ওজন আলী।

সামনে একটা ওজন কিংবা ভর মাপার যন্ত্র। পেছনে একটা মানুষ। রাস্তার ঠিক এক কোণায়।
আমরা ডাকি ওজন আলী ভাই। পাড়াতুতো বন্ধু অয়ন খুব চেষ্টা করেছিল অন্য নামটি প্রচলন করতে। ওজন আলী না। এটা হবে ভর আলী।

আরে ব্যাটা, ওজন হতে হইলে তো মেশিনের সবগুলা সংখ্যারে নয় দশমিক আট দিয়ে গুণ করতে হবে- আর একক বলতে হবে নিউটন। এতদিন সায়েন্স পড়ে কী লাভটা…

ভর আলী অবশ্য খ্যাতি পেল না। তাই ওজন আলীই রয়ে গেল। বিড়ি টানতে টানতে উঠোনে লেপ্টে দেয়া মাটির মত হয়ে যাওয়া-হাতের দশটা আংগুল নিয়ে আমাদের ওজন আলী ভাই।
একজনের ওজন মাপালে এক টাকা। খুব সহজ হিসাব।
বাজার গরমের দিন। সবকিছুর দাম বাড়ে। ওজন আলী ভাইয়ের মেশিনে ওজন মাপাতেই শুধু আগের খরচ থেকে যায়। এক টাকা দাও। তোমার ভর জেনে নাও।

অনেকটা শখের বশেই পাড়ার লোকজন কালে ভদ্রে সেই যন্ত্রের উপর উঠে দাঁড়ায়। কেউ আটান্ন কেজি। কেউবা পঁচাশি। কেউ নিজের কম ওজন হলে তৃপ্তির হাসি দেয়। কেউ আক্ষেপ করে…
নাহ, এবার দেখি ডায়েট নিতেই হচ্ছে।
খরচ অবশ্য একই। এক টাকা।

আমার মাঝে মধ্যে খুব আগ্রহ হতো। ভালো সিগারেট দিতে চাই। ওজন আলী ভাই হাসেন। এত বছর বিড়ি খাই ভাইজান- এসব বিদেশি সিগ্রেটের গন্ধে বমি আহে।
আমিও হাসি। জিজ্ঞেস করি-
আচ্ছা আলী ভাই, আপনার ওজন কত?

ওজন আলী ভাই হাসেন আর হাসেন। যে কটা দাঁত রয়ে গেছে তাতে চিরদিনের জন্য দাগ পড়ে গেছে। তবুও সে হাসি বড় অকৃত্রিম মনে হয়।

কী মিয়া- হাসেন ক্যান?

ক্যামনে কমু আমার উজন কত? আমি কী আর মাইপা দেখছি? আমাগো আলম। রিকশা চালায়। হে কী কুনদিন রিকশায় চড়ছে? বুঝলেন নি ভাইজান। আমাগো বাড়ি আছিল মুবারক খীল। মুবারক খীলের চোধুরীদের জমিনে আমার বাপ বান্ধা চাষ ফালাইত। সুনার ধান ফলাইত। আমার বাপ ক্যামনে মইরা গেল জানেন?

ভুকে। প্যাটের ভুকে।

…………………………………………………
১৬/০১/০৯

৩,৫২০ বার দেখা হয়েছে

৩১ টি মন্তব্য : “ওজন আলী।”

  1. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    মহিবের সবচেয়ে ভাল গল্পগুলোর একটা। আমার খুব প্রিয়। অন্য মানুষের অনুভূতি নিজের মধ্যে অনুভব করা এক বিরাট অর্জন। এটা তুই অর্জন করে ফেলেছিস। তোর অনেক গল্পেই সেটা টের পাওয়া যায়। আশাকরি আরও অনুভূতির কথা আমাদের জানাবি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।