বন্য সুন্দরে পাঁচদিন চাররাত

ভ্রমণ কাহিনীর আমি গোগ্রাসে গিলি। তাতে মজা একটাই। অদেখা, অজানা সব জায়গায় নিজে যেতে না পারলেও অন্যের চোখ দিয়ে দেখে নিই। এই যে আমাদের শান্তা, এমন সব দারুণ লেখে। পড়েও অতৃপ্তিটা থেকে যায়। যদি আরো কিছু পাওয়া যেত। কিন্তু ভ্রমণ তো এক জায়গায় শেষ হতেই হবে। শান্তা দেশ দেখে, স্থান দেখে, মানুষ দেখে, সেসব নিয়ে ভাবে- তারপর দারুণভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরে। সাইফ ভাই মানুষ দেখেন। তাদের কথা লেখেন অবশ্য অন্য ব্লগে। তার প্রতিটি লেখায় নির্দিষ্ট মানুষটার জন্য পরম মমত্ববোধ ভীষণভাবে প্রকাশ পায়। সিসিবির আরো অনেকেরই এমনসব গুন আছে।

আমার সেসব ক্ষমতা নেই। আমি এক্ষেত্রে কেমন যেন স্বার্থপর। নিজে দেখি, নিজেই আনন্দ পাই। হয়তো স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিই। আর বেরাতে গেলে আমি সব সময় অপরিচিত মানুষ এড়িয়ে চলি। নিজের প্রাইভেসিটাকে প্রাধান্য দিই। নাকি নিজের অন্তর্মুখী চরিত্রের কারণে আমার এমন স্বভাব!

এবার ঈদের ছুটিটা আমরা হিমালয় কন্যা নেপালে কাটালাম। ঘরের পাশের দেশ, যেন উঁকি দিয়েই দেখা যায়! অথচ সেখানে যেতেই এতোবছর লেগে গেল! আমাদের ফৌজদারহাটের বন্ধুদের বন্ধনটা ইদানিং যেন আরো জোরালো হয়েছে। প্রায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ চাকরি জীবনে একটা স্থিতি পেয়েছে। ক্যারিয়ারের পেছন দৌঁড়োনো তো অনেক হলো। এখন প্রায় সবাই জীবনের জন্য কিছু চাই। তাই আজকাল বেরানোর পরিকল্পনাগুলোও হয় বন্ধুদের নিয়ে।

প্রথমে পরিকল্পনা ছিল আমাদের অন্ততঃ চারটি পরিবার এবার নেপাল বেরাতে যাবো। উদ্যোক্তা ব্যাংকার ইকরাম। প্রথমেই ঝরে গেল এক পরিবার। ওরা যাবে মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর। আরেকটি পরিবারও দ্বিধায় পরলো। বন্ধু পত্নীর ইচ্ছা, ব্যাংককে গিয়ে তার স্বামীর একটা ছোট্ট অপারেশন করিয়ে নেবে ঈদের ছুটির সুযোগে। কিন্তু তাদের সে ইচ্ছেতেও পানি ঢেলে দিল একটি দুর্ঘটনা। ঢাকা-সিলেট সড়কে নরসিংদীতে একটি বাস ওদের গাড়িটাকে দুমরে দিলেও যাত্রী পাঁচজনের কারো তেমন ক্ষতি হয়নি। ফলে ওরাও বাদ হয়ে গেল।

বাকি ইকরাম আর আমাদের পরিবার। শেষ মূহুর্তে ইকরামের এক সহকর্মী তার দুই ছেলে আর ছেলের বউদের নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। দলে আমরা পূর্ণবয়স্ক ১২ জন আর দুটি শিশু।

টিকেট করা, প্যাকেজ নেওয়া সব ঠিকঠাক করলো ইকরাম। ঈদের পরদিন দুপুরে আমাদের দলের যাত্রা শুরু বাংলাদেশ বিমানে। আর বাংলাদেশ বিমানের স্বভাব তো সবারই জানা। তিনটার মধ্যে কাঠমান্ডু পৌঁছার কথা থাকলেও ওই ডিসি ১০-৩০টি আমাদের কাছ থেকে আরো তিন ঘণ্টা জোর করে নিয়ে নিল! সিগেরেট ফোঁকার বদভ্যাস যাদের আছে তারা আমার কষ্টটা বুঝবে! কাঠমান্ডু বিমানবন্দর সম্পর্কে একটা দারুণ অভিজ্ঞতা হলো একইসঙ্গে।

এতোদিন জানতাম ঢাকার চেয়ে জঘন্য ইমিগ্রেশন আর হতে পারে না। ইমিগ্রেশনে বসা পুলিশ কর্মকর্তারা কি-বোর্ডে এক আঙুল দিয়ে যে গতিতে টাইপ করেন আর যেভাবে পাসপোর্ট দেখেন তাতে মনে হতেই পারে আমরা দেশ ছেড়ে গিয়ে ভীষণ অপরাধ করছি! তাই যতোক্ষণ পারা যায়, যাত্রাটাকে দীর্ঘ, কষ্টকর করতে তাদের কি অপরিসীম চেষ্টা! কিন্তু কাঠমান্ডু গিয়ে ঢাকার ইমিগ্রেশনের প্রশংসা করা ছাড়া আমাদের বিকল্প ছির না! ‘অ্যারাইভাল ভিসা’র নামে কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে একটি কাউন্টারে দুই-আড়াইশ যাত্রীর ইমিগ্রেশন ‘পুলসেরাত’ পার হওয়ার যন্ত্রণা বলে বোঝানো কঠিন। শেষ দিকে দয়া দেখিয়ে আরেকটি কাউন্টার খোলা হল। দুর্ভোগ কাটিয়ে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সিগেরেটে টান দিয়ে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো।

সিগেরেটের প্রসঙ্গ যখন এলোই, তখন এ নিয়ে আমার সৃজনশীল তৎপরতার কিছু উল্লেখ না করাটা ‘অন্যায়’ হবে! প্রতিবার দেশের বাইরে গেলে লাইটারটা মূল লাগেজে ঢুকিয়ে বিমানের পেটে চালান করে দিই। আর যাত্রার আগেই তিন থেকে চারটা ম্যাচবক্স কিনি। একটা পকেটে সিগেরেটের সঙ্গে রাখি। বাকিগুলোকে কেবিন লাগেজের বিভিন্ন পকেটে চালান করি। নিরাপত্তা তল্লাশির সময় প্রথমেই পকেটের ম্যাচটা রক্ষীদের হাতে তুলে দিয়ে প্রমাণ করি আমি ভীষণ ভদ্রলোক! তারপরও ওরা কেবিন লাগেজে হাত ঢুকিয়ে এক, দুটো খুঁজে বের করে ফেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা অন্ততঃ টিকে যায়। এই পুরো তৎপরতার জন্য আমাকে কতো সময়, মেধা আর শ্রম দিতে হয় ভেবে দেখুন! ১/১১ আমাদের মতো ধুমপায়ীদের বিমানযাত্রায় কতো সমস্যা যে ডেকে এনেছে তা যদি লাদেন ব্যাটা আগেই বুঝতো!

কাঠমান্ডু বিমানবন্দরের বাইরে আমাদের বাহন এবং সেই সঙ্গে ট্যুর অপারেটরের একজন নারী প্রতিনিধি অপেক্ষায় ছিলেন। সুটকেস-হাতকেস সব ওই টয়োটা ভ্যানে চালান করে দিয়ে সবাই গাড়িতে উঠে বসেছি। ইকরাম বসেছে চালকের পাশের আসনে আর তার পাশে আমাদের স্বাগত জানাতে আসা নেপালি নারী। আমি কিছু জানিনি বা শুনিনি। অনেকেই বলে আমার এন্টেনায় নাকি অনেক কিছু ধরা পড়ে না! আমার স্ত্রীও এ ব্যাপারে একমত। হঠাৎ দেখি ইকরাম সুরসুর করে তার আসন ছেড়ে নেমে এসে ভেতরের এক আসনে জায়গা নিল। পরে ছবি- আমার স্ত্রী জানিয়েছিল, গাড়ির পেছন থেকে বন্ধুপত্নী পাপড়ি নাকি চাপা হুংকার দিয়েছিল! স্বামীদের দৌঁড় তো তাদের স্ত্রীরা খুব ভালো করেই জানে! তাই বেচারা ইকরাম আর সাহস দেখাতে পারেনি।

ঢাকার ফুলবাড়িয়া পার হয়ে সদরঘাট, মৌলভীবাজার, চকবাজারে যারা গেছেন তারা কাঠমান্ডু শহরের সঙ্গে আমাদের পুরনো ঢাকার আশ্চর্য মিল খুঁজে পাবেন। সরু রাস্তা, পুরনো ছাদছিরি ছাড়া বাড়িঘর, দোকানপাট সব আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আপনি ঢাকাতেই আছেন। খালি একটি পাহাড়ি শহরে যেমন উঁচু-নিচু এলাকা থাকে কাঠমান্ডুতে ব্যতিক্রম শুধু তাই। যানজট পেরিয়ে থামেলে আমাদের হোটেলে পৌঁছুতেই রাত হয়ে গেল।

সবাইকে যার যার ঘর বুঝিয়ে দিয়ে আমরা দু’বন্ধু বেরুলাম আশেপাশের এলাকা রেকি করতে। রেস্টুরেন্ট দেখলাম প্রচুর। আশেপাশের সুভেনির শপগুলো, বার-পাব, সাইবার ক্যাফে আর রিকশাও চোখে পড়লো কিছু। রিকশায় নজর পড়তো না, যদি না এক চালকের কথা কানে না যেত। খালি রিকশাটি আমাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে হালকা উচ্চারণে জানালো, ‘বিউটিফুল গার্ল.. স্যার’। দু’বন্ধু দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলাম। স্বম্ভবত স্বর্গেও পুরুষ মানুষকে আকৃষ্ট করতে এই ‘পণ্যে’র অভাব হবে না!

আমাদের নেপালি টাকা দরকার। মানি এক্সচেঞ্জ খুঁজে পেলাম। ওখানে বোর্ডে লেখা ডলার প্রতি নেপালি রুপির হার ৭১ দশমিক ৮০ বা এরকম কিছু। বললাম, কতো দেবে। কাউন্টারে বসা যুবক ক্যালকুলেটরে দেখালো ৭৩। আমরা বললাম, দেখি অন্যরা কতো দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ও সুর পাল্টে বললো, ৭৪। ডান…. ডান। ভাত টিপেই বুঝলাম, এখানে দরাদরি চলবে।

পানি কিনতে গিয়েও দেখি একই কাহিনী। ১০, ১৫ বা ২০ যে যা দিয়ে কিনতে পারে। দু’বন্ধু কয়েক বোতল পানি, সোডা, পেপসি, চানাচুর আর হুইস্কির একটা বোতল বগলদাবা করে ফিরলাম। রাতে একটা পারিবারিক বাগান রেস্তোরায় ডিনার। খোলা আকাশের নিচে বাগানে বসে তীব্র ক্ষুধার মধ্যে নেপালি খাবার ভীষণ তৃপ্তি নিয়েই সবাই উপভোগ করেছি।

আমরা যাবো পোখরা। ওখানে “অন্নপূর্ণা” দেখবো। ২০০ কিলোমিটার রাস্তা। কিন্তু পাহাড়ি পথে ৬-সাড়ে ৬ ঘণ্টা লাগবে। পরদিন তাই নাস্তা সেরে সদলবলে বেরিয়ে পড়া। প্রথমেই কাঠমান্ডুর উপকণ্ঠে পুরনো শহর ‘পতন জাদুঘর’। কী অসাধারণ স্থাপত্য! যারা এই শহরটা বানিয়েছিলেন তারা আজ কেউ নেই! আর আমরা কতোগুলো বাইরের বর্গি সেই শহর এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছি! ভাবতেই কেমন লাগে, না? ছবি তোলার নেশায় পেয়ে গেল আমাদের সবার। যাই দেখি তারই স্মৃতি ধরে রাখতে ইচ্ছে করে।

‘ছবি’র ছবি তুলছি আমি, আর সেটা ধরা পড়লো ইকরামের ক্যামেরায়

পতন জাদুঘরে পাপড়ি ও ছবি এবং সৌধ ও উদয় : দুই মা আর দুই ছেলে

পতনের এই চত্তরটা দারুণ, কবুতরের দখলে থাকে। মানুষের অত্যাচারে কখনো কখনো ওদেরও জায়গা ছেড়ে দিতে হয়

পতন থেকে ছুটলো আমাদের বাহন পোখরার পথে। পাহাড়ি সরু পথ। আমাদের এই ক’দিনের অপরিহার্য আরেকটি মানুষ মহিন্দ্র। বিশাল টয়োটা ট্যুরিস্ট ভ্যানটির এই চালক ভীষণ সাবধানি। তবুও দুয়েকবার যে ভুল করেনি তা নয়। পথে থেমে চায়ের দোকানে আড্ডা। আবার ছুট। মনোকামনায় ক্যাবল কার ধরতে হবে। আমাদের বলা হয়েছিল, দুপুর একটা থেকে দুটো পর্যন্ত লাঞ্চের জন্য বন্ধ থাকে। আমরা নিশ্চিন্তে পৌঁছুলাম প্রায় তিনটায়।

মনোকামনা, কাঠমান্ডু আর পোখরার প্রায় মধ্যিখানে। পর্যটকদের আকর্ষনের জন্য দারুণভাবে সাজানো। পুরো নেপাল থেকে এই একটা এলাকা একেবাবে ভিন্ন। একটা দরিদ্র দেশে হঠাৎ করেই যেন একখন্ড ইউরোপ! লাল ইটের আধুনিক একটা ছোটখাট ভবন, রেস্টুরেন্ট আর মাঝখানে সাজানো-গোছানো একটা সড়কদ্বীপ। ক্ষুধার্ত সবাই, তাই প্রথমেই রেস্টুরেন্টে ঢুকে জানা গেল- ক্যাবল কার পাঁচটায় বন্ধ হয়ে যায়।

চারটা কি সোয়া চারটায় আমরা ক্যাবল কারে চড়ে বসলাম। ১৩০২ মিটার উঁচু মনোকামনা পাহাড় চুঁড়া আর মন্দিরে নিয়ে যাবে কারগুলো আমাদের। আমাদের মধ্যে ছবিকেই সবচেয়ে ভয় পেতে দেখলাম। চেহারাতে সেটা ও লুকোতে পারেনি। আমি মজা করে বললাম, দেখো উড়োজাহাজে করে কাঠমান্ডু এসে যদি এই সামান্য ক্যাবল কারকে কি করে ভয় পাও! ভয় কি আমারও কিছুটা লাগেনি! কিন্তু আশেপাশের প্রকৃতি, পাহাড় আর সবুজ বন্যা দেখে চোখ-মন জুড়িয়ে গেল। মোবাইলের ক্যামেরায় খালি শব্দ। একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছি।

ইকরাম আবার পণ করেছে, এই ভ্রমণে ও ৬শ ছবি তুলবে। ছবি- আমার বউ ওকে বাস্তববাদী হতে পরামর্শ দিলো। বললো, ইকরাম সংখ্যাটাকে ৩’শতে নিয়ে আসো। পরে নিজেও হিসেব করে দেখেছি, ২’শর মতো ছবি আমিই তুলেছি।

বন্য সুন্দর নেপাল পুরোটাই এরকম। নিজেকে কেমন ছোট লাগে…….

ক্যাবল কার থেকে তোলা নিচে ত্রিশুলা নদী, ল্যান্ডিং স্টেশন আর কাঠমান্ডু-পোখরা মহাসড়ক

ফেরার পথে আমি পরে গেলাম একা। আসলে ভালো করে দেখা আর ছবি তোলার জন্য অল্প যাত্রীর কার বেছে নিয়েছিলাম। কিন্তু ঘটনাটা ইকরামের ছোট ছেলে সৌধকে দুঃশ্চিন্তায় ফেলে দিল। ছোট্ট মনিটা বারবার বলছিল, ‘আচ্ছা, সানাউল্লাহ আকেংল ফিরবে কি করে?’ শেষ পর্যন্ত আমাকে ক্যাবল কার থেকে নামতে দেখে ওর মনে স্বস্তি ফিরে আসে

মনোকামনা ফেলে আমরা আবার ছুটলাম। পোখরা পৌঁছুতে হবে যে! আরো তিন ঘণ্টা লেগে গেল। ফলে ডিনার ছাড়া আমাদের জন্য আর কোনো কাজ বাকি ছিল না। রুচি বদলানোর জন্য এবার বেছে নিলাম পরোটা, সবজি, মুরগির মাংস আর ডাল। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পরলে দু’বন্ধু হুইস্কিতে চুমুক দিতে দিতে আড্ডায় (পরচর্চা কি? ফৌজদারহাটের অন্য কয়েক বন্ধু ছিল আড্ডার বিষয় অবশ্যই।) বসলাম। ছবির ঘুমটা যে পাকা ছিল না, তা বোঝা গেল পরদিন এক প্রশ্নে। জানতে চাইলো, তোমরা অমুককে নিয়ে কি বলছিলে? সব গোপনীয়তা তো ফাঁস করা যায় না। তাও আবার বন্ধুকে রক্ষা নিয়ে কথা! তাই বললাম, ‘ও তুমি শুনেছো? আসলে ও (অনুপস্থিত বন্ধু) কেমন কাঠখোট্টা না!’

পরদিন কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে ভোর ৫টার মধ্যে সবাই তৈরি। ‘অন্নপূর্ণা’ দেখতে হবে না? অন্নপূর্ণা দেখতে হয় সূর্যোদয়ের সময়। পুব আকাশে যখন সূর্যের আলো একটু একটু করে ফুটে ওঠে, তখন সে আলো পড়ে অন্নপূর্ণার চূড়ায়। বরফে ঢাকা সে পর্বতমালা তখন ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়।

মহিন্দ্র রাতের কালো আর কুয়াশা ভেঙ্গে আমাদের নিয়ে গেল সারাংকোট পাহাড়ের চূড়ায়। অন্নপূর্ণা দেখার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় খানিকটা সমতল ভূমি। ওমা এখানে দেখি মানুষের হাট বসেছে! আরো মানুষ আসছে। নানা বয়সি এই অন্নপূর্ণা দর্শকদের অনেকের মুখেই বাংলা ভাষা শুনে বুঝলাম, সমাবেশের আশি ভাগই বাংলাদেশের। পরিচিতও পেয়ে গেলাম কয়েকজন। ফৌজদারহাটে আমাদের একজন সিনিয়র ভুইয়া ভাইও (সাবেক সেনা কর্মকর্তা, বর্তমানে ব্যবসায়ী) সপরিবারে আছেন।

সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় সবাই। কিন্তু মেঘ যেন আমাদের সঙ্গে শত্রুতা করছে আজ। এতো মেঘ যে কোথা থেকে এলো! অনেক পরে মেঘের আড়াল থেকে সূর্যের সামান্য লাল আভা দেখা যেতেই আমরা মুখ ঘুরাই অন্নপূর্ণার দিকে। কিন্তু ‘মা’ (দেবীর নামেই এই পর্বতমালার নামকরণ হয়েছিল) লুকিয়ে রেখেছেন নিজেকে। ভারী মেঘের পর্দা এমনভাবে অন্নপূর্ণাকে ঢেকে রেখেছে যে বোঝারও সাধ্য নেই আড়ালে কি আছে। এর মধ্যে খন্ড খন্ড মেঘ ভাসতে ভাসতে আমাদের নিচের পাহাড়, উপত্যকা, জনপদকে ঘিরে ফেলছে। সে কি দারুণ দৃশ্য! মেঘের খেলা দেখতে দেখতে মনটা আনন্দে নেচে উঠে।

পূব আকাশে সূর্য বাবাজি এমনই রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছিল! মেঘের আড়াল থেকে হালকা লাল আভা……

সারাংকোট পাহাড়ের নিচে চলছে মেঘের খেলা। প্রথমে হালকা-পাতলা, কিছুটা অস্বচ্ছ……. আস্তে আস্তে ভারী হয়ে আসে পুরো ঢেকে ফেলে। সেটা আবার ক্যামেরায় ধরা অসম্ভবও

মেঘ ধেয়ে আসছে আমাদের দিকেও। ঘিরে ফেললো একসময়। হালকা ঠান্ডা একটা চমৎকার অনুভূতি

সময়মতো অন্নপূর্ণার দেখা না পেয়ে হতাশ দর্শকদের বেশির ভাগই চলে যেতে শুরু করলেন। কিন্তু আমরা নড়ছি না। চারদিকের প্রকৃতি দেখছি। উঁচু-নিচু পাহাড়ের ভাজ তো নয়, যেন সবুজ রং ঢেউয়ের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে। আর কি সব ঢেউ! ওইসব ঢেউয়ের ফাঁকে ফাঁকে মানুষের বসতি। ভীষণ শান্ত প্রকৃতি। সূর্য দেখা না দিলে কি হবে, আলো তো আসছে। ঘোলা কাঁচের ওপর রোদ পড়লে যেমন দেখায়।

অন্নপূর্ণা দেখতে গিয়ে ঠান্ডা লাগতে পারে এমন আশংকায় আমি ছাড়া বাকি সবাই কিছু না কিছু গরম কাপড় সঙ্গে নিয়েছিল। কিন্তু সেগুলো তাদের কাছে বোঝা হয়ে ওঠেছে। হালকা ঠান্ডাটা গায়ে মেখে দারুণ উপভোগ করছি।

আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অন্নপূর্ণা দেখার চেষ্টাও চলছে। হঠাৎ রব উঠলো, ‘ওই যে, ওই’। কই…. কই বলে সবাই সেটা দেখার জন্য উঁকিঝুঁকি মারছি। হ্যা, বামে একটু দেখা যাচ্ছে! মেঘের আড়াল থেকে বরফ ঢাকা সামান্য সাদা চূড়া। আবার সেটা আড়াল করে ফেলছে আরো ভারী মেঘ। আমাদের তেষ্টা যেন বেড়ে যায়। আমরা অন্নপূর্ণা খুঁজতে থাকি। সেই ভোর সাড়ে ৫টায় এসেছি। এখন বাজছে সাতটা।

আমাদের অধ্যাবসায়ের পরীক্ষা নিচ্ছে অন্নপূর্ণা। মেঘের আড়াল থেকে আমাদের সঙ্গে ওর লুকোচুরি খেলা চলতেই থাকে। আমরাও মুগ্ধ হয়ে তাই দেখতে থাকি। একটু একটু করে নিজেকে উম্মোচিত করতে থাকে এক ভয়ংকর সুন্দর। দেবীদর্শন যে সহজসাধ্য নয়, সেটা আমাদের ভালো করেই বুঝিয়ে দিচ্ছেন মা।

মেঘের পর্দা ঠেলে আমাদের অন্নপূর্ণা দেখার চেষ্টা শুরু হয়

বামে কিছুটা সমান্তরাল অন্নপূর্ণা একটু একটু করে বেরিয়ে আসছে

অনেকটাই এখন মেলে ধরেছে নিজেকে অন্নপূর্ণা

কি দারুণ না এই চূড়াটা! ইচ্ছে করে জয় করতে? নাকি ভয় দেখায়?

অন্নপূর্ণা সাড়ে ৭টা-আটটার দিকে নিজেকে অনেকটাই মেলে ধরে। চোখের সামনে বা থেকে ডানে বিস্তৃত পুরো পর্বতমালা। আর তার এই লাজনম্র রূপ কবিদের পক্ষেই যথার্থভাবে প্রকাশ করা সম্ভব। অপেক্ষার পুরোটা সময়, প্রতিটি ক্ষণ উপভোগ করেছি। অতৃপ্তির ছিটেফোটাও আমাদের কারো মধ্যে ছিল না। অপেক্ষা যে শেষ পর্যন্ত শুভ আর আনন্দ বয়ে আনে তা আবার নতুন করে জানলাম।

এবার মনে হলো নিজেদের ছাপ রাখার কথা। অন্নপূর্ণাকে পেছনে রেখে নানাভাবে ছবি তুলতে তৎপর হলাম আমরা। আমার ক্যামেরা ইকরামের হাতে, ইকরামেরটা আমার কাছে। নিজের ছবি, বউয়ের ছবি, পরিবারের ছবি, দলের ছবি কোনোটাই বাদ থাকে না।

বিষ্ময়, আনন্দ, তৃপ্তি……. আমার চোখে-মুখে বোধহয় সবকিছুরই মিশেল ছিল

আমরা দুই বন্ধু : ইকরামকে আমার চেয়ে ছোট এবং তরুণ দেখাচ্ছে কেন? ব্যাটা আবার এরই মধ্যে হৃদয়ে আংটি পড়েছে

ইকরাম-পাপড়ির পরিবার : পেছনে সাক্ষী অন্নপূর্ণা

এবং আমরা তিনজন। ছবিটা আসলেই দারুণ তুলেছে ইকরাম। সুখের এই স্মৃতিটাকে বড় করে ঝুঁলিয়ে রাখতে হবে

অন্নপূর্ণা দর্শন শেষে দিনের তালিকায় আমাদের আরো কিছু আছে। নাস্তার পর্ব শেষ করে আমরা ছুটলাম পোখরার “ডেভিস ফল” দেখতে। কি উদ্দাম গতিতে একটি ঝর্ণাধারা ছুটে চলেছে, না দেখলে বোঝানো কঠিন। এর পুরনো নাম Patale Chhango। পোখরার অদূরে এই ঝর্ণা ধারায় স্নানের সময় ১৯৬১ সালে সুইস নাগরিক মিজ ডেভিস স্বামীসহ হারিয়ে যান। মিজ ডেভিসের মরদেহ অনেক পরে উদ্ধার হয়। সেই থেকে এর নতুন নামকরণ। ডেভিস ফলের সৌন্দর্য্যটা ভিন্নরকম। একটা তীব্র গতির ঝর্ণাধারা ভূপৃষ্ঠে অনেকটা গড়িয়ে পাতালে হারিয়ে যায়। আর যে গতি ও শব্দে এর পতন তাতে ভয় ধরানো আতংক আছে।

এই সেই ডেভিস ফল : ভয়ংকর সুন্দর ঝর্ণাধারা। এখানে নামার সাহস দেখনোও অসম্ভব!!

ডেভিস ফল থেকে বেরিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো স্যূভেনির কেনায়। অ্যান্টিক ধরণের নানা গহনা, শো-পিস, নেপালি টুপি, টি-শার্ট, পোস্টার কি নেই সেখানে। বেশি কিছু কেনা হলো তা নয়! কিন্তু সময় গেল অনেকটাই। দামাদামি করতেই মজা লাগলো বেশি। ওরা যে দাম বলে তার পাঁচভাগের এক দিয়ে শুরু হয় এই দরাদরি। যদি ওরা বলে ৩০০; আমরা বলি ৫০ বা ৬০! দরদাম করতে করতে দেখা গেল সেটা ৮০ বা ১০০ রুপিতেই মিলে যাচ্ছে। ভাবা যায়!

এরপর আমরা ছুটলাম মহেন্দ্র গুহার উদ্দেশ্যে। প্রবেশ পথে গিয়ে টিকেট কাটতে গিয়ে জানা গেল, গুহার মূল জায়গায় এখন প্রবেশ নিষিদ্ধ! গুহাটার দুটো ভাগ। প্রথম ধাপে একটা গো-মন্দির আছে। আর দ্বিতীয় ধাপটা গেছে ডেভিস ফলের নিচ দিয়ে। বর্ষা মৌসুমটা ঝুঁকিপূর্ণ বলে ওই অংশটা বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে রোমাঞ্চকর একটা অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম!

বিকেলটা উন্মুক্ত ছিল আমাদের জন্য। আসলে আমরা পোখরার ফেওয়া লেকে নৌকা ভ্রমণে যাবো। কিন্তু সকাল থেকে ছুট ছুট করে কাল্তি ভর করায় বেরুতেই দেরি হয়ে গেল। তাই ফেওয়া লেকে নৌকা ভ্রমণটা ছোট্ট হলো। কিন্তু আমাদের নাকডাকা ঘুমে বাধা না দিয়ে রোমান্টিক বন্ধু দম্পতি ইকরাম-পাপড়ি পরদিন ভোরে সে আনন্দটা কেমন উপভোগ করেছিল তা একটা ছবিতেই বোঝা যাবে।

ইকরাম শুধু নৌকাই বাইছিল না সম্ভবত গানও গাইছিল! আমি সেটা কি করে বলবো? তবে দম্পতির রোমান্টিক ছবি ওদের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা গেল না বলে দুঃখিত……

পরদিন ১৫ সেপ্টেম্বর আমরা এবার ফেরার পথে। ১৬ তারিখ ঢাকা ফিরবো। তাই একই পথ ধরে কাঠমান্ডু ফিরছি। পথে গাড়ি থামিয়ে মাঝে-মধ্যে চা-পান, ছবি তোলা, দুপুরের খাবার সেরে কাঠমান্ডুর কাছাকাছি আসতেই দেখি কঠিন অবস্থা। একে তো রাস্তা খারাপ, তার উপর ঘন কালো মেঘ ঢেকে ফেলেছে আমাদের পথ। ২০ ফুট দূরত্বেও কিছুই দেখা যায় না। আমাদের গাড়ি শুধুই পাহাড়ের চূড়ায় উঠছে। মেঘের রাজ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাই বৃস্টি নেই; কিন্তু রাস্তা, গাড়ি, গাছপালা সবই ভেজা। এর মধ্যে আমাদের চালক মহেন্দ্র দুয়েকবার ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকের বহর অতিক্রম করতে গিয়ে একেবারে খাদের কিনারা ধরে গাড়ি চালাতে গেল। আমাদের ধমক খেয়ে রণেভঙ্গ দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ ওর ছিল না। কাঠমান্ডু পৌঁছুতে রাত নেমে এসেছে।

কাঠমান্ডু শুধু নয়, নেপালেই এটাই আমাদের শেষ রাত। ক্যাসিনোতে যাইনি, বার-পাব কোনোটায় নয়। নেপালের রাতের জীবন দেখা হলো না! রাত ৯টায় সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যায়। তাই “দাবাং” দেখা হলো না! সপরিবারে ভ্রমণে কিছু ত্যাগ করতেই হয়। কিন্তু শেষ রাতের ডিনারটা? সেটা তো ছাড়া যাবে না। জম্পেশ হওয়া চাই।

প্রথম রাতের পছন্দের রেস্তোরাতেই যাবো। এর মধ্যে ইকরামের সপ্তম শ্রেনী পড়ুয়া বড় ছেলে শীর্ষ রাস্তার পাশের রেস্তোরাগুলোর নাম দেখে আর বার-পাব বিশেষনে বিষ্মিত হয়। কোনো একটা রেস্তোরা দেখে, আর তার সাইনবোর্ডে বার লেখা দেখে বলে, ‘ও, ওটা তো বার!’ এরকম কয়েকটা মন্তব্য ও করে ফেলার পর মনে হলো, বিষয়টা না বুঝিয়ে বললে ওর মধ্যে একটা বিভ্রান্তি থেকে যাবে। শীর্ষকে বললাম, ‘বাবা এখানে সব রেস্তোরায় মদ-বিয়ার পাওয়া যায়। আর ওদের দেশে এটি নিষিদ্ধ নয়। তাছাড়া আমাদের মতো প্রচুর পর্যটক আসে। ওরা ডিনার করতে করতে কিছুটা অ্যালকোহল বা বিয়ার পান করতে পছন্দ করে। তুমি নেপালে যতো জায়গায়, রেস্তোরায় খাবার খেয়েছো, দেখেছো সবখানেই মদ-বিয়ার পাওয়া যায়। লোকজন খাচ্ছেও। কিন্তু রাস্তায় দেখো কোনো মাতাল নেই। তাই এ নিয়ে বেশি ভেবো না।’

আমরা সেই গার্ডেন রেস্তোরায় হাজির হলাম। টিপ টিপ বৃস্টি ছিল সে রাতে। এ অবস্থায় শেষ পর্যন্ত বাগানে বসে ডিনারটা হবে কিনা সে দুশ্চিন্তা থাকলেও বড় বড় ছাতার নিচে বাগানে বসে খাওয়াটা উপভোগ করবো বলেই যেন পণ করেছি আমরা। খাবারের অর্ডার দিয়ে বাচ্চাদের পাশের একটা সাইবার ক্যাফেতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আমরা দু’বোতল চিলড নেপালি বিয়ার ‘গোর্খা’ নিয়ে বসলাম। চুলা থেকে নামানো গরম নেপালি থালা এলো ঘণ্টাখানেক পর। ততক্ষণে আমাদের বিয়ারও শেষ। ডিনারটা দারুণ হলো। একেবারে জিবে লেগে থাকা স্বাদের মতো। ঢাকায় তো এরকম সময়-সুযোগ পাই না; নেপালের বৃস্টিভেজা বাগান রেস্তোরায় রাতের ডিনারটা তাই মনে থাকবে অনেকদিন। রেস্তোরার মালিক পরিবারটিকে একটি সুন্দর বন্য রাত আর উপভোগ্য খাবার দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা না জানালে অপরাধ হবে।

পরদিন বিকেলে ফ্লাইট। দুপুর পর্যন্ত হোটেলের আশেপাশের দোকানগুলোতে নানা কেনাকাটায় গেল। এমনকি উদয়ও তার ক্লাসের মেয়ে বন্ধুর জন্মদিনের উপহার পাথরের হার কিনলো! আমি কি করি? ছবি দুয়েকবার চোখের ভাষায় বুঝিয়েছে, এই হারটা, ওই হারটা তার পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আমি তো গিয়েছি পকেটে মাত্র ৫০ ডলার নিয়ে। সেটা তখনো অক্ষত আছে! এক সময় বললাম, ঠিক আছে কিনো। ঋণ থাকলো। ঢাকায় গিয়ে হাতে টাকা এলে পরিশোধ করে দেবো। ভীষণ খুশি মনে দারুণ একটা পাথরের সেট কিনলো। আর সেই ঋণের টাকার ফেরত পাওয়ার জন্য এখন আমাকে তাগাদা দিয়েই চলেছে!

শেষ কথা, নেপাল যারা বেড়াতে যাবেন তাদের জন্য এই টিপসটা না দিলেই নয়। যারা গেছেন তারা কেন যে আগে জানাননি! নেপালের বিমানবন্দরটা যাচ্ছেতাই। ঢুকতেও যেমন রাজ্যের যন্ত্রণা, বেরুতেও তাই। চার-পাঁচ দফা গায়ে হাত দিয়ে তল্লাশি তো আছেই, ঢিলেমির একেবারে চূড়ান্ত। মেজাজ ঠান্ডা রাখা কঠিন। ফেরার পথে ওদের গালাগাল দিয়ে যদিও বেরিয়ে এসেছি; তবু সুযোগ পেলে দুর্ভোগ সহ্য করে হলেও ওই বন্য সুন্দরে আবার যেতে চাই। হয়তো এখন নয়, যখন আরো বুড়ো হবো। বেশি নড়াচড়া, হাটাহাটি করতে পারবো না। কয়েকটা দিন সব কিছু থেকে ছুটি নিয়ে শুধু পাহাড় দেখা আর আলসেমিতে সময় কাটানোর জন্য হলেও।

৬,৬৮৫ বার দেখা হয়েছে

৬০ টি মন্তব্য : “বন্য সুন্দরে পাঁচদিন চাররাত”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    পুরা পোস্ট টা মনোযোগ দিয়ে পড়লাম, ছবি দেখলাম। তাই মাস্ফ্যুর কাছে হাইরা গেলাম!
    একটানে নেপাল ঘুরিয়ে আনলেন বস। এত কাছে থেকেও কোনদিন যেতে পারিনি।
    দারুণ ছবি আর বর্ণণা। নাহ্‌, যেতে হচ্ছে একবার অন্তত....

    জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)
    ইমিগ্রেশনে বসা পুলিশ কর্মকর্তারা কি-বোর্ডে এক আঙুল দিয়ে যে গতিতে টাইপ করেন আর যেভাবে পাসপোর্ট দেখেন তাতে মনে হতেই পারে আমরা দেশ ছেড়ে গিয়ে ভীষণ অপরাধ করছি!

    ট্রেনিং টা শেষ হোক আমার,দেখি কে আমার প্রিন্সু স্যারকে দেরি করায় এয়ারপোর্টে x-(

    জবাব দিন
  3. তানভীর (৯৪-০০)

    আপনার লেখায় মুগ্ধতা প্রকাশ করার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি আগেই, তাই নতুন করে মুগ্ধতা প্রকাশ করলাম না। আপনার লেখায় একবার ঘুরে আসা নেপাল আবার ঘুরে আসলাম। 🙂
    ঐ যে ঐ চূড়াটা- মাচ্ছুপুচ্ছ্রে/ফিসটেইল (নিচ থেকে ৭ নং ছবি) আমার সবচেয়ে প্রিয় চূড়াটা। শুধু এটাকে দেখার জন্যই আবার নেপাল যাওয়া যায়। 🙂

    জবাব দিন
    • সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

      ধন্যবাদ তানভীর। ফিসটেইলটা আসলেই ভয়ংকর সুন্দর! শীতকালে নাকি অন্নপূর্ণা আরো ভালোভাবে দেখা যায়, আরো স্পষ্ট। আমার কিন্তু মেঘের চাদরে ঢাকা অন্নপূর্ণাকেই ভালো লেগেছে। এই যে আমাদের সঙ্গে ওর লুকোচুরি খেলা! স্পষ্ট দেখা গেলে কি এই আনন্দ হতো? দেখিনি তো, তাই জানি না।

      আমি এর পরে কোনো পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের কাঁথা গায়ে জড়িয়ে অলস সময় কাটাতে নেপাল যেতে চাই। :guitar:


      "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

      জবাব দিন
  4. ওবায়দুল্লাহ (১৯৮৮-১৯৯৪)

    লাবলু ভাই,
    সকালে এসে - চা হাতে নিয়ে আপনার লেখাটা পড়ে ফেললাম।
    চমৎকার। :clap:
    আপনার লেখনী আর ছবিতে ঘুরে এলাম নেপাল থেকে।
    অ্যাড দিলে ক্যাপশন হতে পারে -
    "নেপালে পাঁচদিন চাররাত - একদম ফ্রী।" 😛

    আমার বাসার - আমি আর আমার বউ বাদে সবাই ঘুরে এসেছে ঈদের পর পর।
    ওদের কাছেও এয়ারপোর্টের অব্যবস্থার কথা শুনেছি।
    আমি পরে জেনেছি - ঢাকা থেকেও ওদের ভিসা নিয়ে যাওয়া গেলে এই হয়রানিটা কমে।
    আর পিক সীজনে ট্যুরিস্টের চাপটাও বেশী থাকে।

    সে যাক গে - আপনার ভ্রমন কাহিনী পড়ে সামনে ইনশাআল্লাহ একবার নেপাল ঘুরে আসতেই হবে বলে পারিবারিক বিল পাশ করলাম।
    লেখাটা পড়তে পড়তে একটা প্রিয় ছবির কথা মনে গেল - সেখানেও দারুন হাতছানি ছিল হিমালয় দেখবার ...

    The Bucket List


    সৈয়দ সাফী

    জবাব দিন
    • সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

      শিরোনামটা খারাপ দেওনি ওবায়দুল্লাহ। তার মানে তোমাদের পরিবারের লোকজন আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই ছিলেন বোঝা যাচ্ছে। তারা কেমন উপভোগ করলেন?

      ঢাকা থেকে ভিসা নিয়ে গেলে নেপাল ঢোকার সময়ের ইমিগ্রেশনের হ্যাপা না হয় কমাইলা, কিন্তু ফিরার পথে কি করবা? নেপাল টিকে আছে পর্যটনের ওপর। ওদের উচিত ইমিগ্রেশন এবং বিমানবন্দরকে আরো আধুনিক করা। ছোট্ট ছিমছাম বিমানবন্দরটা দেখতে কিন্তু খারাপ না।

      বউকে নিয়ে নেপাল যাওয়ার সিদ্ধান্ত যে নিয়ে ফেলেছ সেটা জেনে ভালো লাগলো। শুভেচ্ছা তোমাদের জন্য।


      "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

      জবাব দিন
  5. লাভলু ভাই,
    আপনার চোখে নেপাল দেখে নিজের চোখে দেখার ইচছা করতেছে।যাওয়ার প্লানিংয়ের ব্যাপারে যদি কিছু শেয়ার করতেন..।মানে ট্যুর এজেন্সি গুলোর মাঝে কোনটা ভাল, বাজেট..এইসব আরকি।

    জবাব দিন
    • সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

      টুটুল এবং অন্য যারা নেপাল যেতে আগ্রহী তাদের জন্য :
      ১. টিকেট : বাংলাদেশ বিমানে রিটার্ন ১৬ হাজার।
      ২. ভিসা : কাঠমান্ডুতে অ্যারাইভাল ভিসা দেয়। পাসপোর্ট আকারের ছবি সঙ্গে নিতে হবে।
      ৩. ট্যুর অপারেটর : নেপালে বেরানোর খরচটা পর্যটক দলের সদস্য সংখ্যা ও মৌসুমের উপর নির্ভর করে। অফ-পিক মৌসুমে গেলে মোটামুটি ১২ জনের দল হলে চাররাত-পাঁচদিনে টুইন শেয়ার হোটেলে থাকা ব্রেকফাস্টসহ এবং পুরো সময়ের জন্য একটি টুরিস্ট ভ্যান নিয়ে জনপ্রতি ১৯০ ডলার পড়ে। আর পিক মৌসুমে স্বভাবতই এই পরিমাণ বেশ বেশি। ঠিক জানা নেই। অফ-পিক মৌসুম সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। হোটেলের মান খারাপ না। ব্রেকফাস্টের মান কাঠমান্ডু ও পোখরায় তারতম্য হয়। কাঠমান্ডুতে বেশ ভালো পেয়েছি। ট্যুর অপারেটর ঢাকায় অনেকেই আছে। মূলতঃ যেসব ট্রাভেল এজেন্সি টিকেট করে দেয়, তাদের বললেই সব ব্যবস্থা হয়ে যায়। টাকাটা ঢাকায় দিলেই হয়।
      ৪. বাকি তথ্য : দেখা-বেরানোর চিন্তাটা ট্যুর অপারেটরকে দিলে ওরাই নেপাল ভ্রমণের পুরো পরিকল্পনা করে দেয়। নানা দর্শনীয় স্থানের টিকেট + দুপুর ও রাতের খাবার এবং বাকি ব্যয়ের জন্য নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে। আমাদের প্রতিবেলায় প্রতিজনে খাবারের খরচ গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ রুপি করে পড়েছে।

      অর্থাৎ প্রতিজনে ৪০ হাজার টাকা হলে নেপাল ভ্রমণটা ভালোই হয়ে যায়। দল ছোট হলে খরচ বাড়বে। আবার অল্প বয়সিরা গেলে খরচ কমিয়ে সেরে ফেলতে পারবে। এই বয়সে আমরা অবশ্য ভ্রমণের সঙ্গে আয়েশটাও খুঁজি।


      "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

      জবাব দিন
  6. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    সানা ভাই আপনার লেখা এই নেপা্ল বর্ননা তো এমনিতেই একটা বড় চমক তার উপর প্রথম প্যারায় আমার নাম দেখে আমিতো খুশিতে একেবারে বাকবাকুম। ছবিগুলো খুবই সুন্দর বিশেষ করে ছবি ভাবির ছবিগুলো - বেশ যত্নের সাথে তুলেছেন বোঝা যাচ্ছে।
    সবাইকে তো নাচিয়ে দিলেন নেপাল দেখিয়ে - নেপাল সরকারের উচিত আপনাকে কিছু ট্যাক্সের ভাগ দেওয়া।
    তবে নেপালীরা তাদের দেশ নিয়ে খুব কষ্টে আছে। ওরা বলে মাওবাদীরা নাকি ওদের দেশটাকে ছারখার করে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা তাদের সব ব্যবসা হারিয়েছে। রাস্তাঘাট ঘরবাড়ি সব ভেংগে গেছে। নইলে শহরটা নাকি আগে আরো ছিমছাম ছিলো। হিমালয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
    যাইহোক আপনার আর সাইফ ভাইয়ের লেখায় বিভিন্ন বয়সের জীবনটাকে দেখতে পাই এবং ভালো লাগে।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
    • সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

      তোমার মতো দেখার চোখ হলো কোথায় শান্তা? তবে এটা ঠিক নেপাল ভ্রমণটা এই সময়ে আমার এনার্জিটা ফিরিয়ে দিয়েছে।

      নেপালে গিয়ে প্রথম চমকটা খেয়েছিলাম লোডশেডিং দেখে! দেশ ছোট, মানুষ কম। প্রাকৃতিক সম্পদ আছে হিমালয় আর পানি। ওরা ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে প্রচুর বিদ্যুৎ উৎপাদন করতেই পারে। শিল্প নেই, কৃষি অর্থনীতি আর পর্যটন এই ওদের সম্বল। একে কাজে লাগিয়ে ওরা দেশটাকে বদলে ফেলতে পারে। কিন্তু ওদের রাজনীতিও আমাদের মতোই। গোটা দেশ দুভাগে বিভক্ত। ভারতপন্থী আর চীনপন্থী। নেপালি কংগ্রেস আর মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি। রাজনৈতিক অস্থিরতাও প্রচন্ড। ভারত নির্ভরতা ভীষণ। বাংলাদেশি পণ্য, বিশেষ করে বিস্কিট, টিপস, জুসও পেলাম নেপালি বাজারে। বাংলাদেশটা ওরা ভালোভাবেই চেনে। বাংলাদেশ থেকে এসেছি বললেই জবাব দেবে, 'ও ঢাকা?' ওদের অনেক শিক্ষার্থী যে বাংলাদেশে পড়ে সেটাও বেশ জানে।


      "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

      জবাব দিন
  7. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    অনেক দিন শখ ছিল। শেষবার খুব কাছাকাছি গিয়েও সময়াভাবে নেপাল ভ্রমন হয়নি। কোরবানির ঈদের পর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আশা করছি এবার মিস যাবে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে লেখা পড়ে এখনই যেতে ইচ্ছে করছে।

    'বিষ্ময়, আনন্দ, তৃপ্তি…….' আপনার এই ছবিটা সবচেয়ে সুন্দর আসছে।
    দার্জিলিং গিয়ে আমি কাঞ্চনজংগা পাশে রেখে এমন একটা ছবি তুলেছিলাম 😀


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  8. রাব্বী (৯২-৯৮)

    মুচমুচে ভ্রমন কাহিনী এবং ছবিতে বেড়ানো আমেজ!

    বাসায় ফোন করে বললাম, ঢাকায় ফিরে সবাই নেপাল বেড়াতে যাবো। নগদের উপর ঝাড়ি খেলাম! কারণ গতবছর এক বন্ধুর ভুটানে বেড়াতে যাবার ছবি দেখে বলেছিলাম সামারে ঢাকায় গিয়ে ভুটান যাবো একসাথে। সেইটা পারিনাই। :grr:

    নাহ! একবার যেতেই হবে।


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন
  9. সামিয়া (৯৯-০৫)

    নেপাল কোন জায়গা হলো? ঢাকাই ভাল 🙁

    একটানে পড়লাম লিখাটা, লিখাটা খুবই সুখপাঠ্য। ভদ্রতা মনে হলেও এই লিখার জন্য এই কম্পলিমেন্টটা দিতেই হচ্ছে। নাইলে গুনা হত।

    অটঃ আমিও নেপাল যাইতে চাই।

    জবাব দিন
  10. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    চমৎকার পোস্টের জন্য লাবলু ভাইরে প্লাস আর ছবি ভালোমতো দেখতে না পারায় আমার ব্রাউজারকে মাইনাস।
    চমৎকার লেগেছে পুরো লেখাটা। নেপাল ভ্রমণের ইচ্ছা ছিলো । বুয়েটে থাকতে আমার নেপালি রুমমেট প্রায়ই বলতো। প্রতিবারই ওর কথায় হু হা করে কাটিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে ভুলই হয়ে গেছে। তবে লাবলু ভাইয়ের লেখা থেকে আসল টিপস যা মিলল তা হলো ভুলেও বিমানে যাওয়া যাবে না। দেশে ফিরে বাস যোগে নেপাল ভ্রমনের ব্যবস্থা করতে হবে। শুনছি কাকরভিটা থেকে কাঠমুণ্ডুর জার্নিটা খুব সাসপেন্স.....।

    জবাব দিন
  11. তৌফিক (৯৬-০২)
    ইমিগ্রেশনে বসা পুলিশ কর্মকর্তারা কি-বোর্ডে এক আঙুল দিয়ে যে গতিতে টাইপ করেন আর যেভাবে পাসপোর্ট দেখেন তাতে মনে হতেই পারে আমরা দেশ ছেড়ে গিয়ে ভীষণ অপরাধ করছি!

    আমি বন্ধুর মুখে দেশের ইমিগ্রেশনের একটা কাহিনী শুনছিলাম। এক ইমিগ্রেশন পুলিশ কিবোর্ডে q খুঁজে না পেয়ে নাকি পাশের সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করছিলেন, কম্পিউটার কি-বোর্ডে q থাকে কিনা.. সহকর্মীর উত্তর, থাকে তো, আমি একবার ইউজ করছিলাম। খুঁইজা দেখেন, মনে নাই... 😀

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।