খিদে

১।
স্বামী হিসেবে সৈকতকে নিয়ে রুপা-র তেমন কোন অভিযোগ নেই…কেবলমাত্র একটি বিষয় ছাড়া। সময় নেই…অসময় নেই- কেবলই খাওয়ার (?) জন্য ছোঁক ছোঁক করে। এই জন্য অনেকবারই রুপাকে লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে…তারপরেও সৈকতকে সামাল দিয়ে রাখা খুবই কঠিন!! নেহায়েৎ ভালবেসে বিয়ে করেছে নয় তো…!! এর চেয়ে অনেক কম ঝামেলার বিষয় নিয়ে বহু তথাকথিত সুখের সংসার ভেঙে যেতে দেখেছে রূপা।

একটা লম্বা কোর্সের জন্য এবার সৈকতকে একা ঢাকায় আসতে হলো…রুপা ওর হাসপাতাল…ছেলের পিএসসি পরীক্ষা…মেয়ের স্কুল…সন্ধ্যায় চেম্বার ইত্যাদির জন্য আসতে পারলো না। সৈকত ওদের পুরো ফ্যামিলি সাথে নিয়ে যাবার জন্য একটু গাঁইগুঁই করছিলো অবশ্য…কিন্তু পেরে ওঠে নি!!

এই একটা বছর কিভাবে সৈকত একা কষ্ট করে কাটাবে সেটা নিয়ে যত না শংকা…তার চেয়ে ওর খাই খাই স্বভাবটা নিয়েই রুপার বেশী ভয়। কখন যে কোন ঝামেলা পাকিয়ে বসে! ঢাকায় রওনা দেয়ার সময়েও বার কয়েক মনে করিয়ে দিয়েছে ওকে। সৈকত শুধু ওর স্বভাবসূলভ ভঙ্গীতে হাসিমুখে বলেছে… “ আমার মিয়া বিদেশ থেকে পাওয়া চারিত্রিক সনদ আছে…তুমি খামাখাই ভয় পাচ্ছো।”

সৈকত সরকারী চাকুরীজীবি ইঞ্জিনীয়ার…দু’জনেই একই ব্যাচের হওয়ায় একে অপরের ফ্রেন্ড সার্কেলের প্রায় সবাইকেই চেনে। সেজন্যই রূপা সতর্ক করে দিলো আরেকবার…
– “খবরদার, সুমি আর শিপ্রার সাথে কিন্তু অত ঘেঁষাঘেঁষি করবে না।”
# আরে ধ্যাৎ, কি যে বলো না! আমি কি ওইরকম না কি?
– তুমি কি রকম…তা তো আমি জানি-ই। সেজন্যই তো সতর্ক করে দিচ্ছি। আর শোন, খবরদার, সিগারেট খাবে না কিন্তু। তোমাদের কাছ থেকে দূরে আছি…ছেলে মেয়েকে খুব মিস করছি…পড়ালেখার খুব চাপ…এইসব ভুজুং ভাজুং চলবে না কিন্তু!
# আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে।
– তোমার সাথে ইমন-অর্পারা যাচ্ছে না? আমি কিন্তু ওদের কাছ থেকে নিয়মিত ইনফর্মেশন নেব। ভাল কথা, তোমাকে কি অফিসার্স মেসে থাকার জন্য রুম দিয়েছে না কি বাসা নিয়ে বাইরে থাকতে হবে?
# দেখি…কি করে!! বাসা হলে তো ভালোই হয়…হাত-পা ছড়িয়ে একা একা থাকবো… বাসায় গেষ্ট নিয়ে আসবো…কোর্সের মাঝে ভাল মাস্তি হবে…
– আর সাথে তোমার কপালে ঝাঁটার বাড়ি হবে! খবরদার…যদি বাসায় আমার অবর্তমানে কোন গেষ্ট নিয়ে এসেছো… তাহলে কিন্তু বিরাট ঝামেলা হবে বলে দিচ্ছি!!
# কি জ্বালা, তোমার সাথে মজাও করতে পারবো না!!
– না, এইসব বিষয়ে কোন মজা নয়…
# আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে।

সৈকত সহজভাবে কথাটা শেষ করলেও…রুপা ব্যাপারটা ভুলতে পারলো না…। পরবর্তীতে, অর্পা এবং ওর হাজবেন্ড ইমনকে ফোন করে অনুরোধ করলো…ওরা দু’জনেই যেন সৈকতের দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখে।

২।

কোর্সের প্রায় চার মাস পার হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে পড়ালেখার বহুর্মূখী চাপের পাশাপাশি দেশী-বিদেশী স্টুডেন্টদের নিয়ে অনেক পার্টি, গ্যাদারিং, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির কারণে সৈকত অনেকটা দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। সেইসাথে…খিদেটাও যেন অনেকটা মরে গিয়েছিল…।

মিরপুর ডিওএইচএস-এর খুব কাছেই ওর বাসা…এক জুনিয়র কলিগ “সাগর” আর ও মিলে থাকে। তিন বেডরুমের বাসায় দুইজন থাকা…কোর্সের পড়ালেখার পাশাপাশি মজা করতে করতে ভালই সময় কেটে যায়। সৈকত তো জিওগ্রাফিকাল ব্যাচেলর…আর সাগর হলো ‘ডিভোর্সড’ ব্যাচেলর। ডিভোর্সের কারণ জিজ্ঞেস করাতে সাগর বলেছিল… “ভাইয়া, বিয়ের রাতেই বউ আমাকে জানিয়েছিল…বাবা-মায়ের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের স্বীকার হয়ে তাকে এই বিয়ে করতে হচ্ছে। সুযোগ পেলেই সে তার প্রেমিকের হাত ধরে চলে যাবে। পরে সময়-সু্যোগ পেয়েই আমার বউটা পলান্টিস দিয়েছে। আমার পরিবারে বাবার মুখের উপরে কোন কথা চলে না…তাই আমি বিয়ে করেছিলাম। এখন বাবা আর আমাকে আবারও বিয়ে দেবার কোন সুযোগ পাচ্ছেন না।”

সাগরের বাবা রিটায়ার্ড আর্মি জেনারেল… ওদের পৈত্রিক বাসা বারিধারা ডিওএইচএস। কিন্তু বাবার উপরে জেদ করে যতটুকু পারে…সাগর বাইরেই থাকে। সে কারণেই এখানে…কোর্সের অজুহাতে আলাদা বাসা নেয়া।

বৃহস্পতিবার বিকেলের পর থেকেই সৈকতের পুরো শরীরে খিদে জাগান দিয়ে ঊঠলো। অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে যেন সামাল দিতে পারছিল না ও। কি করা যায়…ভাবতে ভাবতে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে রাত নয়টা বাজিয়ে দিল…

শেষমেশ পরামর্শ চাইবার জন্য রুপাকে ফোন দিল ওঃ
# হ্যালো, রূপা?
– এই শোন, আমি একটু ব্যস্ত…চেম্বারে আছি। ফ্রী হয়ে তোমাকে কল করছি…ঠিক আছে?
# না, মানে…ইয়ে…আমার …আচ্ছা, ঠিক আছে, পরে কথা হবে।

কিঞ্চিৎ হতাশা নিয়ে ফোনটা রাখলো সৈকত। আজ সারা রাত মনে হয় খিদে নিয়েই কাটাতে হবে…
আচ্ছা, ভাল কথা, অর্পা-র সাথে কথা বলে দেখবো না কি? নিজে নিজেই হেসে উঠলো সৈকত। অর্পা-র সাথে না ও বোন পাতিয়েছে!! তার উপরে ওর হাসবেন্ড ইমনও ওর অনেক কাছের…সবচেয়ে বড় কথা- ওরা দু’জনেই সৈকতকে খুব পছন্দ করে…শ্রদ্ধা করে…ভালবাসে। সৈকতের এই খারাপ দিকটা জানলে কি আর ওরা ভাল করে মিশবে?? তা ছাড়া, টোটাল কমিউনিটিতে একটা বিরূপ প্রভাব পড়বে না!!!

আচ্ছা, ওর ‘হাউসমেট’ সাগরের সাথে কথা বলে দেখবে?? সাগর খিদে পেলে কি করে?? লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে সাগরকে ফোন দিল সৈকত…
# সাগর, তুমি কি বাইরে?
@ না ভাই, আমি তো আমাদের বাসায়…মানে বারিধারা ডিওএইচএস-এ এসেছি। আজ বৃহস্পতিবার রাত নাহ্‌…তাই আপনাকে সুযোগ করে দিয়ে চলে আসলাম আর কি…
# ধুর্‌ মিয়া মজা করো? আমার তো খুবই খারাপ লাগছে…একা একা ভাল লাগছে না। তার উপরে তীব্র খিদেও লেগেছে…
@ ওহ্‌…স্যরি ভাই, আমি তাহলে চলে আসি? আমি অবশ্য খাবার খেতে বসেছিলাম… আচ্ছা, আমি তাহলে খাবার খেয়েই রওনা দিচ্ছি। আর আসার পথে দোকান থেকে বিরিয়ানী কিনে নিয়ে আসবো?
# ভাইরে, আমার কি বিরিয়ানীর খিদে লেগেছে?? জানো না…আমি কি খেতে ভালবাসি??
@ স্যরি ভাই, এই ব্যাপারে তো আমি কোন হেল্প করতে পারবো না…
# আচ্ছা, ঠিক আছে, তোমার আজ রাতেই চলে আসতে হবে না… আমি দেখি, এইদিক থেকে কিছু ম্যনেজ করতে পারি কি না…

আচ্ছা, উপরের তলায় তো মানিকরা আছে…ওর বউ… মানে নীপা তো বেশ হাসিঠাট্টাও করে সৈকতের সাথে। নীপা-র কাছে এপ্রোচ করবে না নি??
রাত সাড়ে দশটার পরে আস্তে আস্তে সৈকতের পুরো শরীর গরম হয়ে কাঁপতে থাকে খিদেয়। খিদেটা না মেটালে আজ রাতে একটা বিরাট কেলেংকারী হয়ে যাবে মনে হচ্ছে… পুরাতন সব ফ্রেন্ড সার্কেলের সাথে যোগাযোগ করবে না কি এতো রাতে!!

রুপার ফোনটা যখন আসলো…ততক্ষণে সৈকত লাজ-শরমের মাথা খেয়ে সুমি-শিপ্রা আর অর্ণার সাথে কথা বলে ফেলেছে…এলোমেলো অবস্থায় সৈকত রুপার কল রিসিভ পর্যন্ত করলো না। চৌদ্দবারের মতন মোবাইল কল না ধরায় রূপা তড়িঘড়ি করে অর্ণাকে ফোন করলো…কিন্তু… অর্ণাও মোবাইল না ধরায় এবার শংকিত হয়ে ইমনকে ফোন দিল রূপাঃ
– ইমন ভাই, সৈকত তো আমার ফোন ধরছে না…এ পর্যন্ত চৌদ্দবার মোবাইলে কল করেছি। আমি চেম্বারে ছিলাম…আমাকে নয়টার দিকে কল করেছিল…কথা বলতে পারি নি।
* ঠিক আছে, আমি তো বাইরে…একটু বাজারে এসেছি। বাসায় ফিরেই আমি সৈকত ভাইয়ের খোঁজ নিয়ে আপনাকে জানাচ্ছি ভাবী!!
– ঠিক আছে ভাই, আমি অর্ণা আপুকেও ট্রাই করেছিলাম…কিন্তু পাইনি।
* ও আচ্ছা, মোবাইল এক রুমে রেখে অর্ণা মনে হয় অন্য রুমে আছে…আমি গিয়ে দেখছি। টেনশন করার দরকার নেই…

বাসায় ফিরে ইমন শুনলো…আধা ঘন্টা খানেক আগে অর্ণা একটা মোবাইল পেয়ে তড়িঘড়ি করে বেড়িয়ে গেছে। কার মোবাইল ছিল…জিজ্ঞেস করায় ছেলে জানালো…সৈকত চাচ্চু মোবাইল করেছিল!! ধ্যাত্তেরি…শালার ঝামেলা!!…বিড়বিড় করতে করতে ইমন সৈকতের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

৩।

সৈকতের বাসাটা পাঁচতলা বিল্ডিং এর নীচ তলায়। বাসার সামনেই ইমন ওদের গাড়ীটা পার্ক করা অবস্থায় দেখলো। সাথে আরও দুইটা গাড়ী দেখলো…মনে হলো সুমি-শিপ্রা ওরাও এসেছে!!

কলিং বেল দেয়া লাগলো না…বাসার সদর দরজাটা খোলাই রয়েছে। সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই ইমন অর্ণাকে দেখতে পেল। শুধু অর্ণা-সুমি-শিপ্রা নয়…উপর তলা থেকে নীপা ভাবীও এসেছে!! সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে অপার মমতা নিয়ে…কিছুটা অবাক ভঙ্গীতে চেয়ে রয়েছে সৈকত ভাইয়ের দিকে…

দরজায় শব্দ পেয়ে সবাই একটু তটস্থ হয়ে ইমনের দিকে তাকালো। সবকিছু দেখে ইমন বলে উঠলোঃ
“ছি ছি সৈকত ভাই…আপনি আগে বলবেন না? আমি তাহলে সাথে করে একটু ঘি নিয়ে আসতাম!!”
আর সৈকত!!!
ইমনের কথার কোন জবাব না দিয়ে সে গোগ্রাসে আলু ভর্তা, ডিম-ভাজি আর ডাল মিশ্রিত ভাত খাওয়া চালিয়ে যেতে লাগলো…যে খাবারের খিদেয় তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল…।

২,১১৮ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য “খিদে”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।