বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অমিত সম্ভাবনার সূচনা


শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে আন্দোলন চলছে, দিনে দিনে তা চারাগাছ থেকে মহীরুহে পরিণত হচ্ছে। প্রাথমিক উত্তেজনা খানিকটা থিতু হয়ে আসায় এখন এই গাছে কি ফলের সম্ভাবনা আছে, তা কবে পরিপক্ক হবে, কার পাতে যাবে- এইসব নিয়ে খানিকটা চিন্তারর ফুরসত পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রক্ষিতে রাব্বীর ব্লগটা খুব পরিচ্ছন্ন একটা ধারণা দিল এই আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত নিয়ে। এটা খুবই সত্য যে, স্বাধীনতা-উত্তর দেশে ইসলামীকরণ হয়েছে, আর সেই সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আবার বাংলাদেশে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ক্রমশঃ দূর্বল করে দিয়ে দেশকে বারবার পেছনে ঠেলে দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে, ইপ্সিত স্বাধীনতার ফল সাধারণ জনগণের অধরাই থেকে গেছে। তবে ইসলামীকরণকে আমি এর কারণ নয়, দেখি ফলাফল হিসেবে। আর শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের চলমান এই আন্দোলন এই বিষয়টা আবারো সামনে নিয়ে এসেছে এবং ইসলামকে (এবং অন্যান্য যাবতীয় ধর্মকেও) রাজনীতি থেকে বাইরে নিয়ে ব্যক্তিগত জীবনাচরণে ফিরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিকে পজিটিভ দিকে যাত্রা শুরু করার সূবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে। কিভাবে, সেটাই বলছি-

ইসলামীকরণকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে বসিয়ে দেশচিন্তা বাস্তবিকই ভ্রান্ত এবং ফলস্বরুপ দীর্ঘমেয়াদে অশেষ ক্ষতিকর। কেন?- কারণ, মুক্তিযোদ্ধারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নাই,তারা যুদ্ধ করেছে পাকিস্তানী সামরিক যান্তার বিরুদ্ধে। মুক্তিযোদ্ধাদের সিংহভাগই (শতকের হিসেবে নব্বই ত’ ছাড়াবেই) ছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বী, যারা হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বিদের সাথে একইদলে থেকে পাশাপাশি যুদ্ধ করেছে। আর যুদ্ধাবস্থায় এমন কোন কারণ ঘটেনি যে, যুদ্ধোত্তর সময়ে ইসলামকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ বানাতে হবে। কাজেই, তারা সেটা করেওনি। মুক্তিযুদ্ধের আগে যেমন দু’চার ওয়াক্ত নামায পড়েছে, যুদ্ধের মধ্যেও সময় সময় অস্ত্র নামিয়ে রেখে নামায আদায় করেছে, আবার নামায শেষে অস্ত্র নিয়ে পাক-হানাদার ও তাদের দোসরদের মোকাবেলা করেছে। যুদ্ধ শেষে আবার বাড়ি ফিরে অস্ত্র জমা দিয়ে দৈনন্দিন কাজেকর্মে লেগে পড়েছে, কাজের অবসরে নামায পড়েছে।

কিন্তু কালেক্রমে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলাম একটা বড় ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছে যেখানে মুক্তিযুদ্ধে নের্তৃত্বদানকারী আওয়ামীলীগ ইসলামধর্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শত্রু হিসেবে গণ্য করে আর তাদের বিরোধী দল নিজেদেরকে ইসলামের ধারক+বাহক হিসেবে যাহির করে। এমতাবস্থায় দুই রাজনৈতিক দল ক্ষমতা দখলের দৌড়ে ইসলামকে নিজ নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে- আওয়ামীলীগ নিজেদের যাবতীয় ব্যর্থতাকে আড়াল করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীশক্তি জামাত-ইস্যু সামনে নিয়ে আসে, মুক্তিযুদ্ধে জামাতের নেতাকর্মীদের যাবতীয় কুকর্ম জনগণের সামনে তুলে ধরে তাদের বিচারের নিজেদেরকে ‘ব্যস্ত’ দেখিয়ে অন্যান্য গণদাবীকে দাবিয়ে রাখে। কিন্তু জামাত ইসলামধর্মকে আশ্রয় করে
বলে আওয়ামীলীগের এই জামাতবিরোধীতা প্রায়শঃই ইসলামবিরোধীতায় পরিণত হয়। তখন আবার আম-জনতা বিরক্ত+ক্ষুদ্ধ হয়, আওয়ামীলীগকে ত্যাগ করে। এই সুযোগে আওয়ামীলীগের বিরোধীশক্তি ইসলামকে আশ্রয় করে রাজনীতি করে, নিজেদেরকে ইসলামের ধারক+বাহক হিসেবে জনতার সামনে হাজির করে (এইখান থেকে আওয়ামীলীগের বিরোধী হিসেবে শুধু বিএনপিকে নিয়ে আসবো)। – ইসলামধর্মকে রাজনীতিতে টেনে নিয়ে এসে বাংলাদেশের রাজনীতির এই যে মেরুকরণ, এতে সাধারণ জনতার ভূমিকাটা কি?- তারা ত’ কখনো বলে নাই যে, তারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে তাদের ইসলামধর্ম-ভিত্তিক মুসলমান পরিচয় রক্ষার জন্য, বা ত্যাগ করার জন্য! আবার, তারা কখনো এটাও বলে নাই যে, নিজেদের মুসলমান পরিচয় রক্ষা করার জন্যই তারা আওয়ামীলীগকে ত্যাগ করে বিএনপিকে ভোট দেয়!সাধারণ জনতার রাজনীতিতে ইসলাম কখনোই নিয়ামকের ভূমিকায় আসেনি, আসার কারণও নাই- তারা আগেও যেমন মুসলমান অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ করেছে, যুদ্ধের পরই সেই একই রকম মুসলমান রয়েছে। আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি দুই দলই এই সত্যটা জানে, আর সে কারণেই তারা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে শাহজালাল (রঃ) অথবা শাহ আমানতের (রঃ) দরগাহ থেকে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তালিকায় যত অনুদান থাকে মসজিদ+মাদ্রাসার জন্য, তা’র দশভাগের একভাগও থাকেনা সাধারণ স্কুল-কলেজের জন্য।

বাংলাদেশে ইসলামধর্মের এই রাজনীতিকরণ বুঝতে হবে মুক্তিযুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির মধ্যে। সেই সময় জামাত রাজনীতি ত দূরের কথা , নিজেদের জান নিয়েই দৌড়ের উপরে ছিল (মূলতঃ গণরোষের কারণে)। তাহলে কি পরিস্থিতির মধ্যে ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে চলে আসল?- এইটা ত’ নিশ্চিত যে, প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সবথেকে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল জাসদ, তারা ত’ ইসলামধর্মের জন্য আওয়ামী বিরোধীতা করেননি! তারা আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করেছেন সুশাসন আর ন্যায়বিচারের দাবীতে। আর তাদেরকে দমানোর জন্য আওয়ামীলীগও ইসলামধর্মের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে নাই, করেছিল জাসদের কাছাকাছি মতাদর্শ সমাজতন্ত্র-অভিমূখী যাত্রা (তথা বাকশাল)। কাজেই, যুদ্ধোত্তর রাজনীতির মধ্যেও রাজনীতির কোন পক্ষে/বিপক্ষে ইসলাম নাই। অতএব, মুক্তিযুদ্ধে কিংবা এরপরেও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের কোন প্রত্যক্ষ ভূমিকা নাই।


রাব্বীর সাথে আমি পুরো একমত যে, প্রথম আওয়ামী সরকারের পর জেনারেল জিয়া+এরশাদের সময় ইসলামকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে টেনে আনা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার শুরু হয় ১৯৭৫এ জাতির জনকের নৃশংস হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের দলীয়করণের কারণে এই ক্রান্তীকালের ইতিহাস নিয়ে চরম ধোঁয়াশার মধ্যে আছি আমরা- কোন পক্ষই প্রকৃত সত্য মানতে চায়না, জানাতে চায়না, জানতে দিতেও চায়না। তারপরেও, উভয়পক্ষের অবস্থান থেকে যা’ বোঝা যায়, তার উপর ভিত্তি করে আমি আমার বয়ান তৈরী করেছি।

জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসেছেন আওয়ামীলীগের দুঃশাসনের প্রেক্ষিতে উদ্ভূত অরাজকতার সুযোগে, আওয়ামীলীগের বিরোধী জাসদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে। আর ক্ষমতায় এসেই উচ্চাভিলাষী জিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পথে সবথেকে বড় বাঁধা দূর করেন জাসদ নেতা কর্নেল তাহেরকে ফাঁসী দিয়ে এবং সেনাবাহিনী থেকে তাহেরের অনুসারী
সেনাদের নির্মূল করে। ক্ষমতাকে পাকাপাকি করার লক্ষ্যে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে জেনারেল জিয়া ‘জাগোদল’ নামের নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন যা’ পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী দল (বিএনপি) নাম ধারণ করে। জিয়ার এই দলে স্বভাবতঃই আওয়ামীলীগ বা জাসদের কেউ আসবে না। এটা ত’ সত্য যে, জাসদ বা আর যারা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এ আওয়ামীলীগের অপশাসনের প্রতিবাদ করেছে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ছিল না, বরং ছিল স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধা, যেমন, মেজর জলীল, কর্নেল তাহের (জিয়া কিন্তু আওয়ামী সরকারের বিরোধীতা করে নাই)। কতিপয় সেনাসদস্যের হাতে ক্ষমতা হারিয়ে অবশ্যই আওয়ামীলীগ আরেক জেনারেলের সাথে যোগ দিবে না। আবার জাসদ এবং জিয়া একে অপরের প্রতিপক্ষ হওয়ায় জাসদও বিএনপিতে যোগ দিবেনা। তাহলে কাদেরকে নিয়ে জিয়া দল গঠন করলেন?- দীর্ঘদিনের আওয়ামী+বাম প্রচারণার ফলে আমাদেরকে একটা ধারণা জোড় করে গিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে এই বলে যে, জিয়া স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে তার দল গঠন করেছিলেন। এই বয়ানে খানিকতা সত্য, কিন্তু বেশিরভাগই মিথ্যা। কারণ, সেই সময় অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামীলীগের দুঃশাসনে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। তারাই জিয়ার দলের মূল সমর্থক, আওয়ামীলীগের প্রতি তাদের বিতৃষ্ণাই এই দলের ভিত্তি। এই আওয়ামী বিরোধীতা আদর্শের পার্থক্যের জন্য হয়নি, হয়েছিল ক্ষমতায় আসীন আওয়ামীলীগের নীতিহীনতা+অন্যায় অপশাসনের জন্য, হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ণে ক্ষমতাশীন দলের (তথা আওয়ামীলীগের)ব্যর্থতা+উদাসীনতার জন্য। কিন্তু কারো প্রতি ঘৃণাকে অবলম্বন করে কোন রাজনৈতিক দল কোন টিকে থাকে না, থাকে মৌলিক একটা আদর্শের ভিত্তিতেই। আর জিয়ার দলের ঘাটতি ছিল সেখানেই- এর ভিত্তিতে ছিল আওয়ামীবিদ্বেষ, কোন আদর্শ ছিলনা।

এই প্রেক্ষিতে ইসলাম একটা মোক্ষম সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয় বিএনপি’র সামনে। আওয়ামীলীগ বাকশালের প্রস্তাবনায় ইসলামকে রাজনীতি থেকে দূরে সড়িয়ে দিয়েছে। আর আওয়ামীলীগের অপশাসনে নাখোশ অধিকাংশ মানুষ, যারা আবার ঘটনাক্রমে মুসলমান। অতএব, আওয়ামীলীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে ইসলাম হয়ে ওঠে সবথেকে সম্ভাবনাময় আদর্শ, যেখানে দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদেরকে এই বলে দলে টানা যাবে যে আওয়ামীলীগ ইসলামকে বাংলাদেশ থেকে দূর করতে চেয়েছিল। আর তাদের বিরোধীতা করে বিএনপি এখানে ইসলামের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করবে। এইখান থেকেই জিয়ার প্রচারিত ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এর ভিত্তিতে আমরা দেখি ইসলাম। জিয়ার দল বিএনপি ইসলামকে আঁকড়ে ধড়ে নিজেদের আদর্শিক শুন্যতা পূরণের জন্য, আল্লার আইন প্রতিষ্ঠার জন্য নয়।

বিদ্যমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমন্ডলও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামকে টেনে নিয়ে আসার পক্ষে প্রভাবিত করেছে। আমেরিকা+মধ্যপ্রাচ্য নগদ অর্থ সহায়তা, শ্রমিক ভিসা, কৃষি+অবকাঠামো উন্নয়ণ সহায়তা, ইত্যাদির মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক চক্র মস্কো+ভারতপন্থী আওয়ামীলীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিএনপি’কে মদদ জোগায়। [উল্লেক্ষ্য যে, আমেরিকা+মধ্যপ্রাচ্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, আর রাশিয়া+ভারত ছিল পক্ষে। আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে/বিপক্ষে আন্তর্জাতিক এই মেরুকরণ ছিল সম্পূর্ণ তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য, আমাদের স্বাধীনতা কোন বিবেচ্যই ছিল না]। একই প্রক্রিয়ায় এক পর্যায়ে আমেরিকা+মধ্যপ্রাচ্য চক্রের যোগসাজসে আমাদের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী জামাত ইসলামের আড়ালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ করে।

জিয়ার বিএনপির হাত থেকে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের প্রত্যক্ষ মদদে ক্ষমতায় আসে আরেক জেনারেল এরশাদ। ইনিও জিয়ার কায়দায় একইভাবে কাটিয়ে ইসলাম ধর্মের নামে রাজনীতিতে নামেন এবং জাতীয় পার্টি গঠন করেন। জিয়ার মতোই আওয়ামীলীগ বিরোধীতা+ইসলামধর্মের আশ্রয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারক+বাহক হিসেবে নিজের দলকে উপস্থাপন করেন। জিয়ার রাজনীতির আদলে আওয়ামীবিরোধী+ইসলামপন্থী সকলে আবারো জমায়েত হয় জাতীয় পার্টিতে। আওয়ামীলীগের বাকশালকে হটিয়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবথা নিয়ে আসলেও জিয়া আর এরশাদ ছিলেন মূলতঃ স্বৈরশাসক [এটা তাদের আমলের জাতীয় নির্বাচনগুলো বিবেচনা করলেই পরিস্কার বোঝা যায়]। ফলে, এসময় গণমতের প্রতিফলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় দেখা যায়নি বললেই চলে।

পুরো ১৯৭০ আর ১৯৮০র দশক জুড়ে জাতীয় রাজনীতিতে সাধারণ জনগণের এই যে অনুপস্থিতি,এই সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধী জামাত নিজেদেরকে আবার সংগঠিত করার সুযোগ পায়। [এইখানে রাব্বীর সাথে আমি পুরোপুরি একমত]। বিএনপি আর জাতীয় পার্টি উভয়ই ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের রাজনীতি করে বলে জামাতের ইসলামধর্মকে পুঁজি করে ঘরগোছানোর প্রয়াস চোখের আড়ালে চলে যায়। ১৯৯০ এ স্বৈরশাসনের পতনে হলে আবার যখন রাজনীতিতে সাধারণ জনতার প্রবেশ ঘটে, দেখা যায় স্বাধীনতাবিরোধী জামাত ইসলামধর্মের আড়ালে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। ১৯৯১-৯৬এ নিএনপির শাসনে যথারীতি আগের সরকারগুলোর মতো লুটপাট চলতে থাকলে জনগণ ক্রমশঃ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, যা’ সামরিক স্বৈরাচারী শাসনে কঠিন ছিল। পাশাপাশি প্রয়াত জাহানারা ইমামের নের্তৃত্বে গড়ে ওঠে একাত্তরের ঘাতকদালাল বিরোধী গণআন্দোলন, যা’ জামাতের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য সরকারকে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। কিন্তু বিএনপি জামাতের যুদ্ধাপরাধের ইস্যুকে কখনোই আমলে নেয়নি, বরং রাজনীতিতে ইসলামধর্মকে টেনে আনার প্রক্রিয়া চালু রাখে, এবং সেই সাথে জামাতকে ছাড় দিয়েই চলে। এই অবস্থায় আওয়ামীলীগ বিএনপি সরকারের শাসনকার্যে ব্যর্থতাকে সমালোচনা করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনায় জনগণের সমর্থন চায়। ফলে জামাতের বিচারকামী জনতাও আওয়ামীলীগের সাথে শরিক হয়ে ক্ষমতাশীন বিএনপির বিপক্ষে নামে। কিন্তু বিএনপি-বিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে একটা অবাক করার মত ব্যাপার ঘটে- শুধুমাত্র দলীয় রাজনৈতিক সুবিধা বিবেচনা করে আওয়ামীলীগ জামাতকেও সাথে নেয় সরকার বিরোধী আন্দোলনে, যা’ বাংলাদেশের সার্বিক রাজনীতিক বিবেচনায় শুধুমাত্র ভুল নয়, অনৈতিক। ফলশ্রুতিতে, আওয়ামীলীগের ১৯৯৬-০১ আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য সাধারণ জনগণের দাবীটা আবারো চাপা পড়ে যায়। আওয়ামীলীগ সরকার পূর্ববর্তী সরকারের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা না-নিয়ে বরং তাদের দুঃশাসনকেই আরো নিপুণভাবে চালিয়ে যায়, অপশাসন+লুটুপাটের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলে সাধারণ মানুষের দূর্ভোগ আর হতাশা। মানুষ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় বিএনপি হয়ে পড়ে তাদের আশ্রয়স্থল। কিন্তু বিএনপিও শুধুমাত্র সাধারণ জনতার উপর নির্ভর করতে ভরসা পায়না। ফলে তারাও জামাতকে দলে টানে। আওয়ামীলীগের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া জনতা ২০০১ এ’ বিএনপিকে সমর্থন দেয়। কিন্তু তাদেরকে চরম হতাশ হতে হয় এ’ই দেখে যে, বিএনপি আওয়ামীলীগের অপশাসন থেকে মুক্তি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী জামাতকে একেবারে ক্ষমতায় শরীক করে নিয়েছে! উপরন্তু ক্ষমতায় আসার পরই আবারো বিএনপি বিগত সরকারগুলোর মতো নিজেদের প্রকৃত স্বরূপে তথা লুটেরা হিসেবে আবির্ভূত হয়। নিজেদের অপশাসন থেকে জনগণের মনোযোগ অন্যত্র সড়ানোর জন্য আরো জোড়েশোরে নিজেদেরকে ইসলামের ধারক+বাহক হিসেবে জাহির করতে থাকে। এই সুযোগে জামাতসহ অন্যান্য ইসলামধর্মাশ্রয়ী দলগুলোও নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসতে থাকে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের পক্ষে/বিপক্ষে আওয়ামীলীগ আর বিএনপির এই যে মেরুকরণ, এর মূলে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তাদের উদাসীনতা। আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধে নের্তৃত্ব দিলেও স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সেই সুযোগে আওয়ামীলীগের বিরোধীরা ক্ষমতা দখল করেছে। এরা রাজনীতিতে আওয়ামীলীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ইসলাম ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে এনেছে। আওয়ামীলীগের শাসনে বিতৃষ্ণ+হতাশ+ক্ষুব্ধ বাংলাদেশীদের একটা অংশ ইসলামধর্মের ভিত্তিতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা বিএনপির পক্ষে চলে গেছে। আবার মুসলমান হওয়ার পরও স্বাধীনতাবিরোধী জামাতকে সাথে নেওয়ার কারণে অনেক বাংলাদেশী বিএনপিকে অপছন্দ করে। এরা শাসনকার্যে আওয়ামী-বিএনপিকে একই রকম ব্যর্থ মনে করলেও শুধুমাত্র জামাতকে রাজনীতিতে দেখতে চায়না বলেই বিএনপির বিরুদ্ধে গিয়ে আওয়ামীলীগকে সমর্থন করে। কিন্তু আওয়ামীলীগ আবার বিএনপি+জামাত থেকে নিজেদের আলাদা করার জন্য নিজেকে ‘ইসলামের বিরুদ্ধে সেক্যুলার’ [অন্য ধর্মের প্রতি আওয়ামীলীগের অবস্থান দ্রষ্টব্য] হিসেবে উপস্থাপণ করে। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের রাজনীতির ময়দানে আওয়ামীলীগ ক্রমশঃ হয়ে পড়ে ইসলামবিরোধী আর বিএনপি ইসলামপন্থী; আর এইখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি সেক্যুলার তথা ইসলামবিরোধী, আর মুসলমানরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী রাজাকার, তথা জামাত-শিবির, তথা ছাগু। বর্তমান বাংলা ব্লগের জগতে জামাতবিরোধীতাকে দেশপ্রেমের চিহ্ন হিসেবে দেখিয়ে নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ করার সহজ তরীকায় প্রেক্ষিতটাও এটাই।

কিন্তু শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের চলমান আন্দোলন এই সরল মেরুকরণকে ভেঙ্গে দিয়েছে, হাজার হাজার মুসলমান আন্দোলনে থেকেও সময় মত নামায আদায় করে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বাংলাদেশীদের ইসলামের কোন বিরোধ নেই; দেখিয়েছে যে নামায পড়ে বলেই তারা জামাতের সমর্থক নয়। কাজেই, দাড়ি+টুপি দেখলেই, মাদ্রাসায় যেতে দেখলেই ছাগু ট্যাগ দেওয়ার অধিকার কারো নেই। একই ভাবে, ইসলামধর্মকে কষে দুচারটা গালি দিয়ে নিজেকে দেশপ্রেমিক দাবী করাটাও হাস্যকর। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানের থেকে স্বাধীন করার সময় ইসলাম নিয়ে আদৌ চিন্তা করেনি, চিন্তা করেছিল কি করে অর্থনৈতিক+সামাজিক+সাংস্কৃতিক মুক্তি পাওয়া যাবে। তারা স্বাধীনতা চেয়েছিল। কাজেই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলে রয়েছে এইসব স্বাধীনতা, আজাইর‍্যা ইসলাম বিরোধীতাও নয়, আবার আল্লার আইনের প্রতিষ্ঠাও নয়। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে নের্তৃস্থানীয় দুইদল-আওয়ামীলীগ আর বিএনপি- এদের কেউই মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনাকে ধারণ করেনা। চলমান রাজনীতির খেলায় ভোটের বিবেচনা থেকে এদের একপক্ষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যাখ্যা করে ইসলামবিরোধীতার মাধ্যমে, আরেকপক্ষ করে ইসলামধর্মের আশ্রয়ে। আর এটা স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় যুদ্ধাপরাধী জামাতের প্রসঙ্গে এদের ভূমিকা দেখলে। দলীয় ক্ষমতার জন্য সময়মত জামাতকে নিজেদের দলে পেতে এদের কারোই অনীহা নেই। এই প্রবণতারই সর্বশেষ প্রকাশ দেখলাম কাদের মোল্লার বিচারের রায়ে খুনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরেও তার ফাঁসী না হয়ে হলো যাবজ্জীবন কারাদন্ড। আর কাকতালীয়ভাবে, ঠিক একই সময়ে আওয়ামীলীগ সরকার জামাত-শিবিরের হরতাল+ধংসাত্নক কার্যকলাপের মোকাবেলায় সন্দেহজনক মাত্রায় নমনীয় [অথচ বিএনপির উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত কঠোর]! স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী শিবিরের নেতা-কর্মীদের প্রতি প্রসংশায় মুগ্ধ! আইন প্রতিমন্ত্রী বলেন জনতার এইরুপ প্রতিক্রিয়া হবে জানলে কাদের মোল্লার রায় অন্যরকমও হতে পারতো!- অন্যদিকে, বিএনপি এখনো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মধ্যে শুধুমাত্র আওয়ালীলীগের রাজনৈতিক স্বার্থই দেখছে, সাধারণ জনতার দাবী দেখছে না। জনগণ আওয়ামীলীগ সরকারের নানান ব্যর্থতায় ক্ষুদ্ধ ঠিকই, কিন্তু তারা জামাতের যুদ্ধাপরাধেরও বিচার চায়।

চলমান আন্দোলনের সবথেকে বড় অর্জন এ’ই যে এটা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে আম-জনতার মধ্যে কোন বিভেদ নেই। ইসলামের সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও কোন বিভেদ নেই। প্রকৃতপক্ষে, আমজনতার রাজনীতির মধ্যেই ইসলাম নেই। কাজেই, ইসলামকে (তথা ধর্মকে) রাজনীতি থেকে আবার আমজনতার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ্যে ফিরিয়ে দিতে হবে (ইচ্ছা করেই ধর্মিভিত্তিক রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে বলছি না। কারণ, এই অবস্থানকে আবারও ইসলামবিরোধী বলে ভুল করার অবকাশ থাকে)এবং জাতীয় রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা জনগণের স্বাধীনতার আকাংখা পূরণের লক্ষ্যের দিকে নিয়ে আসতে হবে।

আওয়ামীলীগ আর বিএনপির নের্তৃত্বে আমাদের বর্তমানের যে রাজনীতি, তা’তে মৌলিক পরিবর্তনের এটাই সূবর্ণ সুযোগ। এতোদিন তারা নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অথবা ইসলামের ‘একমাত্র ধারক’ হিসেবে জাহির করার মাধ্যমে সমালোচনারাকীদেরকে যথাক্রমে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং ইসলামবিরোধী বলে ট্যাগিং করে মুখ বন্ধ করেছে। এখন সময় এসেছে এই বৃত্ত ভাঙ্গার। আম-জনতা এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শাসক দলসমূহের সাথে সরাসরি মোকাবেলায় বসেছে তাদের প্রধান দাবী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে। আপাততঃ এটাই একমাত্র দাবী। রাজাকারদের বিচার এবং রাজনীতি থেকে ইসলামকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া । আর জামাতকে ব্যান করলে এবং একই সাথে আওয়ামীলীগ আর বিএনপির রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার দিকে আসতে বাধ্য করতে পারলেই এই লক্ষ্য অর্জিত হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

অতএব, শাহবাগে আন্দোলনকারীরা যে এখন শুধুমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচার দাবী করছে এবং ক্ষমতাশীন আওয়ামীলীগ সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করছে না, এ’ই ষ্ট্রাটেজিকে আমি সঠিক মনে করি। যদিও ছাত্রলীগ সব সময়ই আন্দোলন উপস্থিত আছে, আন্দোলনকারীরা তাদেরকে নের্তৃত্বে আসতে না-দিয়ে খুবই সঠিক কাজ করেছে। বিএনপিকে তারা সাথে পাচ্ছেনা, কিন্তু আওয়ামীলীগ/ছাত্রলীগকে পেয়েছে মানে এই নয় যে, তারা আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ণ করেই চলে যাবে। এরপর পর্যায়ক্রমে আওয়ামীলীগ+বিএনপিরও জবাবদিহীতার দাবী আসবে।

তবে আন্দোলনকারীদেরকে এই স্বতন্ত্র্য অবস্থান ধরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, মানুষ শাহবাগে আসছে ন্যায় বিচার আদায়ের জন্য, স্বাভাবিক অবস্থায় যেটা আওয়ামীলীগ বা বিএনপি কেউই দেয়নি। এই আন্দোলনকারীদের আমজনতার সাথে আওয়ামীলীগ আছে, বামপন্থি আছে, নাস্তিকও আছে। প্রকৃতপক্ষে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য এই গণদাবীকে বাঁচিয়ে রাখা এবং আপামর জনতাকে এই দাবীতে একত্রিত করতে কতিপয় বাম+নাস্তিক+আওয়ামী ঘরাণার ব্লগারের ব্যাপক ভূমিকা আছে। এজন্য একজন সাধারণ বাংলাদেশি হিসেবে আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু তারা যদি নিজ নিজ দল বা গোষ্ঠির স্বার্থে এই আন্দোলনকে ব্যবহার করতে চায় (যেমন, আওয়ামীলীগকর্তৃক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, নাস্তিককর্তৃক মুসলমানদের অবমাননা, ইত্যাদি), তাহলে চরম ভুল করবে। ক্ষুদ্র দলীয়/গোষ্ঠিস্বার্থ ছেড়ে তাদেরকে আসতে হবে আম-জনতার কাতারে। সত্যি সত্যি দেশের ভালো চাইলে, দশের ভালো চাইলে দলীয় লেজুড়বৃত্তি ছেড়ে আসার এখনই সময়।

শাহবাগের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ জয়ী হোক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুক্তি পাক। ধর্মব্যবসা, চেতনাব্যবসা এবং নাস্তিকতার নামে ইসলামবিরোধীতা অবসান হোক।

[সকাল থেকে বসে একটানা লিখেছি এই ব্লগটা। মূলতঃ গত পরশু পর্যন্ত শাহবাগের আন্দোলনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিবেচনা করেছি এইটা লিখতে। কিন্তু আজ বিকেলে অন লাইনে পত্রিকা আর ব্লগ পড়ে মনে হলো, আমার আশাবাদ ব্যর্থ হতে চলেছে। তবুও লেখাটা পরিবর্তন না করেই পোষ্ট করলাম]।

১,৫২৭ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অমিত সম্ভাবনার সূচনা”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    দারুণ লেখা।দৈর্ঘ্যে কম নয়, কিন্তু পড়ে নেয়া গেলো একটানে।
    একটা দুটো কথা:
    শেষের কথাটা কেন বলা? কেন মনে করছো তোমার আশাবাদ ব্যর্থ হতে চলেছে।

    জাহানারা ইমামের ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলন কিভাবে আওয়ামী লীগের কারণেই মুখ থুবড়ে পরেছিলো, সেটির উল্লেখ নেই।রাজনৈতিক দূরদর্শিতা না থেকে, সদিচ্ছা না থেকে শুধু যদি ভোটের হিসেব থাকে -- নেতৃত্ব ছিনিয়ে নেবার হিসেব থাকে খি হতে পারে, স্বপন কিভাবে মরে যায় আমরা দেখেছি।'ঘাদানিক' শব্দটি শিবিরের পোলাপানকে অশ্লীল উচ্চারণ করতে দেখেছি সেসব দিনে।

    বাংলাদেশে নাস্তিকতার প্রচার এবং প্রসার ঘটছে।সকল মতাবলম্বীদের পাশাপাশি স্বঘোষিত নাস্তিকরাও এই আন্দোলনে সামিল। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ইতোমধ্যে নানানভাবে এই আন্দোলনটিকে নাস্তিকদের দ্বারা পরিচালিত বলে প্রচারণা করছে জোরেসোরে - তাহলে কি এটা সত্য যে, জামাত (বা মৌলবাদী ইসলামপন্থীরা) এটাকে ইসলামের বিরুদ্ধেই হুমকি হিসেবে দেখছে? নাস্তিকদের প্রাণদণ্ড দেবার/ প্রাণ নিয়ে নেবার কেতাবি যৌক্তকতা নিয়ে আলোচনা/ফাইট চালিয়ে যাচ্ছে ফেসবুক ব্লগে! এসবের মধ্যে একজন ব্লগারও খুন হয়ে গেলেন!

    বাংলাদেশে ইসলামের 'জামাত'করণ হয়েছে বেশ ভালোভাবে -- সাঈদীর প্রতি গদগদ প্রেম থেকে এটা স্পষ্ট, যদিও আরো ভুরিভুরি উদাহরণ রয়েছে।এ মায়া বা প্রভাব থেকে সাধারণ মুসলমানদের ফেরানোর কি পথ?

    মধ্যপ্রাচ্য/সৌদি নির্ভরতা - [আর্থিক এবং (বোধ হয় সেকারণে উদ্ভুত) আত্মিক]- রও বেশ মদদ রয়েছে এসবে। তার কি হবে।

    নাস্তিকতার নামে ইসলামবিরোধীতা অবসান হোক

    যতটুকু জানি, নাস্তিকরা শুধুই কাগুজে বীর, কোন বিশ্বাসীকে গিয়ে একটা চড় দিয়েছে এমনটা শুনিনি।নাস্তিকতা বিরোধিতার নামে ইসলমাপন্থীদের মানবতাবিরোধিতার/উগ্রতার/হিংস্রতার অবসানও কি কামনা করা হবে?

    জবাব দিন
    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      নূপুর ভাই,

      আপনি ইসলামপন্থীদের সাথে নাস্তিকদের তুলনা করতে গিয়ে কি সকল মুসলমানকে জামাতীকরণে আক্রান্ত হিসেবে অনুমান করে ফেললেন? আমি কিন্তু এই অনুমানটাই যে কতটা বেঠিক, সেটা বললার চেষ্টা করলাম এ'ই দৃষ্টান্ত দেখিয়ে যে, অতীতের মুক্তিযুদ্ধে আর বর্তমানের শাহবাগে অধিকাংশ আন্দোলনকারী মুসলমান, তারা যুদ্ধ/আন্দোনলের মাঝেও নামায পড়ে, অমুসলিম+ভিন্নমতাবলম্বীদের সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ/আন্দোলন করে। কাজেই, জামাত=মুসলমান এই অনুমান একটা অবাস্তব সরলীকরণ।

      এই অনুমান প্রতিষ্ঠা করতে পারলে জামাতীকরণে সুবিধা হয় বলে জামাত নিজেদেরকে ইসলামের আড়ালে রাখতে চায়। আর তাদের এই প্রচেষ্টা দেখে 'খামাখা ইসলামঅবিরোধী'রাও তারস্বরে ইসলাম মানেই জামাত বলে চিৎকার জুড়ে দেয়, ইসলামের নবী+মুসলমানদের নিয়ে প্রলাপ শুরু করে। তা'তে কার কি লাভ হয় সেটা তর্কেও বিষয় হলেও আদলে ঠকে যায় আম-জনতা যারা না-জামাতি না-নাস্তিক। জামাতকে ঠেকাতে গিয়ে এই সরলোকরণের জন্য নাস্তিকরা কার্যত অধিকাংশ মুসলমানের সহানুভূতি হারায়।

      লাষ্টের লাইনটা জুড়ে দিছি প্রথম আলোর গতকালের কাভারেজ দেখে- গতকাল দেখলাম প্রথম পাতায় প্রায় সবগুলো সংবাদে শাহবাগের আন্দোলনের বিভিন্ন সংগঠকদেরকে সাধারণ ব্লগার/অনলাইন এক্টিভিষ্ট বলা বাদ দিয়ে তাদের দলীয় পরিচয় হাইলাইট করেছে। আর আজকের প্রথম আলো দেখলে মনে হবে, শাহবাগ পুরোটাই আওয়ামীলীগের আন্দোলন। জামাত এক অখ্যাত 'ইসলামবিরোধী'কে খুন করে দেখানোর চেষ্ট করছে যে, শাহবাগের আন্দোলন আসলে নাস্তিকদের আন্দোলন। আর প্রথম আলো দেখাচ্ছে যে এইটা আওয়ামীলীগের, যে দাবী বিএনপি এতোদিন ধরে করে আসছে।

      এখন আবার পুরোনো সেই মেরুকরণ আরোপিত হতে যাচ্ছে- মুক্তিযোদ্ধা=আওয়ামীলীগ+নাস্তিক (প্রগতীশীল/মুক্তমনা) আর রাজাকার=জামাত+বিএনপি।


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
      • নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)
        আপনি ইসলামপন্থীদের সাথে নাস্তিকদের তুলনা করতে গিয়ে কি সকল মুসলমানকে জামাতীকরণে আক্রান্ত হিসেবে অনুমান করে ফেললেন?

        'সকল' তো কখনোই না, এমন কি 'অধিকাংশ'ও আমার শব্দ নয়; তবে আক্রান্তদের হারটি আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে উত্তরোত্তর।

        আর ধর্মে বিশ্বাস যদি একটি দার্শনিক অবস্থান হয়, এতে অবিশ্বাসও তাই।তাদের অবস্থান তো পরষ্পরবিরোধী হবেই।ইসলামবিরোধিতার 'অপবাদ' নাস্তিকতাকেই নিতে হবে কেন শুধু। ইসলাম (বা আর কোন ধর্ম যদি বলি) কি ভয়াবহভাবে নাস্তিকতাবিরোধী নয়? অবশ্য মুসলমান-বিরোধিতা, বর্ণবাদ বা সাম্প্রদায়িকতার সমার্থকতা হিসেবে যদি 'ইসলামবিরোধিতা' শব্দটি ব্যবহৃত হয়, অন্য কথা।যাক এই প্রসংগটুকু একেবারেই আগ টপিক হয়ে গেলো। তবু তর্ক করার লোভ সামলাতে পারলামনা।

        'মেরুকরণ-প্রবণতা' হচ্ছে আমাদের অন্যাতম জাতীয় বদস্বভাবগুলোর মধ্যে একটি -- তুমি আওয়ামী লীগ না হলে বিএনপি, আবাহনী না হলে মোহামেডান, মুসলিম না হলে হিন্দু ইত্যাদি। এবং কোথাও একটা তোমাকে ট্যাগ না করা পর্যন্ত জনতা উশখুশ করতে থাকবে।:-)
        কাজেই ইসলাম-পালনকারী হলেই জামাতি, দাড়ি থাকলেই শিবির, না থাকলে প্রগতিশীল হওয়ার চান্স বেড়ে যাওয়া বা দাবী করা - এগুলো তো চলতেই থাকবে।এসমস্ত অপূর্ণতা নিয়েই আমাদের এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতে হবে, মূল লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে।

        জবাব দিন
        • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
          ধর্মে বিশ্বাস যদি একটি দার্শনিক অবস্থান হয়, এতে অবিশ্বাসও তাই।তাদের অবস্থান তো পরষ্পরবিরোধী হবেই।ইসলামবিরোধিতার ‘অপবাদ’ নাস্তিকতাকেই নিতে হবে কেন শুধু।

          নূপুর ভাই,
          আমি আপনার সাথে পুরোপুরি একমত যে, নাস্তিকতা একটা দার্শনিক অবস্থান যা ইসলামের নানান বিশ্বাসকে যৌক্তিক প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে, বিশ্বাসের ভিত টলিয়ে দেয়। আমি ইসলামবিরধীতার অপবাদ নাস্তিকদের দেইনি, দিছি প্রকৃত ইসলামবিরোধীদেরকে যারা নাস্তিকদের ভড়ং ধরে। নাস্তিক আর ইসলামবিরোধীর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সামহোয়ারইন ব্লগের পারভেজ আলমের সাথে নিহত রাজীব বা আসিফ/আরিফুর এর লেখার পার্থক্য দেখুন।

          আরেকটা কথা- রাজীব ইসলামবিরোধী বলে আমি কিছুতেই তার খুনের পক্ষে সাফাই গাচ্ছি না। কারণ, তার আজাইরা ইসলামবিরোধীতার জন্য এই খুন নয়, এটা সামান্য সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়। ইসলামবিরোধীতার জন্য হলে সে আরো আগেই এই পরিণতি বরণ করতো যখন ঐ লেখাগুলো প্রথম প্রকাশ করেছিল।

          এসমস্ত অপূর্ণতা নিয়েই আমাদের এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতে হবে, মূল লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে।

          - এইটাই বটম লাইন। রাজনৈইতিক দলগুলো ভোটের হিসেব করবেই- কি আওয়ামীলীগ, কি বিএনপি। আশা করি, আম-জনতার দ্বারা সংঘটিত অরাজনৈতিক এই আন্দোলন কোন রাজনৈতিক দলকর্তৃক ছিনতাই হবে না। (সম্পাদিত)


          There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

          জবাব দিন
  2. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    পড়লাম। একজন সমাজবিদের দৃষ্টিভংগিতে লেখা। অনেক সংবেদনশীল বিষয় ট্যাবুহীন নির্মোহ ভাবে উঠে এসেছে যার জন্য অনেক সাহস লাগে। কারণ এই লেখার জন্য প্রচলিত সুরে সুর না মেলানোর জন্য (হয় এদিক, না হয় ওদিক) তোমাকে দৃশ্য-অদৃশ্য অনেক বিশেষণে বিশেষিত হতে হবে। সব পয়েন্টের সাথে সে একমত, তা বলব না। তবে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার জ্ঞান আমার নেই। ভালো থেক।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      শান্তাপু,

      আপনার ফেসবুক ষ্ট্যাটাসে বাংলাদেশের যুগান্তকারী আন্দোলনসমূহের হিসেব (প্রতি ২০ বছর অন্তর) দেখেই আশাবাদী হয়ে এই ব্লগটা লিখতে বসেছিলাম। কিন্তু আমার অনুমানের মধ্যে একটা বিষয় বিবেচনায় ছিলনা- এই যে মুক্তিযোদ্ধা=আওয়ামীলীগ+নাস্তিক (প্রগতীশীল/মুক্তমনা) আর রাজাকার=জামাত+বিএনপি মেরুকরণ, এটা ত এমনি এমনি ভেঙ্গে পড়বে না। দুইযুগ ধরে ক্রমাগত গরে ওঠা এই ক্লাসিফিকেশন ভেঙ্গে পড়ার প্রক্রিয়াটা বেশ করুণ+ধ্বংসাত্নক হবে মনে হচ্ছে। কারণটা বলছি- যেসব ছেলেমেয়ে শিবির করে, তাদের অধিকাংশই পরিবারের মধ্যে একমাত্র সদস্য যে জামাতশিবির করে। কিন্তু তাদের 'ফাঁসী/জবাই/নাস্তা' করলে সে আর পরিবারের সকলেই তখন স্বাভাবিকভাবেই সেটা রুখে দাঁড়াবে। তখন ফলাফলটা কি হবে, সেটা অনুমান করতেও ভয় লাগে।


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
      • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

        মাহমুদ,
        আমি কখনই ঘোড়ার আগে গাড়ী জুড়ে দেওয়ার কথা ভাবতে পারিনা। পরিবারে যখন বাবা-মাদের সন্তান গাইড করে তখন বুঝতে হবে সে পরিবারে কিছু সমস্যা আছে।


        “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
        ― Mahatma Gandhi

        জবাব দিন
        • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

          শান্তাপু,
          ঠিক বুঝতে পারি নাই 'ঘোড়া' আর 'গাড়ি' বলতে আপনি কি বোঝাচ্ছেন। যদি দেশ আর ধর্ম বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে বলতে হবে সেই সমস্যাটা বাংলাদেশের সিংহভাগ পরিবারে আছে। কিন্তু তার দায় আমি তাদেরকে দিবো না, দিবো আমাদের খন্ডিত ইতিহাসচর্চাকে। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, দেশের ৯৯% মানুষ জানেনা আমাদের রাজনীতিতে ধর্মের প্রকৃত ভূমিকা কি, কিভাবে এটাকে ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাজনীতিতে টেনে আনা হলো, আর কেনই বা একে রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে, বাঙ্গালী জাতিসত্বার সাথে ইসলাম (এবং হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের) ঐতিহাসিক সম্পর্কই বা কি।


          There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

          জবাব দিন
  3. রাব্বী (৯২-৯৮)
    ইসলামীকরণকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে বসিয়ে দেশচিন্তা বাস্তবিকই ভ্রান্ত এবং ফলস্বরুপ দীর্ঘমেয়াদে অশেষ ক্ষতিকর

    আমার ৭৫’ পরবর্তী অতি উৎসাহী ‘ইসলামীকরণ’ মুক্তিযু্দ্ধের চেতনার সাথে সংঘাতপূর্নই মনে হয়। মুসলীমলীগ, আওয়ামীলীগ, জামাত এবং বিএনপির জন্মের আগে থেকেই ইসলাম ছিল এবং ব্যক্তি জীবনে ইসলাম নিয়ে আসলে কোন সমস্যা নেই। সমস্যা হয় তখন যখন এইটারে নিয়ে ফালাফালি হয়।

    মুক্তিযুদ্ধে নের্তৃত্বদানকারী আওয়ামীলীগ ইসলামধর্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শত্রু হিসেবে গণ্য করে

    এটা বাস্তবতা না।বরং ইসলামকে জামাত এবং বিএনপির যতটা দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে পারে সে প্রতিযোগীতায় আওয়ামীলীগ পিছিয়ে পড়ে। ষাটের দশকের আন্দোলনগুলো এবং মুক্তিযুদ্ধ একটা সেক্যুলার আইডিওলজি গঠন করে। পচাঁত্তরের পরে আওয়ামীলীগ রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য সেক্যুলার অবস্থান থেকে সরে ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহারের দিকে ঝোঁকে। ইসলামের সাপেক্ষে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি পুরোপুরি মেরুকৃত অবস্থায় না। বরং প্রতিযোগী।

    দাড়ি+টুপি দেখলেই, মাদ্রাসায় যেতে দেখলেই ছাগু ট্যাগ দেওয়ার অধিকার কারো নেই। একই ভাবে, ইসলামধর্মকে কষে দুচারটা গালি দিয়ে নিজেকে দেশপ্রেমিক দাবী করাটাও হাস্যকর

    আমার মনে হয় না এটা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাস্তবতা। তাছাড়া এখনকার জামাত সমর্থক-কর্মীদের দাড়ি-টুপি নেই বেশি।

    বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানের থেকে স্বাধীন করার সময় ইসলাম নিয়ে আদৌ চিন্তা করেনি

    দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রত্যাখ্যান কি বলে? ভাষা থেকে মুক্তি সংগ্রাম পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম নিয়ে কি চিন্তা করেছে তা স্পষ্ট। দ্রষ্টব্য – মাটির ময়না।

    এইখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি সেক্যুলার তথা ইসলামবিরোধী, আর মুসলমানরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী রাজাকার, তথা জামাত-শিবির, তথা ছাগু

    রাজনীতির যে প্রেক্ষিতটা দেখাচ্ছেন, দেখানোর সেই সমীকরণ সঠিক মনে হয়নি। অতি সরলীকৃত। কারণ এই অবস্থার অনেক লাইনস এবং টেক্সচার আছে যেগুলো এই বিভাজনে অনুপস্থিত। যেগুলো বিপরীত বা আংশিক বিপরীত অবস্থায় থেকেও একে অন্যের সংযোগ এবং সমর্থন করে। ব্লগের ক্ষেত্রেও একই কথা। আমার মনে হয় না, পুরোপুরি এভাবে মানুষ দেখে বা প্রেক্ষিতটা এমন।

    শাহবাগের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ জয়ী হোক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুক্তি পাক। ধর্মব্যবসা, চেতনাব্যবসা এবং নাস্তিকতার নামে ইসলামবিরোধীতা অবসান হোক।

    মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দলীয় বা ব্যক্তিগতভাবে কুক্ষিগত করা সম্ভব না। শেষ লাইনটা কি শাহবাগ আন্দোলনের এজেন্ডায় কোথাও আছে?

    ***
    আপনার কিছু কথাতে সমর্থনও আছে। আবার আরো কিছু পয়েন্টে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আছে। এখন কিছু কিছু বিষয়ে আমার ভিন্নমত তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। সবটা কমেন্টে লেখা সম্ভব না।


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন
    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      তোমার বেশিরভাগ মন্তব্যেই আসলে আমার সাথে খুব একটা পার্থক্য দেখতে পেলাম না।
      যেমন-

      আমার ৭৫’ পরবর্তী অতি উৎসাহী ‘ইসলামীকরণ’ মুক্তিযু্দ্ধের চেতনার সাথে সংঘাতপূর্নই মনে হয়।

      - ইসলামীকরণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিবেচনায় পুরোপুরি 'অপ্রাসঙ্গিক' বলেছি, তাই এটা সংঘাতপূর্ণ নাকি সহায়ক তা' বিবেচ্যই নয়।

      বরং ইসলামকে জামাত এবং বিএনপির যতটা দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে পারে সে প্রতিযোগীতায় আওয়ামীলীগ পিছিয়ে পড়ে। ......... পচাঁত্তরের পরে আওয়ামীলীগ রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য সেক্যুলার অবস্থান থেকে সরে ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহারের দিকে ঝোঁকে।

      আমি ত' ঠিক এইটাই বলতে চেয়েছি যে, আওয়ামীলীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাড়াতে গিয়ে বিএনপি ইসলামকে রাজনীতিতে টেনে এনেছে (এই সুযোগে জামাতও ঢুকে পড়েছে) আর আওয়ামীলীগ রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য বাধ্য হয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে তাল মেলাতে; এবং যাথার্থই বলেছো যে, আওয়ামীলী এক্ষেত্রে বিএনপির চেয়ে সব সময়ই পিছিয়ে থাকে।

      দ্বিজাতি তত্ত্বের সাথে আমার বক্তব্যকে কিভাবে রিলেট করলে, বোঝা গেলনা। বাংলাদেশের মুসলমান দ্বিজাতিত্ত্বকে কখনো মেনে নিয়েছিল এমন কথা কোথাও বলেছি বলে ত মনে হচ্ছে না।

      রাজনীতির যে প্রেক্ষিতটা দেখাচ্ছেন, দেখানোর সেই সমীকরণ সঠিক মনে হয়নি। অতি সরলীকৃত। কারণ এই অবস্থার অনেক লাইনস এবং টেক্সচার আছে যেগুলো এই বিভাজনে অনুপস্থিত।

      ঠিকই বলেছো। এসম্পর্কে খানিকটা ধারণা থাকলে সেটা ব্লগের আলোচনায় নিয়ে আসিনি ব্লগের পরিসর এবং বক্তব্যের কমপ্লেক্সিটি বেড়ে যাবার সম্ভাবনায়।

      মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দলীয় বা ব্যক্তিগতভাবে কুক্ষিগত করা সম্ভব না।

      সেটা ত' এখন পর্যন্ত শাহবাগে আন্দোলন যে চলছে তা' দিয়েই প্রমাণিত। কিন্তু গত দুই দিনের প্রথম আলো দেখো, তাহলেই বুঝতে কোন আশংকার কথা মাথায় রেখে আমি এই চিন্তাটা করেছি। যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাইবো কার কাছে? সরকারের কাছে, ঠিক ত? সেই আওয়ামীলীগই ত' শাহবাগের আন্দোলনে শরীক আছে। তারা ত' আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। তাহলে সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন করুক। সংসদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়েও যদি আওয়ামীলীগ জামাতকে রাজনীতি থেকে উৎখাত করতে না পারে, তাহলে কে, কবে, কখন সেটা পারবে? আন্দোলনের দাবী ত বর্তমান সরকারের কাছেই, তাই না? আওয়ামীলীগ 'সেক্যুলার রাজনীতি করে' এইটা প্রমাণ করার এ'ই প্রকৃত সুযোগ; তাদেরকে বাই ডিফল্ট সেক্যুলার ম্যান্ডেট দিয়ে রাখলে কখনোই বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে জামাতের বহিস্কার সম্ভব নয়। আওয়ামীলীগ যে এইখানে 'যুদ্ধাপরাধ' এর ইস্যু নিয়ে ক্ষমতা/ভোটের রাজনীতি করছে, সেইটা বিবেচনা থেকে দূরে সড়িয়ে রাখলে এই আন্দোলন খুব সম্ভবতঃ ঘাতক-দালাল-নির্মূল-কমিটির পরিণতি বরণ করবে, যে কথাটা নূপুর ভাই উপরের মন্তব্যে ইংগিত করেছেন।

      রাব্বী,
      মনে হচ্ছে, আমার বক্তব্য ঠিকঠাক গুছিয়ে লিখতে পারিনা। ফলে, তোমার কাছে অনেকগুলো দ্বিমত এসেছে যেখানে প্রকৃতপক্ষে আসলে একমত হওয়ার কথা। তবে মতের পার্থক্য ত' থাকবেই, তাই না? 🙂


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
      • রাব্বী (৯২-৯৮)

        দ্বিজাতি তত্ত্বের সাথে আমার বক্তব্যকে কিভাবে রিলেট করলে

        আপনি বলেছিলেন যে দেশ স্বাধীন করার সময় মানুষ ইসলাম নিয়ে কোন চিন্তা করেনি। সেটাই মুক্তি সংগ্রামের দীর্ঘ প্রেক্ষাপটে বলতে চাইলাম, দ্বিজাতি তত্ত্বের সমর্থন এবং প্রত্যাখ্যান করে কিভাবে ইসলাম প্রশ্নে মানুষ সরে এসেছিল রাষ্ট্রের জন্য বাতিল মডেল হিসেবে। এই চিন্তাটা রাজনৈতিক এবং মানুষের তাতে সমর্থন ছিল। তাই আমার মনে হয় না যে মানুষের আদৌ ইসলাম নিয়ে চিন্তা ছিল না। মাটির ময়না সিনেমাটা ইসলাম প্রশ্নে মানুষের সেই সরে আসাকে তুলে এনেছে।


        আমার বন্ধুয়া বিহনে

        জবাব দিন
  4. ভাইয়া খুব চমৎকার লেখা । কিছু কিছু জায়গায় একটু খটকা লাগলো তাই কমেন্ট করছি।

    আওয়ামীলীগের প্রতি তাদের বিতৃষ্ণাই এই দলের [বিএনপির ]ভিত্তি। এই আওয়ামী বিরোধীতা আদর্শের পার্থক্যের জন্য হয়নি, হয়েছিল ক্ষমতায় আসীন আওয়ামীলীগের নীতিহীনতা+অন্যায় অপশাসনের জন্য, হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ণে ক্ষমতাশীন দলের (তথা আওয়ামীলীগের)ব্যর্থতা+উদাসীনতার জন্য।

    এদেশে আওয়ামী 'বিরোধী' ('ভিন্ন' শব্দটি বোধ হয় বেশি যথার্থ) রাজনীতির উপস্হিতি আগাগোড়ায় (পাক থেকে বর্তমান অবধি) ছিলো আওয়ামীলীগের নীতিহীনতা+অন্যায় অপশাসন ইত্যাদি তাকে পুনরুথ্থান ঘটিয়েছে মাত্র । আওয়ামী লীগ যখন এর রাজনীতির চূড়ায় মানে ৭০ এর নির্বাচনে, আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলায় নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করলেও আসন গুলোতে কিন্তু কমবেশি প্রতিদ্বন্দিতা ছিলো, আর ভোট কাস্ট হয়েছিলো ৭০%। বাকী ৩০% কে আমি একতরফাভাবে ৭০% এর সমান অনুপাতে ডিস্ট্রিবিউট করব না, এদের একটি ভালো অংশ বিরোধী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। আবার আওয়ামী লীগ যা ভোট পেয়েছে তার সবটা দলীয় নয় বরং সাময়িক রাজনৈতিক পরিস্হিতির বিবেচনায় অদলীয় ভোট আছে। তাই স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামি বিরোধীতা মানেই মোটাদাগে অপশাষণের প্রতিবাদী চিত্র নয়, এটি অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পূর্বাপর সাধারন রাজনৈতিক ভিন্নতা (মাওলানা ভাষানী সাহেব নাকি ৭২ এর জানুয়ারী থেকেই প্রবল বিরোধিতা শুরু করেছিলেন), রাজনৈতিকভাবে ও সামাজিক ভাবে অপাঙ্তেয় হয়ে পড়া সমাজের কিছু এলিত শ্রেণীর ( মুসলীম লীগার যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ও সংগ্রামের বিরোধী বা নিষ্ক্রিয় ছিলেন) রাজনৈতিক পুনর্বাসনের নতুন সুযোগের প্রেক্ষিতে, পাকিস্হানী জড়তা বয়ে চলা সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তার রাজনৈতিক আকাঙ্খা, ইত্যাদি কারনও অগুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি কোনোভাবের আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাকে আড়াল করছি না বরং বিরোধীদের intention কে একতরফাভাবে honest বলে হিসেব মিলাতে চাচ্ছি না, বিএনপির পরবর্তী রাজনৈতিক কার্যক্রম আমার ধারনাকেই সমর্থন করে। এরা বেশ কিছু ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের সৎ আকাঙ্খার সাথে জেনে বুঝে প্রতারণা করে চলেছে। অন্ধ সমর্থন যেমন পরিত্যাজ্য, তেমনি আদর্শিক কারন ব্যতিরেকে অন্ধ বিরোধীতাও পরিনত রাজনীতি নয় [বিএনপির ক্ষেত্রে]।

    জবাব দিন
  5. ভাইয়া খুব চমৎকার লেখা । কিছু কিছু জায়গায় একটু খটকা লাগলো তাই কমেন্ট করছি।

    আওয়ামীলীগের প্রতি তাদের বিতৃষ্ণাই এই দলের [বিএনপির ]ভিত্তি। এই আওয়ামী বিরোধীতা আদর্শের পার্থক্যের জন্য হয়নি, হয়েছিল ক্ষমতায় আসীন আওয়ামীলীগের নীতিহীনতা+অন্যায় অপশাসনের জন্য, হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ণে ক্ষমতাশীন দলের (তথা আওয়ামীলীগের)ব্যর্থতা+উদাসীনতার জন্য।

    এদেশে আওয়ামী ‘বিরোধী’ (‘ভিন্ন’ শব্দটি বোধ হয় বেশি যথার্থ) রাজনীতির উপস্হিতি আগাগোড়ায় (পাক থেকে বর্তমান অবধি) ছিলো আওয়ামীলীগের নীতিহীনতা+অন্যায় অপশাসন ইত্যাদি তাকে পুনরুথ্থান ঘটিয়েছে মাত্র । আওয়ামী লীগ যখন এর রাজনীতির চূড়ায় মানে ৭০ এর নির্বাচনে, আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলায় নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করলেও আসন গুলোতে কিন্তু কমবেশি প্রতিদ্বন্দিতা ছিলো, আর ভোট কাস্ট হয়েছিলো ৭০%। বাকী ৩০% কে আমি একতরফাভাবে ৭০% এর সমান অনুপাতে ডিস্ট্রিবিউট করব না, এদের একটি ভালো অংশ বিরোধী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। আবার আওয়ামী লীগ যা ভোট পেয়েছে তার সবটা দলীয় নয় বরং সাময়িক রাজনৈতিক পরিস্হিতির বিবেচনায় অদলীয় ভোট আছে। তাই স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামি বিরোধীতা মানেই মোটাদাগে অপশাষণের প্রতিবাদী চিত্র নয়, এটি অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পূর্বাপর সাধারন রাজনৈতিক ভিন্নতা (মাওলানা ভাষানী সাহেব নাকি ৭২ এর জানুয়ারী থেকেই প্রবল বিরোধিতা শুরু করেছিলেন), রাজনৈতিকভাবে ও সামাজিক ভাবে অপাঙ্তেয় হয়ে পড়া সমাজের কিছু এলিত শ্রেণীর ( মুসলীম লীগার যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ও সংগ্রামের বিরোধী বা নিষ্ক্রিয় ছিলেন) রাজনৈতিক পুনর্বাসনের নতুন সুযোগের প্রেক্ষিতে, পাকিস্হানী জড়তা বয়ে চলা সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তার রাজনৈতিক আকাঙ্খা, ইত্যাদি কারনও অগুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি কোনোভাবের আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাকে আড়াল করছি না বরং বিরোধীদের intention কে একতরফাভাবে honest বলে হিসেব মিলাতে চাচ্ছি না, বিএনপির পরবর্তী রাজনৈতিক কার্যক্রম আমার ধারনাকেই সমর্থন করে। এরা বেশ কিছু ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের সৎ আকাঙ্খার সাথে জেনে বুঝে প্রতারণা করে চলেছে। অন্ধ সমর্থন যেমন পরিত্যাজ্য, তেমনি আদর্শিক কারন ব্যতিরেকে অন্ধ বিরোধীতাও পরিনত রাজনীতি নয় [বিএনপির ক্ষেত্রে]।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।