বলতে চাই … তোমাকেই চাই

সংবিধিবদ্ধ সতর্কিকরন – পুরোপুরি কল্পনা থেকে লেখা। বাস্তব কোনো চরিত্র বা ঘটনার সাথে মিল পেলে … কিছুই করার নেই।

——————————————-
আগের গল্প ——-

একজন অসুস্থ মানুষ

ও, আমি এবং আমরা ……
যেদিন আমার মৃত্যু হলো ……………

মাঝরাতে কারেন্ট চলে গেলে ভ্যাপ্সা গরমে ঘুম ভেঙ্গে যায়। হঠাৎ অন্ধকারে জেগে উঠে মাথায় চিন্তা জাগে, আমি কি বেঁচে আছি নাকি কবরে ?? কিন্তু একটু পরেই যখন রুমমেটদের গরমে অস্থির গড়াগড়ির শব্দও কানে আসে, তখন নিশ্চিন্ত হই, নাহ, এযাত্রাতে বেঁচেই আছি। কলেজে ক্লাশ টেন এ থাকতে আমার রুমমেট ছিলো আমার ব্যাচের আমিন আর ক্লাশ নাইনের মুন্না এবং শফি। আমিনের ছিলো ঘুমের মধ্যে পড়া মুখস্ত বলার অভ্যেস, শফি স্বপ্নে নিজেকে খুব সম্ভবত কাওয়ালি গায়ক হিসেবে দেখত, আর মুন্না ছিলো ইংরেজী সিনেমার অ্যাকশন হিরো। ঘুম পাতলা হবার কারনে প্রায় প্রতি রাতেই এদের জন্যে আমার কয়েকবার করে ঘুম ভেঙ্গে যেতো। আমি জেগে উঠে শুনতাম উপপাদ্যের প্রমান বা পিয়াআআআ রেএএএ, পিয়া রে অথবা টার্মিনেটর বা কমান্ডো সিনেমার বিভিন্ন ডায়ালগ, যেমন “আস্তালা ভিস্তা, বেইবি” বা “আই উইল বি ব্যাক, বেনেট”। মাঝে মাঝে তারা তিনজনই প্রায় একই সময়ে তাদের ট্যালেন্ট শো শুরু বা শেষ করতো। ব্যাপারটা তেমন দেখার মতন না হলেও শোনার মতন ছিলো সেটা। সমস্যাটা হলো, একবার ঘুম ভেঙ্গে গেলে, যত ক্লান্তই থাকি না কেন, আবার ঘুমিয়ে পড়াটা আমার জন্যে খুব সময়সাপেক্ষ একটা ব্যাপার। রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে জেগে জেগে আকাশ পাতাল চিন্তা ভাবনা করার স্বভাবটা সম্ভবত আমার এই ক্লাশ টেন থেকেই শুরু হয়েছে।

ইদানিং প্রায়ই ওর কথা চিন্তা করি।

ছুটির দিনে সকাল নয়টার কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়ে যখন রুমমেটদের কেউ খবর দেয় যে, এই ওঠ, তোর গেস্ট এসেছে, তখন কেন জানি মুখে নাহোক মনে মনে সেই রুমমেট, সেই গেস্ট এবং তার সাথে গোটা দুনিয়ার গুষ্ঠি উদ্ধার না করে পারিনা। ছেলেদের হলে গেস্ট আসা মানে কোনো মেয়ে বা মহিলা দেখা করতে এসেছে। অর্থাৎ আমাকে এখন আমার চেহারা থেকে ঘুমভাব দূর করে পোশাক পালটে নিচে নামতে হবে। ছুটির দিনে সকালে গেস্ট আসা নিষিদ্ধ করে দেয়া উচিত। দুনিয়ার সব কিছুকে অভিশাপ দিতে দিতে নিচে নেমে দেখি গেস্ট রুমে কাজল বসে আছে। সাদা সালোয়ার কামিজে ওকে দূর থেকেই বেশ চমৎকার দেখাচ্ছিল। আমার মনে পড়ছে যে আজ কাজলের সাথে কিছু একটা করার কথা, কিন্তু কি করার কথা তা মনে পড়ছে না। আমার ধারনা, আমার ব্রেন সিস্টেম অনেক পুরাতন মডেলের, ঘুম থেকে উঠে রিবুট করতে এইজন্যে বেশ সময় নেয়। আমাকে দেখে কাজল উঠে দাড়িয়ে কিছু একটা বলা শুরু করল, কিন্তু আমি আজ ওকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকার কারনে আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। কপালে টিপ, খোলা চুল, মেকাপ নেই – তার মানে কোনো ফর্মাল জায়গাতে যাবার কথা না, ক্যাজুয়াল কিছু একটা হবে। হঠাৎ প্রায় ওর ওপরে ঝাপিয়ে পড়লাম —

— ছাড় !! ছাড় বলতেসি !! কি হইসে তোর ?!!

আমি কথা না বলে আরোও শক্তি প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আসলে শক্তিই সকল সুখের মুল। অবশেষে আমার সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমানিত হল, অবশেষে আমি ওর হাত থেকে চকলেটের বাক্সটা কেড়ে নিতে পারলাম। বাক্সটা খুলে হার্ট আকৃতির দুটো চকলেট মুখে পুরে দিতেই মনটা ভালো হয়ে গেলো। চকলেটে মনে হয় কিছু একটা আছে যেটা মন ভালো করে দেয়। যখন আস্তে আস্তে গোটা দুনিয়াকে ক্ষমা করে দিচ্ছি তখন মাথায় ঢুকলো, আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে এবং কাজলের কাছ থেকে চকলেটের বাক্স কেড়ে নেয়াটা আমার মোটেও ঠিক হয়নি। সে হয়ত কাউকে উপহার দেবার জন্যে এইটা কিনেছে এবং আমি ইতিমধ্যে পাঁচ এবং ছয় নম্বরকে যৌথভাবে গেলার চেষ্টা করছি। চিবাতে চিবাতেই একটু দুখি দুখি চেহারা বানানোর চেষ্টা করে কাজলের দিকে তাকালাম। দেখি সে ভুরু উচিয়ে এবং কিছুটা অবাক হয়ে আমার দিকে দেখছে। যাক, বেশি রাগ করেনি তাহলে। একটা চকলেট ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম,

— খাবি ??

সে কোনো রকমে মাথা নেড়ে না বললো। আমি আরও চারটা খাবার পরে বাক্সটা আবার বন্ধ করে রাখলাম।

— রাগ করিস নারে। তুই ভালো করেই জানিস, সকালে চকলেট দেখলে আমার মাথা ঠিক থাকে না।
— ইন্টারেস্টিং …… তার মানে তুই বলতে চাস, অধিকাংশ সময় তোর মাথা ঠিক থাকে ?

আমি খোঁচাটাকে পাত্তা না দিয়ে ক্যান্টিনের এক ছেলে ডাক দিয়ে আমার জন্যে নাস্তা আনতে বললাম। কাজল নাস্তা না করে সকালে কোথাও বের হয়না। ছোট বেলায় নাকি সে কোন একবার নাস্তা না করে স্কুলে গিয়েছিলো এবং ক্লাসের মাঝখানে খিদের চোটে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলো। ওকে জিজ্ঞেস করলাম,

— বক্সটা কি তুই কাউকে গিফট করার জন্যে কিনেছিস ?
— তুই ভুলে গেছিস ??

মাঝে মাঝে কি ভুলে গিয়েছি এইটা মনে করার চেষ্টা করা, যা ভুলে গিয়েছি সেটা মনে করার থেকে কষ্ট।

— কি ভুলে যাবো ??!!
— আজকে অনুপ অঞ্জলীর সাথে আমাদের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেবে। তার পরে আমরা বইমেলাতে যাব।
— ওওও …… আজকে অনুপকে সিল দেবার দিন। ভাবতেই ভালো লাগছে। আর মন খারাপ করিস না, তুই চকলেটগুলো ওদের দিলে ওরা শেয়ার করত, তখনও আমি দশটাই খেতাম।
— ব্যাপার নাহ ……… তুই আমাদের সবাইকে আইসক্রীম খাইয়ে দিলে আমার মন খারাপ আর থাকবেনা। তা তোর মোবাইল বন্ধ কেন ?
— শান্তি মতন ঘুমানোর জন্যে বন্ধ করে রাখছিলাম। কিন্তু ঘুমাতে আর পারলাম কই …………

নাস্তা করতে করতেই তিথীও এসে হাজির। চমৎকার নীল রঙের একটা শাড়ি পরে এসেছে। যদিও শাড়ি ড্রেসট আমার একেবারেই দেখতে ভালো লাগে না, তারপরেও মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলাম, তাকে দারুন মানিয়াছে। সেও আমার মতন চকলেট খুব ভালোবাসে। আমি মোটামুটি অর্ধেক শেষ করে দিয়েছি দেখে বেশ কিছুক্ষন সেটা নিয়ে গজগজ করলো। এখন মেয়েদের সংখ্যা বেশি, তাই আমার চুপ করে থাকাই ভালো। নাহলে আমার আইস্ক্রীমের শাস্তি ফুলে ফেপে আরও বিশাল কিছু্তে রুপ নিতে পারে। ওরা দুজন কাটুর কুটুর করে কথা বলতে থাকে। আমরা রশিদ আর নুপুরের জন্যে অপেক্ষা করছি। ওরা এলে আমরা টি এস সি যাব, সেখানেই আবির, অনুপ আর অঞ্জলীর সাথে দেখা হবে।

ক্যান্টিনে গিয়ে সিগারেট কিনতে গিয়ে আবদুল্লাহ ভাইয়ের সাথে দেখা। ওনাকে দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেলো। কোনো সন্দেহ ছাড়াই উনি আমার দেখা শক্ত মানুষদের মধ্যে একজন। প্রথম বছরেই ইডেন কলেজের এক মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন, প্রেমটাও চলেছিলো দেড় বছরের মতন। উনি যখন থার্ড ইয়ারে, ওই মেয়ের বাবা মা গ্রীন কার্ডধারি এক পাত্রের সাথে ওই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন। আমি ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলাম একেবারে মেয়েটার বিয়ের দিন। গোটা হলে খোজাখুজি করার পরে উনাকে পেলাম ছাদে গিটার হাতে নিয়ে বসে আছেন, চোখ লাল, গালে কান্নার শুকনো দাগ। আমাকে দেখেই হাসলেন,
— আমি জানতাম তুই আসবি।
— আবদুল্লাহ ভাই, আমি খুবই সরি …………
উনি হাসলেন,
— এই তোর সরি হওয়ার কি আছে রে ? তুই স্বাতিকে বিয়ে করছিস নাকি ?
— আপনি কেমন আছেন ভাইয়া ?
— ভালো না, কিন্তু মাঝে মাঝে আসলে কিছুই করার থাকে না। যা হোক, আশা করছি স্বাতি আমাকে ভুলে গিয়ে সুখে থাকুক।
আমি খুবই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— কেন ??
— তুই হয়ত আমাকে পাগল বলবি, কিন্তু এই তিন চার ঘন্টা একা চিন্তা করার পরে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আসলে কর্মফল, আমার না যদিও।
আমি প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে থাকি। উনি মৃদু স্বরে বললেন,
— দেখ, আমার এখন দেবদাস হয়ে যাবার অপশন আছে। আমি যদি আমার জীবন একা কাটিয়ে দেই, লোকজন তেমন কিছু বলবে না। কিন্তু মনে কর কোনো একটা মেয়ে ছ্যাকা খেয়ে একা জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়, এক পর্যায়ে আমরাই কানাঘুষা শুরু করবো, কি ব্যাপার, মেয়েটা বিয়ে করে না কেন, কি সমস্যা। পুরনো প্রেমিকের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে তাকে নতুন করে শুরু করতে হবে এবং ব্যাপারটার জন্যে ডাইরেক্টলি বা ইনডাইরেক্টলি আমরাই ওকে বাধ্য করছি রে। আবার দেখ, মনে কর তুই যদি তোর চাইতে যোগ্য মেয়ের প্রেমে পড়িস, সে যদি তোকে পাত্তা না দেয়, তাহলে হয়ত তুই না, তোর বন্ধু বান্ধব মেয়েটাকে অহংকারী, দেমাগী – এসব বলে তোকে স্বান্তনা দেবার চেষ্টা করবে। আবার মনে কর, যদি সেই যোগ্য মেয়েটা তোকে এক্সেপ্ট করে, তাহলে হয়ত তুই চমৎকার প্রেম করলি, কিন্তু যখন সংসার শুরু করবি, সে যদি তোর চাইতে ভালো ক্যারিয়ার বানায়, তুইই হীন্মন্যতায় ভুগবি, তাও যদি না প্রথমে না ভুগিস, তোর বন্ধু বান্ধব বা কলিগদের গুতায় তুই হীন্মন্যতায় ভোগা শুরু করবি। রেজাল্ট কি হবে – তোর সংসারে অশান্তি। ঠিক বললাম নারে?

আমি মাথা নাড়াই। হয়ত ওনার কথা ঠিক।
— আসলে আমরাই ওদের জন্যে নিয়ম ভাঙ্গার কোনো পথ রাখিনিরে। স্বাতিকে কিভাবে দোষ দেই বল ? আমি আমাদেরই বানানো সিস্টেমে পড়ে গেসি।
বলতে বলতে হেসে দিলেন।

আসলেই ক্যাডেটরাই নিজের কষ্ট নিয়েও জোক্স করতে পারে। ইস … স্বাতি আপা কি জানেন এখনও আবদুল্লাহ ভাই ওনাকে পাগলের মতই ভালোবেসে যাচ্ছেন ?

গেস্টরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ওকে দেখতে দেখতে সিগারেট খাচ্ছি। কি সুন্দর করে হাত নেড়ে নেড়ে ওর বান্ধবীর সাথে কথা বলছে। আমার সাথে এই রকম ভাবে কথা বলতে পারে না ?

উদ্দেশ্যমুলক গলা খাকরানির শব্দ শুনে পিছনে তাকিয়ে দেখি আবদুল্লাহ ভাই সবজান্তা ভাব করে তাকিয়ে আছেন।
— তোকে উপদেশ দেই, ভালো জিনিস পাস করে দিতে হয়না।
— হে হে …… কি বলতেসেন ভাইয়া …… বুঝতেসি না ……
— তোকে হ্যাবলার মতন ওই মেয়ের দিকে তাকায়ে থাকতে দেখসি আমি ক্যাম্পাসে, টি এস সি তে, শহীদ মিনারে …… ইন ফ্যাক্ট সব জায়গার কথা বলা শুরু করলে সেটা হলের ফিস্টের বাজারের লিস্ট থেকে বড় হয়ে যাবে।
আমি কিছু বলি না, কি লাভ … । সিগারেট ধরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— বলিস না কেন ?
— ভয় হয়, যদি না পাই বা যদি না ধরে রাখতে পারি …………
উনি খুব ঠান্ডা চোখে আমাকে দেখলেন,
— কমপক্ষে তোর জানা থাকবে যে তুই চেষ্টা করসিলি। আর যদি না ধরে রাখতে পারিস, যদ্দিন ধরে রাখসিলি তত দিনের চমৎকার স্মৃতি তোর সারাজীবন থাকবে।
— বস, যদি না ধরে রাখা যায় তাহলে সেটা বেদনার স্মৃতি হবে।
উনি হাসলেন,
— তুই প্রোগ্রামিং লজিকে ভালো হতে পারিস রে, কিন্তু এখনো তোর অনেক কিছু শেখার আছে। জীবনটা বাইনারি লজিকে চলে না।

তাই কি?? সুখের বিপরীত কি দুঃখ না ? নাকি জীবনে সুখী না হলে পারলে দুঃখী না হয়েও কাটিয়ে দেয়া যায় ? কি জানি ? এই যেমন রশিদ এই মাত্র ঝাড়ি খেতে খেতে হলে ঢুকলো, ঝাড়ি খাচ্ছে কিন্তু তারপরেও কি রকম সুখি সুখি ভাব। ঝাড়িটা নুপুর দিচ্ছে বলেই কি ?

ওরা সবাই বের হয়ে আসলে টি এস সি এর দিকে রওনা দিলাম। খুব প্রানোচ্ছল পরিবেশ, আমার খুব ভালো লাগে দেখতে। রশিদের ধারনা এখানে বসে প্রেম না করতে পারলে নাকি জীবন বৃথা। সুখি লোকদের মাঝে মাঝেই হিংসে করতে ইচ্ছে হয়। অনেক দিন গাঁজা বা মদের হালকা বা ভারি কোনো নেশা করা হচ্ছে না। যে ছেলেপেলে গুলোর সাথে অভ্যাসটা করতাম সেগুলো মারাত্বক শয়তান আছে। কোনো একজনকে টার্গেট করবে তারা, তার পরে তাকে বেশি করে মদ খাইয়ে দিয়ে মাতাল বানিয়ে তার গোপন সব কথা বের করে নেবে। যদিও ব্যাপারটার বুদ্ধি প্রথমে আমার মাথা থেকেই বের হয়েছিলো, তারপরেও ওর ব্যাপারটা যতদিন মিটমাট না হচ্ছে ততদিন এই সিক্রেট গোপন রাখতে হবে। সাধারন লোক তিলকে তাল বানিয়ে বলে, ওরা বলবে তরমুজ বানিয়ে। আবদুল্লাহ ভাইয়ের কথাগুলো মাথায় ঘুরছে, কিন্তু কিভাবে ? আর এখনত তাও বন্ধুত্বের উসিলাতে কাছাকাছি থাকতে পারছি, কিন্তু রশিদ-নুপুরের মতন ভাগ্যবান যদি না হতে পারি ? তাহলে তো বন্ধুত্ব রাখাটাও হবে না।

অনুপ আর অঞ্জলী আসার পরে একটা রেস্তোরাতে গিয়ে জমিয়ে খাওয়া দাওয়া করার পরে বইমেলার দিকে ফিরলাম। কাজল শরৎচন্দ্রের বই কিনলো কিছু, আমি ওর কাছে থেকে বইগুলো আপাতত উপহার নিলাম। বই কেনার ব্যাপারে ব্যাপারে আমি মার্ক টোয়েনের তত্ত্বে বিশ্বাসী। পয়সা দিয়ে এমন বই কিনিনা যেটা হারিয়ে গেলে মিস করবো। চোখ কান খোলা রাখি আমার পছন্দ মতন বই বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে কে বা কারা কিনছে, তারপরে সময় এবং সুযোগ বুঝে ধার নিয়ে নেই। তবে অনেকের কাছে থেকে বই মেরে দিতে পারলেও কাজলের সাথে পারা যায়নি। নিজের বইয়ের ব্যাপারে সে কচ্ছপের মতন, আমি ওর তিন চারটা বই হারিয়ে ফেলেছি দাবি করায় সে আমার কাছে থেকে নতুন বই আদায় করেছে। তাই সে বই কিনলে আমি নিয়ে নেই পড়ার জন্যে, তারপরে পড়া শেষ হলে ভদ্রলোকের মতন ফেরত দিয়ে দেই। বইমেলায় কিছুক্ষন ঘোরাঘুরি করে রক্ত দিতে গেলাম, নিয়ন্ত্রিত অবস্থাতে রক্ত দেখতে আমার ভালো লাগে। অনেক বার রক্ত দিয়েছি তার পরেও সুঁচটা দেখলে এখনো ভয় করে কিছুটা। স্বচ্ছ টিউবের মধ্যে রক্ত যাওয়া দেখতে প্রতিবারেই অন্য রকম একটা থ্রিল অনুভব করি। আজ ওকে কিছু একটা উপহার দিতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। সমস্যা হলো, ওকে কিছু দিতে গেলে বাকিদের সবার, কমপক্ষে মেয়েদের সবার জন্যেই কিছু না কিছু কিনতে হবে সন্দেহযুক্ত চাহনি এড়ানোর জন্যে।

একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার বের হয়ে সামনেই একটা দোকানে দেখি কিছু কবিতার বই। একটা বই আমার নজর কাড়লো – পুর্ব ও পশ্চিম বাংলার কবিতা। পাতা উলটে দেখলাম আমি যে কবিতাটি চাচ্ছিলাম, কুড়ানী, ঠিক চার নম্বর কবিতা। যদিও এই কবিতাটা ওর গোটা মুখস্থ, কিন্তু মাঝে মাঝেই দুঃখ করে বইটা হারিয়ে ফেলেছে বলে। ওরা আমার জন্যে অপেক্ষা করছে একাডেমির কাছের গেটের কাছে। তাড়াহুড়ো করে একটা হালকা গল্পের বই, একটা সায়েন্স ফিকশন আর একটা প্রেমের গল্পের বই কিনলাম। ওকে তো কবিতার বইটা দেব, অঞ্জলীকে দেব প্রেমের গল্পের বইটা আর বাকি দু জনকে যেটা আগে হাতে আসবে সেই বই দেব। দুটো নোটবুক ধাঁচের ডায়রিও কিনে ফেললাম। আবার ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়ার সামনে আড্ডায় বসব আমরা। আমি গেটের কাছে পৌছতেই ও প্রস্তাব দিল, হেঁটে হেঁটে যাওয়া যাক। লম্বা রাস্তা হাঁটতে আমার খারাপ লাগে না আর ও সাথে থাকলে তো খারাপ লাগার কোনো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু বাকিরা এমন ভাবে তাকালো যেন আমরা পাগল হয়ে গিয়েছি। ওদের পাত্তা না দিয়ে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু ওরাও আমাদের নির্বিকারভাবকে কোনো পাত্তা না দিয়ে রিকশাতে চেপে বসলো। আজ চমৎকার বাতাস দিচ্ছে, বাতাসে ওর চুল ছটফট করছে। আমি মুগ্ধ হয়ে ওর হাটা দেখছি এমন সময় ও পেছন ফিরে বলল,
— তুই পেছনে কি করছিস ? দুই মিনিট হাটতেই হয়রান হয়ে গেসিস ?
কিছু না বলে একটু পা চালিয়ে ওর পাশে পাশে হাটতে থাকি।
— তারপরে ……… তোর পুরাতন ছাত্রী তো তোর ডিপার্টমেন্টেই চান্স পেলো। এখন আর উপদেশ খয়রাত করিস না??
— পাগল ? আগুনে ঘি ঢালা আর কি ………
— কেন, কি হইসে ? মেয়েটা হলে উঠসে। কথা বললাম সেদিন, খুব চমৎকার মেয়ে তো।
— আমি ভালো করেই জানি সে ভালো মেয়ে, কিন্তু জুনিয়র তো ……।
— কেন, জুনিয়রে কি সমস্যা ?
— দেখ, তুই এসব বুঝবি না। আচ্ছা নুপুরকে দেখছিস, রশিদকে কেমন ঝাড়ির ওপরে রাখে ?
— এটা রশিদের সমস্যা। সে নুপুরকে খ্যাপায়ে দেয়।
এটা যে রশিদের সমস্যা সেটা আমি ভালো করেই জানি। ওর যখন ধারনা হয় যে নুপুর ওকে যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না, তখন কিছু একটা বলে বা করে বা জানিয়ে নুপুরকে রাগিয়ে দেয়। নুপুর তখন মনোযোগ দিয়ে ঝাড়ি দিতে থাকে আর সে ঝাড়িটা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয় এবং মনোযোগটা উপভোগ করে। রশিদের কাছে এই উত্তর শুনে আমি হাঁ হয়ে গিয়েছিলাম। তারপরে একটু কাধ ঝাকিয়ে আবার জানালো, যেদিন ঝাড়ি বেশি হয়ে যায় সেদিন রাগ ঠান্ডা হবার পরে নুপুর নাকি বেশ মন খারাপ করে, মাপ-টাপ চায়, তখন সুযোগ বুঝে অনেক “ফ্যাসিলিটি” নেয়া যায়। তা সে যাই হোক,
— যাই হোক, প্রেম বলিস বা সংসার বলিস, তোরা মেয়েরা আমাদের ঝাড়ি মারতে পছন্দ করিস।
— তোরা ঝাড়ি মারার মতন কাজ করবি তো কি করবে ……
— পয়েন্ট সেটা না, পয়েন্ট হলো, ঝাড়ি যখন খেতে হবে, জুনিয়র মেয়ের কাছ থেকে কেনো খাবো ?? এজন্যই আসলে আমি সিনিয়র মেয়েদের বেশী লাইক করি।
— তোর মাথা আসলেই …………
— শোন শোন, তোর জন্যে একটা জিনিস কিনেছি।
একটা নোটবুক ওর হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বললাম,
— এইখানে তুই লিখবি।
— কি লিখবো ??!!
— ওই তুই গাধা যে আরেক গাধাকে পছন্দ করিস তাকে নিয়ে তোর চিন্তা ভাবনা লিখবি। চিন্তা করে দেখ, কোনো দিন যদি তুই গাধা এবং ওই গাধা সাহস করে একে অপরের প্রতি অনুভুতি স্বীকার করতে পারিস, তোর লেখাগুলো পড়ে সে কি রকম অবাক এবং খুশী হবে।
— এই তুই কেমনে জানিস আমি যাকে পছন্দ করি সে গাধা ………
— গাট ফিলিংস ………

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ও ওর ডিপার্টমেন্টের কাউকে পছন্দ করে বা কাছাকাছি কেউ বা ভালো মেলামেশা আছে এমন। আশা করি আবির না। কোনো কাজিনও হতে পারে অবশ্য, তবে সে সম্ভাবনা কম। ধুর ……
— আর যদি তার সাথে আমার বিয়ে না হয়?
— তাহলে যার সাথে হবে তাকে প্রথমেই বলবি, “ওগো, আমি তোমাকে অমুক নামে ডাকতে চাই, আমার খুব শখ”। তাইলে পরে সে তোর ডায়েরি দেখে ফেললেও আর সমস্যা নাই।

টুকিটাকি কথা বলতে বলতেই রাস্তা ফুরিয়ে এলো। ক্যাফেতে পৌছেই একটা কোক ধরলাম আর সিগারেট ধরালাম। ওদের দিকে তাকিয়ে দেখি পুরাতন দিনগুলোর মতই আবির আর অনুপ একে অপরকে পচানোর চেষ্টা করছে আমাদের ক্যাডেট জীবনের নানারকম কাহিনী বলে বলে। এইমাত্র রশিদ একটু বেশি হেসে ফেলায় ওরা দুজন মিলে রশিদের পেছনে লাগলো। নুপুর প্রানপনে এখন রশিদকে ডিফেন্ড করছে। ক্যাফের চারদিকে অলস চোখ বুলিয়ে অনেক পরিচিত অপরিচিত মুখ দেখা গেলো। আমার দুই ব্যাচ জুনিয়র এক ছেলেকে দেখলাম খুব মনোযোগ দিয়ে তার এক বান্ধবীকে পড়া বোঝাচ্ছে, চোখাচোখি হতেই হাসলো। ওদের প্রায়ই একসাথে দেখি এখন। খুবই ভালো ছেলে, একই হাউসে ছিলাম। ওকে দেখে মনে হলো, আমারও মনে হয় আরো অনেক আগেই চেষ্টা শুরু করা উচিৎ ছিলো। আর এক-দেড় বছর, তারপরেই তো রোজগারের ধান্দা শুরু করতে হবে। নুপুর আর রশিদ চাকুরির ব্যবস্থা হলেই বিয়ে করে ফেলবে। অঞ্জলী যেহেতু আমাদেরই ব্যাচমেট, অনুপকেও সেই লাইনেই চিন্তা করতে হবে। জীবনের আসল এবং শক্ত অংশটা প্রতিদিনই এখন খুব কাছে চলে আসছে।

——————————-

ঘুম আসছে না, তাই ছাদে এসে শুয়ে শুয়ে চাঁদ দেখছি। ভাবছি কাল কি করা যায় …… সেই একই ক্লাস, আড্ডা, ওকে দেখে মনে মনে হা হুতাশ। জীবনটা আসলেই একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে। আসলেই জীবনটা ক্যান্ডি বাক্সের মতন, প্রতিটা দিন সেই একঘেয়ে সাধারন স্বাদের ক্যান্ডি, মাঝে মাঝে একটু ভালো স্বাদেরটা পাই, কিন্তু সেটা মুখে ঠিকঠকভাবে লাগার আগেই সেটা শেষ। ভালো স্বাদের আরও ক্যান্ডি পাবার জন্যে লোভির মতন খেয়ে যেতেই থাকি, খেতেই থাকি। হঠাৎ করে বাক্সটাই শেষ হয়ে যায়। এত কষ্ট করে লেখাপড়া করছি, কিন্তু কেনো ? এত জ্ঞানী হয়ে কি করবো, যদি আমার একান্ত নিজের কথা বলার বা বোঝার জন্যে কেউ না থাকে ? স্বামি-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে সম্পর্কটা কি শুধুই শরীরকেন্দ্রিক ? না মনে হয়। মনে হয় মানুষ প্রেম করতে চায়, কারন সে জানে তার ভালোবাসার মানুষটা শুধু কথা বলেই তার দুঃখগুলোকে কমিয়ে দিতে পারে এবং আনন্দগুলো বাড়িয়ে দিতে পারে। চোখ বন্ধ করে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করি। চোখের পাতার ওপরে জ্যোৎস্না পড়ছে। আগামিকালের একঘেয়ে রুটিনের জন্যে জেগে উঠতে ইচ্ছে করছে না, কিছু চেঞ্জ চাই। অনেক দিন ফুল ফোটা দেখা হয়নি, লজ্জাতে দলা হয়ে থাকা একটা কুঁড়ি কিভাবে সময় হলেই গর্বের সাথে নিজেকে মেলে ধরে। আসলে আবদুল্লাহ ভাইয়ের কথাই ঠিক, জীবনে একটা হলেও সন্তুষ্টি চাই। শুধু – “চেষ্টা তো করেছিলাম” – হলেও।

———————————————————–
পরের গল্প
তুমি আজ ভালোবাসোনি ………
আজ কাজলের বিয়ে ………

৩,১১১ বার দেখা হয়েছে

৩৪ টি মন্তব্য : “বলতে চাই … তোমাকেই চাই”

  1. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)
    এজন্যই আসলে আমি সিনিয়র মেয়েদের বেশী লাইক করি।

    :thumbup: :thumbup:

    শেষ প্যারার আত্মোপলব্ধিটুকু :hatsoff:
    দোস্ত, সেরকম হচ্ছে :boss:
    তোর লেখা পইড়া পেরেম ভালোবাসা করতে মঞ্চাইতাছে এখন 🙁


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  2. রুবেল (৯৯-০৫)
    ওর ওপরে ঝাপিয়ে পড়লাম —

    – ছাড় !! ছাড় বলতেসি !! কি হইসে তোর ?!!

    :)) :)) :)) :)) :))

    পুরা.......মনপুরা..পুরি...........ভাই একটু খোলাসা কইরা বলবেন কি? 😀 😀 😀 😀
    ঝাপিয়ে পরার পর scene টা কেমন ছিল........... (বেয়াদবি হয়ে থাকলে মাফ দিয়েন...কারন জানিনা...এইটা কার story...)

    জবাব দিন
  3. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    তুমি তো দেখি ছ্যাকা কাহিনী লিখতেছ। ছ্যাকা কাহিনী পড়লে মন খারাপ হই যায়।

    শোন, প্রথম খবর হইলো গিয়া, কবিতা এখনো পাইনাই, চিটাগাং এর বইয়ের দোকান ঘুরাঘুরি শেষ করছি। নাই। রংপুরে খবর লাগাইছি, পাওয়ার একটা আশা আছে, সুষম ভাই (আমার বড় ভাই) সাতদিনের সময় চাইছে। এইটা ফেল মারলে আজিজি মার্কেটে যাওয়া লাগবে।

    পরের খবর হইলো গিয়া, তুমি কি সিরিজ লিখতেছ নাকি? এতদিন বুঝি নাই। আইজক্যা মনে হইলো এইটা সিরিজ করতাছ তুমি। কোন পোষ্টের কমেন্টে এইটা স্বীকার করছ দেখলাম।

    দুনিয়ার যাবতীয় সিরিজ কে আমার তরফ থেইক্কা মাইনাস।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
    • মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)

      আসলে বস, বিবেককে টেনে আনলে কথোপকথন বেশী হয়ে যেতো। আর এইখানে কথোপকথন দিয়ে যে ঘটনাগুলো দেখানোর চেষ্টা করেছি সেগুলো কিভাবে বর্ণনা করব বুঝতে পারছিলাম না। এই জন্যেই একটু বিবেকহীন হয়েছি। ইনশাল্লাহ, তাড়াতাড়ি দিয়ে দেব পরের পর্ব।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।