‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও গণহত্যার প্রতীক’

গোলাম আযম কারাগারে। বয়সের দোহাই দিয়ে গ্রেপ্তার এড়াতে চেয়েছিল। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের খুজে বের করে ৯০ বছর বয়সে জেলে নেওয়ার উদাহরণ রয়েছে। মিশরের হোসনি মোবারকের বয়স ৯০, বিচার হচ্ছে। গোলাম আযমের কিছু কুর্কীর্তির বিবরণ দিয়ে কারাগারে যাওয়াকে স্মরণীয় রাখতেই এই পোস্ট।

১.
১৯৯২ সালের গণআদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আত্মজীবনীতে তিনি সেই অভিযোগপত্রটি উল্লেখ করেছেন। ২০০৮ সালে এটি প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল। ব্লগার তানভীরের ব্লগেও এটি পাওয়া যাবে।
ami_masumblog_1196178763_1-g_azm.jpg
মাননীয় আদালত,

আমি, মরহুম ডা• এ টি এম মোয়াজ্জমের পুত্র এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অভিযোগ উত্থাপন করছি। আমি অভিযোগ করছি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পক্ষে; আমি অভিযোগ করছি পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে লাঞ্ছিত মায়েদের পক্ষে; আমি অভিযোগ করছি হানাদার বাহিনী দ্বারা ধর্ষিত বোনদের পক্ষে; আমি অভিযোগ করছি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দোসর আল বদর কর্তৃক নিহত বুদ্ধিজীবীদের পক্ষে; আমি অভিযোগ করছি শত্রুর হাতে প্রাণদানকারী পিতামাতার অসহায় এতিম সন্তানদের পক্ষে; আমি অভিযোগ করছি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষে।

আমি অভিযোগ আনছি মরহুম মওলানা গোলাম কবিরের পুত্র গোলাম আযমের বিরুদ্ধে-ইনি একজন পাকিস্তানি নাগরিক, তবে বহুদিন ধরে বেআইনিভাবে বসবাস করে আসছেন ঢাকার রমনা থানার মগবাজার এলাকার ১১৯ নম্বর কাজী অফিস লেনে।

ইনি সেই গোলাম আযম-যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রতিটি অন্যায়, বেআইনি, অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজ প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন; যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দেশদ্রোহী বলে আখ্যা দিয়ে তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছিলেন; যিনি আল বদর বাহিনী গড়ে তুলে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করার প্ররোচনা দিয়েছিলেন। গোলাম আযমের প্ররোচনায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আছেন আমার শিক্ষক মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সন্তোষকুমার ভট্টাচার্য ও সিরাজুদ্দীন হোসেন, আমার অগ্রজপ্রতিম শহীদুল্লা কায়সার, আমার বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আহমদ, আমার সহকর্মী আবুল খায়ের, আনোয়ার পাশা, রাশীদুল হাসান ও মোহাম্মদ মোর্তজা, আমার ছাত্র আ ন ম গোলাম মোস্তফা ও সৈয়দ নজমুল হক-যাঁদের মৃত্যুতে আমি ক্ষতিগ্রস্ত, শোকাহত ও ব্যথাতুর।

গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আমার বিশেষ অভিযোগঃ তিনি সর্বদা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছেন এবং এখনো করছেন; বিশেষ করে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৮ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সশরীরে উপস্থিত থেকে, বক্তৃতা ও আলোচনার মাধ্যমে, স্মারকলিপি ও বিবৃতির দ্বারা, মুদ্রিত ও প্রকাশিত প্রচারপত্র ও প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে এবং সাংগঠনিক উদ্যোগ গ্রহণ করে নিজে এবং অপরের দ্বারা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে দুর্বল ও সহায়হীন, বিচ্ছিন্ন ও বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র করেছেন। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এতে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।

আমার অভিযোগের সমর্থনে গোলাম আযমের কিছু কার্যকলাপের পরিচয় এখানে তুলে ধরছি।

[১] ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হলে গোলাম আযম পাকিস্তানে বসে মাহমুদ আলী ও খাজা খয়েরউদ্দীনের মতো দেশদ্রোহীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি নামে একটি সংগঠনের সূচনা করেন এবং বিভিন্ন দেশে পূর্ব পাকিস্তান পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলার আয়োজন করেন। তিনি এই উদ্দেশ্যে দীর্ঘকাল পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির বলে নিজের পরিচয় দিতেন।

[২] ১৯৭২ সালে গোলাম আযম লন্ডনে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ গঠন করেন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে আবার এই ভূখণ্ডকে পাকিস্তানের অংশে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করেন। ১৯৭৩-এ ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন অফ স্টুডেন্‌টস ইসলামিক সোসাইটিজের বার্ষিক সম্মেলনে এবং লেসটারে অনুষ্ঠিত ইউ কে ইসলামিক কমিশনের বার্ষিক সভায় তিনি বাংলাদেশবিরোধী বক্তৃতা দেন। ১৯৭৪-এ মাহমুদ আলীসহ কয়েকজন পাকিস্তানিকে নিয়ে তিনি পূর্ব লন্ডনে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির এক বৈঠক করেন। বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে দেখে এই সভায় স্থির হয় যে, তাঁরা এখন থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নিয়ে একটি কনফেডারেশন গঠনের আন্দোলন করবেন। এই সভায় গোলাম আযম ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাংলাদেশে ফিরে অভ্যন্তর থেকে ‘কাজ চালানোর’ প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন। ১৯৭৭-এ লন্ডনের হোলি ট্রিনিটি চার্চ কলেজে অনুষ্ঠিত একটি সভায় তিনি এ কথারই পুনরাবৃত্তি করেন এবং সেই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও বাংলাদেশি ভিসা নিয়ে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে আগমন করেন।

[৩] ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে গোলাম আযম রিয়াদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামি যুব সম্মেলনে যোগদান করেন এবং পূর্ব পাকিস্তান পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সকল মুসলিম রাষ্ট্রের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত তিনি সাতবার সউদি বাদশাহ্‌র সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার আহ্বান জানান এবং কখনো তিনি বাদশাহ্‌কে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করতে ও কখনো বাংলাদেশকে আর্থিক বা বৈষয়িক সাহায্য না দিতে অনুরোধ করেন। ১৯৭৪ সালে রাবেতায়ে আলমে ইসলামির উদ্যোগে মক্কায় অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এবং ১৯৭৭ সালে কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত একটি সভায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেন।

[৪] অনুরূপভাবে গোলাম আযম ১৯৭৩ সালে বেনগাজিতে অনুষ্ঠিত ইসলামি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে আগত প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য লবিং করেন। একই বছরে ত্রিপলিতে অনুষ্ঠিত ইসলামি যুব সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে হানিকর বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

[৫] ১৯৭৩ সালে গোলাম আযম মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম স্টুডেনটস অ্যাসোসিয়েশন অফ আমেরিকা অ্যান্ড কানাডার বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানভুক্ত করার জন্য সবাইকে কাজ করতে আহ্বান জানান।

[৬] ১৯৭৭ সালে গোলাম আযম ইসতামবুলে অনুষ্ঠিত ইসলামিক ফেডারেশন অফ স্টুডেনটস অরগানাইজেশনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশবিরোধী বক্তৃতা করেন।

মাননীয় আদালত,
আমি গোলাম আযমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করছি। ইনি সেই গোলাম আযম-যাঁকে ফেরার ঘোষণা করে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিজ এলাকার মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হতে নির্দেশ দেন; ১৯৭৩ সালের ১৮ই এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনবলে বাংলাদেশ সরকার যাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করে দেন; যিনি পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও তিন মাসের ভিসা নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১১ই জুলাই বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যিনি বেআইনিভাবে এ দেশে রয়ে যান; ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৭৯ ও ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করেও যিনি নাগরিকত্ব ফেরত পাননি; বাংলাদেশ সরকার যাঁকে ১৯৮৮ সালের ২০শে এপ্রিলের মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ দিলেও যিনি বাংলাদেশে থেকে যান; যাঁর নাগরিকত্ব ফেরত দেওয়ার ইচ্ছা বাংলাদেশ সরকারের নেই বলে ১৯৮৮ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিকবার জাতীয় সংসদে ঘোষণা করেছেন; সেই গোলাম আযমের উপযুক্ত শাস্তি বিধানের জন্য এই গণ-আদালতের কাছে আমি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করলাম।

ga.jpg
২.
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ট্রাইবুনালে ৬২টি অভিযোগ দাখিল করা হয়। সেই অভিযোগ এবার দেখা যাক।

একাত্তরের ২১ নভেম্বর দিবাগত রাত। সিরু মিয়া দারোগা, তাঁর ১৪ বছর বয়সী ছেলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নজরুল ইসলামসহ ৩৮ জনকে পাকিস্তানী সেনারা ব্রাম্মণবাড়িয়া কারাগার থেকে শহরের পৈরতলা রেলব্রিজের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল গোলাম আযমের নির্দেশে।

অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির গোলাম আযমের প্রচেষ্টায় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, পাইওনিয়ার ফোর্স প্রভৃতি সহযোগী বাহিনী গঠিত হয়। তাঁর নেতৃত্বে ও নির্দেশে এসব বাহিনী সারাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে এবং এসব অপরাধ করতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করে। অভিযোগে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২) ধারায় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা এবং এ ধরনের অপরাধে নেতৃত্ব, সহায়তা, প্ররোচনা ও উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সিরু মিয়া দারোগাসহ ৩৮ জনের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ অনুসারে, কুমিল্লার হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের সিরু মিয়া একাত্তরে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় দারোগা (সাব-ইনস্পেক্টর) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৮ মার্চ তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও ১৪ বছরের ছেলে আনোয়ার কামালকে নিয়ে কুমিল্লার নিজ বাড়িতে যান। সেখানে সিরু মিয়া শরণার্থীদের ভারতে যাতায়াতে সাহায্য করতেন। ২৭ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে কসবা থানার তন্তর চেকপোস্টের কাছে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেসহ ছয়জন ভারতে যাওয়ার সময় রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। তাঁদের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে কয়েকদিন নির্যাতনের পর ব্রাম্মণবাড়িয়া কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। স্বামী-সন্তানের ধরা পড়ার খবর পেয়ে আনোয়ারা বেগম তাঁর ভগ্নিপতি খিলগাঁও সরকারি স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ মুহসিন আলী খানের মাধ্যমে গোলাম আযমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মুহসিন আলী ছিলেন গোলাম আযমের দুই ছেলে আজমী ও আমীনের শিক্ষক। তিনি গোলাম আযমের কাছে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেকে মুক্তি দিতে অনুরোধ জানান। গোলাম আযম ব্রাম্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটির নেতা পেয়ারা মিয়ার কাছে একটি চিঠি পাঠান যাতে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেকে হত্যার নির্দেশ ছিল। চিঠি পাওয়ার পর ঈদের দিন রাতে সিরু মিয়াসহ ৩৯ জনকে পাকিস্তানি সেনারা রাজাকার ও আল-বদরদের সহযোগিতায় কারাগার থেকে বের করে নিয়ে যান। পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে ওইদিন ৩৮ জন মারা গেলেও একজন প্রাণে বেঁচে যান। ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে আনা হবে।

বাকি ৫১ অভিযোগ অনুসারে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, রাজাকার ও সহযোগী বাহিনীগুলো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সারা দেশে যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটিয়েছে, নেতা হিসেবে গোলাম আযম এসব অপরাধ করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা করতে উৎসাহ, প্ররোচণা ও উসকানি দিয়েছেন।

গণহত্যায় প্ররোচনা: আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ২ মে জামায়াতের ঢাকার কার্যালয়ে এক কর্মীসভায় গোলাম আযম মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটনে দলের নেতা-কর্মী ও অনুসারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। ১৭ মে ঢাকায় সাবেক এমএনএ আবুল কাসেমের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় গোলাম আযম ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সশস্ত্র অভিযানকে সর্বাÍক সমর্থন জানান। তিনি এই অভিযানকে ‌’মহান কাজ’ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ উল্লেখ করেন। ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীর চর্চা কেন্দ্রে তিনি গণহত্যাকে সমর্থন করে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর কাজ দেশ রক্ষা করা এবং তারা তা করছে।
অভিযোগ অনুসারে, ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের ২৫তম আজাদী দিবস উপলক্ষ্যে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সভায় গোলাম আযম ঘরে ঘরে দুশমন খুঁজে বের করে তাঁদের উৎখাতের মাধ্যমে গনহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য প্ররোচিত করেন।

শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠন: আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুসারে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানের পর ৪ এপ্রিল বিকেলে গোলাম আযমসহ ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‌’খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে নাগরিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এর দুই দিন পরে গোলাম আযম সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের পূর্ব পাকিস্তানের সভাপতি পীর মোহসীনউদ্দিন আহমদ ও এ টি সাদী আবারও টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী’ উল্লেখ করে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পরে ৯ এপ্রিল ঢাকায় নাগরিকদের প্রতিনিধিসভায় খাজা খয়েরউদ্দিনকে আহ্বায়ক ও গোলাম আযকে সদস্য করে ১৪০ সদস্যের নাগরিক শান্তি কমিটি গঠন করা হয়।
১৫ এপ্রিল শান্তি কমিটির ২১ সদস্যের একটি কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়, যার একজন সদস্য ছিলেন গোলাম আযম। পরদিন সন্ধ্যায় ওই কমিটি টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড সমর্থন করেন। ২১ এপ্রিল শান্তি কমিটিকে আরও গতিশীল করতে ছয় সদস্যের একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়, যার দুই নম্বর সদস্য ছিলেন গোলাম আযম। ১৮ জুলাই ব্রাম্মণবাড়িয়ার রিপাবলিক স্কোয়ারে আয়োজিত এক সভায় গোলাম আযম শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের কর্মকাণ্ড অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
১৭ আগস্ট মোহাম্মদপুরে শারিরীক শিক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষাগ্রহণরত রাজাকার শিবির পরিদর্শনের সময় গোলাম আযম তাঁদের রাজাকার ও মুজাহিদ বাহিনীতে ভর্তি হয়ে সশস্ত্র হওয়ার আহ্বান জানান। ১১ সেপ্টেম্বর কার্জন হলে ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা মহানগর শাখার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পাকিস্তানকে রা করতে নতুন কর্মী বাহিনীর দরকার। ছাত্র সংঘের নেতাকর্মীদের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এরাই পাকিস্তানকে চিরস্থায়ী করতে সক্ষম হবে।
অভিযোগ অনুসারে, ১ ডিসেম্বর রাওয়ালপিণ্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ৭০ মিনিটের এক বৈঠকে গোলাম আযম বলেন, তথাকথিত মুক্তিবাহিনীকে মোকাবেলা করার জন্য রাজাকাররাই যথেষ্ট। এজন্য রাজাকারের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
রাজাকারদের অস্ত্র সরবরাহের আহ্বান: অভিযোগ অনুসারে, ১৯ জুন গোলাম আযম রাওয়ালপিণ্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করে মুক্তিযোদ্ধাদের মোকাবেলার জন্য রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানান। পরদিন লাহোরে জামায়াতের পশ্চিম পাকিস্তান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে দুষ্কৃতিকারীরা সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের প্রতিরোধের জন্য শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র সজ্জিত হওয়া উচিত। ১৬ আগস্ট গোলাম আযম লাহোর বিমান বন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, ভারত পূর্ব পাকিস্তানের দুষ্কৃতিকারীদের অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করছে এবং পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করতে অনুপ্রবেশকারী পাঠাচ্ছে। অস্ত্রের মাধ্যমে এর জবাব দিতে হবে।
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহের কোনো একদিন গোলাম আযম জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য লাহোর যান। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ অব্যাহত আছে। তাঁদের প্রতিরোধ করতে শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের উন্নতমানের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত করতে হবে।

সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ: ১৬ জুলাই রাজশাহী মিউনিসিপ্যাল হলে এক সুধী সমাবেশে গোলাম আযম বলেন, হিন্দুরা মুসলমানের বন্ধু এমন প্রমাণ করার মতো কোনো দলিল নেই। তাঁরা চিরদিনই মুসলমানের দুশমনী করে এসেছে। ৩১ আগস্ট করাচীতে জামায়াতের কার্যালয়ে গোলাম আযম বলেন, কোনো ভালো মুসলমান তথাকথিত ‘বাংলাদেশ আন্দোলনের’ সমর্থক হতে পারে না।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে দালিলিক সাক্ষ্য হিসেবে যেসব নথি সংযুক্ত করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রতিবেদন (জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র সংঘ ও শান্তি কমিটি), পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, শান্তি কমিটির সঙ্গে রাজাকার, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনের যোগাযোগের নথি ও ছবি, ভিডিওচিত্র এবং একাত্তরের বিভিন্ন পত্রিকা ও বিদেশী টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদন।

৩.
এবার তাহলে গোলাম আযমের নিজের লেখা পড়া যাক। এতেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমান করা যায়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় অধ্যাপক গোলাম আযম নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় জনগণকে আওয়ামী লীগকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলতেন, ‘তারা ক্ষমতা পেলে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান বাংলাদেশ) আলাদা করে ফেলতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে আপনারা পাকিস্তানের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগই হয়ত পাবেন না।’
এ হচ্ছে গোলাম আযমের আত্মজীবনীর ৩য় খণ্ডরে ১০৭ পৃষ্ঠার মন্তব্য। বইটির নাম জীবনে যা দেখলাম। বইটির তৃতীয় খণ্ডের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধবিরোধী নানা মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও রাজাকার বাহিনীর সাফাই গেয়েছেন, পাক বাহিনীকে সহযোগিতা করার যুক্তি খুঁজেছেন, বর্ণনা করেছেন শান্তি কমিটি গঠনের প্রেক্ষাপট। তার দাবি, শান্তি কমিটির সঙ্গে জনগণের কোনো শত্রতা ছিল না, মুক্তিযোদ্ধাদের কারণেই জনগণের সঙ্গে তাদের দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
গোলাম আযমের মতে, ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ কোনো গৌরবময় অর্জন নয় বরং তা হলো ‘পাকিস্তান বিভক্তি ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিষাদময় কাহিনী’ (পৃ-২১১)। একই পৃষ্ঠায় তিনি লিখেন, ‘১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সংকট ছিল বহিঃশক্তি জড়িত দলাদলির ব্যাপার, যাতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উপাদানসমূহ এবং আন্তর্জাতিক উপাদানসমূহ এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ-পরিস্থিতির যোগসূত্র ছিল।’
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের সাফাই গেয়ে গোলাম আযম লিখেন, ‘সামরিক বাহিনীর অভিযানের ফলে জনগণ যে অসহায় অবস্থায় পড়ে আমাদের কাছে আসছে আমাদেরকে যথাসাধ্য তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এ পরিস্থিতিতে জনগণের সামান্য খিদমত করতে হলে সামরিক সরকারের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমেই তা সম্ভব (পৃ-১৪৩)।’
জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের সময় ততকালীন সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাত করেই সামরিক বাহিনীকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে গোলাম আযম পরের পৃষ্ঠাতেই উল্লেখ করেন। টিক্কা খানের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রার আহ্বান জানিয়ে রেডিওতে ভাষণ দেন বলেও তিনি একই পৃষ্ঠায় লিখেন। ভাষণে গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধের অজুহাতে ভারত বাংলাদেশ দখল করতে চায় উল্লেখ করে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। এই ভাষণ প্রচারের পরই সারা দেশে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগের হুমকির মুখে পড়ে- এটাও উল্লেখ করেন তিনি।
পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আঁতাত করে জামায়াত দেশবাসীর উপকার করেছে- জীবনীতে এমন দাবিও করেছেন জামায়াতের সাবেক আমির। জনৈক সূর্য্য মিয়াকে পাক সেনাবাহিনী তার সুপারিশে ছেড়ে দিয়েছিলে উল্লেখ করে তিনি লিখেন, ‘চোখবাঁধা অবস্থায় তাকে (সূর্য্য) জিপ থেকে এক সৈনিক লাথি দিয়ে ফেলে দিয়ে গেল। লাথি মারার সময় নাকি বলল, কোন গোলাম আযম নাকি সুপারিশ করেছে, যা বেঁচে গেলি (পৃ-১৪৫)।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘শেখ মুজিবের আত্মীয় হওয়া ছাড়া তার (সূর্য্য) আর কোনো অপরাধ নেই (পৃ-১৪৪)’।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর নানা অপকর্মের সহযোগী রাজাকার বাহিনীকে দেশপ্রেমিক এবং মুক্তিযুদ্ধকে নাশকতামূলক ততপরতা উল্লেখ করে তৃতীয় খণ্ডের ১৫০ পৃষ্ঠাতে গোলাম আযম লিখেন, ‘যে রেযাকাররা (রাজাকার) দেশকে নাশকতামূলক ততপরতা থেকে রার জন্য জীবন দিচ্ছে তারা কি দেশকে ভালবাসে না? তারা কি জন্মভূমির দুশমন হতে পারে?’
গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারাই পাক সেনাবাহিনীকে হিংস্র হতে বাধ্য হয়েছে বলেও দাবি করেন ১৫২ পৃষ্ঠাতে। তার দাবি, মুক্তিযোদ্ধারা অবাঙ্গালিদের নির্বিচারে হত্যা করেছে এবং এর প্রতিশোধ নিতেই পাক বাহিনী বাঙ্গালিদের প্রতি নৃশংস হতে বাধ্য করেছে। গোলাম আযম পাক সেনাবাহিনীর নৃশংসতাকে ‘মোটাবুদ্ধির সৈনিকদের অনর্থক’ কাজ বলেও উল্লেখ করে পরের পৃষ্ঠাতে লিখেন, ‘মোটা বুদ্ধির সৈনিকরা এভাবে কিছু হিন্দুকে অনর্থক মেরে হিন্দু সম্প্রদায়কে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করল।’
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে শান্তি কমিটি গঠনের লক্ষ্যে প্রাদেশিক গভর্নর নূরুল আমিনের বাসায় এক বৈঠকে গোলাম আযম বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান টিকে থাকুক, আমাদের দেশ ভারতের খপ্পর থেকে বেঁচে থাকুক- এটা অবশ্যই আমাদের আন্তরিক কামনা (পৃ-১৫৬)। দুই পৃষ্ঠা পরেই তিনি আক্ষেপ করে লেখেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা শান্তি কমিটির সঙ্গে শত্রুতা না করলে জনগণের পর্যায়ে শান্তি কমিটি ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হতো না।’
জীবনীর তৃতীয় খণ্ডের ‘১৬ ডিসেম্বরে আমার অনুভূতি’ শীর্ষক অধ্যায়ে গোলাম আযম লিখেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যেই চূড়ান্ত ফায়সালা হয়ে যাবে তা ধারণা করিনি বলে মনের দিক দিয়ে প্রস্তুত ছিলাম না’। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার অনুভূতি জানাতে গিয়ে মাসিক উর্দু ডাইজেস্টের সম্পাদক আলতাফ হোসাইন কুরাইশীকে তিনি বলেছিলেন, ‘উপমহাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম হিন্দু ও শিখ বাহিনীর নিকট প্রায় এক লাখ সশস্ত্র বাহিনী আত্মসমর্পন করলো। ইংরেজ আমলেও মুজাহিদ বাহিনী শিখদের নিকট আত্মসমর্পণ করেননি। তারা শহীদ হয়েছেন’ (পৃ-২৪২)।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আগেই গোলাম আজম ‘৭১ এর ২২ নভেম্বর জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বৈঠকে যোগ দিতে পাকিস্তান যান। এরপর তিনি দীর্ঘদিন আর দেশে ফিরেননি।
গোলাম আযমের আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডে ক্রিকেট খেলা প্রসঙ্গে তার মন্তব্যেও তার পাকিস্তান প্রীতি স্পষ্ট হয়েছে। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল পাকিস্তান দলকে পরাজিত করায় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ৭১-এর মতো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে খেলার ফলেই বিজয় সম্ভব হয়েছে। এই মন্তব্যের সমালোচনা করে গোলাম আযম লিখেন, ‘খেলা খেলাই। এর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকে টেনে এনে তিনি (শেখ হাসিনা) অযথাই হাস্যষ্পদ হলেন’। অথচ পরের অনুচ্ছেদেই গোলাম আযম লিখেন, ‘পাকিস্তান মাঝে মাঝে সাধারণ দলের নিকট পরাজিত হলেও ভারতের নিকট খুব কমই পরাজিত হয়েছে। জানি না পাকিস্তানী দল ৪৭ এর চেতনা নিয়েই ভারতের বিরুদ্ধে খেলে কিনা (পৃ-১২৬)।’
গোলাম আযম এ প্রসঙ্গে আরো বলেছেন, ঢাকা স্টেডিয়ামে যতবার ভারত ও পাকিস্তান দলের খেলা হয়েছে প্রতিবারই ‘বাংলাদেশী দর্শকের শতকরা প্রায় ৯৯ জনই পাকিস্তান দলের প্রতিই আবেগপূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যানার প্রদর্শন করলেও তা দর্শকদের মনে সামান্য প্রভাবও বিস্তার করতে পারেনি। দর্শকরা ঐ ব্যানার দেখে মন্তব্য করেছে ”রাখ মিয়া মুক্তিযুদ্ধের কথা, এখানে মুসলমানদের বিজয় চাই”।
একই খণ্ডে জামায়াতের সাবেক আমির আরো লিখেন, ‘ধর্মনিরপেবাদী ও ভারতপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের মন্তব্যের কথা শুনেছি। তারা নাকি বলেন, আমরা বছরের পর বছর চেষ্টা করে যুবসমাজের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঞ্চারের জন্য যে আপ্রাণ চেষ্টা করি তা স্টেডিয়ামে পাক-ভারত খেলায়ই নস্যাত হয়ে যায় (পৃ-১২৭)।’
স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রমতার অংশীদার করায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূয়সী প্রশংসাও করেছেন গোলাম আযম। আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ডের ১৭৭ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণেই তিনি ‘স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিভাজন বর্জন করে সকলকেই তার সংগঠনে সমবেত করেন। ৭১-এ তার বিপরীত ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও শাহ আজিজুর রহমানের ওপর প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতার দায়িত্ব অর্পণ করেন।’
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারেরও ঘোর বিরোধী গোলাম আযম। তার মতে, ‘মুজিব হত্যার বিচার জনগণের উপর মহা অবিচার।’ দ্বিতীয় খণ্ডের তিনি লিখেন, ‘কয়েকজন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা সফল সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশকে উদ্ধার করেন।…এটা যদি সাধারণ হত্যা হয়ে থাকে তাহলে গোটা দেশবাসীকেই আসামি করা প্রয়োজন ছিলো। কারণ এ হত্যায় তারা আনন্দ ও উল্লাস করেছে।'(পৃ-১৭৪)।

অনেক দিন পর আসলাম। গোলাম আযমের কারণে আসতে হলো। রাব্বী রীতিমত আমার নাম-ঠিকানা সঙগ্রহ করে বিশাল এক মেইল দিয়ে গোলাম আযম নিয়ে এই লেখাটা দিতে বললো। পুরো লেখাটা অবলম্বনে আমি প্রথম আলোতেও লিখেছি। সেটি পড়া যাবে এখানে, ‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও গণহত্যার প্রতীক’

এটা আমার ১০০ তম পোস্ট। দীর্ঘদিন কিন্তু নার্ভাস নাইনটিতে আটকা ছিলাম

৫,৩৩৫ বার দেখা হয়েছে

২২ টি মন্তব্য : “‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও গণহত্যার প্রতীক’”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    দারুন একটা পোস্ট, আগেই পড়েছিলাম :hatsoff: :hatsoff:

    ওয়েলকাম ব্যাক মাসুম ভাই, সেই সাথে শততম পোস্টের শুভেচ্ছা 🙂


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  2. রাব্বী (৯২-৯৮)

    বিচারটা শেষ পর্যন্ত কি হয় দেখার ইচ্ছা। ইতিহাস ক্ষমা করবে না বলেই বিশ্বাস। তারপরও জানোয়ারগুলিরে বিশ্বাস নেই।

    কাটেইন গণহত্যা: একটি সিনেমা, ইতিহাস খুঁজে দেখা এবং বাংলাদেশ প্রসঙ্গ লেখাটার কথা মনে পড়লো!


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন
  3. রেজা শাওন (০১-০৭)

    আমার এলাকা দুঃখজনকভাবে রাজাকার অধ্যুষিত এলাকা( জয়পুরহাট-১)।

    জামায়েতর এক্স আমির আব্বাস এবং দুই নাম্বার যুদ্ধঅপরাধী আব্দুল আলিম( সাবেক সাংসদ) আমার এলাকার সূর্য সন্তান।

    আব্বাসের জানাজায় হাতে গোনা কিছু লোক জমায়েত হইছিল। তুমুল মাইকিংও কাজে আসে নাই।

    মৃত্যুর পর নাকি মানুষের অপরাধ থাকে না। তারপরও কিন্তু মানুষ ক্ষমা করতে পারে নাই।

    এদের স্বল্পতম সময়ে বিচার হোক। এটা একটা জাতীয় ইস্যু। তাই পুনরায় কোন রাজনৈতিক দল এটাকে ইস্যু বানানোর আগেই জানোয়ারগুলাকে সাইজ দেওয়া হোক।

    জবাব দিন
  4. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    সেঞ্চুরীর শুভেচ্ছা 😀 😀 😀
    কোন কথা নাই সোজা :gulli2: করা হউক 😡


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।