ভাসাই ভাবের ভেলা, লালনের সঙ্গে

Ferdinand de Saussure তার Course in General Linguistics (1915) বইয়ে langue (ভাষা) এবং parole (বাক্য) এর মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা করেছেন, যা পরবর্তীকালে ভাষাতত্ত্ব নামক একটা স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিনের জন্ম দিয়েছে। তার মতে, ভাষা হল সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম কানুনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটা নৈর্ব্যক্তিক কাঠামো যা’র মধ্য দিয়ে আমাদের ভাবের আদান-প্রদান সম্ভব হয়। আর এইসব নিয়ম কানুনের চক্করের মধ্য দিয়ে আমাদের ভাব যে আকারে প্রকাশিত হয়, তা’ই হল বাক্য বা কথা। (উচ্চারিত বাক্য বা কথাই কিন্তু ভাবের একমাত্র প্রকাশির রুপ নয়, ভাব নিজেকে অনুচ্চারিত রেখেও প্রকাশিত হতে পারে, যেমন, চোখমারা, চিমটিকাটা, ইত্যাদি)। তাহলে, ভাষা হলো এটা “সাধারন” বিষয়, আর বাক্য বা কথা হলো ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত “বিশেষ” ভাব। হালকা প্যাঁচ খাইতাছে নাকি? দেখি, উদাহরণ দিয়ে প্যাঁচ খোলা যায় কি না।-

ভাবের এই যে “সাধারন” আর “বিশেষ” অস্তিত্ব, তা আমরা আলাদা করে বুঝবো কি করে? আর বুঝেই বা কি লাভ হবে?- আমার মতে, জ্ঞানচর্চার একেবারে শুরুর দিকের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হচ্ছে “সাধারন” আর “বিশেষ” এর মধ্যে পার্থক্য অনুধাবন। এই বিষয়ে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাবার মতো একটা ভাষা ভাষা একটা ধারনা আমাদের সবারই কমবেশি আছে। কিন্তু কোন কিছুর প্রকৃত অর্থ উপলব্ধির ক্ষেত্রে এই বিষয়টার পুরোপুরি আয়ত্বে আনা জরুরী। কিভাবে? এইবার আসা যাক সেই প্রসঙ্গে।-

“ফুল”আর “গোলাপ” এর মধ্যে সম্পর্ক কি?
– আপাতদৃষ্টিতে এই প্রশ্নটা এতটাই সরল যে, কাউকে জিজ্ঞাসা করলে আমার মাথার স্বুস্থতা নিয়ে সন্দেহে পড়ে যাবে। কারন, আমরা সবাই কিন্তু বুঝি এই সম্পর্কটা, তাই না? কিন্তু একটু ভালো করে ভেবে দেখুন তো “ফুল”আর “গোলাপ” এর মধ্যে আসলে সম্পর্কটা কি?- প্রথমটা সাধারণ, আর দ্বিতীয়টা বিশেষ। অর্থাত, প্রথমটা দুনিয়ার যাবতীয় জিনিস যা ফুল নামে পরিচিত, তাদের বৈশিষ্ট্যাবলির একটা ধারনা মনের মধ্যে তৈরী করছে, আর দ্বিতীয়টা সেই ধারনার আলোকে একটা বিশেষ জিনিস নির্দেশ করছে যা সেইসব বৈশিষ্ট্যাবলি ধারন করে, কিন্তু আরো কিছু অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য নিয়ে অন্য সমজাতীয় জিনিসগুলো হতে আলাদা (স্বতন্ত্র)।

গোলাপ নামক জিনিসটি তার সাধারন কিছু বৈশিষ্ট্যের কারনে ফুল, আর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারনে “গোলাপ ফুল”। তারমানে, গোলাপফুল জিনিসটা কি তা উপলব্ধি করতে গেলে ফুলের সাধারন বৈশিষ্ট্য+গোলাপের বিশেষ বৈশিষ্ট্য দুই’ই অনুধাবন করতে হয়, একই সাথে। ফুলের সাধারন বৈশিষ্ট্যবালী কি কি? প্রথমতঃ ফুল উদ্ভিদজাত, এটি উদ্ভিদের বংশবিস্তারের সাথে সম্পর্কিত (আরো কতগুলো থাকতে পারে, কিন্তু আলোচনার জন্য দুটোই যথেষ্ট)। এরপর যে সব বৈশিষ্ট্য আসে, তা’র প্রায় সবই বিশেষ বিশেষ ফুলের “বিশেষ” বৈশিষ্ট্য। যেমন, বিশেষভাবে নির্দিষ্ট উদ্ভিদ, রং, সুবাস, আকার, ফোটার সময়, ইত্যাদি।

সাধারনভাবে “ফুল” বলে কি অর্থবোধক কিছু আছে?
– না, নাই। কারন, শুধু “উদ্ভিদ-জাত” বা “বংশবিস্তারের সাথে সম্পর্কিত” দিয়ে কোনকিছুর ভাবই প্রকাশিত হয় না। তাই যা কিছুই আমরা “ফুল” হিসেবে জানি, তা’র সবই “বিশেষ ফুল”- গোলাপ, বেলী, হাস্নাহেনা, ইত্যাদি,যারা সবাই ফুলের সাধারন বৈশিষ্ট্য+নিজ নিজ বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রকাশিত।

তারমানে, শুধু “সাধারন” বৈশিষ্ট্য দৌড়ের উপরে। এবার দেখা যাক “বিশেষ” বৈশিষ্ট্য।

কোন বিশেষ জিনিসের রং, আকার, সুবাস গোলাপ ফুলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো সাথে মিলে গেলেই কি তা’কে গোলাপফুল বলব? কাগজ, রাবার, ইত্যাদি দিয়ে আর্টিফিসিয়ালী একটা জিনিস ত বানানো যায়ই। কিন্তু তা’কে ত গোলাপফুল বলবো না; বলবো কাগজের গোলাপ, বা রাবারের গোলাপ, বা অন্যকিছু। যাবতীয় “বিশেষ” বৈশিষ্ট্য থাকার পরেও একারনেই “সাধারন” বৈশিষ্ট্য না থাকায় জিনিসটা গোলাপ হয়ে ওঠে না। কাজেই, শুধু “বিশেষ” বৈশিষ্ট্যও দৌড়ের উপর।

অতএব, আমাদের ভাবের লেনদেনের ক্ষেত্রে কোন জিনিস তখনই পরিপূর্ণ অর্থবহ হয়ে ওঠে যখন তা “সাধারন+বিশেষ” বৈশিষ্ট্যাবলি একই সাথে ধারন করে। একারনেই কোন জিনিস/বস্তু/বিষয়ের সাধারন ধারনাগুলো থাকার পরও আমরা বিশেষ কিছু খুঁজি সেই বিষয়টার অর্থ পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করার জন্য। কিন্তু এই “সাধারন” এবং “বিশেষ” সর্বদাই একত্রে থেকে অর্থময় ভাব উতপন্ন করে। অনুভবের স্তরে এদের আলাদা করা যায় ঠিকই, কিন্তু এই পার্থক্য চাক্ষুস করা যায় না। মানুষ কে দিয়ে আরেকটা উদাহরন দেই।-

“মানুষ” কি?
আমরা সবাই জানি এর উত্তর।
আসলেই কি জানি?- মানুষ কি তা জানলে ত উদাহরন দিতে পারার কথা। একটা উদাহরন খুঁজুন ত।
-এটা একটা ব্যাপার? সানাভাই, শওকত ভাই, ইউসুফ ভাই, সিসিবি’র এডু/মডু’রা সহ সবাই ত মানুষ।
কি পেলেন?- না, সাধারন মানুষ পাওয়া যায়নি, পাওয়া গেছে “বিশেষ” মানুষ। কারন, এরা সবাই মানুষের সাধারন বৈশিষ্ট্যাবলী নিয়েও কিছু কিছু “বিশেষ” বৈশিষ্ট্যের কারনে একেকজন “বিশেষ” মানুষ। একেকজন “বিশেষ” একজন মানুষ, তাই না?
– তাহলে “সাধারন” অর্থে মানুষ কি তা অনুধাবন করতে পারলেও বাস্তবে যে মানুষকে পাওয়া গেল, তা “বিশেষ” মানুষ। এখানে গোলাপফুলের মতো একই ভাবে মানুষের “সাধারন+বিশেষ” বৈশিষ্ট্য সমন্বিতভাবে পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করছে।

“সাধারন” আর “বিশেষ” এর মধ্যকার সম্পর্ক অনেকটা “আধার” এবং “আধেয়” এর মতো। আধার ছাড়া আধেয় নাই, আবার আধেয় না থাকলে আধার অপূর্ণ। জগতের “সাধরন মানুষ” ভাবটা তাই অনিবার্যভাবেই একটা আধার, যা নিজের মধ্যে দিয়ে আপনি-আমি’সহ সকল “বিশেষ” মানুষকে অর্থময় করে তোলে। কাজে কাজেই “সাধারন মানুষ” ভাবের একটা কাঠামো যা’র মধ্যে আমাদের সবার নিজ নিজ “মানুষ-ত্ব”-এর অর্থ নিহিত। একারনেই “আমি কে” তা বোঝার জন্য আগে “মানুষ কি” তা বোঝা জরুরী। আসুন, এইখানে লালনকে স্বরন করি।-

“বাড়ির পাশে আরশি নগর, সেথা একঘর পড়শি বসত করে।
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।

গিরাম বেড়ে অগাধ পানি, নাই কিনারা নাই তরণি পারে
বাঞ্ছা করি দেখবো তারে, ক্যামনে সেথা যাইরে, আমি
একদিনও না দেখিলাম তারে।

কি বলবো পড়শিরো কথা, হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা নাই রে।
ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর ক্ষণেক ভাসে নিড়ে।
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।

পড়শি যদি আমায় ছুতো, যম যাতনা সকল যেতো দূরে।
সে আর লালন একখানে রয়, – তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে।
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।

বাড়ির পাশে আরশি নগর, সেথা একঘর পড়শি বসত করে।
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।”

লালনের এই মানুষ হল “সাধারন মানুষ” যা’র মধ্যে দিয়ে ব্যক্তি-লালনের নিজের “মানুষ-ত্ব” (মনুষ্যত্ব নয় কিন্তু) অনুভব সম্ভব। এই “ভাব/উপলব্ধি/জ্ঞান”টা ধরার জন্য তাই লালন ব্যাকুল। লালন এটাও বুঝতে পারছেন যে, এই “সাধারন” মানুষটা তার উপলব্ধির/অনুভবের খুব কাছেই আছে (যেমন, সাধারন মানুষ সম্পর্কে আমাদের ধারনা), কিন্তু তা’কে ঐরুপে ধরা যাচ্ছে না কিছুতেই। কারন, সে সর্বত্র বিরাজমান হলেও তার কাছাকাছি যাবার উপায় নাই (পড়ুন, ভাষা নাই); কারন, তা’র হাত-পা-কাঁধ-মাথা নাই (এগুলো মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য)।- এই কারনে এই “সাধারন” মানুষ দেখা দিয়েও ধরা দেয় না। লালনের পড়শির মতো।

লালন শেষ করছেন এই আঁকুতি নিয়ে যে, সেই “সাধারন” মানুষকে ধরতে পারলে, নিজের উপলব্ধিতে আনতে পারলে তার সমস্ত দুঃখ-কষ্টের বোধ লোপ পেত।

এবার আসুন ফিরে দেখি বৈজ্ঞানিক ভাষাতত্বের পরিমন্ডলে আমাদের “লোক-কবি” লালনের উত্থাপিত জিজ্ঞাসা।-

ভাষাতত্ত্ব “সাধারন” আর “বিশেষ” এর মধ্যে পার্থক্য করে দেখিয়েছে যে, langue (ভাষা) এবং parole (বাক্য) আমাদের উপলব্ধির দুটো আলাদা স্তর। প্রথমটি বাক্যের গঠনকে নির্ধারন করে, কিন্তু বাক্যের মধ্যে প্রকাশিত হয়না। বাক্যে যা প্রকাশিত হয়, তা হল “বিশেষ” ভাব, যা আবার শুধুমাত্র সাধারন কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব (উপরের গোলাপফুল আর মানুষের উদাহরন দ্রষ্টব্য)। একই কথা কি লালনও বলছেন না? দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য শুধু এইটুকু যে, Saussure প্রশ্নটা উত্থাপন করছেন abstract লেভেলে ভাষার বিচারে, আর লালন করছেন মানুষের বিচারে।

তাইলে?-

২,০০৯ বার দেখা হয়েছে

১৯ টি মন্তব্য : “ভাসাই ভাবের ভেলা, লালনের সঙ্গে”

  1. জুবায়ের অর্ণব (৯৮-০৪)

    আপনি কি ভাষাতত্ব পড়ছেন নাকি? এটা আমার খুবই পছন্দের। আমি গত বছর একটু জার্মান শিখেছিলাম। আমি গ্র্যামার একটু বুঝি। মনে পড়ে দেশে ব্যাকরণের কথা চিন্তা করলেই হাঁসফাঁস লাগত অথচ এখানে এসে দেখি খুবই মজার একটা জিনিষ। হাস্যকর হলেও সত্যি আমি মনে করি আমি বাংলা শিখেছি ব্রিটেনে এসে। ইনফ্লেকশন, ডিক্লেনশন জেনেছি। আমি অভিভুত হয়েছি দেখে যে আমাদের ইন্ডো ইউরোপীয়ান ফ্যামিলি কিভাবে অ্যানসিয়েন্ট মাইগ্রেইশনের মধ্য দিয়ে আভেস্তার মধ্য দিয়ে, রিগ্ভেদের মধ্য দিয়ে পুরো য়্যুরেইশিয়ার মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। ব্যপারটা আমার কাছে লাগে বায়োলজিকাল ইভল্যুশনের মত। সময়ে তারা আলাদা হয়েছে, এতটাই আলাদা যে বাংলা ইংরেজীর মধ্যে কোন সম্পর্ক আছে দাবী করলে হাস্যকর শোনায়, তারপরও অভিভুত হতে হয় দেখে ওয়ন-এক, টুউ-দুই, থ্রীই-তিন, ফোঅর-চার দেখে তাই নয় কি? আশা করি এই ব্যাপারে আরো লিখবেন। ধন্যবাদ।

    জবাব দিন
    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      ভাষাতত্ত্ব খুব অল্প পড়েছি, তাও আবার পোষ্টমডার্নিজমের পূর্বসূরী পোষ্টস্ট্রাকচারালিজম পড়তে গিয়ে। ;;;

      তবে ভাষাতত্ত্বে উত্থাপিত এই সাধারন আর বিশেষের আলোচনা জ্ঞানচর্চার একটা মূল বিষয়কে ব্যাখ্যা করে আমাদের বোধকে তীক্ষ্ণ করে। জ্ঞানের আলাদা শাখা হিসেবে ভাষাতত্ত্ব আমাকে অতোটা টানে না। :((


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    ব্যাপার না। আমি বুঝতে পেরেছি এটা একটু উপর দিয়া যাইতাছে।
    পরে আবার কোন এক সময়...... 😀

    (আদতে বিষয়টা ততোটা কঠিন না কিন্তু 😛 )


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  3. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    এই ব্লগ আমি আগে পড়ি নাই কেন? নিইজের উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। এর চেয়ে সুন্দরভাবে বোঝানো যেতো না। এই বিষয়ে লেখা ছেড়ে দিলেন কেন মাহমুদ ভাই? এটা ঠিক যে এই লেখা প্রয়োজনীয় সাড়া পায় নি। কিন্তু আরেকটা লিখলে ঠিকই দেখবেন অনেক পাঠক তৈরি হয়ে গেছে। আমি অধীর আগ্রহে লালন এবং ভাষাতত্ত্ব এর মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে লেখার অপেক্ষায় থাকলাম। এবার নিজের কিছু কথা যোগ করি:

    আধার এবং আধেয়

    জানেনই তো, আমি অতিরিক্ত সিনেমা দেখি। তাই সবকিছুতেই সিনেমার রেফারেন্স চলে আসে। সিনেমা একটা শিল্প, অবশ্যই দর্শন নয়; কিন্তু সিনেমার মাধ্যমে দর্শনের কিছু বিষয় ব্যক্ত করা যায়। শিল্পীরা এই বিষয়গুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে না জেনে ব্যক্ত করেন। আর ব্যক্ত করা জিনিসগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন না। ব্যাখ্যাটা বোধহয় দার্শনিক দেরই করতে হয়।

    স্ট্যানলি কুবরিক এর "২০০১: আ স্পেস অডিসি" সিনেমাটার কথা মনে হয়ে গেল। আমি এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছি, ২০০১: আ স্পেস অডিসির কিছু মানুষ চরিত্র প্রকৃতপক্ষে 'বিশেষ মানুষ' ছিল না, বরং ছিল 'সাধারণ মানুষ'। ভাষাতত্ত্বের সাধারণ-বিশেষ ডাইকোটমি (ডাইকোটমি বলা যায় কি?) র আলোকে স্পেস অডিসি-র একটা ব্যাখ্যা দাড় করতে খুব ইচ্ছা করছে। শিল্প যেহেতু, সেহেতু শিল্পমোদীর একটা নিজস্ব ব্যাখ্যা তৈরির সুযোগ অবশ্যই আছে।

    এই সিনেমার শেষ অংশে এই মানুষ (সাধারণ) এর চরম মৃত্যুর সময়টি দেখানো হয়। মৃত্যুর আগে "লাস্ট সাপার" এ বসে মানুষ। মানুষ এর মৃত্যু দেখানোর জন্য একটা অসাধারণ স্টেজ দেখান কুবরিক, শিল্প মাধুর্যে টইটম্বুর। খেতে গিয়ে হঠাৎ বিশেষ এক মানুষের হাতের ধাক্কায় টেবিল থেকে একটা গ্লাস পড়ে যায় যাতে অর্ধেক পানিও ছিল। মেঝেতে পরে গ্লাসটা ভেঙে যায়, পানি ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। আধার অর্থাৎ গ্লাস ভেঙে গেল, ভাঙল কে?- বিশেষ মানুষ যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো নিইজের মধ্যে ধরে রেখেছে কিন্তু সাধারণের সন্ধান পায় নি। যাহোক, আধারটা একেবারে ভেঙে যায়, কিন্তু আধেয় অর্থাৎ পানি আছে, তবে এটা আধেয়-র এক অদ্ভুত অস্তিত্ব, সে আধার খুঁজে পাচ্ছে না।

    বিশেষ মানুষেরাই কিন্তু 'সাধারণ মানুষ' জিনিসটাকে মেরে ফেলেছে, গ্লাস ভাঙার কারণ তো সে-ই। কুবরিকের স্পেস অডিসি-র পুরো থিমই ছিল এইটা। মানুষ যান্ত্রিক প্রযুক্তি আর সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে গিয়ে মানুষ জিনিসটাকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। এটা ঠিক যে, মানুষের মৃত্যু হয় মহাকাশে স্বাভাবিক ভাবে জীবন যাপনের অক্ষমতা এবং নিজেদের চেয়েও বুদ্ধিমান যন্ত্র উদ্ভাবনের কারণে। কিন্তু আল্টিমেটলি সেগুলো তো মানুষেরই ব্যর্থতা। সাধারণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরই কুবরিক মানুষের বিবর্তনের পরবর্তী ধাপের প্রতি ইঙ্গিত করেন। জন্ম হয় "স্টার চাইল্ড" নামে এক অদ্ভুত জিনিসের। আমার মনে হচ্ছে এই "স্টার চাইল্ড" হচ্ছে মৃত সাধারণ মানুষের প্রতিস্থাপক বা তাদের বিবর্তনের উন্নততর ধাপ। তাই সাধারণ জিনিসটার নাম আর মানুষ নেই, হয়ে গেছে "স্টার চাইল্ড"।

    লালন কে নিয়ে এই লেখাটা না পেলে সত্যি বলছি কুবরিককে নিয়ে এভাবে ভাবতে পারতাম না। তবে কুবরিক কে লালনের সাথে তুলনা করা যাবে না। কারণ কুবরিক আধার-আধেয় সম্পর্কিত সকল দার্শনিক বিষয়াদির সাথে পূর্বেই পরিচিত ছিলেন। তিনি কেবল সেগুলোকে শৈল্পিক উপায়ে উপস্থাপন করেছেন। দর্শনের স্রষ্টা তিনি নন, তিনি কেবল এর উপস্থাপক। কিন্তু লালন একাধারে দর্শন সৃষ্টি করেছেন এবং সেটা কে উপযুক্ত উপায়ে উপস্থাপন করেছেন।

    তাইলে?-

    আমাদের দিকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, খুব রহস্যময় প্রশ্ন। এমন প্রশ্নের কিন্তু খুব নেতিবাচক একটা প্রভাব আছে। অনেকে ভাবতে পারেন, লালনই আধার-আধেয় সংশ্লিষ্ট দর্শনের জন্ম দিয়েছেন।

    কিন্তু আমি একটু অন্যভাবে ভাবতে চাই। এখানে দেখা যাচ্ছে, লালনের ভাব প্রকাশের বাক্যগুলো দর্শন বা যুক্তিবিদ্যার মত ক্ল্যারিটি-কেন্দ্রিক না, বরং রহস্য-কেন্দ্রিক। রহস্যের প্রভাব শিল্পেই বেশি থাকে। তাই আমার মনে হয় লালনের এই ভাবটিকে দর্শন না বলে বলা উচিত ভাবের শৈল্পিক প্রকাশ। এই প্রকাশটাকে আপনি দর্শনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। এর বিকল্প ব্যাখ্যাও কিন্তু করা সম্ভব। কিন্তু দার্শনিক অনুসিদ্ধান্ত এর বিকল্প ব্যাখ্যা কম থাকে, কারণ সে নিজেই একটা ব্যাখ্যা।

    যেমন লালনের এই ভাবে আমি অস্তিত্ববাদ এর গন্ধ পাচ্ছি যেটার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন কিয়ের্কেগর। এখন আমি চাইলে অস্তিত্ববাদ দিয়ে লালনের এই চরণগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারি। দেখাতে পারি, কিয়ের্কেগর এর আগেই লালন এইসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করেছিলেন। হয়ত কিয়ের্কেগর লালনের চরণগুলো হাতে পেলে আরও উদ্বুদ্ধ হতেন। তাই বলে কিন্তু লালনকে এই আধার-আধেয় চিন্তাধারা বা অস্তিত্ববাদ এর স্রষ্টা বলা যাবে না, তার শৈল্পিক আবেদনই বেশি প্রকট।

    ঠিক যেমন, হাজার বছর আগে কেউ যদি বলে থাকে, সব কিছুই আপেক্ষিক- তাই বলে তাকে আপেক্ষিকতার জনক বলা যাবে না। সে আপেক্ষিকতা নিয়ে বড় কোন ভাবের প্রকাশ ঘটালেও তাকে এটার আবিষ্কারক বলা যাবে না। বরং এভাবে বলা যাবে যে, এই তত্ত্ব দিয়ে তার ভাবগুলো বেশি ভালভাবে বোঝা যায়।

    সুতরাং আশা করব লালন যা ছিলেন তাকে নিয়ে তার চেয়ে বেশি কিছু যেন কেউ ভেবে না ফেলেন। তবে অবশ্যই আমাদের ভেবে দেখতে হবে, বহির্বিশ্ব থেকে সাপ্লাই কম থাকায় অধিকাংশ বিষয়ে লালনকে একেবারে গোঁড়া থেকে চিন্তা করতে হয়েছে। এর মধ্যেই অনেকগুলোই হয়েছে একেবারে মৌলিক, অনেকগুলো হয়েছে স্বাধীন পুনরাবিষ্কার। যেমন ভারতবর্ষের সেরা গণিতজ্ঞ শ্রীনিবাস রামানুজান এমন অনেক উপপাদ্য প্রমাণ করেছিলেন যেগুলো ইতিমধ্যে পাশ্চাত্যে প্রমাণ হয়ে গেছে। মৌলিক কাজ শুরু করার আগেই মাত্র ৩০ (?) বছর বয়সে তিনি মারা গিয়েছিলেন। তারপরও কিন্তু তার অবদান মুছে যায় নি। কারণ গাউস এর মত তিনিও একজন সেরা গণিতবিদ ছিলেন।

    মাহমুদ ভাই, লালনকে নিয়ে আপনার পরবর্তী লেখার অপেক্ষায় থাকলাম। আমিও কিন্তু লালনীয় ভাবের আলোকে স্ট্যানলি কুবরিক এর সিনেমা ব্যাখ্যা করে একটা ব্লগ লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই আপনার কাছ থেকে পরবর্তী লেখা পাওনা হয়ে গেল।

    জবাব দিন
    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      মুহাম্মদ,

      ভালো লাগলো যে তুমি এই পোষ্টের বক্তব্য বুঝতে পেরেছো+ তা' তোমার 'সিনেমা- বিশ্লেষনে' প্রয়োগও করতে পেরেছো।

      আমি প্রশ্নটা করেছি আসলে লালনের মূল্যায়নে আমাদের 'অতি সরলীকরণের প্রবণতা'কে যেখানে লালনকে লোকসাহিত্যিক আর তার চর্চাকে লোকগান বিবেচনা করে তার উত্থাপিত দার্শনিক বক্তব্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। লোকসাহিত্যের সংজ্ঞা অনুসারে লালনের কথা/চর্চা'কে (আমি জানিনা এগুলোকে কি নাম দেওয়া যায়) গান/কবিতা/গল্প কোনটাই বলা সহজ নয়। তারপরেও এসবকে লোক সাহিত্যের দলে ফেলাটা আমার কাছে অসঙ্গগত মনে হয়।

      তবে আমি অবশ্যই এই দাবী করছিনা যে, লালনই প্রথম সাধারণ ও বিশেষ এর পারস্পারিক সম্পর্ক বিচার করেছেন। কিন্তু আমি বলছি যে, দর্শনের পদ্ধতিগত এই মৌলিক প্রশ্নে লালনেরও কিছু আলোচনা আছে যা থেকে আমরা খানিকটা দিকনির্দেশনা পেতে পারি (যেমন, আমি শ্রম ও শ্রমিকের পাঠে উপকৃত হয়েছি, মুহাম্মদ সিনেমায়)।

      আমি এখন অন্য কিছু বই পড়ছি। তাই লালন মাথায় নাই।

      তুমি বরং সিনেমা নিয়ে ব্লগটা লিখে ফেলো।


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
    • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

      অর্ণব ভাই, এখানে দর্শন বলতে আসলে আমি নিয়মতান্ত্রিক দর্শন (যেখানে যুক্তিবিদ্যা বা গণিতের উপযুক্ত নিয়ম প্রয়োগ করা হয়) বোঝাই নি। কেবল একজন মানুষের চিন্তাধারা বুঝিয়েছি। দর্শন তো যেকোন রকমই হতে পারে, তাই না?
      বাক্যটার আসলে ভুল অর্থ হয়ে যাওয়ার চান্স আছে। লালনের বেশ কিছু চিন্তাভাবনা কিন্তু আমার ভাল লাগছে।

      জবাব দিন
      • জুবায়ের অর্ণব (৯৮-০৪)

        তোমার সাথে সম্ভবত এই বিষয়ে আমার কথা হয়েছিলো, তখন তুমি এই মত পোষণ করতে না। লালন দর্শন সৃষ্টি করেছেন- এটা হয়তো তোমার নতুন উপলব্ধি হয়ে থাকবে। যাই হোক, লেখো এই বিষয়ে। আরো জানার জন্য আগ্রহ হয়ে থাকলাম। আমি মোটামুটি আত্নবিশ্বাসের সাথেই বলছি লালন কোন উন্নতমানের দর্শন সৃষ্টি করেননি, কোন উন্নতমানের সাহিত্যও নয়। আমি দর্শনের স্ট্যান্ডার্ড ধরছি নিটশে, কান্ট, প্ল্যাটো এদেরকে; সাহত্যের স্ট্যান্ডার্ড ধরছি রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, জীবনানন্দ এদেরকে। তুমি বলো এই স্ট্যান্ডার্ডে কেন লালন একজন সাহিত্যিক কিংবা দার্শনিক বলে বিবেচিত হতে পারে। আওস্লে কি এটাই নয় যে লালন একজন লোকশিল্পী। অ্যাকাডেমিয়াতে লোকশিল্পের আবেদন historical refrence ছাড়া আর কিছু হওয়া উচিত নয়। পোস্ট লিখো এই ব্যাপারে একটা, তাহলে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।

        জবাব দিন
        • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

          আমার পুরো কমেন্টটা একসাথে বিবেচনা করেন। তাইলে দেখবেন আমি আগের কথাটাই বলতে চাচ্ছি। দর্শন দিয়ে লালনের কিছু ভাব ব্যাখ্যা করা যায়, এর বেশি কিছু কিন্তু আমিও বলি নাই।
          তাইলে?- প্রশ্নের উত্তরে যা লিখেছি সেটা ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবেন। লালন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য কোন সুসংগঠিত দর্শনের চর্চা করেন নি অবশ্যই। আর সাহিত্যের যে মূল্যবোধ সে বিচারেও লালন খুব উঁচুমানের নন। কিন্তু শুধু সাহিত্যগুণ আর মৌলিক দর্শন চর্চা দিয়েই বিচার করা ঠিক হবে না। সেক্ষেত্রে গৌতম বুদ্ধ কে আপনি কিভাবে বিচার করবেন? বুদ্ধের অবশ্য কিছু সুসংগঠিত দার্শনিক চিন্তাভাবনা ছিল, তাছাড়া ডেভিড হিউম এর দার্শনিক গবেষণার অনেক বেশ কিছু জিনিস বুদ্ধের ভাবনায় পাওয়া যায়। তাই, আমি লালনকে বুদ্ধের সাথেও তুলনা করছি না।

          জবাব দিন
        • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

          অর্নব,
          কেমন আছো? আমার দেশে আসতে দেরি হয়ে গেলো। কি আর করা। দেখা হবে অন্য কোন সময়, অন্য কোনখানে।-

          আমি আসলে লালনকে প্রচলিত অর্থে সাহিত্যিক বা দার্শনিক হিসেবে দেখতে রাজী নই। এর প্রধানতম কারণ, যে অর্থে আমরা সাহিত্য রচনা করা বা গান লেখা বুঝি, বা দর্শনচর্চা বুঝি, লালন তা'র কোনটাই করেননি। কাজেই সাহিত্য বা দর্শনের প্রচলিত মাপকাঠিতে দেখলে লালনকে সাব-ষ্ট্যানডার্ড মনে হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।


          There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

          জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।