ওস্তাদজীঃ বয়েজ ভার্সন

 
‘গার্লসের পোলাপাইন’ নাকি তাহাদের সর্বজনশ্রদ্ধেয় ড্রিল প্রশিক্ষকদের “ওস্তাদজী” বলিয়া ডাকিতেন। আমিতো হাসিয়াই খুন। তাঁহারা সত্যিই গুণীর কদর করিতে জানিতেন, মারহাবা। সেই হিসেবে আমরা বোধকরি কিছুটা বেয়াড়াই ছিলাম। বিশাল গড়নের এইসব অর্ধশিক্ষিত লোকেদের আমরা যেন মানুষ হিসেবেই মানিতে চাহিতাম না। ওহারা যেন অসম্ভব ডিস্টার্বিং কতিপয় এলিমেন্ট, বড়জোর “স্টাফ” বলিতেই যেন বইয়া যাইত।

আসলে আমাদের কালে ওঁহাদের দৌরাত্ম্য ছিলো অভাবনীয়, প্রতি মুহুর্তের সহবাস, টাচ এন্ড ব্যাক থেকে শুরু করিয়া ইডি-থ্রিডি যাই বলুন সর্বত্র, এমনকি কোনো ক্যাডেটের কলেজ আউটের পেছনেও তাঁহাদের অবদান দেখিয়াছি। ‘শক্তির পেছনে রুধির ধারার মতো অলক্ষ্যে’ তাঁহারা নন, সকল কর্মে অগ্রগামী নির্ভয়।
তাঁহারা বাংলা মায়ের দামাল বীর, চির উন্নত শির। আমাদেরও ইহাই শিখিয়েছিলেন, নভিসেসের আগে ফারুক স্টাফের সগর্ব প্রশিক্ষন,”এমুনভাবে পা মারবা সামনের বিল্ডিংটা ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়বে তোমার পায়ের সামনে”। সত্যি তাঁহারা আমাদের মতো কতো নওজোয়ানের ভিতকে করিয়াছেন মজবুত। দেশপ্রেমিক বানাইয়াছেন আমাদের। সেভেনে যখন গেলাম কী নরম নরম ছিলাম আমরা, ধীরে ধীরে হাড্ডিগুলো শক্ত করিয়া দিলেন তাঁহারা। কুমিল্লার ‘মকরা’ কলেজ বিখ্যাত কামরুল স্টাফ বুঝাইতেন, “তোমাদের জন্য ডেইলি ৪০,০০০ টাকা খরচ করে বাংলাদেশ সরকার। দেশের মানুষের অন্ন ধ্বংস করে বেড়ে উঠতেছ তোমরা। অতএব দেশের প্রতি দায়িত্ব তোমার অনেক…”। এইভাবে করিয়া কতিপয় লাগামহীন উদ্দাম অশ্বশাবককে বশীভূত করিয়াছিলেন তাঁহারা।

এইসব সুশীল স্টাফেদের মনোজগতটা ভেবে বড় আকুল হইয়া উঠিতাম আমি। ইহারাও মানুষ, তবে রক্তে-মাংসে গড়া আমাদের অনুভূতিগুলো বুঝিবেন না কেন? এরই মাঝে এক সুন্দর মওকা মিলিয়া গেলো আমার। কলেজ ছুটির দিনে শুনিলাম তদানীন্তন CHM আলী স্টাফের নিজ কাজে ঢাকা যাবার ইরাদা, ওঁর ছোট্ট একটা প্লট আছে পল্লবীতে, আমাদের বাসার কাছেই, ওহার ভাড়া আনিতে যাইবেন। অতএব কাজে লাগাইলাম সুযোগটা। বাসায় পৌঁছিয়াই পেট পুরাইয়া খাইয়ে দিলাম তাকে। এরপর থেকে ওঁ আমার বড় আপন… কোথাও ফল্ট হইয়া গেলে কাছে ডাকিয়া বলিতো, “দেখ, তুমি আমার নিজের লোক। তোমারে পাঙ্গাইতে ইচ্ছা হয়না। নেক্সট টাইম সাবধান। এইবারের মতো যাওগা।” কতো ভালো, নিমক হালাল করিবার প্রবৃত্তি আমাদের সকলের।
এমনি একটা ফায়দা লুটিয়াছিলাম নজরুল স্টাফের থেকেও। তাঁহাকে পাঠানো হইয়াছিলো এডজুটেন্টের শ্বশুরবাড়ি, ভাগ্যক্রমে সেটাও ছিল পল্লবীতে। আমি সাথে করিয়া নিয়া গেলাম, এক পেট খাওয়াইলাম, তারপর সেই বাসায় পৌঁছাইয়া দিলাম। এরপর থেকে উনিও আমার দোস্ত, কোনো group punishmentএর ভেতর থেকে আমাকে উঠাইয়া নিয়া যাইবে, কথা বলিয়া বলিয়া টাইম পার করাইয়া দিবে। কতো মহান।
ইহাদের মাঝে CHM তাহের স্টাফ ছিলো বেশ ধুরন্ধর, তালিবালি দিইয়া কাজ আদায় করিয়া নিবার বুদ্ধি ছিল তাঁর। একবার আমাদের স্কোয়াডের পাশে আসিয়া বলিলেন, “ক্লাস নাইন সাবধান, ডানে ঘোর।…তোমাদের মাঝে কেবল একজন ভদ্রলোক…আলমের মাথায় দেখ, কী সুন্দর করে চুলে তেল দিয়া আঁচড়াইয়া আসছে।” আমি তখন খুশিতে বাগবাগ।
এই ব্যাটা মজা করিতে করিতে ৩০টা পুশ আপ দেয়াইতেন, আমাদের কতো যে কষ্ট হতো! বদদুয়াও দিতাম মাঝে মাঝে। একবার কোনো এগারজনের ইডি হইলো, তাহারা ‘শেল’ কাঁধে লইয়া দৌড়াইতেছে, এমন সময় তাহের স্টাফ চিল্লাইয়া উঠিলেন,”ওরা এগার জন কই? আমি ওদের নিয়া ফিল্ম বানাব,ওরা এগারজন।”

আমরাও ওঁদের কম জ্বালাই নাই। পিটিতে দৌড়াইবার সময় হঠাত করিয়া স্পিড বাড়াইয়া দিতাম, পেছনে স্টাফ বেসামাল অবস্থায় পড়িয়া যাইতো। আমরা অনেকটা সামনে এসে গেলে তারপর হাঁটিতে থাকতাম। স্টাফ দৌড়ে আমাদের নাগালে আসিতেন, তারপর ঝাড়িতে থাকিতেন। একবার গেইমসের ফলইনে পুরা কলেজ হাসিতেছে, বিখ্যাত মোঃ আলী স্টাফ প্রতি শব্দের শেষে ‘প’ ব্যবহার করিয়াও একাকী কন্ট্রোল করিতে পারিতেছেন না। পরে একজন সামনে আগাইয়া গিয়া বলিল,”স্টাফ, আপনার হাফপ্যান্টের চেইন খোলা।”
আমাদের তিন ক্লাস সিনিয়র কোনো ভাইয়াকে এক স্টাফ, বোধকরি মোখলেস স্টাফ, উত্তেজনার মুহুর্তে গায়ে হাত দিয়া বসিলেন। আমরা কেউ বিষয়টা মানিয়া নিতে পারিতেছিলাম না। ক্যাডেটের মান-ইজ্জত ভূলুন্ঠিত হইতে দেখিয়া সবাই প্রতিবাদী হইয়া উঠিয়াছিলাম। নিজেদের ফিল্ডে প্রচন্ড প্রতিভা থাকিলেও তাঁহারা কেন জানি আমাদের স্ট্যাটাসে পড়িতেন না। গ্রন্থগত বিদ্যার অভাবেই হয়তোবা। আর হয়তো সেইজন্যেই আমরাও তাঁহাদিগকে বয়সের অজুহাতেও শ্রদ্ধা করিতে পারি নাই। তাছাড়া সারাটা দিন একজনের সাথে পড়িয়া থাকাও যেন বোরিং অনুভূত হইতো, তথাপি সে যদি হয় প্রতি পদে ভুল ধরিবার আর কষ্ট দিবারই লক্ষ্যে নিয়ত প্রস্তুত।

শেষ করিবার পূর্বে পুনরায় শুরুর বাক্যে ফিরিয়া যাই। এইসব মূল্যবান লোকদিগকে “ওস্তাদজী” সম্বোধন করায় দোষের কীবা আছে? যদিও শব্দটার সাথে “নাচ-গানের ওস্তাদের” সাদৃশ্য রহিয়াছে, তথাপি এটাতো সত্য যে, তাঁহারা আমাদের নাচের প্রশিক্ষক ছিলেন বটে। তাঁহাদের সাথে “যেমনি নাচাও তেমনি নাচি” গানের কতো মহড়া করিলাম। তবেই না আজকের আমরা।

আলম, ‘৯৭-‘০৩

২,৫৬০ বার দেখা হয়েছে

৩৮ টি মন্তব্য : “ওস্তাদজীঃ বয়েজ ভার্সন”

  1. আমরা লেখা খুবই রসালো হয়েছে। স্টাফদের নিয়ে মজার মজার স্মৃতি...আমিও কিছু বলি...

    গার্লস এর মেয়েরা শ্রদ্ধা কিংবা ভালোবাসায় স্টাফদের ওস্তাদজী বলতো এটা মানতে পারলাম না। আমাদের কলেজের কথাই বলি। আমরাই লাস্ট ব্যাচ যারা স্টাফদেরকে স্টাফ বলে ডাকার সৌভাগ্য ছিল। আমাদের পরের ব্যাচ গুলোর কপাল খারাপ। তাদের শেখানো হলো ওস্তাদজী নামে ডাকতে হবে। আমি সেইদিন স্যামকে নিয়া হাসাহাসি করলেও দুঃখের বিষয় একই জিনিস আমাদের কলেজেও ছিল। পরেরদিকে অবশ্য জুনিয়ররা নিজেদের প্রেস্টিজ বাঁচানোর লক্ষে ওস্তাদজীর পরিবর্তে ওস্তাদ বলে ডাকতো... 😉

    তার পরের কথা। কোন এক অদ্ভুত কারণে কলেজের স্টাফ সম্প্রদায়কে আমার আমাদের খুবই ভালো লাগতো। ভালো লাগাতাই স্বাভাবিক। বাইরে যতই চিল্লাপাল্লা, ফ্রন্টরোল-ফ্রন্টরোল বললেও দিন শেষে তারা মাটির মানুষ। অর্ধশিক্ষিত কিন্তু সত্যিকারের মানুষ যারা এক্স ক্যাডেটরা কলেজে গেলে স্যারদের আগে নিজেদের বাসায় ঢেকে নিয়ে খেতে বসায়...

    আমার মনে হয় আমাদের ৯৯ ইনটেকের মধ্যে সবচেয়ে মুখ খারাপ বরিশালের পোলাপাইনের। কারণ সেভেনে আমরা পেয়েছি আমিরুল স্টাফকে। ভয়াবহ রকমের খারাপ কথা বলতেন। তার কিছু বলতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ব্লগে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালোগুলোও লেখা অসম্ভব। এই লোকটাকেও আমরা সবাই ভালোবাসি। কারণ হয়তো যাবার আগেরদিন আমরা তার চোখে পানি দেখেছিলাম।

    কতোভাবে যে স্টাফদের ভালোবাসা পেয়েছি তা আসলেই বলে বোঝানো যাবে...সেটা নিয়ে কোন একদিন লেখার চেষ্টা করবো...

    জবাব দিন
  2. দোস্ত মাশরুফ

    আমি তোরে অনেক দিন থেকেই follow করছি। "গার্লসের পোলাপাইন" শব্দগুলা তোর কাছ থেকেই আমদানীকৃত।
    আমি একটু পাগলই, সাহিত্যিকরা পাগলই হয়। আর 'খাইশটা' লোকগুলারে অনেকে 'মাটির মানুষ' বলতেসে, কী আর করা? তাই লিখতে বসেছি।
    ICCLMM, in 2002? আমিও ছিলাম তো! হয়তো তোকে চিনতে পারবো। কীসে ছিলি? ছবিসহ মেইল করিসঃ nazbd20@yahoo.com

    জবাব দিন
  3. 'আমি একটু পাগলই, সাহিত্যিকরা পাগলই হয়। আর ‘খাইশটা’ লোকগুলারে অনেকে ‘মাটির মানুষ’ বলতেসে, কী আর করা? তাই লিখতে বসেছি।''

    মাটির মানূষ তো আমি আপ্নে লেখার পর বলছি। আমার "মাটির মানুষ" শুনে তো আপ্নে লিখতে বসেন নাই...

    তবে একটা কথা বুঝলাম...আমার মাটির মানুষ শব্দটা আপনাকে বহুত কষ্ট দিছে। নেন একটা কোক খান...

    জবাব দিন
  4. @ রায়হান
    কষ্ট পাওয়া কারে বলে জানিনা, তোমার কমেন্ট/লেখায় কখনোই রাগ করিনাই।
    কোক আমিই তোমাকে খাওয়াব, একবার দেশে আইস্যা নেই।
    আসলে আমি সবাইকে নিয়ে একত্রে মজা করতে চাই। (তোমরা যেন আবার ভুল ভেবে না বস)

    জবাব দিন
  5. বৃক্ষমানব মাশফী
    তুই খুব একটিভ পোলা, অথবা আজাইর, বলা মাত্রই মেইল পাঠায়া দিছস। খুব মজা পাইলাম মেইলটা পইরা।
    সবাই এখানে ভালো লেখক, ক্যাডেট কলেজই আমাদের এই যোগ্যতা তৈরি কইরা দিসে।

    জবাব দিন
  6. তারেক ভাই
    আপনার কমেন্টের জন্য থ্যাংক্স। জোশ পাইলাম।
    আমি ১৮/৯৭ আলম। ওইযে পিচ্চি পোলাটা।
    জিন্নুরাইন এবং মাশফিক ভাইয়ের টেবিলে বসতাম, চিকি ছিলাম না বলে আপনার টেবিলে জায়গা হয়নি... lol

    জবাব দিন
  7. সেইটাইতো। ওনি বেশ বড়লোকের ছেলে ছিল। বাবা ছিলনা যদিও।
    ওনি একদিন আমারে টেবিলে বলসিল,"এই, তুমি এতো আস্তে কথা বলো ক্যান? আমার মতো বেশি বেশি গোস্ত খাবা, গলার ভলিউম বাড়বো।"
    এরপর থেকে আমি বেশি বেশি গরুর গোস্ত খাই।

    জবাব দিন
  8. তারেক, ছি ছি ছি...alam কে তোর টেবিলে এই জন্য নেস নাই???? ছি ছি ছি 😛
    alam, জিন্নুরাইন না, ওটা হবে জুন্নুরাইন 🙂 যাই হোক, তোমার লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো।
    মাশফিক এখনো খেয়েই যাচ্ছে, তুমিও খাওয়া চালিয়ে যাও...কিন্তু গলার ভলিউম বেশি বারাইওমা

    জবাব দিন
  9. @ তানভীর ভাই
    থ্যাংক্স। বেশ জোশ পাইলাম।
    আপনি সেই বিশা--ল ব্রিলিয়ান্ট তানভীর ভাই না? sscর পর আপনার বাংলাসহ কিছু নোট আমি রাখসিলাম, আপনার প্রতিটা অক্ষর দেখে দেখে লিখতাম আমি, এভাবেই আমার handwriting সুন্দর হইসিলো। এরপর যতো লোক আমার লেখার প্রশংসা করসে, আমি আপনার খাতাগুলার কথা মনে করসি।
    তখন কখনো জানানো যায়নি, তাই আজ "কৃতজ্ঞতা স্বীকার" করে দিলাম।

    জবাব দিন
  10. ভাই আলম,
    কি দোষ করছিলাম যে এইভাবে আমার ইজ্জতের ফালুদা বানাইলা? নাউজুবিল্লাহ!
    তোমার ব্যাচের কে কে আমার টেবিলে ছিলো মনে করতে পারতেছি না রে ভাই। তবে আমি সাধারণত জুনিয়র বেছে নিতামনা টেবিলে, সবার বাছাবাছি শেষ হইলে আমার টেবিলে বাকি নাম আসতো! :-))

    তান্স,
    আওয়াজ দেস কেন শালা! দুরে গিয়া মর!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।