একজন অখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার গল্প

চারু মিয়া সর্দারের তিন মেয়ে, দুই ছেলে। বড় ছেলে মোঃ সুলতান মিয়া সর্দার আর ছোট ছেলে মোঃ সিদ্দিকুর রহমান। ছোট ছেলের নামের শেষে ‘সর্দার’ না রাখার কারন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া সর্দারীটা যেন বড় ছেলে পায়। শুধু তাই নয়, বড় ছেলের জন্য সব ভাল ভাল খাবার, জামা কাপড়, আর অন্যান্য যত্নের যেন কোন ত্রুটি না হয় সে বিষয়ে স্ত্রীকে সবসময় মনে করিয়ে দেন। বড় ছেলেকে তো সর্দার বানাতে হবে। গ্রামের সবার বিচার করবে সে, মেল-দরবার, সালিশ বা বিচার কাজ পরিচালনা করতে হবে।

সুলতান মিয়াকে স্কুলে ভর্তি করানো হলো, ভাল ভাল জামা কাপড় পড়ানো শুরু হলো। দিন যেতে থাকল। ছোট ছেলে সিদ্দিকের বয়স তখন মাত্র ছয় পেরিয়ে সাতে পড়ল কিন্তু তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হলো না। বিষয়টি একমাত্র মা ছাড়া পরিবারের আর কারো নজরে পড়ল না। চারু মিয়াকে বলা হলে তিনি বলেন অভাবের সংসার, দুই ছেলেকে একসাথে লেখাপড়া করানো সম্ভব নয়। হঠাৎ করে একদিন চারু মিয়ার স্ত্রী ইন্তেকাল করলেন। ছোট ছেলে সিদ্দিককে দেখার যেন আর কেউই থাকল না।

দেখতে দেখতে আরো একটি বছর কেটে গেল। চারু মিয়া একটি গাভী সহ বাছুর কিনলেন। ছোট ছেলের উপর দায়িত্ব পড়ল সেই গাভী ও বাছুর দেখাশোনা করার। বড়ভাই ভাল জামাকাপড় পড়ে স্কুলে যাচ্ছে আর ছোটভাই রাখাল বালক হয়ে বেড়ে উঠছে। সিদ্দিকের বয়স আট পেরিয়ে নয়। ধীরে ধীরে তার টনক নড়ল। এভাবে তো চলবে না। সমবয়সী অধিকাংশ বন্ধুরাই স্কুলে যাতায়াত করছে। সবাই লেখাপড়া শিখছে। তাকেও স্কুলে ভর্তি হতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। কাউকে না জানিয়ে সত্যি সত্যিই সে গিয়ে স্কুলে ভর্তি হলো।

দেখা গেল ক্লাসে সবার চেয়ে সে লম্বা, আর বয়সের কারনে সবাই তাকে বিভিন্ন উপনাম ধরে ডাকা শুরু করল। তার খুব মন খারাপ হতো, কিন্তু তারপরও সবকিছু মেনে নিয়ে সে নিয়মিত স্কুলে যেতে থাকল। এদিকে তার বাবা বিষয়টি জেনে ফেলায় খুব রাগারাগি এবং মারধর করলেন। কিন্তু সিদ্দিক তার সিদ্ধান্তে অনড়, সে লেখাপড়া শিখবেই। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো সে লেখাপড়া করতে পারবে কিন্তু তার জন্য কোন ব্যয়ভার বহন করতে পারবে না চারু মিয়া, আর একই সাথে গরু পালনও করতে হবে। উপায়ন্তর না দেখে সিদ্দিক এ শর্তেই রাজী হয়ে গেল। গরুর দুধ বিক্রি করে তার কিছু অংশ দিয়ে সে নিজেই তার পড়াশোনার খরচ চালাতে লাগল।

দিন যেতে থাকল, সিদ্দিক লেখাপড়ায় ভাল করতে লাগল। ক্লাসের প্রথম সারির ছাত্র হিসেবে গ্রামের সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠল। দেখতে দেখতে প্রাইমারী শেষ করে ফেলল। এবারে হাই স্কুলে ভর্তির পালা। গ্রামে কোন হাইস্কুল নেই। তাকে ভর্তি হতে হলো গ্রাম থেকে আট কিলোমিটার দূরে শহরের ইউসুফ স্কুলে। যাবার পথে গোমতী নদীর উপর রেল ব্রীজ দিয়ে নদী পাড় হয়ে ওপারে যেতে হয়। প্রতিদিন খালি পায়ে স্কুলে যাবার পথে দুধের ঘটি নিয়ে যেত আর ফেরার সময় খালি ঘটি নিয়ে ফেরত আসতে হতো। বড়ই কষ্ট আর পরিশ্রমের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হলো তাকে। কখনো গাভীর দুধ পাওয়া না গেলে ধান ক্ষেতে গিয়ে পাকা ধান টোকিয়ে টোকিয়ে তা নিয়ে বাজারে বিক্রি করে স্কুলের পরীক্ষার ফি দিতে হতো। এভাবেই দিন যাচ্ছিল তার।

হঠাৎ করে একদিন চারু মিয়া আরেকটি বিয়ে করে বসলেন। অভাবের সংসারে অভাব যেন আরো বেড়ে গেল। অভাবের পাশাপাশি বাড়ল পারিবারিক অশান্তি। সিদ্দিক তখন ক্লাস এইট পাস করে নাইনে। বয়স তখন উনিশ। মনের দুঃখে সিদ্ধান্ত নিল বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। একদিন সে ক্লাসের এক বন্ধুকে ধরে বসল একটা চাকরী জোগাড় করে দেয়ার জন্য, যেকোন ধরনের চাকরী। বন্ধুটির দুলাভাই ছিল তকালীন পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। কুমিল্লা সেনানিবাসে পোষ্টিং। সে বলল, ‘আমার দুলাভাইয়ের কাছে যাবি? তুই তো লম্বা আছিস, আর্মিতে ঢুকবি?’ কোন দিকে চিন্তা না করে সিদ্দিক রাজী হয়ে গেল। বন্ধুটি পরেরদিন তাকে ভাল কাপড় পড়ে আসতে বলল।

কিন্তু হায়, সিদ্দিকের ভাল কাপড় বলতে ছিল একটা নতুন লুঙ্গি আর একটা হাফশার্ট। কিন্তু অফিসারের বাসায় তো আর লুঙ্গি পড়ে যাওয়া যাবেনা। অগ্যতা একটা হাফপ্যান্ট পড়েই পরেরদিন সে স্কুলে গেল। ঐ বয়সে তার পরনে হাফপ্যান্ট দেখে অনেকেই হাসাহাসি করছিল। যাইহোক বন্ধুর সাইকেলের পিছনে চড়ে সিদ্দিক সেদিন হাজির হলো সেই অফিসারের বাসায়। তাকে দেখে এবং চাকুরীর প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা শুনে সেই অফিসার বললেন, “তুমি লম্বা, চওড়া আছ, সামনের ওমক তারিখে আবার আসো, ইন্টারভিউ হবে, অনেক লোক ভর্তি করা হবে। তোমার হয়ে যেতে পারে”

নির্ধারিত দিনে সিদ্দিক পরীক্ষা দিল এবং তার হয়েও গেল। কিন্তু তার বাবা এবং বড়ভাই এতে খুশি হলেন না। তাদের মতে, কি হবে মিলিটারীর চাকরী করে? সারাজীবন পরিবার থেকে দূরে থাকবে, বাবা, মা, ভাই, বোনের দায়িত্ব পালন করা যায়না… আরো কতো কি। তিনি সিদ্দিককে এই চাকুরী না করার পরামর্শ দেন। সিদ্দিকের প্রচন্ড রাগ হলো। সে বলল, ‘আমি চাকুরী করবই’।

১৯৬৩ সাল। সিদ্দিক পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে জয়েন করল। তাকে ট্রেনিং এর জন্য পাঠানো হলো পশ্চিম পাকিস্তানে। ট্রেনিং শেষে তাকে ইএমই (ইলেকট্রিক্যাল ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার) কোর দেয়া হলো এবং পোষ্টিং হলো পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটা ক্যান্টনমেন্টে। সেনাবাহিনীর ওয়ার্কশপে সামরিক অস্ত্র আর যানবাহন মেরামত করাই ছিল তার প্রধান কাজ। বাড়ির সাথে নিয়মিত পত্রালাপ হতো কিন্তু ছুটি পেত খুবই কম। দেখা গেল চাকুরীর ফাঁকে ফাঁকে সিদ্দিক অনেকটা সময় পাওয়া শুরু করল। প্রতিদিন সন্ধার পর অনেকটা সময় সে একাকী কাটাত। স্বদেশীয় কলিগদের অনেকেই পরামর্শ দিল লেখাপড়া করার জন্য। পড়াশোনার প্রতি তার ছিল অত্যন্ত আগ্রহ। সে ঠিক করে ফেলল আরো পড়াশোনা করতে হবে, তাকে আরো বড় হতে হবে। সময়টা কাজে লাগাতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। সে স্থানীয় একটি স্কুলে এডমিশন নিল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে লাগল। মাগরিবের পর সবাই ডিনার করে লাইট অফ করে ফেললে তাকে পড়তে হয় বিপদে। সে তখন বাথরুমের আলো কিংবা রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের নিচে গিয়ে পড়াশোনা করত। সে ছিল পড়াশোনার ব্যাপারে অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং অধ্যাবসায়ী। রাতের বেলায় পড়াশোনা করে অথরিটির পারমিশন নিয়ে পরীক্ষার সময় সে পরীক্ষা দিত। এভাবে এ লেভেল, ও লেভেল শেষ করে সে ভর্তি হলো করাচী ইউনিভার্সিটিতে বিএ (ইকনোমিক্সে)। দেশে থাকা বড়ভাই যেন কিছুটা ইর্ষান্বিতই হলো। বারবার দেশে ফিরে যাবার জন্য আর টাকা পাঠানোর জন্য তাগাদা দিত তাকে। দেখতে দেখতে একদিন বিএ শেষ হলো। ১৯৭০ সালে সিদ্দিক ২য় শ্রেনীতে বিএ পাস করলো।

১৯৭১ সাল। সিদ্দিক তখন একই ইউনিভার্সিটিতে মাষ্টার্স এ অধ্যয়নরত। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধ শুরু হবার সাথে সাথে সকল বাঙ্গালী সেনাদের জানানো হলো যে, দেশে ছুটি যাওয়া যাবেনা। এভাবে কয়েকমাস কেটে গেল, তাও যুদ্ধ থামছেনা। এদিকে দেশের অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে লাগল। সিদ্দিকসহ অন্যান্য বাঙ্গালীরা দেশে যাবার জন্য আকুল হয়ে উঠল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান সরকার কাউকেই অনুমতি দিলনা, উলটা বলল পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। সিদ্দিকের প্রচন্ড রাগ হলো, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল পালিয়ে হলেও দেশে যাবে। ভার্সিটির সহপাঠীদের বিষয়টা জানানোর সাথে সাথে সবাই নিষেধ করল, বলল ‘তুমি তোমার হেয়ার কাটের জন্য ধরা পড়ে যাবা, ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে’ কিন্তু সিদ্দিক সে কথায় কান দিলনা। ওখানে থেকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের কাছে মরার চেয়ে দেশে ফিরে যুদ্ধ করে মরাই ভাল। সে মনস্থির করে ফেলল যে, দেশে গিয়ে যুদ্ধ করবে। কিভাবে পালাবে এবং তেজগাও এয়ারপোর্টে ধোকা দিবে তার জন্য প্ল্যান করা শুরু করল। তার এক সহপাঠীর বড়বোন তখন তেজগাও বিমানবন্দরের কাষ্টমসে চাকুরী করত। তার সাথে যোগাযোগ করে দেশে আসার পরিকল্পনাটা গোপনে করে ফেলল।

অনেক বাঙ্গালী তখন কোয়েটাতে চাকুরী করত। তারা যেকোন সময় আন্দোলন করতে পারে ভেবে পশ্চিম পাকিস্তান সরকার তাদেরকে বন্দী করার পরিকল্পনা করল। সিদ্দিক বিষয়টি গোপনে জানতে পেরে সাথে সাথে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে ভার্সিটির বন্ধুদের স্মরনাপন্ন হলো। তাদের বুদ্ধিতে সিদ্দিক তখন তার মিলিটারীর সমস্ত ডকুমেন্ট আগুনে পুড়িয়ে ফেলল। বন্ধুরা সবাই মিলে তার প্লেনের টিকেট এবং দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে দিল। আর কোনদিন দেখা হবেনা ভেবে অনেক বন্ধুরাই সেদিন এয়ারপোর্টে তাকে বিদায় দিতে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল।

জীবন বাজি রেখে আগষ্ট মাসের ০৭ তারিখে সিদ্দিক দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। যেই ভাবা সেই কাজ। হেয়ারকাট দেখে ঠিকই তাকে তেজগাও এয়ারপোর্টে পাকবাহিনী সন্দেহ করে বসল। সে তখন নিজেকে ষ্টুডেন্ট পরিচয় দিয়ে করাচী ভার্সিটির কাগজপত্র দেখালো। প্রায় ৪ ঘন্টা তাকে আটকে রাখা হলো। কিন্তু এক হেয়ারকাট বাদে তার কাছে আর কোন সন্দেহজনক জিনিস পাওয়া গেল না। অবশেষে সিদ্দিক কাষ্টমসের তার সেই বন্ধুর বড়বোনের মাধ্যমে ছাড়া পেল। তিনি নিশ্চিত করলেন যে, সিদ্দিক সেনাবাহিনীর সদস্য নন, তিনি করাচী ভার্সিটির ষ্টুডেন্ট এবং সবসময় ছোট করে চুল কাটেন। সিদ্দিক কোনমতে বাড়িতে গিয়ে সবার সাথে দেখা করে বর্ডারের সাথে ঘেষা বড় বোনের বাড়িতে আশ্রয় নেন।

সিদ্দিক যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছে ততক্ষনে তা সেনাবাহিনীতে জানাজানি হয়ে গিয়েছে। কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে একদল পাকবাহিনীর জোয়ানরা চারু মিয়ার বাড়িতে সিদ্দিককে খুজতে গেল। গিয়ে তাকে না পেয়ে বৃদ্ধ চারু মিয়া সর্দারকে বেধে নিয়ে গেল এবং তার দুটি ছনের ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল এবং একটি মাটির ঘর ভেঙ্গে দিল। এরপর ১০ দিন চারু মিয়াকে আটকিয়ে রাখা হলো। তাকে দিয়ে মাটি কাটানো হলো, ছেলের অবস্থান না জানানোর কারনে মারধর করা হলো। ১০ দিন পর কোন তথ্য না পাওয়ায় বৃদ্ধ চারুমিয়াকে তারা দয়া করে ছেড়ে দিল। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সিদ্দিক দিনের বেলায় কখনো বাড়ি আসতে পারতো না, রাতের আধারে গোপনে এসে সবার সাথে দেখা করে যেত।

১৭ আগষ্টে তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে ২নং সেক্টরে যোগ দেন। বর্ডারের ওপারে তখন ছিল তার অবাধ যাতায়াত। বেশিরভাগ সময়েই তিনি ত্রিপুরা, আগরতলা ও সোনামুড়া এলাকায় স্থানীয় ভারতীয় ওয়ার্কশপে কাজ করতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র মেরামত করে দিতেন। ওদিক দিয়ে তখন অনেক অস্ত্র আসত। তার ফোর্স কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন মেজর (পরবর্তীতে লেঃ জেনারেল ও সেনাপ্রধান) খালেদ মোশাররফ এবং তিনি সরাসরি ক্যাপ্টেন মতিন (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) এবং তৎকালীন ক্যাপ্টেন দিদারের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেন।

তার ছোটখাট কয়েকটি অপারেশনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো নভেম্বরের দিকে একটি স্কুলঘরে বিশ্রামরত অবস্থায় কিছু পাক বাহিনীর জোয়ানদের আটকে ফেলা এবং তাদের অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে মুক্তিবাহিনীকে সাপ্লাই দেয়া। ঐ সময় থেকেই চারদিক থেকে বিভিন্ন সাফল্যের খবর আসা শুরু করে। ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সুসজ্জিত আক্রমণ ছাড়াও মুক্তিবাহিনীর ছোটখাট অনেক চোরাগুপ্তা হামলা থেকেই বেশি সাফল্য আসতে থাকে। দেখতে দেখতে ডিসেম্বর মাস আসে। পশ্চিম পাকিস্তান বুঝতে পারল তাদের পরাজয়ের আর বেশি দিন বাকি নেই। পরাজয়ের ঠিক আগ মূহুর্তে এ জাতিকে চিরতরে পিছিয়ে দেবার জন্য পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হলো অনেক বুদ্ধিজীবিদের। জাতি হারালো অনেক সুসন্তানদের। অবশেষে বিজয় আসলো, জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশের, কিন্তু তা হলো অনেক কিছু হারানোর বিনিময়ে…

সিদ্দিকুর রহমান বাড়িতে ফিরে গেল। তার বাবা বৃদ্ধ চারু মিয়া তখন ছেলের উপর খুব ক্ষুব্ধ। ছেলের কারনে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সর্দারীর বদলে তাকে মাটি কাটতে হয়েছে, হানাদারদের বুটের লাথি খেতে হয়েছে। তার বড়ভাইকে জানের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। সিদ্দিকের মন খারাপ হয়ে গেল। দেশ স্বাধীন হলো কিন্তু বাড়িতে শান্তি আসল না। ঠিক করলেন আবার বের হয়ে যাবেন বাড়ি থেকে।

১৯৭২ এর ফেব্রুয়ারী। সিদ্দিক পুনরায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। এবারে তাকে সরাসরি এডুকেশন কোরের (সেনা শিক্ষা কোর) জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। এবার তার কাজ হলো শুধু ছাত্র পড়ানো (প্রধানত ম্যাপ রিডিং আর অন্যান্য সামরিক জ্ঞান শিখানো)। তারপরও তার আফসোস হচ্ছিল যে, রক্ষীবাহিনীতে প্রচুর কমিশন্ড অফিসার নেয়া হয়েছিলো যাদের যোগ্যতা কিনা তার চেয়েও কম ছিল। জায়গামতো পরিচিত লোক না থাকায় তাকে এই পদেই সন্তুষ্ট হতে হলো। যাইহোক এবারে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে শুরু হলো তার নতুন জীবন। ও বছরই বিয়ে করলেন। একে একে তিন মেয়ের পর হলো এক ছেলে। তিনি ঠিক করলেন যত কষ্টই হোক, ছেলে মেয়েদের ভাল স্কুলে পড়াবেন এবং উচ্চ শিক্ষিত করবেন। তিনি বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে চাকুরীকালীন সব ক্যান্ট পাবলিক স্কুলে উচ্চ বেতনে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতেন, বোর্ড স্কুলে ফ্রীতে পড়াতেন না। এজন্য তাকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে জীবনযাপন করতে হতো। ছেলেকে নিয়ে ছিল তার ছিল অনেক স্বপ্ন। নিজে কমিশন্ড অফিসার হওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্বেও হতে পারেননি। তাই ছেলেকে দিয়ে সে আশা পূরণের স্বপ্ন দেখতেন। ছেলেকে ক্যাডেট কলেজে পড়ালেন। অবশেষে তার সে আশাও একদিন পূর্ণ হলো।

১৯৮১ সালে চারু মিয়া সর্দার মারা গেলেন। মারা যাবার পূর্বে তিনি তার ছোট ছেলেকে ডাকলেন এবং নিজের ভুল স্বীকার করলেন। যাবার আগে ছেলেদেরকে সুষ্ঠুভাবে সম্পত্তি বন্টন করে গেলেন। ১৯৯৪ সালে মোঃ সিদ্দিকুর রহমানের অবসর গ্রহণ করার কথা থাকলেও পরপর দুবার ভাল পারফরমেন্সের কারনে তার চাকুরীর সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৯৫ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিনামূল্যে পবিত্র হজ্জ্ব করার দূর্লভ সুযোগ পান। এজন্য তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিকট অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। দীর্ঘ ৩৩ বছর চাকুরীর পর অবশেষে ১৯৯৬ সালে তিনি সুস্থ্য শরীরে অবসরে যান। অবসরে যাবার প্রাক্কালে তিনি কুমিল্লা শহরের মধ্যে বাড়ি করেন এবং একে একে তিনি তার সব মেয়ে এবং ছেলের সুপাত্রে/পাত্রীতে বিয়ে দেন। বর্তমানে তার সকল সন্তানরাই মাষ্টার্স ডিগ্রীধারী এবং সকলেই চাকুরীজীবি। এবছর তিনি সস্ত্রীক হজ্জ্ব করে এসেছেন। বর্তমানে তিনি স্বচ্ছলভাবে অবসর সময় কাটাচ্ছেন এবং সুস্থ্য আছেন। আপনারা তার জন্য মন থেকে দোয়া করবেন।

………………………………………………………………………
এতক্ষনে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন এই গল্পের নায়ক মোঃ সিদ্দিকুর রহমান এর পরিচয়। হ্যাঁ, তিনি আমার বাবা, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধের পাশাপাশি জীবনযুদ্ধেও তিনি জয়ী। অথচ শূন্য থেকে যার হয়েছিল শুরু। আমাদের আশেপাশে ছড়িয়ে আছে এমন অনেক মানুষ যাদের রুপকথার মতো অবিশ্বাস্য এসব ইতিহাস আমরা জানিনা। আমি বলব আমার বাবা একজন সফল মানুষ এবং একজন সফল বাবা। এরকম সফল একজন বাবাকে নিয়ে আমিতো গর্ববোধ করতেই পারি। কি বলেন আপনারা???

[প্রকাশের তারিখঃ ১৬ ডিসেম্বর, ২০০৯]

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ গত ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ তারিখ ১৭২০ ঘটিকায় তিনি ঢাকা সিএমএইচে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধজনিত কারনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)। তার আত্নার মাগফেরাত কামনা করে আমি আপনাদের সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।

৫,৬৪৮ বার দেখা হয়েছে

৫৩ টি মন্তব্য : “একজন অখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার গল্প”

  1. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    দোস্ত, আঙ্কেলের গল্প পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো! উনি শুধুমাত্র একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন, একই সাথে প্রচন্ড প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে জীবনযুদ্ধেরও বিজয়ী একজন বীর!

    আজকে এই বিজয় দিবসে উনাকে সশ্রদ্ধ স্যালুট। সহস্র স্যালুট। সেই সাথে স্মরণ করছি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল শহীদ এবং জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের। উনাদের এই ঋণযে শোধবার নয়!


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    নিজের বাবাকে নিয়ে এমন গল্প খুব কম মানুষ লিখতে পারে এ পৃথিবীতে।রুপকথার গল্পের চেয়েও বিষ্ময়কর লাগল আমার কাছে।
    রহমান ভাই,আপনি অনেক অনেক সৌভাগ্যবান :salute:

    জবাব দিন
  3. রহমান (৯২-৯৮)

    *** অত্যন্ত দুঃখের সাথে পাঠকদের জানাচ্ছি, গতরাতে কিছু ভুল বানান সংশোধন করার জন্য এই পোষ্টটা এডিট করতে গিয়ে নিচের অনেকটা অংশ মুছে যায় এবং কমেন্ট অটো অফ হয়ে থাকে। এখন অনেক চেষ্টা করে পোষ্টটা ঠিক করলাম। দীর্ঘসময় ধরে পাঠকদের এই অসুবিধায় ফেলে রাখার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

    জবাব দিন
  4. রকিব (০১-০৭)

    আঙ্কেলের জন্য স্যালুট :salute: :salute: , উনাদের মতো নিঃস্বার্থ, অসমসাহসীক মানুষদের জন্যই আমরা স্বাধীন দেশে জন্মাতে পেরেছি। :salute:
    অফটপিকঃ কাইল্কে অনেকক্ষণ আইসা গুতাগুতি করছি, কিন্তু মন্তব্য দিতে পারি নাই। প্রথমে মনে করছিলাম আমারে মনে হয় ব্যান করছেন। :bash:


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
    • রহমান (৯২-৯৮)

      এই প্রসঙ্গে একটা মিলিটারী জুক্স মনে পড়ি গেল।
      এক সৈনিক তার প্লাটুন কমান্ডারকে স্যালুট না দেয়ার অপরাধে প্লাটুন কমান্ডার তাকে কোম্পানী কমান্ডারের সামনে হাজির করে। অপরাধের বিবরণ শুনে কোম্পানী কমান্ডার ডিসপোজাল দেন, সৈনিককে তার প্লাটুন কমান্ডারকে ১০০০ বার স্যালুট দিতে হবে। এই ডিসপোজাল শুনে প্লাটুন কমান্ডারের মন খারাপ হয়ে গেল। তিনি তখন কোম্পানী কমান্ডারকে অনুরোধ করলেন "স্যার, পানিশমেন্টটা কমিয়ে দেয়া যায়না? ইয়ে, মানে আমাকেও তো তাহলে ১০০০ বার স্যালুট নিতে হবে"

      সিরিয়াস কমেন্টে ফান করে ফেললাম। আমার বাবার বাসায় ইন্টারনেট নেই তবে বাবাকে পৌছে দিব তোমার মিলিয়ন স্যালুট 🙂 । ভাল থেকো, সাবধানে শীতকালীন প্রশিক্ষণ শেষ করে ক্যান্টনমেন্টে ফেরত যাও। মোবাইলে এত বড় লেখা পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ :hatsoff:

      জবাব দিন
  5. ভাইয়া প্রথমেই ধন্যবাদ কিছু বলার সুযোগ টা করে দেওয়ার জন্য।এই রকম একজন মানুষ এর সান্নিধ্য পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।আর সেই মানুষ যদি বাবা হয় তাহলে তো আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ।ভাইয়া,আপনার লেখাটা পরে খুব খুব ভাল লাগলো।
    আংকেলের জন্য :salute:

    জবাব দিন
  6. ওবায়দুল্লাহ (১৯৮৮-১৯৯৪)

    রহমান,
    প্রথমে একবার পড়তে এসে দেখি অর্ধেক নাই।
    কাল মন্তব্য দিতে এসে হঠাৎ আমার নেট এ ঘাপলা হলো।
    এই কারনটা না বলে শান্তি পাচ্ছিলাম না। এরকম লেখায় আরো আগে হাজিরা দেয়া উচিৎ ছিল আমার।
    যাহোক, আংকেল এর জন্য একটাই সশস্ত্র সালাম। (তোমার জুক্স এর আঙ্গিকে 😛 )

    আর তোমার লেখা - সেতো বল্বার কিছু নাই।
    ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আংকেল এর দেশপ্রেম আর বাবাব্র জন্য তোমার ভালবাসা টুকু এখানে তুলে এনেছো অনবদ্য লেখনীতে।
    :clap:
    শুভেচ্ছা নিও প্রিয়।


    সৈয়দ সাফী

    জবাব দিন
  7. আহমেদ

    লেখাটা পড়ে অন্যরকম একটা শিহরণ জাগলো। আংকেলের মতন মানুষদের জন্যই আজ আমরা এতদূর আসতে পেরেছি। আংকেলকে আমার হাজার সালাম :salute: :salute: :salute: সাথে আপনাকেও :salute: গর্বিত পিতার সফল সন্তান হবার জন্য :boss:

    জবাব দিন
  8. দিহান আহসান

    ভাইয়া একটানে পড়ে গেলাম,
    আপনি আসলেই অনেক ভাগ্যবান, এমন মানুষকে বাবা হিসেবে পেয়ে 🙂 চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। :hatsoff:
    খালুকে আমাদের সালাম পৌছে দিয়েন। :salute:

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।