এক টেরোরিস্টের জন্ম

ভূমিকা

প্রায় তিন বছর আগে একটি খবর ও কয়েকটি ছবিতে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছিল। পাইলট বিহীন ‘ড্রোন’ বিমানের বোমা বর্ষনে আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত শাহ ওয়ালীকোট নামের এক স্থানে এক বিয়ে বাড়িতে অন্তত ১০ জন মহিলা, ২৩ জন শিশু এবং ৪ জন পুরুষ মারা গেছে এবং আরো ৩০ জন আহত হয়ে মত্যুর সাথে যুদ্ধ করে চলেছে। আহতদের মধ্যে বিয়ের কনেও এক জন। সুন্দর চেহারা ঝলসে গেছে বোমার বিস্ফোরনের আগুনে।

এর পর চেষ্টা করেও কনে সম্পর্কে আর কিছু জানতে পারিনি। তখন শুরু করেছিলাম এই গল্পটি লিখতে। নানা কারনে গল্পটি লেখা শেষ করা হয়নি তখন।

৯/১১-এর এক দশক পরে আমাদের সবারই উচিৎ নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা। তাই আজকের দিনে এই গল্পটা প্রকাশ করলাম।

এই গল্পটি কাল্পনিক, তবে এমন হওয়াটা একেবারে যে অসম্ভব তা হয়তো নয়।

আমেরিকা

জন তার সিফটের শেষে যখন অফিস থেকে বের হয়ে এলো, বাইরে তখনো অন্ধকার। নভেম্বরের শুরুতে সকাল ৬-৩০ টা ৭ টার আগে সূর্য ওঠে না। জন তার ওভারকোটটা ঠিক মত টেনে নিলো গায়ের উপরে, তার পর হাটা শুরু করলো পাকিং লটে তার গাড়ীর দিকে। গাড়ীর ভিতরে মনে হলো যেন আরো ঠান্ডা। ইঞ্জিন স্টার্ট করে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলো গাড়ী গরম হবার জন্যে। এই হাই সিকিউরিটি কম্পাউন্ড থেকে বের হবার আগে গেটে তার আই,ডি ব্যাজ স্কান করার পর সিকিউরিটি কোড পাঞ্চ করতে হলো।

জন ‘মেরিন ও এয়ার ফোর্স সার্ভেল্যান্স মনিটরিং সেন্টারে’ এক হাই সিকিউরিটি অফিসে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউরাল কম্পুউটেশন ও ম্যাথেমেটিক্সে মাস্টার ডিগ্রী পাবার পর কম্পুউটার সায়েন্সে পি, এইচ, ডি লাভ করে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কিছু দিন কাজ করার পর বর্তমানের এই কাজে নিযুক্ত হয়েছে সে। তার বর্তমান দায়িত্ব হচ্ছে ‘এম-কিউ’ টাইপের ‘প্রেডিটর’ বিমানের ‘রেস্পন্স টাইম মনিটর’ করা এবং তার উন্নতি করা। ‘প্রেডিটর’ বিমানের আর এক নাম হচ্ছে ‘ড্রোন’ বা ‘চালক-বিহীন বিমান’।

জনের একাদশ জন্মদিনে তার বাবা তাকে উপহার দিয়েছিল একটি ‘রিমোট কন্ট্রল’ খেলনা প্লেন। কি যে খুশী হয়েছিল সে তখন। পারলে সারাক্ষণ সেই খেলনা প্লেন নিয়ে সময় কাটাতো। নিজের মনেই হাসলো জন। এখনো যেন সেই নেশা যায়নি তার। এখনো খেলে বেড়াচ্ছে এমনি চালক-বিহীন বিমান নিয়ে। তফাতটা হচ্ছে – অনেক ধংশ করার ক্ষমতা রাখে তার ‘বর্তমান খেলনা’।

খুব সম্প্রতি এই ‘ক্লাসিকাল এম-কিউ – ১ প্রেডিটর’ বিমানের সফটওয়ারে কিছু পরিবর্তন করেছে জন। যথারীতি ‘কোয়ালিটি এসুউরেন্স টেস্টিং’ পাশ করার পর এই ‘সফটওয়ার প্যাচটি’ পাকিস্তানের একটি টেস্ট ফ্লাইট সেন্টারে বর্তমান সফটওয়ারের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে টেকনোলজির পরিবর্তন এত দ্রুত ঘটে যাচ্ছে যে এর সাথে তাল মিলিয়ে চলা দূরূহ হয়ে যাচ্ছে। একই সাথে সমস্ত পথিবীটা ক্রমেই যেন ছোট হয়ে আসছে – যেন ছোট একটি গ্রাম। ‘শাহ ওয়ালী কোটে’-এর মত ছোট একটি গ্রাম।

হঠাৎ জন অবাক হয়ে গেল। ‘শাহ ওয়ালী কোট’ – এই নামটি তার কেন মনে হলো। তারপর মনে পড়লো গত রাতের ঘটনা। গত রাতে তার উপর রাতের শিফটের ভার পরেছিল। উদ্দেশ্য হচ্ছে, সে যেন চুড়ান্ত ‘অপারেশনাল টেস্টের’ সময় ব্যাক-আপ হিসাবে কাজ করতে পারে। টেস্টের সময় কোন ত্রুটি বের হলে সে যেন সঠিক মনিটরিং-এর মাধ্যমে ত্রুটিটা খুজে বের করতে পারে এবং সফট-ওয়ারে প্রয়োজনীয় পরিবর্ধণ করতে পারে। যদিও রাতটা ভাল ভাবে কাটেনি।

রিসালপুরের ফিল্ড ষ্টেশন বার্তা পাঠিয়েছিল যে প্রেডিটর তার পরীক্ষামূলক লক্ষ্য স্থির করেছে। তবে দ্বিতীয় পাসের সময়, যখন গ্রাউন্ড কন্ট্রল মিসাইল ছাড়তে যাবে, তখন একটা এলার্ট দিয়ে সফট-ওয়ার ‘হ্যাংগ’ হয়ে যায়। জনের জন্যে ঠিক মতো এই পরীক্ষাটা উৎরে যাবার প্রয়োজনীয়তা ছিল। সফট-ওয়ার পরিবর্ধণে সব চাইতে বেশী কাজ সেই করেছে। সে বাধ্য হয়ে নতুন প্যাচটির উপর সুপার-রাইডিং অধিকার চাইলে সংগে সংগে সেটা মঞ্জুর হয়ে আসে। সে তখন চেক করে দেখলো যে তার কনসোল থেকে ‘প্রেডিটর’ ‘মনিটর ও কন্ট্রল’ করতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না। সে তার সুপারভাইজারের সাথে কথা বললে, সুপারভাইজার জনের জন্যে মিশন কন্ট্রলের ক্ষমতা দিয়ে দিল। জন পাকিস্তানের গ্রাউন্ড কন্ট্রলারের কাছে লক্ষ্যবস্তুর ‘জিপিএস’ চাইলে তখনি সেটা এসে হাজির হলো তার কাছে। সে সেই কোয়ার্ডিনেট নাম্বারগুলি তার কনসোলে প্রবেশ করিয়ে পরবর্তি পাসে ‘মিসাইল ফায়ারিং’ নির্দিষ্ট করে ‘সেট’ করলো। গ্রাউন্ড কন্ট্রল থেকে খবর এলো সঠিক ভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত আনা হয়েছে। তার এই কৃতিত্বে খুশী হল জন। লক্ষ্যবস্তুটি কি, সে সম্পর্কে কোন ধারনা ছিল না জনের, কিন্তু সে যখন আফগানিস্তানের একটা বড় উচ্চ রেজুলেশনের ম্যাপের উপরে লক্ষ্যবস্তুটি সুপার-ইম্পোজ করলো – তখন সে খেয়াল করলো প্রথম বারের মত – গ্রামের নামটি – ‘শাহ ওয়ালী কোট’।

জন তার ‘ফেসিলিটির কম্পাউন্ড’ থেকে বের হয়ে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলো। সূর্য তখন উদয়ের পায়তারা করছে। খুব সুন্দর এক সকাল। বিগত কয়েক মাসের কাজের পর আজকের সাফল্যে মনটা আরও বেশী খুশী তার। জন বাড়ীর রাস্তায় মোড় নেবার আগে কাছের গ্যাস স্টেশনে থামলো। এখান থেকেই সে সাধারনত গাড়ীতে তেল নিয়ে থাকে। সে তার ট্যাঙ্ক ভর্তি করার পর দোকানের ভিতরে ঢুকলো একটি ‘ক্যাপিচিনো কফি’ নেবার জন্যে।

এই গ্যাস স্টেশনের মালিক হাসিব খান অনেকটা তার বন্ধুর মতো হয়ে গেছে। জন হাসিবকে পছন্দ করেছে যখন দেখেছে কতটা বেশী কাজ করে সে। হাসিব এবং তার স্ত্রী সালমা – দু’জনে মিলে চালায় এই দোকানটি। দু’জনে মিলে ২৪ ঘন্টা খোলা রাখে তারা এই দোকানটি। তার মানে এরা প্রত্যেকে দৈনিক প্রায় ১২ ঘন্টা করে কাজ করে। তাদের কোন সন্তান নেই। হাসিব বা সালমার কারও একজনের হয়তো কোন অসুবিধা আছে। তা সত্ত্বেও হাসিব ও সালমাকে খুব সুখী মনে হয়। সালমা দেখতে সুন্দরী – বেশ লম্বা এবং স্বাস্থবতী। তার ইংরেজী হাসিবের চেয়ে ভাল। এরা দু’জনেই কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছে। ২০ বছর আগে তারা যখন প্রথম আমেরিকা এসেছিল তখন তাদের কিছু ছিল না। আজ তারা এই গ্যাস স্টেশনের মালিক এবং অন্য একটি গ্যাস স্টেশনের আংশিক মালিক। হাসিব জনকে জানিয়েছে যে যখন তার ছোট ভাই, আসলাম আমেরিকা চলে আসবে, তখন হাসিব অন্য গ্যাস স্টেশনের সম্পুর্ণ মালিকানা নিয়ে নেবে এবং ভবিষ্যতে তার ছোট ভাইকে সেটার ভার দিয়ে দেবে।

বিগত ১০ বছর আমেরিকান নাগরিক হিসাবে থাকার পর তার ছোট ভাইকে এ দেশে ইমিগ্রান্ট হিসাবে আনার আইনত অধিকার তার হয়েছে। কয়েক বছর আগেই এ জন্যে আবেদন করেছিল হাসিব। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া অনেক স্লথ হয়ে গেছে। যে কোন অনুমতি পেতে আগের থেকে বেশী সময় ব্যয় করতে হয়। অবশেষে গত মাসে আসলাম অনুমতি পেয়েছে এখানে আসার। এসব কথা জেনে জনও খুশী হলো। হাসিবকে জানালো যদি আসলামের জন্যে কখনো কোন সাহায্য প্রয়োজন হয় তা হলে যেন জনকে জানাতে শংকা বোধ না করে তারা।

আফগানিস্তান

আসলাম যখন ঘুম থেকে উঠলো তখন ফজরের নামাজের সময় অনেকক্ষণ হল পার হয়ে গেছে। আজকাল আর তেমন নিয়ম মত নামাজ পরে না আসলাম । আগেও যে খুব একটা পড়তো তা নয় – তবে যেহেতু অন্যরা অন্তত শুক্রবারের জুমার নামাজ পড়তে যায়, সেও সবার সাথে ঐ দিন জামাতে অংশ নিতে যায়। দুই সপ্তাহ আগে সে তার পাসপোর্টে আমেরিকা যাবার ভিসার সীল মারতে পেরেছে। তার বড় ভাই হাসিব কয়েক বছর আগে তার জন্যে এই আবেদন করেছিল। তারপর আমেরিকাতে ৯/১১ ঘটনার পর সব কিছু উলট-পালট হয়ে গেল। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পড়াশুনা চলছিল, কিন্তু তালিবান সরকার এসে অনেক কিছু বদলে দিল। সেই ধাক্কা পার হতে না হতে আমেরিকার দখলে গেল আফগানিস্তান। আমেরিকার আফগানিস্তান আক্রমনের পর সব কিছু আবার বদলে গেল। আসলাম ফিরে এল শাহওয়ালী কোটে তাদের নিজেদের বাড়ীতে। তার এক সময়ের খুব ঘনিষ্ট বন্ধু রফিক অনেক দিন আমেরিকায় কাটিয়ে হঠাৎ করে ফিরে এল। তাদের এলাকার বেশ কিছু লোক বেশ অনেক দিন থেকে আমেরিকায় থাকে – যেমন আসলামের বড় ভাই হাসিব। এদের অনেকেই সোভিয়েত দখলের পর দেশ ত্যাগ করেছিল নিজেদের আত্বরক্ষার কারনে। রফিকের এক মামা ছিল আমেরিকাতে – তিনি স্পন্সর করে নিয়ে গিয়েছিলেন রফিককে। এখন এই দুই বন্ধুর তেমন কিছু করার নেই। তাই রোজ একবার করে দেখা হয় তাদের মধ্যে। নানা বিষয়ের গল্প হয়। রফিকের কাছ থেকে আমেরিকার গল্প শুনে অনেক কিছু জানা হয়ে গেছে তার। আসলে রফিকের ফিরে আসাতে বেশ অবাক হয়েছিল আসলাম।

– সত্যি বলতো কেন পছন্দ হল না তোমার ওখানে? আগে তো সব সময় চিঠি লিখতে আমাকে ওখানে আসার জন্যে।
– আগে লিখতাম ঠিকই, তারপর ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে আস্তে আস্তে কেমন যেন অনেক কিছু বদলে যেতে লাগলো। আমার মনে হতো সবাই যেন আমার দিক কেমন ভাবে তাকাচ্ছে।
– এটা তোমার বোঝার ভুল হতে পারে।
– হয়তো বা – একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লো রফিক।
– হঠাৎ কি হল?
– তোমার মনে আছে তোমাকে ইভিতার কথা লিখেছিলাম?
– হু, খুব মনে আছে। তার মত ভাল মেয়ে হয় না – কত কি লিখতে।
– আসলেই, খুব ভাল মেয়ে ছিল সে।
– যোগাযোগ আছে এখনো?
– না, আর কোন যোগাযোগ নেই তার সাথে।
– কেন?

খানিকক্ষণ চূপ করে রইল রফিক। তারপর আস্তে আস্তে বললো ইভিতার সব গল্প তার ঘনিষ্টতম বন্ধু আসলামকে।

আমেরিকা আসার পর অন্য অনেকের মত, সেও প্রথমে একটা রেস্টুরেন্টে কাজ নিয়েছিল নিজের খরচ যোগাড় করতে। সেখানেই ইভিতার সাথে প্রথম পরিচয়। ইভিতা তখন স্থানীয় এক কমুনিটি কলেজে পড়ে এবং পার্ট-টাইম ঐ রেস্টুরেন্টে একজন সার্ভারের কাজ করে। সেখানেই রফিকের সাথে পরিচয় তার। রফিক তখন সেখানে একজন ‘বাসার’-এর (busser) কাজ করে। বাসার-এর কাজ হচ্ছে টেবিল থেকে খাবারের পর প্লেট, গ্লাস, ছুরি-কাটা, ইত্যাদি উঠিয়ে নিয়ে ভিতরে ‘ডিস-ওয়াসার’-এর হাতে তুলে দেওয়া। তারপর টেবিল ভাল করে মুছে সেখানে আবার পরিস্কার নতুন খালি প্লেট, গ্লাস, ছুরি-কাটা, ন্যাপকিন ঠিক মত সাজিয়ে রাখা। বাসাররা কোন টিপস পায় না। রেস্টুরেন্টের কাজের একটা বড় অংশ আসে টিপস থেকে। তাই একটা অলিখিত নিয়ম হচ্ছে যে, দিনের শেষে সার্ভাররা তাদের পাওয়া টিপস-এর কিছু টাকা বাসারদেরকে দেয়। এই টাকার পরিমান সাধারণত ৫-১০ ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই খুব অবাক হল যেদিন পুরা একটা ২০ ডলারের নোট রফিকের হাতে গুজে দিল ইভিতা। অবাক প্রশ্ন চোখে তাকালো ইভিতার দিকে।

– আজ আমি ১৫০ ডলারের উপর আয় করেছি টিপস থেকে, তাই ভাবলাম এতে তোমারও হক আছে বেশী পাবার।
– সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র।

মিস্টি করে হাসলো ইভিতা। আসলেও খুব সুন্দরী ইভিতা। আর্জেন্টিনার মেয়ে সে। রফিকের মত সেও ভাগ্য অন্বেষনে এসেছে আমেরিকাতে। খুবই কর্মঠ মেয়ে। একই ধারে লেখা পড়াও চালিয়ে যাচ্ছে।

দু’জনেরই কাজের শিফট শেষ হয়েছে একসাথে।

– আজ আমারও ভাল দিন। যদি তোমার হাতে সময় থাকে, চল এক সাথে কফি খাই। – ভয়ে ভয়ে প্রস্তাব দিয়ে ফেললো রফিক।

নিজের ঘড়িতে সময়টা দেখে রাজী হল ইভিতা। কাছেই একটা কফি শপে ঢুকলো দু’জনে। সেই থেকেই তাদের পরিচয়। ক্রমে পরিচয় আরও গভীর হলো। ইভিতার উৎসাহে আসলাম ভর্তি হলো কলেজে। অনেক স্বপ্ন দুজনের চোখে।

এই পর্যন্ত বলে আবার চুপ করে গেল রফিক। নিজের মধ্যে কোন এক চিন্তায় আত্মমগ্ন হল সে।

– কি জন্যে তোমাদের ছাড়াছাড়ি হল। – জিজ্ঞাসা করলো আসলাম।
– আমরা চিন্তা করছিলাম বিয়ে করবো। তাই একদিন তার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করাতে তাদের বাড়ীতে নিয়ে গেল ইভিতা। মনে হল না আমাকে খুব একটা পছন্দ হয়েছিল তাদের। আমি স্প্যানিস জানিনা, এমনকি ভাল ইংরেজী বলতে পারিনা – এছাড়া এমন কিছু ভাল কাজও করছি না – তাই তার বাবা-মায়ের আমাকে পছন্দ না হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। প্রথমে তারা আমাকে ভারতীয় বা পকিস্তানী ভেবেছিল। ইভিতাও তাই মনে করেছিল। আফগানিস্তানের নাম কখনো শোনেনি তারা।
– তুমি বললে না তাদেরকে – আমাদের ২৫০০ বছরের ইতিহাস আর ঐতিয্য। এমনকি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান খনন করে দেখা গেছে উত্তর আফগানিস্তানে প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে মনুষ্য বসতি ছিল। সে তুলনায় আমেরিকারতো মাত্র ২৫০ বছরের ইতিহাস।
– আমেরিকাতো আমাদের কারও মাতৃভূমি না। আর্জেন্টিনায় কিন্তু ১৩,০০০ বছর আগের মনুষ্য বসতির নিদর্শন পাওয়া গেছে। কিন্তু সেটা ব্যাপার না। মূল ব্যাপারটা ছিল ধর্মকে নিয়ে। ইভিতার পরিবার গোড়া ক্যাথলিক। তারা চাইল আমিও ক্যাথলিক হই। এটা মানতে পারলাম না আমি। ঠিক হল আমি ও ইভিতা বিয়ের পর নিজের বিশ্বাস মত চলবো – কেউ কাউকে বেশী পরিবর্তন করাতে চেষ্টা করবো না।
– তারপর?
– ৯/১১-এর পর সব কিছু কেমন যেন ওলট-পালট হয়ে গেল। সারা আমেরিকা জুড়ে ইসলাম এবং মুসলমানদের নিয়ে অনেক মিথ্যা প্রচার শুরু হয়ে গেল। বিশেষ করে মেয়েদেরকে কতটা অত্যাচার করা হয় – বোরখা পড়া, স্কুল কলেজে পড়তে না দেওয়া, স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের সাথে মিললে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলা – এসব কথা সবাই জানতে লাগলো। ইভিতার মধ্যেও পরিবর্তন দেখলাম। সেও যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
– আমরা শুনেছিলাম আমেরিকার কোন একটা শহরে নাকি দাড়ি আর পাগড়ি দেখে একজন শিখকে ভুল করে মুসলমান মনে করে গুলি করে মেরে ফেলেছিল – সত্যি নাকি।
– হ্যাঁ, খবরটা সত্যি।
– তোমার কোন অসুবিধা হয়নিতো?
– আমাকে এফবিআই ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ছয় মাস আটক ছিলাম সন্দেহের কারনে। পরে জানতে পেরেছিলাম যে ইভিতার বাবা এফবিআই-কে খবর দিয়েছিল। এই ছয় মাসে ইভিতা এক বারও আমার কোন খবর নিতে আসেনি। আমার জীবনের আশা আমি এক সময় ছেড়েই দিয়েছিলাম। পরে বুঝলাম – ময়ুরপুচ্ছ লাগিয়ে ময়ুর হওয়া যায় না। ডিটেনশনে থাকার সময় আলাপ হয় এক জনের সাথে। সেই আমার চোখ খুলে দিয়েছে। তাই জেল থেকে ছাড়া পাবার পর আমেরিকার স্বপ্ন বাদ দিয়ে ফিরে এসেছি নিজের দেশে, যোগ দিয়েছি তালিবানদের সাথে।
– ওহ, এত কিছু জানতাম না আমি। কিন্তু তুমি কি এভাবে নিজের জীবনটা নস্ট করছো না?
– হয়তো বা তাই। যদি মরতেই হয় – শুধু শুধু মারা যাবার আগে না হয় একটু চেষ্টা করেই দেখি। আমি বলি কি, খামোখা আমেরিকা যাবার চিন্তা না করে তুমিও আমাদের সাথে আসো। অস্ত্র তুলে নাও হাতে।
– না দোস্ত। সেটা হয় না। তুমিতো জানো আমার আর জামিলার বহুদিনের স্বপ্ন। গত সপ্তাহে আমি ভিসা পেয়েছি। আশা করছি এই মাসের মধ্যেই রওয়ানা হতে পারবো। জামিলাকে আমি কথা দিয়েছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে ওখানে নেবার চেষ্টা করবো। তুমি তো জা্নো আমরা ছাড়া ওর আর কেউ নেই।

জামিলা আসলামের চাচাতো বোন। রাশিয়ান দখলদার সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যেয়ে জামিলার বাবা নিহত হয়েছিলেন। সেই থেকে জামিলারা আসলামদের আশ্রয়ে থাকে। খুব ছোট বেলা থেকে জেনে এসেছে যে তাদের মধ্যে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। সে ভাবেই আসলাম সব সময় জামিলাকে আগলে রেখেছে। জামিলাও জানে আসলাম তার হবু স্বামী। সুন্দরী জামিলা নিজেকে সেভাবেই গড়ে নিয়েছে।

আফগানিস্তানের অন্য সাধারণ মানুষদের তুলনায় আসলামরা বিত্তশালী। বেশ কিছু আবাদযোগ্য জমি এবং বাড়ীর মালিক তারা। বংশপরস্পরায় কিছু বিশ্বাসভাজন লোক আছে তাদের যারা এগুলির দেখাশোনা করে। আসলামের ছোট আরও দুই ভাই আছে। ফলে সে আমেরিকা চলে গেলেও কোন অসুবিধা হবে না। বরং হাসিবের মত মাসে মাসে টাকা পাঠাতে পারলে সবারই অবস্থার আরো উন্নতি হবে।

– আচ্ছা, এমন কি হল যাতে ইভিতার বাবা এফবিআই-কে খবর পাঠালো? – কৌতুহল দমন করতে পারলো না আসলাম।
– তুমিতো জানো আমার পরিবারের ছয় জন সদস্য রাশিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যেয়ে মারা গেছে। ওই সময় মূলত আমেরিকা টাকা এবং অস্ত্র-সস্ত্র দিয়ে আমাদেরকে সব সময় সাহায্য করতো। ঐ সাহায্যের জন্যে আমেরিকা সম্পর্কে আমার সব সময় খুব একটা উচ্চ ধারনা ছিল।
– আমার হাসিব ভাইয়াও এমনি চিন্তা করেন।
– কিন্তু কেউ যদি আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে খারাপ কিছু বলে, তাতে সব সময় প্রতিবাদ করতে যাই আমি। এমনি ভাবে এক দিন ইভিতার বাবার সাথে আলাপ করার সময় তিনি ইসলাম ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যা তা বলাতে বাধ্য হলাম তার প্রতিবাদ করতে।
– কি বলছিলেন তিনি?
– তিনি বুশের সাথে তাল মিলিয়ে বলছিলেন আমরা নাকি আমেরিকাকে হিংসা করি, আমেরিকার বাক-স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতাকে ভয় পাই, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আসলে একা ইভিতার বাবাকে দোষ দিয়ে লাভ নাই। অধিকাংশ আমেরিকান পৃথিবী সম্পর্কে খুব কম খবর রাখে।
– খবর রাখার সময় কোথায়? হাসিব ভাইয়া আর ভাবীকে তো শুনি সব সময় কাজে ব্যস্ত। খবর শুনবে বা পড়বে কখন।
– তাই আমি বাধ্য হলাম বলতে – ব্যাপারটা আদতেই তা নয়। এমন কি ওসামা বিন লাদেলও আমেরিকানদের কাছে লেখা এক খোলা চিঠিতে জানিয়েছিল মূল সমস্যাটা কোথায়। ইসরাইলের উল্লেখ ছিল সবার আগে প্রধান কারণ হিসাবে। কিন্তু আমেরিকার কোন মূলধারার টিভি বা সংবাদ পত্রে ইসরাইলের অন্যায় ভাবে প্যালেস্তাইন দখল করা নিয়ে বিশেষ কোন আলোচনা কখনো শুনিনি।

রফিকের পরিস্কার মনে আছে ইভিতার বাবার সাথে সেদিনের আলোচনার কথা।

– তাহলে ইসরাইলের কি করা উচিৎ বলে মনে হয় তোমার?
– খুব সোজা। আমরা আমেরিকার মূল নীতিগুলি যেমন সবাই পছন্দ করি – ঠিক সেগুলিই যদি ইসরাইল মেনে চলে তবে আর কোন সমস্যা থাকে না।
– মানে?
– মানে হচ্ছে সবাই সমান। রাস্ট্র ও ধর্ম একে অপরের উপর কোন প্রভাব ফেলবে না। সবার সমান বাক-স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থাকবে – ঠিক যেমন আমেরিকাতে মানা হয়। একই আইনের মানদন্ডে বিচার হবে সবার।

তর্কে ঠিক জিততে না পেরে খুশী হলেন না ইভিতার পিতা। পরে বন্দি থাকার সময় জেনেছিল যে রফিকের মুখে লাদেনের চিঠির কথা শুনে তার সন্দেহ হয়েছিল যে হয়তো রফিকের সাথে যোগাযোগ আছে তার। এই সন্দেহের কথাই সে ফোন করে জানিয়েছিল এফবিআই-কে। অথচ রফিককে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেই ব্যাপারটা পরিস্কার করে দিত পারতো রফিক। বলে দিতে পারতো লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকাতে পুরা চিঠিটা ছাপা হয়েছিল।

হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আসলাম উঠে দাঁড়ালো।

– এত তাড়াতাড়ি কোথায় যাচ্ছো?
– জামিলা গেছে বেচবাগতু গ্রামে, তার বন্ধুর বিয়েতে। আমারও দাওয়াত সেখানে। আমাকে বলেছে ফেরার সময় তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসতে।
– ওহ, আব্দুল জলিলের ভাগনীর বিয়েতে – যাও ভাল করে খেয়ে আর মজা করে আসো।
– চল, তুমি যাবে আমার সাথে।
– না, আজ আমার কাজ আছে। ওদিকের পাহাড়ের উপর আমাদের একটা দল আছে। আর একদিন যাবো ওদিকে।

আসলাম যখন বিয়ে বাড়ীতে এসে পৌছালো তখন দেখলো একদল লোক ইতিমধ্যে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। কনের ভাই আবদুল জহির আসলামকে দেখে জড়িয়ে ধরলো।

– আসলাম ভাই, এবার আপনার বিয়ের দাওয়াত কবে খাবো? শুনলাম আপনি নাকি শিঘ্রী আমেরিকা চলে যাবেন। বিয়ে করে যাবেন, নাকি পরে এসে বিয়ে করবেন?
– হবে, হবে। অত ব্যস্ততার কি আছে। আচ্ছা তুমি কি জামিলাকে দেখেছো?
– হ্যাঁ, আছে ভিতরে। খুব ব্যস্ত সে। কনেকে সাজাবার ভার তার উপর। আসেন, আপনি টেবিলে বসে পরেন। খাবার পর আমাদের গানের আসর বসবে।

বাড়ীর ভিতরে সব মেয়েরা আর ছেলেরা বাইরে সামিয়ানার নীচে বসে। এক এক করে জলিল চাচা, নবী খান, হাজী রুজী খান – সবার সাথে কথা হল আসলামের। সবাই জেনে গেছে তার আসন্ন আমেরিকা যাবার কথা।

বেচবাগতু গ্রামের ঠিক পাশেই উচু পাহাড়ের শুরু। ওদিক থেকে মনে হল কিছু গুলির শব্দ শোনা গেল। কে যেন জানালো আজ সকাল থেকেই থেকে থেকে গুলির শব্দ শোনা গেছে। গুলির শব্দ খুবই স্বাভাবিক আফগানিস্তানে। এখানে প্রায় সবার হাতে একটা করে রাইফেল। এখানকার মানুষ সবাই খুব স্বাধীনচেতা। অনেক চেষ্টা করেও ব্রিটিশ এবং রাশিয়ানরা আফগানিস্তানীদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। সবাই জানে আমেরিকানরাও বাধ্য হবে পরাজয় স্বীকার করতে একদিন। এমনিতে আফগানীরা খুবই বন্ধুবৎসল। কেউ তাদের বাড়ীতে অতিথি হয়ে আশ্রয় নিলে তাকে রক্ষা করার জন্যে জীবন দিতে কুন্ঠাবোধ করবে না কোন আফগানী। আবার অন্যদিকে হাজার চেষ্টা করেও এ পর্যন্ত কোন বিদেশী শক্তি তাদেরকে পরাধীন করে রাখতে পারেনি।

বাড়ীর ভিতর থেকে কনের বান্ধবীরা তখন বিয়ের গান শুরু করেছে। বাইরে বসেই বেশ শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ করে একটা প্রচন্ড বিস্ফোরনের শব্দ শোনা গেল। আসলাম কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখে তার চোখের সামনে থেকে বিয়ে বাড়ী অদৃশ্য হয়ে ধোয়ায় আর আগুনে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। পাগলের মতো ছুটে গেল সেদিকে। আগুন, প্রচন্ড ধোয়া, ছাই, মানুষের কাতর ধ্বনি, চিৎকার, ডাকা-ডাকি এর মধ্যে দেখতে পেলো সম্পূর্ণ বাড়ীটা ধংশ হয়ে পড়ে আছে। সেও চিৎকার করে ডাকতে লাগলো – জামিলা, জামিলা।

সে এবং আরও কয়েকজন মিলে ইট, পাথর সড়িয়ে খুঁজতে লাগলো তাদের প্রিয়জনদের। কিছুক্ষণ পর পর চিৎকার করে ডাকতে লাগলো – জামিলা, জামিলা। অন্যরাও তাদের স্বজনদের নাম ধরে ডাকতে লাগলো এবং সবাই মিলে ইট পাথর সড়াতে লাগলো। আসলাম একটা বড় সিমেন্টের টুকরা সড়িয়ে একটা মেয়ের পায়ের কিছুটা অংশ দেখতে পেল। আরও কিছুটা সড়াবার পর দেখলো উরু থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি মেয়ের পা এটি। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না আসলাম। বমি করে ফেললো।

এমন সময় আবার আকাশ থেকে বিমানের শব্দ শোনা গেল। যে যেখানে পারলো আশ্রয় নিল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে স্ট্রাইফিং হলো বিমান থেকে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে – চারিদিকে এখন অন্ধকার, কোথা থেকে কে গুলি করছে কিছুই বোঝার উপায় নেই। দূরের পাহাড় থেকে মনে হল যেন অন্যরাও গুলি ছুড়ছে বিমানের দিকে।

নিজের প্রানের মায়া ত্যাগ করে এবার একাই ছুটে গেল আসলাম ভংগ্নস্তুপের মধ্যে তার প্রিয় জামিলাকে উদ্ধারের জন্যে।

আবার চিৎকার করে ডাকতে লাগলো – জামিলা, জামিলা। হঠাৎ মনে হল সে যেন জামিলার গলা শুনতে পেল – আসলাম ভাইয়া, আমি চাপা পড়ে আছি, আমাকে বাঁচাও।

কোন দিক থেকে আওয়াজ এলো ঠিক বুঝতে পারলো না। এই অন্ধকারের মধ্যে কিছুই ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। মনে হল আরও অনেকে ভংগ্নস্তুপের মধ্য থেকে কাতরাচ্ছে। অধিকাংশই মেয়েদের গলা। অন্য অনেকে আবার ফিরে এসেছে তার সাথে মিলে ভংগ্নস্তুপের পাথর সড়াতে। এক এক করে পাঁচটা মৃতদেহ বের হলো। সবাই শিশু – বয়েস ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে হবে।

এমন সময় হেড লাইট জ্বালিয়ে অনেকগুলি মিলিটারী ট্রাক এসে হাজির হল সেখানে। বেশ কিছু আমেরিকান সৈনিক এসে ঘিরে দাঁড়ালো তাদেরকে। এক এক করে তাদের হাত পিছ-মোড়া করে বেধে ফেললো। আসলাম বলতে চাইলো তার বোন জামিলা এখনো বেঁচে আছে ঐ ভংগ্নস্তুপের মাঝে – তাকে ছেড়ে দিতে, যাতে সে খুঁজে বের করতে পারে। কথা বলতে নিষেধ করার পরও সে চেষ্টা করছিল কিছু বলতে – প্রচন্ড এক আঘাত এসে পড়লো বন্দুকের বাটের, তার মাথার উপর। জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়লো সে।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলো সুবেহ-সাদেকের সময়। পূর্ব আকাশে একটু ফরসা ভাব। সে এবং আরও অনেকে পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায় ভংগ্নস্তুপের একটু দূরে পড়ে আছে। জলিল চাচা মিলিটারিদের বুঝাতে পেরেছেন যে এটা ছিল বিয়ে বাড়ী, কোন তালিবান যোদ্ধা এখানে নেই। মৃতদেহ এবং আহতদের কিছু ছবি তোলার পর কবর দেবার অনুমতি দিয়ে গাড়ীতে করে ফিরে গেল আমেরিকান সৈনিকরা। একে অপরের হাতের বাধন খুলতে লাগলো তারা। রাস্তার এক পাশে সাড়িবদ্ধ শোয়ানো হয়েছে মৃতদেহ গুলি। এক পাশে খুঁজে পেল জামিলার মৃতদেহ। হাতের মেহদীর সাথে রক্তের লাল মিশে আছে। আসলাম জানতো যদি তাকে আমেরিকান মিলিটারী বাধা না দিত, তবে ঠিকই জামিলাকে খুঁজে বের করে বাঁচাতে পারতো সে। কত স্বপ্ন দেখেছিল তারা দু’জনে আমেরিকা যাবে, নতুন জীবন গড়ে তুলবে। হঠৎ করে কি হয়ে গেল।

জামিলার মৃতদেহ দেখে চোখ থেকে এক ফোটাও পানি বের হল না আসলামের। শোকের বদলে প্রচন্ড প্রতিহিংসা এখন তার চোখে। অন্যদের সাথে জামিলার কবর হয়ে যাবার পর সোজা রফিকের কাছে গেল আসলাম।

– আমি আর আমেরিকা যাব না। আজ থেকে আমি তোমাদের সাথে আছি।

AP Photo

৩,৪৬৮ বার দেখা হয়েছে

২৫ টি মন্তব্য : “এক টেরোরিস্টের জন্ম”

  1. রাব্বী (৯২-৯৮)

    সাইফ ভাই, কেমন আছেন?

    বেশ একটা বিরতি দিয়ে আপনার ব্লগ দেখে ভাল লাগলো। গল্পটা যেন ফিকশন না, একেবারে যেন সত্যি গল্প! নাইন-ইলেভেন কত কিছু পাল্টে দিল। কত হাজার হাজার মানুষের জীবন এবং বিকলাঙ্গ হওয়া। ধর্মের রাজনীতি আসলে ভয়ঙ্কর কুৎসিত!

    সেদিন এক জায়গায় পড়লাম যে ইংরেজি ভাষায় নাইন-ইলেভেন পরবর্তী নতুন শব্দগুচ্ছ যুক্ত হয়েছে নতুন অর্থে - গ্রাউন্ড জিরো (যেটা আগে হিরোশিমা ছিল, এখন এটা বলতে বুঝায় নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারের স্থল), এক্সিস অব ইভিল, ওয়ার অন টেরর, ইসলামফোবিয়া, এসব।

    গল্পটা নিয়ে সমালোচনা নেই। তবে, খুব সাধারণ একটি অভিমত হলো, যদিও গল্পটি দুটি দেশে আবর্তিত হয়েছে, জন চরিত্রটি গল্পের সমাপ্তির সাথে আরো খানিকটা শক্ত সম্পর্ক স্থাপন করতে পারলে শুরুতে যে গুরুত্ব নিয়ে চরিত্রটি গল্প শুরু করেছে সেটি আরো শক্ত করে বাঁধতে পারতো গল্পটিকে। এটা একদম আমার ব্যক্তিগত মত - অন্যদের পড়ে এমন নাও মনে হতে পারে। এটুকু বাদে গল্পটি লেখা খুব ভাল হয়েছে।

    আপনি ভাল থাকবেন।


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন
    • সাইফ শহীদ (১৯৬১-১৯৬৫)

      রাব্বী,

      অনেক ধন্যবাদ তোমার মতামতের জন্যে। এ গল্পটা শুরু আর শেষের মধ্যে তিনটি বছর কেটে গেছে। একটানা বসে লিখলে যে একটা সমান গতি রাখা যায়, এটাতে তা রাখতে পারিনি। সাধারনত আমি এক-দেড় হাজার শব্দের মধ্যে ছোট গল্প লিখতে চাই। এটা তার দ্বিগুন হয়ে গেছে। আর বড় করতে চাইনি বলে জন বা হাসিবের পরবর্তি কার্যাবলী বাদ দিয়েছি। না হলে, হাসিবের কাছ থেকে খবরটা শোনার পর জন অনুশোচনায় চাকরী ত্যাগ করলো, ইত্যাদি কিছু চিন্তা করতে পারতাম।

      নীচের লিংকে ৯/১১-তে চরম ক্ষতিগ্রস্ত এক বাঙ্গালী পরিবারের কথা আছেঃ

      এক মুসলিম পরিবারের ৯/১১-র চরম ক্ষতি

      জবাব দিন
  2. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    গল্পটা একটানে পড়ে গেলাম।
    সেই সিভিল ওয়ার থেকে শুরু করে বিশ্বযুদ্ধ - এক একটা যুদ্ধে আমেরিকার প্রযুক্তি আর উদ্ভাবণ খুব দ্রুত উন্নতি করে বলেই ওরা এতো যুদ্ধ পছন্দ করে। সেই সাথে যুদ্ধের সাথে জড়িয়ে আছে ধংস। আর ধংস মানেই অধিক উৎপাদন, অর্থনীতির চাকা সচল, চাকরি তৈরী। এ চক্র ভাংগবে কবে?

    খবরের পাতায় আসা এক একেকটা ছোট ঘটনা আসলে যে কত বড় তা আপনের এই গল্প পড়ে বুঝতে পারলাম।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
    • সাইফ শহীদ (১৯৬১-১৯৬৫)

      শান্তা,

      তুমি কি ফিরে এসেছো? ফিরে এলে তোমার কাছ থেকে বাংলাদেশের গল্প শোনার অপেক্ষায় থাকলাম।

      আমারও মনে হচ্ছে যে পশ্চিমের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্যে একটা 'বড় যুদ্ধ' ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু কার সাথে যুদ্ধ করবে?

      'এলিয়েন'-দের সাথে যুদ্ধ করতে পারলে মন্দ হত না। কিন্তু তাদের যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

      জবাব দিন
  3. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    একে গল্প বলা যায় না, কঠিন বাস্তব।

    ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে দেশটির ঋণের খাতায় যোগ হয়েছে কমপক্ষে তিন হাজার ৭০০ কোটি ডলার। যুদ্ধ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এসব অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ওই হামলার পর থেকে কমপক্ষে দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশ বেসামরিক নাগরিক।
    রোড আইল্যান্ডের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ‘কস্ট অব ওয়ার’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়। গবেষণা প্রতিবেদনটি গত জুনে প্রকাশিত হয় এবং ৪ সেপ্টেম্বর এটি হালনাগাদ করা হয়।

    একে বলা হচ্ছে "এক দশকের মাশুল"!! জামিলারা হিসাবের মধ্যে এলেও আসলামরা গোনার বাইরেই থেকে গেছে! আবারো ধন্যবাদ সাইফ ভাই, এমন দিনে শেষ পর্যন্ত লেখাটি শেষ করার জন্য।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
    • সাইফ শহীদ (১৯৬১-১৯৬৫)

      লাবলু,

      বিগত কয়েক দিন ধরে এখানকার সব টিভি ও রেডিওতে ৯/১১ উৎযাপন করা হচ্ছে - এটা যেন অনেকটা জাতীয় বিশেষ দিনে পরিনত হয়েছে।

      যে কোন ইঞ্জিনিয়ারিং বা অন্য কোন সমস্যাতে 'root cause analysis' বিশেষ গুরুত্ব দখল করে। বিগত কয়েক দিন আমি বেশ কিছু বই-পত্র নাড়াচড়া করে বোঝার চেষ্টা করছি সেই ব্যাপারে কতটা সাফল্য লাভ হয়েছে। খুবই অবাক হচ্ছে যখন দেখছি খুবই সতর্কতার সাথে মূল সমস্য কোথায় তুলে ধরা হচ্ছে না।

      ৫০০ পাতার সরকারী ৯/১১ কমিশন রিপোর্ট খুঁজে শুধু একটা লাইন পেলাম যেখানে লেখা হয়েছে - "He spoke of the suffering of the Iraqi people as a result of sanctions imposed after the Gulf War, and he protested U.S. support of Israel."

      ইভিতার বাবাকে রফিক যে কথাটা বলেছিল সেই সোজা সমস্যা এবং সমাধানের কথাটা কেউ বলছে না।

      এক আজব সময়ে বাস করছি আমরা।

      জবাব দিন
  4. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    অনেক দিন পরে লিখলেন ভাইয়া, বরাবরের মতই মন ছুঁয়ে গেল।

    আমেরিকা তো তাদের সমরাস্ত্রের গবেষনা, পুরাতনগুলো ফেজ আউট করার জন্য নতুন বাজার আর প্রেসিডেন্ট ইলেকশনের ইস্যু হিসেবে প্রতি যুগে একটা করে যুদ্ধ লাগায়। আর এখন তারা (ন্যাটো সহ) ব্যস্ত আরবের জনগনকে গনতন্ত্রের স্বাদ দিতে, যেখানে তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় এতদিন ধরে একনায়কেরা শোষন করে গিয়েছে। এতে যে পরিমান টাকা তারা খরচ করছে তারা অল্প কিছু অংশও যদি তারা সোমালিয়ার দূর্ভিক্ষে থাকা মানুষদের সাহায্যে দিত তাহলে হাজার হাজার মানুষের জীবন বেচে যেত।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  5. মুরাদ (৯০-৯৬)

    ভাইয়া, লেখাটা পড়ে খুব ভাল লাগলো। আমেরিকার এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা কবে বন্ধ হবে? বিশ্বের সব টপ ইউনিভারসিটিরর Ranking এ দেখি সব আমেরিকান ইউনিভারসিটির নাম। ইউনিভারসিটির Ranking দেয়া হয় ওই ইউনিভারসিটির গবেষণা এবং গ্র্যাজুয়েটদের সম্মানীর ভিত্তিতে, ওরা এত ভাল গবেষণা করে এইটা কেন গবেষণা করে না যে, পৃথিবীতে কোন অস্ত্র উতপাদনের কারখানা না থাকলে পৃথিবীটা কেমন হত । ধ্বংস করার প্রবণতাটা কি মানুষের Instinct? মানুষ কি অস্ত্র বিহিন একটা পৃথিবীতে সুখে শান্তিতে মিলে মিশে থাকতে পারবে না? যদি মাইলেসিয়ান পণ্ডিতদের প্রথম দার্শনিক ধরি তাওতো মানুষের চিন্তার সভ্যতার বয়স ৩০০০ বছর। এত শত বছরেও কি আমরা অস্ত্র বিহীন এক ভালবাসার পৃথিবী গড়ার আস্থা তৈরি করার মত শিক্ষা অর্জন করতে পারলাম না?


    শামীম মুরাদ

    জবাব দিন
    • সাইফ শহীদ (১৯৬১-১৯৬৫)

      মুরাদ,

      'যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা' বন্ধ হওয়া হয়তো আমাদের জীবনে আর দেখা হবে না। এ ছাড়া লাদেন এখন দেখিয়ে গেছে যে শক্তি না থাকলেও অসম শক্তি নিয়ে যুদ্ধ করা যায়। অন্য বহু ভিন্ন নীতির লোক এখন সেটা ব্যবহার করা আরম্ভ করছে তাদের নিজেদের 'যুদ্ধে'।

      তুমি তো ইতিহাস এবং দশর্ন নিয়ে পড়াশুনা এবং গবেষণা করছো - এটা নিশ্চয় খেয়াল করে দেখেছো যে ন্যায়-নীতি না থাকলে যত শক্ত ভাবেই চেষ্টা করা হোক না কেন - বেশী দিন ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে না কেউ। তবে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় অনেকেই ভুলে যায় সেটা।

      আমেরিকার উন্নতির পিছনে অন্যতম বড় অবদান হচ্ছে 'ব্যক্তি-স্বাধীনতা' এবং 'অভিবাসীদের অবদান'। ওয়ারেন বাফেট, জর্জ সরোস, ইত্যাদি অনেকেই এক পুরুষের অভিবাসী। ইউনিভারসিটির গবেষণাতেও একটা বড় অংশ এই অভিবাসীদের অবদান।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।