শেকড়ের সন্ধানেঃ বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়-৪

১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব

পারভেজ ভাইয়ের (১৯৭৮-৮৪) মন্তব্যের সূত্র ধরে এই পর্বের আলোচনা শুরু করছি এই অনুমান থেকে যে, পূর্ববাংলায়, তথা বাংলাদেশের ৭০%-৮০% ভাগ জনসংখ্যার মুসলমান হওয়ার ঘটনাটি ঘটেছে ‘ইন্টার্নালি এবং গ্র্যাজুয়েলি’। বাংলার বাইরে থেকে এতো অধিক সংখ্যক মুসলমান মাইগ্রেট করার কোন তথ্য না-থাকায় এই অনুমান সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এক্ষেত্রে সবথেকে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি হল এই যে, পূর্ববাংলার মুসলমানরা নিন্মবর্ণের হিন্দু এবং বৌদ্ধ থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছে। কিন্তু আগের পর্বগুলোতে এই আনুমানকেও আমরা বাতিল করেছি বেদের উদ্ধৃতি (যথা বাংলা আর্য/হিন্দু সভ্যতার বাইরের এলাকা) এবং বাংলার ভৌগলিক এবং সেইসাথে জনবসতির সীমানা (পূর্ববাংলার অধিকাংশ এলাকা ঘন বনভূমি দিয়ে আচ্ছাদিত সাম্প্রতিককালে গঠিত পাললিক ভূমি) উল্লেখ করে।

রিচার্ড ঈটন (Richard Eaton, 1993) পুর্ববাংলায় সংখাগরিষ্ট মুসলমান জনগোষ্ঠীর আবির্ভাবের বিষয়টিকে আভ্যন্তরীণ এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ঘটেছে বলে বর্ণনা করেছেন। আমি তার ব্যাখ্যাটিকে সবথেকে গ্রহণযোগ্য মনে করি বলে সেটার আলোকে পূর্ববাংলায় মুসলমান জনগোষ্ঠীর আবির্ভাবের বিষয়টি আলোচনা করবো। তার আগে রিচার্ড ঈটন সম্পর্কে খানিকটা স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরী মনে করছি। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশে শিক্ষিত লোকজনের মধ্যে তথ্য+তত্ত্বের বিচারে বক্তব্যের আগে বক্তার ব্যক্তি পরিচয় এসে পড়ে, যেমন অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তমুক গবেষণা সংস্থার পদাধিকারী গবেষক, ইত্যাদি। (আমি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলতে পারবো বাংলাদেশের কোন কোন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক, রাজনীতি বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী তাদের পদাধিকার বলে খ্যাতিমান, জ্ঞানের জন্য নয়। আমার বিশ্বাস আপনারাও পারবেন। এই বিষয় নিয়ে একটা ব্লগ আসবে এই সিরিজ শেষ হলে।)

ঈটন ১৯৭২ সালে আমেরিকার, এবং বিশ্বেরও, প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় উইসকন্সিন থেকে পিএইচডি করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ভারতের দাক্ষিণাত্যে বিজাপুর রাজ্যে মধ্যযুগে (১৩০০-১৭০০) মুসলিম সূফী সাধকদের সামাজিক ভূমিকা নিয়ে। তিনি ১৯৭২ সালে ইউনিভার্সিটি অব এরিজোনা’তে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত বই The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204‑1760 ইতিহাস গবেষণায় তার জন্য বিশেষ খ্যাতি নিয়ে আসে চারটি একাডেমিক পুরস্কার লাভ করার মাধ্যমে, যা’ বেশ বিরল একটা ঘটনা। (গোলাম মুরশিদ তার ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ বইয়ের কয়েকটা অধ্যায় লাইন-বাই-লাইন এই বই থেকে নিয়েছেন যথাযথ উদ্ধৃতি না-করে, যা স্পষ্টভাবে লেখাচুরির পর্যায়ে পড়ে)। মধ্যযুগে ভারতবর্ষের ইতিহাস, বিশেষ করে দাক্ষিণাত্য আর বাংলার ইতিহাস চর্চায় রিচার্ড ঈটন বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় এবং একাডেমিক এসোসিয়েশনে অন্যতম নির্ভরযোগ্য গবেষক হিসেবে খ্যাতিমান।

ঈটন সম্পর্কে এই তথ্যগুলো উল্লেখ করলাম যদি কেউ তথ্য ছাড়াই গোলাম মুরশিদের পুরস্কারপ্রাপ্ত বই ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ টাইপের রেফারেনসের ভিত্তিতে বক্তব্য খণ্ডাতে আসে তাদের জন্য। তবে ঈটনের বই তার ব্যক্তিগত ক্রেডেনশিয়াল ছাড়াই সমাদৃত। কারণ, পশ্চিমাবিশ্বে একাডেমিক পুরস্কারের জন্য গবেষণার মান যাচাই প্রক্রিয়ায় গবেষকের নামপরিচয় বিবেচনার বাইরে থাকে। আর সেই প্রক্রিয়ায় উল্লিখিত বই অত্যন্ত সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ। ইনফ্যাক্ট, আমি নিজেও ঈটন সম্পর্কে এতো কথা জানতাম না। অস্কফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফয়সাল দেভজি (Faisal Devji) এবং এখানকার আরেক কলিগের সাথে এক সন্ধ্যার আলাপে জানতে পেড়েছি। তারপর গুগলে সার্চ দিয়ে জেনেছি আরও খানিকটা।

যাই হোক, ঈটনের বরাতে বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অভ্যুদয় প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করবো। তার আগে সমাজবিজ্ঞান কিভাবে সামাজিক পরিবর্তন ও বিবর্তন ব্যাখ্যায় করে তার একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা থাকা দরকার বলে মনে করছি।

বাংলার প্রচলিত ইতিহাস পাঠ করতে গেলে প্রচলিত প্রায় সবগুলো বই এভাবে বর্ণনা করে বাংলায় অমুক সালে তমুক রাজবংশ ক্ষমতা দখল করে। তারপর ক্ষমতাসীন রাজবংশের ধর্ম অনুযায়ী পুরো রাজ্য এবং প্রজাসাধারণের যাবতীয় বিষয় তথা ধর্ম, সামাজিক আচার, ভাষার বিবর্তন, ইত্যাদির আলোচনা শুরু হয়। বিষয়টা এমন যেন সিংহাসনে পালাবদলের সাথে সাথে গোটা সমাজেরও পরিবর্তন ঘটে। বাস্তবে তা’ কখনোই হয়না, বাংলাতেও হয়নি। কিন্তু আমাদের দেশে ইতিহাস চর্চার অগ্রগামীদের মধ্যে ইতিহাস গবেষণার প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক এবং পদ্ধতিগত জ্ঞানের অভাব এবং সেইসাথে প্রকৃত ইতিহাসের বদলে দল/গোষ্ঠিগত বয়ানের প্রতি আনুগত্যের কারণে এই ভুল অনুমানই সঠিক ইতিহাসচর্চা বলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক কর্তৃক আদি বাঙালির নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাস বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা, বাংলার অধ্যাপক কর্তৃক সুলতানীযুগের ইতিহাস রচনা, ইত্যাদি।

সমাজের বিবর্তন ও পরিবর্তন হয় সমাজের ভিতর থেকেই, বাইরে থেকে নয়। এবং এইটা অকস্মাৎ ঘটেনা, ঘটে ধীরে ধীরে, কয়েক প্রজন্মব্যাপী। তবে পরিবর্তনের সূচনা করে যেসব ফ্যাক্টর বা কারণ, সেগুলোকে চিহ্নিত করা যায় এবং সেগুলো সমাজের ভিতর থেকে আসে, বাইরে থেকেও আসে। যেমন, আমাদের জনগোষ্ঠী বর্তমানে শিক্ষাদীক্ষায় আগের প্রজন্মের থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। একই সময় আমাদের দেশে বাইরে থেকে অনেক নতুন নতুন টেকনোলজি এসেছে। দুই মিলে বর্তমান সমাজে অনেকগুলো পরিবর্তন সাধন করেছে, যেমন বিয়ে ও নারীপুরুষ সম্পর্কিত পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ, পেশাগত মূল্যবোধ, সমাজ ও ব্যক্তির পারস্পারিক সম্পর্ক ইত্যাদি এক দশক আগের বাংলাদেশের থেকেও এখন অনেকটাই ভিন্ন।

সমাজ পরিবর্তন ও বিবর্তনের এই ধারাবাহিক এবং ধীর প্রক্রিয়া বোঝার জন্য সমাজবিজ্ঞানে কয়েকটি বিশেষ কনসেপ্ট ব্যবহার করা হয়- assimilation, integration, incorporation এবং accommodation। মানব সমাজ সতত পরিবর্তশীল। সমাজের মৌলিক কাঠামোর মধ্যে সর্বদা ভাঙ্গাগড়া ঘটে চলেছে। এই প্রক্রিয়া আবার প্রভাবিত হয়ে থাকে বাইরের সমাজের মাধ্যমে। একটা সমাজ অন্যান্য সমাজের সংস্পর্ষে আসে নানা ভাবে- নিজে অন্য সমাজ দখল করে অথবা বহিরাগতদের দ্বারা অধিকৃত হয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে, অভিবাসী বা মাইগ্রেশনের মাধ্যমে। দুই সমাজের মানুষের মধ্যে লেনদেন হয় ভাষায়, সংস্কৃতিতে, শাসনব্যবস্থায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিল্পকলায়।

কোন সমাজে যখন একাধিক পৃথক গোষ্ঠী কাছাকাছি আসে এবং ক্ষমতায় প্রধান গোষ্ঠীর মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি যখন অধীনস্ত গোষ্ঠীগুলো আত্মস্থ করে তাকে বলে assimilation। অর্থের দিক থেকে এর কাছাকাছি হল accommodation যখন অধিনস্ত গোষ্ঠী সোজাকথায় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সবকিছু মেনে নেয় (কিন্তু মনে নেয়না, অর্থ্যাৎ আত্মস্থ করেনা)। integration হলো সমাজবিজ্ঞানের ক্রিয়াবাদী তত্ত্বের একটা কনসেপ্ট যা’ পরস্পর আলাদা গোষ্ঠীসমূহের নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই অন্যদের সাথে একযোগে একটা সমন্বিত সমাজ গঠন করা। এই অবস্থায় উপনীত হওয়ার প্রক্রিয়াটাই হল incorporation বা একটা সাধারণ সমাজব্যস্থার মধ্যে সকল গোষ্ঠির সমান অংশগ্রহণ। এই অবস্থার বহিঃপ্রকাশ হয় সকল গোষ্ঠীর সমান সামাজিক উন্নয়ন, আন্তঃবিবাহ, একই পাড়ায় ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতহীন বসবাস, ইত্যাদির মধ্য দিয়ে।

পূর্ববাংলার জনগোষ্ঠী প্রধানতঃ হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায় দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে এবং এরা উভয়ই বহিরাগত। তুলনামূলক কম প্রভাবশালী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও বাংলার বাইরে থেকে আগত এবং এদের প্রভাবও কিছু মাত্রায় লক্ষ্যনীয়। বাইরে থেকে আগত এইসব সম্প্রদায়ের সাথে স্থানীয়দের সামাজিক লেনাদেনা বুঝতে পারা এই অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর অভ্যুদয় বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যেখানে উল্লিখিত কনসেপ্টগুলোর বেশ সহায়ক।

রিচার্ড ঈটন পূর্ববাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠীর উদ্ভবের ব্যাখ্যা করেছেন চারটি সীমান্ত (Frontier) দিয়ে প্রস্তাবিত একটা নতুন তত্বের মাধ্যমে। এগুলো হল- সংস্কৃত সীমান্ত, রাজনৈতিক সীমান্ত, কৃষি সীমান্ত এবং ইসলামিক সীমান্ত (Frontier শব্দের অর্থ ঠিক রেখে একটা শ্রুতিমুধূর যুতসই বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে ব্যর্থ হলাম; কেউ সাহায্য করলে খুবই কৃতার্থ হতাম)। এগুলোকে সীমান্ত বলা হচ্ছে কারণ এগুলো আর্য ও অনার্য, রাজ্যের অভ্যন্তর ও বহিঃস্থ, কৃষীসমাজ ও আধা-জংলি সমাজ, ইসলামিক ও অনৈসলামিক সমাজের মধ্যকার বিভাজন নির্দেশ করে।

প্রাচীন যুগে বৌদ্ধ এবং তার পরে হিন্দুদের মাধ্যমে সংস্কৃত সীমান্ত বাংলায় এসেছিল মুসলমানদের আগমনের কয়েক শতাব্দী আগেই। মূলতঃ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বি পাল রাজাদের সময় এবং তাদের পর হিন্দু ধর্মাবলম্বি সেন রাজাদের সময় ৭০০ থেকে ১২০০ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচশ বছর ধরে বাংলায় (অর্থাৎ, উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গে) বৌদ্ধ ও হিন্দু সমাজ ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছিল। বখতিয়ার খিলজীর নের্তৃত্বে তুর্কি মুসলমানদের বাংলা দখল করাকে ঈটন দিল্লীর সুলতানী শাসনের ক্রমবিস্তার হিসেবে বিবেচনা করেন যেখানে মধ্য এশিয়া এবং ইরানের মালভূমি থেকে আগত সৈন্যবাহিনী দিয়ে মুসলমান সেনানায়কেরা ভারতবর্ষে ক্রমাগত রাজ্যবিস্তার করেছে। এসব মুসলমান সুলতান মূলতঃ আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত বাংলার সেনাশহর এবং ব্যবসাকেন্দ্রগুলো দখল করে রাজ্যশাসন করত। এর মাধ্যমে সহজেই তারা কৃষি এবং ব্যবসা থেকে আদায়কৃত কর-নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হতো। একারণে দেখা যায় যে বাংলার তুর্কি মুসলমান সুলতানেরা উত্তরবঙ্গে সেন রাজাদের শাসনকেন্দ্র লক্ষণাবতী, সেখান থেকে পার্শ্ববর্তী গৌড়, পান্ডূয়া, প্রভৃতি স্থানে তাদের শাসনকেন্দ্র স্থাপন করেছিল। পরবর্তিকালে তাদের রাজ্যবিস্তারের সময়, বিশেষ করে ইলিসায় শাহ এবং হোসেন শাহের আমলে মুসলমান এই সুলতানেরা দক্ষিণ বাংলার কৃসমাজ তথা আজকের মানভূম, মুর্শিদাবাদ, চব্বিশ পরগনা, বীরভূম এইসব এলাকা দখল করে। তাদের রাজ্যসীমা শেষ হয় কৃষিসমাজ ও বনভূমির সীমান্তে। এর একটা কারণ ছিল তুর্কি এই শাসকেরা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত কৃষি+ব্যবসাভিত্তিক খাজনা-নেটওয়ার্ক দখল করেই তৃপ্ত থাকত। বনভূমি পরিষ্কার করে নতুন কৃষিজমি তৈরি করা ছিল মুঘল শাসননীতি, যার সবথেকে সফল প্রয়োগ করেছিলেন সম্রাট আকবর।

সম্রাট আকবরের সেনাপতি মুনিম খানের হাতে ১৫৭৪ সালে দাউদ খান কররানির পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলায় মুঘল শাসনের শুরু হলেও তা’ পূর্ণতা পেয়েছিল ১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খান ঢাকায় ‘সুবে বাংলা’র রাজধানী স্থাপন করলে। বাংলার তুর্কি সুলতানী আমলের সাথে মুঘলদের শাসনামলের কিছু মৌলিক পার্থক্য ছিল- তুর্কি সুলতানরা পূর্ববর্তী হিন্দু রাজাদের থেকে শাসন ক্ষমতা কেড়ে নিলেও সমাজে আর কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেনি। কারণ, সেসময় রাজ্যের ক্ষমতার শীর্ষে বদল হলেও নিম্নস্তরে স্থানীয়রাই শাসন ক্ষমতায় ছিল এবং পূর্বের শাসন কাঠামোই অটুট ছিল। কিন্তু মুঘলদের সময় রাজ্যের শীর্ষ থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত পরিবর্তন সূচিত হয়। সামরিক শক্তি ও কূটনীতি দিয়ে মুঘলরা সমস্ত পর্যায়ের স্থানীয় শাসকদের আনুগত্য আদায় করে এবং তাদেরকে মুঘলদের প্রত্যক্ষ শাসননীতি এবং খাজনা ব্যবস্থার অধিনস্ত করে। এক্ষেত্রে তারা হিন্দু রাজপুতদের (যথা রাজা মানসিংহ, টোডরমল, প্রমুখ) সামরিক সহায়তা ছাড়াও মারোয়াড়ীদের ব্যাপক আর্থিক সহায়তা লাভ করে। তাছাড়া তুর্কি সুলতানরা যেখানে ইসলামকে তাদের ব্যক্তিগত এবং রাজনীতির থেকে পৃথক করেননি (যেমন, হূসেন শাহ দিনের অধিকাংশ সময় মসজিদে কাটাতেন, শাসনকার্যের অনেকাংশ ছিল মসজিদকেন্দ্রিক), সেখানে মুঘল শাসকরা রাজনীতি ও ধর্মের মাঝে স্পষ্ট বিভাজন বজায় রাখতেন।

বাংলায় তুর্কি সুলতানী যুগ আর মুঘল আমলের মধ্যে সবথেকে বড় পার্থিক্য ছিল তুর্কি সুলতান এবং তাদের সহযোগী আমীর ও সেনাবাহিনীর অধিকাংশ বাংলায় এসেছিল একাকী এবং এখানে এসে স্থানীয়দের মাঝে বিয়ে করে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে। কিন্তু মুঘলদের সময় শাসক, তাদের সহযোগী এবং সেনাবাহিনী বাংলায় আসত সাময়িক ভিত্তিতে। মুঘলরা বাংলাকে বসবাসের অযোগ্য মনে করত এখানকার দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, রোগব্যাধি, ভাত-মাছ জাতীয় অপরিচিত খাবার, ভিন্ন সংস্কৃতির নিচুজাতের জনবসতি, ইত্যাদি কারণে। স্থানীয়দের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল অনেকটাই ঐপনিবেশিক ইংরেজদের মত, যেকারণে ঈটন মুঘল শাসনকেই বাংলায় ঔপনিবেশিক যুগের শুরু বলে চিহ্নিত করেছেন। তুর্কিরা যেখানে বাংলায় স্থায়ীভাবে বসতি গড়েছে, মুঘলরা সেখানে বাংলায় এসেছে মূলত সাম্রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধির মাধ্যমে যথাসম্ভব বেশি কর আদায় এবং সম্পদ আরোহণের উদ্দেশ্যে। এজন্য যেকোন এলাকা মুঘলদের অধীনে আসলে মুঘল প্রশাসকের সর্বপ্রথম কাজ হতো পুরো অঞ্চলের ভূমিজরীপ এবং তার ভিত্তিতে নতুন করে কর আরোপ করা।

সিরিজের ২য় পর্বে দেখেছি যে, পূর্ববাংলার যে ৭০% থেকে ৮০% মুসলিম অধ্যুসিত জনতা, তা’র উদ্ভব হয়েছে মুঘল আমলের শুরুর দিকে মোটামুটি ১৫০ বছরে। আর ৩য় পর্বে দেখেছি যে, ১৫ এবং ১৬ শতকে গঙ্গা নদী দিক বদল করে পদ্মা হয়ে পূর্ববাংলায় সড়ে যাওয়া কিভাবে এ অঞ্চলে একটা ক্রমবর্ধমান নতুন পাললিক ব-দ্বীপ গঠন করেছে।

মুঘলদের বাংলা দখলের প্রাককালে বাংলা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগলিক ও সার্থ-সামাজিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। ভৌগলিকটি হল- প্রধান নদী এবং সেই সাথে এর শাখা-প্রশাখার পূর্বমুখী প্রবাহ যা’র ফলে গড়ে ওঠা পাললিক ব-দ্বীপ; রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি হল- দীর্ঘ প্রায় পাঁচশ বছরে প্রথমে তুর্কি ও পরে আফগান মুসলমান শাসকদের অধীনে স্বাধীন রাজ্য থেকে মুঘলদের অধীনে এসে বাংলা আবার উত্তর ভারতীয় দিল্লী সাম্রাজ্যের সাথে একীভূত হওয়া; আর অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াটি ছিল ১৪৯৮ এর পরে ভাস্কো-দ্য-গামা’র পথ অনুসরণ করে ইউরোপীয় বণিকদের বাংলায় আগমন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নেটওয়ার্কে প্রবেশ।

মুঘলদের বাংলায় শাসননীতির প্রধান ফোকাস ছিল বনজঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিজমি বিস্তার এবং কৃষি+কৃষিপণ্যের বাণিজ্য থেকে আয় বৃদ্ধি করা। ইউরোপীয় বণিকরা সেই কৃষিপণ্য (প্রধানতঃ ধান) সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশে নিয়ে যেত। ঈটন উল্লেখ করেছেন যে, সেসময় বাংলার চাল সুদূর ইন্দোচীন (আজকের কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনাম) পর্যন্ত সমগ্র প্রাচ্যের বাজার দখল করেছিল। এক ইউরোপীয় ভ্রমনকারী ১৭ শতকের শেষভাগে সন্দীপে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, সেখানকার মাটি পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ কৃষিজমি এবং সেখানে নামমাত্র মূল্যে বিশ্বের সেরা মানের একব্যাগ চাল পাওয়া যায়।

উল্লিখিত তিনটি বৃহৎ আভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা রাজনৈতিকভাবে উত্তর ভারত এবং বাণিজ্যিক ভাবে বহির্বিশ্বের সাথে সমন্বিত হয়েছিল। আর এই তিন প্রকৃয়ার সম্মিলিত প্রভাবে যখন পূর্ববাংলায় বাঙালি জাতির সম্প্রসারণ ঘটেছিল, ঠিক সেই সময়েই পূর্ববাংলায় মুসলিম প্রধান জনবসতি গড়ে ওঠে। কিন্তু কিভাবে? বিশেষ করে, তৃণমূল পর্যায়ে উল্লিখিত প্রক্রিয়াগুলো কিভাবে এই বঙ্গীয় মুসলমান কৃষিসমাজের উদ্ভবকে প্রভাবিত করেছে, বা সম্ভব করেছে?

১৬শতকে রচিত শেখশুভদয়া (Sekashuvodaya) কাব্যে হলায়ুধ মিশ্র বর্ণিত শেখ জালালউদ্দিন তাব্রিজের কাহিনীকে ঈটন বাংলার তৃণমূল পর্যায়ে মুসলমানদের কৃষিসমাজ স্থাপনের প্রক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই কাহিনীর মূল উপজীব্য হল রাজা লক্ষ্মণসেনের আমলে পারস্য থেকে সূফী জালালউদ্দিন তাব্রিজের পান্ডুয়ায় আগমন এবং লক্ষ্মণসেনের সাথে তার সাক্ষাৎ। কাহিনী অনুযায়ী জালালউদ্দিন ইরান নয়, বরং ভারতের মধ্যপ্রদেশ থেকে এক প্রধানপুরুষের আদেশে মুসলিম নিপীড়ক রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজ্যে এসে ইসলাম প্রচারের আদেশপ্রাপ্ত হন। একদিন রাজা নদীর উপর দিয়ে জালালউদ্দিন হেঁটে আসতে দেখেন। জালালউদ্দিন নদী পার হয়ে এসে লক্ষ্মণসেনকে একটা পাখিকে ঠোটে ধরে রাখা মাছ ছেড়ে দিতে হুকুম করতে বললেন। লক্ষ্মণসেন ব্যর্থতা প্রকাশ করলে তিনি পাখিকে আদেশ করেন মাছ ছেড়ে দিতে এবং সেই আদেশ পালিত হয়। এতে মোহিত হয়ে রাজা লক্ষ্মণসেন জালালউদ্দিন দাক্ষিণ্য প্রার্থনা করেন। তিনি রাজাকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, যতদিন তিনি পান্ডুয়ায় আছেন, ততদিন লক্ষ্মণসেনের কোন বিপদ হবে না। সেই থেকে লক্ষ্মণসেন জালালউদ্দিন মুরিদে পরিণত হন। এরপর জালালউদ্দিন আরও কিছু মাজেজা (যেমন তিনটি বাঘকে বশ করে এক ধোপার ছেলে উদ্ধার, এক মৃতব্যক্তিকে পুণরুজীবন দান, ইত্যাদি) প্রদর্শনের মাধ্যমে নগরবাসীকেও অনুগত করে ফেলেন। জালালউদ্দিন নগরের পার্শ্ববর্তী একটা জঙ্গলাকীর্ণ স্থানকে মসজিদ নির্মাণের জন্য নির্বাচন করেন এবং প্রবিত্র পানি ছিটিয়ে তাকে অশুভ শক্তিমুক্ত করেন। এরপর তিনি রাজা লক্ষ্মণসেনের কাছে সেই মসজিদ প্রতিষ্ঠা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাহায্য চান। রাজা বলেন যে, তার আর্থিক সাহায্য করার সঙ্গতি নাই, তবে তিনি মসজিদের জন্য জমিদান করবেন আর সেই জমিতে জালালউদ্দিন বসতি স্থাপন ও চাষবাস করে প্রাপ্ত আয় দিয়ে মসজিদের যাবতীয় ব্যয়নির্বাহ করবেন। রাজার প্রতিশ্রুতিমত জালালউদ্দিন তার ঘোড়াকে ছেড়ে দিলে সেটি সারাদিন যতটুকু অঞ্চলে বিচরণ করে তার পুরোটাই রাজা সেই মসজিদের জন্য দান করলেন। এরপর জালালউদ্দিন স্থানীয় অনুসারীদেরকে নিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন ও জমি আবাদ করলেন। রাজার প্রস্তাব অনুযায়ী জালালউদ্দিন বসতিস্থাপনকারীদের তালিকা তৈরি করে সর্বোমোট ২২,০০০ মুদ্রা বার্ষিক কর ধার্য করলেন এবং তদনুযায়ী ভূমিস্বত্বের দলীল রাজার কাছ থেকে অনুমোদন করিয়ে নিলেন।

এই গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা যে প্রশ্নবিদ্ধ তা’ সহজের বোঝা যায় গল্পের চরিত্র ও কাহিনী-বিন্যাস, রচয়িতা আর রচনাকাল, বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা, ইত্যাদি বিবেচনা করলে। কিন্তু এখানে গল্পকার একটি সামাজিক প্রক্রিয়া বর্ণনা করেছেন যা তুর্কিদের বাংলায় আগমনের পর কয়েকশ বছর ধরে চলে আসছিলঃ একজন সূফী দরবেশ ইরান বা উত্তর ভারত থেকে উর্ধ্বতন কারো (তার গুরু অথবা স্বয়ং নবী) আদেশে বাংলায় অমুসলিমদের মাঝে ইসলাম প্রচারের জন্য আগমন করেন, রাজা এবং স্থানীয় জনতাকে নানান মাজেজা দেখিয়ে মুগ্ধ করেন, স্থানীয় অনুসারীদের সহায়তায় রাজার দানকৃত জমির জঙ্গল পরিষ্কার করে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নতুন বসতি স্থাপন করেন। এইসব দরবেশ ইসলাম ধর্মের শিক্ষা ও রীতিনীতি পালনের পাশাপাশি তৃণমূলের স্থানীয় প্রশাসনও পরিচালনা করতেন, যেমন শ্রমিকদের নিয়োগ এবং জমির বন্দোবস্ত, আয়-ব্যয়, খাজনা, ইত্যাদি ব্যবস্থাপনা করা। আর এসবই করা হতো মসজিদকে কেন্দ্র করে। এই কাহিনীর মধ্যে পাঁচটি বিষয় উল্লেখযোগ্যঃ এক, দরবেশের ক্যারিসমেটিক গুণ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা; দুই, মসজিদ প্রতিষ্ঠা; তিন, রাজার (অর্থাৎ, রাষ্ট্র) অনুমোদন ও সহায়তা; চার, দরবেশ কর্তৃক জঙ্গল কেটে সামাজিক প্রতিষ্ঠান (যথা, মসজিদ, গ্রাম সমাজ, গ্রাম্য বাজার, ইত্যাদি) গঠন; এবং পাঁচ, পূর্বের বিরান জঙ্গলকে অর্থিকভাবে লাভজনক কৃষিজমিতে রূপান্তর যা’ থেকে মসজিদ এবং তৎসংলগ্ন গ্রামীণ সমাজের জীবিকা নির্বাহ করত।

ঈটন বড় বড় প্রায় সবগুলো জেলায় প্রাপ্ত লোককাহিনী উল্লেখ করে দেখিয়েছেন যে, বখতিয়ারের আগমনের পর থেকে তৎকালীন বাংলার প্রায় সবখানেই এই প্রক্রিয়ায় পীর (সূফী-দরবেশ) দ্বারা মসজিদ এবং মুসলমান বসতি স্থাপিত হয়েছে। এভাবে আগত দরবেশদের সংখ্যা এবং তাদের দ্বারা গঠিত এসব মুসলমান বসতি সংখ্যায়+আকারে সীমিত হলেও মুঘলদের বাংলা দখলের আগে প্রায় চারশ’ বছরে এই প্রক্রিয়া একটা প্যারাডাইমে পরিণত হয়েছিল। ঈটন এইসব লোককাহিনীর মধ্যে পীর বা দরবেশদের ক্ষমতার তিনটি উৎস চিহ্নিত করেছেনঃ এক, একদা বন্য শ্বাপদসঙ্কুল বনভূমি যা’কে পীর বশ মানিয়েছেন; দুই, অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সাথে সম্পর্ক যার সাহায্যে মাজেজা প্রদর্শন করে পীর জনতার মাঝে আনুগত্য অর্জন করেন; এবং তিন, নিজের স্থাপিত মসজিদ যা’কে কেন্দ্র করে পীর একটা মুসলিম সমাজের প্রয়োজনীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ গঠন ও পরিচালনা করেন। ঈটন উল্লেখ করেন যে, কোন কোন পীরের মধ্যে প্রথম দুটো উৎসের মধ্যে কোন একটা নাও থাকতে পারে, কিন্তু তৃতীয়টি প্রত্যেক পীরের মধ্যেই ছিল।

দ্বিতীয় পর্বে উল্লেখ করেছি যে, ১৫শতকের আগে বাংলার জনপদ বিস্তৃত ছিল মূলতঃ উত্তর এবং পশ্চিমবঙ্গে, দক্ষিন এবং পূর্ববঙ্গ সেসময় কেবল আংশিক গঠিত হয়েছিল এবং তারও অধিকাংশই ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। পূর্ববঙ্গের কিছু কিছু জনপদ (যথা নোয়াখালি, সোনারগাঁ, সিলেট, কুমিল্লা, ফরিদপুর) গড়ে উঠেছিল উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের কাছে ক্ষমতা হারানো হিন্দু রাজা+জমিদারদের দ্বারা; সেগুলো ছিল প্রধানতঃ নদীতীরবর্তী এবং তিনদিকে ঘনবন দিয়ে বেষ্টিত ছোট ছোট রাজ্য বা জমিদারী। পরবর্তীতে মুঘলদের কাছে পশ্চিম ও উত্তর বঙ্গে পরাজিত হয়ে আফগানরাও একইভাবে পূর্ববঙ্গে বা ভাটি অঞ্চলে পশ্চাদপসরণ করে এবং মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে; সম্মিলিতভাবে এই হিন্দু আর আফগান মুসলিম স্থানীয় শাসকদেরকেই আমরা জানি বাংলার বারোভুঁইয়া নামে।

মুঘলদের বাংলা আধিকারের সময়কালে (১৫৭৪-১৬১০) বাংলায় ভৌগলিক (নতুন পাললিক ভূমির বিস্তার) ও রাজনৈতিক (মুঘল সাম্রাজের অন্তর্ভূক্ত) পরিবর্তনের সাথে সাথে কিছু যুগান্তকারী আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনও সূচিত হয়েছিল। এক, মুঘলদের বিশালবাহিনী এবং তা’র মোকাবেলায় বারোভুঁইয়াদের নিজনিজ সেনাবাহিনীর বৃহদাংশ বাংলায় মুঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হলে কর্মহীন হয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকায় যেসব কুটির শিল্প ছিল, তা’র তুলনায় এদের সংখ্যা ছিল অত্যধিক। এইসব সদ্যসাবেক সেনার জন্য সবথেকে সহজলভ্য বিকল্প ছিল জঙ্গল পরিস্কার করে কৃষিজমির অধিকারী হওয়া। দুই, মুঘলদের সাথে সহযোগী হিসেবে বাংলায় এসেছিল এক বিশাল হিন্দু অর্থলগ্নিকারী শ্রেণী (প্রধানতঃ মাড়োয়ারি) যারা মুঘল শাসকদেরকে যুদ্ধের সময় আর্থিক সহায়তা করত। বাংলায় মুঘল শাসন থিতু হয়ে আসলে অর্থলগ্নি করার জন্য নতুন গ্রহীতার প্রয়োজন দেখা দেয়। এমতাবস্থায় সদ্যসাবেক সেনাদের মধ্যে জঙ্গল কেটে কৃষিজমি উদ্ধারের উদ্যোক্তারা মাড়োয়ারিদের জন্য নতুন ঋণগ্রহীতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। তিন, সম্রাট আকবরের সময় থেকে মুঘল সাম্রাজ্য নতুন কৃষিজমি উদ্ধার এবং কৃষিকাজ বিস্তারে আগ্রাসী ভূমিকা অনুসরণ করছিল। এমতাবস্থায় মুঘল প্রশাসক ও খাজনা আদায়কারী কর্মকর্তারা সোৎসাহে উদ্যোক্তাদের জঙ্গলাকীর্ণ জমির বন্দোবস্ত দিতে থাকে। উপরন্তু, জমিদারদেরকে মুঘল প্রশাসকের পূর্ব অনুমতি ছাড়াই জমিদারির ছোট ছোট অংশ সাব-লিজ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এরফলে পূর্ববর্তী জমিদার অথবা কোন বড় সেনাপতি কোন পরগণার/জেলার জমিদারি পেয়ে গেলে সে নিজ এলাকার জঙ্গলময় জমি আগ্রহী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে পত্তনি দিতে থাকে। এছাড়াও রাজধানীতে অবস্থানকারী কোন কোন উদ্যোক্তা বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে মুঘল শাসকের কাছ থেকে বিশাল বিশাল জঙ্গলাকীর্ণ এলাকার জমিদারী কিনে নিত এবং সেগুলো অন্যান্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে লিজ দিত। তারা আবার স্থানীয় লোকজনকে নিয়োগ করতো জঙ্গল কেটে আবাদী জমি তৈরি করতে। প্রথমোক্তদেরকে বলা হতো তালুকদার আর শেষোক্তদেরকে রায়ত বা কৃষক। এদের মাঝে ছিল একাধিক মধ্যসত্বভোগি যাদেরকে বলা হতো জোতদার, মজুমদার, চৌধুরী, ইত্যাদি। এভাবে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠার কয়েক দশকের মধ্যেই সমগ্র পূর্ববাংলায় এক ধরণের শ্রেণীবিন্যস্ত ভূমিব্যবস্থা গড়ে উঠে যেখানে জমিদার এবং তালুকদাররা থাকতো প্রদেশের দেওয়ানের কাছাকাছি নগরে, আর মধ্যসত্বভোগী এবং রায়তরা পল্লীর কৃষিসমাজে। এই ব্যবস্থাকে ঈটন বলেছেন subinfudation (পৃ, ২২৩)। (আমাদেরকে শেখানো হয় যে, এবসেন্টি জমিদারী সৃষ্টি হয়েছিল ইংরেজদের আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময়, অথচ এর শুরু হয়েছে বাংলায় মুঘল আমলের গোড়াতেই)।

মুঘল শাসকদের সাথে সম্পর্ক এবং আর্থিক সচ্ছলতা ছিল তালুক বা জমিদারী অর্জনের প্রধান উপায়। এজন্য মূলতঃ উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা আর ব্যাংকিং এ নিয়োজিত মারোয়াড়ী হিন্দুদের পক্ষেই সম্ভব ছিল মুঘল শাসকের কাছ থেকে পুরস্কারস্বরূপ পেয়ে বা ক্রয়সূত্রে বিশাল এলাকা কিনে তালুকদার বা জমিদার হয়ে ওঠা। তাদের কাছ থেকে যেসব মধ্যসত্বভোগী ছোট ছোট জংলী এলাকা সাব-লিজ নিয়ে পরিষ্কার করে আবাদী জমি বের করার কাজ করত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা, যারা ছিল প্রধানত সদ্যসাবেক সেনা এবং মুসলমান। তারা না কৃষিকাজ জানত, আর না তাতে আগ্রহী ছিল। ফলে জঙ্গল পরিষ্কার করার প্রাণান্তকর পরিশ্রম এবং তাতে চাষাবাদ করার কাজে তারা নিয়োগ করত স্থানীয়দেরকে (যথা, কোচ, রাজবংশী, চণ্ডাল, ইত্যাদি)। এভাবে মুসলমান প্রান্তিক উদ্যোক্তাদে প্রয়াস, মুঘলদের আগ্রাসী কৃষিভূমি সম্প্রসারণনীতি এবং মাড়োয়ারিদের আর্থিক বিনিয়োগ একত্রে বাংলার পাললিক ভূমির জঙ্গলের স্থানে গড়ে তোলে একটা নবীন কৃষিজীবি সমাজ।

এইসব উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি আরেকটা প্রক্রিয়াতেও জঙ্গল কেটে কৃষিজমি এবং গ্রামসমাজ গড়ে ওঠে। কিছু কিছু মুসলমান উদ্যোক্তা জনবসতির পার্শ্ববর্তী জঙ্গলের কোন একটা স্থানে একটা মসজিদ তৈরি করার পর স্থানীয় খাজনা আদায়কারী কর্তৃপক্ষের কাছে মসদিজ পরিচালনার জন্য আর্থিক সাহায্যের আবেদন করত। এরপর সরকারী ভূমি জরীপকারী উক্ত মসজিদ এবং ততদসংলগ্ন এলাকা পরিদর্শন করে নির্দিষ্ট পরিমাণ জঙ্গল মসজিদ প্রতিষ্ঠাতার পরিবারের নামে রাষ্ট্রীয় দানপত্রে উৎসর্গ করে দিত। এরপর মসজিদ প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয়দের নিয়োগ করতো জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদ করার কাজে (দরবেশ জালালুদ্দীন তাব্রিজের কাহিনীর মতো)।

নতুন এই কৃষিসমাজের পরিচালনা ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে মসজিদ নানা কারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আবতীর্ন হয়। প্রধানতঃ উত্তর ভারত এবং উত্তর+পশ্চিমবঙ্গ হতে আগত সদ্যসাবেক মুসলমান সেনা ( সেইসাথে কিছু কিছু আলেম এবং ধর্মীয় ব্যক্তি) এবং স্থানীয় অধিবাসীরা এইসব সমাজ গঠন করেছিল। তাদের মধ্যে স্বভাবতঃই উত্তর ভারতের গ্রামীণ সমাজের ন্যায় জাতিবর্ণ বা মধ্যএশিয়ার মতো গোত্র ছিলনা। এ অবস্থায় নের্তৃত্বের অবস্থানে থাকা মুসলমান উদ্যোক্তারা মসজিদকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ সমাজ কাঠামো গঠন এবং পরিচালনা করার পথ অবলম্বন করে। এক্ষেত্রে তাদের সামনে মডেল হিসেবে ছিল পূর্বের চার শতাব্দী ধরে চলে আসা মুসলমান পীরকর্তৃক বসতি স্থাপনের নজির। উপরে উলেখ করেছি যে, এইসব পীরের ক্ষমতার তিনটি সাধারণ উৎসের কথা- জঙ্গল পরিষ্কারে নের্তৃত্বদান, অলৌকিক ক্ষমতা এবং মসজিদের প্রতিষ্ঠা। এগুলোর প্রথম দুটোর যেকোন একটি এবং শেষোক্তটির মাধ্যমে মুসলমান ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের নিজ নিজ গ্রামসমাজে পীরের সমপর্যায়ের মর্যাদার আসন লাভ করত। মসজিদভিত্তিক গ্রাম সমাজকে বলা হতো জামাত যার সদস্য হিসেবে গ্রামের সকল পুরুষ শুক্রবারের নামাযের জন্য মসজিদে জমায়েত হতো, গ্রামের নানান বিষয়ের আলোচনা, বিবাদ মীমাংসা, ইত্যাদিও হতো মসজিদকে কেন্দ্র করে।

এভাবে মুসলমান নের্তৃত্ব এবং মসজিদের কেন্দ্রীয় ভূমিকার কারণে পূর্ববাংলায় নবগঠি কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের অধিবাসীরা কয়েক প্রজন্মের মধ্যে মুসলিম সমাজ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

২,২৮৫ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “শেকড়ের সন্ধানেঃ বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়-৪”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)
    গোলাম মোরশেদ তার ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ বইয়ের কয়েকটা অধ্যায় লাইন-বাই-লাইন এই বই থেকে নিয়েছেন যথাযথ উদ্ধৃতি না-করে, যা স্পষ্টভাবে লেখাচুরির পর্যায়ে পড়ে।

    দুঃখ পাইলাম।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      কেন? এইটা ত বাংলাদেশের অনেকটা প্রতিষ্ঠিত একটা রীতি নাম কামানোর, বিশেষ করে নিজের স্পেশালাইজেশন বাদ দিয়ে অন্য বিষয়ে যারা লেখালেখি করে, তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যই এই লাইনে আছে। নাম জানতে চাইস না, শরম্পামু ......... 😉

      নামের বানান ভুলটা উল্লেখ করে ভালো করেছিস। ঠিক করে দিলাম। ধন্যবাদ। (সম্পাদিত)


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    যশোবন্ত সিং এর ভারত ও জিন্নাহ নিয়ে বইটা পড়ছিলাম।
    আমরা শুধু হিন্দু রাজা (নাম মনে করতে পারছি না) যে বুদ্ধগয়া না কোথাকার পবিত্র বৃক্ষ ধ্বংস করেছিলো ও অত্যাচারী ছিলো তার নাম জানি। অথচ কাশ্মীরে মুসলিম শাসকেরা ভালোই অত্যাচার করেছিলো।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      হিন্দু রাজা আর মুসলমান রাজা কে কয়টা মসজিদ/মন্দির ভাঙল এইটা এই আলোচনার সুদূরবর্তী কোন বিষয়ও না। কাজেই, এই লাইনে আলাপে আমিও নাই। তাছাড়া সাহিত্যিকের লেখা থেকে ইতিহাস জানতে চাওয়া আমার কাছে বোকামি মনে হয়।


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
  3. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    এই পর্বটা একটু বেশি তত্ত্ব ভারাক্রান্ত হয়ে গেছে।
    অবশ্য সেটা আনএক্সপেক্টেড না।
    পড়তে দেরী হওয়ায় দুঃখিত।
    তবে আমাকে দিয়ে শুরুটা করেছো দেখে যার-পর-নাই বিগলিত!!!


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  4. মন্ত্র মুগ্ধের মত পড়লাম। ধন্যবাদ অসাধারণ এই সিরিজ টার জন্য। আপনার কাছে একটি অনুরোধ থাকলো। বাঙালি জাতির ইতিহাস নিয়ে একটি সিরিজ লিখেন। বাঙালি কি সংকর জাতি? এর অস্তিত্ব কোথা থেকে এসেছে? নেটে এই ব্যাপারে তেমন কোন লিখাই নেই। তাই আপনার কাছে আশা রাখছি সময় পেলে লেইখেন। ধন্যবাদ😊

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।