না-গল্প পাঁচ(খ) – তোড়ার কথা: শাওন-রিটা অধ্যায়

প্রথম কিস্তি
না-গল্প পাঁচ(ক) – তোড়ার কথা: ফ্ল্যাশব্যাক

দ্বিতীয় কিস্তি
তোড়ার বিয়ের সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তুখোড় ছাত্র শাওন যথারীতি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্টই শুধু হয়নি, পাশ করার পরপরই ডিপার্টমেন্টে জয়েনও করে ফেলে শিক্ষক হিসাবে। অন্য বন্ধুদের মত ওর সাথেও তোড়ার বরাবরই যোগাযোগ ছিল। মাসখানেক আগে বিয়ে করেছে মোটামুটি নামি এক প্রাইভেট ইউনিভার্সিটতে পড়া অনিন্দ সুন্দরি মেয়ে রিটাকে। অবশ্যই এফেয়ারের বিয়ে।
আজকালকার এফেয়ারগুলো তো আর সেরকম প্লেটনিক কিছু থাকে না, ওদেরটাও ছিল না। এফেয়ার কালে তা অ-প্লেটনিক করতে গিয়ে কি কি অভিজ্ঞতা হতো, সেসবও বেশ মজা করে বর্ননা করত শাওন। ছেলেটা এত খোলামেলা উদার ও বন্ধু অন্ত প্রান বলে বরাবরই ওকে অন্য বন্ধুদের থেকে অনেক এগিয়ে রাখে তোড়া।
আর সেই ভাল বন্ধু শাওনই দিয়েছে আজকের পার্টিটা। যদিও বন্ধুরা সবাই জানে যে এটা শাওনের স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকা যাওয়া উপলক্ষে বন্ধুদের জন্য দেয়া ট্রিট কিন্তু তোড়া জানে এই অনুষ্ঠানে সে রিটাকে রাশেদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চায় যেন ওর অনুপস্থিতিতেও বড় ব্যাংকের প্রভাবশালী কর্মকর্তা রাশেদের প্রশ্রয়ে রিটার ইন্টার্নশিপ পাওয়া থেকে ক্যারিয়ার শুরুর পুরো প্রক্রিয়াটা খুব স্মুথলি হয়।
রাশেদকে না দেখে আসলেই শাওন হতাশ হয়। তোড়াও বুঝতে পারে তা। তবে আস্বস্ত করে শাওনকে।
– তুই যে জন্য রাশেদকে আসতে বলেছিলি, রাশেদ না এলেও সেই ব্যবস্থা কিন্তু আমি করে এসেছি। কথা আদায় করে রেখেছি যে রাশেদ আমাকে নিতে আসবে। একটু আগেই ডেকে নেবো আর পার্টির পর না হয় কিছুক্ষণ বসে পরিচয় পর্বটা সেরে ফেলা যাবে। ঐখানেই রিটার সাথে একটা এপয়েন্টমেন্ট সেট করে ফেলা যাবে। তুই-ই তো বলিস যে তোর বউটা দারুন স্মার্ট, দেখি না কতটা কাজ আদায় করতে পারে এই পরিচয় করানোর।

রিটা শুধু সুন্দরীই নয়, আসলেই দারুন স্মার্ট। শাওনকে গেঁথে ফেলার গল্পটাই তার উজ্জ্বল প্রমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রকে ফেসবুকে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দুসপ্তাহের মধ্যে দেখা করতে নাকি ডেইট করতে বাধ্য করে ফেলে। না কোন রেস্টুরেন্ট বা পার্কে না, ডেইট-এর স্থান নির্ধারন হয় রিটার সহপাঠিনিদের ফ্ল্যাট।
ঢাকার বাইরে থেকে পড়তে আসা রিটার ছয় সহপাঠিনী জিগাতলায় তিন রুমের এক ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকে। বাড়ির মালিকের শর্ত দেয়া আছে, কারো কোন বয়ফ্রেন্ড আসতে পারবে না। তবে মামা-চাচা গোত্রের কেউ এলে ওনার যে তেমন কোন আপত্তি নাই, সেটা ওরা জানে।
রিটা আর শাওন যেদিন প্রথম ডেইট করতে ঐ বাসায় যায়, রিটার পরনে ছিল শাড়ী, চোখে চশমা, মাথায় হিজাব। শাওনকেও বলে দিয়েছে, স্যুট-টাই পরে আসতে। এগুলোতে নাকি একটু বয়স্ক বলে মনে হবে। ঢোকার সময় নওরিনের খালা-খালু এসেছেন বিদেশ থেকে, একথা বলতে হবে শুধু। শাওন অবাক হয়, জানতে চায়,
– এই নওরিনটা আবার কে?
– যে ছ’জন থাকে, ওদের একজন। ওর সাথে আমার আবার লেনা-দেনা সম্পর্ক আছে তো, তাই ওর নাম ব্যবহার করবো।
– কিসের লেনাদেনা? তুমি ওকে টাকা-পয়সা ধার দাও নাকি? এইবার থেকে আমাকেও দিতে হবে নাকি?
– আরে না না, কি যে বলো। এটা অন্য লেনা-দেনা। একদিনেই সব শুনে ফেললে কি হবে, সাহেব?
– সেটাও ঠিক। আমাদের সম্পর্ক তো আর এক দিনের না। ধীরে সুস্থ্যেও শোনা যায়। তুমি শুনিও তোমার সুবিধা মত।
– সেকি, একটু পিড়াপিড়িও তো করতে পারো। তা না হাল ছেড়ে দিলে? তোমাকে নিয়ে প্রেম জমানো কঠিন হবে, বুঝতে পারছি। আরে সাহেব, বুঝতে পারছো না যে আমি বলতেই চাচ্ছি। “আরেকবার সাধিলেই বলবো” সিচুয়েশনটা উপভোগ করার জন্য ও কথা বললাম।
– আসলেই বুঝি নাই। সরি। সারা জীবন লেখাপড়া আর বই-খাতার পিছনেই ছুটে গেছি। আসলেই অনেক কিছু জানতে বাকি দেখছি।
– আমিও তাই তো দেখছি। তোমরা ক্যাডেট কলেজে পড়ুয়ারা একটু কেমন যেন। আমাদের ইউনিভার্সিটিতেও চিনি দুচার জন কে। সারাদিন কি কি নিয়ে জানি ব্যস্ত থাকে। ইসিএফ, সিসিবি এইসব।
– বাদ দাও। জিগাতলা পৌছুতে আরও খানিকক্ষন লাগবে। এর মধ্যে নওরিনের সাথে তোমার লেনা-দেনার গল্পটাই নাহয় শুনে ফেলি।
– ও হ্যাঁ, তাইতো। আমার মত যারা বাসায় থাকি, তাদের জন্য ডেইটিং প্লেস আসলেই একটা সমস্যা। জানো নিশ্চয়ই, ছেলেগুলারে আজকাল আর তেমন একটা বিশ্বাস করার উপায় থাকে না। যত গভীর সম্পর্কই থাক অনেকেই থাকে তলে তলে বদ মতলব নিয়ে। মোবাইলে বা হিডেন ক্যামেরায় ভিডিও করা তো এখন খুবই সহজ। তাই আমরা বান্ধবীরা ডেইটিং-এর জন্য ওঁদের কোন ভেন্যু ইউজ করি না। নওরিনদের এই ফ্ল্যাটটা হলো একেকজনের খালা, মামী, চাচী, ফুপু সেজে ডেইটিং করার জায়গা।
– বুঝলাম, এইটা লেনা। মানে সুবিধাটা নিচ্ছো। দিচ্ছোটা কি সেইটা বল? গিফট নিয়ে নেব কোন, ওদের সবার জন্য?
– আরে না সাহেব, ওদেরকে আমার অনেক অনেক বেশী হাদিয়া অনেক আগের থাকেই দিয়ে রাখা আছে। আজ তো যাচ্ছি তার কিছু উসুল করতে। শালীরা যদি আমার প্রথম ডেইটে ভাল একটা ট্রিট না দেয়, দেইখো কি ফায়ার হয়ে যাই। সবগুলার ডেইট করা বন্ধ করে দেবো। কঠিন শাস্তি হবে এক একটার!!
ধন্দে পরে যায় শাওন। অগ্রিম কি হাদিয়া দিয়ে রেখেছে রিটা? কি উসুল করবে? বোকার মত জিজ্ঞাসা করে,
– ও বুঝেছি, ওরা তোমার কাছে ধারটার নেয় বোধ হয় অথবা অন্যকিছু গিফট আইটেম…
– ছাই বুঝেছেন সাহেব। ওসব তো কেনা যায়। আমি ওদের যা দেই সেটা কেনা অত সহজ না। আমি ওদেরকে নিরাপদ ভেন্যু দেই ডেইটিং-এর জন্য। অন্যরা না হয় ওদের ফ্ল্যাটে গিয়ে সেটা পায়। ওঁদের অবস্থাটা একটু ভাবো দেখি? পুরাই “ভেন্যু নাই, ইচ্ছা বুকে কাপিতেছে সাকি”- অবস্থা।
– সেকি তুমি ভেন্যু দাও? তোমার আবার ডেইটিং ভেন্যু আছে নাকি? তাও নিজেস্ব? আবার নিরাপদও? তাহলে এখানে যাচ্ছ কেন? ওখানেই যাই, চলো।
– তুমি না একটা বুদ্ধু। বুঝছো? বাসায় আমার রুমটাই হলো ওদের জন্য নিরাপদ ভেন্যু। শুধু একটু গল্প ফাঁদা লাগে, এই যা। তোমাকে নিয়ে গেলে কি গল্প ফাঁদবো, বল দেখি? এটা অত সোজা না সাহেব। ওদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। বাপির কাছ থেকে আগেই এই বলে অনুমতি নিয়ে রাখি যে এসাইনমেন্ট সাবমিশন আছে গ্রুপস্টাডি করতে হবে আজ। আরও দুএক জনের সাথে বয়ফ্রেন্ড সহ আসে নওরিন বা অন্য কেউ। মামের সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দেই “আইটি এক্সপার্ট” হিসাবে, যে কিনা টাইপিং, ফরমেটিং-এ হেল্প করবে। রুমে ঢুকে গেলে আর কোন সমস্যা নাই। আমার রুমে তো বারান্দা আছে একটা ওখানেই ওরা আলাপচারিতা, ছোঁয়াছুঁয়ি চুমাচুমি, ধুমপান, গাজাটানাটানি করে। তারপরে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ঠান্ডা হতে রুমে ঢোকে। বাসা খালি থাকলে মানে বাপি-মাম কেউ না থাকলে, অন্যরা মিনিট দশ পনেরোর জন্য এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করি। তখন ওরা কাজ সারে।
– তাই নাকি? থ্রিলিং ব্যাপার। আর আঙ্কেল-আন্টি কেউ যদি থাকেন, কি করে সেদিন? সেদিন আর কিছু হয় না? আর হ্যাঁ, তুমিও আবার গাঁজাফাজা টান নাকি ওদের সাথে?
– সেকি, হবে না কেন। খুবই হয়। বরং আরও ভালোভাবে হয়, অন্ততঃ আমাদের জন্য। সেদিন সবাই গাদাগাদি করে বারান্দার গিয়ে বসি। আর পর্দার ফাঁক দিয়ে লাইভ পর্নো দেখি। আর গাঁজা যে একদমই টেনে দেখিনি, তা না। দুদিন টেস্ট করে দেখেছি। খুব যে খারাপ লেগেছে, তা না তবে এমনও মনে হয়নি যে এ জিনিসটা আমার চাই ই চাই। এই আসক্তি থেকে আমি পুরোপুরিই যে মুক্ত, এটা নিশ্চিত।
– ওরে বাপস, এসব কি কি বলছো? আমি তো শুনেই ঘেমে উঠছি। আর হ্যাঁ, আমি কিন্তু জীবনেও কোন রকমের সাবস্ট্যান্স এবিউজ ট্রাইও করি নাই। ইচ্ছাই হয়নি কখনো। এই একটা ব্যাপারে এখনো আমি খুবই এলার্জিক। নো ক্রসিং লিমিট…
– হা হা হা। তুমি বড়ই নাদান হে বালক। তবে চিন্তার কিছু নাই। আমার ওপরে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে মনের মত করে গড়ে পিটে নেবো। এবং অবশ্যই সেখানে কোনই সাবস্ট্যান্স এবিউজ থাকবে না। তারপরে দেখো ক্যামনে ক্যামনে সাত আসমান ঘুরিয়ে আনি তোমাকে।
বলতে বলতে ওদের ভেন্যু, মানে নওরিনদের ফ্ল্যাটে পৌছে যায় ওরা।
শেষ কথাটা কানে লাগে শাওনের। রিটা কি আজই মানে প্রথম সাক্ষাতেই সেরকম মানে সাত আসমান ভ্রমনের কোন পরিকল্পনা করে এসেছে? প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে? নিজের কথা ভাবে, প্রস্তুতির কথা ভাবে সে। আসলেই তো এই ডেটিং ফেটিং-এর ব্যাপারে সে বড়ই নাদান। জীবনে এই প্রথম ডেটিং অভিজ্ঞতা ওর। কিসব প্রোটেকশন-টন নেয়া লাগে, কিছুই যে নেয়া হয়নি। ও তো ভেবেছে আজ শুধু কথা-বার্তা, গল্প-গুজব, আড্ডা দেয়া, চেনা-জানা হবে।
খুব বেশী কিছু হলে একটু ছোঁয়াছুঁয়ি, চুমাচুমি। এরচেয়ে বেশী কিছু করার কোন অভিজ্ঞতা বা প্রস্তুতি, কোনটাই তো নেই ওর। কি হবে এখন? তাছাড়া পৌছে গেছে ভেন্যুতে। এখন তো বলারও উপায় নেই যে একটু অপেক্ষা করো, ডার্লিং – আমি প্রোটেকশন জোগাড় করে আনি।
বড় অস্বস্তি হতে থাকে শাওনের।
(চলবে)

তৃতীয় কিস্তি
না-গল্প পাঁচ(গ) – তোড়ার কথা: নেপাল অধ্যায়

চতুর্থ ও শেষ কিস্তি
না-গল্প পাঁচ(ঘ) – তোড়ার কথা: ফেরা

আরও কিছু না-গল্প

একটি না-গল্প: সার্ভিস চার্জ

আরেকটি না-গল্প: বেল্ট কাহিনী

না-গল্প তিন: তোড়ার জন্য

না-গল্প চার : আড়াইখানা ব্রেক-আপ কাহিনী

৮১৬ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।