খেলা দেখা : আনন্দ, বিড়ম্বনা, অতঃপর একজন ভুক্তভোগীয় বয়ান

আমার দাদা একজন তুমুল ক্রীড়াপ্রেমী ছিলেন, এমন তথ্য কোন কালে কোন ঘটনায় খোঁজ পাওয়া যায় না কিন্তু তার ছেলেদের নামের সাথে মিল রেখে কাকতালীয় ভাবে ক্রীড়াবিদ বেরিয়ে এসেছে ক্রমাগতই। আমার বাবার কথাই ধরা যাক। আশরাফুলের গুরু নামে খ্যাত ওয়াহিদুল গণির সাথে তার নাম অনেকখানিই মিলে যায়। পৃথিবীতে আগমনের দিকে ওয়াহিদুল গণির চাইতে হয়তো আমার বাবাই এগিয়ে থাকবেন, তবে ক্রীড়াসংশ্লিষ্টতার দিক থেকে তাদের ব্যবধান আকরাম খান আর খিলিপানের চাইতে কোন অংশেই কম হবে না। তার বড় ভাই অর্থাৎ আমার বড় চাচা আরেক কাঠি সরেস। খেলাধূলা করা কিংবা দেখার নাম শুনলে তার কেশরেরে মত বাবরী চুল সিংহের মত ফুলে না উঠলেও তার পুরুষ্ঠ গোঁফের নিচের ঠোটখানা যে বেঁকে যেত একথা নিশ্চিতভাবেই জানি। আর কোন একদিন টিভিতে ফুটবল খেলার মাঝে আমার চাচাত ভাই যখন সাবাশ মন্টু বলে চিৎকার দিলো, ছেলের বেয়াদবিতে তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। কতবড় সাহস ছেলের। ঠোঁটের উপর গোঁফের রেখা গজাবার আগেই বাপরে নাম ধরে ডাকে !! এই ভয়ানক অনর্থ ঘটবার পিছনের কারণ যখন বুঝানো হয় তাকে, মন্টু নামক ফুটবলার কিংবা তার পেশা ফুটবলই তার পছন্দের তালিকায় নিচের দিকে চলে যায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ তাদের তৃতীয় ভাই তার নামের ক্রিকেটারটির মতই খেলাধূলা অন্তঃপ্রাণ। মাঝে মাঝে তো মনে হয় ক্রিকেটার রফিকের মাঝে যে নিষ্ঠা তা হয়তো আমার চাচার নামটি প্রাপ্তির সাথে কোনভাবে সম্পর্কযুক্ত। ছোটবেলা থেকেই আমার এই চাচাকে দেখে এসেছি রেডিও কানে বয়ে বেড়াতে। ব্যাপারটা তখন কৌতুককর বোধ হলেও পূর্বের ইতিহাস যখন জানতে পারি তখন আর হাসিতে মুখ বিস্তৃত হয় না। কারণ আবাহনী অন্তঃপ্রাণ আমার চাচা আশির দশকের নিয়মিত মাঠগামী দর্শক ছিলেন। আবাহনী আবাহনী — এমন তুমুল চিৎকারে গ্যালারি কাঁপিয়েছেন এমন অনুমানও করতে পারি। তবে গ্যালারির অবাঞ্ছিত কোলাহলের মাঝে মোহামেডান আবাহনী সমর্থকদের মাঝেকার দাঙ্গায় শহীদ হবার তুমুল সম্ভাবনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে দৌড়ে বাসে উঠবার সময় বেকায়দা পতনে তার পায়ের যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে যাবার পরে তিনি মাঠে যাওয়াকে এড়িয়ে চলেন। সেই থেকে রেডিওর মাঝ দিয়েই তিনি মাঠে চলে যান খেলা শুরু হলেই।

থাকুক সে কথা। ক্রীড়াবিমুখী বড় চাচা তার ছেলের নামকে ক্রীড়া থেকে একশত হাত দূরে রাখলেন। কে জানে, নামের প্রভাবে আর ছোটচাচার বাতাসে মাঠে যাওয়ার পোকা মাথায় ঢুকে যায় যদি!! একশত হাত দূরে রাখা নাম আমার যেই ভাইয়ের তার নামটি শুনলনে অবশ্য পাঠকরা চাচার ব্যর্থতা ভালোভাবেই বুঝতে পারবেন। আশরাফুল নামের আমার এই ভাইটি শুধু ছোট চাচার বাতাসে ক্রীড়া প্রেমীই হন নি, তার নামের বাতাসে বাংলাদেশের এক মহা আলোচিত ক্রীড়াবিদকেও টেনে এনেছেন চিত্রপটে। ফুল মিয়ার আগমন অবশ্য যতদিনে ততদিনে আমার ভাইয়ের মাঠে যাওয়ার ঘটনাও ইতিহাস হয়ে গেছে। আর ফুলের গুরুর নামে আমার বাবা ওয়াহিদ তাকে উৎসাহ না দিলেও নামের বাকি অংশের মালিক পাড়ার গণি ভাই তার গুরু না হোন নিদেনপক্ষে তার সহচর সে কথা নিশ্চয় করে বলা যায়। যা হোক এই আশরাফুল আর গণি ভাই এই দুইয়ের হাত ধরেই আমার প্রথম মাঠে যাওয়া। মাঠে যাওয়ার নাম শুনেই আমি আনন্দে আটখানা হয়ে যাই। টিভিতে দেখা কোরিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বাংলাদেশের জেতার স্মৃতি মনে তখনো টাটকা। আর কিছুদিন আগে গোথিয়া ডানাকাপ জয় করে এসেছে বাংলাদেশের যুবা বিকেএসপির দল। একরকম ফুটবল আলোড়ন নিয়েই মাঠে গেলাম। মাঠের স্কোর কার্ডের একপ্রান্তে বিকেএসপি নামটি দেখে টিপু বখতিয়ারদের চেহারাও ভেসে উঠে চোখে। বারবিহীন মাঠ দেখে কিছুটা থমকে যাই। আরো পরে যখন লাঠি হাতে বলকে বাড়ি দেয়া শুরু হয় কিছুই না বুঝে আমি বিরক্ত হই। আমার পাশে বসে রকিবুল হাসান গণি ভাই এনামুল হক মণিকে হাততালি দেন। আর সাথে একটু পরপরেই ফুল ভাইয়ের ক্রিটিক মন্তব্য। ক্রিকেটের অ আ ক খ বুঝলাম মাঠে বসেই, বলা যায় ফুল ভাইয়ের অত্যুৎসাহে আমাকে বুঝার ভান করতে হলো। শুনেছি তিনি নাকি এখন নিজের তিন বছরের ছোট ছেলেকেও ক্রিকেট ফুটবলের নিয়মকানুন শিখান, সেই তুলনায় আমি তো তখন অনেক বড়ই । বিরক্ত মুখে খেলা দেখতে থাকলাম আর জোর মনে দোয়া করতে লাগলাম যাতে দুইদলের দশটি করে উইকেট দ্রুত পরে আমার এই আযাব থেকে নিষ্কৃতি লাভ হয়। যতই সময় গড়াতে থাকে আমি বুঝতে পারি এ আযাব থেকে মুক্তি মিলার সম্ভাবনা সহসাই নেই। সাড়ে তিনঘণ্টা ঝাড়া এই অত্যাচার সহ্য করার পরে লাঞ্চ আওয়ারে যখন ফুল ভাইয়ের সৌজন্যে বিরিয়ানি প্রাপ্তি ঘটলো তখন অবশ্য সেটাকে সাড়ে তিন ঘন্টার মজুরি বলেই বোধ হচ্ছিল। আনন্দ আমার কাছে ঈদে পরিণত হয় যখন জানতে পারি, জাতীয় দলের ব্যাটিং শেষ বলে দুই ভাই তল্পি তল্পা গুটিয়ে বাড়িতে যাবেন। সেই আনন্দেই হোক আর বাইরে বিরিয়ানি খাবার অভিজ্ঞতা নতুন বলেই হোক তৃপ্তি করে খেতে গিয়ে শেষ করতে দেরি হয়ে যায়। খাওয়া দাওয়া শেষ করে বাড়িতে যেতে যেতে প্রথম মাঠে যাওয়ার স্মৃতিতে খাওয়া দাওয়াটাই ঘুরে ফিরে চলে আসে কেবল।

সময়ের সাথে সাথে বড় দুই ভাইয়ের প্রভাবে ক্রিকেট ফুটবল দুই খেলাতেই আমার জ্ঞান গভীর হয় , ভালো লাগা প্রবল হয়। তবে নানান সময়ে ক্রিকেট খেলা মাঠে গিয়ে দেখবার সুযোগ হলেও মারামরির অজুহাত দেখিয়ে বড় ভাইরা আমাকে ফুটবল খেলা দেখতে নিয়ে যেতেন না। মোটামুটি তাদের সামনে ক্ষিপ্রগতি ও শারীরিক সামর্থ্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তাদের সাথে মোহামেডান আবাহনী ফুটবল দেখার সুযোগ মিলে। সমস্যা হলো আমার বড় ভাই দুজনেই আবাহনীর তুমুল সমর্থক হলেও আমি ছিলাম মোহামেডান সমর্থক। খেলার মাঝে মোহামেডানের প্রায় গোল হওয়ার সম্ভাবনায় আমি যখন ইশশ বলে উঠি আমার চারপাশে একঝাঁক দৃষ্টি আমার দিকে ঘুরে যায়।তাদের কয়েকজনতো প্রায় এ্যাকশনেই নেমে যাবার অবস্থা। নেহায়েত বয়স কম ছিলো বলে আমাকে মনে হয় ছাড় দেওয়া হলো। তবে আমার ভাইদের উপর বেশ ভর্ৎসনা জুটেছিল সে কথা বেশ বুঝতে পারি। এর ফলে ভাইদের সাথে মাঠে যাওয়ার টিকেট কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। তবে আমার উপর নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘ হয় না। মূলত ভাইদের খেলোয়াড়দের নাম এবং ক্যারিয়ার মনে রাখার ডাটাবেস হিসাবে আমি বেশ গ্রহনযোগ্যতা পেয়ে যাই। তারপরে যাওয়া হয় প্রায়ই। একসময় ভাইদের ছাড়াও যাওয়া শুরু হতে থাকে। নিজেকে বড় বড় বোধ করতে থাকি। ভাইদের সাথে কাটানো সময়ের বিচিত্র ঘটনাগুলো অন্যদিনের জন্য তোলা থাক। আজ বরং নিজেই যখন বড় ভাই হয়ে ছোটভাইরে নিয়ে কীভাবে খেলা দেখলাম তার গল্প বলি।

সময়টা ২০০৪ সাল। বাংলাদেশে অনুর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ চলছে। সস্তা দরে খেলা দেখার সুযোগটা লুফে নেই। এবং পারিবারিক খেলাধূলার দর্শনের ধারা আমার ছোট চাচার ছেলের মাঝেও সঞ্চালনের উদ্দেশ্যে ব্রতী হই। পাড়ার বড় ভাইয়ের থেকে ক্লাব হাউসের টিকেট জুটে। এবং উনি ইঙ্গিত পূর্ন হাসি দিয়ে বলেন, ক্লাব হাউসে খেলা দেখার সাথে সময়টাও উপভোগ হবে। তার ইঙ্গিত বুঝতে আমার দেরি হয় না। নারী পরিবেষ্টিত হয়ে খেলা দেখার সম্ভাবনায় আমি বেশ রোমাঞ্চিত হই। কিন্তু ক্লাব হাউসে ঢুকে আমার ভুল ভাঙে। এ যে পুরাই খাঁ খাঁ মরুভূমি। পুরা মাঠের গ্যালারিতে যেখানে জমজমাট ভিড় সেখানে এখানে কোট টাই পরা কিছু কর্মকর্তার ফর্মাল উপস্থিতিতে স্বপ্ন ভঙ্গের প্রথম ধাপ পূর্ণ হয়। যা হোক সেই আশাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ক্রিকেটে মনোযোগ দেই। আফতাবের বেশ নাম ডাক তখন। তাই প্রথমে বাংলাদেশের উইকেট পড়ার পরে আফতাবের আগমনে উৎফুল্ল হই। আর আমার উৎফুল্ল হওয়াকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে পাঁচ মিনিটের মাঝেই আফতাব আহমেদ রান আউট হয়ে যায়। আশেপাশের দর্শকদের ঝাল ঝাড়া দেখে নিজেরও একটু ইচ্ছা করে ঝাল ঝাড়ার। কিন্তু বাঁধা পাই প্রথমত ছোট ভাইয়ের উপস্থিতি আর পরে আশেপাশের কোট টাই পরা ফর্মাল লোকের দাদাগিরিতে। এর মাঝেই আমাদের পাশে এক বুড়ো বেশ অবেগী গলায় কেঁদে উঠলে তাকে ঘিরে ছোট খাটো ভিড় জমে যায়। কাঁপা কাঁপা গলায় বুড়োকে বলতে শুনি, আজ যে আমার কী খুশীর দিন। আজই প্রথম আমার ছেলে দেশের জার্সি গায়ে নামছে। সঙ্গত কারনেই বুড়োর ছেলের তেমন তারকাখ্যাতি না থাকলেও বুড়োর অভিব্যাক্তিতে রাতারাতিই আশেপাশের মানুষের মাঝে তারকা বনে যায়। গোলটা বাঁধে একটু পরেই যখন বুড়োর ছেলেও সাজঘরের দিকে হাঁটা দেয়। সেই সময়ে আশেপাশের লোকের অশ্রাব্য ভাষায় আমার নিজেরই খারাপ লাগতে শুরু করে। বুড়োর অবস্থাটা কল্পনা করবার চেষ্টা করি। স্বান্তনা পাই এই ভেবে অন্তত যে খেলা দেখা নিরানন্দ হয়ে যাওয়া দিনে এই ফর্মালিটিতে পিস্ট এই আমির চাইতেও হতাশ একজন মাঠে আছে।

সারাদিন কেঁটে যায়। দিন শেষে যখন অল্পের জন্য বাংলাদেশ হেরে যায়, সারাদিনের কষ্টের জন্য মেজাজটাই বিগড়ে যায়। তবে আশায় বুক বাঁধি পরের খেলা নিয়ে। দুর্বল স্কটল্যান্ডের সাথে খেলা। এর মাঝে টিভিতে ভারতের হাতে স্কটল্যান্ডের কচুকাটা হওয়ার দৃশ্য দেখে মন এলাচ ফুলের মৌতাতে ভরে উঠে। পরের খেলা সাধারণ দর্শকদের মাঝে বসে রসিয়ে রসিয়ে দেখতে হবে আর অবশ্যই করে ছোটভাইকে বাদ দিতে হবে কোন একটা ছুঁতা করে। স্কটল্যান্ডের বোলারদের নাফিস আফতাবদের হাতে কচুকাটা হবার দৃশ্য চোখের সামনে ভাসতে থাকে। মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নাফিস আফতাব হয়ে স্কটল্যান্ডের বোলারদের ঠ্যাঙানিকে শ্যাডো করি। আর তা করতে করতেই ছোট ভাইকে বাদ দাওয়ার মোক্ষম অস্ত্র হাতে পেয়ে যাই। আরে খেলা তো ফতুল্লায়!!! এত দূর যেতে হবে সেটা ও ছোট মানুষ নিশ্চয়ই পারবে না। ছুঁতা কাজও করে ম্যাজিকের মত। ছোট ভাইকে বাসা থেকেই আঁটকে দেয়। আর মুক্ত বিহঙ্গের মত আমি রওয়ানা দেই ফতুল্লায়। সকালে উঠতে একটু দেরি হওয়াতে নিজেই নিজের উপর বিরক্ত হই। আগের দিন ভারত ৪০০ করেছে স্কটল্যান্ডের সাথে। বাংলাদেশ নিদেনপক্ষে ৩৫০ তো করবেই। একটা বল মিস করাও ঠিক হবে না, অথচ আমি রওয়ানা হতেই দেরি করে ফেললাম।

তাড়িঘড়ি করেই বাস ধরি যাত্রাবাড়ী থেকে। ভেবেছিলাম নারায়নগঞ্জ আর কত দূর। কিন্তু নারায়নগঞ্জ আর ফতুল্লায় যে ব্যবধান আছে সেটার উপলব্ধি হয় কিছু পরেই। ফতুল্লার মাঠ ধরে যেই রুট, আমি অন্য রুটে চলে এসেছি। পাগলা যাওয়ার পরে থামাতে হলো তারপরে উল্টা পথে আবার যাত্রাবাড়ী। তারপরে রুট ধরা। ইসস খেলা শুরু হলো বলে। নফিস নাইমরা ঠ্যাঙানো শুরু করলো বলে। সিটে বসেই আমার মাঝে গতির সঞ্চার হয়। কিন্তু বাংলাদেশের চিরায়ত ট্রাফিক জ্যামকে জয় করে কার সাধ্য!! আমার গতি স্থিতি প্রাপ্ত হয় বাসের নিশ্চলতায়। প্রতি মুহূর্তে নিজের বোকামির জন্য নিজেকেই গালি দিতে থাকি। স্ট্যাটিক জ্যাম পার হয়ে ডাইনামিক জ্যাম শুরু হয়। মানে গাড়ি নড়ে কিন্তু এতো ধীরে নড়ে যে আমি নেমে দৌড়ালেও তার আগে যেতে পারি। জ্যাম পার হয়ে যখন ফাঁকা রাস্তা হুট করে বাস কাউন্টারে থেমে গেল যাত্রী তোলার জন্য। আরে কী তামশা !! যাত্রী ছাউনি ধূ ধূ মরুভূমি অথচ বাস দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপার আবিষ্কার হলো একটু পরে। বাসের ড্রাইভার সিট খালি। প্রাকৃতিক জল বিয়োগের কাজে বাসকে থামিয়ে রেখে সে গেছে। কোথায় গেছে কতক্ষণ লাগবে ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। আমার মূল্যবান প্রতিটা মুহূর্তকে এভাবে জলে ভাসানোর জন্য মানে মনে ড্রাইভারের পিণ্ডি চটকাই। অপেক্ষার পালা শেষ হতেই বাস চলতে শুরু করে। ফতুল্লার কাছে আসার অনেক আগেই ব্যানার দেখতে পাই। নারায়নগঞ্জ বাসী শুভেচ্ছা জানিয়েছে তাদের এলাকার সন্তানকে। এখনকার স্মার্ট শাহাদাতের নামে সাথে পরিচয়ও ঘটে যায় বাসে বসেই। আরও খানিক পরে যখন মাঠের কাছাকাছি বাস নামিয়ে দিয়ে যায়, আমি উৎফুল্ল হয়ে প্রায় দোড়ে যাই মাঠের দিকে। কিন্তু বিধি বাম। বিরাট লাইনের পিছে নিজেকে আবিষ্কার করি। টিকেট আগে থেকে কাটা হয়নি সকালে এসে দান মেরে দেবো এই আশায়। এখন যেরকম ভিড় দেখছি ঘটনা বেগতিক। আর এই ভিড়ের সুযোগ নিয়ে ব্ল্যাকাররাও দাম হাঁকছেন। লম্বা টিকেটের লাইন ধরে কেনার চেয়ে কিছু টাকা বেশি দিতেও দেখি কুণ্ঠাবোধ করছেন না অনেকেই। আমার চোখের সামনে তখন আফতাবের ব্যাট চলছে স্কটল্যান্ডের বোলারদের উপর। মাঠের ভিতরে দর্শকদের উল্লাসে নিশ্চিত হই যে চার ছয়ের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। ব্ল্যাকার ধরবো কিনা তা নিয়ে যখন দ্বিধান্বিত এমন সময় এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন সাহায্যে। তার ফ্রেন্ড যে আসার কথা ছিলো সে আসেনি। তার টিকেট টা কেনা দামে বেঁচে দিতে চাইছেন। এমন সৌভাগ্যে খুশি হয়ে আমি লুফে নেই সুযোগ। টিকিটের লাইনের হ্যাপা পেরিয়ে মাঠে ঢুকার লাইনে দাঁড়িয়ে যাই। ভিতর থেকে আসা দর্শকদের চিৎকারে আমার চোখের সামনে বাংলাদেশের দাউদাউ ব্যাটিং জ্বলতে থাকে।

মাঠে ঢুকে মাঠের অভিনবত্বে মুগ্ধ হব নাকি বিমূঢ় হবো বুঝে পাই না!! পুরা মাঠ জুড়ে একই গ্যালারি। মানে কোন পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ ভাগ নেই। একপাশে ভিআইপি গ্যালারি। এর বাইরে সবটুকু ফাঁকা আকাশের গণগণে সূর্যের একদম ঠিক নিচে। গরমকে প্রথমবার উপলব্ধি করি অধিক মানুষের সমাগমের ভিড়ে। আর গ্যালারিতে বসবার চেষ্টা করতেই রোদে গরম হওয়া গ্যালারির আঁচ লাগে শরীরের স্পর্শকাতর জায়গাতে। বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে গিয়ে তখনই উপলব্ধি করি এতক্ষণ দর্শকদের চেচামেচির কারণ। বাংলাদেশ বোলিংয়ে আর ৬৩ রানে স্কটল্যান্ডের নয় উইকেট পড়ে গেছে। মেজাজ খারাপ হইলো বাংলাদেশের ক্যাপ্টেনের উপর !! আরে ব্যাটা নেট রান বাড়াইতে পরে ব্যাটিং নেস, ঐদিকে আমরা যে এত কষ্ট কইরা আসছি সেটা কি স্কটল্যান্ডের ব্যাটিং দেখতে নাকি !! এনামুল হক জুনিয়র তখন অলরেডি চারটা উইকেট পেয়ে গেছে আর উইকেটের নেশায় বল করছে। মনে মনে ব্যাটাকে এনিমেল বক জানোয়ার গালি দিতেও ছাড়লাম না। জোর মনে চাইলাম যাতে স্কটল্যান্ড আরো কিছু রান করে। কিন্তু কিসের কী, বুঝে উঠার আগেই ৬৮ রানে গুটিয়ে গেলো তারা।

মাঠে ঢুকতেই ইনিংস বিরতি পরলো। তাও ভাগ্য ভালো দশ মিনিটের বিরতিতে খেলা শুরু হলো। শুরুতেই নাজিমুদ্দিনকে দেখে বেশ খুশি হলাম। আগের দিন এই ছেলেটার খেলা দেখেই ওকে চিনেছি। আমার খুশিকে ভণ্ডুল করতেই কিনা ব্যাটা প্রথম বলেই আউট। আর তারপরে নাফিস নাইম বিরক্তিকর ব্যাটিং করে দর্শক ভুগিয়ে ১০ ওভার ব্যাট করে শেষ করলে সেই খেলা। তবে খেলা শেষ হবার আগেই দেখি দর্শকরা মাঠ থেকে দৌড়ে বের হয়ে যাচ্ছে। কী হলো!! টিভিতে দেখেছিলাম, আগে ইংল্যান্ডে খেলা শেষ হলেই আম্পায়ার প্লেয়ার সবাই দৌড় দিতো মাঠে দর্শক প্রবেশের ভয়ে। এখানেও এমন কিছু নাকি। আমি বেশ রয়ে সয়ে খেলার পুরস্কার বিতরণী দেখলাম কষ্ট করে আসা টাকা উসুল করবার জন্য। পরে বুঝলাম সে উসুলের মূল্য আমাকে কী নিদারুণভাবেই না শোধ দিতে হবে। বাইরে বের হয়ে দেখি চারদিকে লোকে লোকারণ্য। আর আমি হঠাৎ করেই আবিষ্কার করলাম যে এখান থেকে যাওয়ার মত কোন পাবলিক পরিবহণ তো নেই ই এমনকি প্রাইভেট পরিবহনও নেই। আমি প্রমাদ গুণলাম। ঘটনা বেগতিক। নতুন জায়গা কিছু চিনি না। তার উপর পরের বাস স্টপেজ কতদূরে সেটা যে জিজ্ঞেস করবো এমন উপায়ও নেই। সবার তখন ইয়া নাফসী ইয়া নাফসী অবস্থা। খেলার মাঠ তো না যেন হাশরের মাঠ!! ঢাকার দিকে যাওয়ার কিছু দেখি না। নারায়নগঞ্জের দিকে কিছু ট্রাক যাচ্ছে। চিরকাল রাস্তার ডাকাত বলে পরিচিত এই ট্রাক মানবদরদী হিসাবে আবির্ভূত। জনে জনে মানুষ তুলছে তারা। উঠবো কি উঠবো না হেজিটেট করতে করতেই চলে গেলো ট্রাক। পরের বার দূর থেকে ট্রাক আসতে দেখেই প্রস্তুত হয়ে গেলাম। মোটামুটি ক্যাডেট কলেজের অবসট্যাকল কোর্সের সুবিধা নিয়েই টাইগার জাম্প মেরে বসলাম। কাজ হলো। তবে জাম্প দেয়ায় যে কেউ আমার চেয়ে পিছিয়ে নেই তাও টের পেলাম আশেপাশের লোক দ্বারা দলিত হয়ে। যেভাবেই হোক ট্রাকে জায়গা নেবার সময় শক্ত কিছু এসে হাঁটুতে ঠেকলো। তাকে তোয়াক্কা করলে হবে না ; জোরে পা ধাক্কা দিয়ে ট্রাকের উপর তুলে আনলাম। উঠে আসার সময় প্যান্টের ফেঁড়ে যাওয়ার শব্দ কানে এল তবে তা নিয়ে ভাবনা চিন্তার অবস্থায় নাই তখন। ট্রাকে উঠে দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। তবে স্বস্তি অস্বস্তি হয়ে দেখা দিলো ট্রাক হার্ড ব্রেক কষলেই। মোটামুটি একসাথে ট্রাক ভর্তি লোক সামনে হেলে পরে। আমি তবু মাঝখানে থাকায় রক্ষা। সামনের লোকগুলো কিভাবে এতজনের ভার সামলাচ্ছে আল্লায়ই জানে। সোজা হয়ে দাড়াবার মতো অবস্থাও নেই। প্রতিটি সময়কে অনেক দীর্ঘ মনে হতে থাকে। মাত্র মিনিট বিশ বাদে নারায়নগঞ্জে পৌঁছাই, অথচ মনে হয়েছি আমি যুগ যুগ ধরে সেই ট্রাকের ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

নারায়নগঞ্জ আসার পরে পরিচিত এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচি। তখনই আবিষ্কার করি হাঁটুর কাছে আমার প্যান্টের একটা বড় অংশ ছিড়ে গেছে। আর সেখান দিয়ে রক্ত না পড়লেও অনেকটা জায়গা ছড়ে গেছে। ট্রাকের লোহার কোন এক অংশ আটকে গিয়েই এই বিপত্তি। হাঁটুর উপরে ছড়ে যাওয়া জায়গা থেকে লোহার গুড়াও কিছু পেলাম মনে হলো। অতঃপর সেদিন ছেড়া প্যান্ট আর ছিলা হাঁটু নিয়ে বাসায় পৌছার পরে সারাদিনের দুর্ভোগের বিরক্তি ডাবল হয় আমার কুটিলতার শিকার হয়ে দুর্ভোগ থেকে বেঁচে যাওয়া চাচাতো ভাইয়ের নির্মল হাসিতে।

১,২৩৭ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “খেলা দেখা : আনন্দ, বিড়ম্বনা, অতঃপর একজন ভুক্তভোগীয় বয়ান”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    দারুন স্মৃতিচারন হইছে। লেখাটা পড়ে মনে হলো শেষ হয় নাই, আরো পর্ব আসতেছে?

    নিজের মাঠে যাওয়ার অনেক কথাই মনে পড়ে গেল, সেটা পরে বিস্তারিত বলবো (নিজে একটা ব্লগও লেখে ফেলতে পারি, তোর আইডিয়া মেরে দিয়ে :grr: ) কিন্তু তোরে আপাতত ধিক্কার জানায় গেলাম, আশেপাশের এত আবাহনীর সাপোর্টার থাকা সত্তেও মোহামেডানের সাপোর্টার বনে যাবার কারনে।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
    • আমিন (১৯৯৬-২০০২)

      লিখে ফেল ব্লগ। স্মৃতিচারণ ঠিক বলা যাবে এই ব্লগ কে একটু এদিক ওদিক কাহিনীর প্রয়োজনে রস ঢুকানো হইছে। তবে ফতুল্লার সেই অভিজ্ঞতার পরে শিক্ষা নিয়ে ফেলছি। খুব জমজমাট ম্যাচ না হইলে শেষভবার দশ ওভার আগেই বের হয়ে যাই। যাকে বলে থাম্বস রুল।

      আর আমার কপাল এমন খারাপ আমি খেলা দেখতে গেলেই খালি বাংলাদেশ বোলিং পায়। খালি এহসান ভাইয়ের সাথে যেবার গেলাম সেবার বাংলাদেশের ব্যাটিং দেখে বিপক্ষের ব্যাটিং ২৫ ওভার দেখার পরেই তল্পি তল্পা গুটাইছি।

      জবাব দিন
  2. রাব্বী (৯২-৯৮)
    জাম্প দেয়ায় যে কেউ আমার চেয়ে পিছিয়ে নেই তাও টের পেলাম আশেপাশের লোক দ্বারা দলিত হয়ে

    ফাঁড়া প্যান্ট নিয়া থানায় গিয়া অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের নামে শ্লীলতাহানীর মামলা ঠুকে দিলে আর এতদিন পর কষ্ট কইরা ব্লগ নামানো লাগতো না 😀

    লেখা ভাল হইছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকজন মনে হয় আমার মতো নারীপ্রেমী তাই ক্রীড়াপ্রেম নিয়া তাদের আগ্রহ কম। যাইহোক, লেখার জন্য উত্তম বিনিময় দিন!


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।