অনেকদিন যাবৎ মিশনে ক্লোসড হয়ে আছি। সেই জুলাই মাসের ১ তারিখ চলে যাচ্ছি যাচ্ছি শুনতে শুনতে আজ ৬ সেপ্টেম্বর। সবার মধ্যে কেমন যেন অনিশ্চয়তা, ক্লান্তি আর বিরক্তির আভা। আবার মালীর (দেশের নাম) প্রথম মিশনের সদস্য হবার দরুন গর্বের গভীরে রয়েছে হতাশা। কষ্ট আর তাং বেশি, অন্য কোন মিশনে গেলে ত আর অন্তত তাবুতে থাকতে হত না। অনেক অফিসার এমনকি সৈনিক ও এই মিশন থেকে নাম ড্রপ করাতে ইচ্ছুক।
১
পূবের মানুষ যখন পশ্চিমে এমনিতেই একটি সিরিজ লেখা। তবে আজকের পর্বটি গত পর্বের ধারাবাহিকতা। গল্প একবার শুরু করলে শেষ হতে চায় না। লেখা শুরু করবার আগে আমি নিজেও জানি না যে আমার মধ্যে এতো গল্প জমে আছে। কেন আছে এর পেছনের কারণটি খুঁজে পেতে লক্ষ্য করলাম এই জীবন আমাকে অনেক রকম বৈচিত্র্যের মধ্যে দিয়ে ভ্রমণ করিয়েছে। জ্ঞান হবার পর থেকেই নানান রকম মানুষ আর ঘটনা এবং দুর্ঘটনা দেখে চলছি।
বি এম এ তে জয়েন করার আগে টানা এক মাস হাসপাতালে ছিলাম । নভেম্বর ২০০৬ এর শেষ দিকে জ্বর আসল । পাত্তা দিলাম না । ভাবলাম, ধুর… এই জ্বর কত্তো হইছে । এর জন্য ওষুধ !
এইভাবে এক সপ্তাহ কাটল । তারপর দেখি আমি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় । শুধু মনে আছে আমি চোখ বন্ধ করলেও সব দেখতে পারতাম !!
এই দুনিয়ায় যত জাতি আছে, তন্মধ্যে ক্যাডেট জাতি সর্বাপেক্ষা নিষ্পাপ (হাসেন কেন? ঠিকই তো বললাম)। তবে, সব কিছুরই কিন্ত আছে। কিন্ত থাকবে না কেন বলুন, চাঁদ ও সূর্যের গায়ে যদি কলঙ্ক থাকতে পারে, তবে ক্যাডেটের চরিত্রে দুই-একটা কিন্ত থাকলে কোন সমস্যা নেই। যা বলছিলাম, এই নিষ্পাপ একঘেয়ে জীবনে অফুরন্ত আনন্দ নিয়ে আসে কিছু নিয়ম বহির্ভূত কর্ম। বলা নিষ্প্রয়োজন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো কারোর না কারোর বিরক্তির কারণ হত।
কলেজের অ্যানুয়াল এথলেটিক্স। কি পরিমান উত্তেজনা বিরাজ করে তা বোধহয় লিখে বলা যাবে না। তো ঐ সময়ের একটা ঘটনা প্রায়ই মনে উকি দেয়। ২০০০ সাল, আমরা তখন ইন্টারমিডিয়েট গ্রুপে। আমি খুবই উত্তেজিত, কারন অবশেষে একটা সময় আসছে যেখানে বেশ ভাল একটা ঝলক দেখানো যাবে। কিন্তু বিপত্তি ছিল শামসকে নিয়ে। ওকে হারিয়ে একা একা বেস্ট এথলেট হবার কোন পথই নাই। তো, অগত্তা সমঝোতা। আমাদের ইভেন্ট আলাদা করে নিলাম।
১
এইমাত্র ক্লাস শুরু হল। যিনি ক্লাস নেবেন, তাঁর চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা। দেখতেই বোঝা যায়, বাবা-মার আদরের পড়ুয়া ছেলে। উসকো-খুসকো চুল, চুলের যত্ন নেয়ার সময়ই বা কোথায়। ক্লাসে ঢোকার পর নিজের পরিচয় দিলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি কোচিংয়ে ক্লাস নেবেন, বুয়েটে যে পড়েন তা সহজেই অনুমেয়। ডিপার্টমেন্টের নাম বলার পর ক্লাসের ভেতর একটা সম্মিলিত চাপা চিতকারের শব্দ শোনা গেল। ভাবী প্রকৌশলীদের চোখ উজ্জ্বল থেকে উজ্জলতর হয়ে উঠল।
অভিশপ্ত জীবন আমার। ঠিক করেছি লিখব না। অন্তত: আরও কয়েকটা মাস। ফোকাসটা একটা কাজে পারলে ভাল হয়। কিন্তু অনিদ্রা রোগটা এমন খ্যাপাটে হয়ে পড়ল যে আমি বুঝে গেলাম এবার সময় হয়েছে। লেখা ব্যাপারটা অনেকটা প্রসববেদনার মতো। পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া যায় না। সময় যখন হয় তখন তেড়ে-মেড়ে বেড়িয়ে আসে। হোক তা সুস্থ কিম্বা বিকলাঙ্গ; স্পষ্ট কিম্বা অস্পষ্ট; ভাল বা মন্দ – আমরা মনের আনন্দে অক্ষর দিয়ে সন্তান বানাই।
কলেজে যাবার পর সবার সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিভিন্ন দিক থেকে প্রস্ফুটিত হতে থাকে।
ক্লাস সেভেন এর শেষ দিকে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না।
আশেপাশের সবার প্রতিভা দেখে অবশেষে একটা কবিতা লিখে ফেল্লাম।
মেঘনা হাউসে ইশতিয়াক ভাই ছিল সেইরকম মারদাঙ্গা।
সবাইরে পাঙ্গাইয়া ফাত্তাফাই করে দিছে। স্বভাবতই তার উপর আমি নাখোশ।
মনের দুঃখ প্রকাশে হাতে কলম তুলে নিলাম।
জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ সবাই পায় না । এটা সত্যি যে কাছ থেকে দেখা সেই দৃশ্য অবশ্যই সুখকর কিংবা দৃষ্টিনন্দন কিছু না ।তবু সেই বিভৎস দৃশ্যগুলো কখনো কখনো যে শিক্ষা দিয়ে যায়, তা জীবনের চলার সিঁড়িকে ‘চলন্ত সিঁড়িতে’ রূপ দিতে পারে ।
লেখাটার নাম দিয়েছি ‘মিরপুর টু আজিমপুর : গাড়ি নং ৩৬’ ..অদ্ভুত এই নামের আবির্ভাব কতটা যুক্তিযুক্ত তা আপনাদের হাতেই ছেড়ে দিলাম ।
এই ভাইয়ের নাকি একটা বালতি ছিলো,রোজ গেমসের পরে লুঙ্গি পরে,হাতে বালতি নিয়ে পুরো হাউজ রাউন্ড দিতেন,আর জুনিয়ররা নাকি মসজিদের দান-বাক্সের মত সেইখানে কুপন ফেলত।এই ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ হয়নি,কিন্তু কালে কালে উনার খ্যাতি ডালপালা গজাতে গজাতে ছড়িয়ে পড়েছে সবগুলো ব্যাচের মধ্যে।
পরের কাহিনীও একজন সিনিয়র ভাইকে নিয়ে,কাহিনীর সত্যতা মোটামুটি ভেরিফাইডঃ
পিসিসি’র একটা ঐতিহ্য আছে,এখানে কোন ব্যাচ দ্বাদশ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে যারা টেবিল লীডার হতে যাচ্ছে,তারা স্বচ্ছ ও নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক হাউজ প্রিফেক্টের তত্ত্বাবধানে নিলামের মাধ্যমে তার টেবিলে কোন কোন জুনিয়র বসবে,তা ঠিক করে নেয়।জমাকৃত সকল অর্থ দিয়ে পরবর্তীতে ব্যাচের পক্ষ থেকে হাউজকে উপহার কিনে দেওয়া হয়।সুন্দর ট্রেডিশান।তো আমাদের কাহিনীর নায়ক ভাইয়া,দ্বাদশ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে পিতার কাছে টাকা চাহিয়া পত্র লিখলেন,”বাবা,ক্লাস টুয়েল্ভকে টেবিল কিনতে হয়,তাই বেশি করে টাকা পাঠায়ে দিয়ো।”উনার পিতা অতশত বুঝিতেন না,উনি পত্রের উত্তর পাঠালেন,
উনার মত চাপাবাজ লোক আমি জীবনে খুব কমই দেখেছি,তার কয়েকটা নমুনাঃ
চাপা ১-“জানো,ক্যাডেট কলেজ হওয়ার আগে এইখানে বিশাল জঙ্গল ছিলো।বাঘ,সিংহ,ডাইনোসর,আরো অনেক কিছু ছিলো এইখানে।ধরে ধরে নিয়ে আফ্রিকায় ছেড়ে দিয়ে আসত এলাকার লোকজন।”
চাপা ২-মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বাবার কপালে গুলি করেছিলো পাকিস্তানিরা,উনি টের পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলেছিলেন,তাই ভিতরে না ঢুকে চামড়ার পাশ দিয়ে চলে গেছে।ওই জায়গায় এখন আর চুল গজায় না।আরেকটা গুলি খেয়েছিলেন পেটে।ডাক্তার অপারেশান করেও বের করতে পারেনি,পরে পায়খানার সাথে বের হয়ে গিয়েছিলো।