ডাক্তারী পড়া হইলো না আর

(BCS-কর্তৃক ছ্যাঁকা খাইয়াও ব্যাকা না হওয়ায় জুনায়েদ কবীর ভাইকে উৎসর্গ করে এই লেখাটি। সমস্ত লেখা জুড়ে আপনাদের চোখে পড়বে আমার অতিরিক্ত বায়োলজি-প্রিয়তার নিদর্শন।)

ভার্সিটি লাইফের শেষ পরীক্ষা শেষ করিলাম। এখন আমি একজন প্রকৌশলী। ;)) জীবনের এই টার্নিং পয়েন্টে আসিয়া একখানা আফসোসের বিস্ফোরনঃ ডাক্তারী পড়া হইলো না আর। ;;)

মনে পড়ে, যেইদিন ১ম শ্রেনীতে ভর্তি হইতে যাইব। স্কুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইবো, বাবাও রেডি, এমন সময় আমার মেঝদা কহিলো, “অপু, তোমার স্যার যদি জিজ্ঞেস করেন, বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও, বলবা, “I wish I shall be a doctor”. সহাস্যবদনে মানিয়া লইলাম।
আমার পুরো মুঠো জুড়িয়া বাবার একখানা আঙ্গুল ধরিয়া আছি, নতুন স্কুলে ভর্তি হইবো, মনে বেশ কৌতুহল, বাবার সহিত পথ চলিতেছি আমি প্রায় দৌড়ে। অবশেষে পৌঁছিলাম স্কুলে, হেডমাস্টারের রুমে গেলেন বাবা আমাকে লইয়া… হেডমাস্টার আমাকে জিজ্ঞেস করিলেন, “বাবা, বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও”, তাঁকে অবাক করিয়া দিয়া আমি ইংরেজীতে জবাব দিলাম, “I wish I shall be a doctor”.
বেচারা এতোই খুশি হইলেন যে, তাঁহার আলমারি হইতে বের করিয়া দিলেন কাগজের তৈরি প্যান্ট-শার্ট (স্কুলের ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’
প্রতিযোগিতায় কাগজের তৈরি এই শার্ট বানাইয়া আনিয়াছিলো কেউ), বলিলেন, “তুমি যখন ডাক্তার হবা, এটা পরে চেম্বারে বসো”!

ঘটনাটা তেমন কিছুই নহে, তবে তাহা আমার ছোট্ট মনে ভীষন নাড়া দিলো। বড় হইয়া ডাক্তার হইবার দুর্বার বাসনায় ছাত্রজীবন শুরু করিলাম। যত উপরে উঠিতেছি, বায়োলজি আমার ততোই প্রিয় এক বিষয়ে পরিগণিত হইতেছে। ক্যাডেটে যাইবার পর… নাইনে উঠিতেই সায়েন্স পার্টির মাঝে ইডি-বায়োলজি দ্বন্দ্বযুদ্ধ, আমি বরাবরই বায়োলজির লড়াকু সৈনিক। :duel: ‘ডাইনিং হলের ত্রাস’ মাসুদ স্যারের ভক্ত আমি প্রাণীবিদ্যা পড়ান বলিয়া, গাজী আজমল আমার প্রিয় লেখক একই কারণে!
আমরা ছিলাম GPA পদ্ধতির ১ম ব্যাচ, নিয়মানুযায়ী optional বিষয়ের নাম্বার কাউন্ট হয়না বলিয়া বালকগণ বায়োলজি optional রাখিতো আর পড়িতোও কম। আমি ভাবিলাম, বায়োলজি কম পড়িলে আমার ডাক্তারীর আশা শেষ, তাই বায়োলজি রাখিলাম মেইন সাবজেক্ট! 😀
ইন্টার পাস করিয়া আসার পরপরই বাবা মারা গেলেন, পড়াশুনায় ভাটা পড়িলো, অথচ তাহা ছিলো সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সময়। যাইহোক, সাধের মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম, চান্স পাইলাম না। :(( ১২-১৩ বছরের স্বপ্ন মাত্র অল্প ক’দিনের অবহেলায় ভেঙ্গে খানখান।
প্রকৌশলবিদ্যা জিনিসটা খুবই বোরিং ছিল আমার নিকট, তাই বুয়েট+তদ্‌গোত্রীয় কোনো জায়গায় পরীক্ষাই দিলাম না, এমনকি ২-৩ ভার্সিটিতে পরীক্ষা দিলাম কেবল জীববিজ্ঞান অনুষদে। পরিশেষে পাকিস্তান সরকারের দয়ায় স্কলারশীপে আসিলাম পাকিস্তান, ‘নিজের হোটেলে’ খাইবার লোভে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াটাও মানিয়া লইলাম। :-B তাহা নয়তো চিটাগাং ভার্সিটিতে মাইক্রোবায়োলজি অথবা
জা’নগরে ফার্মাসী নিয়া পইরা থাকিতে হইতো। শুকরিয়া খোদার, একটা স্বনির্ভরতার পথ খুলিয়া দিলেন তিনি।

অতঃপর দেখিতে দেখিতে ৪ বছর বহিয়া গেল, এই ৪ বছরের ভাল-মন্দ গল্প পরে হইবে… প্রকৃত কথা হইলো, ডাক্তারী পড়া হইলো না… ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করিলাম। আজ ভাবি, আমি যখন বায়োলজি/মেডিক্যাল কল্পনায় ভবিষ্যতের স্বপ্নজাল বুনিতাম, উর্দ্ধে বসিয়া বসিয়া ‘আল্লামিয়া’ তখন মুচকি হাসিতেছেন, “আলম, আমি যা জানি, তুমি তা জাননা।” তুলনীয়ঃ

রথযাত্রা লোকারণ্য, মহা ধূমধাম
ভক্তেরা লুটায়ে পথে, করিছে প্রণাম
পথ ভাবে ‘আমি দেব’, রথ ভাবে ‘আমি’
মূর্তি ভাবে ‘আমি দেব’, হাসে অন্তর্যামী।

ব্যাচেলর স্টাডি খতম, এখন শুরু বেকারত্বের জীবন। (মাস্টার্স পড়ার ধৈর্য নাই, কোনরকমে একখানা চাকুরি ধরিতে পারিলে চির-আকাংখিত বিয়েটা সারিয়া ফেলা যাইত, এই ধান্দায় আছি। :gulti: ) আজ সার্চ মারিলাম ওয়ারিদে লোক লইবে কিনা দেখিবার জন্য, দেখি তাহাদের ৪ দেশের মধ্যে (বাংলাদেশ, কঙ্গো, পাকিস্তান, উগান্ডা) ৩খানাতেই “কর্মখালি নাই” (No vacancy) সাইনবোর্ড ঝুলানো, কেবল ১ দেশে (পাকিস্তানের) ২টা পদ খালি রহিয়াছে, পদের নামঃ Front desk officer!!
তাহা হইলে এত কষ্ট করিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়া লাভ কী হইলো? :bash: ডাক্তারী পড়িলেতো আজ গাছতলায় বসিয়াও পয়সা রুজি করা যাইতো! (আর বিবাহের সাধটাও পূরণ হইতো। 😉 ) হায়রে আমার ডাক্তারী, হায়রে আমার বায়োলজি। :chup:

২,২৮০ বার দেখা হয়েছে

৩১ টি মন্তব্য : “ডাক্তারী পড়া হইলো না আর”

  1. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    পুরা পোষ্টে নিজে প্রকৌশলী হইয়া নিজেরা পাংগা দেয়ার জন্য, এবং আমি নিজে একজন প্রকৌশলী হইয়া (ডাক্তারী খ্যাতা পুড়ি) নিজেদের এহেন বদনামের দেখে তোমার ভ্যান গাড়ি না চাইয়া থাকতে পারলাম না।

    মাসুদ স্যার আমাকেও খুব ভালা পাইতেন। তিনজন এস,এস, সি তে বিজ্ঞান ২য় পত্রে লেটার পেয়েছিল মাত্র, প্রশ্ন উলটা পালটা হবার কারনে। সুখের কথা, আমরা যে তিনজন বীরপুরুষ আমাদের ব্যাচে এই মহৎ কর্ম করেছি, তারা কেউও বায়োলজি নেইনি। কারন আমরা ডাক্তারীর খ্যাতা পুড়ি। 😀


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  2. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    প্রকৌশলের বিষেদাগার করা আর বায়োলজির স্তুতি করার জন্য তোমার ব্যাঞ্চাই।

    বায়োলজি আমার দুচোখের বিষ আর বিষ ছিলো কলেজের মাষ্টর গুলো।
    তাই নব্বই উর্ধ্ব নম্বর পাইয়াও আমি ইন্টারে বায়োলজিকে খারিজ করিয়া দিয়াছি। 😀 😀 😀

    জবাব দিন
  3. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    "‘ডাইনিং হলের ত্রাস’ মাসুদ স্যারের"- ইনি কি রাজশাহীর মাসুদ স্যার না কি 😕 ? সিসিআর-এও উনি ডাইনিং হলের 'কুতুব' ছিলেন 😉


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  4. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    আমি কিছুদিন মেডিক্যালে পড়ছিলাম... 🙁
    তারপর পোষায় নাই দেইখ্যা চাইড়া দিয়া ঢাকা ভার্সিটিতে গেছিলাম... B-)
    আমার জীবনের অন্যতম সেরা ডিসিশনগুলোর একটা সেটা... :-B


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।