ইচ্ছে-ঘুড়ি-১

সেল ফোনে নতুন অপরিচিত একটা নাম্বার ভেসে উঠে। ফোনটা ধরা মাত্রই পরিচিত গলা। জিজ্ঞাসা করলাম “এইটা কি তোর নতুন নাম্বার?”
“হ্যাঁ।“ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল আমার সেজ ভাইয়ের মেয়ে মানে আমার আপন ভাতিজী। অপর প্রান্ত হতে-
“বন্ধু চাচু, আমার একটা টেস্ট পেপার লাগবে। খুলনাতে সব বইয়ের দোকান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ। কি এক কারণে তা জানি না।“ আমাকে টেস্ট পেপারের প্রকাশনীর নাম,সাইন্স কি আর্টস,ইত্যাদি বিস্তারিত বুঝাই দিল। সামনে এইচ,এস,সি পরীক্ষা। এই সময়টা প্রস্তুতির জন্য খুবই জরুরী ।
হটাত মনের মাঝে এই রকম একটা সময়ের, একই রকম স্মৃতি আমাকে কিছুক্ষণের জন্য আচ্ছন্ন করে রাখল। সময়টা-
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস
আমার এই ভাতিজী তখন সবে অষ্টম শ্রেণীতে উঠছে। পড়াশুনার ব্যাপারে সে খুবই সিরিয়াস প্রকৃতির। কি এক কারণে ঐ বছরে স্কুলে স্কুলে সরকার হতে বোর্ডের বই পৌঁছায়নি।যথারীতি আমাকে ফোন করে বইয়ের সমস্যার কথা জানাল। আমি ঐ সময়টা ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার আশেপাশে থাকতাম। বাংলা বাজারে আমার কিছু বন্ধু ছিল। যারা প্রকাশনী সাথে জড়িত।মাঝে মাঝে তাঁদের সাথে বইয়ের আবাসভূমি বা জন্মভূমি বাংলা বাজারে আড্ডা বা সময় কাটাতাম। বাংলা বাজার বন্ধু-মহলে সমস্যার কথা জানালাম। সবাই তখন বইমেলা নিয়ে খুবই ব্যস্ত। ওদের পক্ষে একসেট বই ব্যবস্থা করা তেমন কোন বড় সমস্যা হওয়ার কথা না।
২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০০৯– বিকাল বেলা বাংলা বাজারে বন্ধুর প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কিছু সময় গল্প করে এক সেট বই নিয়ে চলে আসার পথে কাকরাইল মোড়ে এস, এ পরিবহনে বুক করে দিলাম।
রাত ১০ টা হতে আমার ডিউটি শুরু হবে তাঁর আগে কর্তব্য স্থানে ফিরতে হবে। রাতে ডিউটি মানে সারা রাত জেগে থাকা। পরের দিন সকাল ৬ টায় ডিউটি হতে রুমে ফিরলাম। সারা রাত ঘুমানো হয়নি। সকাল ১০ টা পর্যন্ত রেস্ট তাই ড্রেসটা পাল্টে সোজা বিছানাতে।
২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০০৯– আনুমানিক সকাল ০৯৩০ দিকে সেল ফোনটা বেজে উঠল। ঘুম ঘুম নিয়ে ফোনটা ধরলাম। অপর প্রান্ত হতে ভেসে আসে সহকর্মী ও বন্ধুর কণ্ঠ ;
“ ঐ মোকা কি করিস? ঘুমাস না কি?”(বন্ধুরা সংক্ষেপে আমাকে এই নামে ডাকে)
সকালের ঘুম তাই বিরক্তি মেশানো উত্তর দিলাম -“ হ্যাঁ”।
” তোর ঐ খানে না কি ফায়ারিং হচ্ছে? অফিসারদের ধরে ধরে গুলি করে না কি মেরে ফেলছে?”
আমি বললাম “ সাত সকালে ফাজলামি করিস না।“
” ফাজলামো করবো কেন? তুই খোঁজ নিয়ে জানা। তোর লোকেশন কি পিলখানার ভিতরে না বাহিরে?”
আমি বললাম ” আমি মেসের রুমে আছি। তোকে জানাচ্ছি।“ বলে ফোনটা রেখে দিলাম।
আমার বন্ধুর কথা শুনে আমার ঘুম তখন হাওয়া। ফোনটা নিয়ে পিলখানায় কর্মরত আমার কাছের এক মানুষকে ফোন করলাম। ইতিমধ্যে আমি বিচ্ছিন্নভাবে ফায়ারিং শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ক্যান্টনমেন্ট এই ধরনের শব্দ খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।
আমার কাছের সহকর্মী মানুষটি ফোনটা ধরে
…”মোকা তুমি কোথায়?”
”স্যার, মেসের রুমে।“
” মোকা আমি ফায়ারিং এর মধ্যে আছি। কথা বলতে পারব না। take care.”
” স্যার, কি বলছেন? কেন”
অপর প্রান্তের মানুষটির কথার কোন উত্তর পেলাম না। লাইনটাও কাটে নাই। আমি ফোনের মধ্যে তীব্র গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। ঐ সময়টাতে সমস্ত শরীর কেমন যেন আমার সাথে বিরোধিতা করতে শুরু করেছে। হাত, পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। পা এত ভারি লাগছে কেন? গলাটা শুকিয়ে কাঠ। কি করবো? মাথার ভিতরটা হটাত কেমন যেন ফাঁকাফাঁকা লাগছে এক বুদ্ধিহীন প্রাণীর মত। আবার ফোনটা বেজে উঠল।
”কি রে তোর খবর বল?”
বললাম …” তুই ঠিক বলছিস। ফায়ারিং ছাড়াও গ্রেনেডের আওয়াজও পাচ্ছি।“
” নিজেকে সেফ রেখে, দেখ কি করে বের হওয়া যাই।…”
বল্লাম- “বন্ধু, দরজা খুলে আর জানালা দিয়ে বাহিরে দেখলাম। ওরা হাতে অস্ত্র নিয়ে আমার অবস্থানের আসে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইচ্ছামত যেদিকে খুশি গুলি করছে। পালানোর বা নিজেকে আত্মগোপন করার কোন পথই খোলা নেই। পরে কথা হবে।“ বলে ফোনটা রেখে দিলাম। আমার কাছে তখন দুইটা ফোন- একটা ব্যক্তিগত আর একটা অফিসিয়াল নাম্বার।
অনবরত দুইটা নাম্বারে বিভিন্ন মানুষ আর স্থান হতে ফোন আসছে। আর আমি ফোনের মারফতে আপডেট নিউজ পাচ্ছি আর সেই সাথে আমার বিভিন্ন পদবীর সহকর্মীদের আশার কথা আমাকে আর আমার মনকে পুনর্জীবিত করছে।। সময় অতি দ্রুত কমে আসছে। কিছু জরুরী কাজ ফোনে শেষ করতে হবে। মৃত্যুর প্রহর যে কোন সময় হাজির হবে। বউ আর একমাত্র সন্তান ট্রেনে করে সকাল বেলা খুলনা হতে রওনা করেছে। জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চোখের সামনে ভেসে উঠে চার বছরের একমাত্র শিশু সন্তানের মুখটি। সান্ত্বনা পাই এই ভেবে যে অন্তত আমার পরিবার নিরাপদে আছে।
আমার সেজ ভাবিকে ফোন করলাম। ভাবির কথা শুনে মনে হোল এখনও এত বড় ঘটনা তাঁদের কানে পৌঁছায় নাই। বললাম “ ভাবি, গতকাল এস, এ পরিবহনে বইগুলো বুক করেছি। মেমো নাম্বারটা লিখে রাখ। বুকিং এর সময় তোমার সেল নাম্বারটা দিয়ে দিয়েছি। একটু কষ্ট করে কালেক্ট করে নিও।“ ভাতিজীর কাছ হতে কিছু ধন্যবাদ জ্ঞাপন হজম সাথে আমি পড়াশুনা ব্যাপারে কিছু উপদেশমূলক কথা বললাম। স্বাভাবিকভাবে কথা শেষ করে ফোনের লাইনটা কেটে দিলাম।
কিছু সময় পরে শুনতে পেলাম পাশের রুমের চিৎকার আর দরজা ভাঙ্গার শব্দ। একদিকে মৃত্যুর প্রহর আর অন্যদিকে নিজেকে মৃত্যুর হাত হতে কি ভাবে নিজেকে রক্ষা করা যাই তাঁর চিন্তা।অবশেষে নরঘাতকদের কাছে বন্ধী হলাম।

দেখতে দেখতে চার চারটা বছর কেটে গেল। অতীব ভয়ঙ্কর স্মৃতির এক দুঃস্বপ্ন মনে করে সর্বদা এটাকে পাথর চাপা দিয়ে রাখতে চাই।মনে মনে সব সময় প্রার্থনা করি যেন কোন ভাবেই ঐ স্মৃতির পাতা আবার আমাকে তালাস না করে। আমার চাওয়া পাওয়ার হিসাব দিয়ে তো আর জীবন চলে না। তাই অনেক কিছু না চাইলেও তা আবার বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সামনে চলে আসে।
তেমনি আজ ২০১৪ সাল
সেই বাংলা বাজারের পুরাতন বন্ধুদের কাছে আবারও বইয়ের জন্য আসা। গল্প আর আড্ডার মাঝে সেই পুরানো স্মৃতি আবার মনে করিয়ে দিল।
বন্ধুরা বলতে লাগল –“আমাদের কাছ হতে ঐ দিন চলে গেলে। তারপরের দিন ঐ খবর শুনে কতবার যে ফোন দিয়েছি। আর সময়ের সাথে সাথে তোমারে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণাতে সব বন্ধুরা মিলে কেঁদেছি। আল্লার কাছে অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই তুমি আমাদের মাঝে আছো। ইত্যাদি,ইত্যাদি।“
আমি জানি, এখন যদি ওরা বলা শুরু করে তাহলে অনেক কথা, অনেক স্মৃতি, অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টে চলে যেতে চাই বইমেলা বা দেশের বিভিন্নও আলোচনাতে।বুকের মাঝে আবার কেমন যেন একটা বাজে অনুভূতি শুরু হয়। মনের মধ্যে কেমন যেন খচ খচ সাথে কেমন যেন খালি খালি লাগে।মন খুলে আড্ডার রেষ হটাত কে যেন লাগাম টেনে ধরে।
বারবার নিজেকে সামলে যোগ দিতে চাই ওদের সাথে। শেষ পর্যন্ত ডিউটি আছে এই অজুহাতে ওদের কাছে বিদায় নিয়ে রওনা করি। চার বছর আগের সেই সিকুয়েন্স- কাকরাইল মোড়ে এস, এ পরিবহনে বইটা বুক করা।
গাড়িতে আসতে আসতে অনেক উল্টা পাল্টা চিন্তা করি।
বর্তমান সময়টাকে বলা হয়ে থাকে আবিষ্কারের যুগ। নতুন নতুন অনেক কিছু আবিষ্কার হচ্ছে। কত কিছু নিয়ে গবেষণা চলছে। এমন কিছু যদি আবিষ্কার হত যা দিয়ে মানুষের জীবনের কোন স্মৃতিকে চিরতরে মুছে ফেলা যেত।
তাহলে আমি ২৫শে ফেব্রুয়ারি সকাল হতে ২৬ শে ফেব্রুয়ারি ২০০৯ এর বিকাল ৫ টা পর্যন্ত স্মৃতিকে চিরতরে মুছে ফেলতাম। আর……
আমি তখন মুক্ত………
বিদ্যুতের আলো পাখার ব্যবস্থাহীন ১০x১০ কিংবা তার থেকে ছোট্ট একটা রুমের মধ্যে তিন চার বছরের বাচ্চা হতে পঞ্চাশ ঊর্ধ্বে ২০ বা তারও বেশি কিছু মহিলা আর সন্তানের কান্না,পীড়ন, বাঁচার ক্ষীণ আশা যন্ত্রণার দগ্ধ হতে….

আমি তখন মুক্ত………
হায়েনা সেজে কতিপয় নিষ্পাপ মানুষকে একটু পর পর দরজা খুলে ফায়ারিং স্কোয়াডে বা মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার হুমকি- “এখনই এলো বুঝি আমার টার্ন”…যা বুকের মধ্যে এক অজানা তীব্র হাহাকারের বা টানের অনুভূতির সঞ্চার হতে…

আমি তখন মুক্ত………
বীভৎস হত্যার বর্ণনায়িত গল্পের স্রোতা হয়ে হত্যাকারীদের কিছু বলতে না পারা বা কিছু করতে না পারার কষ্টের তীব্র আস্ফালনের ব্যথা হতে…

আমি তখন মুক্ত………
নিউজ পেপারে বিভিন্ন সময় ওদের নিয়ে লেখা বা ছবি, বন্ধুদের আড্ডার মাঝে ঐ দিনের স্মৃতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পারার কষ্ট।স্মৃতিবিজড়িত হয়ে মনের ভিতরে কালো মেঘের ছায়া হতে। কিংবা বছর ঘুরে ফিরে আশা ঐ দিন আমাকে বিষণ্ণতায় কুঁড়ে কুঁড়ে খাওয়ার যন্ত্রণা হতে..

আমি তখন মুক্ত………
আশায় আশায় বুক বেঁধে থাকা- আমার সহকর্মীদের মিথ্যা কথার ফুলঝুরি “ এইতো কিছুক্ষণের মধ্যে আসছি। চিন্তা করতে হবে না।“ “এইতো কিছুক্ষণ” আর শেষ হয় না। প্রতিটি সেকেন্ডে মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে একটা সময় “মুহূর্ত” তখন নিরবধি, নিরন্তর হয়ে মর্মযন্ত্রণার যে রূপ তার স্পর্শ হতে।

আমি তখন মুক্ত………
এতদিনের, এত বছরের সহকর্মীদের এই মিথ্যা প্রহসন আর প্রতিশ্রুতি যা আমার মাঝে ওদের প্রতি যে তীব্র ঘৃণার উদ্রেক করা সেটা হতে…

আমি তখন মুক্ত………
নিষ্পাপ সন্তানের মুখ বা স্বজনদের আবার কাছে পাওয়ার জন্য বেঁচে থাকার যে তীব্র আকুতি মিশ্রিত কষ্ট, আমাকে আর পীড়া দেবার কষ্ট হতে…

আমি তখন মুক্ত………
বছরের শুরুতে হটাত বই কিনতে গিয়ে নস্টালজিকটার ছায়া হতে।
আমি মুক্ত ১,১৮,৮০০ সেকেন্ডের মৃত্যুযন্ত্রণা স্মৃতির অপচ্ছায়া হতে
একদম মুক্ত আমি…..
………. যেন এক সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি।

২,০৮৮ বার দেখা হয়েছে

১৬ টি মন্তব্য : “ইচ্ছে-ঘুড়ি-১”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)
    ফোনটা নিয়ে পিলখানায় কর্মরত আমার কাছের এক মানুষকে ফোন করলাম। ইতিমধ্যে আমি বিচ্ছিন্নভাবে ফায়ারিং শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ক্যান্টনমেন্ট এই ধরনের শব্দ খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।
    আমার কাছের সহকর্মী মানুষটি ফোনটা ধরে
    …”মোকা তুমি কোথায়?”
    ”স্যার, মেসের রুমে।“
    ” মোকা আমি ফায়ারিং এর মধ্যে আছি। কথা বলতে পারব না। take care.”
    ” স্যার, কি বলছেন? কেন”


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)
    “বন্ধু, দরজা খুলে আর জানালা দিয়ে বাহিরে দেখলাম। ওরা হাতে অস্ত্র নিয়ে আমার অবস্থানের আসে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইচ্ছামত যেদিকে খুশি গুলি করছে। পালানোর বা নিজেকে আত্মগোপন করার কোন পথই খোলা নেই। পরে কথা হবে।“


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  3. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    :salute: স্যার। এই প্রসঙ্গে কিছু বলতে পারি না, পুরো ঘটনায় একেবারে কাছ থেকে কেন জানি নাম্ব হয়ে গিয়েছি 🙁


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  4. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    প্রত্যক্ষ অনুভূত - তাই এতো জীবন্ত। তুমিও দেখি আমার ব্যাচ। আগেও অবশ্য তোমার লেখা পড়েছি। ভালো থেক।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।