প্রত্যয়ঃ একটি পত্রিকার জন্ম মৃত্যুর গল্প

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য বেকারের খাতায় নাম লিখিয়েছি। স্বগোত্রিয় আরও কয়েকজনের সমবায় সমিতিতে শুরু হল পন্ডিতি। বিকাল বেলা লোকমানপুর স্কুল মাঠে  কখনও ক্রিকেট আবার কখনও বাদাম টুয়েন্টি নাইনে বুদ্ধিজীবির ভূমিকা। মাস্টারী করি তাই ছা পোষাদের সাথেও মেলা মেশা শুরু।এমন একজন ছিলেন দলিল চাচা।পেশায় হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। মাদার টিংচার থেকে বিভিন্ন মাত্রার ওষুধ তৈরী বেশ ভাল একটা বিনোদন। শিশিটাকে উঁচু করে দ্রুত হাত নামিয়ে আস্তে করে অন্য হাতে ঠেকান। মাঝে মাঝেই মজা করে বলতাম- চাচা, ঐ ওষুধ বানানো ঝাঁকিটা দেখানো যাবে ? কখনো নিরাশ করেননি। চাচা কবিতা লিখতেন।কাকলাসের রাজত্বকালে পুলিশ বিষয়ক একটা কবিতা লিখে বেশ ঝাড়ি খেয়েছিলেন। কবিতাটার কিছু অংশ- পুলিশ মানে ফুলিস,খায় শুধু ঘুস…।যাই হোক, সেই চারন কবি দলিল চাচা একদিন বল্লেন বিজয় দিবস উপলক্ষে একটা পত্রিকা বের করলে কেমন হয়। অতি উৎসাহী নবিউলের প্রস্তাব সাময়িক পত্রিকা নয় মাসিক পত্রিকা বের করতে হবে।ব্যাস শুরু হয়ে গেল কাজ।পন্ডিতি শুরু করলেও গা থেকে ছাত্র ছাত্র গন্ধ তখনও যায়নি।চনমনে ভাব নিয়ে একাধারে লেখক, সম্পাদক, প্রুফরিডার এমনকি  হকার হলাম। নামটি আমিই ঠিক করেছি।রাত জেগে স্বাধীনতার দলিল পত্র, সাধারণ জ্ঞানের বই , দৈনিক পত্রিকা ঘেঁটে নিজের আর্টিকেল লেখাসহ অন্যদের গুলোও (সাহিত্য বাদে) সম্পাদনা করতে হল। কম্পোজ এবং ছাপার দায়িত্ব দেয়া হল নাটোরের সিগমা কম্পিউটার্সকে।কম্পোজিটর বি-জামান।নাটোর পর্যন্ত গিয়ে কাজের অগ্রগতি দেখি। বিজয় দিবসেই পত্রিকা পাঠকের হাতে পৌছাতে হবে। একদিন তো বাড়ি থেকে সাইকেল চালিয়ে নাটোর চলে গেলাম।দলিল চাচা , নবিউল আর আমি।প্রায় ২০ কিমি দূরত্ব। কম্পোজ দেখতে দেখতে রাত হয়ে গেল।অন্ধকার রাত।কিভাবে এত রাস্তা সাইকেলে যাই। নাটোর রেল স্টেশনে গেলাম। ট্রেন নাই।হোটেলে গেলাম।সিট নাই।রাত ১২টায় একটা আন্তনগর ট্রেন আসলে দুই একটা রুম ফাঁকা হলেও হতে পারে।দলিল চাচা বিকালেই চলে গেছে। আমি আর নবিউল জ্ঞান গর্ভ আলোচনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুখ দুঃখ হাসি কান্নার গল্প , এক টিকিটে দুই সিনেমার গল্প ইত্যাদি করে সময় পার করছি।অবশেষে দুটি রুম পেলাম রাত ১২টায়। শীতের রাতে লেপের মধ্যে ঘুম দরকার। সেখানে বাদ সাধলো নবিউল। ভাই লেপের কভার পাল্টে দেয়নি।বিছানায় বড় চুল দেখছি! অগত্যা ঘিনঘিনে অনুভূতি নিয়ে রাত কাবার।ভোর বেলা ব্যাক টু হোম বাই সাইকেল।সম্ভবত ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৭, বি-জামান নবিউল এবং আমি সারারাত জেগে কম্পোজ এবং সম্পাদনা শেষ করি।প্রচ্ছদের জন্য সাবাস বাংলাদেশ-এর ছবি ঠিক করা হয় । এবিষয়টা আমি দেখে দিতে পারিনি।প্রচ্ছদে বিজয়ের লাল রং ।ট্রেসিং পেপারে পাতা গুলো প্রিন্ট করে তা দিয়ে প্লেট তৈরী করা হয়। প্রেসের মেশিনে প্লেট লাগিয়ে কাগজে ছাপ দিয়ে হয় ছাপা।কারখানা থেকে নিজে প্লেট টেনে টাউনপ্রেসে নিয়ে গেছি। এসবের মধ্যে সিগমার মালিকের সাথে রাগারাগি হয়ে গেল। তাকে বল্লাম -আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম সিগমা না হয়ে ওমেগা হলে ভাল হত। উনি খুশি হয়ে আমাকে সেরা বেয়াদব আখ্যা দিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৭ই ডিসেম্বর মাসিক প্রত্যয় প্রকাশিত হয়। পাবলিক পত্রিকা ভালই পড়ে কিন্তু অন্যেরটা।তাই প্রত্যয়ের প্রথম সংখ্যাই শেষ সংখ্যা।

১,৫২৬ বার দেখা হয়েছে

১৯ টি মন্তব্য : “প্রত্যয়ঃ একটি পত্রিকার জন্ম মৃত্যুর গল্প”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    খুব ভালো লাগলো মোস্তাফিজ ভাই আপনার কাহিনী। এসব কাজে ভুতের বেগার খাটতে হয় -- চাওয়াপাওয়ার কোন হিসেব না রেখে দৌড়ানোর কিছু লোক থাকে বলেই সৃষ্টিশীলতা বেঁচে থাকে।
    সবগুলো লেখা পড়া হয়নি। তবে দুয়েকটা যা পড়লাম তাতে বানান ভুলের পরিমাণ বেশ কম। সেই আমলে কম্পিউটার কম্পোজ করে ছাপানো খুব ঝক্কির কাজ ছিলো।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।