দর্প হরণ পার্ট টু

“ আমার গায়ে বল মারছে কে? পিটিয়ে সবগুলার হাড্ডি গুড়ো করে ফেলবো” চিৎকার শুনে পেছনে ফিরে তাকালাম। দেখলাম আমাদের ক্লাসের দস্যুরানী ফুলনদেবী নীতু ক্লাসের এক কোনায় রংবাজি করছে,এক হাতে তার বিশেষ অস্ত্র স্টিলের স্কেল, আরেক হাতে পানির বোতল। আর তার সামনে জড়োসড়ো ভঙ্গিতে নিরীহ কয়েকটি ছেলে। এটি আমাদের ক্লাসের মোটামুটি কমন একটি দৃশ্য।
নীতু মেয়েটার কথা একটু বলি, আমাদের ক্লাস সিক্সের ক্যাডেট কোচিং এর সবচেয়ে বাঁদর মেয়ে এই নীতু। আমি তো তাকে দুচোখে দেখতে পারিই না, আমার মনে হয় ক্লাসের কেউই দেখতে পারে না তাকে। সারাক্ষণ মাথার মধ্যে বাঁদরামি আর ফাইজলামির কুচিন্তা ঘুরে তার মাথায়। সবাইকে জ্বালিয়ে মারে। ক্লাসের বেঞ্চগুলো পাড়িয়ে মাড়িয়ে শেষ করে ফেলবে। এইতো সেদিন বাঁধনের ব্যাগে টিকটিকি রেখে দিয়েছিলো। বাঁধনের ভয়ার্ত মুখ দেখে সে কি হাসি! আর কেউ তার মুখের উপর কোন কথা বলে যদি একবার, তাহলেই খবর আছে। ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সবার ত্রাস এই বিচ্ছুটা। আর এমনই পোড়া কপাল আমার! এই ফাজিলটার বাসা আমার বাসার পাশেই। কিভাবে কিভাবে যেন আমার আম্মু আর আমার ছোট ভাইয়ের সাথে অনেক ভালো সম্পর্ক করে তুলেছে। আমার ছোট ভাই তো আপু আপু বলতে পাগল। আন্টিও আমাকে অনেক আদর করেন। মাঝখান থেকে শুধু আমার সাথেই ওর সম্পর্ক খারাপ, শুধু খারাপ না ভয়াবহ রকমের খারাপ। আমাকে এমন সব কুৎসিত নাম দেয়, খালি রাগে গা জ্বলে কিন্তু কিছু বলতে পারি না। নামটা যখন ক্লাসে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ সবাই যখন ওই নামে ডাকা শুরু করে তখন সে খালি খিলখিল করে হাসে। রাগে পিত্তি জ্বলে যায় ডাইনীটার হাসি দেখলে।
যাইহোক ক্লাস সেভেন যখন ক্যাডেট কলেজে চান্স পাওয়ার সংবাদে মহাখুশিতে বাসায় লাফালাফি করছি, এই বিদঘুটে প্রাণীটা দেখি মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে আমাদের বাসায় হাজির, মুখে সেই গা জ্বলানো হাসি। মুহূর্তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার। সেও চান্স পেয়েছে। সে আমার কাছে এসে পায়ের মধ্যে ধুম করে পাড়া দিয়ে বলল, আজকাল দেখি গরুরাও চান্স পায়, অবশ্য ছেলে তো, নয়টা কলেজ, মেয়ে হইলে বুঝতি,মাত্র একটা। ইচ্ছা করছিলো ওইটাকে ধরে পিটাই, কিন্তু অনেক কষ্টে ইচ্ছাটাকে দমন করলাম।
যথাসময়ে দুইজন দুই কলেজে চলে গেলাম। নতুন জীবন, অন্যরকম অভিজ্ঞতা। মাঝে ছুটিতে আসলেও দেখা কম হত আর আমিও যন্ত্রণা থেকে বাঁচতাম। ক্লাস সেভেনের ফাইনাল টার্মের ছুটির পর দেখি কয়েকটা মেডেল নিয়ে বাসায় আসছে। আমি প্রমোদ গুনলাম, অর্থাৎ আবার শুরু হয়ে গেল ভাব। দৌড় টৌড় হাবিজাবিতে কিভাবে কিভাবে জানি পেয়ে গেছে। আমার আম্মু দেখে বলে, “ও এত কিছু পায় তুই তো কিছুই পেলি না” । আমি বললাম, “ ও মেয়ে তো, মেয়েদের এসবে আগ্রহ কম, প্রতিযোগিতা কম,তাই ও পাইছে” । বিচ্ছুটা আমার মুখের উপরে বলল, “ এহ আসছে, তুই তো আমার সাথেই পারবি না, তোরে দিয়া আসলে কিছুই হবে না”। বরাবরের মতই রেগে যাই আমি কিন্তু কিছু বলতে পারি না।
এভাবে দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, সময় এগোয়। আগের সব বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও নীতুর সাথে যোগাযোগ ঠিকই থাকে এবং ঝগড়াও সমানতালে চলতে থাকে। ইতিমধ্যে আমিও মোটামুটি কথা বলা শিখে গেছি। তাই সহজে ছাড় দিতে চাই না। ক্লাস এলিভেন এ সবাই যেখানে লুকিয়ে ফোনে মিষ্টি মিষ্টি প্রেমালাপে ব্যস্ত, আর আমরা তখন ঝগড়ায় ব্যস্ত। ঝগড়া হবে না কেন? সে কেন আমাকে দিনরাত ছাগল বলে ডাকবে ? আর কয়টা কম্পিটিশনে যায়, প্রাইজ পায় কিছু, এগুলো নিয়ে এত ভাব। আমিও যে পাই না, তা না। ওর মত না পেলেও আমিও তো পাই।আর ছেলেদের যে কম্পিটিশন,মেয়েদের তো তার দশ ভাগের এক ভাগও না।
দেখতে দেখতে শেষ বছরে চলে আসলাম। ক্লাস টুয়েলভ, কলেজে সবচেয়ে সিনিয়র।ক্লাস সেভেনে কাঁধে এক দাগ থেকে শুরু করে এখন কাঁধে ছয় দাগ।ছুটিতে এসেই বিতৃষ্ণায় ছেয়ে গেল মন। জানতে পারলাম,নীতু বদটা কলেজ কালচারাল প্রিফেক্ট হয়েছে।কে যে তাকে এই পোস্ট টা দিলো! অর্থাৎ কাঁধে একটা স্টার সাথে ক্রস বেল্ট। এখন তো সারাজীবন এইটা নিয়ে তার ভাব চলতে থাকবে। এখুনি যেকোনো উপায়ে থামিয়ে দেয়া দরকার ,তা না হলে………।
বলতে না বলতেই আমাদের বাসায় এসে হাজির। তার আন্টিকে তার ছবি দেখাচ্ছে। আর চোখ মুখ বড় বড় করে বুঝাচ্ছে তার ক্রস বেল্টের মহিমা কি, কারা পায়, ইহা কি কাজে দেয় । আমি পানসে মুখে বললাম, “ তুই মেয়ে দেখে সহজে পাইছস, আর আমার এগুলার প্রতি একটুও ইন্টারেস্ট নাই” । সে আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আম্মার সামনেই বলে উঠলো, “ আরে রামছাগল, আমরা ৭ টা মেয়ে মাত্র ক্রস বেল্ট হোল্ডার, আর তোদের ছেলেদের ৯ টা কলেজে ৭ টা করে ৬৩ টা। তুই আসলেই একটা বলদ”। আমার আম্মাও, কেমনে জানি ওকে সায় দিয়ে বলল, আমার নাকি লেখাপড়া বাদে অন্য দিকে তাল একটু কম। আমার মাথায় সাথে সাথে রক্ত উঠে গেল। তক্ষুনি ওকে একটা চ্যালেঞ্জ করে বসলাম। সামনের ICCLM(Inter Cadet College Literature and Music Meet) এ আমরা দুইজন একই ইভেন্ট কম্পিটিশন করব, যে এগিয়ে থাকবে সেই বস। কথা ফাইনাল। এখন সমস্যা হল কোন ইভেন্টে যাওয়া যায়? গান? এটা তো ইন্টার হাউজ কম্পিটিশন না যে চাইলাম আর একটা ইভেন্ট এ চলে গেলাম। আমি সাধারণত হালকা পাতলা ডিবেট করি আর অই হারামীটা সত্যি বলতে সবই পারে। ঠিক করলাম ডিবেটেই কমপিট করবো, ওকে বলার সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেলো। ও আমারে বললো, “ তরে দেইখা মনে হয় না, ডিবেট করতে পারস, গলা দিয়া তো চিঁ চিঁ ছাড়া আর কোন আওয়াজ বের হয়না”
অনেক কষ্টে রাগ সম্বরণ করলাম, “ অয়েইট এন্ড সী বেইবি , বুঝবা কয়দিন পর আমি কি জিনিস।”
এরপর আমি ডিবেটের দিকে মনোনিবেশ করলাম। টপিক কি ছিলো ভুলে গেছি। “Over population is the main obstacle for the development of a country” এই টাইপ কিছু একটা। লাইব্রেরীতে বসে দিনরাত বিভিন্ন বই ঘাটতে লাগলাম, এনসাইক্লোপিডিয়া ঘেটে পুরা তামা তামা বানালাম। অক্সফোর্ড ডিকশনারীর দাঁতভাঙা ওয়ার্ড মুখস্ত করতে লাগলাম । Barron এর GRE ওয়ার্ড ঘাটলাম। অনেক পরিশ্রমের পর অত্যন্ত তথ্যবহুল ও দাঁতভাঙ্গা GR Eword এর সমন্বয়ে বিশাল আকারের একটি স্ক্রিপ্ট বানালাম। একটি তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে মনে মনে হাসতে লাগলাম, বেচারি, একটি অসম লড়াই হচ্ছে আসলে। ও নিশ্চয় আমার মত এতকিছু ঘাটাঘাটি করার অবকাশ পায় নাই। আর এত সুন্দর সুন্দর ওয়ার্ড ? হুহ, ও জানবে কোত্থেকে? কলেজ কালচারাল প্রিফেক্ট হইছে বলে এই না যে আমার চেয়ে ভালো পারবে।
যথাসময়ে আইসিসিএলএম এ গেলাম, পুরোটা সময় আমার মাথায় খালি এই এক চিন্তা, নীতুকে হারাতে হবে, নীতুকে হারাতে হবে। এই চিন্তায় এতই বিভোর হয়ে গেলাম যে, আমি ঠিকমত খাই না, ঠিকমত আড্ডা দেই না। ডাইনিং এ খাওয়ার সময় নীতুর সাথে দেখা হল, আমাকে দেখে বলে, “ কিরে? বেশি নার্ভাস নাকি? আমি ক্ষেপে গিয়ে বলে উঠি , “ দূরে গিয়ে মর , আমার এগুলা নিয়া অত চিন্তা করারও টাইম নাই” । নীতু কি বুঝলো কে জানে , এবার কেন জানি কোন উত্তর দিলো না।
ডিবেটের দিন সবার প্রথমে স্পিচ দিতে উঠলো নীতু। চিকন রিনরিনে গলা, অথচ কি পরিষ্কার ! খুব সহজ –সরল সাবলীলভাবে বলে যাচ্ছে। যে তথ্যগুলো দিচ্ছে প্রায় সবই আমার জানা। অথচ মনে হচ্ছে আবার নতুন করে জানছি । একটা করে যুক্তি দিচ্ছে আর সবাই হাততালি দিচ্ছে। আর ওর ভাবটা এমন যেন , স্ক্রিপ্ট তৈরি করেনি, কিছু মুখস্ত করেনি, ও সব জানে এবং সহজাতভাবে বলে যাচ্ছে । ওর স্পিচ শেষে তুমুল করতালি দিলো সবাই। দিবেই তো, ঐযে , মেয়ে , তাই।
সবার শেষে আমি উঠলাম, আমার স্ক্রিপটা অনেক দুর্বোধ্য আর দাঁতভাঙা বানিয়েছিলাম কিন্তু কেন জানি ওইটা যে স্ক্রিপ্ট হিসেবে কতটা শক্তিশালী বলার সময় ঠিকভাবে সবাইকে সেটা বোঝাতে পারছিলাম না। শেষ বক্তা হিসেবে আমার অনেক যুক্তি খন্ডন করার কথা ছিলো কিন্তু আমি কেন যেন নিজের স্ক্রিপ্ট নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলাম। কারণ কোন জায়গায় একটু জোর দিতে হবে কোন জায়গায় উত্তেজিত হতে হবে সব এক্সপ্রেশন আমি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম। একেবারে যাকে বলে চুলচেরা প্রিপারেশন। কিন্তু সবার দৃষ্টি দেখে মনে হল আমি ডিবেট করা বাদ দিয়ে অভিনয় করছি এবং আমার প্রতিপক্ষরাও আমার স্পিচ না বুঝে হা করে তাকিয়ে আছে। সে যাকগে, বিচারকরা তো বিজ্ঞ মানুষ। উনারা নিশ্চয়ই এর মর্ম বুঝে মার্ক দিবেন ভালো। বাকি সবাই তো পোলাপান। আমার স্পিচের মর্ম এরা বুঝবে কিভাবে? আমার স্পিচ শেষে হাততালিও পড়লো না খুব একটা। ঐ সময় আমার মনের মধ্যে কু ডাক দিলো । এত নেগেটিভ ফীডব্যাক পাচ্ছি কেন? আমি কি তবে হেরে যাচ্ছি?
প্রতিটা ইভেন্টের রেজাল্ট ঘোষণা উলটা দিক থেকে শুরু হয়। সবাই দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করে। GRE স্ক্রিপ্টএর অধিকারী আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, ৩ জন পরেই স্টেজ থেকে ঘোষণা আসলো নাইনথ প্লেস গোস টু……
আর আমার কিছু শুনতে ইচ্ছা করলো না, তবুও কি এই কান বন্ধ রাখা যায়? নীতুর নাম আর আসে না, একদম শেষে যখন শুনলাম সেকেন্ড প্লেস গোস টু ক্যাডেট মিনহাজ অব এমসিসি তখন আর থাকতে পারলাম না। ফার্স্ট প্লেস গোস টু নীতু ফ্রম এমজিসিসি এইটুক সহ্য করার শক্তি বিধাতা আমাকে দেন নি। তাই পেছন দিয়ে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেলাম । নীতুর সামনে কিভাবে যে যাবো ! ও যে কিভাবে টিটকারি দিবে আমাকে ! এই চিন্তায় আমি অধীর হয়ে গেলাম। যখন অডিটোরিয়াম এ ফিরে এলাম তখন দুর থেকে আড়চোখে নীতুর দিকে তাকালাম। একী ! চোখের ভুল না তো! নীতু কাঁদছে ! সত্যি বলতে ওকে আমি প্রথম কাঁদতে দেখলাম। অডিটোরিয়াম থেকে বের হয় করে সাথে কথা বললাম, কংগ্রাটস জানালাম। ও কিছু বললো না। কিন্তু ওর দৃষ্টি দেখে মনে হল আমি খারাপ করায় আমার চেয়ে ও কষ্ট পেয়েছে বেশি । আর আমি গাধা এতদিন সেটা বুঝিনি।

সত্যি বলতে আমার জন্য ওর চোখের পানি দেখে আমার সব কষ্ট চলে গিয়েছিলো। আইসিসিএলএম এ মেডেল না পেলেও অন্য একটি জিনিস নিয়ে আসলাম যেটি মেডেল থেকে অনেক দামি। আর এরপর সেই পাজি মেয়েটি আর কোনদিন স্টেজে উঠে নাই, কলেজে তো আর সময় ছিলো না। ভার্সিটি লাইফেও না। কত রিকুয়েস্ট করি,তবুও যায় না আমি তো বুঝি তোমার ডিপার্টমেন্টে আসলে কত্ত যে পড়ালেখার চাপ!

১,১৭৮ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “দর্প হরণ পার্ট টু”

  1. সাইদুল (৭৬-৮২)

    অনেক পাওয়া না পাওয়ার যোগফল আমাদের জাবনা l দর্প হরণ গল্পটিকে প্রাপ্তি হিসাবে ধরে নিলাম, শেষের ব্যাখ্যা না দিলে আরও ভালো হত l সুন্দর গল্প


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন
  2. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    ক্যাডেট কলেজীয় সেট আপে পড়া একখানা জমজমাট গল্প।
    ক্যাডেট কলেজিয় সেট আপের ঘটনা, স্মৃতিচারণ, গল্প ইত্যাদি বেশ বোরিং হয়।
    এটা একটা স্টানিং এক্সেপশন।
    তাই :hatsoff:


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।