ক্যান্সার চিকিৎসায় সাফল্যের গল্প

ক্যান্সার, আমার মায়ের। ব্রেস্ট ক্যান্সার। নরম প্রকৃতির আম্মুর বয়স ৬৫, ডায়াবেটিস ২০০০ সাল থেকে। আমার নানা আর বড়খালা যথাক্রমে প্রস্টেট ও লিভার ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। আম্মু মেজ। সেজ খালাও ব্রেস্ট ক্যান্সারের রোগী।

২০১৭ সালে, আমার মায়ের ক্যান্সারটা যখন ধরা পড়লো তখন আমি ঢাকাতে একটি বেসরকারী সংস্থাতে সবেমাত্র চাকুরি শুরু করেছি। বিয়ে করে বাসা নিলাম মিরপুর-৬ এ। গ্রাম থেকে বাবা-মা ঢাকাতে আমার বাসায় এলেন ডাক্তার দেখাতে। সেজখালার কাছ থেকে আম্মু ব্রেস্ট ক্যান্সারের লক্ষণগুলো মিলিয়ে নেওয়াতে, মা-বাবা আগেই ধারণা করেছিলেন খারাপ কিছু। কিন্তু এটা যে আরো খারাপ ছিল সেটা আমরা ধারণাই করতে পারিনি। এটা ছিল ক্যান্সারের অ্যাডভান্সড থার্ড স্টেজ।

আগে অপারেশন করে অঙ্গটি কেটে ফেলে দিবো, নাকি আগে শরীরে ক্যান্সারের জীবানুটার ছড়ানো থামাবো? কি করবো, কিভাবে করবো? কেমোথেরাপি না রেডিওথেরাপি? খরচ কেমন লাগবে? আম্মুর এখন কি হবে? আমাদের কি হবে? এমন অনেক চিন্তা, অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত, ধৈর্য্যের পরীক্ষার জন্য সত্যি প্রস্তুত ছিলাম না আমরা।

আমার শাশুড়ি আম্মা, উনি একজন ফুসফুস ক্যান্সার সার্ভাইবার। উনার অপারেশন ২০১৬ সালে। উনাকে যে ডাক্তার দেখানো হয়েছিল, আমরা সেই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আমার মায়ের চিকিৎসা শুরু করলাম। সেক্ষেত্রে, মায়ের শরীরে ক্যান্সারের জীবানু ছড়ানোটা আগে থামানো হবে। তাই প্রথমে কেমোথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা।

প্রতিটা মানুষের শারিরীক গঠন এক হলেও ভেতরের সহ্য করার ক্ষমতা আলাদা। আর সবার সব রকম কষ্ট বা সমস্যা নাও হতে পারে। আমার সেজখালা আমার মায়ের আগে কেমোথেরাপি নিয়েছিলেন এবং মাকে নানান সমস্যার কথা জানাতেন। মানে কেমোর ওষুধের কষ্টদায়ক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা। মা সে সমস্যাগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন। আমরা মাকে সবসময় হাসিখুশি রাখতে চাইতাম। বড় অসুখে আক্রান্ত একজন মানুষ, আমার মা যাতে সবসময় মনের দিক থেকে কোনো কষ্ট না পায়, এজন্য যেকথায় মা ভালো থাকবে, দুশ্চিন্তা করবে না – এমন পজেটিভ পরিবেশ রাখতে চেষ্টা করতাম। আমার অফিসের চাপ, সময়ের বা অর্থের প্রাপ্যতা নিয়ে কোন কথা মা জানতেন না। আসলে তার জীবনের কাছে এসব নিতান্তই তুচ্ছ ছিল।

সাপের বিষ দিয়ে বেশির ভাগ কেমোথেরাপীর ওষুধ তৈরি হয়। মায়ের সব চুল পড়ে গেলো। নখ কালো হয়ে গেল। ডাক্তার বিশেষভাবে বলেছিলেন যেনো ওজন বেশি কমে না যায়। মায়ের খাওয়া-দাওয়ার প্রতি আমরা অনেক সতর্ক ছিলাম। মাকে আঙুর খাওয়ানো একেবারে নিষেধ ছিল। আমার শাশুড়ি আম্মার ফুসফুস ক্যান্সারের জন্য যে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল, সেটাতে উনার সব চুল পড়ে যাওয়া বা নখের কোনো পরিবর্তন হয়েছিল না। প্রতিটি কেমোর ওষুধই আলাদা হয়।

২০১৮ সালের জানুয়ারীতে অপারেশন হয় মায়ের। কিছুদিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে, সুস্থ হলে মাকে আবার বাসায় নিয়ে আসি। এর কিছুদিন পর শরীর আর একটু ভাল হলে পুনরায় কেমোথেরাপি শুরু হয়। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে প্রতি সপ্তাহে কেমোথেরাপি দেওয়ার প্ল্যান করি আমরা। কেমোথেরাপি চলাকালীন সময়ে আমার সেজখালা মারা যান। আমার মা আর সেজখালা পিঠাপিঠি দুই বোন। মা অনেক কষ্ট পান খালার মৃত্যুতে।

ঢাকাতে আমার চাকুরীর জন্য আমাকে ঢাকার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তের ছোটাছুটি করতে হতো। সে সময় আমি চিকেনপক্সে আক্রান্ত হই। বাসার অন্য কারো আগে পক্স না হওয়াতে অনেক ভয় পেয়ে যাই। আমার মায়ের এখন কি হবে? কেমোথেরাপির মধ্যে এই পক্স অনেক ভয়ানক বিষয়। তাই মায়ের পক্স ওঠার আগেই আমরা মায়ের কেমোথেরাপির ডাক্তারের কাছে মাকে নিয়ে যাই। ডাক্তার স্যার মাকে কিছু ওষুধ দেন, সাথে পরবর্তী দুইটি কেমোথেরাপির তারিখ পিছিয়ে দেন। সেসময় পক্সের জন্য আব্বুর, আমার আর আমার স্ত্রী বিপাশার অনেক খারাপ অবস্থা হলেও আম্মু অল্পের উপর দিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

কেমোথেরাপির পর শুরু হয় মায়ের রেডিওথেরাপি। রেডিওথেরাপিতে শরীরের অপারেশনের স্থানটা তাপ দিয়ে সেখানকার কোষগুলোকে মেরে ফেলা হয়। প্রায় তিনমাস এই রেডিওথেরাপি চলে আম্মুর। এর মাঝে আমার নানি বয়সজনিত কারণে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েন। নানির সাথে আর দেখা হবে না এমন দুশ্চিন্তায় আমার মা অনেক ভেঙ্গে পড়েন। সেসময় একদিন সকালে আমি অফিসে যেয়ে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে ছুটি দিয়ে বাসায় চলে আসি। সেদিনই সকাল ১১টার দিকে মা-বাবা আর বিপাশাকে নিয়ে একটা প্রাইভেটকার ভাড়া করে মেহেরপুর চলে যাই মায়ের সাথে নানির দেখা করানোর জন্য। সেসময় নানি কিছুটা সুস্থ ছিলেন। পরের দিন আমরা আবার সেই প্রাইভেটকারে করে ঢাকাতে আমার বাসায় ফিরে আসি। এর ঠিক সপ্তাহ দুয়েক পরে আমার নানি মারা যান।

আমার মায়ের চিকিৎসা চলতে থাকে। বাবা টাকা ধার করে চিকিৎসার খরচ চালান। কিন্তু সে অর্থও শেষ হবার পথে। এর মাঝে সৌভাগ্যক্রমে গ্রামে আমাদের একটা জমির ভালো খরিদদার পেয়ে যান বাবা। বাবা গ্রামে যেয়ে জমির টাকা নিয়ে আসেন। ধার শোধ দেন।

বাসায় মা-কে দেখতে অনেক আত্মীয়-স্বজন আসতেন। উনাদের আনা আঙুর মা একবার ভুলে খেয়ে ফেলেন। আর তার জন্য পেটে অসুখ নিয়ে মা আবার হাসপাতালে ভর্তি হন। কিছুদিন পর সুস্থ হলে মাকে আবার বাসায় নিয়ে আসি। মায়ের খাবারের বিষয়ে আমরা অনেক সতর্কতা মেনে চলি।

ছোট আপু আর বড় আপু ঢাকাতে আসেন মায়ের সেবা করার জন্য। তৌসিফ, তৌফিক, আন্দালিব – তিন নাতিকে মা অনেক ভালবাসেন। পরিবারের কাছের মানুষের সংস্পর্শে মা সবসময় ভাল ছিলেন। সবার সাথে কথা বলে মা নিজের মনকে হাল্কা আর আনন্দিত রাখতেন। কেমোথেরাপি চলাকালিন সময়েও আমরা আম্মুর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে হেসেছি। আমাদের হাসিমুখ দেখে আমার মা হেসেছেন।

আমার স্ত্রী, বিপাশা আমার মনে সবসময় শক্তি জুগিয়েছে। পাশে থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে। বিপাশা আম্মার মেডিক্যাল রিপোর্টগুলো, ডাক্তারের সাথে কথা বলার বিষয়গুলো আমাকে বুঝতে অনেক সহযোগীতা করেছে।

২০১৪ সাথে আমার মায়ের পিঠে একটা টিউমার খুলনাতে অপারেশন হয়। সেসময় রিপোর্টে লেখা ছিল কার্সিনোমা, মানে ক্যান্সারের জীবানুর কথা। এটা বিপাশা খেয়াল করে মায়ের পুরাতন রিপোর্ট ঘেটে। যেটা আমি খেয়াল করিনি। এটা আগে খেয়াল করলে হয়তো আমার মাকে এমন খারাপ অবস্থায় আসতে হতো না। আরো সহজেই আমরা মায়ের চিকিৎসাটা করাতে পারতাম।
বর্তমানে মায়ের সব রিপোর্টগুলো ভালো আছে। প্রতি ছয়মাস পরপর মা ঢাকাতে আসেন চেকআপ করতে। করোনার জন্য চেকআপ করার সময়টা পেছালেও এখন মা অনেক ভালো আছেন।

আলহামদুলিল্লাহ্।

-সমাপ্ত-

১৯১ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।