প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা-৪

প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা-১
প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা-২
প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা-৩

রবিবার থার্ড পিরিয়ডের পর আমি আর স্বাতী চলে গেলাম লাইব্রেরীতে। ঐদিন আর ক্লাস ছিলনা। সাথে করে ল্যাব সংক্রান্ত কিছু নোটসও নিয়ে গেলাম যাতে বুঝতে পারে আমি কিছুটা প্রিপারেশন নিয়ে এসেছি। লাইব্রেরীতে জানালার পাশটায় যেখানে আলো বেশী ওখানে গিয়ে বসলাম, মুখোমুখি। প্রথম ল্যাব থেকে পড়াগুলো বুঝানো শুরু করল স্বাতী। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত ওর দিকে তাকিয়ে ওর কথাগুলো মস্তিষ্কে গেঁথে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকলাম। অনেক কিছু বুঝলাম, আবার কিছু বুঝলাম না। যেগুলো বুঝলাম না সেগুলো আবার বুঝিয়ে দিতে বললাম। একটু ভয়েই বললাম পাছে আবার না বিরক্ত হয়ে যায়। না, বিরক্ত হল না। আগ্রহী ছাত্র পেয়ে কিছুটা খুশীও হল মনে হয়। অথবা নিজের জ্ঞানটুকু ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ পেয়েও খুশী হতে পারে! আমার তাতে কি? আমি তো ওকে বিরক্ত না হতে দেখেই আনন্দিত। বাচ্চাদের যেমন করে সব কিছু আস্তে আস্তে করে বুঝিয়ে পড়াতে হয়, স্বাতীও ঠিক সেভাবেই আমাকে পড়াচ্ছিল। আমার ভিতরের বাচ্চা মানুষটা যেন আরও বাচ্চা হয়ে যেতে চাচ্ছিল। কখন যে সময় গড়ালো টেরই পেলাম না! ওর ভিতর সামান্য উশখুশ দেখতে পেয়ে একটু অবাক হলাম। কিছুক্ষন পর করে আশেপাশে চারদিক ফাঁকা হতে দেখে হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম খাবার সময় হয়ে এসেছে! কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, স্যরি! এখন খাওয়ার সময় হয়ে গেছে, আমার জন্য তোমার দেরী হচ্ছে। ঠোটের কোনে মুচকি একটা হাসি ঝুলিয়ে রেখে ও বলল, ইটস ওকে। ঐদিনের মত বিদায়ের আশু আভাসে মন খারাপ হয়ে গেল। আবার কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বাকী পড়াগুলোর কি হবে? ঠোটের হাসিটাকে আগের মতই অক্ষুন্ন রেখে ও বলল- আফটার লাঞ্চ।

লাঞ্চ একসাথে করব নাকি করব না দ্বিধায় পড়ে গেলাম। একসাথে খাওয়ার কথা বললে যদি মাইন্ড করে বসে? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে খেয়াল করলাম ও একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বোকারা মাঝে মধ্যেই সাহসের কাজ করে ফেলে। আমিও সাহস করে বলে ফেললাম- চল, ক্যাফেতে খাই। খাওয়া শেষে দেখি স্বাতী পার্স থেকে টাকা বের করছে। আমি ঢোক গিলে বললাম- আমি দিয়ে দিই? ও বলল- আমার বিল তুমি কেন দিবে? আমি থতমত খেয়ে চুপচাপ মেনে নিলাম। কিছুক্ষণ পর লাইব্রেরীর জানালার পাশে আবার পড়া বোঝা পর্ব। সময় যে কারও জন্য থেমে থাকেনা তা বুঝতে দেরী হলনা। সবগুলো ল্যাবের পড়া বুঝে নেয়া হলনা বিকেলের মধ্যে। কপালের একপাশ ঢেকে দেয়া চুলের গোছাটুকু আলতো করে কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে স্বাতী বলল- আমার তো এখন বাসায় যেতে হবে। কাল বাকীটুকু বুঝিয়ে দিব। মুখে বললাম- ঠিক আছে। আর মনে মনে বললাম শুধু কাল কেন, আমি হাজার বছর ধরেও বুঝতে রাজী। হলে গিয়ে কম্পিউটারে স্লো বিটের কয়েকটা গান ছেড়ে দিয়ে রুমের পিছনের প্রিয় বারান্দাটায় এসে চুপচাপ সারাদিনের ঘটনাগুলো মনে করে সুখ খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। সন্ধ্যার আকাশটাকে অনেক দিন পর আজ খেয়াল করলাম। কলেজের মাগরিবের নামাজ শেষে ফার্স্ট প্রেপে যাওয়ার আগের মুহূর্তের রঙ্গীন আকাশটা যেন অনেক দিন পর আমার সাথে দেখা করতে এল!

পরের দিন এল, কয়েকটা ক্লাস হল, ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে যথারীতি স্বাতীর দিকে তাকালাম। দুপুর পেরিয়ে বিকেল চলে এল, আমাদের একসাথের পড়ালেখাও শেষ হল। মঙ্গলবারের পরীক্ষাটাও খুব একটা খারাপ হল না। ক্লাস আবার চলতে থাকল আপন গতিতে। মঙ্গলবারের ল্যাবের সময়টুকু ছাড়া আমরা আগের মতই দুটি বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতে লাগলাম। একদিন স্যার এসে ল্যাব পরীক্ষার নাম্বার দিলেন। ২৫ এ ১৭ পেলাম। ক্লাসের ভালো ছাত্রদের তুলনায় খুব একটা ভাল না হলেও আমার জন্য অনেক ভাল। স্বাতী পেয়েছে ১৯। নাম্বার পেয়ে ওকে খুশী হতে বা দুঃখ পেতে দেখলাম না। হয়তো আরেকটু বেশী নাম্বার পেতে চেয়েছিল। ভালো ছাত্র-ছাত্রীরা যে কত নাম্বার পেলে খুশী হয় তা বোঝার সাধ্য আমার নাই। দেখতে দেখতে টার্ম ফাইনালও ঘনিয়ে আসতে লাগল। সমানুপাতিক হারে সামনের পরীক্ষাগুলোর জন্য আমার ভয় বাড়তে লাগল। সাথে এও বুঝতে লাগলাম আত্মসমর্পণের সময় হয়ে এসেছে। একদিন ল্যাবে বেশ সাহস সঞ্চয় করে স্বাতীকে বললাম- কেমিস্ট্রি আমি অনেক কম বুঝি, আমাকে বুঝিয়ে দিবা? কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে গেল। সাথে সাথে বললাম, তুমি ল্যাব এক্সামের আগে আমাকে না পড়ালে তো আমি নির্ঘাত ফেল করতাম। এইবার লাবণ্যময়ীর মুখে হালকা একটা হাসি দেখতে পেলাম। বলল- ঠিক আছে। যুদ্ধ জেতার পর যুদ্ধজয়ী সেনাপতির অনুভুতি তখন কিছুটা হলেও বুঝতে পারলাম।

মঙ্গলবারের ল্যাব ছাড়াও অন্যান্য দিনগুলোতে লাইব্রেরীতে আমাদের দেখা হতে লাগল। কেমিস্ট্রির সাথে সাথে অন্যান্য সাবজেক্টে আমার দুর্বলতা বুঝতে পারলাম এবং সেটা যে স্বাতীকে জানানো দরকার তাও বুঝতে পারলাম। মায়েরা যেমন করে বাচ্চাদের আবদার মেনে নেয়, ঠিক তেমন করে স্বাতীও অন্যান্য সাবজেক্টের পড়া বুঝিয়ে দেয়ার আমার আবদার মেনে নিল। আস্তে আস্তে লাইব্রেরীর জানালার পাশের ঐ জায়গাটা মনে হয় একান্তই আমাদের হয়ে গেল। সারাদিন লাইব্রেরীতে একসাথে পড়াশুনা করি, দুপুরে একসাথে খাই, খাওয়া শেষে যে যার বিল মিটিয়ে দেই। বিকেলে স্বাতী বাসায় চলে গেলে আমি হলে এসে উদাস মনে গান শুনি, আকাশ দেখি, পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়া গাড়ি দেখি আর মানুষ দেখি। সন্ধ্যায় সারাদিনের পড়াটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিই, তারপর রুমমেটদের সাথে গল্পে মেতে উঠি। মাঝে মধ্যে সবাই মিলে কম্পিউটারে একটা-দুইটা মুভিও দেখে ফেলি। পরদিন একই ভাবে আরেকটা দিন কেটে যায়। এভাবেই পরীক্ষা খুব কাছে চলে আসে। আমি কিংবা আমরা পড়ালেখায় আরও ডুবে যেতে থাকি। ভয়ে ভয়ে প্রথম পরীক্ষা দেই। খুব একটা খারাপ হয়না। একটা একটা করে বাকী পরীক্ষাগুলো চলে আসে! বসন্ত শুরু হয়ে ভ্যালেন্টাইন্স ডে কবে চলে যায় তা টেরও পাইনা! শেষ হয়ে যায় টার্ম ফাইনাল। সামনে আপাতত এক-দেড় মাসের অখন্ড অবসর। কিন্তু এই অবসর দিয়ে আমি কি করব? আগে কখনই পরের টার্ম শুরু হওয়ার জন্য এতটা আকুল হয়ে অপেক্ষা করিনি। সময় থেমে গেল এবং চলতেও শুরু করল। হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম পরের সপ্তাহেই রেজাল্ট দিবে। রেজাল্ট পাওয়ার চেয়ে স্বাতীকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা যে আমাকে আরও স্বপ্নীল করে তুলছিল সেটা বোধ করে কাউকে বলে দিতে হবেনা!

(চলবে)

৯,২৪৭ বার দেখা হয়েছে

৯২ টি মন্তব্য : “প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা-৪”

  1. বন্য (৯৯-০৫)

    তানভীর ভাই এই পর্বটা মারাত্মক হইসে. :thumbup: :thumbup: ..লাইব্রেরী ফাইট..আহা. :dreamy: ..এইটা নিয়া অনেক চ্রম গপ্পো মনে পইরা গেল :khekz: :khekz:
    তয় মিয়া আপনারে এক্কেরে ভেড়া বানাইলাইছেন...যদিও এইরকমই হয়... :awesome: :awesome:

    জবাব দিন
  2. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    হুমমম, এরা তো দেখি পুরা কোপিষ্ট কাপল। এদের বাই-প্রোডাক্ট ক্যামন হইতে পারে ভাবতাছি? :-/

    লেখা পাংখা হইছে, আরও পাংখা হইছে লেখার নীচে "চলবে" কথাটা।

    অফটঃ আমরা পড়াশুনারে কোপানো কইতাম, যারা বেশি কোপাইতো এরা ছিল "কোপিষ্ট", বুঝ গেছে জিনিস্টা 🙂


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  3. সামিয়া (৯৯-০৫)

    🙁 🙁 আমি যদি একটা ছেলে স্বাতী পাইতাম, তাইলে কি পরীক্ষাগুলা এমন দেয়া লাগত?? x-( ক্লাসটেস্টগুলাতে ০০ পাইতাম?? x-( x-( লাইব্রেরীর চিপায় একা একা বসে পড়তে পড়তেই তো জীবনটা কেটে গেল :(( :((
    গল্প সেইরকম আগাচ্ছে তানভীর ভাই :thumbup: :thumbup:
    চলুক না দৌড়াক :tuski: :tuski:
    নেন একটা গান শুনেন :guitar:

    জবাব দিন
  4. তাইফুর (৯২-৯৮)

    তানভীর ... দুর্দান্ত হইছে ... তবে পড়াশুনার দিকে মনযোগ বেশি হয়া যাইতেছে ... লেখক ভাল ছাত্র হইলে যা হয় আর কি ... ;;)

    পড়াশুনা'র পাশাপাশি একটু দ্রুত কাজে লেগে গেলে ভাল হত মনে হয় ... :-B


    পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
    মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

    জবাব দিন
  5. রাব্বি (১৯৯৮-২০০৪)

    "কলেজের মাগরিবের নামাজ শেষে ফার্স্ট প্রেপে যাওয়ার আগের মুহূর্তের রঙ্গীন আকাশটা যেন অনেক দিন পর আমার সাথে দেখা করতে এল" জুস্ত জুস্ত আরও জুস্ত :salute:

    গুরু আপ্নের লেখা পইরা একটা স্বাতীর লাগি বুক জলি যাইতেসে। :thumbup: :thumbup:

    জবাব দিন
  6. রহমান (৯২-৯৮)

    এই পর্বটা খুব ভাল লাগল :thumbup:

    "প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা" নামটা দেখে শুরুতেই মনে হয়েছিল শেষটা খুব রঙ্গিন 😡 হবে। এখন পর্যন্ত তাই মনে হচ্ছে। এখন দেখা যাক তানভীর প্রহর শেষে কতটা রাঙ্গাতে পারে ;;;

    জবাব দিন
  7. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    জিহাদ : প্রেমে পড়লে স্বাতী টাইপ না, ওতো মাস্টারনি। চাঁদনি টাইপ মাইয়ার প্রেমে পইড়ো। ভ্যালেন্টাইন ডেতে এবিসির ভালোবাসার ক্যাফে অনুষ্ঠানে বাপ্পা আর চাঁদনি'র আড্ডাবাজি শুনছিলা? আহ্‌! যেন দুরন্ত ঘোড়া, সামাল দেয়া কঠিন। ২৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার বেলা ১২টার খবরের পর পুনঃপ্রচার হবে। শুইনো।

    তানভীর : প্রেমটারে লাইব্রেরি আর ল্যাব থেইক্কা বাইর করন যায় না? ধরো মুসলধারে বৃষ্টি দিনে রিকশায়.............. :no: :no: :no:


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  8. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    এত দিনে কিলিয়ার হইল নায়ক এক্স-ক্যাডেট... B-)
    দুই এক পর্বের মধ্যে মনে হয় আরও স্পষ্ট হবে যে, এটা 'বেজ্‌ড অন ট্রু স্টোরি'... :-B

    সানা ভাইএর দাবীর সাথে একমত... :thumbup:
    এছাড়াও একসাথে বইমেলা, বানিজ্যমেলা, সিনেপ্লেক্স এ মুভি...এসবও চাই... 😀


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  9. রকিব (০১-০৭)

    তানভীর ভাইইইইইইই, এত্তো ভালো লিখেন কেমনে??? আমিও তো অভ্র দিয়াই টিপি, কিন্তু খালি আবজাবই বের হয় :(( । প্রিয়তে যোগ না করে পারলাম নাহ।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  10. সাকেব (মকক) (৯৩-৯৯)
    ... রঙ্গীন আকাশটা যেন অনেক দিন পর আমার সাথে দেখা করতে এল!
    কপালের একপাশ ঢেকে দেয়া চুলের গোছাটুকু আলতো করে কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে...

    তানভীর, সব পর্ব একসাথে পইড়া কমেন্ট করবো ভাবসিলাম...
    এই 'সোনা দিয়া বান্ধায়া রাখার মত' লাইন দুইটা কো্ট না কইরা পারলামনা :boss:


    "আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
    আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস"

    জবাব দিন
  11. হাসান (১৯৯৬-২০০২)
    একদিন ল্যাবে বেশ সাহস সঞ্চয় করে স্বাতীকে বললাম- কেমিস্ট্রি আমি অনেক কম বুঝি, আমাকে বুঝিয়ে দিবা? কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে গেল। সাথে সাথে বললাম, তুমি ল্যাব এক্সামের আগে আমাকে না পড়ালে তো আমি নির্ঘাত ফেল করতাম।

    উপস্থিত বুদ্ধি, ক্যাডেট বইলা কথা :thumbup:

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।