পরিবারের ভবিষ্যত

এমন না যে আমি নতুন কোন কথা বলছি। কিন্তু বাংলা ব্ললগস্ফিয়ারে এই নিয়ে তেমন কোন কথাবার্তা আমার চোখে পড়েনি, তাই এই ব্যাপারে সবার মতামত জানার আগ্রহ থেকেই এই লেখা। আশা করবো সবাই খোলামেলা মত দিয়ে বিষয়টার আরো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণকে সামনে তুলে আনবেন।

মানুষের ইতিহাসকে যারাই বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যখ্যা করতে যান, সেটা বৈজ্ঞানিকই হোক আর মার্কসবাদী হোক অথবা মেইনস্ট্রিম সমাজ গবেষণাই হোক, সব গবেষণার মুল সুরটা থাকে সমাজের পরিবর্তনের একটা সাধারণ প্যাটার্ন বের করা যেন তার আলোকে ভবিষ্যৎকে আরো নিখুঁতভাবে ব্যখ্যা করা যায়। সেই লক্ষ্যেই বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, নৃতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবেত্তা,  এমনকি ইদানীংকালে সায়েন্স ফিকশনের লেখকেরাও নানাভাবে নানা তত্ত্বের আলোকে সমাজকে ব্যখ্যা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমরা এখানে ইতিহাসের বস্তুবাদী দৃষ্টিকোন থেকে সমাজ পরিবর্তনের একটা সাধারণ চিত্র দেখার চেষ্টা করবো।

মানুষ পৃথিবীর বুকে মোটামুটি মানুষ হিসেবে বিচরণ করছে প্রায় এগারো লক্ষ বছর ধরে। পৃথিবীর ইতিহাসের তুলনায় সেটা অতি নগন্য হলেও জীবজগতের ইতিহাসে মানুষের আবির্ভাব অবশ্যই একটা অতি প্রভাবশালী ঘটনা। আবির্ভাবের মাত্র ১১লক্ষ বছরের মধ্যে আমরা পৃথিবীকে এমনভাবে বদলে দিতে শুরু করেছি যে সেটা বাকিদের জন্যে এমনকি পুরো পৃথিবীর জন্যে হুমকি হয়ে উঠেছে। আমরা নিজেদের হোমো স্যাপিয়েন্স, জ্ঞানী-গুনী বলে যতই মহিমান্বিত করার চেষ্টা করিনা কেন, মহাজাগতিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে পৃথিবীর বুকে এখন আমরা একটা টিউমারের ছাড়া আর কিছু নই! ক্যান্সার যেভাবে একটা শরীরে বাস করে তাকেই ধ্বংস করে বড় হয়, আমরাও পৃথিবীকে ঠিক সেভাবে শুষে ছিবড়ে বানিয়ে ছেড়ে দিচ্ছি!

এই এগারো লক্ষ বছরে আমারের শারীরিক গঠনে পরিবর্তন এসেছে খুব সামান্যই। এমনকি কিছু কিছু সাম্প্রতিক গবেষনায় এমনও পাওয়া যাচ্ছে আমাদের প্রাচীন শিকারি-সংগ্রহক পূর্বপুরুষদের তুলনায় আমাদের মস্তিষ্কের গড় ঘনত্ব বরং আরো কিছুটা কমে গেছে! তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে কি বৈশিষ্ট্য আমাদের জীবজগতের অন্যান্য প্রানীদের থেকে আলাদা করে তুলেছে? এইখানে এসে আমাদের একটু থামতে হবে। একটু চিন্তা করতে হবে আমরা যে প্রশ্নটা করছি, সেটা কি বাস্তবের সাথে অদৌ সংগতিপূর্ণ? বাস্তবের দুনিয়াতে পরিবর্তন কি আসলেই একটি বা দুটি কারনের উপরে নির্ভর করে? নাকি সেখানে পরিবর্তন অসংখ্য বস্তু এবং ঘটনার একটা বিস্তৃত জালের মত যেখানে প্রত্যেকটা পরিবর্তন আরো অনেকগুলা পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল? আমরা যদি একটা দুইটা ঘটনা ধরে আমাদের উদ্ভব ও বিকাশকে ব্যাখ্যা করতে যাই তবে সেটা কতটুকু সত্যকে চিত্রিত করবে? তাই একটা বা দুইটা অথবা আলাদা আলাদা করে অনেকগুলা বৈশিষ্ট্য দেখে কোন ঘটনাকে বুঝতে যাবার ফলে যে খন্ডিত দৃষ্টিভংগি আমাদের মধ্যে তৈরী হয়, সেি ধারনা আমাদের পুরো চিত্রটা বুঝতে বাধা প্রদন করে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা তাই এভাবে ভাগ ভাগ করে চিন্তা করার অভ্যাস থেকে থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। এটা এখন মোটামুটি সবাই স্বীকার করেন যে বৈশিষ্টগুলো আমাদের প্রানীজগতের অন্য সব প্রানীর মধ্যে অনন্য করে তুলেছে, তার মধ্যে অন্যতমগুলো হল আমাদের বিনিময়, ভাষার ব্যাবহার এবং আমাদের সংঠন তৈরী করার ক্ষমতা। এই বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের একসাথে কাজ করার মাধ্যমে নতুন নতুন জিনিষ তৈরী করার ক্ষমতা এনে দিয়েছে যার মাধ্যমে আজ আমরা সফলভাবে পৃথিবির বুকে টিউমার হয়ে উঠেছি। মানুষের ক্ষমতার মূল উৎস তার বুদ্ধিমত্তায় না, বরং সেটাকে দলবদ্ধভাবে কাজে লাগানোয়। একা একজন মানুষ আসলে অনেক নাযুক এবং অসহায়ই। এবং তাকে টেক্কা দেবার মত প্রানীর অভাব নেই এই পৃথিবীতে। কিন্তু একশ মানুষ বা এক হাজার মানুষ বনাম একশ বা এক হাজার অন্য যেকোন প্রানী মধ্যে তুলনা করতে গেলে তারা কোনদিক দিয়েই আমাদের সমকক্ষ হতে পারবেনা। বিগত এগারো লক্ষ বছরে আমাদের শারীরিকভাবে তেমন পরিবর্তন না হলেও আমাদের সংগঠন যেটাকে আমরা সমাজ বলে থাকি, সেটায় কিন্তু ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আর এখনতো পরিবর্তনের হারটা এতোই দ্রুত যে আমরা এই পরিবর্তনের সাথে তাল রাখতে পারবো নাকি আর অনেক প্রানীর মত বিলুপ্ত হয়ে যাবো সেটা নিয়েই সংশয় দেখ দিয়েছে।

আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন মানুষ হতে শুরু করেছে, যখন হোমো স্যাপিয়েন্সের পাশাপাশি আরো বেশ কয়টি প্রজাতির মানুষ দুনিয়ার বুকে ঘুরে বেড়াতো সে সময়ের মানুষদের সমাজের গঠনটা কেমন ছিল? তখনো কিন্তু মানুষ দলবদ্ধ ভাবেই থাকতো। এখানে উদাহরন হিসেবে নিয়ার্ন্থান্ডলদের নাম উল্লেখ করা যায়। এরা হোমো স্যাপিয়েন্সরা আসার আগে প্রায় ১ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করে গেছে! এই দীর্ঘ সময় ধরে তারা ছিল শিকারি সংগ্রাহকের ভূমিকায়, যারা শারীরিকভাবে আমাদের থেকেও শক্তিশালী, যারা কিছু কিছু অস্ত্রও বানাতে পারতো, বাস করতো ছোট ছোট গোত্রে এবং যারা আমাদের আবির্ভাবের পরে খুব কম সময়ের ব্যাবধানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অপরদিকে আমরাও ওদের মত শিকারী-সংগ্রাহক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও খুব দ্রুতই পৃথিবীর সবখানে ছড়িয়ে পড়ি এবং মোটামুটি দ্রুতই নানারকম অস্ত্রের ব্যাবহার শিখে যাই। সেই সাথে দলগতভাবে বড় বড় প্রানী শিকার করাতেও আমরা পোক্ত হয়ে উঠি যা আমাদের বড় বড় গোত্র করে টিকে থাকার মত পরিবেশ তৈরী করে দেয়। কৃষির আবিষ্কার আমাদের প্রথমবারের মত স্থায়ী খাদ্যের যোগান দেয় এবং আমাদের আরো বড় সংগঠন করতে পারার মত পরিবেশ তৈরী করে। এভাবে গ্রামের গোড়াপত্তন হয়। সেই সাথে নির্দিষ্ট ভূমিকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কাজ করার প্রয়োজন হয়, যা আমাদের মধ্যে তৈরী করে শ্রমবিভাগ। ফলে আমাদের মোট উৎপাদন করার ক্ষমতা বাড়ে। সেই সাথে তোমার আমার ভাগ করার প্রবনতা প্রকট হয়, অতিরিক্ত উৎপাদন হতে থাকে যার থেকে সম্পত্তির ধারনার উদ্ভব হয়। আগে যেটায় ছিল সবার অধিকার, সেটার একক মালিকানা আসে এবং বিনিময় প্রথারও উদ্ভব হয়। এই বিনিময়ই হাট বাজার সৃষ্টি করে এবং ছোট ছোট গ্রামগুলোকে একত্রিত করে বড় বড় নগরের উদ্ভব ঘটায়। একইসাথে অতিরিক্ত সম্পদ জায়গায় জায়গায় জমা হতে থাকে, ক্ষমতার উদ্ভব হয়, দাস-রাজার সৃষ্টি হয়। এভাবেই চলতে থাকে, যতদিন না রেনেসার মধ্যে দিয়ে মানুষের উৎপাদন ক্ষমতায় ব্যাপক boost আসে। রেনেসা এবং বানিজ্যের বিস্তার নতুন ক্ষমতাবান শ্রেনী তৈরী করে যা  সমাজের ক্ষমতার ভারসাম্যে বিচ্যুতি ঘটায় এবং দাস-রাজা টাইপের সমাজ ব্যাবস্থার অবসান ঘটায়। রেনেসা মানুষের উৎপাদন ক্ষমতায় যে ব্যপকতা আনে সেটাকেই শিল্প বিপ্লব বলে। শিল্প বিপ্লব কলকারখানার জন্ম দেয় যা মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা এমনভাবে বাড়ায় যা কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষ দ্বারা তৈরী করা সম্ভব নয়। কিন্তু কারখানা চালাতেও মানুষ লাগে। দাসপ্রথার মধ্যে থাকা সেই মানুষগুলা জমির বাঁধন থেকে মুক্ত হয় কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য অন্ন সংস্থান করতে তাদের সেইসব কারখানায় কাজ কর ছাড়া উপায় থাকেনা। এভাবে তৈরী হয় শহর, সিটি-মেগাসিটি যেখানে গ্রাম সংগঠনের চেয়েও কম জায়গায় অনেক অনেক বেশী সংখ্যক মানুষ বাস করতে শুরু করে। এবং এখন পর্যন্ত এই প্রকৃয়া চলমান। মোটাদাগে এই হল এখন পর্যন্ত আমাদের গল্প, মানুষের ইতিহাস। যারাই একটু আধটু ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ঘাটেন তারা এইসব মোটামুটি জানেন কম বেশী। তারপরেও ভূমিকাটা দিয়ে নেয়া কেননা তাতে ধারাবাহিকতা বুঝতে সুবিধা হবে।
এখন এই পরিবর্তনগুলাকে আমরা যদি গ্রাফে বসাই, তাহলে কতগুলা সাধারন প্যাটার্ন আমাদের চোখে ধরা পড়ে। যেমন-

* যত দিন যাচ্ছে মানুষের সংঠনের আকার তত বাড়ছে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ একসাথে বেশী মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারতো না। একজন মানুষ সামনাসামনি সর্বোচ্চ কতজন মানুষের সাথে সার্থকভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে তার একটা সীমা আছে। এটা ডানবার নাম্বার নামে পরিচিত। এই তত্ত্ব এখনো ব্যবহার হয়, এখনো ফেসবুক-টুইটারের মত সামাজিক গণমাধ্যমগুলো এই সীমাবদ্ধতা মাথ্য রেখেই তাদের পেজের ডিজাইন করে (লক্ষ্য করলে ধরতে পারবেন, আপনি যত বড় ফেসবুক ছেলিব্রিটিই হন, আপনার লাখ লাখ ফলোয়ার থাকলেও, আপনার ওয়ালে সবসময় নির্দিষ্ট কিছু প্যাটার্নের খবরই ঘোরাফেরা করে)। কিন্তু এখন ব্যাক্তিগত বলয়ে আমাদের সেই সীমাবদ্ধতা থেকে গেলেও কোনভাবে আমরা এমন উপায় বের করেছি যার মাধ্যমে আক্ষরিক অর্থে হাজার হাজার এমনকি লাখ লাখ মানুষ একসাথে মিলে একটা নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করতে পারে, তার জন্য একজনের আরেকজনকে চিনতে হয়না! একটা ছোট্ট মোবাইলেরও যন্ত্রাংশগুলো সারা পৃথিবী জুড়ে তৈরী হয়, এবং লাখ লাখ মানুষ মিলিতভাবে সেটা করে। এবং অবধারিতভাবে এই মানুষগুলা সবাই সবাইকে চেনেনা। (কিভাবে সেটি হয় সেটা নিয়ে ভবিষ্যতে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা আছে)

* যত দিন যাচ্ছে আমাদের ঘনত্ত্বও বাড়ছে, অল্প জায়গায় অনেক মানুষ একত্রিত হয়েছে। যখন আমরা শিকারি-সংগ্রাহকের জীবন যাপন করতাম তখন আমাদের সংখ্যা এবং ঘনত্ব দুইটাই ছিল নগন্য। তখন বেঁচে থাকার জন্যই আমাদের ঘুরে বেড়াতে হত। কৃষি আবিষ্কার প্রথমবারের মত আমাদের এক জায়গায় থাকার সুযোগ করে দিলো, শিল্পবিপ্লব আমাদের ঘনত্বকে আরো বাড়িয়ে তুললো। এখন আমরা দিনের পর দিন, কারো কারো ক্ষেত্রে পুরো জীবনটি ছোট্ট একটা গন্ডীতে কাটিয়ে দেই, একই ধরনের কাজ করি।

* এককভাবে বেঁচে থাকার যোগ্যতা কমেছে। আগের একজন শিকারি-সংগ্রাহক একা যত ধরনের কাজ করতে পারতো, শুনতে অবাক লাগলেও; এখনকার মানুষ একা অত ধরণের কাজ করতে পারেনা। একজনের অনেক ধরনের কাজ করার বদলে এখন আমাদের বিশেষায়িত কাজের দক্ষতা অনেকগুন বেড়েছে। এখন বেঁচে থাকার জন্য আপনাকে সবকিছু জনতে হয়না, বরং কিছু নির্দিষ্ট কাজ খুব ভালোভাবে জানলেই হয়। যেমন ধরেন আপনি হয়তো একটা গার্মেন্টসের মালিক। আপনার কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক খাটে, কিন্তু মজা হল মালিক হবার জন্য আপনাকে সরাসরি জীবনের সাথে সম্পর্কিত প্রায় কিছুই জানতে হয়না। এমনকি আপনি যে শার্টটা পরে সকালে অফিসে যান, সেটাও হয়তো আরেকজনকে আয়রন করে দিতে হয়। অথচ একটা শিকারি-সংগ্রাহক গোত্রে এরকম অথর্ব একটা মানুষের পক্ষে দলের প্রধান হওয়া তো দুরের কথা, তার পক্ষে বেশীদিন বেঁচে থাকাই সম্ভব ছিলনা!

* সমাজ-সংগঠনের আকার যত বেড়েছে, এক জায়গায় যত বেশী মানুষ একত্রিত হয়েছে, ব্যাক্তি পর্যায়ে মানুষের স্বাধীনতা তত বেড়েছে। বেঁচে থাকার জন্য আগে একটা মানুষকে প্রচুর কাজ করতে হত। সেই কাজগুলোই তার সময়ের সিংহভাগ খেয়ে নিতো। শ্রমবিভাগ মানুষকে সেই দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে। সেসব কাজের দায়িত্ব এখন নিয়ে নিয়েছে অনেক সংগঠন, নানান প্রতিষ্ঠান। এবং সেই প্রক্রিয়া এখনো চলমান। প্রতিবার মানুষ একেকটা নতুন ব্যাবসা/ সার্ভিস চালু করে তার মানে সেটা আরো কিছু মানুষকে কোন একটা ব্যাক্তিগত কাজ থেকে মুক্তি দেয়। আমাদের সময়ের অবস্থা দিয়ে একটা উদাহরণ দেয়া যাক। মনে করেন আপনি নতুন একটা ব্যাবসা চালু করলেন যে এখন থেকে এলাকার সব বাসা থেকে ময়লা আপনার লোক সংগ্রহ করে এনে সেগুলা ফেলানোর ব্যাবস্থা করবে। ময়লা কিন্তু সেই এলাকার মানুষদের আগেও ফেলতে হত, সবাই যার যার সুবিধামত সময়ে সুবিধামত উপায়ে সেই কাজটা করতো। সেই বিচ্ছিন্ন কাজটাকেই আপনি একটা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিলেন, কিছু নির্দিষ্ট মানুষকে সেই কাজটার দায়িত্ব দিয়ে বাকিদের সেই সময়টুকু মুক্ত করে দিলেন। এবার আপনার কল্পনার লাগামে আরেকটু ছাড় দিন। ধরুন আপনার ব্যাবসাটা দাঁড়িয়ে গেল। আপনি এরিয়া বাড়ালেন, আপনার কর্মী বাড়লো। এক সময় বজ্য ব্যাবস্থাপনা করে সেটা রিসাইকেল করার একটা সহজ উপায় বের করে ফেললেন, আপনি একটা রিসাইকেল প্লান্টই দিয়ে ফেললেন, দশ বছর পর দেখা গেল আপনার দেশের মধ্যে এই কাজে আপনার প্রতিষ্ঠনের ধারে কাছে কেউ নেই, দেশের মোটামুটি আশি ভাগ এলাকার সব বজ্য আপনার প্রতিষ্ঠান ম্যানেজ করে। এখন এই যে ব্যাবসাটা আপনি দাড় করালেন, এর মাধ্যমে আসলে কি হল? আপনি আপনার দেশের আশি ভাগ মানুষের ময়ল ফেলানোর সময়টুকু ফ্রি করে দিলেন! এভাবে প্রতিনিয়ত যত নতুন নতুন ব্যাবসা আসছে সেগুলো বেসিক্যালি মানুষের মধ্যে শ্রমবিভাগ বাড়ানোর মাধ্যমে মানুষকে ব্যাক্তিগত নানান কাজ থেকে মুক্ত করে দিচ্ছে। এর ফলে প্রকৃতিতে মানুষের স্বাভাবিক যে বিচরণ, সেই সুযোগ তার কমে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার জায়গায় নতুন একটা বলয় তৈরী হচ্ছে যেখানে তার বিচরনের আওতা দিনকে দিন প্রসারিত হচ্ছে। সেটাই হল মানুষের সমাজ, যেটা আরো খন্ডিত পরিসরে দেখলে বলা যায় নানান সংঠনের সমষ্টি। এভাবে আমরা যত উন্নত হচ্ছি, যত সংখ্যায় বাড়ছি, আমাদের সামষ্টিক জানাশোনার পরিধি যত বাড়ছে, আমরা তত শ্রমবিভাগ তৈরী করছি, এবং আমরা তত বেশী চারপাশের পরিবেশ, যাকে আমরা প্রকৃতি বলি, তার থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। তার বদলে আমরা আমাদের নিজস্ব প্রকৃতি তৈরী করছি, নিজস্ব বাস্তবতা তৈরি করছি এবং তার মধ্যে বুঁদ হয়ে যাচ্ছি। এখন এমন পরিবেশ পৃথিবীর অনেক শহরে তৈরী হয়েছে যেখানে একজন মানুষ আক্ষরিক অর্থেই শুধু মানুষের মধ্যে তার জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে, আর কোন কিছু সম্পর্কে না জেনেই! অথচ দুশো বছর আগেও এটা মানুষ কল্পনাই করতে পারতোনা। আমরা এখন নিজেদের মধ্যে একটা কিছু তৈরী করতে পারি, সেটা লালন পালন করে বড় করতে পারি এমনকি সেটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কিলাকিলি করে মরেও যেতে পারি, বাইরের পরিবেশকে এতোটুকু প্রভাবিত না করেই! যেমন ধরুন ক্রিকেট খেলা। এটি আমাদের দেশের মানুষের জন্য দারুন এক ছেলে ভুলানো চুষিকাঠি। এই কাঠি দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আমাদের নিয়ন্ত্রন করা যায়। আমরা একে কেন্দ্র করে অন্য মানুষের সাথে তর্কে লিপ্ত হই, দেশপ্রেম _দাই, অনেক সময় খুনাখুনি পর্যন্ত করে ফেলি! অথচ একজন ক্রিকেট না জানা কারো কাছে এটা একটা বলকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষের শারীরিক করসত ছাড়া আর কোন অর্থ বহন করবেনা। ঠিক যেমনভাবে pictionary যদিও একটা খেলা, তথাপি এটি আপনার কাছে সম্ভবত ক্রিকেটের মত কোন অনুভুতি বহন করেনা, কেননা আপনি এর সম্পর্কে কিছু জানেননা। এই যে একটা মহাজাগতিক দৃষ্টিকোন থেকে পুরাই অনর্থক একটা কাজের পিছে আমরা এতোটা মেধা-শ্রম-সময় ব্যায় করছি, কিছু মানুষ শুধুমাত্র এই কাজ করে তাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় সবকিছু জোগাড় করে ফেলতে পারছে (অনেকের থেকে অনেক বেশীই পারছে) সেই সুযোগটাই কিন্তু আমাদের ক্ষমতা দিচ্ছে আরো নতুন নতুন জিনিষ তৈরী করতে পারার। এভাবেই ধীরে ধীরে আমরা একটা আলাদা জগতে প্রবেশ করছি যেটার অস্তিত্ত্ব আগে ছিলনা। আর সেটা সম্ভব হয়েছে আমাদের এই অতিরিক্ত জিনিষপত্র তৈরী করতে পারার, সংগঠিত হয়ে কাজ করতে পারার ক্ষমতার জন্যই। আবার এটাই ব্যাক্তি জীবনে আমাদের বৃহত্তর বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে, কারন আমরা এখন এমন সক্ষমতা অর্জন করেছি যে সত্যিকারের প্রয়োজনীয় জিনিষের বাইরে কাল্পনিক জিনিষের পেছনে সময় শ্রম ব্যায় করলেও আমরা বেঁচে থাকতে পারি!

এই যে আমরা বলছি দিন বদলের সাথে সাথে ব্যাক্তিগত বলয়ে মানুষের স্বাধীনতা বেড়েছে, সেটা কি রকম? আসলেই কি বেড়েছে না কমেছে? আমরা চেষ্টা করবো আলোচনার বিষয় এই পয়েন্টটার আশেপাশেই সীমাবদ্ধ রখতে। এবং আমরা উদাহরনটা নেব পরিবার থেকে। মানুষের এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় পরিবারের গঠনগুলোও কখনো একরকম ছিলনা। এমনকি এখনো নেই। কিন্তু আর অনেককিছুর মতই, একটা নির্দিষ্ট পরিবারের গঠনকে আমরা একটা স্ট্যান্ডার্ড মডেল ধরে বাকিগুলাকে অগ্রাহ্য করে চলেছি। প্রানপণে বলে চলেছি এই একটাই হল ছহী, বাকি সব ভুল। কিন্তু আসলেই কি তাই? আবার তাহলে একটু ইতিহসে ঢোকা যাক। আদিম মানুষের শরীরতত্ত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন প্রমান যেমন সহজে পাওয়া যায়, তাদের আচার-ব্যাবহার, রীতি-নীতি, খাদ্যাভ্যাস, রুচি-সংস্কৃতি এসব সম্পর্কে অত সহজে কোন  পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া যায়না। এর প্রধান কারন এদের অস্তিত্ত্ব আছে একমাত্র গতিশীলতার মধ্যে। সচল জীবন ছাড়া এদের আর খুঁজে পাওয়া যায়না! এবং এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই ব্যাপারে আমাদের জানার থেকে অজানা অধ্যয়ের পরিমানই বেশী। তবে মানুষতো বসে নেই। তারাও এই ব্যাপারে ধারনা পাবার কিছু কিছু উপায় ঠিকই বের করে নিয়েছে, এবং এখনো করছে। আগে আমরা এসব ব্যাপারে কিছুই জানতামনা, এখন আমরা জানি আমাদের কোথায় খুঁজতে হবে, কিভাবে খুঁজতে হবে। বিজ্ঞানের যে শাখা এই বিষয়টা নিয়ে কাজ করে সেটাকে আমরা বলে থাকি নৃ-তত্ত্ব। নৃতত্ত্ব খুজে বের করার চেষ্টা করে আদিম যেকোন জীবিত কিছুর (প্রধানত মানুষ) সামাজিক ব্যাকরণটা (social dynamics) কিভাবে কাজ করে সেটা বের করা। এর জন্য নৃতত্ত্ব প্রধানত সাহায্য নেয় সেইসব আদিবাসি নৃ-গোষ্ঠীর যারা এখনো তাদের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। নৃতত্ত্ব কিভাবে কাজ করে তার বিস্তারিত ব্যখ্যায় না গিয়ে আমরা সরাসরি মূল ব্যাপারে চলে যাচ্ছি।

একদম প্রথমে, আমরা যখন শিকারি-সংগ্রাহকের জীবন যাপন করছি, তখনকার পরিবারের গঠন সম্পর্কে যা পাই তাতে তাদের মধ্যে কোন একক পরিবারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়না। তারা দলবদ্ধভাবে থাকতো এবং নির্দিষ্ট একটাই যৌনসঙ্গী নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতো না। তবে তখনো যে মেয়েদের নিয়ে পুরুষদের মধ্যে বা পুরূষের অধিকার নিয়ে মেয়েদের মধ্যে মারামারি হতোনা তা না, কিন্তু সেটা নিছকই জৈবিক, তার মধ্যে আর কোন গভীর ভাব ভালবাসা বা নৈতিক উদ্দেশ্য টাইপের কিছু ছিলনা। তবে আধুনিক মানুষের (হোমো স্যাপিয়েন্স) উদ্ভবের পরে তারা যখন ছোট ছোট গোত্রে পৃথিবীতে ছডিয়ে পড়তে শুরু করে, তখন থেকে পরিবারের ধরনগুলোতেও পরিবর্তন আসতে থাকে। মানুষের মধ্যে নানান ফর্মে জোড়া বাধা শুরু হয়। সেটা এক বা একাধিক যৌন সঙ্গী নিয়ে। প্রথম দিকে এগুলো বেশীরভাগই ছিল মাতৃকেন্দ্রিক কেননা এছাড়া আর কোনভাবে সন্তানের পরিচয় নিশ্চিত করার উপায় ছিলনা। তবে এর মধ্যেও পরিবারগুলোতে নানারকম বিন্যাস সমাবেশ ঘটেই চলেছে এবং নতুন নতুন গোত্রকেন্দ্রিক পরিবারের ধরন চালু হয়েছে। এই যে পরিবারের ধরনগুলায় পরিবর্তন হচ্ছিলো, সেটা শুরু হয়েছিল একধরণের বিনিময়কে কেন্দ্র করেই। তখনো মানুষের কছে খাদ্যই ছিল প্রধান সমস্যা, সেটা তাদের কাছে মহামুল্যবান। শিকারি-সংগ্রাহক হবার কারনে তাদের যাযাবর জীবন যাপন করতে হতো, ফলে বড় দল এবং ভারী সম্পদ তাদের জন্য ছিল অসুবিধাজনক। বিনিময় করর মত তাদের কাছে অতিরিক্ত যা থাকতো তা হল মানুষ। মাঝে মাঝে বিনিময়টা কেড়ে নেয়ার মাধ্যমেও হত। এই বিনিময়ই ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে বহিঃবিবাহভিত্তিক নানান সম্পর্ক তৈরী করে। এরপরে মানুষ কৃষি আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে স্থায়ী সম্পদের যুগে প্রবেশ করে। এই পর্যায়ে এসে একটা নির্দিষ্ট ভূমিকে কেন্দ্র করে বংশানুক্রমে বাস করার সুযোগ সৃষ্টি হয় যা বংশ-উত্তরাধিকার-স্থায়ী সম্পদের ধারনা তৈরী করে। অনেকের মতে এটা নারীদের স্থায়ীভাবে পুরুষের সাথে সমতা থেকে বিচ্যুত করে। আর আগের সময় থেকেই মানুষ সাথে করে নিয়ে আসে একটা শর্টকাট- অনেকের শ্রমের বিনিময়ে কিছু মানুষ বসে বসে খাবার উপায়, সেটা এইখানে এসে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায়, সৃষ্টি হয় দাস প্রথার। এই যে উত্তরাধিকার ঠিক করার দরকার হয়, সেটা  নানান ধরনের পরিবারকে এক পতি-পত্নীর দিকে ধাবিত করে, এবং এটাই একটা সময় স্থায়ী রুপ পায়। কিন্তু এখনকার যুগে এসে যেমন আমরা নর-নারীর প্রেম ভালবাসাকে বড় করে দেখি, এটাকেই সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে চিন্তা করি, তখন ব্যাপারগুলো সেরকম ছিলোনা। বিয়েটা তখন এমনকি এখনো অনেক জায়গায় ভূমিভিত্তিক ব্যাবস্থার মধ্যে একটা সম্পদের বিলি বন্টনের সাথে সম্পর্কিত একটা বিষয় হিসেবে দেখা হত। পৃথিবির সকল নৃতাত্তিক আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যেই ব্যাপারগুলা এখনো এইরকম। এমনকি আমাদের আশেপাশেও একটু খেয়াল করে দেখবেন যারা জমিদার আমলের মানুষ, বা সেরকম করে যারা চিন্তা করে, তারা মেয়েদের এমনকি ছেলেদেরও এই ব্যাপারে পছন্দ অপছন্দ বলে কিছু যে থাকতে পারে এবং বিয়ের ক্ষেত্রে সেটা যে ভূমিকা রাখতে পারে সেটা বুঝতেই চায়না। আমি আগে মনে করতাম এরা বুঝতে চায়না কিন্তু আপনি যদি এই মানুষগুলার মনস্তত্ত্বটা ধরতে পারেন, তাহলে বুঝতে পারবেন, এই মানুষগুলা আসলে আমাদের মতন করে চিন্তাই করতে পারেনা। তাদের চিন্তা ভাবনার সীমা আসলে সম্পদের কাছে বাঁধা। তারা এখনো বাড়ি গাড়ি টাইপের বস্তুগত সম্পদের বাইরে চিন্তাই করতে পারেনা এবং বস্তুগত সম্পদের বিনিময় ছাড়া কোনরকম সম্পর্ক হতে পারে সেটা এদের বোধের মধ্যে আসেনা। ফলে প্রেম ভালোবাসা বন্ধুত্ব এসব এদের কছে ফালতু মনে হয়। তারা ঠিক ততটুকুই বোধের চর্চা করে যতটুকু তার সম্পদ টিকিয়ে রাখার/ বাড়াবার জন্য প্রয়োজন। এই অবস্থাই চলে হাজার হাজার বছর ধরে, যতদিন না শিল্পবিপ্লব হবার মত অবস্থা সৃষ্টি হয়। শিল্পবিপ্লব শহরের উদ্ভব ঘটায় যা মানুষকে আগের চেয়ে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসে। শারীরিকভাবে কাছে আনলেও এটা ব্যক্তিগত বলয়ে মানুষকে আরো স্বাধীনতা দেয়। এটা নির্দিষ্ট জমিকে কেন্দ্র করে তার বাস করার প্রয়োজনের অবসান ঘটায় যার একটা বড় প্রভাব পড়ে মানুষের মনোজগতে। তাকে আর বাঁচার জন্য একটা জায়গায় একটা জমিকে কেন্দ্র করে আটকে থাকতে হয়না বরং তার বদলে পুরো সমাজে নানারকম কাজ করে সে বেঁচে থাকতে পারে। এটি একই সাথে তাকে সমাজের উপর আরো নির্ভরশীল করে ঠিকই কিন্তু তার চিন্তা জগতকে আরো একটু প্রসারিত হতে দেয়। শহরে থাকা মানুষকে আরো অনেক মানুষের সাথে চলতে হয়, আরো অনেক রকম কাজ করতে হয় ফলে তাকে বাধ্য হয়েই দশরকম চিন্তাকে মাথায় পাশাপাশি স্থান দিতে হয়। শ্রমবিভাগ ততদিনে চরম আকার পেয়েছে, মানুষ একটা কাজকেই সূক্ষ্ণ থেকে সূক্ষ্ণতর ভাগে ভাগ করেছে যেসব আবার একটা অপরের উপর নির্ভরশীল। এই ধরনের কাজ তাদের আরো বেশী বেশী মানুষের সাথে মেশার প্রয়োজন তৈরী করছে, আরো দশজনের উপরে নির্ভরশীল করছে ফলে আগের আমলের যে একগুঁয়ে পরিবারকেন্দ্রিক নীতিতে মানুষ চলতো সেখান থেকে তাকে বেরিয়ে আসতে হচ্ছে। সম্পূর্ণ অনাত্মীয় অপরিচিত মানুষের সাথে একসাথে কাজ করতে গিয়ে তাদের মধ্যে পরিবারের বাইরে একটা ঐক্য তৈরি হচ্ছে, তারা একে অপরকে বিশ্বাস করছে, ভরসা করছে, এটিই তাকে অন্যের প্রতি সহমর্মী করে তুলছে। আবার পরিবারের কঠিন বাঁধন থেকে আপাত বিচ্ছিন্নতা তাকে স্বাধীনতা দিচ্ছে নতুন নতুন কাজ করার। জীবন নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার। শ্রমবিভাগ আপনার বড় বড় প্রয়োজনগুলো আর দশজনের মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছে, আপনার ভরনপোষনের দায়িত্ব নিয়ে নিচ্ছে। ফলে গ্রামদেশে যেই কাজ করা অসম্ভব ছিল সেরকম অনেক কিছুই মানুষ করতে শুরু করেছে, পুরোনো অভ্যাস পালটে ফেলছে, ছুড়ে ফেলছে, তখনকার অনেক ধ্যান ধারনাকে প্রশ্ন করে বসছে। এভাবে একটা নতুন প্রজন্ম তৈরী হয়েছে যারা বহু দিক দিয়ে আগের প্রজন্ম থেকে এতো বেশী আলাদা যে পুরনো সেইসব মূল্যবোধ দিয়ে আমরা সেটাকে কোনভাবে মাপতে পারছিনা, বুঝতে পারছিনা, ফলে বরদাস্তই করতে চাইছিনা। পরিবর্তনের হারটা এতো বেশী যে আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছেনা চট করে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলা। যৌথ পরিবারগুলো ভেঙ্গেছে আগেই, এখন একক পরিবারগুলোতেও ভাঙ্গন দেখা যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও জোড়া বাধার জন্য সঙ্গী খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন একটা কাজ ছিল। প্রেম করা তো ভীষণ কঠিন, ধর্মীয়-সামাজিক-অর্থনৈতিক বাধা উপেক্ষা করে সেই প্রেমকে পূর্নতা দেয়ার মতন মানসিক জোর খুব কম কাপলেরই ছিল। আবার দেনমোহর দিয়ে বছর বছর বউ কেনার মত ক্ষমতা এবং সামর্থও খুব বেশী মানুষের ছিলনা। আর মেয়েদের জন্য তো নিজের সঙ্গী নিজে বাছাই করা ছিল জীবন নিয়ে জুয়া খেলার মত। সেই সাহসও খুব কম মেয়েই করতে পারতো। ফলে দেখা যেত একটি সঙী নিয়ে জীবন কাটানো ছাড়া উপায় না থাকার কারনে আমাদের মুল্যবোধগুলোও গড়ে উঠেছিলো সেভাবেই। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নতি সারা দুনিয়া জুড়ে সেই অবস্থাকে ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছে। এখন একটু চেষ্টা করলেই আপনিও খুব সহজেই বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন, তার সাথে ভবের আদান-প্রদান করতে পারবেন এবং তাকে স্বপ্ন দেখাতে পারবেন। আবার পছন্দ না হলে সহজেই ছুড়ে মারতে পারবেন কেননা একইভাবে অন্য একটা সঙ্গী খুজে নেবার উপায় আপনার কাছে আছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হবার কারনে যদিও এখনো এই অবস্থার সুযোগ বেশীরভাগটাই ব্যাবহার করছে ছেলেরা, কিন্তু ধীরে ধীরে হলেও মেয়েরাও জাগছে। পুরুষেরা একটা পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিতে চাইছেনা, ফুল থেকে ফুলে ঘুরে বেড়ানোতেই তাদের বেশী ঝোঁক, আবার মেয়েরাও নিজের অধিকারের প্রশ্নে সচেতন হচ্ছে, উপায় থাকলেই পুরুষের অধীনে থাকার থেকে নিজের মত করে বাঁচতে চাইছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেই মেয়েরা পুরুষের অসম দাসত্ব আর করছেনা। এভাবে পরিবারের যে কনসেপ্ট প্রায় হাজার হাজার ধরে মানুষের মধ্যে টিকে ছিল, সেটা হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবার ব্যাপারটা পুরোপুরি ভেংগে যাবার জন্য এখন শুধু একটা বাধা মানুষের সামনে আছে, সেটা হল সন্তান। এখনো কোন সমাজই পুরোপুরি সফলভাবে বাবা মা ছাড়া কিভাবে সন্তানকে বড় করা যাবে সেটার স্থায়ী এবং কার্যকর কোন সমাধান বের করতে পারেনি বলে পরিবারগুলোর মুমুর্ষু  দেহগুলো এখনো টিকে আছে, টেনে হিঁচড়ে সমাজ সেটাকে বহন করে যাচ্ছে কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে সেই ব্যাপারে কেউই খুব একটা আশাবাদী নয়। বুইড়ারা সবাই হায় হায় করছে, এর সমাধানের আশায় অতীতে হাতড়াচ্ছে। হাজার বছরের একটা অভ্যাস, একেবারে আমাদের অস্থি মজ্জায় সেট হয়ে বসে গেছে যে এর বাইরে কেউ চিন্তাই করতে চাইছেনা, যদিও অবচেতনে, বাস্তব জীবনে চরমতম ধার্মিক, সৎ মানুষেরাও আর সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারছেনা। কি ছেলে কি মেয়ে, যে যত বড় হুযুর ব্যাক্তিগত গোপন জীবনে তার ছোঁকছোকানি তত বেশী! কারন সমস্যাটা নৈতিকতার সাথে সম্পর্কিতই না! কিন্তু এখন পর্যন্ত ইতিহাসের যে ধারা আমরা দেখলাম, তাতে মানুষের সেই পুরান ব্যাবস্থায় ফিরে যাবার সম্ভাবনা কতটুকু? ওই ময়লা ফেলার কোম্পানির কথা চিন্তা করুন। কেউ যদি আপনার হয়ে ময়লা ফেলে দেয়ার কাজটুকু করে দেয়, আপনি  কি সেটা করতে দিবেন না? আস্তে আস্তে ব্যাক্তিগত সবকিছুই সমাজের হাতে ছেড়ে দিবেন নাকি উল্টা দিকে যাত্রা করবেন? আস্তে আস্তে আবার নিজের সব কাজের ভার নিজের ঘাড়ে নিয়ে অবসর সময়কে বাই বাই জানাবেন, আবার শিকারি-সংগ্রাহক জীবনে ফেরত যাবেন? আপনার ভেতরে সেট করা আরাম অন্বেষী জৈবিক প্রবনতা আপনাকে সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দিকেই ঠেলবে। আর আপনি যদি অসাধারণ না হন, আপনার জৈবিকতাকে যদি আপনি উপেক্ষা করতে না পারেন, তাহলে পরিবার প্রথাকে টিকিয়ে রাখা আপনাদের পক্ষে সম্ভব হবে বলে মনে হয়না। ফলে আপনার অনাগত শিশুদের “ম্যানেজ” করার জন্য সামাজিক সামষ্টিক কোন উপায় বের না করলে আপনার সামনে গভীর দুর্দিনই অপেক্ষা করছে মনে হয়। কিছু কিছু দেশ সমাধানটা ধরতে পেরেছে এবং তার প্রেক্ষিতে তাদের মূল্যবোধগুলোকেও ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছে। এই ব্যাপারে পশ্চাদপদ দেশ হিসেবে মোটামুটি অভাবনীয় সাফল্য এনেছে কিউবা। ইউরোপের অনেক দেশও সেদিকে হাটার চেষ্টা করছে। পারবে কি পারবেনা সেট তো ভবিষ্যতই বলে দেবে কিন্তু সমাধানের জন্য হাঁটতে হবে যে এই পথেই সেটাতে সমজবিজ্ঞানীরা কেউ দ্বিমত করছেননা।

একই অবস্থা সমাজের অন্য দিকগুলোর ক্ষেত্রেও। এই যে মানুষের স্বাধীনতার দিকে যাত্রা, এটাকেই আমরা বলি প্রগতি। প্রগতি শুনতে অনেক মিঠা লাগলেও সেটা অনেক পুরোনো রীতি সংস্কারকে ভাংগার মধ্যে দিয়েই এগিয়ে যায়। এখানে কোন ঐশ্বরিক শর্টকাট নেই। রবীন্দ্রনাথের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে-

“পুরাকালে দেবতাদের কল্পনা আছে, কিন্তু তারা অতীতে নেই। দেবতারা বাস করেন ভবিষ্যতে, মানুষের ইতিহাসের শেষ অধ্যায়ে”

এবং কথাটা সত্যি। ইতিহাসের এই একমুখী ধারা যদি অব্যাহত থাকে তবে মানুষ সামনের দিকেই এগোবে, যেটা হটাৎ পরিবর্তন হবার কোন কারন নেই। হোঁচট খেতে পারে কিন্তু থেমে উল্টো দিকে যাওয়া শুরু করবে এমনটা ঘটার কোন ইতিহাস গত এগারো লক্ষ্য বছরের মধ্যে দেখতে পাচ্ছিনা। (যদিনা ম্যাড ম্যাক্সের মত পোস্ট অ্যাপোক্যালিপ্টিক কোন অবস্থা সৃষ্টি হয়!) সুতরাং আশা করা যায় মানুষ অতীতের মত এবারো একটা উপায় ঠিকই বের করবে, বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোকেও ভেংগে চুরে দেবে; অথরিটিকে বুড়া আংগুল দেখাবে, সামাজিক সংঠনকে আরো সুসংহত করার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে মুক্তির দিকেই নেবে। প্রশ্নটা হল, আপনি কোন পক্ষে থাকবেন??

তথ্যসূত্রঃ

১। মিশেল ফুকোঃ পাঠ ও বিবেচনা

২। পরিবার, ব্যাক্তিগত মালিকানা ও রাষ্টের উৎপত্তি

৩। তৃতীয় ঢেউ – এভলিন টাফলার

৪। অচেনা দাগ – সেলিম রেজা নিউটন

৫। স্যাপিয়েন্স – ইউভাল নোহা হারারি

৬। মার্কস পাঠের ভূমিকা – ফরহাদ মজহর

৭। হলিউডি মুভি – লুসি

২,৬৫৯ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “পরিবারের ভবিষ্যত”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    সুন্দর লেখা।
    অনেক বড় তাই একত্রে সব বলা যাচ্ছে না।
    ধীরে ধীরে বলতে হবে।

    আমার ধারণা হাত-পা আর মস্তিস্কের ব্যবহার মানুষকে অনন্য করে তুলেছে।

    এটা সত্য যে আমরা পৃথিবী কে নষ্ট করে ফেলছি। অবশ্যই দায়ী আমরা সবাই। তবে বড় বড় কোম্পানিগুলি এর জন্য বেশি দায়ী, বিশেষত তাদের লোভ।
    তবে আমি আশাবাদী। কারণ অনেকেই প্রবেশের কথা বলছেন, ভাবছেন এবং কাজ করছেন। এমনকি একটি আরব দেশ সম্ভবত বাহরাইন বন্য পশু ও সামুদ্রিক প্রাণি রক্ষার্থে যেসব কাজ করেছে বা করছে তাতে আমি অভিভূত।
    আমাদের দেশের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও প্রাণি রক্ষায় দরকার সরকারি পদক্ষেপ ও গণসচেতনতা।
    আমি বিবর্তনে বিশ্বাস করি। তাই একজাতের মানুষ শেষ হয়ে গেলো আর আরেক জাত আসলো বা নতুন জাত আসার পরে পূর্বের জাত লোপ পেলো এভাবে ভাবি না। বরং বিবর্তনের ফলে পূর্বের মানুষ আর দেখা যায় না।

    আর যেহেতু আগেকার মানুষ এর মূল লক্ষ্য ছিলো সারভাইভ করা তাই তারা অনেক কিছু জানতো।
    আমাদের সব টা জানার দরকার নেই। কারণ আমাদের প্রয়োজন মেটাবার জন্য নানা পেশাজীবীর সৃষ্টি হয়েছে।
    ধরা যাক আমার চুল আমার বউ মেশিনে কেটে দেয়। সবাই যদি এটা করে তবে তো সব সেলুন বন্ধ হয়ে যাবে।
    আবার এই যে আমরা সব জানি না সেজন্য কিন্তু কিছু থেমে নাই। এবং আমরা সেই সময়ে হয়তো অন্য কিছু করছি।
    অন্যভাবে বলা যায় আমাদের পূর্বপুরুষ রা কায়িক শ্রম বেশি করতো, আমরা মানসিক শ্রম বেশি করি।

    আর একভাবেই পৃথিবী পিছিয়ে যেতে পারে আর তা হলো ক্ষমতাধর দেশগুলো যদি পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করে। (সম্পাদিত) (সম্পাদিত)


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    প্রিয়তে।

    প্রায় পুরো একমত। দ্বিমতের জায়গা খুব সামান্য।

    তবে এখনই বিস্তারিত মন্তব্যে না-গিয়ে একটা প্র্যাক্টিকেল বিষয়ে 'দাবী' জানাচ্ছি- লেখাটাকে ফরমেট করো। পরিবারের মত একটি অতিপরিচিত বিষয়কে নতুন আঙ্গিকে দেখতে গেলে এমনই বেশ ঝামেলা হয়। কাজেই, প্রেজেন্টেশনটা পাঠকের, বিশেষ করে যারা সামাজিক বিজ্ঞানের সাথে কম পরিচিত, কথা মনে রেখে করা ভালো। এক্ষেত্রে আমার একটা 'টিপস' হলো- বড় প্যারাগুলোকে যথাসম্ভব ছোট করে ফেলো বিষয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে। একটা উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে আমি কি বলতে চাইছি-

    এই যে আমরা বলছি দিন বদলের সাথে সাথে ব্যাক্তিগত বলয়ে মানুষের স্বাধীনতা বেড়েছে, সেটা কি রকম? আসলেই কি বেড়েছে না কমেছে? আমরা চেষ্টা করবো আলোচনার বিষয় এই পয়েন্টটার আশেপাশেই সীমাবদ্ধ রখতে। এবং আমরা উদাহরনটা নেব পরিবার থেকে। মানুষের এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় পরিবারের গঠনগুলোও কখনো একরকম ছিলনা। এমনকি এখনো নেই। কিন্তু আর অনেককিছুর মতই, একটা নির্দিষ্ট পরিবারের গঠনকে আমরা একটা স্ট্যান্ডার্ড মডেল ধরে বাকিগুলাকে অগ্রাহ্য করে চলেছি। প্রানপণে বলে চলেছি এই একটাই হল ছহী, বাকি সব ভুল। কিন্তু আসলেই কি তাই? আবার তাহলে একটু ইতিহসে ঢোকা যাক। আদিম মানুষের শরীরতত্ত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন প্রমান যেমন সহজে পাওয়া যায়, তাদের আচার-ব্যাবহার, রীতি-নীতি, খাদ্যাভ্যাস, রুচি-সংস্কৃতি এসব সম্পর্কে অত সহজে কোন পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া যায়না। এর প্রধান কারন এদের অস্তিত্ত্ব আছে একমাত্র গতিশীলতার মধ্যে। সচল জীবন ছাড়া এদের আর খুঁজে পাওয়া যায়না! এবং এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই ব্যাপারে আমাদের জানার থেকে অজানা অধ্যয়ের পরিমানই বেশী। তবে মানুষতো বসে নেই। তারাও এই ব্যাপারে ধারনা পাবার কিছু কিছু উপায় ঠিকই বের করে নিয়েছে, এবং এখনো করছে। আগে আমরা এসব ব্যাপারে কিছুই জানতামনা, এখন আমরা জানি আমাদের কোথায় খুঁজতে হবে, কিভাবে খুঁজতে হবে। বিজ্ঞানের যে শাখা এই বিষয়টা নিয়ে কাজ করে সেটাকে আমরা বলে থাকি নৃ-তত্ত্ব। নৃতত্ত্ব খুজে বের করার চেষ্টা করে আদিম যেকোন জীবিত কিছুর (প্রধানত মানুষ) সামাজিক ব্যাকরণটা (social dynamics) কিভাবে কাজ করে সেটা বের করা। এর জন্য নৃতত্ত্ব প্রধানত সাহায্য নেয় সেইসব আদিবাসি নৃ-গোষ্ঠীর যারা এখনো তাদের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। নৃতত্ত্ব কিভাবে কাজ করে তার বিস্তারিত ব্যখ্যায় না গিয়ে আমরা সরাসরি মূল ব্যাপারে চলে যাচ্ছি।

    উদ্ধৃতর মধ্যে বোল্ড করা বাক্যে প্যারা শেষ করে পরের বাক্যে নতুন প্যারা শুরু করা যায়। এতে পড়তে সহজ হয়, আবার ন্যারাটিভ এর ধারাবাহিকতাও অটুট থাকে। একই ব্যাপার অন্যান্য বড় প্যারাগুলোর ক্ষেত্রেও। আশা করি, অফ-টপিকে এতো কথা বলায় কিছু মনে করনি ঃ)


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
    • মাহবুব (৯৯-০৫)

      প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এতো দেরীতে উত্তর দেবার জন্য। সিসিবিতে আমি লেখাটা জমা দিসিলাম বেশ অনেকদিন আগে। পাবলিশ করতে করতে সময় লাগায় পরে আর চোখেই পড়েনি যে লেখাটা ছাপা হইসে!
      লেখাটা তৈরী করার সময়ই বুঝতে পারছিলাম যে এটা বেশী ভারী হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার একাডেমিক পড়াশোনা সামাজিক বিজ্ঞান থেকে শত হস্ত দূরে হওয়ায় অন্ধের হস্তী দর্শনের মত সোজা কথাটাও লিখতে গিয়ে অহেতুক কথাবার্তা এনে ফেলেছি।
      আপনার পরামর্শ আমার জন্য খুবই উপকারে আসবে কারন লেখালেখির অভ্যাস বা অভিজ্ঞতা না থাকায় সহজ বিষয়গুলো সহজ করে বলতে পারিনাই। আমি চেষ্টা করেছি আপনার মতামত মেনে লেখাটাকে যত সম্ভব বোধগম্য করার।


      না জানাটা দোষের কিছু না, কিন্তু জানতে না চাওয়াটা দোষের। এইগুলানের শাস্তি হওয়া উচিৎ!!

      জবাব দিন
  3. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    সংক্ষেপে বলি।
    পরিবার প্রথায় কিছু সিনার্জি পাওয়া যায়, কিছু কমপ্রোমাইজও করতে হয়।
    পরিবার প্রথাটার যেঁকে বসার মুল কারন হলো, সিনার্জিগুলো কমপ্রোমাইজগুলো থেকে অনেক বেশি ছিল অগ্রগামি ছিল।
    যতই দিন যাচ্ছে, আমার ধারনা, একটা সময়ে পরিবার যেই যেই সিনার্জিগুলো ক্যাপিটালাইজ করতো সেগুলার ইফেক্ট ক্রমে ক্রমেই কমে আসছে।
    কিন্তু কমপ্রোমাইজের ক্ষেত্রগুলা কিন্তু একই রকমের রয়ে যাচ্ছে।
    যে সব সমাজে সিনার্জি মাইনাস কমপ্রোমাইজ < জিরো বা নেগেটিভ, সেসব সমাজে পরিবার প্রথা অলরেডি অপ্রয়োজনিয় হয়ে গেছে। টিকে আছে কেবলি এসথেটিক কারনে। গোটা বিশ্ব জুড়ে যে প্রবনতা বা প্যারেডিজম চলছে, তাতে করে অন্যত্রও এটা (সিনার্জি কমে যাওয়া) হতে না থাকার কোনো কারন দেখি না। তারমানে, যতই দিন যাবে, দেখা যাবে, পরিবার প্রথা অপ্রয়োজনিয় হয়ে উঠবে। মানুষ সেটা ধরে রাখার একটা চেষ্টা করবে, ঐ যে বললাম এসথেটিক কারনে অথবা অন্যকিছু নগদ সুবিধা পেতে। যখন সেই সুবিধাগুলোও পরিবারের জন্য আর খুব বিশেষায়িত কিছু থাকবে না, ধরে নেয়া যায়, গতানুগতিক পরিবার প্রথা বিলুপ্তই হয়ে যাবে। এটা রিভার্স হবার কোনো কারন দেখি না। কারন এর পিছনে যে যে ফ্যাক্টরগুলো কাজ করছে, সেগুলা রিভার্স করার কোনো সুযোগ নাই। এই ফ্যাক্টরগুলো হলো: ১) লিঙ্গভেদে সাম্যতার ভাবনা মানে অসাম্য নিরুতসাহিত করা। ২) সকল পেশায় নারীর অংশগ্রহন, এক্সক্লুসিভ মেল-জব বলে কিছু না থাকা। ৩) নারীর ক্ষমতায়ন, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ইন্ডিপেন্ডেন্স। ৪) টেকনোলজির উন্নতি সাধনে রিপ্রোডাকশান ডিসিশন নারীর করায়ত্ত হওয়া। ৫) জিনেটিক্স-এর উন্নতির সাথে সাথে সারকামসটেনশিয়ান এভিডেন্সের মাধ্যমে নয় বরং সায়েন্টিফিক এভিডেন্সের মাধ্যমে পিতৃত্ব নির্ধারনে সামর্থ অর্জন। ৬) চিকিতসাবিজ্ঞানের উন্নতির কারনে যৌনরোগ নিয়ন্ত্রন ও চিকিতসা সহজ হয়ে যাওয়া। ৭) অনেক অল্প বয়স থেকেই শিশুর বেড়ে ওঠায় মা-বাবা বা পরিবারের উপর নির্ভরতা ইন্সটিটিউশনালি কমিয়ে আনতে পারা। ৮) গর্ভধারনের মত অতি ব্যাক্তিগত ব্যাপারটাও আউটসোর্সিং করে ফেলা। ৯) ধর্মকে রাস্ট্রিয় বা সামাজিক আচার থেকে নামিয়ে ব্যক্তিগত আচারভুক্ত করার প্রবনতা। অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মের উপর নির্ভরশিলতা প্রত্যাহার করে নেয়া। ১০) ইত্যাদি এসবের যে কোনো একটাই রিভার্স করা যেহেতু প্রগতির অন্তরায় বলে গন্য না করার কোনো কারন নাই, তাই যত দিন যাবে, আমার মনেহয়, পরিবার প্রথা তত বেশি বেশি অপ্রয়োজনিয় হয়ে উঠবে......... (খুব একটা সংক্ষেপ হলো না। দুঃখিত) (সম্পাদিত)


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  4. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    মহাজাগতিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে পৃথিবীর বুকে এখন আমরা একটা টিউমারের ছাড়া আর কিছু নই! ক্যান্সার যেভাবে একটা শরীরে বাস করে তাকেই ধ্বংস করে বড় হয়, আমরাও পৃথিবীকে ঠিক সেভাবে শুষে ছিবড়ে বানিয়ে ছেড়ে দিচ্ছি! - বড়ই ভাবনার বিষয়, তবে রাজীব এর মন্তব্য পড়ে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম।
    বড় লেখা। পরে আবার আসার ইচ্ছে রইলো।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।