উপজেলা পরিষদে আদৌ কি প্রতিশ্রুত দিন বদল হবে?? !!

বর্তমান সরকারের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০০৮ এর নির্বাচনী ইশতেহারের “গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য কর্মসূচী” অধ্যায়ের ৬ (ছয়) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে

“ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পরিষদকে শক্তিশালী করা হবে।জেলা পরিষদকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন শৃংখলা ও সকল প্রকার উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন সদরকে স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু, পরিকল্পিত পল্লী জনপদ এবং উপজেলা সদর ও বর্ধিষ্ণু শিল্প কেন্দ্রগুলোকে শহর-উপশহর হিসাবে গড়ে তোলা হবে।“

দিন বদলের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আগত শেখ হাসিনা ওয়াজেদ নেতৃতাধীন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার তার নির্বাচনী ওয়াদা পূরনে কতটুকু বদ্দ পরিকর তা নিয়ে আমরা যথেষ্ট সন্দিহান-ই হয়ে পড়েছি। বিশেষ করে গত কিছুদিন আগে যখন সংসদ সদস্যদের অসীম ক্ষমতা ও স্বল্প দায়িত্ব এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের অসীম দায়িত্ব আর সীমিত ক্ষমতা দিয়ে যে অন্তবর্তীকালীন যে পরিপত্র জারি করা হয়েছে (দেখুন দৈনিক প্রথম আলো সংবাদ পত্রের ৬ই মে ২০০৯ এর অনলাইন সংখ্যাটি অথবা একই তারিখের একই পত্রিকার মূল সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠার ডান দিকে )
তাতে দেখা যাচ্ছে যে আওয়ামী লীগ সরকার তার নির্বাচনী ওয়াদা পূরনে অনাগ্রহের-ই পরিচয় দিচ্ছে।

এই ক্ষেত্রে কথিত অগণতান্ত্রিক (এবং অনির্বাচিত)তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রগতিশীল আইনকে অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে তার মূল চেতনাকেই ভূলন্ঠিত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে অবশ্য উপজেলা অধ্যাদেশ-২০০৮ এ একটু চোখ বুলিয়ে নিতে পারি যেখানে উপজেলা চেয়ারম্যানকে নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে প্রকৃতক্ষেই স্থানীয় শাসনকে শক্তিশালী করার একটা চেষ্টা ছিলো। কেউ চাইলে অবশ্য বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের “Electoral laws” পেইজের অধীন “The Upazila Ordinance-2008” (৩০শে জুন, ২০০৮ এ বাংলাদেশ গেজেট এর অতিরিক্ত সংখ্যা হিসাবে প্রকাশিত অথবা এখান থেকে ডাউনলোড করে নিতে পারেন। অবশ্য এই লিংকটি কতদিন কার্যকর থাকে তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। যাইহোক অধ্যাদেশের সপ্তম অধ্যায়ে উপজেলা পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলী সম্পর্কে বলা হয়েছিলো যেখানে দেখা যাচ্ছে যে পরিষদের সভায় সরকার কতৃক নির্ধারিত কর্মকর্তাদের অংশগ্রহনের সুযোগ থাকলেও সভায় কোন কার্যকরী সিদ্বান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নির্বাচিত উপজেলা সদস্যদেরই ভোটাধিকারের সুযোগ রাখা হয়েছিল। উপজেলা অধ্যাদেশ-২০০৮ এর সপ্তম অধ্যায়ের ৩১ ধারার (১০) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিলো যে,

“সরকার কতৃক এতোদুদ্দেশ্যে নির্ধারিত কর্মকর্তাগণ পরিষদের সভায় যোগদান এবং সভার আলোচনায় অংশগ্রহন করিতে পারিবেন, তবে তাহাদের ভোটাধিকার থাকিবেনা।“

আবার ৩৫ ধারার (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিলো যে,

“এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য সাধন এবং পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ঙ্কল্পে চেয়ারম্যান উপজেলা পরিষধের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করিবেন।“

আবার একই ধারার ২ এর (ঘ) অনুচ্ছেদে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছিলো যে,

“উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে যৌথ স্বাক্ষরে পরিষদের সকল আয় ব্যয়ের হিসাব পরিচালনা করিবেন।“

অর্থাৎ, অধ্যাদেশটিতে সত্যিকার অর্থেই স্থানীয় শাসনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সরকারী কর্মকর্তা ও নির্বাচিত উপজেলা সদস্যদের মাঝে ক্ষমতা ও দায়িত্বের চমৎকার সমন্বয় সাধন করা হয়েছিলো।

কিন্তু ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০০৮এর পরবর্তী সময়ে ৯ম সংসদে এই অধ্যাদেশটিকে আর আলোর মুখ দেখানো হয়নি। বরং অন্তবর্তীকালীন পরিপত্রে সংসদস্যদের পরামর্শ গ্রহন বাধ্যতামূলক করে সংসদ সদস্য ও নির্বাচিত উপজেলা সদস্যদের বিরোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে স্থানীয় শাসন শক্তিশালী হওয়াতো দূরের কথা বরং স্থানীয় উন্নয়নের ধারাকেই বাধাগ্রস্থ হবে।তাছাড়া সংসদ সদস্যদের কাজই হচ্ছে আইন প্রণয়ন। স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকান্ডে তাদের অংশগ্রহন শুধু তাদের দূনীতিকেই বিস্তৃত করবে। তছাড়া ঢাকায় বসে স্থানীয় উন্নয়ন সম্পর্কে একজন সংসদ সদস্য কিবা পরামর্শ দিবেন তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।আবার শোনা যাচ্ছে যে, উপজেলা পরিষদ ভবনেই নাকি স্থানীয় সংসদ সদস্যদের একটা কার্যালয় দেয়া হবে। ফলে চেয়ারম্যানরা কি আদৌ স্বধীনভাবে কাজ করতে পারবেন?

তাই অনতিবিলম্বে সরকারের উপজেলা অধ্যাদেশ-২০০৮কেই আবার গ্রহন করে সত্যিকারের দিন বদলের শুরু করার উচিৎ। আর মাঠপর্যায় থেকেইতো সব কিছুর শুরু করতে হবে।করতে হবে “ডিজিটাল বাংলাদেশ” গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের শুরুও।

১,০৬২ বার দেখা হয়েছে

১০ টি মন্তব্য : “উপজেলা পরিষদে আদৌ কি প্রতিশ্রুত দিন বদল হবে?? !!”

  1. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    সময়োপযোগী বিষয়কে নিয়ে আলোচনা শুরু করেছ। স্থানীয় সরকারকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে একে শক্তিশালী করার বদলে মহাজোট সরকার সংসদ সদস্যদের উপজেলা শাসন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। তবে এসব কোনো কিছু প্রতিবাদহীন থাকতে পারে না। প্রতিটি অন্যায়-অপকর্মের কঠোর প্রতিবাদ আমাদের যার যার জায়গা থেকে করতে হবে। এক সময় নিশ্চয়ই জনগণ-জনমত জয়ী হবে।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  2. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    ক্ষমতা সীমিত করে ঘূষ হিসাবে দেয়া হচ্ছে দামী গাড়ি। যদিও অর্থমন্ত্রী বেশ হেসে হেসেই বলেছেন এটা তাদের প্রাপ্য, তাদের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হবে কাজের জন্য।

    আমার ধারনা, সাংসদদেরর মধ্যে একপ্রকার ভীতি কাজ করছে, তারা ভাবছে স্থানীয় সরকারে তারা না থাকলে তারা জনগনের কাছ থেকে দূরে সরে যাবে এবং এর ফলে পরবর্তী নির্বাচনে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে নমিনেশনের ইদুর দৌড়ে তারা হেরে যাবেন। বা পরাজিত হবেন সংসদ ইলেকশনে। আমি এটা এক ধরনের সম্ভাবনার কথা বলছি, কিন্তু সাংসদরা যে ভয় পাচ্ছেন এটা বুঝতে কষ্ট করতে হয় না।

    তাদের এই ভীতি দূর করার জন্য কাজ করতে হবে। সেই সাথে জনগনের বুঝতে হবে উপজেলা চেয়ারম্যান আর সাংসদ এর মধ্যে পার্থক্য কোন খানে। এই সব জটিলতা দূর না হলে শক্তিশালী স্থানীয় ব্যবস্থা হবে না।

    আবারও মিডিয়ার দিকেই তাকাবো। জনগনকে বুঝতে হবে সাংসদ কি এবং স্থানীয় সরকার কি। এর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

    জনগন যে এটা বুঝেছে এটা আবার বুঝতে হবে রাজনৈতিক নেতাদের, এরপর এই কাজে হাত দিতে হবে।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  3. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    আমার দুঃখ হচ্ছে যে এমনকী বিরোধী দলেও এমন কোন নেতাকে পেলাম না যে কিনা স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের ৯ম অনুচ্ছেদকে একটু সম্মান দেখালেনঃ

    "রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিগণ সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে উৎসাহ দান করিবেন এবং এই সকল প্রতিষ্ঠানসমূহে কৃষক,শ্রমিক এবং মহিলাদিগকে যথাসম্ভব বিশেষ প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হইবে।"

    আমাদের সাংসদদের মধ্যে(অতীত-বর্তমান মিলিয়ে) সর্বদলীয় ঐক্য গঠিত হতে দেখা গেল দুটি বিষয়েঃ
    ১)নিজেদের জন্যে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানীতে এবং
    ২)অনৈতিকভাবে এবং সংবিধানের মূলভাবের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় সরকারে অধিষ্ঠিত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা খর্ব করতে।

    আমেরিকাকে যতই আমরা গালি দেইনা কেন মহামন্দার সময় নিজেদের অর্থনীতিকে বাঁচাতে "বেইল-আউট' প্ল্যানের মত এর-যৌক্তিকতা-নিয়ে-প্রশ্ন-তোলা-যায় একটি ইস্যুতে কিন্তু রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিকরা একযোগে বিল পাস করিয়েছিলেন।

    আমি ব্যক্তিগতভাবে আশা করেছিলাম যে এবারের সাংসদে যেহেতু অনেক উচ্চশিক্ষিত ও অপেক্ষাকৃত নবীন সাংসদ রয়েছেন-নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থপরতা ও ক্ষমতালিপ্সাকে পাশ কাটিয়ে তাঁদের কেউ কেউ হয়ত উপজেলা চেয়ারম্যানদের পক্ষে কথা বলবেন।

    কিন্তু অবস্থা যা দেখলাম,তাতে কামরুল ভাইয়ের ভাষায় বলতে হয়-"কেউ একজন এই বেহায়া সংসদদের গালে ঠাডাইয়া একটা থাবড় দ্যান তো দেখি!"

    জবাব দিন
  4. শাওন (৯৫-০১)
    সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০) বলেছেনঃ
    মে ১৭, ২০০৯ @ ২:২৩ অপরাহ্ন edit

    সময়োপযোগী বিষয়কে নিয়ে আলোচনা শুরু করেছ। স্থানীয় সরকারকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে একে শক্তিশালী করার বদলে মহাজোট সরকার সংসদ সদস্যদের উপজেলা শাসন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। তবে এসব কোনো কিছু প্রতিবাদহীন থাকতে পারে না। প্রতিটি অন্যায়-অপকর্মের কঠোর প্রতিবাদ আমাদের যার যার জায়গা থেকে করতে হবে। এক সময় নিশ্চয়ই জনগণ-জনমত জয়ী হবে।

    সানা ভাই,
    মনে আছে গত গেট-টুগেদারে (এবিসি রেডিও তে) আপনি বলেছিলেন যে উপজেলা নিয়ে যা হচ্ছে তার একটা প্রতিবাদ হওয়া দরকার সিসিবি থেকে যাতে ক্যাডেটরা যে সমাজ নিয়ে চিন্তা করেনা সবার এই ভুল ধারণা টা ভেঙ্গে দেয়া যায়।

    কিছু কি করা যায়? ধরেন সবাই মিলে সংসদের সামনে গিয়ে একটা মানব বন্ধন বা কনো শান্তিপূর্ণ র‌্যালী? আমি আবার এই বিষয়ে একদম ই অভিজ্ঞ নই। আয়োজন করার ব্যাপারেতো আরোও নই। কিন্ত কিছু কি করা যায়?

    বি.ডি.আর সমস্যা ও দেশের আরো নানবিধ সমস্যার কারণে উপজেলার এই ব্যাপারটা মিডিয়া ও অন্যান্য জায়গা থেকে আলোচনা প্রায় হারিয়েই গেছে।


    ধন্যবাদান্তে,
    মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শাওন
    প্রাক্তন ক্যাডেট , সিলেট ক্যাডেট কলেজ, ১৯৯৫-২০০১

    ["যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায় ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি"]

    জবাব দিন
  5. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
    উপজেলা নিয়ে যা হচ্ছে তার একটা প্রতিবাদ হওয়া দরকার সিসিবি থেকে যাতে ক্যাডেটরা যে সমাজ নিয়ে চিন্তা করেনা সবার এই ভুল ধারণা টা ভেঙ্গে দেয়া যায়।

    ঐ :grr:


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।