হ্যাটস অফ টু এমেক সিস্টারস – সাথে কিছু প্রস্তাব

কত কিছু নিয়েই না ব্লগ লিখার তাগিদ থাকে।
কখনো নিজের দিক থেকে আবার কখনো অন্যদের কাছ থেকেও।
অথচ এক এক সময় এমন এক একটা বিষয়ের মুখোমুখি হই যে সব তাগিদ পিছনে ফেলে সেটা নিয়েই বসে যেতে হয়।

এই রকমের একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম আজ আবার।
বলছিলাম এমেকের বোনদের আয়োজনে আজ অনুষ্ঠিত ও আমার অংশ নেয়া “জরায়ু মুখ ক্যান্সার” সম্পর্কিত এওয়ারনেস জাগানো প্রোগ্রামটির কথা।

প্রথম যেদিন এই অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেখলাম, বেশ অবাক হয়েছিলাম “সকল” এক্স-ক্যাডেটদের ফ্রেন্ডস ও ফ্যামিলিসহ যোগ দিতে আমন্ত্রন জানানো দেখে। আমি ভাবলাম, এমজিসিসির সকল এক্স-ক্যাডেট বলতে গিয়ে ভুল করে ওটা বলে ফেলেছে বুঝিবা। ঘোষণাদাত্রীর কাছে তাই জানতে চাইলাম, “তুমি কি সত্যিই বারো ক্যাডেট কলেজের সকল এক্স-ক্যাডেটকে দাওয়াত দিয়েছো এমেকের পক্ষ থেকে? নাকি “সকল এক্স-ক্যাডেট” বলতে এমেকের সকল এক্স-ক্যাডেট সদস্য বুঝিয়েছো?

আমাকে অবাক করে সে বললো, “সবাইকেই বুঝিয়েছি, শুধু এমেক নয়”।
এমেকের এই বোনগুলা দুঃসাহসি, দুর্ধর্ষ জানতাম কিন্তু এতটা? আসলেই আশা করি নাই।

চুরানব্বুই-এ আইবিএ-তে এমবিএ করার সময় আমার সহপাঠি ছিল এমজিসিসির এক এক্স-ক্যাডেট। আমার চেনা প্রথম এমেক সদস্য। ওর কাছ থেকে জেনেছিলাম, দেশের চিকিৎসা সেক্টরে এমজিসিসির থেকে পেশাজীবী সরবরাহের অসাধারন সব গল্প। ওর বন্ধুদের অর্ধেকের বেশীই নাকি ডাক্তারি পড়ছে তখন! ভাবা যায়? ওর জানা অন্যান্য ব্যাচের অবস্থাও নাকি কাছাকাছি। আমি তখনি বুঝেছিলাম যে অচিরেই এমজিসিসি দেশের চিকিৎসা সেবা খাতে এক পাওয়া হাউজ হিসাবে আবির্ভুত হবে। আজ শুধু বুঝলামই না, নিজ চোখে দেখলামও যে সেটা কতটা ঠিক।

আজকের আবহওয়াটা খুব অনুকুল ছিল না। তারপরেও হলরুম ভরে গেল অংশগ্রহনকারীতে। মোটামুটি পিনপতন নিরবতায় ও নিরবিচ্ছিন্ন মনযোগে আমরা সবাই শুধু শুনেই গেলাম না, বরং অবগতও হলাম যাবতিয় রিস্ক ফ্যাক্টর ও করনিয় সম্পর্কে।

যারা ছিলেন না, সেসকল পাঠকদের জন্য স্মৃতি থেকে কিছু চুম্বক অংশ শেয়ার করছি –

১) দেশের ৭০ ভাগ নারীই জীবনের কোন এক সময় হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) ইনফেকশনে আক্রান্ত হন। এঁদের ৮০ ভাগ নিজ থেকেই তা কাটিয়ে ওঠেন কিন্তু বাকি ২০ ভাগ মানে মোট নারীর ১৪% এই আক্রান্ত অবস্থাটা বয়ে বেড়ান।
২) এই ১৪% নারীর সবাই অন্য সকল ফ্যাক্টর ও কো-ফ্যাক্টরের রসায়নে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের উচ্চ ঝুকিতে থাকেন।
৩) অন্য সেই ফ্যাক্টর ও কো-ফ্যাক্টরের বেশির ভাগই আবার তাঁদের নিজেদের নিয়ন্ত্রনাধীন নয়। যেমন ক) প্যাসিভ স্মোকিং, খ) সঙ্গির কনডম ব্যবহার করা, ইত্যাদি।
৪) আবার আক্রান্তের যে আশি ভাগ (মোট জনসংখ্যার ৫৬%) প্রথম ইনফেকশন কাটিয়ে উঠেছেন, তাঁরা কিন্তু অন্য কোন টাইপের ভাইরাস দ্বারা দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে থাকছেন। আর তখন যে তাঁরা তা কাটিয়ে উঠবেনই এরকম কোন নিশ্চয়তা কিন্তু নাই। প্রকৃত ঝুঁকি তাই ঐ ১৪% থেকে কার্যতঃ বেশীই।

ঝুঁকির ব্যাপারটা তো বুঝলাম। কিন্তু করনীয় কি?

প্রথমতঃ ঝুঁকিপুর্ন আচরন পরিহার করা। তবে তা যতই করা হোক, কিছু ঝুঁকি থেকেই যাবে।

তাই দ্বিতীয় করনিয় হলো তিন থেকে পাঁচ বছবের মধ্যে পেপ টেস্ট নামক একটা টেস্ট করে দেখা যে আক্রমনের প্রক্রিয়ায় কেউ আছেন কি না।
ইনফেক্টেড হবার পরেও রোগাক্রান্ত হতে যেহেতু ৭ বছর লেগে যায়, তাই এই বিরতিতে টেস্ট করাটা ঝুঁকি কমাতে উপযুক্ত। এটা অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সাশ্রয়িও।

তবে সবচেয়ে ভাল হয়, সামর্থ থাকলে টিকা নিয়ে ফেললে।
এটা খুবই আশার কথা যে একটা তিন ডোজের খুবই কার্যকরি টিকা বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে। তবে হতাশার কথা হলো টিকাটা বেশ দুর্মূল্য। পুরো কোর্স নিতে ১৩০০০ টাকার মত পড়বে কেবল টিকারই দাম। এর পরে আছে তা নিতে যাওয়ার জায়গা খুজে বের করা, সেখানে রেজিস্ট্রেশন, সার্ভিস চার্জ যাতায়ত ইত্যাদির খরচ ও ঝক্কি।

আমার এই লিখাটার আসল উদ্দেশ্যটা এখন খোলাসা করি।

আমরা বারো ক্যাডেট কলেজ এসোসিয়েশন তো কত জনের কত কাজেই নানান ইভেন্ট করি। নিজেদের বোনদের, ভাবীদের, কন্যাদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কমাতে কি যৌথ কোন ইভেন্ট করতে পারি না? ইভেন্ট করলে সেখানে স্পন্সার পাওয়া যায়, ক্যাম্পেইন করা যায় আর এর মধ্য দিয়ে বেনিফিশিয়ারিদের মধ্যে যাঁদের দরকার তাঁদের ব্যয়ভার কমিয়ে আনা যায়।
প্রশ্ন হতে পারে স্পন্সারদের লাভ কি? প্রচারণা পাবার একটা নগদ লাভ তো আছেই সাথে সাথে ভাল কাজে অংশগ্রহনের যে তৃপ্তিটা পাবেন – সেটা কিন্তু অমূল্য!!

ইভেন্ট ভেন্যু হিসাবে ক্যাডেট কলেজ ক্লাবের সহযোগিতা পাবার উজ্জ্বল সম্ভবনা আছে। কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের অফিস বেয়ারারের সাথে আলাপ করে সেই রকমই আভাসই পেলাম।

আর আমাদের এমেকের ডাক্তার বোনেরা এবং সকল গার্লস ক্যাডেট কলেজের মেডিক্যাল পড়ুয়া এক্স-ক্যাডেট বোনেরা যে ঐদিন স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে ইভেন্টটির টেকনিকাল বিষয়গুলি কে সহজ করে দেবেন, সে বিষয়ে আমি মোটামুটিভাবে নিশ্চিত সবসময়েই ছিলাম। তবে আজ তাঁদের উৎসাহ দেখে তা আকাশ ছুঁয়ে গেল।

কি হবে নাকি একটা প্রচেষ্টা? সবার স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাবার?

তাহলে চলুন ঠিক করে ফেলা যাক –
প্রথম শুক্রবারটি, তারপর
নবম শুক্রবারটি এবং সবশেষে
ষঢ়বিংশতম শুক্রবারটি………

পুনশ্চ:
১) অনুষ্ঠানটির কিছু ছবি দেবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ফেবুতে এখন পর্যন্ত পাওয়া কোন ছবিই “পাবলিক” না। তাই দিতে পারলাম না। “পাবলিক” করা কোন ছবি পেলে যথাশীঘ্রই তা জুরে দেবার অঙ্গিকার রইল।
২) অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেওয়ায় এমেক ইসির কাছে এমনিতেই আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। এর মধ্যে তিন পদ দিয়ে যে মজার ডিনারে তাঁরা আপ্যায়ন করলো, সে কথা মাইক দিয়ে না প্রচার করলে “অন্নপাপ” হবে গো “অন্নপাপ” হবে। আচ্ছা, তোমারা এত ভাল কেন হে বোন সকল???
৩) ইসির সবার প্রতিই কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তবে বিশেষ কৃতজ্ঞতা বিপাশা আহমেদের প্রতি 🙂 🙂 🙂 সে শুধু দাওয়াত করেই ক্ষান্ত হয়নি, গিয়েছি বলে ধন্যবাদ জানাতেও ভোলে নাই।

২,৪০০ বার দেখা হয়েছে

১২ টি মন্তব্য : “হ্যাটস অফ টু এমেক সিস্টারস – সাথে কিছু প্রস্তাব”

  1. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    :hatsoff: :hatsoff: :hatsoff: :hatsoff:

    মহতী আয়োজন নিঃসন্দেহে, ভাইয়া। তোমার কারণে আমাদেরও দেখা হলো এমেকের এই আয়োজন। বিপাশা সঠিক মানুষটিকে নেমন্তন্ন করেছে বলতেই হবে।

    জবাব দিন
    • পারভেজ (৭৮-৮৪)

      😀 😀 😀 😀 😀
      কিছুদিন আগে ব্রেস্ট ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এইরকম একটা আয়োজন করেছিল ওরা।
      সেটার কথা কি জানো?
      না জানো না।
      কেনো জানো না, বুঝতে পারছো এখন?
      কারন আমি যে ছিলাম না ওখানে হে হে হে............
      😛 😀 😛 😀 😛 😀


      Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

      জবাব দিন
  2. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    Hats Off শুধু তোমার না পারভেজ, আমরা যারা পড়লাম, আমাদেরও। :hatsoff:
    যেমন অনুপ্রেরণাদায়ক কাজ, তেমন প্রেষণামূলক লেখা। মুগ্ধ হ'লাম AMEC এর কার্যকলাপে আর তোমার রিপোর্টিং এ।

    জবাব দিন
    • পারভেজ (৭৮-৮৪)

      মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ, খায়রুল ভাই।
      তবে ওদের এত বড় একটা উদ্যোগ আর আমার এই তুচ্ছ রিপোর্টিংকে পাশাপাশি লিখাটা বড়ই শমিন্দায় ফেলে দিলো আমাকে।
      আমি যা চাচ্ছি, অর্থাৎ এই সচেতনতাকে পুঁজি করে একটা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্প করতে, সেটা যেন সফল হয় - সেই দোয়া করবেন।

      আপডেট হলো, আজ ক্লাবের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ন ব্যাক্তিবর্গের সাথে মত বিনিময় করলাম।
      তাঁরাও খুবই উৎসাহ দেখালেন।
      তিনটে শুক্রবার এই কাজের জন্য ক্লাব স্পেয়ার করতে তাঁদের সবরকমের সহযোগিতা থাকবে বলে তাঁরা আশ্বস্ত করলেন।
      ব্যাপারটা জেনে খুব ভাল লাগলো।
      আশা করছি অন্যান্য সকল পক্ষেরও সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব হবে।
      🙂 🙂 🙂


      Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

      জবাব দিন
  3. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    "ভাগ্যিস আপনি ছিলেন ওখানে... "
    কমপ্লিমেন্ট হিসাবে নিয়ে নিলাম।
    যদিও খুব ভাল করেই জানি যে এরকম একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগের কথা জানাজানিতে আমার থাকা না থাকায় কিছু আসে যায় না।
    নিজে নিজে এরকম গায়ে পড়ে কমপ্লিমেন্ট নেয়াটা শরমের ব্যাপার হলেও আনন্দদায়ক...
    😀 😛 😀 😉 😀


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  4. সাইদুল (৭৬-৮২)

    তোমার কিছু আসে যায় না, আমাদের যায় আসে। তোমার কারণে অনেক ভালো ইভেন্টের মনকাড়া রিপোর্ট পড়তে পারি


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।