শাপে বর

ডিসক্লেইমারঃ এটি কোন ধর্মীয় পোষ্ট না, আমাদের মত নিতান্তই সাধারন কিছু মানুষের মনস্তাত্বিক বিশ্লেষনের প্রচেষ্টা এবং আমার অযোগ্য দর্শনচিন্তাপ্রসূত লেখা।

মানুষ স্বভাবতই দূর্বলচিত্তের অধিকারী। আর এই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে যুগের পর যুগ আধুনিক পুজীবাদী উদ্যোক্তাশ্রেনীর বুদ্ধিমান মানুষগুলো নিজেদের জীবিকার সন্ধান খুজে নিতে চেয়েছে। ধর্মে যেহেতু ব্যাবসাকে জীবিকার প্রথমসারির হালাল পন্থা বলে রায় দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত বানিজ্য-শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকগুলোতে বিপননের পদ্ধতি হিসেবে বাইবেলের মত বাধাধরা কৌশলগুলোর মধ্যে বারবার ভোক্তার মনস্তাত্বিক চাহিদা বিশ্লেষন করে কার্যপন্থা গ্রহনের উপর আলোকপাত করা হয়েছে, তাই এই কৌশল অবলম্বন করে বোকা মানুষগুলোকে প্রভাবিত করার মধ্যে দোষের কিছু নাই। তাতে তাদের খুব বেশী ক্ষতির সম্ভাবনা নাই। বোকা মানুষের জন্মই হয় অন্যের দ্বারা নিজেদের জীবন প্রভাবিত আর পরিচালনা করার জন্য, এতে করে যদি পদে পদে কেউ ঠকে যান, বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তার দায়ভার অন্যকেউ বয়ে বেড়াতে পারে না।

আমি পাহাড়প্রেমী। এতোটাই পাহাড়ের প্রেমে মজে থাকি যে মাঝে একটা ছোটখাট গোছের আস্ত পাহাড় কিনে ফেলার মোটামোটি সবরকমের বন্দবস্ত করে ফেলেছিলাম। পাহাড়ী আঁকবাঁকের কারনেই কি না জানিনা, চট্টগ্রাম শহরটা আমার খুব বেশি ভালো লাগে। সুযোগ পেলেই হানা দেই ওই দেশে। কিছুদিন আগে এক্স ক্যাডেট পূনর্মিলনীর ডাকেও তাই ছুটে গিয়েছিলাম বন্দরনগরী আর বারো আউলিউয়ার পূন্যভূমি চাটগায়।

অনুষ্ঠান ছিল শুক্রবার সন্ধায়, তাই সারাদিন হাতে পাওয়া কিছুটা সময় মেয়ে আর সফরসঙী খালাতো ভাই-বোনদের নিয়ে ভাবলাম কোথাও বেরিয়ে আসি। প্রতিবার সমুদ্র, ফকক, বিএমএ, গল্ফক্লাব, বিএনএ দেখতে দেখতে সবাই কিছুটা ক্লান্ত, তাই ঠিক হল এবার আমরা বায়জিদ বোস্তামীর মাজার দেখতে যাব। এমনিতেই রেলগাড়িতে এই বিলাতফেরত খালাতো ভাই-বোন এবং ইংরেজী মিডিয়ামে পড়া কন্যাকে মাজারের কথিত শাপপ্রাপ্ত জ্বিন, যাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের শাস্তিস্বরূপ কচ্ছপে পরিনত করার রূপকথার কাহিনী শোনানোর কারণে তারা অতিআগ্রহী ছিল, তার উপর যখন ওদের সামনে সেখানে ঘুরে আসার প্রস্তাব উত্থাপন করা হল, একবাক্যে রাজী হয়ে গেল সবাই।

মাজারের গলির শুরুতেই আতর, তসবীহ, আগরবাতি, ধর্মীয় চটি বই এর পসরা সাজিয়ে বসেছে হকাররা। দর্শনার্থীদের চোখ-মুখ ভর্তি উদ্বেগ, আশা, উতকন্ঠা। আমারও মনটা কেমন যেন হঠাত করেই শরতের মেঘের মত নরম হয়ে গেল ক্ষনিকেই। সকল ক্ষমতার উৎস সৃষ্টিকর্তার কাছে আর্জি পেশ করার জন্য কাতারে কাতারে মানুষ ছুটে এসেছে, যেন এখানে এসে প্রথানুযায়ী দুই রাকাত নফল নামাজ আর কচ্ছপকে কলা, মাংস খাইয়ে খুশী করাতে পারলেই মনস্কামনা পূরণ হয়ে যাবে। অবাক লাগল দেখতে কি প্রচন্ড ভক্তিভরে বিশ্বাসী মানুষগুলো কচ্ছপগুলোকে খাবার খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করে একটু ফাকফোকড় বের করে পুকুরের বাধানো সিড়িতে এসে ভীড় জমাচ্ছে। মাজারপ্রাঙ্গনেই ব্যাবসা পেতে বসেছে একদল, কচ্ছপকে খাওয়ানোর জন্য কলা, মাংস, শশা প্যাকেটপ্রতি ২৫ টাকায় বিক্রির ফন্দী এটে। আর যাদের সেটা ক্রয় করাও সামর্থের বাইরে তারা অন্যের ফেলে দেওয়া বা পরে যাওয়া খাবার তুলে নিয়ে খাওয়াচ্ছে কচ্ছপগুলোকে। কিন্তু তাদের মুখে কিরকম যেন অস্বস্তি, কিছুটা ভীতি আর দ্বিধা, অন্যের টাকায় কেনা খাবার খাওয়ালে মনের বাসনা পূরণ হবে তো?

বেশ কিছুক্ষন ধরেই লক্ষ্য করছিলাম মানুষগুলোকে আর বুঝার চেষ্টা করছিলাম তাদের মানসিক অবস্থা। হঠাত মনে হল, মহামতি এই কচ্ছপগুলোকে একবার হলেও দেখে আসা উচিৎ। সামনে এগিয়ে গেলাম। এক ভদ্রলোক তার ৩/৪ বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে সুপারম্যানের ফ্লাইয়িং স্টাইলে কোলে তুলে ধরল, শিশুটিকে বলা হল, হাত দিয়ে “ইনাদের” স্পর্ষ করতে। শিশুটি কান্না জুড়ে দিল, ভয়ে। কিছুতেই সে স্পর্ষ করবে না। এই দেখে তার মা তাকে পিটাতে আরম্ভ করে দিল, “ইনাদের তুই রাগায় দিস না, শেষ হয়ে যাবি।” শিশুটি “শেষ হয়ে যাবি” দিয়ে কি বুঝল জানি না, পাশে থাকা কে যেন বলে উঠল, “ইনারা সবার দেওয়া খাবার খান না, যাদের মনের ইচ্ছা পূরন হবে, তারটাই খান।” দেখলাম “ইনাদের” মধ্যে দুচারজন এদিক ওদিক সাতরে বেড়াচ্ছেন নবাবী চলনে। ভক্ত বিশ্বাসীদের আহাজারী আর কাতরতা নিয়ে এগিয়ে দেওয়া খাবারের প্রতি তাদের খুব একটা ভ্রূক্ষেপ নাই। পাশে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, “ইনারা কি সারাদিনই খাওয়াদাওয়ার উপরে থাকেন?” আমার দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে বল, “ইনাদের যখন ইচ্ছা হয় তখন খাবার খায়, আপনে খাওয়াইতে না চাইলে রাস্তা দেন।” অগত্যা আমিও কুড়িয়ে পাওয়া খাবারের টুকরা তুলে নিলাম হাতে দেখি “ইনাদের”কে খাইয়ে নিজের কিছু পাপ-মোচন করা যায় কি না! “ইনারা” আমাকে পাত্তাই দিলেন না।

কি আর করা, মনে কষ্ট নিয়ে এক পা পিছাতেই দেখি দুটি নেড়ি কুকুর অবহেলায় ভীড়ের মাঝেই ঘুড়ঘুড় করছে যদি কোন সহৃদয় মানুষের মনে মায়া দয়া জন্মে আর কপালে কিছু উচ্ছিষ্ঠ খাবার জোটে এই আশায়! আমার হঠাত কেন যেন ভীষন মায়া হল এই নির্বাক জন্তুটার উপর। কচ্ছপের মুখে না তোলা খাবার এগিয়ে দিতেই হাড্ডিসাড় কুকুরদুটো আমারর পায়ের কাছে বসে পড়ল। হাজার টাকার বিদেশী ব্রিডের নরম তুলতুলে হোক না কেন, কুকুর জাতিটার প্রতি কখনোই কোন লুতুপুতু আকর্ষন বোধ করি নাই, কিন্তু একসময় নিজের পোষ মেনে নিয়েছিল ছোটখাট শান্ত স্বভাবের এক কুকুর। খুবই মায়া পড়ে গেছে সেই থেকে এই বিশ্বস্ত প্রানীটির উপর। মনে আছে যেদিন আদর করে ডাকা “ডোলা” নামের আমার সেই পোষ্যটিকে কেউ চুরি করে নিয়ে গেল, খুব কেঁদেছিলাম। সেই টানেই কিনা জানিনা, মাজার প্রাঙ্গনের অসহায় হাড্ডিসার কুকুর দুটি যখন আমার পায়ের কাছে এসে উচ্ছিষ্ঠ খাবার মুখে তুলে নিল, ভীষন মায়া হল। ভক্ত দর্শনার্থীদের রক্তচক্ষুর তেজ সহ্য করার ধৃষ্টতা না দেখিয়ে তাড়াতাড়ি স্থান ত্যাগ করলাম।

বাসায় ফেরার পথে একটা বোধ আমাকে খুব নাড়া দিল। বায়জীদ বোস্তামী যদি দুষ্টু জ্বিঙ্গুলোকে কচ্ছপ না বানিয়ে কুকুর বানিয়ে দিতেন, তাহলে এত আদর, আহ্লাদ সবকিছু এই কুকুরগুলোর ভাগ্যেই জুটত! সৃষ্টিকর্তার নিজহাতে গড়া মানুষের জন্য নিবেদিত এই প্রানীকে অবহেলা করে কি সুন্দর সবাই আমরা শাপ-প্রাপ্ত এই কচ্ছপদের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেছি। তবে এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি দুইটা শিক্ষাগ্রহন করলাম।
এক) বাস্তব বা কাল্পনিক কাহিনীভিত্তিকই হোক, আর ধর্ম নিয়ে যতই ব্যাবসা-পাতি চলুক বা অন্ধবিশ্বাসের টানেই হোক, কিছুটা সময়ের জন্য হলেও মানুষের মনে নির্বাক নিরীহ প্রানীকূলের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়।
দুই) কখনও কখনও সত্যিই শাপে বর হয় বটে!

ক্ষতি কি!

১,৪৪২ বার দেখা হয়েছে

১০ টি মন্তব্য : “শাপে বর”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    চট্টগ্রাম নিয়ে কাহিনী -- পড়তেই হবে। চাটগাঁইয়া ফোয়া বলে কথা।
    খাওয়াইতে খাওয়াইতে কচ্ছপগুলোর বারোটা বাজাচ্ছে -- মানুষ নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার করার ঈশ্বরের জীবের দফারফা করে সেই ঈশ্বরের কৃপা কি করে পাবে বুঝতে পারিনা। মাইনষের কমন সেন্স হয় মাথা ফুঁড়ে উড়ে গেছে নয় পা বেয়ে নেমে গেছে । আবার বাচ্চাকে পিটিয়ে বাধ্য করছে এ আচরণে অভ্যস্ত হতে!

    তোমার লেখাটি তাই ক্লাসিক। অভুক্ত কুকুরের প্রতি মনোযোগ নিয়ে গিয়ে পুরো মাজার ব্যাবসাকেই সপাটে চড় মেরে দিয়েছ।

    জবাব দিন
  2. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    এইগুলি একটি ক্রিটিকালি এনডেঞ্জারড প্রজাতির কচ্ছপ।
    মজার ব্যাপার হলো, আমরা যখন ধর্মিয় অনুভুতির কারনে এদের অস্তিত্বকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছি তখন ভারতে ধর্মিয় অনুভুতিকে পুজি করে এগুলোকে রক্ষার একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
    সেখানে একটি এনজিও এইরকম দশ ধরনের এনডেঞ্জারড প্রজাতির কচ্ছপ বিভিন্ন ধর্মিয় উপাসনালয়ের পুকুরে ছেড়ে দিয়ে একসেট "ডুজ এন্ড ডোন্টস" সহ সেগুলার পরিচর্যা করাচ্ছে।
    "মন্দিরের কচ্ছপ" বলে তাঁদের প্রতিপালনে ফান্ড ও স্বেচ্ছাসেবীর অভাব হচ্ছে না।
    আবার ঐ "ডুজ এন্ড ডোন্টস"-গুলো আছে বলেই কোন ঝুঁকি তৈরী হচ্ছে না।
    এটাকেও একধরনের "কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার" সাথে তুলনা করা যায়।
    তাই না?


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  3. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    ছবিগুলো এড করে দেয়ায় বেশ লাগছে।
    পিছনে অভুক্ত কুকুর, সামনে কচ্ছপদের জন্য খাবারের ঢল।
    ধর্ম বড়ই অদ্ভুত।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  4. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    খুব ভালো একটা বিষয় নিয়ে লিখেছো। লেখাও ভালো হয়েছে, বিশেষ করে ছবিগুলো জুড়ে দেওয়ায়।

    সিসিবি'তে আর একটু নিয়মিত হলে আরো ভালো হতো 🙂


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।