ইসরাইলি আগ্রাসন নিপাত যাক

ফিলিস্তিনের গাজায় হামাস যোদ্ধাদের সঙ্গে ইসরাইলি সৈন্যদের প্রচন্ড লড়াই হচ্ছে। নিরপরাধ বেসামরিক নারী-বৃদ্ধ-শিশুরা মারা পড়ছে। এখন পর্যন্ত নিহত ফিলিস্তিনীর সংখ্যা প্রায় ৭০০, আহত ২৭০০ জন, এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।
এদিকে ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ যুদ্ধ বন্ধে বিশ্ববাসীর আহ্বানকে প্রত্যাখান করেছেন। একতরফা এ যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্স, বৃটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা। দেশে দেশে ইসরাইলের এই হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি গাজায় হামলা বন্ধে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের রাজি করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গতকাল তিনি সিরিয়া ও লেবানন সফর করেন। আর ওআইসি জাতিসংঘ সাধারন পরিষদে এক বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে।
এ হামলার কারণে গাজায় চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জ্বালানী, খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে অসংখ্য মানুষ সেখানে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। বিশেষত ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিশুরা।
গত এক সপ্তায় হাজার হাজার ইসরাইলি সৈন্য পাঠানো হয়। গাজার ৪০টি হাইরাইজ বিল্ডিং লক্ষ্য করে হামলা চালায় তারা। জয়তুন শহরের ৪তলা একটি বিল্ডিংয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় গতকাল একই পরিবারের ৭ শিশুসহ মারা যায় ১২ জন সদস্য। এমনকি গাজায় আশ্রয়কেন্দ্রেও হামলা চালাচ্ছে, জাতিসংঘ পরিচালিত ৩টি স্কুলে ট্যাংক ও বিমান হামলায় গতকাল ৪৫ জন শরণার্থী মারা গেছেন।
ইসরাইলের সর্বগ্রাসী হামলার বিপরীতে হামাসের সশস্ত্র শাখা অবশ্য দক্ষিন ইসরাইলে রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে, গতকাল তারা অন্তত ২৬টি রকেট নিক্ষেপ করে।
যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে ইসরাইল চায়, হামাসের রকেট ছোঁড়া বন্ধ হোক এবং মিশর-গাজা সীমান্তে আন্তর্জাতিক সেনা মোতায়েন হোক। আর হামাস চাচ্ছে, ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ হোক এবং ৩ বছর ধরে বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার হোক।…

এ যুদ্ধের পেছনের ইতিহাস কম-বেশি সবার জানা। ১৯৬৭ সালের ৫-১০ জুন সময়ের কথা। যখন ইসরাইল প্রথম ফিলিস্তিনের উপর দখল অভিযান চালায়; পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর এবং গাজা দখল করে; অবৈধ বসতি গড়ে প্রায় ৫ লাখ বহিরাগত ইহুদী। গত ৪১ বছর ধরে চলে আসছে তাদের আগ্রাসন এবং ফিলিস্তিনীদের মুক্তি সংগ্রাম। প্রয়াত বীর প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে তার দল PLO (Palestine liberation organization) ২টি বিপ্লব জন্ম দেয়, তাদের ভাষায় “ইন্তিফাদা”, যথাক্রমে ১৯৮৭ ও ১৯৯৩ সালে। অবশেষে ১৯৯৩ সালে ইহুদীরা “অসলো চুক্তি” নামে এক ছলনার আশ্রয় নেয়, শুরু থেকেই চুক্তির বক্তব্য লংঘন করতে থাকে তারা। তেমনি একটি সুযোগে সেখানে জন্ম
নেয় হামাসের ইন্তিফাদা; হামাস একটি জঙ্গী সংগঠন, ২০০০ সালের পর থেকে তাদের সশস্ত্র বিপ্লব শুরু হয়।
এই ৪ দশক ধরে ফিলিস্তিনীদের কী শোচনীয় পরিস্থিতিতে চলতে হচ্ছে, তার বর্ণনা পাওয়া যায় সাংবাদিক এলান জোনস্টোনের (বিবিসি’র গাজা রিপোর্টার) মন্তব্যেঃ “গত ৩ বছর ধরে ফিলিস্তিনীদের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট দেখছি আমি, এ কষ্টের মাত্রা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই অসংখ্য ফিলিস্তিনী গ্রেফতার হচ্ছে, অকারণে-নির্বিচারে, রোজ ভিত্তিতে লোক মারা হচ্ছে। অর্থনৈতিক দুর্দশা মারাত্মক, বিশেষতঃ গাজায়।”

মূলতঃ নভেম্বর ১৯৪৭-এ জাতিসংঘ পার্টিশন প্ল্যান ঘোষণা করা হয়েছিলো, যে হিসাবে ফিলিস্তিনকে ২ ভাগে ভাগ করার কথাঃ একটি আরব রাষ্ট্র, একটি ইহুদী রাষ্ট্র। কিন্তু স্বভাবতঃই আরবরা তাদের নিজ ভূমিকে বিভক্ত হতে দেয়নি। ফলস্বরুপ, ইসরাইল ১৫ মে ১৯৪৮ তারিখ থেকে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরে আক্রমণ চালাতে থাকে। সেই থেকে চলে আসছে ফিলিস্তিনিদের আত্মরক্ষার লড়াই, নিজ দেশে সার্বভৌমভাবে বেঁচে থাকতে আজ লড়তে হচ্ছে প্রতিদিন। অবস্থা এমন হয়েছে যে, পশ্চিম তীর যেন বৃহত্তর ইসরাইলেরই অংশ, প্রফেসর নোয়াম চমস্কি একে আখ্যায়িত করেছেন “Palestinian dungeon” (hidden zone) বলে।
বিস্ময়করভাবে, এই আগ্রাসনের ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্বের অভাবনীয় মদদ ছিলো ইসরাইলের পেছনে। জাতিসংঘে যখনই এ-ব্যাপারে কোনো দেশ কোনো কথা তুলে, আমেরিকা এতে নির্লজ্জভাবে ভেটো জানিয়ে দেয়। নোয়াম চমস্কির ভাষায়, “আমেরিকা ইসরাইলকে নিরংকুশ সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সাপোর্ট দিয়ে আসছে।” ফিলিস্তিনে একটি সফল গৃহযুদ্ধ বাধানোর সাফল্যও ওয়াশিংটনের।
হামাসের নির্বাচিত সরকারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছিল ইউরোপও। এভাবে ইসরাইলকে এ ভাঙ্গনের লড়াইয়ে এগিয়ে দিচ্ছে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো।

এখন অর্ধশতাব্দী ধরে ফিলিস্তিনীদের কেবল আত্মরক্ষার আন্দোলন, নিজভূমে পরবাসে। “দখলদারিত্বের অবসান চাই” এটাই তাদের একমাত্র স্লোগান। এ-লড়াইয়ে জয়ী হলে ফিলিস্তিনে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করেন নোয়াম চমস্কি, যার পরিচয় হবে Palestinian state with a Jewish minority. আমরা সে দিনটির অপেক্ষায় আছি। আগ্রাসী ইসরাইল নিপাত যাক, ফিলিস্তিনীরা নিজ দেশে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার নিয়ে বাঁচুক।

২,৪৬৯ বার দেখা হয়েছে

২৮ টি মন্তব্য : “ইসরাইলি আগ্রাসন নিপাত যাক”

  1. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    এগুলো সব স্বার্থের কাছে বাধা। মাঝে মাঝে অক্ষম আক্রোশে হাত মুষ্টি বদ্ধ হয়ে যাক, কিন্তু কিছুই করতে পারি না, ভুলে যাই একটু পর। ভাবখানা এমন "আমি তো বেশ আছি"।

    সবর্ত্র মানবতার জয় হোক- এ কামনা ছাড়া আর কিছু করতে পারিনা আপাতত।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  2. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    গতকাল থেকেই এ নিয়ে লিখব লিখব করছিলাম। আলম ভাই কাজটা করে দিলেন। অনেক ধন্যবাদ। এখন একটু ব্যস্ত আছি। আর ২ ঘণ্টা পরই এ নিয়ে অনেক কথা বলার ইচ্ছা রইল। তার আগে আমিও বলে যাই, ইসরাইলী রক্তপিপাসুদের এই আগ্রাসন নিপাত যাক....

    জবাব দিন
  3. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    না আর স্থির থাকতে পারলাম না। সব কাজ ফেলে দিয়ে কিছু বিষয় শেয়ার করি:

    আমার কাছে একটা বই আছে। নাম "ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রাম: ইহুদী ষড়যন্ত্র ও আরবদের ভূমিকা", লেখক "মুহাম্মদ হাসনাইন হাইকল"। এটা আসলে অনুবাদ। মূল ইংরেজি বইয়ের নাম "The Liberation War of Palesine: Conspiracy of the Jews and Arab's Stand"। হাসনাইন হাইকল মিশরের আল-আহরাম পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন। এরও আগে তিনি জামাল আব্দুন নাসেরের মন্ত্রীপরিষদে তথ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন। ৭৩৬ পৃষ্ঠার এই বইয়ের শেষ কিছু কথা শেয়ার করি (২০০২ সালের প্রেক্ষাপট):

    ২০০২ সালের ২৩শে জুলাই গাজা ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ৯টি শিশু ও একজন অন্যতম শীর্ষ হামাস নেতাসহ ১৫ ফিলিস্তিনীকে হত্যা করে। তারা এতে এফ-১৬ বিমান ব্যবহার করে। ২৪শে জুলাই জাতিসংঘে এ ঘটনার উপর ৪ ঘণ্টা বিতর্ককালে প্রায় ৩০টি দেশ ইসরাইলের এ হামলাকে অকারণ অগ্রহণযোগ্য ও অপ্রত্যাশিত বলে বর্ণনা করে। জাতিসংঘে আরব গ্রুপের বর্তমান সভাপতি রাষ্ট্র সৌদী আরবের আহ্বানে এ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চীনও এর কড়া সমালোচনা করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করে। এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র আরব
    শিশুদের উপর বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলাকে ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার বলে চাপিয়ে দেয়।

    এভাবেই বুশ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস নির্মূলের অজুহাতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু ইসরাইলের রাষ্ট্রী সন্ত্রাসকে আত্মরক্ষার অধিকার বলে তাদের সকল মানবাধিকার লঙ্ঘনকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে।

    নিজেও ইরাকের প্রেসিডেন্টকে উৎখাতের ঘোষণা দিয়েছে এবং নেসার গাইডে বোমা জেডি এ এস এবং টমাগক মিসাইল উৎপাদন দ্বিগুণ করেছে। আফগানিস্তানে এই অস্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং লক্ষ্যভেদী প্রমাণিত হয়েছে।

    ব্রিটেন সব সময় মার্কিন পরিকল্পনার সহযাত্রী হলেও এই প্রথমবার বুশের বিরোধিতা করে বলে যে আরাফাতকে বাদ দিয়ে ফিলিস্তিনের কোন শান্তি পরিকল্পনা হতে পারে না। দৃশ্যত বুশ এ ব্যাপারে একা হয়ে গেলেও বুশ-শ্যারন জোট ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পথে বিরাট বাধা হয়েই থাকবে।

    তবে যে জাতি নিজের মৃত্যুকে কবুল করে স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন রাখতে চায় তাদের পদানত করা যায় না। বিজয় তাদের সুনিশ্চিত, এটাই ইতিহাসের অমোঘ বিধান।

    শেষ কথাগুলো লক্ষ্য করুন। আমরা কিন্তু এটা প্রমাণ করেছি। আমরা ১৯৭১ এ নিজের মৃত্যুকে কবুল করে স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন রাখার শপথ করেছিলাম। ইতিহাস তার কথা রেখেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেটা অলৌকিকভাবে হয়ে যায়নি। তার জন্যকে ভারতে সহযোগিতা করতে হয়েছে, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ লেগেছে।
    ফিলিস্তিনের অবস্থা আমাদের চেয়ে অনেক অনেক খারাপ। তাদের যুদ্ধ আরও অনেক অসম। এই যুদ্ধে তাদের জেতার তেমন কোন আশা নেই। একমাত্র আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপই এর সমাধান এনে দিতে পারে। আর সেই আন্তর্জাতিক মহলকেই করায়ত করে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নমাক উত্তরাধুনিক সম্রাজ্যবাদী শক্তিটি।

    আমরা ভেবেছিলাম সব দোষ বুশ প্রশাসনের। কিন্তু এখন ভুল ভাঙতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে, ইসরায়েলের সাথে আমেরিকার আঁতাতটা ঐতিহাসিক, এর যেন কোন শেষ নেই। ওবামার প্রতিক্রিয়া দেখে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। ওবামা বুশের পক্ষে গলা মেলাননি এটা ঠিক, কিন্তু তিনি নিজে ইসরায়েলের বিপক্ষে যায় এমন কোন কথা বলেননি। সেই একই সুরে একে আত্মরক্ষার অধিকার বলে চালিয়ে দিয়েছেন। পৃথিবীর মানুষ মাত্র এক মাস আগে ওবামাকে এতই ভালবেসেছিল যে তিনি রীতিমত হযরত ওবামা (আঃ) [ফারুক ওয়াসিফের উদ্ভাবন] বনে গিয়েছিলেন। সেই পদে তিনি থাকতে পারবেন না, যদি না অতি সত্ত্বর কিছু করেন। ওবামার মত লোকের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, রাজনীতিবিদদের কাছে সিংহাসন আর কুঁড়েঘরের মধ্যে পার্থক্য খুব কম। যে সিংহাসনে তিনি বসে আছেন সেখান থেকে তাকে কুঁড়েঘরে নামাতে সাধারণ মানুষের কিছুটা সময় লাগলেও বুদ্ধিজীবীদের এক সেকেন্ডও লাগবে না।

    আবারও এডওয়ার্ড সাইদের কথা মনে হচ্ছে। নোয়াম চমস্কির সাথে ইনিও বিংশ শতকের অন্যতম সেরা ভাষাতাত্ত্বিক দার্শনিক ও মানবতাবাদী হিসেবে পরিচিত। তার জন্ম হয়েছিল জেরুসালেমে। পরবর্তীতে অবশ্য আমেরিকায় চলে যান। এডওয়ার্ড সাইদ আমৃত্যু ফিলিস্তিনের অধিকারের কথা বলে গেছেন। তার বিখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন "End of the Peace Process" এ এমনকি ইয়াসির আরাফাতের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, অসলো চুক্তি করেই আরাফাত বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি ফিলিস্তিনীদের জন্য যোগ্য নেতা নন। আরাফাতের পক্ষে হয়ত এর চেয়ে বেশী কিছু করা সম্ভব ছিল না, কিন্তু ফিলিস্তিনীদের এর চেয়েও বেশী কিছু করার ক্ষমতা আছে। আশাকরি সেটাই প্রকাশিত হবে। আবার পৃথিবীর মানুষ তার অধিকার ফিরে পাবে।

    জবাব দিন
  4. হাসনাইন (৯৯-০৫)

    এই সংঘাত হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমন সম্রাজ্যের পতনের পর তা ব্রিটিশদের অধিকারে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশদের টালমাটাল অবস্থায় তারা এ অঞ্চল ছেড়ে যায়। উপমহাদেশের মতই আরেকটা চক্রান্ত করে তারা। পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের মত দুই পাশে ফিলিস্তিনিদের দুই খন্ডিত করে মাঝখানে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার জন্য মত দেয় যাতে ইহুদিদের ভাগ্যে প্রায় ৫১% ভূমি পরে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যে ৪৯% ভূমি পড়ে। কিন্তু আরব নেতারা কোন ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী ছিলেন। মূলত পশ্চিমাদের মূল লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর সমস্ত ইহুদিদের এই অঞ্চলে ডাম্প করা, ততদিনে হিটলারের দমনে লক্ষ লক্ষ ইহুদি প্রাণ হারায়। পশ্চিমাদের এই চক্রান্ত যে সফল হওয়ার পথে তাই দেখা যাচ্ছে। ইসরাইল যখন নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষনা করল সব আরব রাষ্ট্র মিলে ১৯৬৭ সালে ছয়দিনের এক যুদ্ধে লিপ্ত হল। লাভের লাভ কিছুই হল না, উল্টা আরও ভূমি হাতছাড়া হল। মিশর তার বিশাল এক জায়গা (সিনাই পর্বত) হারাল। এরপর মিশরের একনায়ক আনোয়ার সাদাতের নেতৃত্বে আরবরা ১৯৭৩ সালে ঊম কিপ্পুর যুদ্ধ শুরু করে। প্রথমদিকে চমকে দিয়ে অনেক জায়গা দখল করে নেয় মিশর। কিন্তু পরে মিশরের তৃতীয় আর্মি ট্রেপে পরে যায়। এই সময় আরবদের সহায়তা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর অন্যদিকে ইসরাইলীদের যুক্তরাষ্ট্র। আবার তাদের নাক গলানিতে অস্ত্রবিরতী চুক্তিও হয়। সেই অনোয়ার সাদাতই প্রথম আরব নেতা যিনি এরপর ইস্রাইল সফর করেন এবং ইস্রাইলকে স্বীকৃতিদানের বিনিময়ে সিনাই অঞ্চল ফিরিয়ে নেন। এর ফলশ্রুতিতে মিশরকে আরব লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। আনোয়ার সাদাতও পরে এক প্যারেডে তার নিজ বাহিনীর এক সদস্যের হাতে প্রাণ হারান। সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকাকালে শক্তির ভারসাম্য ছিল, কিন্তু তা ভেঙ্গে গিয়ে এখন ইঊএসএ-ই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাস্তান। নিরাপত্তা পরিষদে ইস্রাইল নিয়ে যাই প্রস্তাব আসে এই মাস্তানের কারণে তা বাস্তবায়ন হতে পারে না। এরপর আরো যুদ্ধ হয়েছে, কখনও শান্ত ছিলনা এই অঞ্চল। ইউএসএ ছাড়া ইস্রাইলের এই অঞ্চলে টিকে থাকা অসম্ভব। সেই থেকে ফিলিস্তিনিদের দুঃখ দূর্দশা শুরু। এক অসম যূদ্ধে লাখ লাখ প্রাণ হারিয়েছে। ইস্রাইলিদের সবার সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক, এ থেকেই বোঝা যায় কতটা মরিয়া তারা। IDF-ইস্রাইলী ডিফেন্স ফোর্সের কয়েকটা মোটোর মধ্যে একটা হল, কোন মতেই হারা যাবে না। ঠিক তাই একটা যূদ্ধে হারলেই ইহুদিদের অস্তিত্ত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এ কারনেই সবসময় ভয়ে থাকে তারা, একটু উস্কানিতেই বিচলিত হয়ে পরে। আর আছে সবচেয়ে ধূর্ত আর নিকৃষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ, ইয়াসির আরাফাতকে বিষ প্র‌য়োগে হত্যা করার অভিযোগ যার মাথায়। এই মুহুর্তে আরবদের সবচেয়ে যেটা প্র‌য়োজন তা হল একজন শক্তিশালী নেতা যিনি পশ্চিমাদের পা চাটা হবেন না। এই গুণ বর্তমানে শুধু ইরানী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের মধ্যেই আছে। প্রযুক্তি আর রণকৌশলে ইরান কোন অংশেই পিছিয়ে নেই। বলা হয়ে থাকে ইরাক হামলার আগে ইরানকেই টার্গেট করেছিল ইউ.এস.এ কিন্তু এইটাও বুঝতে পারে বেশি সুবিধা করতে পারবে না। তাই হুমকি-ধামকি দিয়েই চলছে। ইস্রাইলিদের একটা জিনিস আমার খুব পছন্দ হয়েছে, যুদ্ধে ডিফেন্স বলে কিছু নেই। শান্তিমত থাকতে পারলে ভাল, কিন্তু কেউ গন্ডগোল করার চেষ্টা করলেই চুরমার করে দিতে হবে। যুদ্ধ বাধলে সব শক্তি এক করে অফেন্সিভ হতে হবে। ইস্রাইলিরা যা প্রতিবার অতীতে দেখিয়েছে এখনো দেখাচ্ছে। আমাকে অনেকে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করতে পারেন, তাদের আমার একটাই অনুরোধ একটু ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করেন আর টিভিতে খবর দেখেন, মূর্খ না হলে ঠিকই বুঝতে পারবেন কি হচ্ছে।

    ইতিহাস কথা বলে... নাথিং গোস অনপেইড। যার জ্বলন্ত প্রমাণ ইস্রাইল, এবং হাস্যকর হলেও সত্য এর পরিণতিও ভোগ করতে হবে তাকে।

    বর্তমানে ইস্রাইলের যুক্তি হল হামাস (যারা কিনা ফিলিস্তিনিদের নির্বাচিত সরকার, কিন্তু আন্তর্জাতিক অগ্রহযোগ্যতার কারণে!!! আর ফাতাহের সাথে গন্ডগোলের কারণে গাজার নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছে আর ওয়েস্ট ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফাতাহের কাছে) তাদের উপর রকেট ছুড়ে মারছে যাতে তাদের শিশুসহ অন্যরা প্রাণ হারাচ্ছে।

    আর হামাসের যুক্তি হল অস্ত্রবিরতী চুক্তি না মেনে এখনো ইস্রাইল অবরোধ করে রেখেছে।

    বাহ... কি মজা!!! তারা আমাদের শিশুকে হত্যা করল কেন, দাও ওদের তাদের সব শিশুকে মেরে অথবা পঙ্গু করে।

    আমার কথা হচ্ছে ইস্রাইল কি একবারো অবরোধ ঊঠিয়ে দেখেছে এর ফলটা কি হয়?? তা না করে তারা হামাসের বড় বড় নেতাদের মারতেই বেশি তৎপর ছিল, আর হামাস-ফাতাহের ভিতর গ্যাঞ্জাম লাগাতেই ব্যস্ত ছিল।

    জবাব দিন
      • হাসনাইন (৯৯-০৫)

        ছবিটা বড় করে দেখুন। এতে UN-এর প্রস্তাবিত প্লান আর ১৯৬৭ এর পরে ইস্রাইলের অধিকৃত সিনাই পর্বত, গোলান হাইটস, গাজা, ওয়েস্ট ব্যাংক দেখা যাবে। পরে সিনাই অঞ্চল ফেরত পায় মিশর।

        জবাব দিন
      • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

        প্রচণ্ড ইনফরমেটিভ পোস্ট হাসনাইন। এটুকু পড়লে অনেকের কাছেই ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমিও অনেক কিছু জানলাম। তবে একটা বিষয়ে দ্বিমত আছে:

        এই গুণ বর্তমানে শুধু ইরানী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের মধ্যেই আছে।

        আহমাদিনেজাদের উপর নির্ভর করাটা বোকামি হবে। কারণ, তাকে পৃথিবীর কোন দেশই মেনে নেবে না। আহমাদিনেজাদের এই কথার সাথে কিন্তু কোন দেশই একমত না: "Israel should be wiped out of the world map." সুতরাং আহমাদিনেজাদ কোন প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেষ্টা করলে আমার মনে হয় একটা বিশ্বযুদ্ধ বেধে যাবে।
        আর আমি নিজেও ইরান সরকারের উপর খুব বেশী আস্থাশীল না। ধর্মীয় রাষ্ট্র হওয়ার কারণেই কিন্তু ইরানে বাকস্বাধীনতা নেই। ইরানের বুদ্ধিজীবীরা কিন্তু যা ইচ্ছা তা-ই বলতে পারে না। ইসলামী বিপ্লবের পর কিন্তু অনেক অধার্মিক পরিবারকে ইরান ত্যাগ করে চলে যেতে হয়েছে। সমকালীন ইরানী সিনেমা দেখলেই এটা বোঝা যায়। বিশেষত মাখমালবফ পরিবার ও কিয়ারোস্তামির সিনেমা। সবচেয়ে বড় উদাহরণ সাম্প্রতিক এনিমেশন সিনেমা "পারসেপোলিস", পরিচালক মারজান সাত্রাপি।

        তাই আমি মনে করি সব দেশের অংশগ্রহণ লাগবে। সবার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতে হবে। ইসরায়েল পৃথিবীর সবচেয়ে কট্টর ধর্মবাদী দেশ এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এই দেশকে ঠেকাতে আরেকটি ধর্মবাদী দেশকে লাগালে কি অবস্থা হবে একবার চিন্তা কর।

        জবাব দিন
        • হাসনাইন (৯৯-০৫)
          আহমাদিনেজাদের এই কথার সাথে কিন্তু কোন দেশই একমত না: “Israel should be wiped out of the world map.” সুতরাং আহমাদিনেজাদ কোন প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেষ্টা করলে আমার মনে হয় একটা বিশ্বযুদ্ধ বেধে যাবে।

          এই কথা অস্বীকার করা যায় না। :thumbup:

          জবাব দিন
  5. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    ব্যাপক ইনফরমেটিভ আলোচনা, পোস্ট এবং মন্তব্যে :thumbup:

    আগ্রাসী ইসরাইল নিপাত যাক, ফিলিস্তিনীরা নিজ দেশে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার নিয়ে বাঁচুক।

    এই দোয়া করি স্রষ্টার কাছে


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  6. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    আমেরিকা সবসময় ইসরালইকে সমর্থন করেছে দুটো কারনে।

    ১। ইহুদিদের একটা আবাস করে দেয়া। এটা কেন করছে তারও ইতিহাস আছে, জীয়োনিজম বলে বোধহয় এটাকে। মুহম্মদ নেটে দেখতে পার, আমার ইচ্ছা করে না।

    ২। ইহুদি লবি খুব ষ্ট্রং ইউএসএ তে। রিপাবলিকান কিংবা ডেমক্রেট সব খানেই।

    ইহুদিদের একটা জায়গা দরকার, এরা খুব বেশি ইনফিয়োরিটি কমপ্লেক্সে ভুগে, ধর্মপ্রান ইহুদিরা বিশ্বাস করে জেরুজালেম তাদের মাতৃভুমি, এখান থেকে তাদের বিতারিত করা হয়েছে। নিজেদের অস্তিস্ব রক্ষাই এদের এত হিংস্র করেছে। ধর্মপ্রান মুসলমানরা বলছে ইহুদি রাষ্ট্র বলে কিছু নেই।

    মধ্যপ্রাচ্য তেলের খনি। সবদেশ এক হয়ে গেলে ইউএসএ কে কেউ পাত্তা দিবে না। এইজন্য ইউএসএ সব যোগ বিয়োগ করে ইসরাইলকে সমর্থন করে যায়। তার সুবিধা। একটা জিনিস দেখে, এই একটা জায়গায় ইউএসএ নিজেদের সৈন্য পাঠায় না, কারন সে সমাধান চায় না।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  7. আলম (৯৭--০৩)
    ইউএসএ সব যোগ বিয়োগ করে ইসরাইলকে সমর্থন করে যায়। তার সুবিধা। একটা জিনিস দেখে, এই একটা জায়গায় ইউএসএ নিজেদের সৈন্য পাঠায় না, কারন সে সমাধান চায় না।

    ফয়েজ ভাই, পুরান কথা, তবু মনে করিয়ে দেই। ৯/১১ এর ঘটনায়ও ইহুদীরা জড়িত ছিল বলে নিউজ এসেছিল। যার অপ্রত্যাশিত পরিণতি এসে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উপর।

    'জায়নবাদের' ফলশ্রুতিতেই মোসাদ এই উপমহাদেশেও কলকাঠি নেড়ে চলেছে। পারভেজ মোশাররফের ধসের অন্যতম কারণও ছিল এই ইসরাইলের সাথে হাত মিলানো।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।