কলেজ আউট

বাজার থেকে আজ তা প্রায় বারোটা বছর পর হবে, একটি ভিডিও গেমসের সিডি কিনে এনে করিম আর তার ছেলে সজীব খেলছে। করিম তো বুড়া আর সজীব ক্লাস ফাইবে পড়ে কিন্তু তা সত্বেও দুজন খেলাটার স্বাদ পেতে মোটেও বাকি রাখছে না। সজীবের মা মিসেস লিজা করিম অবাক হয়ে বাপ-বেটার কান্ডটা দেখছে। খেলাটার নাম “কলেজ পলায়ন-১”।

।এক।

১৯৯৫ সাল। নবম শ্রেনীর ছাত্র করিম আর হায়দার। চক ছোড়াছুড়ির দায়ে ক্লাসের বাইরে বারান্দায় হাটু গেড়ে নীডাউন হয়ে আছে তা প্রায় আধাঘন্টা যাবত।

করিম – এই মলদ্বার। শালা, তুই স্যার আসছে কিনা তা দেখবিনা?

হায়দার – কর্‌র্‌রিম, চালাকজাদা। ব্যাটা খেলতে খেলতে ঘুমাও তাই না?

করিম – দোস্ত। পা ব্যথা হয়ে গেছে। স্যার যে কখন দয়া করবেন?

হায়দার – নো চান্স ম্যান। জাস্ট এঞ্জয় ইট।

ক্লাসটা শেষ হলে স্যার চলে যাবার আগে ওদের দুজনকে আচ্ছা মতো শাসালেন। বললেন, আর কোনদিন যদি তোমাদের দুজনকে ক্লাসে এভাবে চক ছোড়াছুড়ি করতে দেখি তাহলে কিন্তু আমি তোমাদেরকেই এই কলেজ থেকে চিরদিনের মতো বাইরে ছুড়ে ফেলার বন্দোবস্ত করবো।

।দুই।

একজন চিত্রশিল্পীর জীবনে সবচেয়ে বড়গুণ হলো যে, সে একটি কাগজে তার হাতে ধরা রঙের কলম বা তুলির একটা দাগই যে কাউকে উপহার হিসেবে দিয়ে বাহবার সাথে সাথে তার মনের পবিত্রতার সার্টিফিকেটও পেতে পারে। অপরাধ করে ধরা পড়লে তো তার সাজা হবেই না বরং তারপর আবার তার প্রশংসা কুঁড়াতে হয় না, প্রশংসা তার জন্য উড়ে আসে।

হায়দার ভালো ছবি আঁকায়। এই কলেজে কোনো মহানব্যক্তি আসলেই কলেজ অধ্যক্ষ উনাকে হায়দারের তেলরঙে আঁকানো তেলসমৃদ্ধ ছবি উপহার হিসেবে দেন। কলেজ বাঁচায় অর্থের খরচ আর হায়দার বাঁচায় তার এই কলেজে থাকার গুরুত্ব।

অবশ্য এদিক থেকে করিম একপ্রকার বিপদের মধ্যেই আছে। বিভিন্ন কারণে তার জরিমানার অংকটা একটু বেশি। গত তিনদিন আগে করিমের বাবাকে অধ্যক্ষ স্যার ডেকেছিলেন। এরপর তার বাবা তাকে ডেকে তার গালে উনার পাঁচটা আঙ্গুলের ছাপ বসিয়ে দিয়ে গেছেন। আর বলেছেন, এরপর করিমের দ্বারা উনার সম্মান গেলে করিমকে কলেজ থেকে বাড়ি চলে যাবার বন্দোবস্ত করতে হবে।

।তিন।

দশম শ্রেণী। কয়েকদিন হলো প্রি-টেস্ট পরীক্ষা আরম্ভ হয়েছে। ডাইনিংহলে খাবার টেবিলে বসে বন্ধুদের মাঝে গল্প চলছে –

জ্ঞান যদি আলো হয়, তবে বিজ্ঞান সেই আলোর জোর বাড়াবার পদ্ধতি। গণিত আর পদার্থবিজ্ঞান পরোক্ষভাবে কিন্তু জীবনের গতি সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই আলোচনা করে তাই না – করিম?

করিম হায়দারের দিকে তাকিয়ে বলল – অনেকটা তাই। যেমন ধর যে, ক্যাম্পাসে কয়জন দারোয়ান আছে। দারোয়ানদের আটঘন্টা পরপর ডিউটি পাল্টানো, উনাদের কার চোখের পাওয়ার কত, কার চুল পাঁকা, চুল পাঁকার সাথে সাথে কলেজ জীবনে উনাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জনের মাত্রা। মানে যার চুল যতো বেশি পাঁকা তার চোর ধরার দৃষ্টি বা পদ্ধতি ততো ভাল জানা। তারপর সাইকেল চালাবার কার গতি কেমন।

পাশ থেকে রিমন বলল – কোন দারোয়ান টাকা দিলে সিগারেট এনে দেয়। কলেজ থেকে পালিয়ে বা লুকিয়ে বাইরে যাওয়া আবার ভেতরে আসার সময় কোন দারোয়ান কাদের কাদেরকে দেখেও না দেখার ভান করে।

হাসান বলল – এখানে কিন্তু কিছুটা মনোবিজ্ঞানের সাথে সাথে অর্থনীতিও আছে। টাকায় অনেক কিছুই হয়। সাথে সাথে বাপের ক্ষমতাও দরকার।

পরীক্ষার সময়টাতে আমাদেরকে অনেক ছাড় দেয় কর্তৃপক্ষ। রুমে বসে পড়ালেখার সুযোগ আর বাইরে কম নজরদারি। এই সময়টাই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে একটু রোমাঞ্চকর জীবনের স্বাদ নিলে কেমন হয়?

করিমের এই কথা বেশ অবাক করলো সবাইকে। রাসেল এতক্ষণ চুপ থেকে এবার বলে উঠলো, মানে কি?

হায়দার প্রশ্ন দিয়ে উত্তর দিল যে – আমাদের সাথে আগামীকাল মাগরিবের পরে ডিনারের আগে কলেজের প্রাচীর দেড়ঘন্টার জন্য টপকাবি কে কে?

সবাই চুপ।

।চার।

বাবার বন্দোবস্ত, স্যারের বন্দোবস্ত আর নিজেদের বন্দোবস্ত। “চল পালিয়ে যায়”।

গতি বেশি দৌঁড়ের। তাই তাদের পেছনে দৌঁড়ে তাদেরকে ধরবে কোন দারোয়ান?

চোখের পাওয়ার ৬/৬।

সময়ের গণনার সাথে সাথে অসাধারণ এক পদচারণা। প্রাচীর টপকে দিনের পর দিন পগার পার।

রক্তে বন্ধুত্বের মাঝে এক যেন রোমাঞ্চের স্বাদ। আহা।

।পাঁচ।

গোপনীয়তার একটা মেয়াদ থাকে। মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার আগেই সেটা প্রকাশ পেলে জীবন শেষ। আর মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার পর সেটা প্রকাশ করে পুরাই নায়ক বনে যাওয়া যায়। কিন্তু তাদের সময়টা বোধ হয় মারাত্মক খারাপের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। তারা নায়ক না বনে যেয়ে, একটি জীবনের শেষের দিকে ধুরপাক খাচ্ছিল অনেকটা।

দারোয়ানের রিপোর্ট হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নিয়ম-কানুনের হেড মেজর, আজ ওদের সবাইকে উনার রুমে ডেকেছেন। কোন একটা প্রমাণ আছে ওদের বিরুদ্ধে মেজরের কাছে। ওরা ধারণা করছে যে, ওদেরকে কলেজের বাইরে কোন একজন দারোয়ান দেখে ফেলেছে। আর সেই দারোয়ানেরই চোখের প্রমাণে ওদেরকে খুঁজেবার করা হবে।

।ছয়।

কলেজের বাইরে সেদিন যেয়ে একটা দোকান থেকে ওরা তিন বন্ধু সিগারেট কিনছিল। করিম, হায়দার আর রাসেল। দোকান থেকে কিছু টাকা ফেরত নেবার সময় দোকানদারের হাতে লুকানো ব্লেডে করিমের হাতটা কেটে যায়। অনামিকার সামান্য অংশ।

প্রমাণ একটা খারাপ বিষয়। করিম কোন প্রমাণ রাখতে অনেক বেশি অপছন্দ করে। দারোয়ানটার প্রমোশনের জন্য একটা প্রমাণ অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল। দোকানদারটা বোধহয় দারোয়ানের শ্বশুর আব্বা ছিল।

।সাত।

রাসেলের বাবার অনেক ক্ষমতা। এখানকার কর্তৃপক্ষের অত ক্ষমতা নেই যে ওর বাবাকে ডাকবে। হায়দারের দাম কলেজ বোঝে। সে চিত্রকর। আর করিমের কলেজফাইল লালে-লাল। তারপর আবার অনামিকায় তার প্রমাণ।

।আট।

আসলে একা একা ব্যাগ গোছানোটা অনেক বাজে একটা ব্যাপার। আর সেটা যখন আর পাঁচজনের সামনে হয় তখন সেটাকে সংজ্ঞায়িত করা যায় বিশ্রী ব্যাপার হিসেবে।

রিমন, হাসান, রাসেল আর হায়দার করিমের ব্যাগ গোছানো দেখছে। করিমের চোখটা বোধহয় আজ লাল। ওদেরটা হলুদ।

এখন গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, অর্থনীতির থেকে মনে হয় মনোবিজ্ঞানটারই জোর দেয়া উচিত।

বন্দোবস্ত মনে হয় মনোবিজ্ঞানে পড়ানো হয়।

।নয়।

কোলাকুলি ভাল। এখানে দেহের উষ্ণতার সাথে সাথে চোখের পানির ছোঁয়া পেলে অনুভূতিটা দারুন হয়।

শেষপর্যন্ত বিদায়টা একটু আগেভাগেই নিতে হলো করিমকে।

করিম বলল – শালারা নাক কম টান। আর মলদ্বারের বাচ্চা কিছু মনে করিসনে। আর তোরা জেলে আর কিছুদিন থাক। আমি বাইরে যেয়ে হাতে সিগারেট নিয়ে তোদের জন্য অপেক্ষা করবো। এই জীবনটা – জাস্ট এঞ্জয় ইট।

।দশ।

কার কপালে ভাত কখন কোথায় আর কিভাবে জোটে এটা বলায় কঠিন বিষয়। আজ এতোগুলো বছর পার হয়ে, যখন তারা প্রায় সবাই বাবা বনে গেছে তখন করিম পেশায় শিক্ষক, হায়দার স্থপতি, রাসেল আর হাসান ব্যবসায়ী এবং রিমন ডাক্তার।

কিন্তু তাদের বন্ধুত্ব এখনও অটুট আছে। তারা তাদের মেধা আর শ্রম একত্র করে বানিয়েছে “কলেজ পলায়ন-১” নামের ভিডিও গেমটি। কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে ধরা না পড়ে কলেজ থেকে পালিয়ে বাইরে যেয়ে আবার সফলভাবে ফিরে আসার মিশনটি তারা তাদের বুদ্ধির সুতোই দারুনভাবে বুনে সফটওয়্যার প্রয়োগে বানিয়েছে এই গেমটি। বিজ্ঞানের কৃত্রিমতা পূর্ণরূপে ব্যবহারের পাশাপাশি তারা প্রয়োগ করেছে মানুষের মনের সূক্ষ কিছু বিষয় বিবেচনার মানবিকতা। যা তরুণ সমাজকে আরও রোমাঞ্চের স্বাদ দিতে সহায়তা করবে।

তারা সবাই এখন প্রচুর অর্থের মালিক। তাদের কারোরই এখন আর বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেতে বাকি নেই। তারা জীবনে সবাই সফল।

……………………………

করিম – এই মলদ্বার, শালা শোন।

হায়দার – বল ব্যাটা খারাপ ছেলে।

করিম – কলেজে থাকাকালীন সিগারেটের প্রতিটি টানের স্বাদ আর এখনকার সিগারেটের স্বাদে অনেক পার্থক্য। সেই স্বাদ আর পাই না রে।

হায়দার –  ভাল। কলেজ ডাইনিংহলের পাতলা ডালের স্বাদের কথা মনে আছে?

করিম – আহারে সেই স্বাদ, মামা!

-সমাপ্ত-

৯৮৬ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “কলেজ আউট”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    তুমি আবার পড়ে দেখো তো, বেশ কিছু বানান ভুল বা ভুল বাক্যের কারণে হোচট খাচ্ছি।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।