পাঠকের ডায়েরিঃ স্মৃতি উসকে দেওয়া বই- খাকি চত্বরের খোয়ারি

ফেসবুকে বইপড়ুয়া বলে একটা গ্রুপ আছে। শাহাদুজ্জামানের বইয়ের খবরটা সেখান থেকেই পাই। লেখক হিসেবে শাহাদুজ্জামান এমনিতেই পছন্দের তালিকায় আছেন তার উপরে বইটা যখন ক্যাডেট কলেজ নিয়ে লেখা তখন আর তার উপর নজর না দিয়ে পারি নাই। ক্যাডেট কলেজ নিয়ে যেখানে যা পাই পড়ি, নিজের অভিজ্ঞতার সাথে অন্যদেরটা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করি। তাই আজিজে বইটা চোখে পড়তেই কিনে ফেললাম। এরপর শুধু চুপচাপ পাতা উলটে যাওয়া।

শুরু টা একটু জড়সড়। তারপর ভাষাটা খাপ খুলে যায়। ততক্ষণে প্রধান চরিত্রদের সাথে পরিচয় হয়ে যায়, পরিচয় হয়ে যায় বইয়ের স্থান,কাল,পাত্র- সত্তরের দশকের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের সাথে। নিজের ক্যাডেট জীবনের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে লেখক আশ্রয় নেন প্রশ্নের, একেকটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে লেখক একেকটা অধ্যায় সাজান। ক্যাডেট কলেজের সাথে পরিচয় কীভাবে, প্রথম দিনের স্মৃতি কেমন ছিল, কোন মেয়ের প্রেমে গোপনে পড়েছিল ক্লাসের সবাই? এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে লেখক আমাদের তার ক্যাডেট জীবনের আর ভিতরে নিয়ে যান। হয়ত এর সাথে সাথে আমাদের স্মৃতি গুলো খাপ খুলতে থাকে।

লেখকের প্রায় ২৫ বছর পর আমার ক্যাডেট কলেজ যাত্রা। সিকি শতাব্দী। এইটুকু সময়ের ভিতর কতকিছু বদলে যায় কিন্তু পড়তে গিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ্য করি কিছু জিনিস মনে হয় ক্যাডেট কলেজে কখনো বদলে যায় না। প্রথম দিন গাইডের হাতে বাবা মা ছেড়ে চলে যাবার সময় অসহায় মূহুর্তগুলো, প্রথম ডিনারে কাটা চামাচ নিয়ে বিব্রতকর অবস্থা, নভিসেস ড্রিলের দৌডঝাপ থেকে শুরু করে কলেজ ছেড়ে যাবার দিনের অভিজ্ঞতাটুকু, পড়বার সময় মনে হয় সিকি শতাব্দী পেড়িয়ে গেলেও কেমন যেন আমার সময়েও এইসব কিছু আগের মত ছিল, হয়ত এখনো আগের মত আছে।

বইটা পড়তে পড়তে বন্ধুত্বের মূহুর্তগুলো উপভোগ করি। ইফতি,রুমি,সোবহান,রাজীব, মিলন- নাম পালটে আমার বন্ধুরাই যেন আশ্রয় নেয় বইয়ের ভিতর। কলেজে বন্ধুত্ব হবে কিন্তু কার কোন নাম হবে না এটা কেমন করে হয় তাই নাম হয় বোতল রুমি, কুজ সোবহান কিংবা কসকো রাজীব। বন্ধুত্বের পরিধিও উঠে আসে লেখায়। সোবহানের ইংরেজি নিয়ে সবাই হাসাহাসি করলেও কাঠাল চুরিতে অবিসংবাদিত নেতা কিন্তু সেই, সিগারেট কিংবা প্লেবয় ম্যাগাজিন এইসবের সাথে হাতে খড়ি করতে হলে খাতির থাকতে হবে বোতল রুমির সাথে। আর এতসব কাজ করতে হলে দরকার একজন ইনসাইড ম্যান সেই জন্য সব সময়ের মত লেখকদের ছিল হাউজ বেয়ারা জাকির ভাই।

ক্যাডেট কলেজের বন্ধুত্ব কে লেখক চমতকার বিশ্লেষণ করেছেন। ক্যাডেট কলেজের বাইরে আমাদের বন্ধুদের সাথে দেখা হয় দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে- ক্লাসে বা খেলার মাঠে। কিন্তু ক্যাডেট কলেজে এই সময়টুকু সারাদিন, ২৪ ঘন্টা। কিশোর বয়সে কলেজের বন্ধুর পরিবেশে সার্বক্ষণিক এই সাহচর্য সবার মধ্যে একধরনের পারষ্পারিক নির্ভরশীলতা গড়ে তুলে। এইখানে বন্ধুত্বের শুরুতেই থাকে এই প্রাথমিক আস্থা। তবে ক্লাসের ৫০ জনের সবার সাথে সমান বন্ধুত্ব থাকা সম্ভব নয় তাই কার কার সাথে বন্ধুত্ব আর গাড় হয়। লেখকের যেমন হয়েছিল মিলনের সাথে।

মিলনের মত একটা করে চরিত্র আমরা সবাই আমাদের ক্যাডেট জীবনে দেখে এসেছি, হয় নিজেদের ক্লাসে নয় সিনিয়র বা জুনিয়র ক্লাসে। সবার সাথে থেকেও কেমন যেন দলছুট। মিলনের ইচ্ছে ছিল কবিতা লিখবার তাই মায়াকোভস্কির কবিতা থেকে নাম নিয়েছিল- ট্রাউজার পরা মেঘ। ফুটবলে মাঠে ডিফেন্সের খেলোয়াড়। গোলকিপার লেখকের সাথে তাই ভাল খাতির। বিশ্বভ্রমণ কিংবা কবিতা লিখবার বিষয়ে কথা হয় দুই জনে। কিন্তু মিলনের বাবার ইচ্ছে ইন্টার শেষে যেতে হবে আর্মিতে। মিলনের মত আর অনেক অনেক চরিত্র কে কলেজ জীবনে ইচ্ছে আর নির্দেশের দোলাচালে দুলতে দেখেছি। তবে সবাই মিলনের মত সাহসী হয় না তাই চারুকলা নিয়ে পড়বার ইচ্ছে ছিল যার হয়ত সেই হয়ে যায় ডাক্তার।

আমাদের কলেজগুলোতে সব সময় সবাই কে একই ছা্চে তৈরি করার চেষ্টা হয় কিন্তু সবাই ভুলে যায় একি ছাচে সবাই কে আটানো যায় না। হয়ত তাই মিলনরা খাপ খাইয়ে নিতে পারে না।

কলেজের স্যারদের কথাও উঠে আসে লেখায়। কোন কোন স্যার অনুপ্রেরণার উতস আবার কেউ প্রবল প্রতিপক্ষ। আবার আসে কৈশরিক প্রেম আর পেন ফ্রেন্ডের কথা। পড়তে পড়তে নস্টালজিক হয়ে যাই। আমাদের এক বড় ভাই চিঠি লিখত, পৃষ্টার পর পৃষ্টা। তার জন্য আবার বিশাল আয়োজন। খুজে খুজে কার কাছে সুন্দর প্যাডের পেজ আছে সেটা খুজে বের করে দামি কলম দিয়ে লেখা চিঠি। আবার একবার আমরা সবাই মিলে প্রেমে পড়ে গেলাম এক ম্যাডামের। যতই সিকি শতাব্দী পার্থক্য হোক না কেন ঐ নির্দিষ্ট বয়সে গল্পটা সবার একি রকম। ক্যাডেট কলেজগুলোতে খালি চরিত্র বদলায় গল্প গুলো মনে হয় সব একি থাকে।

স্মৃতিচারণমূলক লেখাগুলোর একটা বড় দূর্বলতা থাকে সেখানে লেখকেরা অনেক সত্য তবে স্পর্শকাতর ব্যাপার এড়িয়ে যেতে চান তবে শাহাদুজ্জামান তা করেন নি। তাই উঠে আসে যতই সমতা বিধানের চেষ্টা হোক না কেন কখনো কখনো বড় চাকুরে বা ব্যবসায়ি বাবার ছেলেরা হয়ে উঠে- মোর দ্যান ইকুয়েল। আবার ক্যাডেট কলেজ গুলোর ভিতর আরেকটা নিয়মিত ঘটনা হচ্ছে ক্লাস ইলাভেনে প্রিফেক্টশিপ নিয়ে বন্ধুদের ভিতর দ্বন্দ্ব। মজা লাগে লেখকের বন্ধুদের ভিতর এই নিয়ে মারামারির ঘটনা। আবার প্রিফেক্টশিপ দেওয়ার সময় যে অথরিটি সব সময় অন্য যে কোন যোগ্যতার থেকে বিনা বাক্যবয়ে অর্ডার মেনে নেওয়া কে সব চেয়ে বড় গুণ হিসেবে ধরে নেয় এই পর্যবেক্ষেণের সাথে একমত না হয়ে পারা যায় না।

শাহাদুজ্জামানের এই বইটা আসলে ক্যাডেটদের জন্য স্মৃতি উসকে দেওয়া এক বই। প্রতিটা ঘটনা পড়ার সাথে সাথে নিজের ভিতরের ঘটনা গুলো যেন বাক্সের ভিতর থেকে বের হয়ে আসে। পড়তে পড়তে তাই মনে হয় বইটা আরেকটু বড় হলে বোধহয় ভাল হত।

সময়ের সাথে সাথে আমাদের সবার দৃষ্টিভংগী পালটায়, পর্যবেক্ষণ পালটায়। পড়তে পড়তে পিছন ফিরে নিজেদের অনেক ঘটনা নিয়ে ভাবতে গিয়ে এমন মনে হয়েছে। কলেজ নিয়ে আমাদের সবার গল্পের শেষ নেই। গল্পের আসরে সেই পিছন ফিরে দেখার আরেকটা ভাল সংগী তাই হতে পারে- খাকি চত্বরের খোয়ারি।

১,৬৭৮ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “পাঠকের ডায়েরিঃ স্মৃতি উসকে দেওয়া বই- খাকি চত্বরের খোয়ারি”

  1. শাহরিয়ার (০৬-১২)

    প্রথম 🙂
    আপনার লিখা পড়ে বইটা পড়ার ইচ্ছা আরো বেড়ে গেল। প্রথমে লিখাটা পড়ছিলাম। পরে লেখকের নাম দেখতে গিয়ে চোখ আটকে গেল কলেজে। আপনার ছয় ব্যাচ জুনিয়র আমি ভাইয়া। নতুন আসছি এই চত্বরে তাই কলেজমেট খুজতেছিলাম বেশ কিছু দিন ধরেই। ভাল লাগল।


    • জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব - শিখা (মুসলিম সাহিত্য সমাজ) •

    জবাব দিন
  2. জিহাদ (৯৯-০৫)

    দারুণ লিখসিস, রাশেদ। আমি অনলাইনেই পড়সি বইটা। আর আমার পঠন অভিজ্ঞতাও তোর সাথে কম বেশি মিলে গেছে। শাহাদুজ্জামান একই কলেজ এবং একই হাউসের হওয়ায় প্রত্যেকটা দৃশ্যপট আমার কাছে মনে হইসে যে একেবারে চোখের সামনে ঘটতেসে।

    মিলনের ইচ্ছে ছিল কবিতা লিখবার তাই মায়াকোভস্কির কবিতা থেকে নাম নিয়েছিল- ট্রাউজার পরা মেঘ

    - খাকি পড়া মেঘ হবে সম্ভবত।


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
  3. সামীউর (৯৭-০৩)

    বইটা পড়েছি। ভাল লেগেছি খুব, তবে একটা কথা বলতেই হচ্ছে। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সঙ্গে স্টকহোম সিনড্রোম এর মিলটা ঠিক মনে হয়নি। তবে একটা উক্তি দারুণ, "বউ হচ্ছে কম্বলের মত। গায়ে দিলে কুট কুট করে, গায়ে না দিলে শীত করে।"

    জবাব দিন
  4. সামিয়া (৯৯-০৫)

    চমৎকার রিভিউ লাগলো। স্পয়লার না আশা করি। এই মুহুর্তে বই হাতে পাওয়ার উপায় নাই, তাই নেটে পড়ে ফেলবো কিনা ভাবতেসি, কিন্তু কাগজের পাতায় পড়ার আলাদা অনুভূতি আছে, অনেকটা কাঁচা মরিচের মতন, রান্নায় না থাকলেও সমস্যা নাই, কিন্তু থাকলে আলাদা একটা ফ্লেভার এনে দেয়। সেইরকম একটা গন্ধ।

    জবাব দিন
  5. সামিউল(২০০৪-১০)

    মাত্র পড়ে শেষ করলাম বইটা...
    শেষ করে খুব খারাপ লাগতেসে। পড়তে পড়তে হঠাৎ করেই বইটা শেষ হয়ে গেল।
    আমার নিজের চত্বরের কথাও মনে পড়ে গেল।
    আহারে...... (সম্পাদিত)


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।