আরো একটি অনু গল্প

১.
রাত দ্বিপ্রহর প্রায়। শহর থেকে মাইলখানেক দূরে পাহাড়ী রাস্তা। অন্ধকার চিরে হেডলাইট দু’টি এগিয়ে চলছে। প্রকৃতির নিস্তব্ধতা আরো বেশি রহস্যময় করে তুলেছে এই পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথটাকে। একটু পরেই এখানে একটা খুন হবে, এ সবই যেন তার আয়োজন।

এসব নিয়ে অবশ্য তাদের কোন চিন্তা নেই। তারা কেবল শিখেছে পরস্পরের সাথে জুড়ে থেকে কাজ করে যেতে। এ ছাড়া অন্য কোন চিন্তা তাদের মাথায় খেলে না। আসলে প্রকৃত সত্য বললে তাদের কোন মাথাই নেই। তারা সামান্য যন্ত্র বিশেষ।

তবে তাদের উপর ভর করে যে পাঁচজন মানুষ বসে আছে তারা বেশ চিন্তিত। এদের কারো আছে মৃত্যু চিন্তা, কারো আবার স্যারকে খুশি করার চিন্তা। ক্যাপ্টেন আহসানের চিন্তা অবশ্য পুরো কাজটি নিয়ে। মাস ছয়েক হল সে র‌্যাবে এসেছে, চিটাগাং। মাইনে বেড়েছে চার হাজার। অবশ্য সে অনুপাতে কাজ বেড়েছে চারগুণ।
আগে হাইপোথিটিক্যাল অনেক শত্রু মেরেছে। সরাসরি মানুষ হত্যা এই প্রথম। উপরের নির্দেশ, কাজটা তাকেই করতে হবে।

এই মুহূর্তে রিভালবরটা তার কোলের উপর। চেহারায় একটা উদাসী ভাব আনার চেষ্টা করছে সে। যেন পুরো ব্যাপারটাই ডালভাত। সে জানে এসব নিয়ে তার সঙ্গীরা পরবর্তীতে কথা বলবে। এরকম গুরুত্বপূর্ণ কাজে কে কতটা ড্যাম কেয়ার থাকতে পারে তা নিয়ে শ্রদ্ধামিশ্রিত গল্প হয় বেশ। সে কোন বীরগাথা তৈরি করছে না কিন্তু আড়ালে হাসাহাসি না হোক অন্তত। সে কারণেই আসার সময় সে বিরিয়ানি নিয়ে এসেছিল, পা নাচাতে নাচাতে এখন তাই খাচ্ছে। ফলে চিন্তাটা অন্য খাতে বইতে শুরু করেছে। এবার কাজ শুরু করা যেতে পারে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ড্রাইভারকে বললেন- দ্যাটস এনাফ। গাড়ি রাখ। আর ফারুক..
-জ্বি স্যার?
– আপনারা মাল রেডি করেন, রাস্তায় আলো দেন।

মালটার কানেও কথাটা গিয়েছে। সে জানে আর কিছুক্ষণ পরই তাকে ঘিরে একটা নাটক হবে। তাকে দৌড়াতে বলা হবে। যেন তাকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে। তারপর পেছন থেকে এরা গুলিটা করবে।
আসলে মুক্তিই তো বটে। ক্ষুধা থেকে মুক্তি, অপরাধ থেকে মুক্তি, জীবনের নেশা থেকে মুক্তি। টিকে থাকার চেষ্টা থেকে মুক্তি…..মুক্তি সকল রক্ত পিপাসা থেকে। ফুলির হাত থেকেও মুক্তি। আহা, মালটা বড় ভাল। কেমন নেশা নেশা চেহারা। মদির চোখ। বাচ্চু হারামজাদারে ধ্বংস করে এসেছিল ওরে খেতে। কিন্তু ওইটা তো কোন পুরুষ মানুষ আছিল না। তাই জব্বারের মত পুরুষ মানুষ পেয়ে মজে গিয়েছে মাগী। ধর-পাকড় শুরু হলেই তাই ওকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল দূরে কোথাও। ছোট্ট একটা ঘরের স্বপ্ন তার অনেকদিনের। হল না। আহা!

গোটা দুই ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে ফেলা হল ওকে। খুলে দেয়া হল পা, মুখ আর চোখের বাধন। দাড় করানো হল গাড়ি থেকে দশ মিটার দূরে, সেগুন গাছটার গোড়ায়। পিস্তল হাতে সবাই ঘিরে ধরল।

ক্যাপ্টেন আহসান আস্তে ধিরেই নামলেন। চেম্বার ভরা গুলি তবু এই ফাঁকে আর একবার চেক করে নিলেন। সাবধানতা এবং স্টাইল। হাতে সময় বেশি নেই। অপরাধী কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাজটা শেষ করতে হবে। মৃত্য ভয়ে ভীত কোন চেহারা সারাজীবন বয়ে বেরাবার কোন ইচ্ছেই তার নেই।
তবু কি হাত উঠতে চায়? ক্যাপ্টেন আহসান প্রচন্ড ভাবে লোকটির প্রতি ঘৃনা আনার চেষ্টা করছেন। আটদিন আগে এই লোকটাই ব্যবসায়ী আরেফীনের বাসায় তার কাটা তিনটি আঙুল পাঠিয়েছে। মাসখানেক আগেই এই লোকটা কর্ণফুলির বাঁকে তিনটা লাশ ফেলেছে। এই লোকটাই… ক্যাপ্টেন আহসান মনস্থির করে ফেললেন। চট করে রিভালবরটা বের করে টার্গেটে নিয়ে আসলেন।

২.
জব্বার গাছটার নিচে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছিল কখন তাকে দৌড়াতে বলা হবে। সে ভেবে রেখেছে তাকে দৌড়াতে বলা হলেই সে হাসিমুখে বলবে,
-স্যার আমি দৌড়ামু না। আমারে সামনাসামনি গুলি করেন। ব্যাটা মানুষের মত মরি।
লোকগুলি তখন বিভ্রান্ত হবে। চউক্ষে থাকবে ভয়। মরেও এই বিভ্রান্ত দৃষ্টি তাকে প্রশান্তি এনে দেবে।
কিন্তু এদের লিডার লোকটিকে তার ঠিক সুবিধার মনে হয়নি। এ লোক খুবই ভয়ংকর। এ লাইনে বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই তাকে মানুষ চিনতে হয়েছে। চোখ দেখেই আন্দাজ করে নিতে হয়েছে লোকটা কেমন। এই লোককে চমক দেযার আগেই তাকে চমকে দিতে পারে। তাই খুব খিয়াল কইরা..খুব।

এইতো শালা গাড়ি থেকে নামছে। গুলি টুলি ঠিক করছে। আগেভাগে আবার মেরে দেবে না তো? হ্যা, তাইতো। ঝট করে মেরেই তো দিল। ভয়ে জব্বার চোখ বন্ধ করে ফেলে। বুকের ডান পাশটায় পরপর দুটো ধাক্কা মত অনুভব করে সে। পড়েও যায়। এখনি কি তার মৃত্যু যন্ত্রনা শুরু হবে?

মিনিট দুয়েক কেটে যায়। জব্বার কোন রকম যন্ত্রনাই অনুভব করে না। মারা যায়নি তো সে? এ এক অন্য কোন জগত নয় তো! কিন্তু শ্বাস তো চলছে অবিরাম। পরানের ধকধকও শোনা যায়। ঘটনা কি? চোখ খোলে সে। যে ডান পাশটায় ধাক্কা মত খেয়েছিল সেখানে রক্তের নহর বওয়ার কথা, অথচ রক্তের ছিটে ফোটা দাগও তো নেই। তাহলে কি মিস ফায়ার হয়েছে। হলে হয়েছে, এদেরকে বুঝতে দেয়া যাবে না। মানুষের হাতে সুযোগ বারবার আসে না। তার হাতে এসেছে। এখন ঝোপ বুঝে কোপ মারার পালা।

ওই তো ক্যাপ্টেনের গলা পাওয়া যাচ্ছে।
-ফারুক, হাতের বাধনটা এবার খুলে দিয়ে গাড়িতে আসেন। আর আনোয়ার, আপনি গিয়েই ক্রসফায়ারের প্রেস রিলিজটা করে ফেলবেন।

জব্বার তার চোখের কোনা দিয়ে তাকাল। একজনকে এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। এই লোকের নামই ফারুক হবে হয়ত। হাতে কোন আর্মস নেই। বাকীরা ইতিমধ্যেই গাড়িতে ফিরে গেছে।
একটা ছোট্ট গড়ান দিল জব্বার। ভাগ্যিস লোকগুলি তাকে পাহাড়ের কাছে নিয়ে এসেছিল। খুব বেশি কষ্ট তাকে করতে হচ্ছে না। শরীর আপনা আপনিই ঢাল বেয়ে গড়িয়ে গেল। নিচে নামছে সে। বড় মুক্তির আশায় একটু আধটু গাছের বাড়ি এই মুহূর্তে তাকে মোটেই যন্ত্রনা দিচ্ছে না।

পিছনে হল্রা শুরু হয়েছে। কর শালারা ইচ্ছা মতন চিল্লাপাল্লা কর। আমি এই শব্দের মতই মিলিয়ে যাচ্ছি। আর নয় এদেশে। অনেক অনেক দূরে চলে যাব, ভাবছে জব্বার। ফুলিটারে নিতে পারলে ভাল হত। মাগীটার বড় ঘর বাধবার শখ। মালটাও খারাপ না। কিন্তু ওর কাছে এখন যাওয়া যাবে না। এই শালারা সব জানে। এখানে তাকে না পেলেই ফুলির ওখানে গিয়ে ওত পেতে থাকবে। ভুলেও ওখানে যাওয়া যাবে না। একবার সে ধরা খেয়েছে, আর না। ন্যাড়া বেল তলায় একবারই যায়।

এক সময় পাহাড় ফুরায়ে সমতলে নামল সে। পিছনে তাকাল। নাহ, দুইন্যায় শান্তি নাই। তীব্র আলোয় ফেলে আসা পথটা ভেসে যাচ্ছে। শালারা পিছু নিয়েছে। আসছে। শালারা বেশ তাড়াতাড়িই আসছে।
শরীরের অসংখ্য জায়গায় কেটে কুটে গিযেছে কিন্তু দেখার সময় নাই। লম্বা একটা দম নিয়ে দৌড় লাগাল সে। একটু পরেই স্যাঁতস্যাঁতে মাটি পাওয়া গেল। কাছেই তাহলে নদী। গাছপালা কমে যাওয়ায় সুবিধাই হয়েছে। আরো জোরে দৌড় দিল সে, কিছু দূরে পা পিছলে নদীতে পড়ল। কি ঠান্ডা পানি! বাহ! কি শান্তি। খুশিতে দু এক ঢোক গিলেও ফেলল। আহা জীবনের কি স্বাদ!
এখন শুধু ডুব আর ডুব। নদীতে আলো ফেললেও তাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম। কোনমতে নদীটা পার হতে পারলেই..জব্বার চোখ বন্ধ করে প্রানপণে সাতরাতে লাগল। কেটেকুটে যাওয়া শরীরে জল লাগায় তীব্র বেদনা হচ্ছে। তবু তার মুখে ফুটে উঠল মুক্তির আনন্দ আর প্রশান্তির ছায়া।


ক্যাপ্টেন আহসান ঠিক তখনি গুলিটা করলেন আর ভাবলেন মৃত্যুর আগে বুঝি সবার মুখে এমন প্রশান্তি নেমে আসে।

৬,০৬৬ বার দেখা হয়েছে

১০০ টি মন্তব্য : “আরো একটি অনু গল্প”

  1. তৌফিক (৯৬-০২)

    কমেন্টে ফয়েজ ভাইরে বিট করতে পারলাম না। 🙁

    আমার খুব পছন্দ হইছে টিটো ভাই।
    প্যারালাল পারস্পেকটিভটা খুব ভালোভাবে টানছেন, নির্বিকারচিত্তের বর্ণনা, কোন জাজমেন্ট নাই। :boss: :boss: :boss:

    জবাব দিন
  2. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    এক নিঃশ্বাসে পড়লাম। 😀 ফাটাফাটি দিছ। কামরুল তো ছবি বানানোর জন্য লাফাইবো মনে হয়।

    তয় একটা কথা, আমি তো জানি আহসান মেজর, তুমি অরে ডিমোশন দিয়া দিলা। আর এত ভালো পোলাটারে দিয়া মানুষ মারলা, হোক না সন্ত্রাসী। 😕


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  3. ভালো লাগছে।
    ড্রাফটে সেভ করা ছিলো বলে কিছু অংশ আগেই পড়ে ফেলছিলাম, তখন থেকে ভাবতেছিলাম, গল্পটা কোন দিকে যাবে। 😛 মিলেনি। 😛

    নাম দেস নাই ক্যান। "আরো একটি অনু গল্প" ছাড়াও গল্পটা অবশ্যই একটা আলাদা নাম দাবি করে। 🙂

    জবাব দিন
  4. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    গল্পটা পড়তে গিয়ে শুরুতেই এক্টু ধাক্কা খেলাম, নিজের নামের সাথে মিলে যাবার কারনে।
    গল্পের প্যারারাল পারস্পেকটিভ ভাল লেগেছে।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  5. তাইফুর (৯২-৯৮)

    টিটো, আমি আগেই বলেছি ... আমি তোমার 'ফ্যান'গোত্রীয়।
    গল্প হিসেবে অসাধারণ ...
    তবে ...
    ক্রসফায়ারের কিছু ডিটেইল তুমি দিয়েছ, যা সাধারণ লোকের জানার কথা না ...

    -ফারুক, হাতের বাধনটা এবার খুলে দিয়ে গাড়িতে আসেন। আর আনোয়ার, আপনি গিয়েই ক্রসফায়ারের প্রেস রিলিজটা করে ফেলবেন।


    পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
    মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

    জবাব দিন
  6. রকিব (০১-০৭)

    অসাধারন...... :gulli: :grr:
    কিন্তু একটা ব্যাপার... ডিমোশন পেয়ে ক্যাপ্টেন হবার শোকে... আহসান ভাই আবার সত্যি একটা ক্রস ফায়ার না করে ফেলেন...তবে তাতে ভিকটিম জব্বার না হয়ে টিটো ভাইয়েরই হবার সম্ভাবনা বেশি মনে হচ্ছে...। :gulli2: :gulli2:


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  7. তারেক (৯৪ - ০০)

    টিটো,
    লেখাটা ভাল লিখছিস, কিন্তু দয়া করে আরেকবার পড়।
    অনেকদিন আগে একটা ইংরেজী সিনেমা দেখছিলাম, পরপর কয়েকটা দৃশ্য। শত্রুপক্ষ একটা লোকরে ফাঁসীতে ঝোলায়, লোকটা কেমন করে জানি ফাঁসীর দড়ি ছিড়ে পড়ে নদীতে পড়ে যায়। তারপর সাঁতরে নদী পেরিয়ে ওর বাড়িতে গেলে ওর বউ বাচ্চারা ছুটে আসে। লোকটা দৌড়ে গিয়ে ওদের জড়িয়ে ধরে। এইটুকু দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই পরের দৃশ্য- লোকটা ফাঁসীর দড়ি গলায় নিয়ে ঝুলে আছে- এবং মারা গেছে। ঐ অংশটুকু ওর মৃত্যুর পূর্ববর্তী কল্পনা।
    তোর গল্পটায় ঐ সিনেমাটার ছায়া পেলাম বেশ।
    আমি এই মন্তব্যটা লিখবো না ভেবেছিলাম, একটা কারণে লিখলাম। আমার ধারণা, তুই ওই সিনেমাটা দেখিস নাই, কোন না কোন ভাবে চিন্তার স্টাইলটা মিলে গেছে। এরকম হয়, আমি দেখেছি, কদিন আগে দেখেছিলাম অন্য একটা ব্লগে প্রায় একই ব্যাপার। তাই সাহস করে লিখে ফেললাম তোকে।
    সিনেমাটার নাম মনে করতে পারছি না, পারলে জানিয়ে দিবো।


    www.tareqnurulhasan.com
    www.boidweep.com

    জবাব দিন
  8. আন্দালিব (৯৬-০২)

    অনেক জোওস লাগলো গল্পটা। এটা দেখতে ভালো লেগেছে যে দু'টা ক্যারেক্টারকেই প্রকাশিত বিকশিত হবার সুযোগ দিয়েছএন। তবে শেষপর্যন্ত আপনিও সেখানে অপরাধীকে একটু বেশি স্পেস দিয়েছেন। নারীকামনা চলে এলে পাঠক সেই চরিত্রের সাথে বেশি রিলেট করতে পারে। (সবার কমন পড়ে আর কি!) যদি অফিসারেরও বাসায় রেখে আসা (বা অন্যশহরে রেখে আসা) স্ত্রীর চরিত্র তুলে আনতেন তাহলে সত্যকারের ডিলেমায় পড়তো পাঠক।

    সে যাই হোক, আমার গল্পটা ভালো লেগেছে এটাই জরুরী। সামনে পেছনের লেখাগুলোও পড়ে ফেলবো সময় করে। ভালো থাকবেন।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।