ফ্রিকিকাল্ডো

১৬ জুন ২০১৮ শনিবার বাংলাদেশ সময় (১৫ জুন ২০১৮ দিবাগত রাত)। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় দিনেই ক্ল্যাশ অফ টাইটান্স। আইবেরিয়ান ডার্বি। সি আর সেভেন ( ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ) এর পর্তুগাল আর রামোস- ইস্কো- এসেনসিও- ইনিয়েস্তা দের স্পেন মুখোমুখি। The legend vs. The greats of this era.

বিশ্বের এই মুহুর্তের সেরাদের সেরা গোলরক্ষক, স্পেনের ডেভিড ডি গিয়া (ম্যান ইউ), যখন দাড়াচ্ছেন, তখন তার সামনে বিশাল এক দেয়াল, সেটা নিজ দলেরই তৈরী করা। সে দেয়াল ভেদ করে দেয়ালের অপর পাশে ঠিক মতন চোখ মেলা মুশকিল। কিন্তু দেয়ালটা ছোট করাও সম্ভব নয়। কারণ দেয়ালের ওপাশে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তাকে থামাতে এর থেকেও বড় আর উঁচু দেয়াল দরকার, তাতেও সম্ভব কিনা কে জানে। কিন্তু তাকে থামাতেই হবে। ৮৮ মিনিট খেলা হয়ে গেছে। এ যাত্রায় রক্ষা পেলেই হলো। এমনিতেই তিনি ম্যাচে একটা আন-ক্যারেক্টারিষ্টিক্স ভুল করেছেন, যেটা তার নামের সাথে যায়না, এবং যার কারণে একটা গোল হজম করতে হয়েছে। তাই তিনি আরো সতর্ক। গোলবারের লাইনে দাঁড়িয়ে দু’পাশ দেখে নিলেন ডেভিড ডি গিয়া। এর আগে বহুবার জিতেছেন স্পেনের এই ম্যান ইউ গোলরক্ষক। অধিনায়ক সার্জিও রামোস সবার সাথে কথা বলে নিলেন ঠিক ভাবে। উনি ছাড়া আর কে জানে যে পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে। সব বিভেদ আপাতত ভুলে গিয়ে বার্সার জেরার্ড পিকের সাথে মিলে পুরো ম্যাচে রক্ষণ সামলানোর চেষ্টা করেছেন। অধিনায়ক যখন ওভারল্যাপ করেন, গায়িকা শাকিরার এই জীবনসঙ্গী তার পিছনে থাকেন প্রতি আক্রমণ কাভার দেয়ার জন্য। রেফারী ও বেশ খানিকটা সময় নিলেন সব ঠিকঠাক করতে। পুরো ম্যাচে তিনি চেষ্টা করেছেন ভুল না করতে। ওদিকে দেয়ালের ওপার থেকে ডেভিড ডি গিয়া দেখলেন যে চোখ বন্ধ করে কনসান্ট্রেশন ঠিক করে নিচ্ছেন পর্তুগীজ অধিনায়ক।

অন্য সব দলে এমন জায়গায় ফ্রী কিক নিলে দুই- তিন জন দাড়ান গোলরক্ষক কে দ্বিধায় ফেলার জন্য।

কিন্তু তিনি একাই দাড়িয়েছেন , সমস্ত দ্বায়িত্ব নিজ কাধে নিয়ে। যে কাঁধের উপর ভর করে পর্তুগাল জিতেছিলো ইউরো। বিশাল দেয়াল থাকায় তিনি নিজেও গোলবার পুরোটা দেখতে পাচ্ছেন না। এই দেয়াল ভেদ করে তাকে এমন ভাবে শটটা কে গোলে পৌছাতে হবে যাতে ডেভিড ডি গিয়া বুঝেই উঠতে না পারেন। কারণ তিনি ঝাপ দিতে পারলেই সব শেষ। মনে মনে তিনি ব্রাজিলিয়ান রোবার্তো কার্লোস কে মনে করছিলেন কিনা কে জানে। তবে সেটা না মনে করলেও চলবে। কারণ তিনি নিজেকে নিজে বহুবার প্রমাণ করেছেন যে শুধু পরিশ্রম দিয়েও সমকালীন অনেক জন্মগত প্রতিভা কে পিছনে ফেলা যায়, ফুটবল পরাশক্তি না হয়েও একটা দেশকে ইউরো তে চ্যাম্পিয়ন করা যায়, রানার্স আপ করানো যায়, স্পেন এর মতন এই মুহুর্তে বিশ্বসেরা দলের সাথে সমানে সমান টক্কর দেয়া যায়।

CR7 – ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

খুব জোরে জোরে বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছেন পর্তুগীজ অধিনায়ক। লক্ষ্য স্থির, অবিচল। রেফারী বাঁশী বাজালেন, এবং ছুটলেন পর্তুগীজ অধিনায়ক। এবং তারপর শুধু জেগে থাকলো বিষ্যয় । পুরো ষ্টেডিয়াম যেনো স্তব্ধ । বলকে বাঁক খাইয়ে দেয়াল ভেদ করে (এমন কি সবাই লাফিয়ে উঠার পর ও), বারের সবচেয়ে কর্ণারড জায়গায় তিনি এমন ভাবে বল পৌছালেন যে ডেভিড ডি গিয়ার চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার ছিলোনা। এবং গোল । সেই সাথে হ্যট্রিক। এমন ই এক গোল যেটাতে ঢাকা পড়ে গেছে, ব্রাজিলে জন্ম নেয়া স্পেনিশ ষ্ট্রাইকার দিয়েগো কস্তা (এ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ) এর সেই শৈল্পিক দুই গোল, ঢাকা পড়ে গেছে স্পেন এর রিয়াল মাদ্রিদ ডিফেন্ডার নাচোর ডি বক্স থেকে করা সেই দূর্দান্ত গোল।

অনেক চাপ নিয়ে নেমেছিলেন রোনালদো। পুরো দলকে একাই টেনে নিয়ে যেতে হবে, এর মাঝে শুরুতেই পড়তে হচ্ছে স্পেন এর সামনে, যার কিনা এই মুহুর্তে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ফেবারিট (ফ্রান্সের সাথে) । তার উপর ফুটবল বহীর্ভুত চাপ। কর সংক্রান্ত ঝামেলায় স্পেন এর আদেশ ম্যাচের দিন । ১ কোটি ৮৮ লাখ ইউরো জরিমানা। একই সঙ্গে দুই বছরের স্থগিত কারাদণ্ড। তার উপর ম্যচের সময়, স্পেনের জর্ডি আলভা (বার্সা) কে তিনি যখন থ্র –ইন এর জন্য হাত দিয়ে বল হ্যান্ডওভার করেন, আলভা এমন এক অভিনয় করেন যাতে মনে হয় রোনালদো খুব জোরে বল ছুড়ে দিয়েছেন তাকে আঘাত দেয়ার জন্য। উদ্দেশ্য পরিস্কার- রোনালদো কে মিথ্যা অভিনয় জাদু দিয়ে লাল কার্ডের মুখোমুখি করা। তবে তিনি ভুলে গেছেন যে তিনি সুয়ারেজ বা রোবেন নন। আর রেফারী খুব কাছে ছিলেন। রোনালদো নিজেও মাথা ঠান্ডা রেখেছিলেন। উত্তেজনার পারদ তখন থেকেই চরমে।

এত সব চাপ নিয়ে যখন খেলে যান আর ওরকম কীর্তি গড়েন, তখন বলতে হয়- Free-kick, Bullet, Curve, Stunner… …

এই ম্যাচে স্পেনের ই জেতার কথা। কিন্তু রোনালদো সব স্বপ্ন গুড়িয়ে দিয়েছেন।

ফলাফল: স্পেন ৩ – ৩ পর্তুগাল। রোনালদোর হ্যাট্রিক।

ম্যচের হাইলাইটস আর সব গুলো গোল দেখতে নিচের ইউটিউব লিঙ্কে ক্লিক করুন। আর ফ্রী-কিকটি দেখতে সরাসরি ফাষ্ট ফরোয়ার্ড করে ৪:৪৬ মিনিটে চলে যান।

ম্যচের হাইলাইটস আর সব গুলো গোল দেখতে নিচের ইউটিউব লিঙ্কে ক্লিক করুন। আর ফ্রী-কিকটি দেখতে সরাসরি ফাষ্ট ফরোয়ার্ড করে ৪:৪৬ মিনিটে চলে যান।

লেখাঃ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শাওন
তারিখঃ ১৬ জুন ২০১৮, শনিবার, বিকাল ০৩:০০ ঘটিকা (বাংলাদেশ সময়)
ইমেইলঃ a.shaon@gmail.com

লেখাটি আরো প্রকাশিত হয়েছেঃ

ফ্রিকিকাল্ডো


//www.somewhereinblog.net/blog/shaon1016/30244198

২,১৯৫ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য “ফ্রিকিকাল্ডো”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।