অতীত বয়ান – কেউ যদি শুনতে চায় (আমি যখন সংখ্যালঘু)

মাঝে মাঝে এই প্রবাস জীবনে খন্ড খন্ড অনেক আনন্দের মুহূর্ত চলে আসে। এই যেমন গাড়ি চালিয়ে যখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সমতলে নামতে থাকি দূরে দেখতে পাই সাগরের এক ফালি অংশ। রূপালি রেখা, চিকমিক। আর রাতের বেলা হলে দেখবো সেই সাগর পাড়ের শহরটিতে স্তব্ধ জোনাকীদের মেলা। একেকটা এনার্জি সেভিং বালব যেন একেকটা জোনাকী। তারা সেখানে জ্বলেই আছে, নিভতে ভুলে গেছে। তাই দেখে মনটা ঝকমকিয়ে উঠে। পথে চলতে চলতে ছেড়ে দিই রেডিওর এফএম ব্যান্ড ৯৬.৫। হালকা রকের সুর ভাজতে থাকে। মাঝে মাঝে আবহাওয়া, ট্রাফিক, টুক টাক খবর আর বিজ্ঞাপন। সবগুলোই কাজের। এমনকি বিজ্ঞাপনটাও। সেখানে প্রায়ই মূল্যহ্রাসের খবর থাকে। আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় যখন বিজ্ঞাপন শেষে প্রিয় গানের কলি ভেসে উঠে। এরকম একটা প্রিয় গান জন লেননের ‘ইমাজিন দেয়ার ইজ নো হেভেন’। তখন আমাকে আর পায় কে। ঈদের আনন্দে মেতে উঠি। হ্যা, এখন পর্যন্ত আনন্দের সর্বোচ্চ তুলনা করতে ঈদ শব্দটার কোন বিকল্প খুঁজে পাই না। অবশ্য তা ছোটবেলার ঈদ।

দেশে থাকতে একদম ছোটবেলায় এক ঈদ দাদার বাড়িতে আরেক ঈদ নানার বাড়িতে করতাম। ঈদের একমাস আগে থেকে কী প্রতীক্ষাতেই না দিন কাটতো! বিশেষ করে রোজার ঈদ। এক একটা করে রোজার সংখ্যা কমতো আর আনন্দের উত্তাপে উত্তেজনার পারদ-মাত্রাটা তর তর করে উপরে উঠে যেত। শুধু আমি না সেইসাথে পরিবার, সব বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পুরো শহর এমনকি পুরো দেশ একই আনন্দে মেতে উঠতো। রোজা রাখি না রাখি ইফতারের সময়টা ছিলো উৎসব, উৎসব। সাইরেন যেন রবিশংকরের সেতারের ঝংকার, টেবিলে সাজানো রকমারী খাবারের দর্শক থেকে ভক্ষক হবার প্রবেশপত্র, সংযমের মাসে অসংযমী হওয়ার ইংগিতবাহক।
আমার শৈশব বিটিভি প্রজন্মের। সবেধন নীলমনি একটাই চ্যানেলে রোজার মাসে সবচেয়ে আকাংখিত অনুষ্ঠানটি ছিলো মাহে রমজান। দেশে সংখ্যাগুরুর দলে থাকবার কারণে কখনও সংখ্যালঘুর কষ্টটা বুঝতে পারিনি। এই প্রবাস জীবনে নিজে যখন সংখ্যালঘু হলাম তখন অনুধাবন করলাম সেই কষ্টটাকে। প্রতিদিনই শোনা আমার পছন্দের রেডিও চ্যানেলে ডিসেম্বর মাস জুরে খালি বড়দিনের গান বাজতে থাকে। তখন এই বড়বেলায় ছোটবেলার মতোই এক এক করে গুনতে থাকি কবে ডিসেম্বর মাসটা শেষ হবে, কবে ফিরে পাব আমার সেই আগের হালকা রকের এফ-এম ব্র্যান্ড ৯৬.৫কে। অন্যকোন চ্যানেলে যেতে ইচ্ছে করে না, সিডি শুনতে ইচ্ছে করে না। শুধুই ৯৬.৫এর প্রতীক্ষা।

এই অহেতুক গোঁয়ার্তমিটুকু ছাড়া ডিসেম্বর মাসটার আর সব কিছুই বেশ ভালো লাগে। আসলে এসময় এই দেশটা তার প্রতিটি ক্ষেত্র থেকেই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই একটু হলেও ভালোলাগার অনুভূতিটুকু ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।


থ্যাংকস গিভিং অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই আমেরিকাতে বড়দিনের জন্য সাজ সাজ রব শুরু হয়ে যায়। বড়লোকদের দেশে উৎসবটার চলন-বলনও বড়লোকী ধাঁচের। বানিজ্যিক পাড়া, অফিস পাড়া, আবাসিক এলাকা এমনকি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসমূহও ভিতর-বাহিরে আলোকসজ্জা, জড়ির ফিতে, ঝলমলে জিংগেল বেল, ক্যান্ডি কেইন, নানান রকমের নক্সাদার øোফেçক দিয়ে উৎসবের সাজে সেজে উঠে। ঠিক যেন বিয়ের কনেটি এইমাত্র বিউটিপার্লার থেকে বেড়িয়ে আসলো। এসময় আমেরিকার বহু আবাসিক এলাকায় লোকজন বাড়িতে বাড়িতে আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতা করে সামনের উঠোনে পাল্লা দিয়ে বাইবেল কাহিনী ঝলমল করে ফুটিয়ে তুলে। একই সাথে সারা মাস জুরে চলে নানা অনুষ্ঠানাদি – বিশেষত উপহার আদান-প্রদান আর ফ্রী খাওয়া দাওয়া।

আশেপাশের গুপ্তা, প্যাটেল, চ্যাং, ব্যাংদের অনেকেই এসময় উইলিয়াম আর ক্যাথেরিনদের সাথে তাল মিলিয়ে বাড়িতে আলোকসজ্জা করে, ঘরের মধ্যে বড়দিনের গাছ সাজায়। সবাই যখন সংখ্যাগুরুদের দলে ভিড়ছে তখন আমাদের মতো আহম্মেদ মোহাম্মেদদের সন্তানেরা খুব দ্বিধাদ্বন্ধে পড়ে যায়। রাসীন তার ধর্মটা জানছে। বুঝছে যে আমরা পাইন গাছ সাজাই না। তারপরও মনে মনে ইচ্ছে ঘরে যদি একটা পাইন গাছ আসতো। যেদিনটি নিয়ে এতো ছুটিছাটা, এতো আয়োজন তাতে তাদের অংশগ্রহন নেই বিষয়টা শিশুমনে নিশ্চয় খুব কষ্ঠ দেয়।
হাতে বেশ কিছুদিন পাওয়াতে আমরা বড়দিনের ছুটির সময়টাতে নেভাদার লেক টাহো আর রিনোতে ঘুরতে চলে যাই। ক্যালিফোর্নিয়ার ভেতরটায় খুব একটা বরফ পড়ে না। কিন্তু শীতকালে তুষারের সাথে একটু সখ্যতা না করলে কিভাবে হয়? তাই ওখানটায় যাওয়া। সেখানে গিয়ে বরফ দিয়ে যতো খেলা আছে তার সব করি। øোম্যান বানাই। স্কী করি। বরফের মধ্যে দিয়ে øো-মোবাইল চালিয়ে সোজা চলে যাই। টায়ারের উপর বসে স্লাইড করি। রাতে খেতে যাই কোন না কোন আন্তর্জাতিক বাফেতে যেখানে সব দেশের সব রকম খাবার থাকে। এরকম অনেক জায়গায় হঠাৎ হঠাৎ বাংলাদেশি শেফের সাথে দেখা হয়ে যায়। অন্তত এই একটা জায়গায় আমরা বেশ আন্তর্জাতিক। আমাদের খাবার-দাবারের প্রসিদ্ধি সারা বিশ্বজুরে। নইলে কী আর সেই সমুদ্র-অভিযানের সময়গুলোতে মশলার সন্ধানে নাবিকেরা এই ভারতীয় উপমহাদেশে দলে দলে ভীড় করতো!


বড়দিনের পাশাপাশি আর সারা বছর জুরে বিভিন্ন কম্যুনিটির উৎসব লেগেই আছে। কেউ বলে না দিলেও ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি সময়টাতে বুঝে যাই চাইনীজদের নিউ-ইয়ার আসছে। হয় অফিস নয় বাচ্চাদের আফটার স্কুল কোন না কোনখান থেকে ফ্রী চাইনীজ মিষ্টি ঘরে চলে আসে। এর মধ্যে একটার স্বাদ আমাদের দেশের মোরব্বার মতো।
ভারতীয়রা দুর্গাপুজো আর দিওয়ালী খুব ঘটা করে পালন করে। থ্যাঙ্কস গিভিং আর দিওয়ালীর সময়টা মিলে যাওয়াতে ওরাও পাল্লা দিয়ে ঘরবাড়িতে আলোকসজ্জা করে। সেই সাথে বাসার সদর দরজার সামনে থাকে একটা প্রদীপ। আমাদের পাড়ায় এক মিস্টার এন্ড মিসেস আয়ার থাকেন। মিসেস আয়ার দিওয়ালীর দিন সন্ধ্যাবেলায় পুরো পাড়াজুরে ওনার বাসায় দাওয়াত দেন। একজন সাহায্যকারী নিয়ে নিজ হাতে প্রায় দুশ’র মতো লুচি বেলেন। ষার্টোদ্ধ এই যুগলটি দক্ষিন ভারত থেকে আসা প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী। ভদ্রমহিলা তার চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন। ভদ্রলোকের নিজস্ব ব্যবসা আছে। বেশ বড়সড় পোর্টফোলিও সম্বলিত অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তাদের এক মেয়ে বিয়ে করে পুরো সংসারী আরেক মেয়ে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে নৃত্যকলাকে। এই ব্যাপারটা এদেশে বেশ লক্ষনীয়। প্রথম প্রজন্ম খেটেখুটে নিজেদের শক্ত ভীত গড়ে। আর দ্বিতীয় প্রজন্ম তখন হেসেখেলে তাদের প্যাশনকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। রবীন্দ্রনাথের ভাগ্য আরকি। পৃথিবীর দ্বিতীয় ধনকুবের ওয়ারেন বাফের ছেলে পিয়ানো বাদক। আবার ছেলের প্যাশন যদি হয় অর্থোপার্জন তাহলে তার ফলাফল দাড়ায় বিল গেটস। ভদ্রলোকের পিতা বেশ বিত্তশালী ছিলেন। তবে ওয়ারেন বাফের মতে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো কথাটি ভুল। তা হবে সোনার ছুড়ি পিঠে নিয়ে জন্মানো। সবকিছুর সহজলভ্যতা জীবনের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়।

সিলিকন ভ্যালিতে বাংলাদেশিরা বেশ সাড়ম্বরে ঈদের দিনটি পালন করে। প্রায় বার বছর আগে যখন এখানে আসি তখনও এখানকার বাংলাদেশিরা বুঝে উঠতে পারছিলো না কিভাবে ঈদ পালন করবে। অবশ্য তখন আমরা দুজনেই উর্ব্ধশ্বাসে ছুটছিলাম আমাদের প্রতিষ্ঠা নিয়ে। ঈদের দিন কোন ছুটি নিতাম না। এমনকি বাচ্চা হওয়ার পরও ওরা নিঃশব্দে তাদের স্কুল আর ডে-কেয়ারে চলে যেতো। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে বাচ্চা ছোট থাকতে অনেক কিছু করা যায় কিন্তু বড় হয়ে গেলে বাবা বা মা অন্তত দুজনের একজনকে কিছুটা লাগাম টেনে ধরতে হয় বাচ্চাদের সময় দেওয়ার জন্য। এখন ওরা ওদের হামাগুড়ির গুটিগুটি খোলস ছেড়ে রীতিমতো চিন্তাশীল, ভাবনাশীল মানুষ হয়ে উঠছে।
ঈদের দিন সকালবেলায় মসজিদে গিয়ে পুরো পরিবার একসাথে নামাজ পড়ে বাংলাদেশিদের বাসায় বাসায় ঘুরতে বের হই। এদিনের দাওয়াতটা ওপেন হাউজ থাকে। মানে কর্তা/গিন্নি তার বাসায় আসার জন্য একটা সময় বেঁধে দেন। ওসময়ের মধ্যে সে বাসায় যেতে হবে। টেবিলে থরে থরে খাবার সাজানো থাকে। লোকজন কাফেলার মতো আসতে থাকে। তাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে আবার অন্য বাসায় ছুটতে হয়। তারপরও অনেক দাওয়াত রক্ষা করা যায় না। আবার নিজের বাসায় দাওয়াত দিলে সে সময়টায় অন্য বাসায় যাওয়া হয় না। বাচ্চারা ঈদের সময় তাদের পছন্দের উপহার পায়, ঈদি পায়, স্কুলে যেতে হয় না, অনেক বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা হয় এতেই ওরা মহাখুশি। যেমন এখন রাসীনের প্রিয় হলিডে ঈদের দিন। গতবছর দেশ থেকে ঈদের সময় মেজবোনের পরিবার এসেছিলো। বোনের মেয়েরা বললো, ’তোমরা তো বাংলাদেশের থেকেও জমজমাট ঈদ করো।’

আসলে সংখ্যালঘু হবার একটা সুবিধা আছে। অস্তিত্বের সংকট থেকেই অস্তিত্বের মূলটাকে আকড়ে ধরবার আপ্রাণ চেষ্টা। দেশে যেখানে ঈদের মজাটা ছিলো ফর গ্রান্টেড, এখানে সেই মজাটাই পেতে হয়েছে অনেক সাধ্যসাধনা পর। আমরা ছোটবেলা থেকে যেই জীবনাচরণ, অভ্যাসের মধ্যে বড় হয়েছি দরকার না পরলে হঠাৎ করেই তা বদলে নতুন কিছু গ্রহন করতে পারি না। যে পথ দিয়ে নিজেরা হেটে এসেছি, বাচ্চাদেরকেও তো সেই একই পথের পথিক করতে চাই। কারো বাসায় গিয়ে জর্দা, সেমাই পোলাউ কোর্মা খেয়ে যে মজাটা আমরা পাব সেটা পাইন গাছ সাজিয়ে বা উপহার আদান-প্রদান করে পাব না।


একদিন ট্রাফিক লাইটের কাছে গাড়ি দাড়িয়ে ছিল। পেছন থেকে রাসীন বলে উঠলো, মামনি আমাদের কিন্তু চ্যারিটি করা উচিত।’
’করি তো’। কথাটা বলেছিলাম দেশের করা চ্যারিটির কথা মনে করে।
’কোথায় করো, আমি তো কখনও দেখিনি তুমি কোন হোমলেসকে সাহায্য করেছে।’
রাসীনের কথায় সম্বিৎ ফিরে খেয়াল করে দেখলাম রাস্তার কোনায় একজন হোমলেস ’আমি একজন ভ্যাটারান কিন্তু এখন খুব ক্ষুধার্ত’ লেখা একটা ছোট্ট প্লেকার্ড হাতে দাড়িয়ে আছে। এদেশে ইরাক যুদ্ধ ফেরত সৈন্যের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে হোমলেসদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকাংশেই এরা কিছুটা মানসিক রোগী। খালেদ মোশারফের একটা কথা আছে এরকম যে দেশ কোন জীবিত গেরিলা চায় না। স্থান, কাল, পাত্রভেদে কথাটা আসলেও সার্বজনীন। নিউমার্কেটের ব্রীজের নীচে দাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা নসু মিয়াকে ভিক্ষা করতে দেখেছি আর এখানে দেখছি ইরাক, আফগানিস্থানের যুদ্ধফেরত সৈনিকদের হোমলেস হতে।
নিজের ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এসে রাসীনকে বললাম,’আমরা দেশে চ্যারিটি করি।’
রাসীন বললো, ’তোমাদের এখানেও করা উচিত কারণ এটা এখন তোমাদেরও দেশ।’

এই খেলাটা আমাদের মা-ছেলের মধ্যে প্রায়ই হয়। রাসীন আমেরিকাকে নিজের দেশ মনে করে। তাই এখানে তার কোন সংখ্যালঘু কমপ্লেক্স নেই যা আমার আছে। আবার আমি বাংলাদেশে সংখ্যাগুরুর দলে, রাসীন নিজেকে সে দলভূক্ত করতে পারে না। আমি রাসীনকে হাজারটা কথা বলে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুর দলে টানতে চাই আমেরিকায় যে কাজটা রাসীন করে আমাকে নিয়ে। কিন্তু এতো সহজে কী আর আমার আমেরিকান হওয়া হয়! বরং আবার ফিরে যাই অতীতে।

দেশে থাকতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টাতে পুরোনো ঢাকায় ভাড়া থাকা আমার এক হিন্দু বান্ধবীর কলকাতায় বাড়ি আছে শুনে খুব মন খারাপ হয়েছিলো। ওরা বাংলাদেশের সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সেই দেশটাকে আপন ভাবতে পারে না কেন? সেই আমি এখন ছেলের চোখে একই কাঠগড়ায় দাড়িয়ে আছি।
সংখ্যালঘু হবার দরুন আমরা কী খুব অবধারিতভাবেই দেশটাকে আপন করে নিতে পারি না? রাসীনের যেমন অভিমান হচ্ছে আমারও তো ঠিক একই অভিমান হয়েছিলো সেই হিন্দু বান্ধবীর প্রতি।

অনেক পরে এই আমেরিকায় এসে বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের থেকেও অনেক বেশি অভিমান ওদের বুকে।


এই প্রবাসে বাংলাদেশি কম্যুনিটিতে প্রায়ই দেখা যায় হিন্দুরা নিজেদের একটা আলাদা গ্রুপ করে নেয়। ছেলেরা ব্যাচেলর জীবনে একসাথে চললেও বিয়ের পর খুব অলক্ষ্যে সে গ্রুপের সাথে ভীড়ে যায়।
আবার দেখা যায় আরেকটু বৃহত্তরক্ষেত্রে বাংলাদেশের হিন্দুরা কলকাতার হিন্দুদের সাথে ভীরে যাচ্ছে, ওদিকে ভারতীয় মুসলিমরা মিশে যাচ্ছে পাকিস্তানী মুসলিমদের সাথে। সিলিকন ভ্যালীর প্রথম প্রজন্মের কিছু বাংলাদেশি অভিবাসীদের সাথে কথা বলে এই বিভেদের কারণটার একটা ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করলাম।
সে ইতিহাস বয়ান করার জন্য দুটো কাল্পনিক নাম ব্যবহার করি। মনে করি একজন সরস্বতি বৌদি আরেকজন মালেকা আপা।
ধরা যাক উনারা দুজনেই সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে বৌ হয়ে এ এলাকায় আসেন। প্রথম দিকে পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফালগুন, একুশে ফেব্রুয়ারী, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ঈদ, পুজো সব মিলেমিশে একই সাথে চলছিলো। হই-চই, আনন্দ-ফুর্তি,দুঃখ-বেদনা সবকিছুই ভাগাভাগি। সপ্তাহান্েত সপ্তাহান্েত পালা করে এর ওর বাসায় দাওয়াত। খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি আড্ডা, তাস পেটানো, গান-বাজনা প্রবাস জীবনে নিরাপত্তা বোধ খুঁজে পেতে সাহায্য করছিলো। বেশ অনেকটা সময় পর মধ্যবয়সে এসে হঠাৎ একদিন সরস্বতি বৌদি দেখলেন মালেকা ভাবি তার বাসায় দাওয়াতে আসলেন হিজাব পড়ে। রান্না করা কোন মাংশ ছুয়ে দেখলেন না যেখানে মুসলমানদেন মাংশ ছাড়া রাজভোগ কল্পনা করা যায় না। আসলে মালেকা ভাবির সন্দেহ হচ্ছিলো গরুর মাংশটা শতভাগ হালাল কিনা। এশার ওয়াক্ত দেরী হয়ে যাচ্ছে এই অজুহাতে মালেকা ভাবি আর গানবাজনা পর্যন্ত থাকলেন না। তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। মালেকা ভাবি আবার বাংলাদেশি কম্যুনিটির নারী মহলের অঘোষিত দলনেত্রী। উনি যা করবেন বা বলবেন দলের আর বাকী সবাই তাই করবে। পরবর্তী সপ্তাহে মালেকা ভাবির বাসার দাওয়াতে গান-বাজনার বদলে হালাকা অর্থাৎ ধর্ম বিষয়ক আলাপ আলোচনা হলো। কিছুটা বাধ্য হয়েই সরস্বতি বৌদিকে সেখান থেকে চলে আসতে হলো। এভাবে ধীরে ধীরে সরস্বতি বৌদি বাংলাদেশি সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম সমাজ থেকে সরে গিয়ে কলকাতার বাংগালিদের দলে ভীড়ে গেলেন। পরবর্তী সময়ে যখন আরো অনেক বাংলাদেশি হিন্দু এই এলাকায় চলে আসলো তখন তাদেরকে নিয়ে একটা আলাদা কম্যুনিটি গড়ে তুললেন। আমাদের সংস্কৃতির গোড়া এক হলেও পরবর্তীতে ধর্মীয় কারণে আলাদা হয়ে যাচ্ছি। বড়রা উদারতা না দেখালে ছোটরা সেখানে ভীড়তে পারে না। তাই বুঝি আমাদের দেশের সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগুরুদের বিরুদ্ধে এক ধরনের অভিমান পুষে রাখে। মূল কারণটা নিরাপত্তাহীনতা বোধ। একই অবস্থা ভারতের মুসলমানদেরও। আমার কাছে মিরা নায়ার এবং ইন্দ্রা নয়ী (পেপসির সিইও) এই দুজনকে খুবই ক্ষমতাশালী অভিবাসী নারী বলে মনে হয়। কিন্তু একটা ব্লগে দেখতে পেলাম যে কিছু ভারতীয় এই দুই নারীকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগাল করছে। তাদের অপরাধ তারা দুজনেই মোহামেডান (ওদের ভাষায় – আমাদের ভাষায় মুসলিম হবে) বিয়ে করেছে।


বুয়েটে আমাদের ব্যাচের একটা ইয়াহু গ্রুপ মেইল আছে। সেখানে ব্যাচের একজন বেশ সক্রিয়ভাবেই জামাতি মতাদর্শ প্রচার করতে থাকে যা অনেকেরই বিরক্তির কারণ ঘটায়। কারণ আমরা বাংলাদেশিরা অধিকাংশই অনেক উদার মুসলিম। ধর্ম পালন করছি আবার নিজ সংস্কৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছি। এই সিলিকন ভ্যালিতে আমার ব্যাচের যে বন্ধুরা আছে তারা নিয়মিত ধর্মীয় নিয়মনীতি পালন করছে আবার আরেকদিকে কেউ পহেলা বৈশাখ উদযাপন, শহিদ মিনারে ফুল দেওয়াকে কটাক্ষ করলে কিম্বা হিজাবকে মহিলাদের রক্ষাকবচ বললে তা পছন্দ করছে না। বেশ কিছুদিন ধরে জামাতি মতাদর্শী ব্যাচমেটটি মেয়েদের হিজাবের পক্ষে সাফাই গাইছে। এখানে বন্ধু মারুফ ব্যাচ ইমেইল-মালায় আমাকে সরাসরি অংশগ্রহন করে জামাতী ব্যাচমেটটিকে কিছু যুক্তি প্রদর্শন করতে বললো। এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে যদি একবার যুদ্ধ শুরু হয়, কী ময়দানে কী ব্লগে অথবা ফেসবুকে, তাহলে আর সহজে থামাথামি নেই। মাঝে মধ্যে মনে হয় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধটা বোধহয় ঘটবে আন্তর্জালে। কিছুটা পাশ কাটানোর জন্যই মারুফকে বললাম, ’কখনও তো কোন মেয়েকে এই ইমেইল মালায় অংশগ্রহন করতে দেখিনি। আমি একা অংশগ্রহন করতে চাচ্ছি না।’
আমার উত্তরে খুব আহত স্বরে মারুফ বললো, ’ তোমার কাছ থেকে এ কথাটা আশা করিনি।’

পরে আমি চিন্তা করে দেখলাম কথাটা আমি শুধু পাশ কাটানোর জন্যই বলিনি। আমার মনের একেবারে গভীরে কী লিঙ্গ ভিত্তিক সংখ্যালঘুভীতি (জেন্ডার মাইনোরিটি ফোবিয়া) কাজ করে না? যদিও সংখ্যাগুরু নিজেই দিব্যি ভুলে বসেছিলো যে আমি একজন সংখ্যালঘু।
জীববিজ্ঞান দিয়ে, নৃবিজ্ঞান দিয়ে সংখ্যালঘু বোধটার অনেক ব্যখা করা যেতে পারে। তারপরও বলবো যে নিজের মধ্যে থেকেই সংখ্যালঘু বোধটা ঝেটিয়ে দূর করতে পারলে তাহলেই সে আর সংখ্যা লঘু থাকে না। সংখ্যাগুরুরাও তাকে সেভাবে গ্রহন করে নেয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমারকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

লিংগভেদে, জাতিভেদে, ধর্মভেদে, ব্যাচভেদে মুছে যাক সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর সকল বিভেদরেখা। এই ঈদে এর থেকে আর ভালো কী চাইতে পারি।

সবাইকে ঈদের আগাম শুভেচ্ছা।

৬,৪৭৪ বার দেখা হয়েছে

৬০ টি মন্তব্য : “অতীত বয়ান – কেউ যদি শুনতে চায় (আমি যখন সংখ্যালঘু)”

  1. আহমেদ

    লেখাটা পড়ে ভালো লাগলো আপু, ধর্মীয় উৎসবগুলো নিয়ে অনেক কিছুই জানলাম। সংখ্যালঘু বোধটাই এমন, একে গিলে ফেলে এগিয়ে গেলেই বরং জীবনটা বেশি উপভোগ্য হয়।
    ঈদ মোবারক আপু 🙂

    জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    আপু একটানে পুরো লেখাটা পড়লাম।আপনার লেখাগুলোকেই বোধহয় সত্যিকারের "ব্লগ" বলে...ঝরঝরে,সাবলীল।
    অফ টপিক- আপু আমার প্রসেস ফলো করতে পারেন।রাজাকার দেখলেই গদাম কারণ কোটি কোটি অকাট্য যুক্তিতেও এদের কোন পরিবর্তন হবেনা-"যুক্তিতে ডরায়না ছাগু" কথাটা এমনি এমনি আসে নাই।রাজাকার দেখলে আপন ভাইবোনেরো মাপ নাই,ক্লাসমেট তো বহুত দূর কি বাত।

    জবাব দিন
  3. সুমন্ত (১৯৯৩-১৯৯৯)

    আপু, স্বরস্বতী বৌদির ঘটনাটা অনেক সুন্দর করে বললেন। ঠিক একই রকম অনেক ঘটনার স্বাক্ষী আমি নিজে (ককক'র এক্স ক্যাডেট মেইলিং লিস্টে যদি কেউ থাকেন তাইলে তিনি একটা উদাহরন পেয়ে গেছেন বোধহয়)। তবে বিদেশে থাকা মানুষদের এরকম আচরনের পিছে আমি একটা কারন খুজে পাইঃ বিদেশে আসার পর পরই সবাই (অন্তত যাদের ব্যক্তিত্বের সংকট আছে, তারা তো বটেই) একটু পরিচয় সংকটে ভুগতে শুরু করে। ফলাফল স্বরূপ নিজের সংস্কৃতি (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাংগালী সংস্কৃতি না হয়ে সেটা হয়ে যায় ধর্মীয় সংস্কৃতি) বেশি করে আকড়ে ধরার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের কাছের মানুষজনকেই দূরে সরিয়ে দেয় তারা।

    জবাব দিন
  4. সাইফ শহীদ (১৯৬১-১৯৬৫)

    শান্তা,

    বেশ কিছুদিন পরে তোমার লেখা পড়লাম। খুবই খুবই উন্নত মানের লাগলো। কবে যে সবাই এভাবে মুক্ত মন নিয়ে সব কিছু দেখার চেষ্টা করবে?

    রাত সাড়ে তিনটা থেকে ঘুম ভেংগে যাবার পর আর ঘুমাতে পারিনি। পাঁচটা পর্যন্ত বিছানায় এদিক ওদিক করে তার পর উঠে পরে কম্পুউটার অন করে তোমার এ লেখা পড়লাম। আমার আগে ওঠা সার্থক হলো।

    আমেরিকার সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে টেলিফোনে এক বন্ধুর সাথে কথা বলার সময় যখন আমরা আলোচনা করছিলাম কেমন করে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী আমেরিকান মনে করে যে গ্রাউন্ড জিরোর কাছে এই মসজিদ হওয়া উচিৎ না, সে মনে করিয়ে দিল, ৭১-এ যখন পাকিরা শহীদ মিনারকে মসজিদ ঘোষনা করেছিল, তখন আমরা সংখ্যাগুরু মুসলমান হওয়া সত্বেও এরূপ বিরূপ মনভাব কেন পোষন করেছিলাম? সত্যই - এ ভাবে তো আমি ভাবিনি।

    আশা করবো তুমি এবং তোমার মত মুক্ত মন নিয়ে যারা চিন্তা ভাবনা করে এবং লেখে তারা তোমাদের চিন্তা ভাবনা অন্যদের সাথে শেয়ার করবে।

    পাঁচ তারা দিলাম, জানি আরও তারা পড়বে।

    ঈদের শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক তোমাকে ও পরিবারের সবাইকে। রাসীনের থেকে আমাদের সবার অনেক শেখার আছে। তাকে আমার স্নেহ রইল।

    পূনঃ আমার না হয় বয়েসের কারনে রাতে বেশী ঘুম হয়না। তুমি এত সকালে উঠে কি করছো? নাকি রাতে পার্টি করে দেরীতে বাড়ীতে ফিরে বিছানায় যাবার আগে এটা পোস্ট করলে (যদি ধরেনি এখনো সিলিকন ভ্যালিতেই আছো)?

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      লেখার সময় মনে হচ্ছিলো আপনি এ লেখার টোনটা বুঝবেন। যাইহোক নিশ্চিন্ত হলাম।
      লিখবো বলে পার্টি ছেড়ে দিয়েছি - নইলে সময় পাওয়া যায় না। এখন একটা উপন্যাস লিখছি। সেটার জন্য অনেক পড়াশোনা করতে হয়।
      গতরাতে ঈদের রান্না করতে করতে দেরী হয়ে গেছে। আজকে বাসায় ৬০-৭০ হন মেহমান আসবে। এমনিতে আমি খুব তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাই আর উঠি খুব ভোরে।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
  5. দিহান আহসান

    ঈদের অনেক শুভেচ্ছা আপি। রোযার আগে কল দিয়েছিলাম, বাসায় ছিলেনা তুমি 🙁
    আজকেও ফোন দিতে পারছিনা আমার ফোনের অবস্থা ভালো না :((

    রাইসা মামনি আর রাসীন বাবা'র জন্য আদর রইলো। :hug: :hug:

    জবাব দিন
  6. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    অসাধারণ।
    অনেকদিন পর এলে। উপন্যাস লিখছো জেনে বেশ ভালো লাগলো।
    আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট আর কাটলোনা বোধ হয়। দিন দিন কেমন সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে.... ধর্ম, জাতি এই বর্মের আড়ালে চলে যাচ্ছে যেনো সবাই....
    ঈদের শুভেচ্ছা তোমার আর তোমার পরিবারের জন্যে।
    অফটপিক: তোমাদের ব্যাচের সুদীপা (এখন টেক্সাসে) এই ব্লগের মেম্বার হবার জন্য সেই ৫-৬ মাস ধরে লাইন দিয়ে আছে। এখনো ইমেইল কনফার্মেশন এলোনা ওর। আমি-ই ওকে বলেকয়ে মেম্বার হতে বলেছিলাম। কোন উপায় আছে? তুমি চাইলে ওর নম্বর তোমার দিতে পারি।

    জবাব দিন
  7. রাশেদ (৯৯-০৫)

    শান্তাপু আছেন কেমন? গান শোনা হয় না খুব একটা, ইংরেজি আর কম। লেননের গানটাও শোনা হয় নি আগে। লেখাটা পড়া শুরু করার পর মনে হল একবার সার্চ করে দেখি। ইউটিউবে গানটা দিয়ে লেখাটা প্রথম থেকে পড়া শুরু করলাম। পড়তে পড়তে মনে হল নিজের ভিতর কিছু প্রশ্ন ছিল, উত্তরগুলো দরকার ছিল কিন্তু কাকে করব ঠিক জানা ছিল না। এই সংখ্যালঘুবোধটা হয়ত সংখ্যাগুরু হওয়ার কারণে কখনো ঠিক করে বুঝে উঠতে পারি নি। পড়তে পড়তেই নিজের দেখা কিছু ঘটনা মনে পরল হয়ত সংখ্যালঘুবোধ এর অনুভূতি কেমন হয় সেই ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে আবার নতুন করে ধরা দিল।

    নতুন উপন্যাস লিখছেন তাইলে। খুব ভাল, খুব ভাল। আপনার ঝরঝরে গদ্য ভাল পাই তাই উপন্যাসের অপেক্ষায় রইল পাঠক 🙂


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      নিজের ভিতরের বোধটা পালটে যেতে পারে যদি অপরপক্ষের চোখ দিয়ে বিষয়টা উপলদ্ধি করতে পারো। তোমার প্রশ্নগুলো জানতে ইচ্ছে করছে। তবে এই ব্লগে জিজ্ঞেস করবো না। বইটা ভালো ভালোয় শেষ হলে বইমেলার সময় আসবো তখন কথা হবে।
      দেশে থাকতে তোমাদের মতো বয়সে আমি যেরকম বই পড়তে চাইতাম লেখার সময় উপন্যাসটা সেরকম করার চেষ্ঠা করতেছি। পড়তে খুব কষ্ঠ হবে না আবার নিজের মনের নানান ভাবনা নিয়ে নাড়াচাড়া করবে - এই টাইপ আরকি। কতোটুকু পারবো জানি না তবে চেষ্ঠায় আছি।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
  8. রাব্বী (৯২-৯৮)

    দুর্দান্ত লেখা শান্তা আপা! খুব ভাল লাগলো। বিষয়গুলোর সাথে অল্পবিস্তর পরিচিত হওয়ায় লেখার সাথে দারুনভাবে রিলেট করতে পারলাম নিজেকে।

    আইডেনটিটি পলিটিকস বা সংখ্যালঘুর পরিচিতির রাজনীতি হলো সংকট এবং অস্থিত্বের ঘাতপ্রতিঘাত। এই সংকট নানা রকমের ডিফেনসিভ মেকানিজম দিয়ে মোকাবিলা করে মানুষ। ধর্ম তার একটি। ধর্মীয় পরিচয় নির্মানে সুবিধা হলো এটি অনেক বেশি ইনক্লুসিভ। নিজস্বতা নির্মান করার প্রানান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যায় প্রথম প্রজন্ম। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী মনেপ্রানে চিন্তায় তার নিজ দেশে বসবাস করে, সুন্দর স্বদেশের ছবি আঁকে। ফিরে যাবার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বাস্তবের সাথে একটি শূন্যতা এবং দূরত্ব তৈরি হয়। প্রথম প্রজন্মের মননে লালিত হয় বিশ বা ত্রিশ বছর আগের ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, পাবনা ইত্যাদি। কিন্তু যত দিন যায় ততো বন্ধনগুলো আলগা হতে থাকে, পরিবর্তিত হতে থাকে সম্পর্ক। আর দ্বিতীয় প্রজন্মের পরিচয় ঘুরপাক খায় ইল্যুশনের ভিতরে। বার বার তারা সংকটের ভেতর দিয়ে যায়, তাদের সাধারনত অস্তিত্বের লড়াই কমে যায়। তাদের থাকে গভীর আত্ম পরিচয়ের সংকট, দ্বৈততার সংকট। তাদের সামাজিক এবং পারিবারিক জীবনের ভিতরে যোজন যোজন ব্যবধান থাকে। বিশেষত যারা ইউরোপের বাইরে থেকে অভিবাসিত হয় কোন পশ্চিমা দেশে। আর শক্তিশালী ডায়াসপোরা হতে আসলে বেশ সময় লাগে।


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      খুব সুন্দর বিশ্লেষন প্রথম প্রজন্ম আর দ্বিতীয় প্রজন্ম নিয়ে। তবে প্রজন্মগুলোকে প্রভাবিত করার আরো অনেক অনুঘটক আছে। সব অনুক্ত ভাবকে প্রকাশ করার ভাষা খুঁজে পেলে ক্রাইশিসটা ভালো ভাবে অনুধাবন করা যাবে। সেদিন টিভিতে টনি ব্লেয়ারের একটা সাক্ষাতকার দেখলাম। সেখানে উনি বলছেম যে যেহেতু রাজনেতিক মতাদর্শিক পার্থক্য মুছে গেছে/যাচ্ছে তাই আগামীতে ধর্ম এবং সংস্কৃতিই জাতিগত বিভেদরেখা সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা রাখবে। বৃটিশটা তাদের ডিভাইড এন্ড রুল থেকে বেড়িয়ে আসতে পারলো না। তবে এরাই তো বিগ গাই। এদের কথাকে হেলাফেলা করার কোন কারণ দেখি না। পিছিয়ে থাকা জাতি হিসেবে আমাদেরকে এ বিষয়টা নিয়ে আরো পরিষ্কার হতে হবে।
      আমি বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সামাজিক আর পারিবারিক দূরত্বটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করি। বে-এড়িয়াতে এটা কিছুটা সহজ এশিয়ান অধ্যুসিত এলাকা বলে।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
      • রাব্বী (৯২-৯৮)
        সেদিন টিভিতে টনি ব্লেয়ারের একটা সাক্ষাতকার দেখলাম। সেখানে উনি বলছেম যে যেহেতু রাজনেতিক মতাদর্শিক পার্থক্য মুছে গেছে/যাচ্ছে তাই আগামীতে ধর্ম এবং সংস্কৃতিই জাতিগত বিভেদরেখা সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা রাখবে। বৃটিশটা তাদের ডিভাইড এন্ড রুল থেকে বেড়িয়ে আসতে পারলো না।

        আপা, এই কথাগুলোর ভিত্তি হলো স্যামুয়েল হান্টিংটনের দ্য ক্ল্যাশ অভ সিভিলাইজেশেন বইয়ের তত্ত্ব।


        আমার বন্ধুয়া বিহনে

        জবাব দিন
  9. ইফতেখার (৯৯-০৫)

    আপু, অসাধারণ, দারুণ লেখা। অন্নেক ভালো লাগলো। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, লেখাটার শেষের দিকে এসে মনে হচ্ছিলো, ইস, এটা যদি শেষ না হতো। 🙂
    অনেক সাবলীল একটা লেখা। প্রিয়-তে রাখলাম 🙂
    আপনাকেও ঈদের অনেক শুভেচ্ছা 🙂

    জবাব দিন
  10. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    খুব ব্যস্ত আছো মনে হচ্ছে। ্বাই দা ওয়ে শুনতে একটু আধুনিক আধুনিক লাগে আমি এমন একটা নাম খুঁজছি। ভাবতেছি তোমার নামটা চোথা মারবো।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
  11. সাব্বির (৯৫-০১)

    অসাধারন আপু!!!
    আপনার ঝরঝরে লেখা সব সময়ই অতি ভাল লাগে।
    প্রত্যেক টি পয়েন্ট উপলব্ধি করলাম অন্তর থেকে।
    বিদেশের মাটি তে সুখে না দুখে আছি সেই হিসাব টা মিলাতে পারিনা কোন ভাবেই।

    অ ট পাচঁ তারা :thumbup: :boss:

    জবাব দিন
  12. সামিয়া (৯৯-০৫)

    চমৎকার!
    আমি একটা জিনিস প্রায়ই ভাবি, আমার বাবার নিজের দেশের বাড়ির (রংপুর) প্রতি আলাদা একটা টান ছিল, আমি তা পাইনি। বাংলাদেশের প্রতি আমার একটা টান আছে, যা হয়ত আমাদের পরের জেনারেশনগুলোতে নাও থাকতে পারে। শুনতে খুব খারাপ লাগলেও, হয়ত সেটাই ভাল হবে।

    জবাব দিন
  13. মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)

    ভালো লাগলো ওয়াহিদা আপা।
    বাইরে কাজ শুরু করার পরে অফিসের পার্ট যদি চিন্তা করি, মাইনরিটি মনে হয়নি নিজেকে। অন্যান্য এক্স প্যাটদের সাথে মোটামুটি ভালই মিশে গেসি। তবে বন্ধু বান্ধবদের জন্যে মন খারাপ লাগে ... এই যা। গ্রুপ মেইলে বা ফেসবুকে যখন দেখি শয়তানগুলা গেট টুগেদার করতেসে তখন মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।

    আমাদের আসলে দেশের বাইরে স্থায়ী হয়ে যাবার কোনো পরিকল্পনা নেই। বিদেশে যদি ঘাটি গড়তেই হয় পরের প্রজন্ম গড়ুক। আমরা দুজনেই দেশে ফিরতে চাই কোনো এক সময়। সেই জন্যেই মনে হয় আপনার মতন করে চিন্তা করিনি কখনো।

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      সবাই দেশে ফিরতে চায় - সচেতনে কিম্বা অবচেতনে।
      আমার মালয়েশিয়া বা দুবাইতে কয়েক বছর থাকার ইচ্ছা আছে। আমার ধারনা পশ্চিমের কোন দেশ থেকে পুবের কোন দেশে থাকার অভিজ্ঞতাটা একটু ভিন্ন হবে। জীবনের অভিজ্ঞতাটা একেক বাকে একেক রকম। বাচ্চা যখন আরেকটু বড় হবে তখন অভিজ্ঞাতা কিছুটা ভিন্ন।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
  14. তানভীর (৯৪-০০)

    একদম অন্যরকম আমেজের একটা ঈদের লেখা।
    শুনে ভালো লাগল যে আপনি আরেকটা উপন্যাসের কাজ করছেন, আমার মত আপনার মুগ্ধ পাঠকেরা তাতে অনেক উপকৃত হবে। 🙂
    জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রই আসলে সারভাইবালের জায়গা, একেকজনের প্যাটার্নটা একেকরকম- এটাই যা পার্থক্য।

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)
      জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রই আসলে সারভাইবালের জায়গা, একেকজনের প্যাটার্নটা একেকরকম- এটাই যা পার্থক্য।

      সহমত। জীবন প্রেডিক্টেবল না বলেই হয়তো এতো জীবন্ত।
      নিজের ভেতরের তীব্র তাড়না (এখন লেখালেখি না করলে ভালো লাগে না) সেইসাথে তোমার মতো পাঠকদের উতসাহ আমাকে সাহসী করে তুলছে। সেইসাথে আরেকটা জিনিষ আমি দেখতে চাই মানুষ চাইলে জর্জ- ব্যারিস্টার-ডাক্তার হতে পারে। সেটার একটা প্রতিষ্ঠিত পথ আছে। সে পথ দিয়ে গিয়ে ভূড়ি ভূড়ি মানুষ তা হচ্ছেও। কিন্তু লেখক হতে চাইলে তা সহজে হতে পারে না কেন? লেখক হওয়ার জন্য হয়তো কোন প্রতিষ্ঠিত পথ নেই। সেই অজানা পথটাকে এখন খুব জানতে ইচ্ছে করছে।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
  15. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    আপু,
    দারুন লাগল লেখাটা। কিছুদিন ধরে ব্যাপক দৌড়ের উপরে আছি। তাই ব্লগে নিয়মিত আসা হচ্ছে না। গতকাল বউয়ের জোড়ালো সুপারিশের জন্যই আজ ভোরে উঠেই আপনার ব্লগে আসলাম। এবং আমি মুগ্ধ। অতএব, পাঁচতারা।

    আজ রাতে দেশ ছাড়ছি বেশ কিছু সুখস্মৃতি, কতিপয় আশংকা আর একটা তীব্র হতাশা নিয়ে। - মজার ব্যাপার হলো, আমার এইসব অনুভূতিও আসছে আপনার বর্ণীত এই সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর সাংস্কৃতিক টানাপোড়েনের চক্কর থেকে।

    অ ট- আমার আপনার লেখার বিশাল ভক্ত। তার খুব ইচ্ছে আপনার সাথে কথা বলার। আপু, সম্ভব হলে আপনার ফোন নম্বরটা দিবেন আমার মেইলে [mahmud735এটgmail.com ]


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  16. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    একটা অসাধারণ লেখা শান্তা। পড়েছি আগেই, আবারও পড়লাম। এমন নির্মোহ, খোলামন, পক্ষপাতহীন দেখার চোখ আর আত্মসমালোচনা লেখার ক্ষমতা তোমার! ভীষণ মুগ্ধ হয়েছি।

    সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘু- এই দ্বন্দ্ব থেকে একবিংশ শতাব্দী হয়তো শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসবে। আমরা দেখে যেতে পারবো না। আমাদের পরের প্রজন্ম- জানিনা। তবে এই শতাব্দীতেই বিশ্বটা একদেশ হয়ে যাবে নিশ্চিত। ধর্ম, রাজনীতি বা অন্য কোনো কিছুই বাধা হতে পারবে না। আমাদের সন্তানরাই তো আর জাতিরাষ্ট্রে আটকে থাকতে চাইছে না। গত দুই দশকে বাংলাদেশের মানুষ যতোটা বহির্মুখী হয়েছে, আগামী এক দশকে এই যাত্রা আরো তীব্র হবে। একসময় দেশ ছেড়ে যাওয়াটাকে পলায়ন মনোবৃত্তি ভাবতাম। এখন মনে হয় উল্টো। যে মানুষ বিশ্বনাগরিক তাকে কিভাবে দেশ, ধর্ম আর ভৌগলিক সীমানা আলাদা করে রাখে! আমার নিজের চিন্তার জগতেই যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে! একটা একটা করে রক্ষণশীলতা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসছি প্রতিদিন, প্রতিমূহুর্তে।

    নিজের ভালোলাগার টুকটাক গল্প, মনের দরজা খুলে সেখানে খোলা বাতাসের মাঝে-মধ্যে ঝাপটা- লেখাটাকে বেশ পরিণত করেছে। গঠনটাও ভালো লাগলো...... হুম লেখাটার খারাপ লাগলো কী? কিচ্ছু না, কোনো কিছুই না। লিখতে থাকো। মনের দুয়ার খুলে দাও।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      আপনার উতসাহব্যঞ্জক সুন্দর মন্তব্যটির জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

      এই শতাব্দীতেই বিশ্বটা একদেশ হয়ে যাবে নিশ্চিত।

      আশা করি সত্যিই যাতে তা হয়। কতো কারণে আমরা বন্দি হয়ে যাই। প্রতিটি মানুষের প্রোডাকটিভ হওয়ার সুযোগ থাকলে এই মানুষ, এই সভ্যতা আরো অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতো।
      প্রাকৃতিক বেরিতা না হয় অতিক্রম করা অতো সহজ নয় - কিন্তু মানুষের সৃষ্ট বাঁধা তো দূর করা যেতে পারে।
      আবারো অনেক ধন্যবাদ আপনার সুন্দর সুন্দর বিশেষনগুলোর জন্য।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।