ডেডবডি (পর্ব-১)

# এই লেখাটি বাংলাদেশ হতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণকারী সকল “ব্লু হেলমেটধারী”দের জন্য উৎসর্গকৃত যাঁরা শান্তির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের ঝুঁকি নিয়ে জাতিসংঘের পক্ষে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন।

    ১২ মে, ২০……

১। প্রতিবারের মতনই প্লেনটা টেক-অফ করার সময়ে তলপেটে একটা কেমন অস্বস্তিবোধ হতে লাগলো। তবে, মিশনের উদ্দেশ্যে সাউথ সুদান-এ যাচ্ছি বলে আমার মাঝে কোন আতংক কাজ করছে না। এর মূল কারণ হতে পারে…এটা আমার দ্বিতীয় মিশন। এছাড়া অন্যতম আরেকটি কারণ হচ্ছে…আমার সাথে আমার এয়ারফোর্সের কোর্সমেট উইং কমান্ডার মুকিত রয়েছে। উইং কমান্ডার মুকিত প্রায় তিন বছরেরও বেশী সময় ধরে মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্র্যাফ্‌ট-এর ইন্সট্রাকটর হিসাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে সেকেন্ডমেন্ট-এ ছিলো। কাজেই, আমাদের দুজনেরই একসাথে অনেক হাসি-ঠাট্টা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা মিশে আছে!! আমরা তো প্রায়শঃই ওর নামের শেষে আমাদের নৌবাহিনীর অফিসারদের মত “বিএন” (যা কিনা বাংলাদেশ নেভী-র সংক্ষিপ্ত রূপ) লাগিয়ে ওকে “উইং কমান্ডার মুকিত (বিএন)” বলে ডাকি!!

২। আমার ফুরফুরে মেজাজের আরেকটি কারণ হলো…এই সাউথ সুদানে বাংলাদেশ ফোর্স মেরিন ইউনিট বা “ব্যানএফএমইউ” নামে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি কন্টিনজেন্ট রয়েছে, যেখান থেকে অন্য কিছু না হোক…অন্ততঃ মানসিক জোর পাওয়া যাবে। তাছাড়া, এই কন্টিনজেন্টের প্রায় সব মুখই আমার পরিচিত…অনেকের সাথেই আমার চাকুরী আছে!! আমার হাতে…আমার জাহাজ থেকে কমিশন পাওয়া, আমার সাথে ফ্রিগেট (বড় যুদ্ধজাহাজ)-এ একসাথে চাকুরী করা…একসাথে লেবাননে মিশন করা…ইত্যাদি পরিচিতজন ছাড়াও আমার কোর্সমেট কমান্ডার মঞ্জুর আছে এখানে… চিফ লজিস্টিকস্‌ অফিসার হিসাবে। উপরন্তূ, কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বরত ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন স্যার কিংবা টুআইসি কমান্ডার কামীল স্যার আমাকে খুব ভাল করেই চেনেন। কাজেই, ইনশাআল্লাহ্‌, এখান থেকে আমি সর্বোচ্চ সাপোর্টই পাবো!!

৩। ব্যানএফএমইউ এর বর্তমান সদস্যরা অবশ্য এই বছরের জুলাই মাসেই মিশন শেষ করে দেশে ফিরে যাবে। পরের গ্রুপকে তো নেভাল বেইজ “বিএনএস ঈসা খান”-এ প্রস্তুতিরত অবস্থায় দেখেই আসলাম! সিনিয়র হওয়ার এই এক সুবিধা…সবখানেই অনেক পরিচিত মুখ থাকে। এই যেমন, ব্যানএফএমইউ-এর পরের গ্রুপেও আমার কোর্সমেটসহ কমপক্ষে ছয়/ সাতজন পরিচিত অফিসার আসছে!! কাজেই, আগামী এক বছর সাউথ সুদানে থাকতে আমার ইনশাআল্লাহ্‌ তেমন কোন সমস্যাই হবে না!!

    ১৩-১৭ মে, ২০……

৪। এন্তেবে, উগান্ডায় নেমে মনটাই ভাল হয়ে গেল…ইউএন সদস্য শুনে কি চমৎকার…আন্তরিক ব্যবহার করলো এয়ারপোর্টের সবাই, কবে যে আমরা শিখবো!! আর্মির লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ফয়সালও আছে আমাদের সাথে…তিন বুইড়া ইনশাআল্লাহ্‌ সাউথ সুদান যাওয়ার আগে এন্তেবে/ উগান্ডাতে ভালোই মজা করতে পারবো মনে হচ্ছে!!

৫। এন্তেবে-র ইউএন লগ বেইজে ট্রেনিং করাচ্ছে আমাদের…এই বয়সে সকাল-সন্ধ্যা ট্রেনিং আর কাঁহাতক ভাল লাগে!! সাউথ সুদান গেলেই মনে হয় ঝামেলা থেকে বাঁচি। অবশ্য ওখানে গেলে…ঝামেলাও আছে। আমাকে কোথায় যে পাঠিয়ে দেয়… কোন ঠিক ঠিকানা নাই!! আমার আগে নৌবাহিনীর যে অফিসার ছিল…ওকে তো রাজধানী “জুবা” থেকে প্রায় হাজার মাইল দূরে… “রেঙ্ক”-এ পাঠিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য এখন না কি জুবা-তে এমএলও (মিলিটারি লিয়াঁজো অফিসার)-দের সংখ্যা কম আছে…দেখা যাক্‌, আল্লাহ্‌ ভরসা!!

৬। প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন না করলে…বুড়ি-র (আমার বউকে আমি এই নামেই ডাকি) সাথে কথা না বললে মনে হয়… কি যেন করা হয়নি!! এমন না যে…বউটাকেই আমি সবচেয়ে বেশী ভালবাসি…তারপরেও, কথা না হলে…কিঞ্চিৎ ঝগড়া না করলে ভাল লাগে না। আর, ছেলেটা …বা মেয়েটার সাথে গল্প না হলে তো মনে হয় আমার খাবারই হজম হয় না!! অবশ্য, মনটাকে শক্ত করেছি…করছি…। একইসাথে ফ্যামিলির সবাইকেই জানিয়ে রাখছি…সাউথ সুদানে গেলেই যোগাযোগ অনিয়মিত হয়ে যাবে এবং প্রায় বন্ধই হয়ে যাবে। কারণ, ওখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক এখন পর্যন্ত খুবই দূর্বল এবং ওই দেশের সকল প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো মোবাইল সুবিধা পৌঁছায়নি। কাজেই, আমার মনে হয়…এখন থেকেই কম কথা বলা অভ্যাস করতে হবে!!

৭। আল্লাহ্‌র অশেষ রহমত…অবশেষে সাউথ সুদানের ভিসা পেয়েছি। অন্য এমএলও/স্টাফ অফিসারদের সবাইকে নাকি অনেকদিন ঘুরিয়ে…তারপরে ভিসা দিয়েছে…আর আমরা এতো অল্প সময়েই পেয়ে গেলাম!! মুকিত তো পুরা বাকুম বাকুম করছে…!!! আমার অবশ্য একটু মন খারাপ…ওখানে গিয়ে কবে মোবাইল সীম নিবো…দেশে কিভাবে যোগাযোগ করবো…ঠিকমতন কথা বলতে পারবো কি না…ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। যাউক গা, কাউন্টডাউন তো শুরু হবে!! মাত্র তো তিনশত পঁয়ষট্টি/সত্তর দিন, দেখতে দেখতে কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ্‌। তাছাড়া, এবার তো আর কন্টিনজেন্ট মিশন না…চান্স পেলেই ছুটিতে যাওয়া যাবে!! সব মিলিয়ে না কি কেউ কেউ চুরাশি দিনও ছুটি কাটিয়েছে!! হোয়াট দ্যা “****”!!

(চলমান)

## বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রয়াত লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোহাম্মদ আশরাফ সিদ্দিকী-এর স্মরণে যিনি সাউথ সুদানে মিলিটারী লিয়াঁজো অফিসার (এমএলও) হিসাবে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত থাকাকালীন পেট্রোলরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

### বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রয়াত লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোহাম্মদ আশরাফ সিদ্দিকী সাউথ সুদানে মিলিটারী লিয়াঁজো অফিসার (এমএলও) হিসাবে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত থাকাকালীন পেট্রোলরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার (২৭ জুন ২০১৮, সময়-আনুমানিক সকাল ১০৪৫ ঘটিকা) সময়ে লেখক সাউথ সুদানস্থঃ জুবায় “ব্যানএফএমইউ” কন্টিনজেন্ট-এর সদস্য হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

৬০৩ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।