প্রেম ভালবাসা ও সম্পর্ক নিয়ে কিছু টুকরো ভাবনা (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রেম ভালবাসা ও সম্পর্ক নিয়ে কিছু টুকরো ভাবনা (প্রথম পর্ব)

পাঁচ
“ইমোশনালি ইনভল্ভড” প্রেমের সম্পর্কগুলি আসলে কেমন?
প্রেম মানেই কিন্তু সেখানে ইমশনাল ইনভল্ভমেন্ট থাকবে।
ইমোশন ছাড়া যেই সব সম্পর্ক হয়, সেগুলা আর যাই হোক, প্রেম নয়।
আসলে প্রেম ছাড়াও আরও অনেক অনেক সম্পর্কে কিন্ত ইমোশন থাকে।
এমন কি, “ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিট”-এর মত ঘোষিত হালকা সম্পর্কও কিন্তু ইমোশন মুক্ত নয়।
তবে কথা আছে।
সব সম্পর্কের ইমোশনের ইন্টেন্সিটি কিন্তু এক নয়।
আমার পরিচিত বেশ ক’টি যুগলকে জানি, যাদের প্রেমের সম্পর্কগুলো বড়ই জটিল।
অদুর ভবিষ্যতে তো নয়ই, সম্ভবতঃ জীবনেও ঐ প্রেমগুলা পূর্নতা পাবে না।
অথচ তারপরেও কি গভীর তাদের ইমোশনাল এটাচমেন্ট!!
প্রতিনিয়ত পথচলা!!!
তাদের প্রতিটা মুহুর্তেই চলে পরষ্পরের প্রতি পরষ্পরের সেইসব আবেগময় আদান-প্রদান।
আবার একটু বেশি সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেই কি এক শুন্যতায় ভরে ওঠে তাদের চারিপাশ। চারিপাশের প্রতিটা মূহুর্ত!!!
মজার ব্যাপার হলো, এই কাপলগুলার বেশিরভাগই কিন্তু আবার ততটা তরুণ নয়, যতটা তারুন্যে প্রেমটা হয় বাধভাঙ্গা। মধ্যবয়স বা তার কাছাকাছি পৌছেও এরা যে এমন আবেগময় টানটান উত্তেজনাময় প্রেমের সম্পর্কে আছেন, তেমন কোনো প্রাপ্তি ছাড়াও সেটা যে অনির্দিষ্টকালের জন্য টেনে নিয়ে যাচ্ছেন – ব্যাপারগুলা এক এক সময় ব্যাখ্যাতিতই ঠেকে!!!

এইতো গেল একধরনের ইমোশনাল ইনভল্ভমেন্ট যা : বয়স, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান, বৈবাহিক অবস্থা, ইত্যাদি নির্বিশেষে নিবিড় গভীরতা সহ এগিয়ে যাচ্ছে।
অথচ, এর বাইরেও এমন অনেক অনেক প্রেমের সম্পর্কের কথা শুনেছি বা জানি, যেগুলাতে পরিনতির সব ধরনের সুযোগ ও সম্ভবনা থাকা সত্বেও দেখা যায় খুবই ঠুনকো কোনো কারনে হুড়মূড় করে ভেঙ্গে পড়ে।
মজার ব্যাপার হলো, সেগুলোতেও পক্ষগুলো দাবী করে যায় যে, সেই সম্পর্কগুলোও নাকি ছিল মূলতঃ আবেগ-নির্ভর।
কিন্তু অবাক কান্ড হলো, একটি আবেগ-নির্ভর প্রেমের সম্পর্ক কি করে এতটা ঠুনকো হয় যা অতি সামান্য কোনো কারনে এইভাবে ভেঙ্গে পড়তে পারে?
হ্যাঁ, ভেঙ্গে পড়াটা তখনই সম্ভব, যখন সম্পর্কে থাকা যুগল আবেগময়তার যত দাবীই করুক না কেন, আসলে সেটার মধ্যে কোনো একজনের তেমন কোনো গভীরতা থাকে না।
আর সেটার কারনে হয়তো দেখা যায়, একটি অসময়ে করা দুর্বোধ্য এসএমএস নিয়ে সৃষ্ট মতভেদও হতে পারে এধরনের একটি সম্পর্ক ভঙ্গের অজুহাত।
তাজ্জব না???
মিস-কমুনিকেশন তো সেখানে সম্পর্ক ভাঙ্গার জন্য বিরাট উপলক্ষ।

প্রেমের সম্পর্ক যে আবেগ-নির্ভর হবেই, এতে আলাদা কোনো কৃতিত্ব নাই।
কৃতিত্ব হলো, সেই আবেগ-নির্ভরতাটা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কতটা গভীরতা পাচ্ছে তাতে।
অগভীর ইমোশনাল ইনভল্ভমেন্টের কারনে ঠুনকো সম্পর্কে থাকা যাবতিয় যুগলের জন্য তাই আগাম সতর্কতা – কবে ভাঙ্গছেন, এই সম্পর্কটা?
ভাঙ্গুন, ভাঙ্গুন, তবে এইজন্য অন্য কিছুকে বা অন্য কাউকে দূষবেন না।
সুযোগ থাকা সত্বেও, নিজেই যখন সম্পর্কটাকে গভীর ভাবে আবেগময় করতে পারলেন না, সেটা ভাঙ্গার দায় কিন্তু আপনারই।
অন্য কারো না……
*** *** ***

ছয়
মাঝেমাঝে ভাবি, একাধিক নারীর সাথে সম্পর্ক রাখে যে পুরুষ, তাঁকে বহুগামি ডেকে অসম্মান করা হয়, নাকি প্রশংসা?
গমন করা থেকে যে “গামি” সাফিক্সের উদ্ভব, সেখানে গমনকারী হলো ইনিশিয়েটিভের উৎস। আর তাই একজন ইনিশিয়েটরকে তাঁর ইনিসিয়েশন এবিলিটির জন্য গামি প্রত্যয় যোগ করে আসলে প্রশংসা করা হলো নাকি বাতিল করা হলো, সেই সংশয় জাগতেই পারে।
নারীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কিন্তু ভিন্ন।
একাধিক পুরুষের সাথে স্বেচ্ছায়, এমনকি ইনিশিয়েটর হিসাবেও সম্পর্ক রাখা নারীকে বহুভোগ্যা নামে আখ্যায়িত করে সবাই।
ভাবখানা এমন যে, তাঁর জন্য শারীরিক সম্পর্ক কেবলি অন্যের ভোগের জন্য।
সে কেবলি অন্যের উপভোগের সামগ্রী, তাঁর নিজের এতে কোনো পার্টিসিপেশান নাই, উপোভোগের উপলক্ষ নাই।

আচ্ছা, যদি এমন হয়, যেখানে, একটি পুরুষ নিজেকে একাধিক নারীর উপোভোগের সামগ্রি হিসাবে নিজে ব্যবহৃত হতে সম্মত আছেন – তাঁকে কি তখন “বহুভোগ্য পুরুষ” নামে অবিহিত করা যাবে?
অথবা একজন ক্ষমতাবান নারী যদি উপভোগের জন্য একাধিক পুরুষের সান্নিধ্য বেছে নেন, তাঁকে কি তখন বহুগামি নারী বলা যাবে??

পারষ্পরিক সম্মতিতে নারী-পুরুষের যে ইন্টিমেট সম্পর্ক, তাতো উভয়েরই ইনিসিয়েশনে, উভয়েরই উপভোগের জন্য। তাহলে কেনো তাতে একজনকে ভোগ্যা আর অন্যজনকে গমনকারী হিসাবে চিহ্নিত করা???
*** *** ***

সাত
শুধু ইন্টিমেসি আর প্যাশনের মিথোস্ক্রিয়ায় যে রোমান্টিক প্রেম, কমিটমেন্টের অনুপস্থিতিতে তা কতটা স্থায়ী হওয়া সম্ভব?
তাত্ত্বিকভাবে এটা যথেষ্ট স্থায়ী হতে কোনো বাধা নাই, কিন্তু আমার ধারনা, আমাদের দেশের যে প্রেম-সংস্কৃতি ও প্র্যাকটিস তাতে এরকমের বেশির ভাগ সম্পর্কই খুব একটা দীর্ঘমেয়াদি হয় না।
এই ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসাবে যেটা এসে পরে, তা হলো, একটি অপ্রকাশিত কমিটমেন্ট ও তা মেনে চলার জন্য কোনো এক পক্ষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জোরাজোরি।
আগেই লিখেছিলাম, এই রোমান্টিক প্রেমগুলা যে সেখানেই আটকে থাকে, কমিটমেন্ট অন্তর্ভুক্ত করে পরিপূর্ণ প্রেম গঠনে এগোয় না, তার কারন মূলতঃ দুইটা : ১) কমিটমেন্টে যেতে অনিহা অথবা ২) কমিটমেন্টে যাওয়ার অপারগতা।
এই যদি হয় অবস্থা, সেখানে অপ্রকাশিত কমিটমেন্টের জন্য এই জোরাজোরিটা ঘটে কিভাবে?
ঐ যে বললাম, এটা ঘটে দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসা যে সংস্কৃতি, সেটার কারনে।
সমস্যা বাধে তখনই, যখন অপ্রকাশ্য বলে উভয়ের চাহিদাগুলোও হয়ে পড়ে অসম।
হয়তো দেখা যাবে, জুটির একজন চাইছে, তাঁর পার্টনার কেবলই তাঁর প্রতি গভীরভাবে বিশ্বস্ত থাকুক, তাকেই একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান গন্য করুক। অথচ সে নিজে পার্টনারের প্রতি তা করতে সক্ষম না বা ইচ্ছুক না।
এই পরিস্থিতিতে সম্পর্কে আর ভারসাম্য থাকে না।
কখনো কখনো আবার দেখা যায়, পার্টনারের কাছ থেকে এরকম চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও নিজ থেকেই সীমাবদ্ধ একটা জীবন বেছে নেয় কেউ কেউ, পার্টনারের প্রতি জন্মানো গভীর আবেগকে সম্মান দেখাতে। এতে হয়তো আত্মপ্রসাদ থাকে কিন্তু ব্যাপারটা কিন্তু যথেষ্ট স্ট্রেসফুলও।
আর তাই এটাও একসময় ভারসাম্যহীনতা বোধের সুত্রপাত করে, যখন সে দেখে তাঁর পার্টনার সেসব থেকে মুক্ত থেকে কি সুন্দর স্ট্রেসবিহিন নিজের জীবনযাপন করে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে “প্রেমের দায় কি আমি একাই মেটাবো” জাতিয় ভাবনার অনুপ্রবেশ খুব অসম্ভব কিছু না।
একটি ভারসাম্যবিহীন সম্পর্ক খুব বেশিদিন টেনে নেয়া যায় না।
তা নিতে হলে, আবার ভারসাম্যে ফেরাটা জরুরী হয়ে পড়ে।
তাছাড়া এদেশে “ওমুকের বয়ফ্রেন্ড” বা “তমুকের গার্লফ্রেন্ড” ব্যাপারগুলা নিয়ে ঘনিষ্ট মহল এতটাই জাজমেন্টাল ও ইনভল্ভড হয়ে পড়ে যে দুজন মানুষের জন্য সবাইকে আশ্বস্ত করে পরিস্থিতি সামাল দেয়াটা জটিল হয়ে পড়ে।
এসব সামাল দিতে গিয়ে তাই বরং বিচ্ছেদটাই হয়ে পরে রোমান্টিক প্রেমের অমোঘ পরিনতি।
তবে হ্যাঁ, এসব ঘটতে যাওয়া বিষয়গুলো যদি রোমান্টিক প্রেমে থাকা যুগল মাথায় রাখে ও তা সামাল দেয়ার ব্যাপারে উভয়েই ইচ্ছুক ও সচেষ্ট হয়, তা হলে, ফর্মাল কমিটমেন্টে না গিয়েও একটি রোমান্টিক প্রেমের সম্পর্ক অনির্দিষ্ট কালের জন্য চলতে পারে।
চলাটা খুবই সম্ভব……

(চলবে………)
প্রেম ভালবাসা ও সম্পর্ক নিয়ে কিছু টুকরো ভাবনা (তৃতীয় পর্ব)

প্রেম ভালবাসা ও সম্পর্ক নিয়ে কিছু টুকরো ভাবনা (চতুর্থ পর্ব)

১,৯৬২ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।