সাম্প্রতিক এবং ছেঁড়া কথন ০২

কখনো বলা হয় নাই, লন্ডনে প্রত্যেকটা কাউন্সিলে লাইব্রেরী রয়েছে। বাঙালি অধ্যুষিত হওয়ায় প্রচুর বাংলা বই পাওয়া যায়; যা খুবই সুখকর একটা বিষয়। যদিও এখানের লাইব্রেরিতেই প্রথম কাসেম বিন আবু বাকারের বই পাই। কিন্তু একটাও আবুল বাশারের বই নাই। লাইব্রেরিতে বললাম একথা। দেখি কি করে? অনেকদিন আবুল বাশারের বই পড়িনা। নকশাল আন্দোলন নিয়ে ওনার একটা বই বেরিয়েছিল অনেক আগে। ২য় খণ্ড বেরিয়েছে কিনা জানিনা। অন্য কোনও লেখক এতো ব্যাপক ও গভীরভাবে নকশাল নিয়ে লিখেছেন বলে মনে পড়েনা!

নিকট অতীতে দুইটা বই ইস্যু করলাম।
শাইখ সিরাজের মাটি ও মানুষের চাষবাস। পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৯০ (১৮০); মূল্য ৩০০ টাকা। বইটা কার জন্য লেখা???
এতদিন হুমায়ুন আহমেদরে গালাগালি করতাম ১০০ পৃষ্ঠার বই ১৫০ টাকা রাখার জন্য। বাংলাদেশের প্রকাশকরা তো সুলভ, শোভন দুই ধরণের প্রিন্ট করতে পারে, নাকি? পৃথিবীর সবজায়গাতেই বোর্ড বাইন্ডিং আর পেপার ব্যাক একসাথে বাজারে চলছে। তবে?

আরেকটি আনওয়ারুল আলম শহীদের ৭১ আমার শ্রেষ্ঠ সময়। লেখক আমার পূর্বপরিচিত; আমার মার বন্ধু। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ, বিশেষ করে টাঙ্গাইলে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধকাহিনী, রাজনীতি, মুজিবনগর সরকার, এবং ছাত্র রাজনীতি সম্বন্ধে জানতে চাইলে এই বইটা দলিল স্বরূপ এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। অনুসন্ধানী পাঠকদের পড়তে বলবো। লেখকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ৭১ পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে লেখার কথা ভাবছেন কিনা? বললেন লেখা চলছে।
আমি অপেক্ষায় আছি।

সহজ কথা যায়না বলা সহজে।
আবার কথা বেশি খোলাখুলি বলাটাও কখনো কখনো বিব্রতকর। কারো কারো আঁতে ঘা লাগাটাও অস্বাভাবিক নয়।
আমার দুইটা খুব প্রিয় প্রবাদ আছে।
আকলমন্দকে লিয়ে ইশারাই কাফি। আর
কুত্তা আপনা গলি মে শের হোতা হেয়।
উর্দু ভাষা একটি মিষ্টি ভাষা হওয়া সত্ত্বেও আমাকে টানেনা। এখনো অনেক সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধে উঠতে পারিনাই।

হুমায়ুন আজাদের সেই বিখ্যাত প্রবচন আছেনা, আমি পাকিস্থানিদের বিশ্বাস করিনা, যখন তারা গোলাপ নিয়ে আসে, তখনো।
আমি পাকিদের সাথে ভারতীয়দেরও যোগ করতে চাই। এক মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া তারা আর কখনোই আমাদের পাশে এসে দাড়ায়নি (প্রতিবেশি বন্ধুদেশ হিসাবে)। যদিও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয়দের অবদান অনেক; কিন্তু তারা আমাদের যুদ্ধজয়ের কৃতিত্বটা সুন্দর করে হাইজ্যাক করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৭১ সালের যুদ্ধটা পাক-ভারত যুদ্ধ নামেই বেশি পরিচিত।
এই প্রসঙ্গে একটা মজার কথা বলি। অনেকেই হয়তো জানেনা। যুদ্ধের মধ্যবর্তী পর্যায়ে ইয়াহিয়া (ব্লাক লেবেল) লে জে আ আ খা নিয়াজিকে ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান করে ঢাকা পাঠান। মদ এবং নারিলিপ্সার জন্য নিয়াজি সাহেব বিখ্যাত ছিলেন। (অনেক পাকি সেনা কর্মকর্তা সারা বাংলাদেশ জুড়ে সংঘটিত নারী ধর্ষণের জন্য প্রকারন্তরে নিয়াজিকে দায়ি করেছেন, সেনাপ্রধান এরকম হলে অন্যরা তো করবেই)।

আমরা সবাই এসব জানি কিন্তু যেটা জানিনা তা হল আমাদের অনেকের প্রিয় পাকি ক্রিকেটার, রাজনিতিবিদ ইমরান খানের চাচা হল এই নিয়াজি। তাহলে কি দাঁড়ালো, ইমরান খানের পুরা নাম ইমরান খান নিয়াজি।

এখন এই সাম্প্রতিক এবং ছেড়া কথন লেখার শানে নুজুল বলি।
ফেসবুকে এখন আমার ফ্রেন্ড ৫০০ র উপরে। অধিকাংশই ক্যাডেট। এদের কারো কারো প্রোফাইলে দেখি এরা কেউ বিএনপি, কেউ আওয়ামীলীগের সমর্থক। সত্যি বলতে কি খুব অবাক হই!!!
(একটা বিষয় আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে লক্ষ্য করেছি; ছাত্রদের জীবনযাত্রার মান।
আর্টসের হলগুলোর ছেলেপেলেরা রুমে রান্না করে খেত খরচ বাচাতে। সবাই নয়।
একটা মজার জিনিস জেনেছি সলিমুল্লাহ হলে থাকাকালীন সময়ে। সয়াবিন তেল (ওজনে হাল্কা) ওরা কেজিতে কিনত আর সরিষার তেল (ওজনে ভারী) কিনত লিটার হিসাবে।
আমি এখনো ব্রেকফাস্ট করতে পারিনা; খুব ক্ষুধা লাগলে বিস্কুট খাই; যদিও ব্রেকফাস্ট হিসাবে খিচুড়ি, বা পোলাও আমার খুব পছন্দের, কিন্তু প্রতিদিন তো খাওয়া যায়না। সেই সময় ব্রেকফাস্ট না করে হলের কোনায় গিয়ে ইবু নামের দোকানদারকে (হল সংলগ্ন)ডাকতাম আর টুকরীতে করে দোতলার বারান্দা থেকে ১০ টাকা নামিয়ে দিতাম; ইবু ৫টা গোল্ড লিফ দিয়ে দিত। এই সিগারেটই ছিল আমার সকালের নাস্তা।
সাইন্সের হলগুলোর ছেলেরা চাঙ্কারপুলের হোটেলগুলোয় খেতে যেতো। সোহাগের রান্না বেশি ভালো ছিল।
আর বুয়েটে গেলে ছেলেপেলে দারুন নাস্তা করাতো। টুইশনিতে ওদের বাজার ভালো থাকায় সবসময় ওদের পকেটে কাঁচা পয়সা থাকত।)

হলে সিটের জন্য ছেলেপেলেরা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তো। এখন কি অবস্থা কে জানে? কিন্তু যখন দেখি এদের ফেসবুকে রাজনৈতিক স্লোগান তখন রীতিমতো শঙ্কিত হই। মেডিকেলের ছাত্ররা (ক্যাডেটরাও) রড নিয়ে মারামারি করে; যেই হাত রক্ষা করবে মানুষের জীবন সেই হাত উদ্দত সহপাঠীর জীবন হরনের নিমিত্তে।

১ম পর্বের আলোচনায় ফেরত আসি।

অনেকেই মুল বক্তব্য ধরতে চেয়েছেন, অনেকের কাছেই খাপছাড়া লেগেছে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমিও কি বুজছিনা, ধান ভানতে শিবের গিত গাওয়া হয়ে গেলো। (তাহলে কি ধান ভানার আলাদা গিত রয়েছে; কই মনে পড়ছেনা। দেখি বাংলা সিনেমায় থাকলেও থাকতে পারে, দেখা যাবে আমাদের বিখ্যাত ময়ুরি বা মুনমুন ঢেকিতে পাড় দিচ্ছেন, সারা উঠান কাঁপছে আর তেনারা সখিসহ গান গাইছেন)।

আমাদের ইতিহাস বইতে যা পড়ানো হয় তার অধিকাংশই ভুল বা মিথ্যা।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে একসময় বানোয়াট ও মিথ্যা মামলা বলা হতো; অথচ আজ আমরা জানি যে মামলাটি ১০০ ভাগ সত্যি ছিল। এমনকি মামলাটি সত্যি হওয়ায় মুজিবের দেশপ্রেম, জাতিয়তা চেতনা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।

ইতিহাসের দুই মহানায়ক রয়েছেন।
ইখতিয়ার উদ্দিন মহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজি।
আর বাংলা-বিহার-উরিষার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দউলা।

ইতিহাসে আছে ইখতিয়ার সাহেব ১৮ জন সেনা সহ লক্ষণ সেনের রাজধানি নদিয়া দখল করে নেন। লক্ষণ সেন তখন বৃদ্ধ; শত্রু আগমনের সংবাদ পেয়ে তিনি পিছন দ্বার দিয়ে নদিপথে পালিয়ে যান। রাজা পালিয়ে যাওয়ায় রাজধানীর সেনারা আর যুদ্ধ করেনাই, বরং আত্মসমর্পণই শ্রেয় মনে করে।
কিন্তু মজা সেইখানে নয়। বখতিয়ার ১৮ জন সেনা নিয়ে নদিয়া জয় করেননি; বরং তারা আগ্রবর্তি বাহিনীর অংশ ছিল।
প্রকৃতপক্ষে লক্ষণ সেনই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। লক্ষণ সেন হিন্দু হওয়ার কারণেই আমরা মুসলিম ইখতিয়ার সাহেবকে উচ্চে স্থান দেবার জন্য এইরকম কাহিনি ফেঁদেছি বা নাচাকুদা করেছি। অনুসন্ধানী পাঠক শওকত আলির প্রদোষে প্রাকৃতজন পড়ে দেখতে পারেন।

আর সিরাজ ইংরাজদের মতো বিদেশি বইত আর কিছুই নয় বা হতে পারেনা আমাদের কাছে।
সিরাজ যে অকর্মার ধেকি ছিল তার প্রমাণ পলাশির যুদ্ধে ব্যাবহৃত কামান এবং গোলাবারুদ সংরক্ষনের ধরণ।
কামান গুলো উঁচু মঞ্চে স্থাপিত ছিল ফলে সব গোলা ক্লাইভ বাহিনীর অনেক উপর দিয়ে উড়ে যায়।
গোলাবারুদ অধিকাংশই বৃষ্টিতে ভিজে যায়। অনায়াসে বলা যায় সিরাজের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার কোনও ক্ষমতা ছিলোনা।

চলবে………

২,১১৩ বার দেখা হয়েছে

১৯ টি মন্তব্য : “সাম্প্রতিক এবং ছেঁড়া কথন ০২”

  1. টিটো রহমান (৯৪-০০)

    রাজিব ভাই কেমন আছেন?
    প্রথম পর্বটা মিস করে গেছি পড়ে নিচ্ছি......এ পর্বটা দারুণ...... :hatsoff: :hatsoff:

    আমার বিশ্ববিদ্যালয় চেনা আপনাদের ব্যাচকে দিয়ে......শহীদুল্লাহ হল....১৮ নম্বর রুম....সেইদিনগুলা আসলেই খুব মিস্করি 🙁
    মোস্তাক ভাইর সাতে মাঝে মাঝে সিসি ক্লাবে দেখা হয়.....
    ফেসবুকে পিচ্চির ছবি দেখলাম......ব্যাপক কিউট হইছে.....
    ভাবী কেমন আছে?
    সপরিবারে ভালো থাকেন সব সময়।


    আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই

    জবাব দিন
    • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

      হাফিয আমি ভালই আছি।
      ভাবী, বাচ্চারাও ভালো আছে।
      গতকাল ছোটটা, ঋধি উপর থেকে পড়ে গিয়েছিল।
      কাজ থেকে চলে আসতে হল।
      আছে ভালই।
      তোর ভাবীতো বিশাল ভয় খাইছিল।
      তুই কি করিস এখন?
      কোনোদিন তো লিখি নাই।
      তাই মতামত জানাইস।
      ভালো থাক।


      এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

      জবাব দিন
  2. রাব্বী (৯২-৯৮)

    রাজীব ভাই, কাসেম বিন আবু বাকারের কি কি বই পড়ছেন? 'বাসর রাত' কিংবা 'স্বপ্নে দেখা সেই মেয়েটি' পড়ছেন নাকি, ব্রাদার? 😛

    শওকত আলির প্রদোষে প্রাকৃতজন আমার প্রিয় বইগুলোর একটি। অসাধারণ! আবুল বাশার 'দেশ' পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় পড়েছি। খুব শক্তিশালী এবং পশ্চিম বাংলার সেক্যুলার বাম ঘরানার লেখক। ভালভাবে পড়ার ইচ্ছা অনেকদিনের।


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন
    • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

      দুঃখিত রাব্বি, কাসেম সাহেবের বই পড়ার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কনটাই আমার হয়নাই। আশা রাখি হবেওনা।
      গো আজমের জীবনী ইস্যু করছিলাম একবার। দেখি মিথ্যা কথা লেখা। আমার ভাগ্য খুব ভালো যে ১ম খণ্ডের ১৫/২০ পাতার মধ্যেই মিথ্যাটা চোখে পড়ছে। নয়তো পুরা বইটাই হয়তো পড়তাম!!!
      পরে এ নিয়ে লিখবো।
      আমাদের দেশের অনেক অনেক ভালো লেখক রয়েছেন; আমরা পড়িনা, জানিনা। আর অন্য দিকে ধাবিত হই। শওকত আলির লেখা খুব বলিষ্ঠ।
      আবুল বাশারের লেখা আমার খুব প্রিয়। ধর্মের অনেক গোঁড়ামি উনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে উনার প্রত্যেকটা লেখা ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের; কোনও repeatation নাই। আমাদের দেশের হুমায়ুন আজাদের মতো।


      এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

      জবাব দিন
  3. রাজীব ....ভালই লিখ, তবে নকশাল, সয়াবিন তেল , ইমরান খান ও সিরাজ-উদ-দউলা এক লেখায় না আনলেই ভালো....একেক দিন একেক আলোচনায় আনন্দটা বেশি...এটা আমার মনে হই ...মিনহাজ (৬৫৭)...

    জবাব দিন
  4. ফখরুল (১৯৯৭-২০০৩)

    রাজীব ভাই আপনার লেখা আসলেই ছেড়া কথন। কখন কোনদিকে চলে যাচ্ছেন টের পাচ্ছি না কিন্তু খুব ভাল লাগছে। ধন্যবাদ ভাইয়া অনেক অজানা তথ্য দিয়েছেন।

    জবাব দিন
  5. নঈম (৮৭-৯৩)

    রাজিব। চমৎকার লিখেছ। তবে যতটুকু জানি, লক্ষণ সেনের পূর্ব পুরুষ দক্ষিণ ভারত (বা অন্য কোথাও) থেকে ভাগ্যান্বষণে এসেছিল। এদেশের অরাজক অবস্থার সুযোগ নিয়ে শাসন ভার গ্রহণ করেছিল। সেই হিসেবে লক্ষণ সেনও বিদেশী।

    জবাব দিন
    • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

      নঈম ভাই, ধন্যবাদ।
      আপনার কথা ঠিক।
      সৃতির উপর ভর করে লিকছি তো; তাই আরকি?
      কিন্তু একটা কথা ভাই গোপাল, সেন, শশাঙ্ক এদের সাথে মুসলিম শাসকদের নীতিগত তফাত রয়েছে।
      আর আমরা নিজেরা মুসলিম বলে অন্য মুসলিমদের কোনও দোষ দেখিনা।
      এই কারণে লাদেন, মোল্লা উমর, সাদ্দাম, গাদ্দাফি, আহামেদিনিজাদ আমাদের কাছে HERO.


      এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।