একটি মাথামুণ্ডুবিহীন স্বপ্নভঙ্গের গল্প


এইমাত্র ক্লাস শুরু হল। যিনি ক্লাস নেবেন, তাঁর চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা। দেখতেই বোঝা যায়, বাবা-মার আদরের পড়ুয়া ছেলে। উসকো-খুসকো চুল, চুলের যত্ন নেয়ার সময়ই বা কোথায়। ক্লাসে ঢোকার পর নিজের পরিচয় দিলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি কোচিংয়ে ক্লাস নেবেন, বুয়েটে যে পড়েন তা সহজেই অনুমেয়। ডিপার্টমেন্টের নাম বলার পর ক্লাসের ভেতর একটা সম্মিলিত চাপা চিতকারের শব্দ শোনা গেল। ভাবী প্রকৌশলীদের চোখ উজ্জ্বল থেকে উজ্জলতর হয়ে উঠল। রফিকের এসব কিছুই ভাল লাগছে না। এইচ এস সির পর আরো অনেকেরই মত ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সেও ঢাকায় এসেছে। বাবা-মায়ের ইচ্ছায় সে ভর্তি হল ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি কোচিংয়ে। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতি তার কখনই তেমন আগ্রহ ছিল না। সে ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন দেখত অনেক বড় একজন বিজ্ঞানী হওয়ার। ভাবত, একদিন সেও আইনস্টাইন বা গ্যালিলিওর মত বিজ্ঞানী হবে, আবিষ্কারের নেশায় গবেষণা করে যাবে দিনভর। একদিন বাবাকে সে তার স্বপ্নের কথা জানায়। সে তার বাবাকে বলে, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্বীয় বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চায়। উত্তরে বাবা অনেক কিছু বললেন যার মর্মার্থ হল, গরিবদের এত বিলাসিতা মানায় না, সংসারের বড় ছেলে হিসেবে যত দ্রুত সম্ভব প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার দায়ভার নিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এসবের পর তার আর কিছু বলার থাকে না। সে শুধু জানে, তার স্বপ্ন পূরণ হবার নয়। এবং এটাই তাকে সবচেয়ে বেশী ভোগায়।

তার একটি ঘটনা মনে পরে যায়। এস এস সি পরীক্ষার আগে একদিন সন্ধ্যায় সে হাউজে বসে পড়ছিল। হঠাত হাউসে এডজুট্যান্ট স্যার এলেন। ওর পাশ দিয়ে যাবার সময় কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন। ওর খাতাটা উল্টেপাল্টে দেখলেন। যাবার সময় জিজ্ঞেস করলেন, “বড় হয়ে বিজ্ঞানী হতে চাও?” সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর উত্তর দিল, “জী স্যার”। আশ্চর্য! ওর খাতায় তো তেমন কিছু লেখা ছিল না। ও তো কাউকে বলেও নি। স্যার কিভাবে বুঝলেন সেটা সে অনেক ভেবেও বের করতে পারে নি। সে এগুলো ভাবে আর হাসে। ক্লাসে কিছুতেই মন বসাতে পারে না।

এইচ এস সির ফলাফল বের হয়েছে। রফিক যে ভয় করছিল, সেটাই হল। বাংলায় এ প্লাস না পাওয়ায় গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া হল না। পরীক্ষা যে খারাপ হয়েছে তাও না। এদিকে তার তিন দিন ধরে খুব জ্বর। পরীক্ষায় জন্ডিস ধরা পরল। এ অবস্থায় ঢাকায় থাকা অসম্ভব। তাই বাড়ি ফিরে গেল। বাড়িতে যাবার পর বুঝল, ওখানে না গেলেই বোধহয় ভাল ছিল। বাবা সারাদিন মুখ গোমড়া করে বসে থাকে, মায়ের চেহারার দিকে তাকানোই যায় না। কেউ ঠিক করে তার সাথে কথাও বলে না। একদিকে অপ্রত্যাশিত ফলাফল, আরেকদিকে অসুস্থতা তার জীবন দুর্বিষহ করে তুলল। কোন রকমে কয়েকটা দিন পার করে আবার ঢাকায় পাড়ি দিল।

রূপকথার গল্পের মত হয় না রফিকের জীবন। ভর্তি পরীক্ষার পর সে বাড়ি ফিরে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরও বাবা-মায়ের ইচ্ছায় ভর্তি হয় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। ছেলেকে প্রকৌশলী কারখানায় ভর্তি করিয়ে বাবা-মাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। রফিকও ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে নেয়। কিন্ত পুরনো স্বপ্নটা এখনো মাঝে মাঝে খুব জ্বালাতন করে। রফিক ভাবে, জীবনটা বোধহয় আরো সুন্দর হতে পারত।

শেষ পর্যন্ত গল্প লিখতে প্রবৃত্ত হলাম। অখাদ্য না হওয়াটাই অস্বাভাবিক।

১,০৮৪ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “একটি মাথামুণ্ডুবিহীন স্বপ্নভঙ্গের গল্প”

  1. সামিউল(২০০৪-১০)

    অখাদ্য হইছে বলছে কেডা??? অনেক সুন্দর হইছে।

    তবে আমার মনে হয়, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও বিজ্ঞানী হওয়া যায়। পুরোটাই নিজের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।