছেন। অদ্ভুত এক চক্রে পড়ে আটকা পড়ে গেছে আমরা।

      ডারউইন তার অরিজিন অফ স্পেসিস বইতেই সৃষ্টিবাদীদের সম্ভাব্য সকল ধরণের প্রশ্নের জবাব দিয়ে গিয়েছেন (জীনতত্ত্ব ব্যতিত, যেহেতু এইব্যপারে তার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিলোনা)। যাই হোক, ভিক্টোরিয়ান কঠিন ইংলিশে লেখা অরিজিন অফ স্পেসিস পড়ার অনুরোধ আপনাকে করবোনা, আপনি সহজ বাংলায় বন্যা আহমেদের লেখা "বিবর্তনের পথ ধরে" বইটি পড়ে দেখতে পারেন। বইটি বের করেছে অবসর প্রকাশনী। আজিজ সুপার মার্কেটের যেকোন দোকানে বইটি পাবেন। একবার রিডিং দিলে আশাকরি আপনার মনের অনেক অনেক প্রশ্নের জবাব পাবেন। বাকিটা না পেলে আপনার ডিসকাশন করতে পারবো।

      মুহাম্মদ আর আমি আপনাকে আবারও বেশ হোমওয়ার্ক ধরিয়ে দিলাম, জানেনই তো শেখার কোনও শর্টকার্ট নেই 😀

      বইটা পড়ে আপনার মন্তব্য আবার দেখুন। দেখবেন সেখানে অনেক নাইভ করা রয়েছে। অনেকভালো থাকুন। আপনার কষ্ট করে প্রদান করা মন্তব্যের জন্য আবার ধন্যবাদ।

      জবাব দিন
  5. জাহিদ (১৯৮৯-৯৫)

    রায়হান, অনেক ধন্যবাদ লেখাটার জন্য।
    [১৪] “Life’s Grand Design”, Kenneth R. Miller এটা কি বই না আর্টিক্যাল? জানিও। বই হলে বইয়ের নাম আর আর্টিক্যাল হলে জার্নালের নাম দিও, প্লীজ।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।