এলোমেলো-৫: বাংলা

১.
খুব সম্ভবত ক্লাস নাইনের ঘটনা। আমাদের পছন্দের বাংলার এক ম্যাডাম ক্লাসে এসে আমাদেরকে একটা দরখাস্ত লিখতে বললেন। বিষয়- গ্রামে একটা দাতব্য হাসপাতাল স্থাপনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন । খুব ভালো কথা, আমিও ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে দরখাস্ত লিখতে বসে গেলাম। আমাদের গ্রামেই কেন লোকজনের দাঁতে খুব ব্যথা হয় এবং এই ব্যথা উপশমের জন্য কেন হাসপাতাল স্থাপন করা খুব জরুরী- এই সংক্রান্ত অনেক চাপাবাজী এক পৃষ্ঠার মধ্যে লিখে (দরখাস্ত এক পৃষ্ঠার মধ্যে লেখার নিয়ম ছিল) ম্যাডামের কাছে জমা দিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পর ম্যাডামের কাছে ব্যাপক ঝাড়ি খেয়ে বুঝে গেলাম দরখাস্তে চাপাবাজী করা মোটেও ভালো নয়।

২.
একই ম্যাডামের সাথে ঘটা আরেকটা ঘটনা। ক্লাস টেনে মাইকেল মধুসূধন দত্তের একটা কবিতা- “কপোতাক্ষ নদ” আমাদের পাঠ্যসূচীতে ছিল। কোন এক পাক্ষিক পরীক্ষায় এই কবিতার বিষয়বস্তু লিখতে বলা হল আমাদের। খাতা দেয়ার পর দেখা গেল আমাদের মাসফিক ফেল করেছে। বাংলায় ফেল করা বেশ কষ্টকর ব্যাপার, মোটামুটি আইডিয়া করে চাপাবাজী দিয়ে পৃষ্ঠা ভরায়ে ফেলতে পারলে পাশটা অন্ততঃ হয়ে যেত। আমাদের মাসফিকও ঠিক বুঝতে পারছিল না বাংলায় তার মেধার এই অবনমনের ব্যাপারটা। ম্যাডামের কাছে কৈফিয়ত চাওয়ায় জানা গেল প্রশ্নোত্তরের একটা লাইন ম্যাডামের মন কেড়ে নিয়েছে এবং তার জন্য এই নাম্বার দেয়া হয়ছে। লাইনটা ছিল- মাইকেল মধুসূদন দত্ত কপোতাক্ষ নদে নিয়মিত গোসল করতেন । ম্যাডাম ওকে জিজ্ঞেস করলেন- কবিতার কোথায় তুমি পেয়েছ যে মধুসূধন দত্ত কপোতাক্ষ নদে গোসল করতেন? মাসফিকের তড়িৎ জবাব- বাড়ির পাশে নদী থাকলে উনি তো গোসল করতেই পারেন, নাকি? এত সহজ সরল যুক্তি ম্যাডাম কেন বুঝতে রাজী হলেন না এই প্রশ্নের জবাব এখনও খুঁজে পাইনি।

৩.
এটা আরেক ম্যাডামের সাথে ঘটা। উচ্চ মাধ্যমিকে আমাদের পাঠ্যসূচীতে একটা গল্প ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের “শকুন্তলা”। মূল গল্প থেকে সংকলন করে আমাদের পাঠ্যে দেয়া ছিল। সেই গল্পের কটা লাইন পরীক্ষায় ব্যাখ্যা করার জন্য দেয়া হল- মহর্ষি অতি অবিবেচক, এমন শরীরে কেমন করিয়া বল্কল পরিধান করাইলেন? এই লাইনের সোজা সাপটা অর্থ হচ্ছে শকুন্তলার মত সুন্দরীকে গাছের ছাল না পড়িয়ে আরও অনেক সুন্দর পোষাক পড়ানো উচিৎ ছিল। পরে অবশ্য এই পোষাকেই শকুন্তলাকে যে অত্যধিক মনোহরিণী, রুপসিনী লাগছিল সেই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যাই হোক, আমার কলেজের এক বন্ধুর এই ব্যাখ্যা জানার সময় ছিল না। সে নিজের মত করে যা লিখে এসেছিল তার সারাংশ হচ্ছে অনেকটা এইরকম- মহর্ষি শকুন্তলাকে বল্কল না পড়ালেও পারতেন, কারণ বল্কল ছাড়াই শকুন্তলাকে আরও অনেক সুন্দর লাগত!!! ম্যাডামের বেখেয়ালে বড়সড় শাস্তি থেকে বেঁচে যাওয়া আমার এই মোটামুটি হুজুর হওয়া বন্ধুটির ঘটনাটা মনে পড়ে কেমন অনুভূতি হয় জানার খুব ইচ্ছা আমার অনেকদিনের।

৪.
এটা অপ্রাসঙ্গিক। কোন সুন্দর লেখা, বা উদ্ধৃতি কিংবা কবিতা ভালো লেগে গেলে একটা ডায়েরীতে টুকে রাখার অভ্যাস ছিল কলেজে। অনেকদিন অবহেলায় পরে থাকা ডায়েরীটাতে চোখ বুলাতে গিয়ে পূর্ণেন্দু পত্রীর একটা কবিতা বা কবিতাংশ নতুন করে ভালো লেগে গেল। কবিতাটা এখানে দেয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না……

যে টেলিফোন আসার কথা
সচরাচর আসে না
প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে
সূর্য ডোবে রক্তপাতে
সব নিভিয়ে একলা আকাশ
নিজের শূন্য বিছানাতে
একান্তে যার হাসার কথা হাসে না,
যে টেলিফোন আসার কথা
আসে না।

৫,২৬০ বার দেখা হয়েছে

৭৫ টি মন্তব্য : “এলোমেলো-৫: বাংলা”

  1. মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)
    মহর্ষি শকুন্তলাকে বল্কল না পড়ালেও পারতেন, কারণ বল্কল ছাড়াই শকুন্তলাকে আরও অনেক সুন্দর লাগত!!!

    =)) =)) =)) =))

    তোমার প্রিয় ওই ম্যাডামের সাথে আমরা একবার খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম ...... ভাবলেই খারাপ লাগে ......

    জবাব দিন
  2. রাশেদ (৯৯-০৫)

    তানভীর ভাই “ব্রহ্মপুত্র নদ” হবে না হবে কপোতাক্ষ নদ 🙂
    এই ম্যাডামের কাছে মাসফিক ভাইয়ের মত কাহিনী আমাদের ক্লাসেও আছে 😛


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  3. নাঈম (৯৪-০০)

    তানভীর, সুন্দর লিখেছিস। মাসফিক মনে হয় আরো কিছু লিখেছিল......যাই বলিস, বাংলায় ফেল করাটা একটা ভাগ্যের ব্যাপার।

    মাসফিকের গল্প লিখেই তো তুই শেয করতে পারবি না.....মাসফিককে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ, সেই স্পাইকের গল্পটা মনে পরে গেল। :))

    জবাব দিন
  4. তৌফিক (৯৬-০২)

    সেলিনা ম্যাডামের কথা মনে পড়ে গেল তানভীর ভাই। বড়ই ভালো মানুষ ছিলেন।

    কলেজে স্যাররা বানান ভুলের জন্য ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং করে নাম্বার কাটতেন। পাবলিক এক্সামগুলাতে সেই সুবাদে বানান ভুল খুব একটা হয় নাই। অনভ্যাসে এখন বাংলা লিখতে গেলেই বানান নিয়া ধন্দে পড়ি। 🙂

    তানভীর ভাইয়ের ব্লগ আরো নিয়মিত চাই। :thumbup:

    জবাব দিন
    • তানভীর (৯৪-০০)

      সেলিনা ম্যাডামকে আমরা কখনও পাইনি।

      বাংলা বানান নিয়ে আগে আমার খুব আত্মবিশ্বাস ছিল, বানান ভুল হতই না প্রায়। আর এখন একটা শব্দ লিখে কিছুক্ষণ চিন্তা করি বানান ঠিক আছে কিনা। এজন্য মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে। 🙁

      ব্লগ লিখতে খুব কষ্ট, আমার মত অলস মানুষের তো কষ্ট আরও বেশি। 😛

      জবাব দিন
  5. সাইফ (৯৪-০০)

    সনি,তোর লেখাটা পড়ে মজা পাইলাম।মাস্ফিক মামার আরেকটা যুক্তি ছিল ম্যাডাম যখন ওকে বল্ল ,তুমি কোথায় পাইছ যে মাইকেল অই নদে গোসল করত।মাস্ফিকের জবাব ছিল এই, ম্যাডাম অই আমলে ত আর গ্রামে এখনকার মত বাথ্রুম ছিল না ,নদী ছিল।বাসার পাশে নদীতে গোসল না করে আর কই গোসল করতে পারে।

    জবাব দিন
  6. মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত কপোতাক্ষ নদে নিয়মিত গোসল করতেন ।
    মহর্ষি শকুন্তলাকে বল্কল না পড়ালেও পারতেন, কারণ বল্কল ছাড়াই শকুন্তলাকে আরও অনেক সুন্দর লাগত!!!

    :khekz: :khekz:

    জবাব দিন
  7. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    :)) :))
    শকুন্তলা নিয়া বহুত কাহিনী।
    কইতে গেলে বাক্স বড় হইয়া যাবে।

    মজা পাইছি দুস্ত।
    রোজা ধরছে, তাই বেশি বড় কমেন্ট করলাম না। ;;;


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  8. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    ইফতার পার্টিতে চিপা-চুপায়, তব্ধা মাইরা বইয়াছিলা ক্যান? রোজায় ধরছিলো??

    মাসফিকের কাহিনী পইড়া :just: :pira: !! সব ক্লাসেই অন্ততঃ একটা মাসফিক থাকে। 😛


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  9. ওবায়দুল্লাহ (১৯৮৮-১৯৯৪)

    চমৎকার তানভীর।
    ভাল লাগলো।
    ডায়েরীতে টুকে রাখা অভ্যাস আমারও ছিল।
    অনেক কিছুই মনে পড়ে গেল।
    শেষের পূর্ণেন্দু পত্রীর টেলিফোন টা পড়ে ভাল্লাগলো।
    ভাগ্যিস তুমি লোভ সামলাতে পারো নি।
    😀


    সৈয়দ সাফী

    জবাব দিন
  10. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত কপোতাক্ষ নদে নিয়মিত গোসল করতেন ।

    :khekz: :khekz: :khekz: :khekz: :khekz:

    পূর্ণেন্দু পত্রী আমারেও ধরছিল, কলেজ লাইফের একদম শেষের দিকে 😀 😀 ।


    Life is Mad.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।