বুড়া-বুড়ির প্রেমকাহিনী এবং আমি…………

‘মানুষ সামাজিক জীব। সে একা বাঁচতে পারে না। জীবনে চলার পথে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের সংগীর প্রয়োজন। এভাবেই গঠিত হয় সমাজ……………….’ :-B
-তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটা সমাজ বইতে এসব একই বাক্য পড়তে থাকলে কে আর একা বাঁচতে চায় বলুন? তখন সবাই বেমালুম ভুলে বসে থাকি, ‘আসবার কালে আসলাম একা, যাইবার কালেও যাইব একা…’

তবুও আমরা ভালোবাসি। যখন আমরা ভালোবাসি কাউকে, তখন ভাবি, ‘ভালোবাসার থেকে সুন্দর আর কিছু নেই।’ আর যখন কারো ভালোবাসা-বঞ্চিত হই, তখন ভাবি, ‘ভালোবাসা বড়ই নিষ্ঠুর,ভালোবাসা যতটুকু দেয়,তার থেকে বেশি নেয়।’ হায়রে বিধাতার খেয়াল…….. হায়রে অবাক ভালোবাসা………..

………… আজ জীবনের ২২-তম বসন্ত পার করছি। এখনো কোন ১লা ফাল্গুনে বাসন্তী রঙ এর শাড়ী পড়া কারো হাত ধরে ‘বসন্ত-বরণ উৎসব’ দেখতে যাওয়া হয়নি। কোন ২রা ফাল্গুনে সকাল বেলায় সুদর্শনা বংগদেশী ললনার খোঁপায় একখানা লাল গোলাপ গুঁজে দিয়ে বলা হয়নি ‘ভালোবাসি তোমাকে।’ ১৪ই ফেব্রুয়ারী তারিখটাকে সবাই জানি ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ হিসেবে; কিন্তু এর নিচে আড়াল করে ফেলি ২রা ফাল্গুন>> ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’-কে! হায়রে বাঙ্গালী!…..এটা অনেকটা রিকশাওয়ালাদের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ না চিনে ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি’ চেনার মত!……..

১৪ই ফেব্রুয়ারীকে সামনে রেখে প্রেমিক-প্রেমিকারা কত কিছুই না প্ল্যান করে! আমি একবারই এই দিনটা নিয়ে চিন্তিত হয়েছিলাম, সেটা ২০০৬ সালে। দিনটা আসার আগেই কলেজে চলে যেতে হবে, তাই ভাবলাম, লাল গোলাপ যাওয়ার আগে দিয়েই যাব। দিন-তারিখে আর কীই-বা আসে যায়! অনুভূতিটাই আসল……..।

যেই ভাবা, সেই কাজ। মনের একটা স্বত্তা যুক্তিহীনতা মানে না, আরেকটা স্বত্তা যুক্তি-তর্ক মানতে চায় না। আর কথায় আছে, ‘ভালোবাসা কোন যুক্তি মানে না।’ দ্বৈত-স্বত্তার দ্বৈরথে তাই ‘যুক্তি-না-মানা’ স্বত্তাই জয়ী হল। টেলিফোনে আলাপ করে ঠিক করলাম, ঠিক দুপুর ১ টায় ‘তাঁর’ বাসার ফ্ল্যাটের দরজার সামনে একটা গোলাপ ফুলের তোড়া রেখে আসব, ‘সে’ দরজা খুলে তুলে নিবে। বুদ্ধিমত্তার ধার না ধেরে ১৫টা লাল গোলাপ কিনে তোড়া বানিয়ে জায়গামত রেখে এসেছিলাম। ২ ঘন্টা পর ফোনে জেনেছিলাম, তোড়াটা ‘সে’ পায়নি। তখন ভেবেছিলাম, আমার ভ্যালেন্টাইন গিফট কোন ফকির বা ময়লাওয়ালা নিজের ভ্যালেন্টাইন গিফট মনে করে নিয়ে চলে গেছে। ২ বছর পর জেনেছিলাম, তোড়াটা ‘সে’ পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু স্বীকার করতে পারেনি। কারণ,………..

…………..কারণ, ততদিনে ‘সে’ আমার নেই, অন্য একজনের হয়ে গেছে। আমার গিফট স্বীকার করা মানে যে আমার ভালোবাসা কে স্বীকার করা আর ‘তাঁর’ সদ্য পাওয়া ভালোবাসার সাথে প্রতারণা করা! ‘সে’ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিল সঠিক সময়ে। আমি পারিনি। ভেবেছিলাম, আগে Right moment আসুক, তারপর ভালোবাসার কথা প্রকাশ করব। বহুত দেরী করে ফেলেছিলাম, বুঝতেও পারিনি, বুঝার সুযোগও পাইনি, কারণ ‘সে’ বন্ধু হারানোর অজুহাতে সব গোপন রেখে গেছে। যেদিন জানলাম, আমার ভালোবাসার মানুষটা প্রায় দেড় বছর আগে থেকেই একজনকে মন দিয়ে বসে আছে, সেদিন আমার করার ছিল না কিছুই, পরদিন কলেজে চলে এসেছি। কোন দাবী ছিল না তার কাছে। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। আমার মনের সেই যুক্তিভক্ত স্বত্তাই শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর ভঙ্গিতে ঘোষণা করল, ‘Right moment never comes stupid, right moment always has to be made by yourself!’ 😡

এরপর প্রেম এসে মনের দরজায় কড়া নেড়ে গেছে কয়েকবার, সাড়া দেইনি। কারণ ভিতর থেকে সাড়া পাইনি। মেয়েগুলোকে ফিরিয়ে দিতে মোটেও ভাল লাগেনি। তারপরও দিয়েছি বিবেকের তাড়নায়। কেননা,ভালোবাসার নামে কারো মন নিয়ে খেলাধুলা করাটা আমার কাছে নিষ্ঠুরতা মনে হয়। কাজেই এই ২২ বছরের জীবনে কেউ প্রেম-বিষয়ক অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে দুই চরণেই সবকিছুর সারমর্ম বলে দেই,
“যাকে চাই,তাকে ভুল করে চাই,
যাকে পাই,তাকে চাই না।”
=((

বুঝতেই পারছেন, আমার নিজের কথা লিখতে গেলে তা মোটেও তো ‘রোমান্টিক’ হবেই না, বরঙ রীতিমত ‘প্যাথেটিক’ হয়ে যাবে। তাই আমার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর প্রেমের গল্প শোনাই। আমাদের ব্যাচে বন্ধুটার প্রচলিত নাম ‘বুড়া’।এর ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যে ব্যাখ্যা দাঁড় করানো গেছে তা হলঃ

“কথিত আছে, প্লাইস্টোসিন যুগে সৃষ্টিকর্তার জীব-জন্তুদের প্রতি মায়া হওয়ায় তিনি দুনিয়ায় রাখাল পাঠাবেন বলে মনঃস্থ করলেন। মেসোজোয়িক যুগে যখন ডাইনোসরদের ব্যাপক আধিপত্য চলছে, তখন এই বিশিষ্ট রাখাল-বালক স্বরূপে আবির্ভূত হলেন। অত্যন্ত প্রতাপের সাথে ডাইনোসর চরাতেন তিনি। আর তাই তাকে ‘ডাইনোবয়’ উপাধি দেয়া হল।ডাইনোসর বিলুপ্ত হল, কিন্তু বিধাতার আজব খেয়ালে তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করলেন। একে একে সকল যুগ পার করে যৌবন-সায়াহ্নে এসে তিনি ঠিক করলেন, ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হবেন, ক্যাডেট হবেন…..।’’

উপোরোক্ত প্রতিটা শব্দই চাঁপা এবং এর কারণ আমার এই বিশিষ্ট বন্ধুটা ভয়ানক চাঁপাবাজ। সে যখন গম্ভীর ভাব নিয়ে বলে, ‘কত ডাইনোসর পিটায়ে মানুষ করলাম জীবনে আর তুই তো……’ , তখন আসলেই বাচ্চা-কাচ্চারা মনে করে, ডাইনোসর পিটিয়ে মানুষ বানানো সম্ভব!!(অন্তত মাসরুফ ভাই তো মানুষই ,নাকি! :khekz: )

………তো ডাইনোবয় ক্যাডেট হলেন, ক্যাডেট কলেজ থেকে আমাদের সাথে বেরও হলেন। কিন্তু যৌবন লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ভেবে তিনি যারপরনাই চিন্তিত হয়ে উঠলেন। ঠিক করলেন, এতদিন একা ছিলেন, এখন সঙগী জোটাবেন। আর আমরা এই সুযোগে তার নামের বিবর্তন ঘটিয়ে রাখলাম, ‘বুড়া’।

স্নাতকে ভর্তি হয়ে সদ্য বার্ধক্য প্রাপ্ত বুড়ার হৃদয় প্রেমগাহে স্নান করবার জন্য উথালপাতাল করতে থাকল। একটা মেয়ের সাথে তার সখ্যও গড়ে উঠল, কিন্তু পানি আর তার গন্তব্যস্থল পর্যন্ত পৌঁছতে পারল না। মেয়েটা এর মধ্যেই আরেকজনের প্রেমদীঘিতে স্নান করে ফেলল। আশাহত বুড়ার মন থেকে একটার পর একটা দার্শনিক উক্তি উৎসারিত হতে থাকল। যেমন- “একটাই তো মন,কয়জনকেই আর দেয়া যায়!’’…… “মেয়েদের কোন বিশ্বাস নাই,এই আছে এই নাই।’’…ইত্যাদি,ইত্যাদি। :no:

ডিপ্রেশন কাটানোর জন্য আমার আরেক বিশিষ্ট বন্ধু বুড়াকে একখানা মেয়ের নম্বর জোগাড় করে দিল। মেয়েটা সম্পর্কে বন্ধুটার বোনের বান্ধবী হয়। যাই হোক, আশাহত বুড়ার জীবনে আশা আনয়নের এই প্রচেষ্টাই এক নয়া দিগন্ত উন্মোচন করল। রাত ১২টা বাজত, আর বুড়া সুরসুর করে মোবাইলখানা পকেটে ভরে রুম থেকে বেরিয়ে যেত, ফিরত এক-দুই ঘন্টা পর, সন্তুষ্ট মুখে। এভাবে, এক-দুই সপ্তাহ যাবার পর সে আমাকে বলল, ‘চাচা,বৃহস্পতিবারে রাজশাহী যামু।’ উল্লেখ্য, বন্ধু মহলে প্রেম-সংক্রান্ত তত্ত্ব-জ্ঞানে পারদর্শিতা, ১ম স্যাকামাইসিন সেবন, নারীবিষয়ক সবজান্তামূলক ভাবভঙ্গি প্রদর্শনসহ আরো নানাবিধ কারণে আমি সবার ‘চাচা’ হয়ে গেছি! তো বুড়ার এই অকস্মাৎ অনাকাংখিত রাজশাহী যাবার কারণ আমি বুঝলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাস্তে,কাহিনী কি? প্রপোজ-থপোজ জাতীয় কিছু নাকি?’ আমার শংকাকে সত্য প্রমাণ করে সে লাজুক ভঙ্গিতে জবাব দিল, ‘জ্বী চাচা,ভাবতেছি করে দিমু, দেখি কি হয়, কিন্তু কেমনে করমু বুঝতেছি না।’ আমার ক্যাডেট সত্ত্বা টীজ করার এমন সুযোগ পেয়ে আহ্লাদিত হয়ে উঠল। কিন্তু ততদিনে ‘চাচা’ উপাধি আমাকে আসলেই একটা মুরুব্বীয়ানা ভাব এনে দিয়েছে। তাই চিন্তিত মুখে বললাম, ‘ভাস্তে, এত তাড়াতাড়ি কম জেনে-শুনে একটা মেয়েকে প্রপোজ করাটা কি ঠিক হবে? আপনে ভাল করে ভেবে দেখছেন ব্যাপারটা, যদি রেজাল্ট নেগেটিভ হয়, তাইলে….’

সে কনফিডেন্টলি উত্তর দিল, ‘চাচা, আমি কথা বলে আমার চিন্তাভাবনার সাথে ওর চিন্তাভাবনার ভালোই মিল পাইছি। মনে হয় আমার সাথে তার মেন্টালিটি ম্যাচ করে যাবে।আমার ওকে দেখতে ইচ্ছা করতেছে। যাই দেখা করে আসি, নেগেটিভ-পজিটিভ কোন ফ্যাক্টর না……’ ।আমার দার্শনিক চিত্ত চিন্তা করল, ‘হায়রে দুনিয়া,কত ফাস্ট মানুষ ‘প্রেম থেকে পড়ে’ আর কত ফাস্ট মানুষ ‘প্রেমে পড়ে’!’ মুখে বললাম, ‘তা ভাস্তে। কেমনে প্রপোজ করবেন, ভাবছেন কিছু?’ সে বলল, ‘কি আর দিমু, ফুল…..স্বাভাবিক ভাবেই লাল গোলাপ!’ আমি বললাম, ‘তাইলে ভাস্তে এক কাজ করেন, একটা গোলাপ ফুলের তোড়া এক হাতে নিয়ে যাবেন, আর আরেকটা মাত্র গোলাপ ফুল আরেক হাতে নিয়ে যাবেন। আগে তোড়াটা দিবেন, পরে একটা ফুল দিয়ে ‘তিন-শব্দ’ মাইরা দিবেন, মনে হয় কাহিনী হয়ে যাবে!’ সে হাসতে হাসতে বলল, ‘ওরে সারছে চাচা, এইরাম তরিকা কোন সিনেমায় ছিল? ভালোই বললেন তো!’ নিজের জীবনে গোলাপ ফুলের তোড়া নিয়ে যে ছিঃনেমা হয়ে গেছে,সেটা আর প্রকাশ করলাম না। :bash:

তো যথারীতি নতুন শার্ট-প্যাণ্ট, জুতা পরে আমার ‘বুড়া’ বন্ধু বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহীতে প্রেমের উপাখ্যান রচনা করতে গেল। শুক্রবার সারাটা দিনে কয়েকবার চেষ্টা করেও আমরা কয়েকজন তার খোঁজ নিতে পারলাম না। চিন্তায় ছিলাম। সেদিন সন্ধায় আবার ঢাকায় ধানমণ্ডি স্টার হোটেলে এক বন্ধু আমাদের খাওয়ানোর কথা ছিল।আমরা স্টারে পৌঁছানোর মিনিটদশেকের মধ্যে বুড়াও রাজশাহী থেকে সেখানে হাজির। ক্লান্ত-বিদ্ধস্ত বুড়ার চেহারা দেখে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইয়ে ভাস্তে,খবর কি? শহীদ নাকি গাজী?’ সে একগাল হেসে জবাব দিল, ‘চাচা, আপনার আইডীয়াটা সে লাইক করছে। পুরাই গাজী!!” আমি আর কি বলব! এত খুশি লাগল, মনে হল জড়িয়ে ধরি, কিন্তু স্টার-ভর্তি লোকজন ‘ভুল’ বুঝতে পারে ভেবে কিছু করলাম না! সবাইকে খবরটা আমিই জানালাম। পুরাটা সময় বুড়ার প্রেম-সূচনা শুনতেই পার হয়ে গেল, যার দাওয়াত খেতে গিয়েছিলাম, তার কথাই সবাই ভুলে গেলাম!….. এভাবেই বুড়ার জীবনে ‘বুড়ীর’ আগমন। :hatsoff:

মোবাইলের কল্যাণে তাদের যোগাযোগ চলতে থাকে। মাঝে মাঝে রাজশাহীও যাওয়া হয়। বুড়ার ক্লাস-পার্ফর্মেন্সও অনেক ইম্প্রুভ হয়। এভাবে চলতে চলতে একদিন বুড়া আমাকে জানালো, ‘চাচা,আমার আব্বা-আম্মা ওকে দেখতে চাইছে। কালকে নাইটে ওকে ঢাকা নিয়াসমু আর সকালে বাপ-মার সাথে দেখা করায়ে রাজশাহী দিয়ে আসমু।’ আমি আকাশ থেকে ১০-১২ বার পড়লাম! বললাম, ‘ অ কি কইলেন ভাস্তে! এত্ত তাড়াতাড়ি জানাই দিছেন ফ্যামিলি রে?!! যদি কোন গ্যাঞ্জাম হয়, ব্যাপারটা কেমন হবে বলেন তো!?’ ভাস্তে বলল, ‘ব্যাপার না,দেখি কি হয়।’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা ভাস্তে। আপনার যা ভাল মনে হয় করেন, আপনার লাইফ, আপনার ডিসিশন…..সমস্যা নাই, আমরা থাকমুনে ওইসময়’

‘বুড়ী’-কে নিয়ে নাইটে ঢাকা আসল বুড়া। বুড়ীকে একটা হলের বান্ধবীর রুমে ফ্রেশ হওয়ার সুযোগ দিয়ে নিজে একটা ছোট ঘুম দিয়ে নিল। মাঝখানে একবার এসে আমি দেখে গেলাম, বুড়া ঘুমাচ্ছে। ১২টার দিকে বুড়া আমাকে ফোন দিল, ‘চাচা,আমার ফ্যামিলি আসছে। আপনি কি আসবেন?’ আমি আসতেছি বলেই দৌড় দিলাম। গিয়ে যা দেখলাম তাতে চক্ষু পুরাই ছানাবড়া হয়ে গেল! বুড়ার ফ্যামিলি না-পুরা চৌদ্দ গুষ্ঠীই আসছে। আমাদের কয়েকজনের সাথে বুড়া তার পরিবার্বর্গের সাথে পরিচয় করায় দিল। এত্তগুলা মানুষ আর এর মধ্যে অপরপক্ষের একমাত্র প্রতিনিধি পাত্রী নিজে!! আমি নিজেই নার্ভাস হয়ে পড়লাম। মেয়েটা পজিটিভ থাকতে পারবে তো! বাংলাদেশে পাত্রী দেখতে যাওয়ার ইতিহাস তো অতটা সুখকর নয়! কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই বুড়ী পুরা পরিবারটাকেই আপন করে নিল। আমরা বাকি বন্ধুগুলা এই মিলনমেলায় নিজেদেরকে বেমানান ভাবলাম। নামাজে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে চলে আসলাম। আমার কী কারণে ভাল লাগছিল জানি না, কেন মিটীমিটী হাসছিলাম তাও জানি না, কিন্তু প্রথম দেখাতেই বুড়ী আমার শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্রী হয়ে গেল……. :salute:

পরের সময়টুকুতে যা যা ঘটেছিল তার কতকটা ভাস্তে আমাকে শুনিয়েছিল এইভাবে, “চাচা,আর বইলেন না। ভাবলাম, আম্মা একটু খাস্টা হবে ওর উপরে। ঘটনা দেখি পুরাই উল্টা। এক্কেবারে পিরীতের আলাপ দুইজনের মধ্যে! আমার বৌ(!) তো রীতিমত আমার নামে কম্পলেইন করে বসছে, আন্টি আপনার ছেলে পড়াশুনা করে না, গেমস খেলে খালি! আম্মা বলে, মা! তুমি ভালো করে বুঝায়ে ওরে লেখাপড়া করাইও! পরে দুজন মিলে আমারেই ঝাড়ি দিল!” আমি বাকরুদ্ধ। মনের দার্শনিক-চিত্ত চিন্তা করল, ‘অবাক দুনিয়া, স্বপ্ন দেখতেছিনা তো! কোথায় এর বাপ-মা আর কোথায় আমার টা! আর কোথথেকে এই বূড়ী আইসে সব উল্টায় ফেলল!!’…. 😮 …….একটা কথা অবশ্য বুড়া বলেছিল, ‘চাচা,দোয়া কইরেন, এরকম মিল যেন থাকে। কোন ক্রমে আমাদের ঝামেলা দেখা দিলে ব্যাপারটা খুব খারাপ দেখাবে।’

শীতকাল। বুড়ার ঠাণ্ডা লেগেছে। মাফ্লার গলায় প্যাঁচালে চুলকায়। এ কথা শুনে বুড়ি তার একটা ওড়না বুড়াকে পাঠিয়ে দিল। বুড়া সেটা গলায় জড়িয়ে রুমে পড়াশুনা করে, ঘুমায়। আমরা মজা পাই, টিজ করি। কিন্তু আমি মনে মনে ভাবি, ‘হায়রে অবাক ভালোবাসা!……; O:-)
বুড়া-বুড়ীর রসায়ন দুর্বার গতিতে চলছে। গত ভালোবাসা দিবসে নিউ মার্কেটের ‘আর্চিস’ থেকে কিউট একটা ‘বেবী-ডল’ কিনে বুড়া বুড়ীকে কুরিয়ার করে পাঠিয়েছিল। আমিও সাথে ছিলাম। টিজ করেছি, ‘এইটা হইল বুড়া-বুড়ির প্রথম বাচ্চা। প্রতি বছর ১৪ই ফেব্রুয়ারীতে একটা করে বাচ্চা কিনে পাঠাবেন ভাস্তে!’ অবশ্য এই ভ্যালেন্টাইন’স ডে-তে কি দিবে কিছু বলেনাই। না-ই বা জানলাম,ওরা সুখেই থাক………………………আপনারা দোয়া করবেন প্লিজ, ওরা যেন সুখী হয়………. :guitar:
**********************************
ভালোবাসা নামের ফ্যান্টাসি এখন আমার মধ্যে কাজ করে না। এর সাথে দায়িত্বশীলতা,সমঝোতা এসব ব্যাপারও আছে, এইটা এখন বুঝি। তারপরও আশেপাশে যখন এত স্বৈর্গিক ভালোবাসা দেখি তখন আসলেই প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে। আবার যখন কোন বন্ধু ‘প্রেম থেকে পড়ে’ চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন তাকে সান্ত্বনা দেই আর ভাবি, ‘সবই মায়া……একলাই ভালো আছি…..কোন প্রেসার নাই…..রিস্ক নাই।’ বন্ধুগুলোকে অসম্ভব ভালোবাসি। আড্ডায় বসলে যখন কেঊ নারীঘটিত কারণে অনুপস্থিত থাকে, তখন তাকে মিস করি আর ডায়লগ ছাড়ি , “সে-ই সফল পুরুষ,যে পরিবার-বন্ধু-প্রেমিকা এই তিন শ্রেণীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে পারে। আর সেই নারীই মহীয়সী, যে প্রেমিকের মন পুরোটাই দখল করবার জেদ না করে পরিবার আর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ দেয়।” :-B
তবুও স্বপ্ন দেখি, কোন এক রোদেলা দুপুরে একজন সুদর্শনা বংগদেশী ললনা আমার নাকের সামনে তার সুগন্ধি রেশমী চুল মেলে দিয়ে, আমার কানে ফিসফিস করে বলছে, “JIBON,I LOVE ONLY YOU,REALLY!”………… :dreamy:

এখন নতুন যার প্রেমে পড়েছি, তার নাম ‘সিসিবি’।সারাটা দিন রুমে থাকলেই এই ওয়েবপেজ খুলে বসে থাকি।সবার লেখা যত না ভালো লাগে,তার থেকে ভালো লাগে কমেন্টগুলো। বসদের লেখা পড়ি আর ভাবি, ‘নাহ,কিচ্ছু পারি না,অনেক শিখার আছে!’ আমার ছুট্টু বুন্ধুগুলা বিস্মিত বা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘ভাইয়া আপনি পড়েন না?সারাক্ষন তো দেখি নেট এই থাকেন!’ আমি অযথাই তর্ক করি, ‘আমি নেট এ সারাক্ষন থাকি কিনা চেক করার জন্য তুমিও সারাক্ষণ নেট এ থাক,তাই না?!’ 😛

…নাহ,আসলেই ‘সিসিবি’-টারে ভালোবাসি….ইশশিরে! ‘সিসিবি’-টা যদি একটা ‘মেয়ে’ হইত! 😡

৪,৮১৬ বার দেখা হয়েছে

২১৬ টি মন্তব্য : “বুড়া-বুড়ির প্রেমকাহিনী এবং আমি…………”

  1. রকিব (০১-০৭)
    ‘সিসিবি’-টা যদি একটা ‘মেয়ে’ হইত!

    তাইলে কি সিসিবি ছেলে? 😛 😛
    আছিব ভাই, দারুন লিখছেন। মন খারাপ কইরেন না। আমিও প্রতিবারের মতো এবার একলা একলাই ভালান্তাইন দেবস পালন করবো। :((


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    অন্তত মাসরুফ ভাই তো মানুষই ,নাকি! x-( x-( তোরে কাঁচা খামু নাকি সালুন বানায়া খামু সেইটা ডিসাইড করতেই যা সময় লাগতেছে x-( x-(

    অফ টপিক- যাউজ্ঞা তাও মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিলি- তোর ভাতিজি আমারে "আফ্রিকান গরিলা" কয় :(( :((

    জবাব দিন
  3. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    পিন্টু রে, আমি তোর লেখার বিয়াপক পাঙ্খা হয়া গেছি ইতোমধ্যেই।পরথম কাহিনীতে তোরে রান আউট হইতে দেইখা অনেক কষ্ট পাইছি রে,সিরিয়াস্লি 🙁 তয় ভাবিস না,একদিন তুইও... :clap:

    জবাব দিন
  4. রুবেল (৯৯-০৫)

    😉 😉 দেখ মজা ।সিসিবি র সকল বুড়া বুড়ী গেছে পিরিত মারতে =)) =)) =)) এত জমজমাট কাহিনীতে কমেন্ট কম কিল্লাই???ব্যাপার নাহ !আমরা আছি,অল দ্য সিংগল বয়েজ!!!!চালাই যা্ও 🙂

    জবাব দিন
  5. মিথুন (2000-2006)

    চাকা তর লেখা ভাল হইসে।।।।।
    আমার এখন মনে পরে চাপাবাজটা শহীদ মিনার এ রাতের বেলা বইসা বলত " সব ই মায়া" আর অই দিন আমি জানতে পারলাম না যে এত বড় একটা কাহিনি এত ঠান্ড়া মাথাই অ কইরা আসবে
    আসলে সবই অভিঞ্জতা হাজার হইলেঅ এত দিন ধইরা বাইচা আসে

    অর জন্য সরবাত্মক শুভ কামনা ""

    জবাব দিন
  6. সাকেব (মকক) (৯৩-৯৯)

    ভাইডি, দুর্দান্ত হইসে...
    আমি সেই ১৯৫৩ সালের দিকে সিসিবিতে রেগুলার ছিলাম, তারপর শীতনিদ্রায় চইলা গেসি B-) ...আজকে তোমারে 'ফ্যান' হইয়া বাতাস দিতে উপরে আসলাম।


    "আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
    আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস"

    জবাব দিন
  7. মাহমুদ (১৯৯৮-২০০৪)

    সাকেব ভাই,আমি কিন্তু আপনার ফ্যান।আপনি একবার এ্যাথলেটিক্সে আসলেন কলেজে,আপনারে দেখাইয়া আমার আব্বুকে বললাম যে উনিই সেই সাকেব আরেফিন ভাই,১ম স্ট্যান্ড।
    আপনাকে আমরা ৭ দিন পাইছিলাম,আপনি আমাদের নয়া ক্লাস ৭ এর সবার সাথে ১১ নং রমে একটা ছবি তুলেছিলেন।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।