কলেজ লাইফের ভূত-রসাত্মক কাহিনী- ৩

আমাদের সুরমা হাউজে একটা রুম ছিলো,রুম নম্বর ১১, নাম “অধীতি” ,নামটা অনেক সুন্দর,তাই না? কিন্তু সেই রুমে কেউ থাকতো না। কেন থাকতো না জানতাম না। আমাদের কাছে খুবই অবাক লাগত বিষয়টা। কারণ অন্য দুই হাউজে ১১ নম্বর রুম ব্যবহার করা হয় কিন্তু আমাদেরটা হয় না। একটু কৌতূহল জাগাটা স্বাভাবিক বিষয় না? সিনিয়রদের জিজ্ঞাসা করতাম, উনারা কিছু বলতে পারতেন না। আবার অনেকেই অনেক কিছু বলতেন । বলতেন ওই রুমে নাকি কি ঝামেলা আছে,কি খারাপ জিনিস আছে, আরো নানারকম কাহিনী। ব্লকে হাঁটার সময় মাঝে মাঝে ওই রুমের ভিতরে তাকাতাম। রুমে দুইটা ফ্যান ছিলো,খাট ছিল, লকার ছিলো, সবই ছিলো আরও ছিলো হাজারো জঞ্জাল। রুমটা প্রকৃতপক্ষে স্টোর রুম হিসেবে ব্যবহার করা হত, যদিও হাউজে আরও গোটা দুয়েক স্টোর রুম ছিল আর অতিরিক্ত কোন স্টোর রুমের দরকারও ছিলো না। দিন দিন এই রুমের প্রতি আমার কৌতূহল বাড়তে থাকলো। রুমটা কেমন জানি টানত আমাকে। কি এক অদৃশ্য টান,বোঝানো যাবে না। এর মধ্যে এক সিনিয়র ভাইয়ের কাছে কাহিনী শুনলাম এই রুমে নাকি একজন ক্যাডেটরুপী জিন থাকতো। সে নাকি ৪ নাম্বার বেডে শুয়ে তার বেডের ফ্যান চালু করতো,বন্ধ করতো। সেই জিন ভাই কোন ব্যাচের, ক্যাডেট নম্বর কত ওই ভাই বলতে পারে না,কি কারণে রুম বন্ধ হল সেটাও বলতে পারেন না।শুধু বলেন অনেক আগের কাহিনী, অনেক সিনিয়র ব্যাচের,ব্যাস । এই কথা শোনার পর এই রুমের প্রতি আমার আকর্ষণ আরও তীব্র হয়ে গেল। কেন জানি আমার মনে হচ্ছিলো এই রুমে একদিন আমি থাকবো, কেন জানি না, কিন্তু মাথার মধ্যে এই জিনিস বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিলো।
আমরা যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন হঠাৎ করে রুমটা খুলে দেওয়া হয়। এবং খুলে দেয়ার কিছুদিন পরেই আমি কিভাবে কিভাবে যেন এই রুমেরই বাসিন্দা হয়ে যাই। বুঝি প্রকৃতির সেই অদৃশ্য টানের কারনেই। আমি, তানভীর আর জুনিয়র দুইজন, মনির ও জয়। মনির থাকতো ৪ নম্বর বেডে। সেই জিন ভাইয়ার বেডে। রুমটা অদ্ভূত,অন্যরকম। জুনিয়র ব্লকের সম্ভবত একমাত্র রুম যে রুমে পর্দা লাগানো। লাইটস অফের পর,ভরা পূর্ণিমায় ডিমলাইট ও বাইরের জোছনার মিলিত আলোয় রুমে এক আধিভৌতিক আলোছায়ার খেলা চলত। আমি অবশ্য সেটা উপভোগই করতাম। তো একদিন কি কারণে তানভীর মনিরের উপর অনেক রেগে ছিলো। সে মনিরকে ডাক দিলো ঝাড়ি দেয়ার জন্য। ঠিক যে মুহূর্তে মনির বেড থেকে উঠে এলো ঠিক সেই মুহূর্তে আমি নিজ চোখে দেখলাম ফ্যানটা ঘুরতে ঘুরতে মনির যে জায়গায় বসে ছিলো ঠিক সেই জায়গায় পড়লো। ঠিক যেন ফাইনাল ডেসটিনেশন মুভির কাহিনী। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা সবাই থ। মনির শুধু কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তানভীরকে বলল, “ আমাকে বাঁচালেন ভাই” । ৪ জনের মধ্যে আমিই শুধু ফ্যান খুলে পরার দৃশ্য একদম প্রথম থেকে দেখেছিলাম। এরপর কেন জানি আমি অনেকদিন সরাসরি ফ্যানের নীচে ঘুমাতে পারতাম না, আমাকে ভয় গ্রাস করতো, আমি নার্ভাস হয়ে যেতাম। মনে হত ফ্যানটা এক্ষুনি খুলে আমার মাথার উপরে পরবে, আর সেই আধিভৌতিক পরিবেশও আর সহ্য করতে পারতাম না,আমার ভয় লাগতো। যাইহোক ফ্যান খুলে পরার ঘটনা দ্রুত হাউজে ছড়িয়ে পড়লো, অবশ্য ভৌতিক ঘটনা না, দুর্ঘটনা হিসেবে। অবশ্য কয়েকজন এর ভৌতিক ব্যাখ্যা দেয়ারও চেষ্টা করতো। কিন্তু এরপর আর কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি।
দশম শ্রেণীতে উঠার সাথে সাথেই আমি রুম পরিবর্তন করে পাশের রুমে চলে এলাম। ১০ নাম্বার রুম, নাম “দিশারী”। আমার জায়গায়, আমার বেডে গেল কৌশিক। খুবই দুরন্ত এবং খুবই চালু একটা ছেলে সেই সাথে আমার খুব প্রিয় ছোট ভাই। সে এমন ধুরন্ধর ছিলো যে হাউজ ইন্সপেকশনের আগের দিন খুব ধীরে সুস্থে সে হাসপাতালে নেয়ার জিনিসপত্র একটা পুঁটলিতে ভরে রেডি করতো। এর পরের দিন সকালে পিটির টাইমে সে শুরু করতো নিখুঁত অভিনয়। এমন অভিনয় যে, হাসপাতালের ডাক্তার স্যার পর্যন্ত রোগ নির্ণয়ে হিমশিম খেতো। তাকে পাঠিয়ে দেয়া হত সোজা সিএমএইচে। সে এমনই চিজ, ভোর পাঁচটার আগে কমান্ডো স্টাইলে ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ম্যাথ খাতায় নম্বর বসিয়ে আসতো। সে যাই হোক আসল কথায় আসি,রুম চেঞ্জের কিছুদিন পরে একটা অদ্ভূত ঘটনা ঘটলো। শুনলাম ভরা পূর্ণিমা রাতে কৌশিক নাকি উলটাপালটা আচরণ করে। সে নাকি কেমন কেমন হয়ে যায়, মূর্তির মত ধ্যান করে, কাউকে গায়ে হাত দিতে দেয় না, চোখ বড় বড় হয়ে যায়,ভয়ঙ্কর ভাবে তাকায়,সানসেট দিয়ে একা একা হাটে আরও অনেক কিছু। মানে প্যারানরমাল এক্টিভিটি বলতে যা বোঝায় আরকি, সে একদম অন্যজগতে চলে যায়। রাতের বেলায় একজন প্রিফেক্ট(নাম বলা যাবে না) আসলেন হাউজ রাউন্ড দিতে। উনাকে দেখে কৌশিকের চোখ রাগ দু চোখ ফেটে বেরিয়ে এলো, ভাইয়া শাঊট করলে সে রক্ত হিম করা ডাক দেয়। ভাইয়া প্রথমে ভাবলেন কৌশিক ফাইজলামি করছে, ভাইয়া রেগে আগুন হয়ে যান, ঝাড়ি দেওয়া শুরু করেন। পরে দেখা যায় কৌশিকের কোন ভাবান্তর নেই, উলটো কৌশিকেও আরও ক্ষেপতে দেখা যায়, সে বলে, “শয়তানের দল চোখের সামনে থেকে সরে যা,নইলে খবর আছে”। এইবার ভাইয়া সিরিয়াসলি ভয় পেয়ে যান,একটা জুনিয়র ছেলের তো এরকম আত্মঘাতী ফান করার কথা না।নিশ্চয়ই কোথাও কোন ঝামেলা আছে। তিনি রুম থেকে আস্তে করে বেরিয়ে রুম লিডার তানভীরকে ডেকে নিয়ে যান নিজের রুমে। তানভীরের কাছ থেকে ডিটেইলস শুনে ভাইয়া মনে হয় বেশ ভড়কে গিয়েছিলেন। কারণ এরপর থেকে তিনি ১১ নম্বর রুমের ধারে কাছে আসতেন না আর কৌশিককেই পারতপক্ষে এড়িয়ে চলতেন।
যাইহোক, সেদিন ওই ভাইয়ার রুম থেকে তানভীর ফেরত আসার পর তার পিছু পিছু ১১ নম্বর রুমে ঢুকেছিলাম। ঢুকে প্রত্যাশিতভাবেই দেখলাম কৌশিকের আকর্ণবিস্তৃত ২৮টি দাঁত বের করা হাসি। কারণ আমি ওভারসিউর ছিলাম পুরো ঘটনাটিই কৌশিকের নিখুঁত অভিনয়। (চলবে)

৭২০ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “কলেজ লাইফের ভূত-রসাত্মক কাহিনী- ৩”

  1. নাফিস (২০০৪-১০)

    ব্যাপক হচ্ছে ভাই... :thumbup: তাড়াতাড়ি পরের পর্ব ছাড়েন। আপনাদের কলেজের কিছু হরর কাহিনী ইংরেজির আতিক স্যার ট্রান্সফার হয়ে আমাদের কলেজে এসে বলেছিলেন। স্পেশালি একজন ক্যাডেট এর কাহিনী। পরের পর্বে সেগুলো আসে কিনা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

    জবাব দিন
  2. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    এই পর্বে কাহিনির উপস্থাপনা আগের পর্বগুলো থেকে ভাল লেগেছে, চালিয়ে যাও :thumbup:


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।