ডঃ রেহমান সোবহানের লেখা প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া (আংশিক সংযোজিত/সংশোধিত)

মিডিয়ায় গ্রামীন ক্ষুদ্রঋণের সাম্প্রতিক আলোচনার ধারাবাহিকতায় প্রথম আলো’তে (২৩ ডিসেম্বর,২০১০) ডঃ রেহমান সোবহান কলাম লিখেছেন ‘আমরা কীভাবে আমাদের মানমর্যাদা রক্ষা করবো’ শিরোনাম দিয়ে। আসেন ঐটা নিয়ে খানিকক্ষণ আলাপ-সালাপ করি।

রেহমান সোবহান স্যার শুরু করেছেন যথারীতি গ্রামীন ক্ষুদ্রঋণের সাথে তার সম্পর্ক দিয়ে যা’ প্রকৃতপক্ষেই খুব ‘নিকট সম্পর্ক’- তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত গ্রামীন ব্যাংক বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। তিনি বলেছেন, এই সময়কালটা গ্রামীনের জন্য সবথেকে ভালো সময় ছিলঃ গ্রামীন ক্ষুদ্রঋণ পৃথিবীর নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছিল, বিশ্বের সব ক্ষমতাবান+ধনী দেশগুলোর রাজা-রাণীরা বাংলাদেশে সফরে আসছিলেন গ্রামীন ক্ষুদ্রঋণ এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে এর সফল প্রয়োগ দর্শন করতে। গ্রামীন ক্ষুদ্রঋণের সুনাম এই সময়েই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে আসে ‘নোবেল শান্তি’ পুরস্কার। ক্ষুদ্রঋণ এবং এর জনক ডঃ ইউনুস এইভাবে দেশের জন্য বয়ে নিয়ে আসেন বিরাট সম্মান, বিশ্বের দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন।

এরপর ডঃ রেহমান সোবহান সমালোচনা করেছেন সম্প্রতি প্রচারিত নরওয়ের সাংবাদিকের সেই প্রামাণ্যচিত্র এবং এর প্রভাবে আমাদের মিডিয়ায় ক্ষুদ্রঋণের নেতিবাচক সমালোচনা ও প্রচার নিয়ে। তার মতে, ক্ষুদ্রঋণের বিরুদ্ধে এই সমালোচনা যথার্থ নয়। এটা দেশের মান-ইজ্জতের জন্য ক্ষতিকর। আর তাই এটা- তার ভাষায়- ‘অশোভনীয় উৎসাহ’। তিনি দাবি করেছেন, তিনি ক্ষুদ্রঋণের অন্ধ সমর্থক না। তার দৃষ্টিতেও এর ক্ষতিকর প্রভাব ধরা পড়েছে যা তিনি তার সর্বশেষ বই ‘চ্যালেঞ্জিং দ্য ইনজাষ্টিস অব পোভার্টি’তে উল্লেখ করেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ক্ষুদ্রঋণের এইরূপ সমালোচনা দেশের মান-সম্মানের উপর আঘাত। এটা পরিহার করে তিনি ক্ষুদ্রঋণের ‘শালীন ও পেশাদারী’ সমালোচনার পরামর্শ দিয়েছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদের কাছ থেকে এটাই আমারও প্রত্যাশা। এবার আসেন দেখি তিনি কতটা পেশাদারীত্বের পরিচয় দিলেন এই আলোচ্য সম্পাদকীয়তেঃ

এই লেখায় তিনি ক্ষুদ্রঋণের পক্ষে যেসব যুক্তি দিলেন, সেগুলো হচ্ছেঃ
১। দেশের দারিদ্র্যের হার ১৯৯৬ সালে ৫১% থেকে ২০০৫ সালে তা ৪০% নেমে এসেছে। এটাই ক্ষুদ্রঋণের দারিদ্র্যনাশিনী ক্ষমতা প্রমাণে তার একমাত্র তথ্য !!! কিন্তু এই দারিদ্র্যের হার কমায় ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকা কি? একমাত্র ক্ষুদ্রঋণ ছাড়া দেশে আর কোন অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কি ছিলোনা সেই সময়? পেশাদারী আলোচনায় ত’ সেইসবের ভূমিকাও স্বীকৃতি পাওয়ার কথা। পেশাদারী আলোচনা ত দাবী করে সুনির্দিষ্ট করে ক্ষুদ্রঋণের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত জনগণের আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন, সেটা কই?

২। তিনি বর্তমান ধারায় ক্ষুদ্রঋণের সমালোচনা করতে নিরুৎসাহিত করেছেন এই বলে যে, এই মডেল এবং এই উদ্যোক্তার সম্মানের সাথে দেশের সম্মান জড়িত। একেবারে খাঁটি সুশিলীয় যুক্তি। এইটা কতটা পেশাদারী মনে হয়? পেশাদারী সমালোচনা ত’ হবে নিরাবেগ, তথ্যসমৃদ্ধ। তথ্য যেদিকে নির্দেশ করবে, সেই দিকেই আমাদের সিদ্ধান্ত যাবে।

– পেশাদারী সমালোচনার পরামর্শ দিলেও ডঃ রেহমান সোবহান নিজে সেই মত চলেননি। তিনি দাবী করেছেন যে তিনিও সর্বশেষ বইয়ে ক্ষুদ্রঋণের সমালোচনা করেছেন। আশা করি সেটা যথেষ্ট পেশাদারীত্ব নিয়েই করেছেন। কিন্তু আফসোস, আমরা সেইখান থেকে কিছুই জানতে পারলাম না; অতীতেও কখনো জানতে পারিনি, ভবিষ্যতেও পারবো বলে আশা নেই। ক্ষুদ্রঋণের সমালোচনায় আমাদের সুশীলদের এই লুকোছাপা কেন? আমরা আম-জনতা তাদের ‘পেশাদারী’ সমালোচনা/বক্তব্য বোঝার যোগ্য নই বলে, নাকি আসলেই ওখানে গোপনসোপন কোন ব্যাপার আছে?

তিনি ক্ষুদ্রঋণের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে নিজেকে নিরপেক্ষ হিসেবে তুলে ধরার জন্য বলেছেন রেগুলেটরি কমিটিতে কিস্তি আদায়ে নিপীড়নের অভিযোগ তদন্ত করার কথা, পিকেএসএফ ও বিআইডিএস-এর মাধ্যমে গ্রহীতাদের জীবনযাত্রায় ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব নিয়ে হালনাগাদ গবেষণা করার কথা। পেশাদারী গবেষণার প্রয়োজন অনুভব করতে এতোদিন (প্রায় ১৫ বছর) লাগল?! তিনি নিজেই ত’ গ্রামীন বোর্ডে চেয়ারম্যান ছিলেন, ক্ষুদ্রঋণের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল, প্রভূত ক্ষমতাও ছিল। তখন তিনি কি করেছেন সেইখানে?

বাস্তব হচ্ছে এই যে, এতোদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণের বিপক্ষের সমালোচনার দ্বার রুদ্ধ ছিল দুইভাবেঃ ক্ষুদ্রঋণের উপর পেশাদারী গবেষণাকে সিস্টেমেটিক্যালী এড়িয়ে গিয়ে এবং জাতীয় পর্যায়ে চেনাজানা ব্যক্তিত্বদের মুখ দিয়ে আবেগসর্বস্ব বক্তৃতা দিয়ে। নরওয়ের সেই প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ হওয়ায় এই দরজা খুলে গেছে। এখন বিদেশীরা জানছে ক্ষুদ্রঋণের অন্ধকার দিক, আর তাদের কাছ থেকে জানা শুরু করেছে বাংলাদেশের সচেতন জনগণ, দারিদ্র্য বিমোচনের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যাদেরকে এতোদিন ধরে বোকা-বানানো হচ্ছিল। এখন সুশীলদের আবেগসর্বস্ব বক্তৃতা আর দেশের ভাবমূর্তির দোহাই দিয়ে কাজ হবেনা। এখন প্রকৃত অর্থেই পেশাদারী গবেষণা শুরু হবে ক্ষুদ্রঋণের মহিমা যাচাইয়ে (অবশ্য ইতোমধ্যেই অনেক একাডেমিক গবেষণা হয়েছে, কিন্তু বিপক্ষে যায় বলে তারা তা’ কখনোই স্বীকার করেননা)।

দুইয়ে দুইয়ে চার- এটাই বিজ্ঞান, এটাই পেশাদারিত্ব। রেহমান সোবহান স্যার, তথ্যের বদলে ব্যক্তিগত ক্রেডেনশিয়াল দিয়ে দাবী প্রতিষ্ঠার দিন শেষ হয়ে গেছে। এই সত্যটা যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করবেন, সত্যের অবশ্যম্ভাবী প্রকাশে দেশের (!) মান-মর্যাদা খুইয়ে বেইজ্জতি হওয়ার ভয় ততো কমবে।

সংযুক্তিঃ আজকের (২৫ ডিসেম্বর) ইত্তেফাকে ‘রাজধানী’ পাতায় ছাপা হয়েছে যে, ক্ষুদ্রঋণ মনিটর করার একমাত্র সরকারী আইন মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি এক্ট (২০০৬) এর অধীনে গ্রামীন ব্যাংক এখনো নিবন্ধিত হয়নি!! এই আইন করার ৪ বছর পরেও গ্রামীনের সময় হলো না যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেদের নিবন্ধন নেওয়ার!!! নাকি তারা মনে করে নোবেল পুরস্কার পাইছে বলে গ্রামীন ব্যাংক দেশের আইনের উর্ধ্বে? (http://ittefaq.com.bd/content/2010/12/25/news0027.htm)।

২২ টি মন্তব্য : “ডঃ রেহমান সোবহানের লেখা প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া (আংশিক সংযোজিত/সংশোধিত)”

  1. তানভীর (০২-০৮)

    বস প্রথম আলোতে রেহমান সোবহান এর লেখাটা আগেই পড়েছিলাম ,তখন আপনার আগের লেখা গুলো দিয়ে মিলাতে চেষ্টা করছিলাম । আপনি যে আসলেই সচেতন এবং ভালো লেখক তা প্রমাণ করলেন এই লেখা দিয়ে :clap: (সম্পাদিত)

    জবাব দিন
  2. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    আচ্ছা ক্ষুদ্র ঋনের এই সব ব্যাপার স্যাপার "ধর্মীয় মোড়কে" নিলে ক্যামন হয়? ধর্মের একটা নামও ঠিক করা দরকার, হাজার হোক ক্ষুদ্র দেশের বৃহৎ সম্মান বইলা কথা 🙂


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  3. তৌফিক

    আমাদের জাতীয় চরিত্রই এই, নিজের ব্যক্তিগত ক্রেডেনশিয়াল দিয়ে "আমি যেটা বলছি সেটাই ঠিক" এই দাবী করা। অবশ্য আমার নিজের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে, মাহমুদ ভাইরে ভালো পাই। উনি যা লিখেন সেইটাই বিশ্বাস করে বইসা থাকি। বৈঠকী আড্ডায় রেফারেন্স দেই। পাওয়ার-নলেজ ছেড়াবেড়া হইয়া গেছে। 🙂

    জবাব দিন
  4. মোস্তফা (১৯৮৮-১৯৯৪)

    ডঃ ইউণুসের সাম্প্রতিক বিতর্কের পর লাইব্রেরী থেকে উনার লেখা ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে এবং সামাজিক ব্যবসা নিয়ে তিনটি বই পেলাম, এবং পড়লাম। তুমি দেখলাম সামাজিক ব্যবসায় এবং ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে লেখা লিখেছো। আমি হাতে সময় নিয়ে তোমার আগের লেখাগুলো পড়বো। দ্বিমত বা সহমত থাকলে জানাবো। এই লেখাটির সাথে মূল বক্তব্যের সাথে সহমত। মান সম্মানের দোহাই দেওয়া কোন যুক্তি এবং পেশাদারিত্বের লক্ষন হতে পারে না। নরওয়ে সরকারে সাথে গ্রামীনের বিষয়টি ৯৮ সালে মিটে গেছে, কিন্তু তার জন্যে যে অর্থ গ্রামীন ব্যাংক ফান্ড হতে গ্রামীন কল্যান নামক ফান্ডে নেওয়ায় হয়েছিল সেই বিষয়টি হালাল হয়ে যায় না। হয়তো আইনি প্রক্রিয়ায় সঠিক ছিল, কিন্তু আমার মতে বিষয়টি অনৈতিক ছিল। ডঃ ইউনূস কিংবা গ্রামীন ব্যাংক কিন্তু সেই বিষয়টির ব্যাখ্যা এখনো দেননি।

    জবাব দিন
    • মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

      মোস্তফা ভাই,
      সহমত হয়েছেন বলে খুব ভালো লাগল। ধন্যবাদ।

      লক্ষ্য করে দেখেন, বর্তমান বিতর্কে তহবিল স্থানান্তর গৌণ বিষয়, মূখ্য হলো 'ক্ষুদ্রঋণ দরিদ্রদের জন্য ফাঁদস্বরূপ' যা' সম্পর্কে গ্রামীন কর্তৃপক্ষ একেবারে নিশ্চুপ। আমার সমালোচনাও এই মূখ্য বিষয়েই। ঐ প্রামাণ্যচিত্রের মূল বক্তব্য+টাইটেলও কিন্তু তহবিল স্থানান্তর নিয়ে নয়, তা' দরিদ্রদের জন্য ক্ষুদ্রঋণের ক্ষতিকর দিককেই নির্দেশ করে।


      There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

      জবাব দিন
  5. আব্দুল্লাহ্‌ আল ইমরান (৯৩-৯৯)

    মাহমুদ ভাই,
    আমি গ্রামের ছেলে,গ্রামের সাথে যোগাযোগও ভাল।আমি আরেকটু ভাল করে খোঁজ নিয়ে দেখবো।বিস্তারিত মন্তব্য পরে করবো।
    ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে আপনার দুইটা লেখা পড়ে আপনার ফ্যান হয়ে গেলাম। :salute: ::salute:: :salute:

    জবাব দিন
  6. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    লেখা বরাবরের মতই দারুন লাগলো। :salute:
    নরওয়ের রিপোর্ট প্রকাশের পরে সব আলোচনা সমালোচনা ইউনুসের ব্যক্তিগত নৈতিকতা আর সততার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে তেমন কোন আলোচনা হচ্ছে না, সেটাই মনে হয় বেশি জরুরী।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।