প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা-৭ (শেষ পর্ব)

আগের পর্বগুলো –

পরদিন থেকে আমার চির পরিচিত দৈনন্দিন জীবন কেমন যেন পাল্টে যেতে শুরু করল। রাতে বিছানায় শুয়ে পড়ি তাড়াতাড়ি, সেই আগের সময়টাতেই। কিন্তু, চোখের পাতা দুটি যেন এক হতেই চায় না! জানালার পাশ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি আর ছাইপাশ চিন্তা করি। গভীর রাতে হয়ত ঘুমিয়ে পড়ি, সকালে আর তাড়াতাড়ি উঠতে পারিনা। ফলাফল- সকালের ক্লাসগুলো নিয়মিত মিস হতে থাকা। ঢুলুঢুলু চোখে দেরী করে ক্লাসে ঢুকি প্রতিদিন, পড়ায় মন বসাতে পারিনা কিছুতেই। মনের অস্থিরতা যেন আমার চেহারাতেও ছাপ ফেলতে থাকে। ল্যাবে একদিন স্বাতী আমাকে জিজ্ঞেস করেই বসে- তোমার কি কিছু হয়েছে? ওর তাকিয়ে বলি- নাহ্‌! কিছু হয়নি। মনের ভিতর থেকে আমার আরেকটা অংশ বলে উঠে- যা হবার হবে, সত্যি কথাটা বলে ফেল। কিন্তু, কি হয়েছে তা বলার সাহস যে এখনও হয়ে উঠেনি!

প্রতি বিকেলে আগের মতই আমরা লাইব্রেরী যেতে থাকি, কিন্তু আমি আগের মত মনযোগ দিতে পারিনা। স্বাতী যখন আমাকে বুঝায়, আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, উদাস মনে কি যে ভেবে বেড়াই! বোঝানো শেষ করে জিজ্ঞেস করে- বুঝেছ? আমি বোকার মত একটা হাসি দেই। ও চট্‌ করে বুঝে ফেলে যে আমি পড়া বুঝিনি। হয়ত আরো বুঝে ফেলে যে, আমার ভিতর অনেক চিন্তার ঝড় চলছে। আমি আরও মনযোগী হওয়ার চেষ্টা করি, আমাকে আবার পড়া বুঝিয়ে দেয়। একদিন সব শেষ করে স্বাতী ভার্সিটির বাসটাতে উঠে, অন্য কোথাও যাবে হয়তো। শেষ বিকেলের এই বিচ্ছেদটা হঠাৎ করেই আমার কাছে অসহনীয় মনে হতে থাকে, আমি ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। বাসটা যখন ছেড়ে দিল, ঠিক তখনই স্বাতী ব্যাপারটা খেয়াল করে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। বিস্ময়মাখা গভীর ঐ চোখ দুটিতে তখন আমি আমার সর্বনাশ দেখতে থাকলাম।

পরের দিন সকালে হন্তদন্ত হয়ে আবার ক্লাসরুমে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। দেখি ক্লাসের সব মেয়েরা শাড়ী পড়ে এসেছে আর আমার মত কয়েকটা ক্যাবলা ছাড়া অনেক ছেলের গায়েই পাঞ্জাবী। কি ব্যাপার চিন্তা করতে গিয়ে হঠাৎ করে স্বাতীর যেখানে বসে সেই দিকে তাকালাম। হালকা টিয়া সবুজ শাড়ি পড়া লাবন্যময়ী মেয়েটার দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার হৃৎস্পন্দন থেমে গেল। কয়েক পা এগিয়ে যখন আমার জায়গাটাতে বসি তখন ভালোলাগা আর বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি। এমনকি স্যার ক্লাসে এসে কি বলে গেলেন তাও শুনিনি। শুধু বুঝতে পারছিলাম আজই স্বাতীকে আমার মনের কথা জানাতে হবে। আজই, পরে আর কখনও নয়!

ক্লাসের ছেলেমেয়েরা নাকি ঠিক করে রেখেছে আজ সপ্তাহের শেষ দিনে সবাই পাঞ্জাবী আর শাড়ি পড়ে আসবে। তখন নিজের ভাবনার মধ্যে সারাক্ষণ ঢুকে থাকা আমার সেটা জানার উপায় ছিল না যে! জিন্স, টিশার্ট আর স্যান্ডেল পড়া নিজেকে বড় বেশী জীর্ণ মনে হচ্ছিল। দুপুরে সবাই মিলে নাকি একসাথে ক্যাফেতে খাবে আর তারপর সন্ধ্যায় অডিটরিয়ামে ফিল্ম শো দেখবে। আমি আর কি করব, ওদের সাথেই থাকলাম। স্বাতীকে চোখের আড়াল করতে ইচ্ছে করে না যে! বিকেলে সবাই একসাথে গল্পে মেতে উঠল আর আমি শুধু স্বাতীকে খেয়াল করে গেলাম। দেখলাম ও সবার হাসি-ঠাট্টার মাঝেও কিছুটা অন্যমনষ্ক। তবে কি বুঝেই গেল আজ আমি আমার মনের কথা তাকে বলব?

সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এল, কিছুক্ষনের মধ্যেই আকাশটাকে গোধুলী রঙ্গে রাঙ্গিয়ে দিয়ে সূর্য্টা চলে যাবে অচিন দেশে। সবাই অডিটোরিয়ামের দিকে চলে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে যাওয়া অডিটোরিয়ামের বাইরের জায়গাটাতে হালকা টিয়া সবুজ শাড়ী পড়া লাবন্যময়ী মেয়েটাকে দেখলাম চুপচাপ বসে আছে। আমি নিঃশব্দে ওর ডান পাশটাতে গিয়ে বসলাম। মাথা নিচু করে বসে থাকা স্বাতী মাথা ঘুড়িয়ে আমার দিকে তাকাল। আমি বললাম- স্বাতী, আমি কিছু বলতে চাই। সম্মতি জানিয়ে ও আবার মাথা নিচু করে ফেলল। আমি তোমাকে ভালবাসি- এই কথাটা ওকে বলতে পারলামই না! শুধু বললাম- আমরা কি বাকিটা জীবন একে অন্যের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হতে পারি? মুহূর্তের মধ্যেই ওর গালটাকে আরও রক্তিম হয়ে যেতে দেখি। বিশ্বজয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত আমি ওর আলতো করে বাড়িয়ে দেয়া হাতটাকে ধরে থাকি আমার সবটুকু ভালোবাসা নিয়ে।

(শেষ)

৬,৪৩০ বার দেখা হয়েছে

৮০ টি মন্তব্য : “প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা-৭ (শেষ পর্ব)”

  1. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    পুরো গল্পটাই দারুন লেগেছে। আর শেষটাও ভালো লাগল।

    :thumbup: :thumbup:

    বাস্তব প্রায়ই কষ্টে মোড়া হলেও স্বপ্নগুলো রঙ্গীন দেখতে ভালো লাগে।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  2. বন্য (৯৯-০৫)

    সাবাশ তানভীর ভাই..এ সিসিবি অবাক তাকিয়ে রয়..
    এরকম যার লেখার হাত,সে ক্যামনে ব্লগ না দিয়ে রয়!!!পঞ্চতারকা...

    আসলে ইমোর আধিক্য ছাড়া ভালোলাগাটা বোঝাইতে পারতেসিনা...
    :gulli2: :gulli2: :gulli2: :gulli2: :gulli2: :gulli2: :gulli2:
    :thumbup: :thumbup: :thumbup: :thumbup: :thumbup: :thumbup: :thumbup:
    :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:
    :clap: :clap: :clap: :clap: :clap: :clap: :clap:

    জবাব দিন
  3. পাভেল (১৯৯৩-৯৯)

    তানভীর এইটা তুমি কি করলা? এখন তো ক্লাসমেট একটু হাসি দিলেই পোলাপান সব প্রেমে পইড়া যাবে। আমারি জানি কেমন কেমন লাগতেছে 😡
    ভাগ্যিস ছুটি চলতেছে কোন ক্লাস নাই... নাইলে 😛

    জবাব দিন
  4. এহসান (৮৯-৯৫)

    কিছু লেখাতে কিছু না বলাই সবচে মানানসই মন্তব্য। কিন্তু চুপ থাকতে পারলাম না।
    (কপিরাইটঃ জিহাদ)

    লেখা ভাল্লাগসে “ঝাক্কাস”। :clap: গল্পটা আমার দারুন লাগছিল, এইটা আজকে বলতে পারলাম। 🙂

    জবাব দিন
  5. রাশেদ (৯৯-০৫)

    আমি আগেই বলছিলাম খালি লাইব্রেরী আর ল্যাব এ পরে থাকলে নায়ক(তানভীর ভাই 😉 ) এর কিছুই হবে না। দেখছেন প্রমাণ যেই মাত্র পড়াশুনার বাইরে বাহির হইল সেই মাত্র সফল 😀
    তানভীর ভাই গল্প ভাল লাগছে কিন্তু একটা সমস্যা হইছে এখন তো ক্লাসে মেয়েদের হাসি দেখলে মাথা পুরা আওলায়া যাইতে পারে 🙁


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  6. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    মধুরেণ সমাপয়েৎ :clap: :clap:

    আফসোস জীবনটা তোর গল্পের মতো হইলো না। 🙁

    নেক্সট গল্প কবে?


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  7. সামিয়া (৯৯-০৫)
    (শেষ)

    তানভীর ভাইয়ের প্রহর শেষে দেখলেই আমি প্রথমে নিচে আসি, এইবার লিখার শেষে

    (শেষ)

    দেখে হার্ট এটাক হয়ে যাচ্ছিল প্রায়, লিখা পরে একটা নিঃশ্বাস ফেললাম।
    এত সুন্দর। তানভীর ভাই আপনি কি দিয়ে ভাত খান?
    এই গল্প লিখার জন্য আপনাকে একটা আইসক্রীম দেয়া হলো। ;;)

    জবাব দিন
  8. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    মিষ্টি মধুর প্রেমের গল্পটা শেষ হয়ে গেলো! 🙁
    বেশ রোমান্টিক একটা আবেশ ছিলো 😡 এতোদিন। এখন আবার সেই কাঠখোট্টা সিসিবি :no:
    তানভীর লিখছিস সেরকম। আরেকটা প্রেমের কাহিনী শুরু করনা ভাই। এবার নাহয় মিষ্টি মধুর দাম্পত্যের একটা গল্প শুনি স্বাতী আর তানভীরের থুক্কু নায়কের 😡


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  9. শার্লী (১৯৯৯-২০০৫)

    অনেক অনেক দুঃখিত ভাই দেরি করে ফেলার জন্য। আমার অন্যতম প্রিয় একটা সিরিজ আমার অজ্ঞাতেই শেষ হয়ে গেল 🙁 ।

    যাই হোক অসাধারন সমাপ্তি। আপনি ভাই ভস।

    জবাব দিন
  10. রকিব (০১-০৭)

    মন খারাপ ছিলো না, কিন্তু আপনার ফোন পেয়ে মনটা অস্বাভাবিক রকমের ভালো হইয়ে গিয়েছে। থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু :hug:
    অফটপিকঃ এইরকম একটা দারুন সিরিজের জন্মদাতা কেন যে আর পোষ্ট দেন না, তা নিয়ে একটা বিচার সভার আয়োজন করা উচিৎ। :grr:


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।