রফিকের ঈদ

প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাস রফিকের কখনো ছিলো না। নামায সে কালে ভদ্রে পড়েছে বটে কিন্তু গত এক যুগে কয়বার সে কিবলায় মাথা ঠেকিয়েছে তা হয়তো হাতের কর গুণে বলে দেয়া যাবে। এমনকি রমযানের রোজা রাখার ব্যাপারেও রফিকের তীব্র অনিহা।

স্ত্রী মমিনুন নেছার এই নিয়ে তীব্র মনোঃকষ্ট। জীবনে আর যাই হোক এইরকম বেদ্বীন, নাস্তিক স্বামী তার কখনো কাম্য ছিলো না। তাও যদি তার স্বামী রফিক উদ্দিন এইসব নিজের ভিতরে রাখতো! সুযোগ পেলেই আড্ডায় এইসব নাস্তিক টাইপ কথাবার্তা বলতে রফিক উদ্দিন খুবই পারদর্শী। আবার কোরান হাদিসেও ওস্তাদ। কোথা থেকে সে দুষ্ট দুষ্ট কোরানের আয়াত-হাদিস বের করে আল্লাহ ই ভালো জানেন। খোদ আযাযিল ই হয়তো তার দোস্ত।

কিন্তু এই আলাভোলা, বোকাসোকা মানুষকেও ডক্টর ফষ্টাস ভাবতেও পারেন না মমিনুন নেছা। আবার রফিক উদ্দিনের মনের তল ও খুঁজে পান না তিনি। কিছুদিন আগেই শাশুড়ি মারা গেছে নেছার। সবাই মিলে দেশের বাড়িতে গিয়ে দাফন-কাফন করে এসেছে। কিন্তু লন্ডন ফিরে একবারো নামাজ-কোরানের ধারে কাছেও যায় নি তার স্বামী। কয়েকবার বলার পরে সূরা ইয়াসীন নিয়ে বসেছিলো রফিক। কিছুক্ষণ পড়েই কোরান বন্ধ করে রেখেছিলো সে। বলে,

“এইগুলা কি করে আল্লাহ বলে? খালি ভয় ডরের কথা, পানিশমেন্টের কথা। আর এই সূরা কি কইরা এতো পাওয়ারফুল সূরা হয়।”

নেছা বার বার আস্তাগফিরুল্লা বলে।
নেছার একবার মনে হয়েছিলো মা মারা কষ্টে কি এর মাথা আউলাইয়া গেলো। শেষ পর্যন্ত তবে কি পাগল স্বামী নিয়ে ঘর করতে হবে তাকে!

“নাউজুবিল্লাহ। হে আল্লাহ তুমি রফিকরে হেদায়াত দাও।”

বেহেশতে যাবার খুব খায়েশ মমিনুনের। কিন্তু স্বামী ছাড়া কি সে বেহেশত যেতে পারবে? মনে হয় পারবে। ফেরাউনের বৌ আছিয়া তো বেহেশতে যাবেন। কিন্তু মমিনুন নিজে বেহেশতের আঙ্গুর বেদানা খাবেন আর স্বামী দোযখের অঙ্গারে জ্বলবে এইটাও মানতে নারাজ।

আজ মমিনুনের জীবনে অত্যন্ত আনন্দের দিন। নাস্তিক স্বামী কে গ্যাড়াকলে ফেলে নামাজ পড়তে বাধ্য করেছেন। যাকে বলে কিনা মাইনকা চিপা। আচ্ছা মাইনকা চিপা বা মানিকের চিপা এই বাগধারা আসলো কোথা থেকে? ঢাকার কোন গলির নাম কি? যেই গলি ছিনতাই এর জন্য বিখ্যাত!

রফিক উদ্দিনের মনটা বড়ই বেজার। কিছুক্ষণ এক চার্চে গিয়েও বসেছিলো সে আজ। বাসার সামনে এভানজেলিকদের একটা চার্চ আছে। রফিকের গলায় সুর নেই। কিন্তু একসাথে গান গাইতে তার বেশ লাগে। যিশু-আল্লাহর গুণকীর্তন করতে খারাপ লাগে না। বাপ-দাদার ধর্ম ইসলামেই বিশ্বাস নেই তার। সেই হিসাবে খ্রিষ্টান হবার সুযোগ ও তার নেই। কিন্তু পাস্তুর মশাই যে মুসলিম-ইহুদী-হিন্দুদের ধ্বংশ চাইছেন না, সামনে পয়সার বাক্স আসছে না এতেই সে খুশি। আর উপাসনার পর চা-নাস্তার ব্যবস্থাও আছে। চা-খফি খেতে খেতে সে পাস্তুরের সাথে সৃষ্টি তত্ব নিয়ে আলোচনা করে। কোরান-হাদিস-ওল্ড টেষ্টামেন্ট-নিউ টেষ্টামেন্ট নিয়ে আলোচনা করে। যিশু আল্লাহর পুত্র এইটা মানতে তার আপত্তি। কিন্তু আবার সে ভাবে মুহম্মদ যদি আল্লাহর দোস্ত হইতে পারে আর আল্লাহর যদি অসীম ক্ষমতাই থাকে তবে সে কেন একটি সন্তানই নিতে পারবে না!
কিন্তু এইসব বাদ থাক। বিবর্তনবাদ ই তো বেশি সত্য মনে হয়।

কিন্তু আজ তার স্ত্রী তাকে পাকড়াও করেছে। সে নিজে বার বার বলে এসেছে যেদিন বিশ্বাস আসবে সেদিন সে খুশি মনে নামাজ পড়বে। মনের মধ্যে অবিশ্বাস নিয়ে নামাজে কোন ফল হবে কি! নামাজ তো লোক দেখানো কিছু নয়। যার উদ্দেশ্যে মাথা ঠোকা তাকে বিশ্বাস না করে মাথা ঠোকায় ফল কি! কিন্তু আজ আর স্ত্রীকে কিছুতেই বোঝানো গেলো না। কদিন আগেই ফুটফুটে এক সন্তান হয়েছে।

বাড়ি ফিরে রফিক উদ্দিন গুগলে সার্চ দেয়। কিবলা খুঁজে বের করে। ওজু করার নিয়ম বের করে। নামাজ পড়ার নিয়ম বের করে। রাজাকারদের মসজিদ ইষ্ট লন্ডন মসক থেকে নামাজের টাইম টেবিল বের করে। এক ওয়াক্তে আত্তাহিয়াতু তার মুখস্থ হয় না। এশায় আবার বেতর পড়তে হয়। আবার দোয়া কুনুতের ফেকরা। অবশ্য সে ঠিক করেছে শুধু ফরজ পড়বে।

আল্লাহ যদি এক নাস্তিকের নামাজে খুশি হয় তবে আর বলার কি?
ইনশাল্লাহ আগামী দশ বছরে রফিক উদ্দিন কপালে দাগ করে ফেলবে।
নাস্তিকের কপালে নামাজের দাগ। প্রতি সেজদায় একটু ভালো করে জায়নামাজে কপালটা একটু জোরে ঘষতে হবে।

মমিনুন নেছা আজ আনন্দে আটখানা। কাল ঈদ। ঈদুল ফিতর। সামনের বছর রফিক উদ্দিনকে তিনি ঘাড়ে ধরে নামাজ পড়াবেন। এইবার বেঁচে গেছে রফিক মিয়া। কি যুক্তি তার,

“নবী নিজে ১৮-২০ ঘন্টা লম্বা রোজা রাখেন নাই। তিনি দুই রোজা জোড়া দিছেন কিন্তু একটা রোজা এতো লম্বা রাখেন নাই। আর তিনি (নবী) নিজে রোজা ভাঙ্গছেন। আর রোজা রাখলে যদি মেজাজ গরম থাকে, কাজকর্ম করতে ইচ্ছা না করে তাইলে রোজা রাখার দরকার কি!”

এইবার যখন নামাজ পড়াতে বাধ্য করেছেন আগামী রমজানে রোজা ও রাখতে বাধ্য হবে রফিক। ঈদের চাঁদ দেখে সালাম দেন মমিনুন, কোলে নবজাত সন্তান।
রফিক চাঁদের দিকে তাকায় আর মনে মনে বলে, শালার ঈদ।

বিঃদ্রঃ গত দুই বছর যাবৎ রফিক-মমিনুন দম্পতি যুক্তরাজ্য প্রবাসী।

৯৪৪ বার দেখা হয়েছে

১০ টি মন্তব্য : “রফিকের ঈদ”

    • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

      নয় বছর।
      ২১ শে জুলাই ২০০৫।
      ভিসা পাইলাম।
      তারপর এইখানে পাতাল রেলে বোমা ফাটল।
      এইখানে আসলাম। ঐ সপ্তাহে গাড়িতে বোমা। ম্যান্ডেজ পুলিশের গুলিতে নিহত।


      এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

      জবাব দিন
  1. প্রাকৃতিক বিজ্ঞান না বুঝলে রফিকের মত লোকেরা ভোদাই হয়েই জীবন পার করে যারা আসলেই জানেনা কি, কেন এবং কিভাবে। তারা বার বার নিজেরা যা বিশ্বাস করতে চায় সেখান থেকে সরেও আসে। কারন তারা জানেনা বিশ্বাস বা অবিশ্বাস , কোনটা কি জিনিস। শুধু সাহিত্য বা ইতিহাস বাক্তি মানসে এগুলোর ব্যাপারে কোন নিশ্চিত জ্ঞান তৈরি করতে সক্ষম নয়। তারা কট্টর মৌলবাদীদের মতই বিভ্রান্ত এবং এই বিভ্রান্তি সমাজে ছড়িয়ে দিতেও ওস্তাদ। আধুনিক ও বুদ্ধিমান মানুষের সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হল এই উভয় পোলের মানুষদের বোকামিসুলভ কথা গুলোকে প্রতিহত করে সমাজকে সবার জন্যই উন্মুক্ত রাখা। ধর্ম সবারই প্রয়োজন রয়েছে। সে যে ধর্মই হোক। এর সাথে ধর্মের নিরঙ্কুশ সত্য হয়ে টিকে থাকার কোন সম্পর্ক নাই বলেই আমার ধারণা।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।